📄 ’আমীরুল বহর কোচক হুসায়ন পাশা
কোচক হুসায়ন পাশা তৃতীয় সালীমের শাসন 'আমলে হাসান পাশার পর আমীরুল বহর নিযুক্ত হন। তিনি এক নাগাড়ে দ্বাদশ বছরকাল এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি তুর্কী নৌ-বিভাগে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র নতুন-ভাবে ঢেলে সাজান। ফ্রান্স ও ইংরেজ নৌ-বহরের অনুকরণে তুর্কী নৌবহরকেও পুনর্বিন্যাস করেন। বহু নতুন জাহাজ নির্মাণ করান। ফ্রান্স ও সুইডেন থেকে অজস্র দক্ষ প্রকৌশলী আমদানী করেন। তাঁরা তুর্কী তরুণদের কামান ও আধুনিক অস্ত্র নির্মাণ শিক্ষা দেন।
সুলতান আবদুল হামীদের 'আমলে ব্যারন দি তুতের তত্ত্বাবধানে গোলন্দাযদের শিক্ষাদানকল্পে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলে।। কোচক হুসায়ন পাশা সেটির মানোন্নয়ন সাধন করেন। এছাড়া তিনি আরো একটি নৌ-বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
দুটি বিদ্যালয়কেই তিনি চরমোৎকর্ষ দান করেছিলেন। ফলে তুর্কী তরুণদের মধ্যে নৌবিদ্যা লাভের উদগ্র আগ্রহ জন্মে। মুসলিম নৌবা-হিনীর ব্যাপক উন্নতি ঘটে।
হুসায়ন পাশা নৌবিদ্যা, জাহাজ চালনা, জাহাজ নির্মাণ ও নৌ-বাহিনী সম্পর্কীয় সমুদয় ফ্রান্সিস ও ইংরেজী গ্রন্থের তুর্কী তরজমা করান। নৌবাহিনীতে বিভিন্ন প্রকার পাঠাগার স্থাপন করেন। এই সব গ্রন্থাগারে হাযার হাযার বই থাকতো। তিনি তাঁর নৌবিদ্যালয়ে ফ্রান্সীয় শিক্ষারও সুব্যবস্থা রাখেন।
এসব সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের পর আমীরুল বহর কোচক হুসায়ন পাশা নৌবন্দর সংস্কার করেন। পোতাশ্রয়গুলো পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি করেন।
জাহাজ চালনা কার্যের জন্য ভালো জাহাজ নির্মাণ কারখানা থাকা আবশ্যক। যে জাতির ভালো জাহাজ নির্মাণ কারখানা নেই, সে জাতির জাহাজ চালনা নিরর্থক।
তুর্কী জাতি যাতে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে ইউরোপীয় কোনো জাতির চাইতে পিছনে পড়ে না থাকে আমীরুল বহর কোচক হুসায়ন পাশা সেজন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তিনি ভূমধ্যসাগরের তীরভূমি ও বিভিন্ন দ্বীপদেশে জাহাজ নির্মাণ কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এসব কারখানায় বহু পর্বতোপম জাহাজ নির্মিত হতো। খ্যাতনামা প্রকৌশলিগণ দ্বারা কারখানাগুলো পরিচালিত হতো।
আমীরুল বহর কোচক হুসায়ন পাশা ভূমধ্যসাগর ও ঈজীয়ান সাগরকে নৌদস্যু ও তস্করমুক্ত করেন। নৌসৈনাপত্যের দায়িত্ব হাতে নিয়ে তিনি ইউরোপের কুখ্যাত ডাকাত লম্বারো কাজিয়ানীকে গ্রেফতার করে তার জাহাজগুলো ডুবিয়ে দেন।
লম্বারো কাজিয়ানীর পর ঈজীয়ান সাগর ও ভূমধ্যসাগরে তার সাঙ্গোপাঙ্গদের খুঁজে খুঁজে বধ করেন। এইসব নৌদস্যু ও লুটেরা-রা শান্তিপূর্ণ সওদাগরী জাহাজে হামলা ও লুটপাট চালাতো। আমীরুল বহর কোচক হুসায়ন পাশা এদেরকে সদলবলে সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করেন।
সেনানায়ক কোচক হুসায়ন পাশা বারো বছরকাল অবধি তুর্কী নৌবাহিনীর পোষকতা করেন। নৌ-বিভাগে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ও উন্নয়ন সাধন করেন। কিন্তু তুর্কী সাম্রাজ্যের পতন এসব সংস্কার ও উন্নয়নকে অর্থহীন করে দেয়।
আঠারোশ' চার খৃস্টাব্দে এই প্রখ্যাতনামা আমীরুল বহর ইহলীলা সংবরণ করেন এবং উত্তরাধিকারস্বরূপ মুসলিম তরুণদের জন্য বহু অক্ষয় কীতি রেখে যান।
যে তরুণ সমাজ এই উত্তরাধিকার গ্রহণ করবে, তারা বড়ই সৌভাগ্যবান।