📘 সোনালী যুগের মুসলিম নৌশক্তি > 📄 ’আমীরুল বহর পীরী রইস

📄 ’আমীরুল বহর পীরী রইস


তুর্কী নৌবহরকে ভারত মহাসাগরে পরাস্ত করার পর পর্তুগীজদের শক্তি-সাহস এতোই বেড়ে যায় যে, তারা দ্বিতীয়বার এডেন বন্দরটি দখল করে নিলো এবং হিজাযের বন্দর নগরী জেদ্দার ওপরও ক্রুদ্ধ ছোবল হানার তোড়জোড় শুরু করলো।
জেদ্দা কর্যা করার পর مسلمانوں প্রতি প্রতিহিংসাবশতঃ তারা খানা কা'বা বিধ্বংস এবং রসূলুল্লাহ (স.)-এর রওযা মুবারক বিনষ্ট করার (তওবা তওবা) ফন্দি আঁটছিলো। এই অভিসন্ধি প্রতিরোধ-কল্পে পূর্তগীযদের সাথে লড়াই করার লক্ষ্যে সুলায়মান-ই-আ'জম পীরী রঈসকে এক বিরাট শক্তিশালী তুর্কী নৗবহরসহ ভারত মহাসাগরে প্রেরণ করেন। আমীরুল বহর পীরী রঈস পর্তুগীজদের ওপর হামলা করে এডেন বন্দর পুনরুদ্ধার করেন এবং এডেন বন্দরের নিরাপত্তাহেতু এক বিরাট নৌবহর মোতায়েন করেন।
এডেন মুক্ত করার পর তিনি আরব উপকূল ঘেঁষে এগোতে এগোতে মাস্কাত বন্দরে পৌঁছেন। মাস্কাতে পর্তুগীজ নৌবাহিনী নিলিপ্ত হয়ে পড়েছিলো। পীরী রঈস তাদেরও পাকড়াও করলেন। অতঃপর তিনি মাস্কাত থেকে অগ্রসর হয়ে পারস্যোপসাগর উপকূলে পর্তুগীজদের পর্যুদস্ত করে হরমুষ পৌঁছেন। এখানে পর্তুগীজদের সাহায্যার্থ কিছু নতুন সৈন্য এসে যোগ দিলো। ফলে পীরী রঈস পরাস্ত হলেন। পীরী রঈস মাত্র দুটি নৌ-জাহাজ শত্রুর কবল থেকে রক্ষা করতে পারলেন। বাকী সব গ্রেফতার হলো।
পীরী রঈস নিছক একজন আমীরুল বহরই ছিলেন না, একজন যবরদস্ত ভূগোলবিদও ছিলেন। তিনি ভূগোলবিদ হিসেবে ঠিক ততখানিই সুবিখ্যাত ছিলেন, যতখানি সুবিখ্যাত একজন আমীরুল বহর হিসেবে। তিনি ঈজীয়ান সাগর ও ভূমধ্যসাগর সম্বন্ধে দু'খানি গ্রন্থ রচনা করেন। তাতে তাঁর ব্যক্তিগত তত্ত্বজ্ঞানের ভিত্তিতে ঐ দু'টি সাগরের স্রোতধারা, আশপাশের পরিবেশ, নৌবন্দর ও তীরে ওঠার উপযুক্ত স্থানসমূহের বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন।
আমীরুল বহর পীরী রঈস তাঁর অধিকাংশ নৌ-অভিযানই ভূমধ্য-সাগর ও ঈজীয়ান সাগরে চালিয়েছিলেন।
পীরী রঈসের পরাজয়ের খবর শুনে সুলায়মান-ই-আ'জম আমীরুল বহর মুরাদ-ই-আ'জমকে প্রেরণ করেছিলেন। যাঁর পরিচয় তোমরা পূর্বেই পড়ে এসেছো।
মুরাদ-ই-আ'জম তুর্কী নৌবহর উদ্ধারকল্পে হরমুষ উপসাগরের সামনে পর্তুগীজদের মুকাবিলা করেন। কিন্তু কৃতকার্য হতে পারেন নি।
পীরী রঈস একযুগ পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে আমীরুল বহর ছিলেন এবং পরিশেষে সত্তর বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। তিনি তাঁর পশ্চাতে গৌরবজনক নৌসৈনাপত্য ও ভৌগোলিক ক্রিয়াকাণ্ড রেখে গেছেন।

📘 সোনালী যুগের মুসলিম নৌশক্তি > 📄 ’আমীরুল বহর হাসান পাশা

📄 ’আমীরুল বহর হাসান পাশা


সুলতান প্রথম আবদুল হামীদের 'আমলে রুশ ও তুর্কীদের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ চলছিলো। তুর্কী সাম্রাজ্যের ফৌজী শক্তি নিস্তেজ হয়ে আসছিলো। সুলতান রুশদের সাথে সন্ধি করে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটাতে চাইলেন। তাই সতেরোশ' চুয়াত্তর খৃস্টাব্দের ষোলই জুলাই কেনার্জী নামক স্থানে দুই সরকারের সামরিক প্রতিনিধিদের এক কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যা 'কেনার্জী চুক্তি' নামে খ্যাত।
তুর্কীদের মধ্যে এই সন্ধি-চুক্তির বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিলো। তারা রাশিয়ানদের ভয়ে ভীত হয়ে পড়লো। কিন্তু তুর্কীদের মধ্যে একটি জামা'আত জাতিকে এই অধোপাতের হাত থেকে রক্ষা করতে চাইলেন। তাঁরা যে-কোনো মূল্যে ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তায় তুর্কী সালতানাতের সেবায় নিয়োজিত রইলেন। পরাজয়, অধঃপতন ও তীব্র কশাঘাত সত্ত্বেও তাঁদের সঙ্কল্প থেকে তাঁরা এতোটুকু বিচ্যুত হলেন না।
এই জামা'আতের সবচেয়ে বড় স্তম্ভ ও অগ্রনায়ক ছিলেন আল-জিরীয় হাসান পাশা। তাঁর ওপর সুলতান আবদুল হামীদ ও তুর্কী জাতির পূর্ণ ভরসা ছিলো।
তুর্কী সুলতান হাসান পাশাকে অগাধ ক্ষমতা দান করেছিলেন। হাসান পাশা একদিকে স্থলবাহিনীর সিপাহসালার ও অন্যদিকে নৌ-বাহিনীর আমীরুল বহর।
তিনি স্থল ও নৌবাহিনীকে পুনর্গঠন করার সঙ্কল্প করেন। কিন্তু স্থলবাহিনীর ক্ষেত্রে কৃতকার্য হতে পারলেন না।
অজ্ঞতা ও কুসংস্কারবশত স্থলবাহিনী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও টেকনিক ব্যবহারে অসম্মত হলো। অবশ্য নৌ-বিভাগের সংস্কার সাধনে হাসান পাশার প্রচেষ্টা অনেকটা সফল হলো।
হাসান পাশা জনৈক ইংরেজ জাহাজ মিস্ত্রী দ্বারা নতুন ধরনের যুদ্ধ জাহাজ তৈয়ার করালেন। আলজিরিয়া, এ্যাড্রিয়াটিক সাগর ও বারবারী রাজ্যসমূহে যতো ভালো ভালো মাঝিমাল্লা, নাবিক ও জাহাজ মিস্ত্রী পাওয়া গেলো তিনি তাদের সবাইকে কনস্টান্টিনোপল ডেকে পাঠিয়ে নৌকার্যে নিয়োগ করলেন।
হাসান পাশা নিজেও একজন দক্ষ নাবিক ছিলেন। তিনি জাহাজ চালনা ও জাহাজ নির্মাণের গুরুত্ব ভালোভাবেই অবগত ছিলেন। তাই এই শিল্পের প্রতি তাঁর অন্তরের টান ছিলো দুনিবার। খালাসীর কাজ থেকে আরম্ভ করে কাপ্তানের কাজ পর্যন্ত তিনি স্বয়ং দেখাশোনা করতেন এবং তাদের কৃতকর্মের ভালো-মন্দ দেখিয়ে দিতেন। তিনি জাহাজের কাপ্তানদেরও জাহাজের প্রতি নজর রাখতে বাধ্য করতেন।
তিনি সর্বক্ষণ বিপুল সংখ্যক দক্ষ ও অভিজ্ঞ নাবিক কনস্টানটিনোপলে রিজার্ভ রাখতেন। এতোদিন নিয়ম ছিলো, শীতকালে জাহাজ-সমূহ বন্দরে নোঙ্গর করে নাবিকদের বিদায় করে দেয়া হতো। এই নিয়মের ত্রুটি নির্দেশ করে বললেন যে, দেশের রাজধানী এইভাবে অরক্ষিত রেখে দিলে রুশ নৌবহর কৃষ্ণসাগরের বন্দর থেকে বের হয়ে অতি সহজেই বসফোরাস দখল ও তুর্কী নৌবহরগুলোকে তার বন্দরে ধ্বংস করে দিতে পারে।
সুতরাং এই প্রস্তাব অনুসারে দওলত-ই-'উছমানিয়া বসফোরাস উপকূলে নৌছাউনির পত্তন করেন এবং নৌবাহিনীর সুবিধার্থে কতিপয় ব্যারাক নির্মাণ করেন। এইসব ব্যারাকে জাহাজের নাবিকরা শীতকালে স্বচ্ছন্দে অবস্থান করতেন।
তুর্কী আমীরুল বহরদের মধ্যে হাসান পাশা প্রথম ব্যক্তিত্ব, যিনি জাহাজের কর্মচারীদের শাস্ত্রীয় শিক্ষাদান মানসে একটি নৌ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন, তুর্কী ভাষায় নৌ-বিষয়ক গ্রন্থসমূহ তরজমা করান এবং তুর্কী তরুণদের মধ্যে নৌবিদ্যার উৎসাহ সৃষ্টি করেন।
তুর্কী সাম্রাজ্যের পতন আসন্ন। তাই যন্ত্রতন্ত্র বিদ্রোহ দানাবেঁধে উঠছিলো। প্রথম বিদ্রোহ করেন সিরিয়ার শায়খ তাহির নামক জনৈক গোত্রপতি। স্থল ও নৌ উভয় বাহিনীই ব্যবহৃত হয়। 'আক্কা বন্দর অবরোধ করে শায়খ তাহিরকে গ্রেফতার ও বন্দী করা হয়। এবং 'আক্কা বন্দর ও তার পুরো এলাকা কব্জা করে হাসান পাশা সেখানে একদল নৌ ও স্থলসেনা নিয়োগ করেন। অতঃপর সতেরোশ' সত্তর খৃস্টাব্দে তিনি মারীয়া বিদ্রোহ দমন করে সেখানে শান্তি স্থাপন করেন।
কিছুদিন পর মিসরে মামলুকদের বিদ্রোহ শুরু হয়। হাসান পাশা এই বিদ্রোহ দমনের জন্যেও স্থল ও নৌবাহিনী ব্যবহার করেন এবং অচিরেই কায়রো দখল করে বিদ্রোহের মূলোৎপাটন করেন।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন সম্রাজ্ঞী যারীনা ক্যাথারীন। এই মহিলা ভীষণ গোঁড়া ও তুর্কীবিদ্বেষী ছিলেন। তিনি তুর্কী জাতিকে ভূপৃষ্ঠ হতে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইলেন। তাই বড় বড় কূটকৌশল ও চক্রান্তজাল রচনা করলেন। তাঁর প্রথম লক্ষ্য ছিলো তুর্কীদের ইউরোপ থেকে বহিষ্কার করা। কনস্টান্টিনোপল থেকে পিটিয়ে তাড়িয়ে দেয়া। কনস্টানটিনোপলের সিংহাসনে বসানোর জন্য তিনি তাঁর পৌত্র যুবরাজ কনস্টানটাইনকে প্রস্তুত রাখলেন।
যারীনা ক্যাথারীন বিরাট প্রস্তুতির পর তুর্কীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। তুর্কী সুলতান আমীরুল বহর হাসান পাশাকে নৌ ও স্থল বাহিনীর কর্তৃত্ব প্রদান করে ক্যালবার্ন আক্রমণকল্পে উকাযাকোভ প্রেরণ করেন। ক্যালবার্ন নীটার নদীর মোহনায় উকাযাকোভের বিপরীত তীরে অবস্থিত। ক্যালবার্নে রুশ বাহিনীর প্রখ্যাত সিপাহ্-সালার সুভারভ শিবির ফেলে অবস্থান করছিলেন। সুভারভ সমকালের খ্যাতনামা জেনারেল ছিলেন। তিনি তুর্কী ফৌজের অধিকাংশকে বিনা বাধায় নদী পার হতে দিলেন।
অতঃপর এক ঝটিকা আক্রমণে তুর্কী বাহিনীর বৃহদংশের ক্ষতি-সাধন করেন। তুর্কী ও রুশ নৌবহরের মধ্যেও সংঘর্ষ হলো। তুর্কী বহরের ঘোরতর ক্ষতি হলো। হাসান পাশার অধিকাংশ নৌ-জাহাজ ধ্বংস ও বিনষ্ট হলো।
এরপর সতেরোশ' সাতাশি সাল পর্যন্ত দুই সরকারের মধ্যে কোনো লড়াই-বিবাদ বাধেনি।
তুরস্ক সতেরোশ' উনানব্বই খৃস্টাব্দে ইউসুফ পাশার নেতৃত্বে তরতযা নব্বই হাযার সৈন্য রাশিয়ার মুকাবিলায় চালনা করে। ইউসুফ পাশা একজন মস্ত অভিজ্ঞ তুর্কী সিপাহসালার ছিলেন। তিনি তাঁর সৈন্যের কিয়দংশ শত্রুর পশ্চাৎদেশে আক্রমণ পর্যবেক্ষণহেতু রেখে নব্বই হাযার আনকোরা সাহসী সৈন্যসহ দানিয়ুব নদী পার হয়ে ট্রানসিলভেনিয়ায় ঢুকে পড়েন। সেখান থেকে তিনি অস্ট্রিয়া আক্র- মণের উপক্রম করলেন। ইত্যবসরে সতেরোশ' উনানব্বই খৃস্টাব্দের সতেরোই এপ্রিল সুলতান প্রথম আবদুল হামীদ ইন্তিকাল করেন। ফলে ইউসুফ পাশাকে ফেরত ডেকে পাঠানো হয়। তিনি এই অভিযান অসমাপ্ত রেখে সসৈন্যে কনস্টানটিনোপল পৌছেন।
প্রথম আবদুল হামীদের পর শাহযাদা তৃতীয় সালীম তখন'শীন হন। তিনি তুর্কী সালতানাতকে সুবিন্যস্ত করে স্থল ও নৌবাহিনীকেও শক্তিশালী করার সঙ্কল্প করেন। কিন্তু শত্রুরা তাঁকে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার অবসর দেয়নি।
এই সময় যারীনা ক্যাথারীনের ইঙ্গিতে অস্ট্রিয়া তুর্কীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো। সুলতান সালীম তাঁর পুরাতন বিদগ্ধ আমীরুল বহর ও সিপাহসালার হাসান পাশাকে প্রধান সেনাপতি করে পাঠান। হাসান পাশা এক বিরাট বাহিনীসহ অস্ট্রিয়ার সিপাহসালার শাহযাদা কোবরগের মুকাবিলায় অগ্রসর হলেন। কোবরগ মলডেভিয়ার সীমান্তে ফকশানী নামক স্থানে শিবির পেতে বিশ্রাম করছিলেন। যদি রাশিয়ার রণদক্ষ সিপাহসালার সুভারভ কোবরগের সাহায্যে এগিয়ে না আসতেন, তাহলে কোবরগের পরাজয় অবধারিত ছিলো।
রাশিয়ার প্রবীণ সিপাহসালার সুভারত মাত্র ছত্রিশ ঘন্টার ব্যবধানে ষাট মাইল দুর্গম পাহাড়ী পথ অতিক্রম করে যথাসময়ে সাহায্যার্থ পৌঁছে গেলেন।
সুভারত তুর্কীদের হামলার অপেক্ষা না করে স্বয়ং তুর্কী বাহিনীর ওপর হামলা পরিচালনা করলেন। সুভারতের হামলা ফলবতী হলো। যুদ্ধক্ষেত্রে তুর্কীরা পরাভূত হলেন। শত্রুপক্ষ তুর্কীদের সমুদয় যুদ্ধোপ- করণ করায়ত্ত করলো।
এই ব্যর্থতার পর সুলতান তৃতীয় সালীম নতুন নতুন সেনাদল পাঠালেন। সতেরোশ' উনানব্বই খৃস্টাব্দের ৬ই সেপ্টেম্বর রম্নগ্‌ নদীর সন্নিকটে জেনারেল সুভারভের সৈন্যরা এই নতুন সৈন্যদেরও পরাজিত করেন।
এই উপর্যুপরি পরাজয়ের দরুন কনস্টানটিনোপলের জনগণ তুমুল হট্টগোল আরম্ভ করেন। তারা এই পরাজয়ের সমস্ত দায়-দায়িত্ব সেনাপতি হাসান পাশার স্কন্ধে চাপালেন। তারা সুলতান সকাশে হাসান পাশার শান্তিও দাবী করলেন।
যে হাসান পাশা দওলত-ই-'উছমানিয়ার শুশ্রুষা করতে করতে বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, যিনি 'উছমানীয় সাম্রাজ্যকে অধঃপাতের হাত থেকে রক্ষা করার প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন, তাঁর শত্রুরা তাঁকে কারারুদ্ধ করালো।
আত্মমর্যাদাশীল বীর আমীরুল বহর কারাগারেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আর স্বীয় উজ্জ্বল কর্মকাণ্ড অনাগত মুসলিম তরুণদের জন্যে রেখে যান।
তোমাদের কর্তব্য হচ্ছে, এই বীর বাহাদুর সেনাপতির আদর্শে স্বীয় জীবনযাত্রা নির্বাহ করা। ইসলামের কৃতী সন্তানরূপে নিজেদের গড়ে তোলা। যে জাতির নতুন বংশধররা কোনো মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে অগ্রসর হয়, কেবল তাদেরই সম্মানজনক জীবন যাপনের অধিকার আছে। তারাই পারে দুনিয়ায় সসম্মানে জীবন ধারণ করতে।
তোমরাও তোমাদের জীবনের লক্ষ্য স্থির করো। স্বীয় পূর্বপুরুষদের কীর্তিধন্য জীবন থেকে ফায়দা হাসিল করো। আল্লাহ, তোমাদের সাহায্য করবেন। কিন্তু স্মরণ রেখো, আল্লাহ্ তাদেরই সাহায্য করেন, যারা নিজেদের সাহায্য করে।

📘 সোনালী যুগের মুসলিম নৌশক্তি > 📄 ’আমীরুল বহর কোচক হুসায়ন পাশা

📄 ’আমীরুল বহর কোচক হুসায়ন পাশা


কোচক হুসায়ন পাশা তৃতীয় সালীমের শাসন 'আমলে হাসান পাশার পর আমীরুল বহর নিযুক্ত হন। তিনি এক নাগাড়ে দ্বাদশ বছরকাল এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি তুর্কী নৌ-বিভাগে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র নতুন-ভাবে ঢেলে সাজান। ফ্রান্স ও ইংরেজ নৌ-বহরের অনুকরণে তুর্কী নৌবহরকেও পুনর্বিন্যাস করেন। বহু নতুন জাহাজ নির্মাণ করান। ফ্রান্স ও সুইডেন থেকে অজস্র দক্ষ প্রকৌশলী আমদানী করেন। তাঁরা তুর্কী তরুণদের কামান ও আধুনিক অস্ত্র নির্মাণ শিক্ষা দেন।
সুলতান আবদুল হামীদের 'আমলে ব্যারন দি তুতের তত্ত্বাবধানে গোলন্দাযদের শিক্ষাদানকল্পে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলে।। কোচক হুসায়ন পাশা সেটির মানোন্নয়ন সাধন করেন। এছাড়া তিনি আরো একটি নৌ-বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
দুটি বিদ্যালয়কেই তিনি চরমোৎকর্ষ দান করেছিলেন। ফলে তুর্কী তরুণদের মধ্যে নৌবিদ্যা লাভের উদগ্র আগ্রহ জন্মে। মুসলিম নৌবা-হিনীর ব্যাপক উন্নতি ঘটে।
হুসায়ন পাশা নৌবিদ্যা, জাহাজ চালনা, জাহাজ নির্মাণ ও নৌ-বাহিনী সম্পর্কীয় সমুদয় ফ্রান্সিস ও ইংরেজী গ্রন্থের তুর্কী তরজমা করান। নৌবাহিনীতে বিভিন্ন প্রকার পাঠাগার স্থাপন করেন। এই সব গ্রন্থাগারে হাযার হাযার বই থাকতো। তিনি তাঁর নৌবিদ্যালয়ে ফ্রান্সীয় শিক্ষারও সুব্যবস্থা রাখেন।
এসব সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের পর আমীরুল বহর কোচক হুসায়ন পাশা নৌবন্দর সংস্কার করেন। পোতাশ্রয়গুলো পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি করেন।
জাহাজ চালনা কার্যের জন্য ভালো জাহাজ নির্মাণ কারখানা থাকা আবশ্যক। যে জাতির ভালো জাহাজ নির্মাণ কারখানা নেই, সে জাতির জাহাজ চালনা নিরর্থক।
তুর্কী জাতি যাতে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে ইউরোপীয় কোনো জাতির চাইতে পিছনে পড়ে না থাকে আমীরুল বহর কোচক হুসায়ন পাশা সেজন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তিনি ভূমধ্যসাগরের তীরভূমি ও বিভিন্ন দ্বীপদেশে জাহাজ নির্মাণ কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এসব কারখানায় বহু পর্বতোপম জাহাজ নির্মিত হতো। খ্যাতনামা প্রকৌশলিগণ দ্বারা কারখানাগুলো পরিচালিত হতো।
আমীরুল বহর কোচক হুসায়ন পাশা ভূমধ্যসাগর ও ঈজীয়ান সাগরকে নৌদস্যু ও তস্করমুক্ত করেন। নৌসৈনাপত্যের দায়িত্ব হাতে নিয়ে তিনি ইউরোপের কুখ্যাত ডাকাত লম্বারো কাজিয়ানীকে গ্রেফতার করে তার জাহাজগুলো ডুবিয়ে দেন।
লম্বারো কাজিয়ানীর পর ঈজীয়ান সাগর ও ভূমধ্যসাগরে তার সাঙ্গোপাঙ্গদের খুঁজে খুঁজে বধ করেন। এইসব নৌদস্যু ও লুটেরা-রা শান্তিপূর্ণ সওদাগরী জাহাজে হামলা ও লুটপাট চালাতো। আমীরুল বহর কোচক হুসায়ন পাশা এদেরকে সদলবলে সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করেন।
সেনানায়ক কোচক হুসায়ন পাশা বারো বছরকাল অবধি তুর্কী নৌবাহিনীর পোষকতা করেন। নৌ-বিভাগে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ও উন্নয়ন সাধন করেন। কিন্তু তুর্কী সাম্রাজ্যের পতন এসব সংস্কার ও উন্নয়নকে অর্থহীন করে দেয়।
আঠারোশ' চার খৃস্টাব্দে এই প্রখ্যাতনামা আমীরুল বহর ইহলীলা সংবরণ করেন এবং উত্তরাধিকারস্বরূপ মুসলিম তরুণদের জন্য বহু অক্ষয় কীতি রেখে যান।
যে তরুণ সমাজ এই উত্তরাধিকার গ্রহণ করবে, তারা বড়ই সৌভাগ্যবান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00