📄 ’আমীরুল বহর সাইয়্যিদী আলী রইস
সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সাইয়িদী আলী রঈস নামক এক প্রখ্যাত আমীরুল বহর আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি নৌযুদ্ধ ও জাহাজ পরিচালনায় খায়রুদ্দীন পাশা বারবারোসার সমকক্ষ এবং ইউরোপীয় এক বিখ্যাত খৃস্টান পরিবারের নও মুসলিম কাপ্তানের পুত্র ছিলেন।
আলী রঈস নৌযুদ্ধ ও জাহাজ চালনার ট্রেনিং লাভ করেছিলেন তাঁর পিতার কাছে। অতঃপর ক্রমান্বয়ে উন্নতি লাভ করে ষোলটি জাহাজের এক নৌবহরসহ দওলত-ই-উছমানিয়ার নৌ-বিভাগে চাকরি নেন। সুলতান তাঁকে তাঁর সুখ্যাতি ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমীরুল বহর নিযুক্ত করেন। এরপরই তাঁর কীতিকাণ্ডের স্বর্ণদ্বার খুলে যায়।
ষোলশ' আটত্রিশ খৃস্টাব্দে আলী রঈস তুর্কী নৌবহর দ্বারা ইটালীর পূর্ব উপকূল আক্রমণ করে আপুলিয়া প্রদেশের নকোত্রা লুট করেন।
এখানকার বিজয় পর্ব সম্পন্ন করে তিনি এ্যাড্রিয়াটিক সাগরে প্রবেশ করেন এবং কেট্রো উপসাগরের সন্নিকটে এক স্পেনীয় নৌবহরে হামলা করে সেগুলো দখল করেন। ভেনিসে যখন আলী রঈসের এই সামুদ্রিক ক্রিয়াকাণ্ডের খবর পৌঁছলো তখন ভেনিস সরকার আলী রঈসকে দমনকল্পে সেনাপতি ক্যাপেলুর নেতৃত্বে এক বিরাট নৌবহর প্রেরণ করলেন।
ভেনিসীয় নৌবহর আলী রঈসের ওপর হামলা করলো। আলী রঈস আত্মরক্ষাকল্পে আলবানিয়ার ভিলোনা নামক তুর্কী দুর্গে আশ্রয় নিলেন। সেনাপতি ক্যাপেলু প্রচণ্ড আঘাত হেনে তুর্কী জাহাজগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করলেন।
এর প্রতিশোধ মানসে কনস্টান্টিনোপল থেকে এক শক্তিশালী তুর্কী নৌবহর এসে সেনাপতি ক্যাপেলুকে চরমভাবে পর্যুদস্ত করলো।
এই নৌযুদ্ধে আলী রঈসের নৌবহরের এক বিরাট অংশ নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই দওলত-ই-'উছমানিয়া তাঁর জন্যে একটি নতুন নৌবহর তৈয়ার করলেন। এই নৌবহরে নতুন-পুরান মিলে মোট পঁয়ষট্রিটি জাহাজ ও ত্রিশ হাযার নৌসেনা ছিলো।
এই নৌবহরের বদৌলতে তিনি বিরাট খ্যাতি অর্জন করেন। ভূমধ্যসাগরে ইউরোপীয় মীরবহররা আলী রঈসের নামে সন্ত্রস্ত্র ছিলো। দক্ষিণ ইউরোপে তো তিনি তুর্কীদের নৌএকাধিপত্যই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
আলী রঈস তাঁর নৌসেনাদের কল্যাণ ও উন্নতি বিধানে সবিশেষ যত্নবান ছিলেন। তিনি ভূমধ্যসাগরের সকল নৌবন্দর সংলগ্ন স্বাস্থ্যকর স্থানসমূহে নৌসেনাদের চিত্তবিনোদনহেতু অনেক বালাখানা নির্মাণ করেছিলেন। এইসব বালাখানার চতুর্দিকে সেব গাছ লাগানো হতো। সেব গাছের সবুজ ডালপালা বালাখানার জানালা পর্যন্ত এসে পৌঁছতো।
আমীরুল বহর আলী রঈস ছিলেন একজন পূর্ণ আদর্শ নৌসেনানী। তিনি তাঁর নৌসেনা ও খালাসীদের সাথে অত্যন্ত প্রীতিপূর্ণ ও নম্র ব্যবহার করতেন। অধীনদেরকে সর্বদা 'হযরত' বলে সম্বোধন করতেন। তাদের দুঃখ-কষ্টকে নিজের দুঃখ-কষ্ট বলে মনে করতেন।
তাঁর কথা ও কাজে কখনো অমিল হতো না। তিনি নিজেও বলতেন-"আমার কথাই আমার কাজ।" বন্দীদের সাথে নিহায়েত কোমল ও সদয় ব্যবহার করতেন।
এই অকুতোভয় বাহাদুর ও অমিতপরাক্রম সিপাহসালার ছাপান্ন বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। তিনি তাঁর কর্মকাণ্ড দ্বারা উত্তর-সূরিদের এমনভাবে পথ-প্রদর্শন করে গেছেন, যেমনিভাবে মহাসমুদ্রে অন্ধকার রাতে পথভ্রষ্ট জাহাজসমূহকে আলোকস্তম্ভ পথ-প্রদর্শন করে থাকে।
তোমাদের কর্তব্য হচ্ছে, এই বীর আমীরুল বহরকে স্বীয় চলার পথের আলোকবর্তিকা রূপে গ্রহণ করা এবং সমুদ্রের তরঙ্গময় জীবনের সাথে খেলা করতে শেখা। স্থল ও নৌশক্তিতে পারদর্শিতা লাভের মধ্যেই জাতির গৌরবময় জীবন নিহিত। তোমরাও পারদর্শী হও।
📄 ’আমীরুল বহর পিয়ালে পাশা
পিয়ালে পাশা প্রথম দিকে একজন সাধারণ নৌসেনা ছিলেন। সুলায়মান-ই-আ'জম তাঁকে নৌ-বিভাগে কাপ্তান পদে উন্নীত করেন। অতঃপর ক্রমান্বয়ে তিনি আমীরুল বহর পদে অধিষ্ঠিত হন।
দু'শ' খৃস্টান জাহাজের এক বিশাল নৌবহর ত্রিপোলী বন্দর তুর্কীদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে সেনাপতি ডোরীয়ার নেতৃত্বে রওয়ানা হলো।
পিয়ালে পাশা তার মুকাবিলাহেতু দাররাই-দানিয়াল থেকে বেরিয়ে আসেন এবং তুরস্কের জেরবা দ্বীপ সমীপে অবস্থান গ্রহণ করেন। এখানে খৃস্টান সম্প্রদায় তাদের সৈন্যদল নামিয়েছিলেন এবং একটি দুর্গও নির্মাণ করেছিলেন। পনেরোশ' ষাট খৃস্টাব্দের চৌদ্দই মে পিয়ালে পাশা ডোরীয়ার নৌবহরে জোরদার আক্রমণ করে চরমভাবে পর্যুদস্ত করেন।
খৃস্টান পক্ষের প্রায় পঞ্চাশটি জাহাজ ধ্বংস ও সাতটি ধৃত হলো। যেসব সৈন্য দুর্গে আশ্রয় নিয়েছিলো, পিয়ালে পাশা তাদেরও গ্রেফতার করলেন। জেরবায় তুর্কী পতাকা পুনরুত্থিত হলো।
এই বিজয়ের পর পশ্চিম আলজিরিয়ায় অবস্থিত উরন প্রদেশে হামলা চালিয়ে তাকেও 'উছমানীয় সম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হলো।
পনেরোশ' পঁয়ষাট্ট খৃস্টাব্দে যখন তুর্কী নৌবাহিনী মাল্টা আক্রমণ করেন, তখন তার কর্তৃত্বও ছিলো পিয়ালে পাশার করপুটে। অর্থাৎ পিয়ালে পাশাই ছিলেন তখন তুর্কী নৌবহরের আমীরুল বহর।
খৃস্টীয় পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে স্পেনের পর যে দেশটি মুসল-মানদের বেশী ক্ষতি করেছে, তা ছিলো পূর্তগাল। স্পেনে যখন ইসলামী হুকুমত কায়েম হয়েছিলো তখন পূর্তগালও তার আওতাধীন ছিলো। কিন্তু এই ভূখণ্ডে যখন মুসলমানদের ভাগ্যরবি অস্তমিত হয় এবং
স্পেনের খৃস্টান সরকার মুসলিম নিধনযজ্ঞে মেতে ওঠে, তখন পূর্তগাল মুসলমানদের নিকট থেকে তার মনের বাসনা চরিতার্থ করলো।
অর্থাৎ-হিন্দুস্থান, চীন, জাভা, সুমাত্রা, ভারত দ্বীপপুঞ্জ, সিংহল, মালাবার, মম্বাসা, যাঞ্জিবার, ইথিওপিয়া, মিসর ও আরব প্রভৃতি অঞ্চলের সমুদয় ব্যবসা-বাণিজ্য আরব বণিকদের অধিকারে ছিলো। এক্ষণে সুযোগ বুঝে পূর্তগীযরা আরব বণিকদের হাত থেকে এই নৌপথগুলো কেড়ে নিলো।
আরব বণিকগণ প্রাচ্য দেশের পণ্যদ্রব্য জাহাজাযোগে মিসরে নিয়ে যেতো এবং সেখান থেকে ইউরোপীয় বাণিজ্য জাহাজ এইসব মালামাল ভেনিস ও জেনোয়ায় পৌছে দিতো। অপরদিকে ইউরোপীয় পণ্যদ্রব্য বহন করে আরব বণিকরা চীন দেশে পৌঁছে দিতো। এই নৌ-বাণিজ্যে مسلمانوں অনেক অর্থাগম হতো। কিন্তু ভাস্কোডা গামার ভারত আবিষ্কারের পর পূর্তগীষরা মুসলমানদের হাত থেকে এই সুবিধা চিরতরে ছিনিয়ে নেয়ার সঙ্কল্প করলো।
সুতরাং এই লক্ষ্যে পূর্তগীযরা আচানক মুসলিম নৌবহরে হামলা শুরু করলো। এমনকি ভারত ও ইরানেও আক্রমণ করলো। শুধু তাই নয়, তারা অমুসলিমদেরকে তাদের পণ্যদ্রব্য মুসলমানদের নিকট বিক্রয় না করতেও বাধ্য করলো।
মালাবারের মোল্লা বণিকদের ওপর ঘোর নির্যাতন চালালো। য়ামন ও হিজাযের উপকূলীয় শহরগুলো কষাই করলো। ভারতীয় নদী বন্দরগুলোর ওপর-অর্থাৎ সিন্ধু থেকে আরম্ভ করে মাদ্রাজ পর্যন্ত উপকূলীয় মুসলমানদের ওপর চড়াও হলো।
ভারতীয় উপকূল ও দ্বীপপুঞ্জে মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালালো। মসজিদসমূহ ভেঙ্গে গির্জায় রূপান্তরিত করলো। কালিকটের অসাম্প্রদায়িক রাজাকে তাঁর এলাকায় মুসলমানদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে বাধ্য করা হলো। কোচীনের তীরভূমি দখল করে মুসলমানদের কতল করলো।
এরপর পূর্তগীযরা আরব উপকূলবর্তী এডেন ও হরমুষ আক্রমণ করলো। কালিকট শহর লুন্ঠন করে স্থানীয় জামে মসজিদ জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করলো। আরব উপকূলীয় অঞ্চলসমূহে লুটতরাম অব্যাহত রাখলো। হজ্জযাত্রীরাও এই দৌরাত্ম্য থেকে রেহাই পেলো না।
গোয়ার বিখ্যাত নৌবন্দর বিজাপুর সুলতানের হাত থেকে ছিনিয়ে নিলো। গুজরাটরাজের বন্দরসমূহে লুটপাট শুরু করলো। পূর্তগীযরা জেদ্দা দখল করে হিজায আক্রমণের স্বপ্ন দেখছিলো। এমনকি মক্কা মুকাররামা ও মদীনা মুনাওয়ারা আক্রমণ করে (তওবা তওবা) এ দুটি শহরকেও ধ্বংস করতে চাচ্ছিলো।
এই অবস্থার প্রতিকারকল্পে মুসলিম মিল্লাতের অধিপতি হিসেবে সুলায়মান-ই-আ'জম এগিয়ে এলেন এবং পূর্তগীযদের এহেন অত্যাচার থেকে মুসলমানদের উদ্ধার মানসে কতিপয় নৌবহর প্রেরণ করেন। মহান পিয়ালে পাশা ও সুলায়মান পাশা ছিলেন এইসব নৌ-বহরের আমীরুল বহর।
তুর্কী নৌবহর এডেন অবরোধ করলো। পূর্তগীঘরা এডেনে শিকড় গেড়েছিলো। তাই এ যাত্রা তুর্কীদের পরাজয় ঘটলো। তবু তারা অতি বীরত্বের সাথে অবিচল রইল। ভারত সাগরে পূর্তগীষদের ঠেলতে ঠেলতে গুজরাট উপকূল পর্যন্ত পৌঁছে গেলো। এখানে তুর্কী ও পূর্তগীষ নৌবহরে কয়েক দফা লড়াই হলো।
এদিকে তুর্কী নৌবহরের সাহায্যার্থে এক বিরাট নৌবহর মিসর অধিনায়ক সুলায়মান পাশার নেতৃত্বে সুয়েযখাল থেকে রওয়ানা হলো এবং এডেন করা করে গুজরাটে পৌঁছলো। মালদ্বীপ পৌছে পাশা গুজরাটীদের সহযোগে পূর্তগীষদের আক্রমণ করলেন।
সুলায়মান পাশা মালদ্বীপ অবরোধ করলেন। তিনি যদি দুঢ়চিত্তে এই অবরোধ অব্যাহত রাখতে পারতেন, তবে নির্ঘাত পূর্তগীষদের হাত থেকে বন্দরটি রক্ষা পেতো। কিন্তু ইত্যবসরে কোন এক ব্যাপারে গুজরাট নেতাদের সাথে সুলায়মান পাশার মতান্তর ঘটলে তাঁরা তুর্কী বাহিনীকে রসদ প্রেরণ বন্ধ করে দেন। ফলে একদিন তৃর্কী নৌবাহিনী নোঙ্গর তুলে চলে গেলেন এবং মালদ্বীপ পূর্বের মতোই পূর্তগীযদের দখলে রইলো।
সুলায়মান-ই-আ'জম এই সংবাদ শ্রবণ করে যারপরনাই ক্ষুব্ধ হন। তিনি আমীরুল বহর সুলায়মান পাশাকে দরবারে ডেকে তীব্র ভর্ৎসনা করে বলেন : “আমি তোমাকে মালদ্বীপ থেকে পূর্তগীষদের উৎখাতকল্পে গুজরাটরাজের সাহায্যার্থে পাঠিয়েছিলাম—হিন্দুস্তানী মুসলমানদের ওপর শাসনকর্তা করে পাঠাইনি!”
পিয়ালে পাশাও এই ব্যপদেশে পূর্তগীষদের সাথে কয়েক দফা নৌযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। কখনো কৃতকার্য হয়েছেন, আবার কখনো ব্যর্থকাম। সুলায়মান পাশার ভ্রান্তির পর সুলায়মান-ই-আ'জম তাঁর সমস্ত আমীরুল বহর রদবদল করেন। এবার পীরী রঈস নতুন আমীরুল বহর নিযুক্ত হন। তিনি পূর্তগীষদের চূড়ান্তরূপে পর্যুদস্ত করেন।
পিয়ালে পাশার প্রাথমিক জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, তিনি ছিলেন নিতান্ত একজন সাধারণ নৌসৈন্য। অতঃপর তিনি কাপ্তানে উন্নীত হন। কাপ্তানের পর ক্রমে ক্রমে আমীরুল বহরের পদ অলঙ্কত করেন।
তোমরাও নও জওয়ান। তোমাদের মধ্যেও পিয়ালে পাশার মতো সাফল্য ও উন্নতির উপাদান বিদ্যমান। কিন্তু সাফল্যকে রূপদান করতে প্রয়োজন অনলস প্রচেষ্টা ও অদম্য উৎসাহ-উদ্যম।
📄 ’আমীরুল বহর পীরী রইস
তুর্কী নৌবহরকে ভারত মহাসাগরে পরাস্ত করার পর পর্তুগীজদের শক্তি-সাহস এতোই বেড়ে যায় যে, তারা দ্বিতীয়বার এডেন বন্দরটি দখল করে নিলো এবং হিজাযের বন্দর নগরী জেদ্দার ওপরও ক্রুদ্ধ ছোবল হানার তোড়জোড় শুরু করলো।
জেদ্দা কর্যা করার পর مسلمانوں প্রতি প্রতিহিংসাবশতঃ তারা খানা কা'বা বিধ্বংস এবং রসূলুল্লাহ (স.)-এর রওযা মুবারক বিনষ্ট করার (তওবা তওবা) ফন্দি আঁটছিলো। এই অভিসন্ধি প্রতিরোধ-কল্পে পূর্তগীযদের সাথে লড়াই করার লক্ষ্যে সুলায়মান-ই-আ'জম পীরী রঈসকে এক বিরাট শক্তিশালী তুর্কী নৗবহরসহ ভারত মহাসাগরে প্রেরণ করেন। আমীরুল বহর পীরী রঈস পর্তুগীজদের ওপর হামলা করে এডেন বন্দর পুনরুদ্ধার করেন এবং এডেন বন্দরের নিরাপত্তাহেতু এক বিরাট নৌবহর মোতায়েন করেন।
এডেন মুক্ত করার পর তিনি আরব উপকূল ঘেঁষে এগোতে এগোতে মাস্কাত বন্দরে পৌঁছেন। মাস্কাতে পর্তুগীজ নৌবাহিনী নিলিপ্ত হয়ে পড়েছিলো। পীরী রঈস তাদেরও পাকড়াও করলেন। অতঃপর তিনি মাস্কাত থেকে অগ্রসর হয়ে পারস্যোপসাগর উপকূলে পর্তুগীজদের পর্যুদস্ত করে হরমুষ পৌঁছেন। এখানে পর্তুগীজদের সাহায্যার্থ কিছু নতুন সৈন্য এসে যোগ দিলো। ফলে পীরী রঈস পরাস্ত হলেন। পীরী রঈস মাত্র দুটি নৌ-জাহাজ শত্রুর কবল থেকে রক্ষা করতে পারলেন। বাকী সব গ্রেফতার হলো।
পীরী রঈস নিছক একজন আমীরুল বহরই ছিলেন না, একজন যবরদস্ত ভূগোলবিদও ছিলেন। তিনি ভূগোলবিদ হিসেবে ঠিক ততখানিই সুবিখ্যাত ছিলেন, যতখানি সুবিখ্যাত একজন আমীরুল বহর হিসেবে। তিনি ঈজীয়ান সাগর ও ভূমধ্যসাগর সম্বন্ধে দু'খানি গ্রন্থ রচনা করেন। তাতে তাঁর ব্যক্তিগত তত্ত্বজ্ঞানের ভিত্তিতে ঐ দু'টি সাগরের স্রোতধারা, আশপাশের পরিবেশ, নৌবন্দর ও তীরে ওঠার উপযুক্ত স্থানসমূহের বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন।
আমীরুল বহর পীরী রঈস তাঁর অধিকাংশ নৌ-অভিযানই ভূমধ্য-সাগর ও ঈজীয়ান সাগরে চালিয়েছিলেন।
পীরী রঈসের পরাজয়ের খবর শুনে সুলায়মান-ই-আ'জম আমীরুল বহর মুরাদ-ই-আ'জমকে প্রেরণ করেছিলেন। যাঁর পরিচয় তোমরা পূর্বেই পড়ে এসেছো।
মুরাদ-ই-আ'জম তুর্কী নৌবহর উদ্ধারকল্পে হরমুষ উপসাগরের সামনে পর্তুগীজদের মুকাবিলা করেন। কিন্তু কৃতকার্য হতে পারেন নি।
পীরী রঈস একযুগ পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে আমীরুল বহর ছিলেন এবং পরিশেষে সত্তর বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। তিনি তাঁর পশ্চাতে গৌরবজনক নৌসৈনাপত্য ও ভৌগোলিক ক্রিয়াকাণ্ড রেখে গেছেন।
📄 ’আমীরুল বহর হাসান পাশা
সুলতান প্রথম আবদুল হামীদের 'আমলে রুশ ও তুর্কীদের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ চলছিলো। তুর্কী সাম্রাজ্যের ফৌজী শক্তি নিস্তেজ হয়ে আসছিলো। সুলতান রুশদের সাথে সন্ধি করে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটাতে চাইলেন। তাই সতেরোশ' চুয়াত্তর খৃস্টাব্দের ষোলই জুলাই কেনার্জী নামক স্থানে দুই সরকারের সামরিক প্রতিনিধিদের এক কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যা 'কেনার্জী চুক্তি' নামে খ্যাত।
তুর্কীদের মধ্যে এই সন্ধি-চুক্তির বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিলো। তারা রাশিয়ানদের ভয়ে ভীত হয়ে পড়লো। কিন্তু তুর্কীদের মধ্যে একটি জামা'আত জাতিকে এই অধোপাতের হাত থেকে রক্ষা করতে চাইলেন। তাঁরা যে-কোনো মূল্যে ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তায় তুর্কী সালতানাতের সেবায় নিয়োজিত রইলেন। পরাজয়, অধঃপতন ও তীব্র কশাঘাত সত্ত্বেও তাঁদের সঙ্কল্প থেকে তাঁরা এতোটুকু বিচ্যুত হলেন না।
এই জামা'আতের সবচেয়ে বড় স্তম্ভ ও অগ্রনায়ক ছিলেন আল-জিরীয় হাসান পাশা। তাঁর ওপর সুলতান আবদুল হামীদ ও তুর্কী জাতির পূর্ণ ভরসা ছিলো।
তুর্কী সুলতান হাসান পাশাকে অগাধ ক্ষমতা দান করেছিলেন। হাসান পাশা একদিকে স্থলবাহিনীর সিপাহসালার ও অন্যদিকে নৌ-বাহিনীর আমীরুল বহর।
তিনি স্থল ও নৌবাহিনীকে পুনর্গঠন করার সঙ্কল্প করেন। কিন্তু স্থলবাহিনীর ক্ষেত্রে কৃতকার্য হতে পারলেন না।
অজ্ঞতা ও কুসংস্কারবশত স্থলবাহিনী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও টেকনিক ব্যবহারে অসম্মত হলো। অবশ্য নৌ-বিভাগের সংস্কার সাধনে হাসান পাশার প্রচেষ্টা অনেকটা সফল হলো।
হাসান পাশা জনৈক ইংরেজ জাহাজ মিস্ত্রী দ্বারা নতুন ধরনের যুদ্ধ জাহাজ তৈয়ার করালেন। আলজিরিয়া, এ্যাড্রিয়াটিক সাগর ও বারবারী রাজ্যসমূহে যতো ভালো ভালো মাঝিমাল্লা, নাবিক ও জাহাজ মিস্ত্রী পাওয়া গেলো তিনি তাদের সবাইকে কনস্টান্টিনোপল ডেকে পাঠিয়ে নৌকার্যে নিয়োগ করলেন।
হাসান পাশা নিজেও একজন দক্ষ নাবিক ছিলেন। তিনি জাহাজ চালনা ও জাহাজ নির্মাণের গুরুত্ব ভালোভাবেই অবগত ছিলেন। তাই এই শিল্পের প্রতি তাঁর অন্তরের টান ছিলো দুনিবার। খালাসীর কাজ থেকে আরম্ভ করে কাপ্তানের কাজ পর্যন্ত তিনি স্বয়ং দেখাশোনা করতেন এবং তাদের কৃতকর্মের ভালো-মন্দ দেখিয়ে দিতেন। তিনি জাহাজের কাপ্তানদেরও জাহাজের প্রতি নজর রাখতে বাধ্য করতেন।
তিনি সর্বক্ষণ বিপুল সংখ্যক দক্ষ ও অভিজ্ঞ নাবিক কনস্টানটিনোপলে রিজার্ভ রাখতেন। এতোদিন নিয়ম ছিলো, শীতকালে জাহাজ-সমূহ বন্দরে নোঙ্গর করে নাবিকদের বিদায় করে দেয়া হতো। এই নিয়মের ত্রুটি নির্দেশ করে বললেন যে, দেশের রাজধানী এইভাবে অরক্ষিত রেখে দিলে রুশ নৌবহর কৃষ্ণসাগরের বন্দর থেকে বের হয়ে অতি সহজেই বসফোরাস দখল ও তুর্কী নৌবহরগুলোকে তার বন্দরে ধ্বংস করে দিতে পারে।
সুতরাং এই প্রস্তাব অনুসারে দওলত-ই-'উছমানিয়া বসফোরাস উপকূলে নৌছাউনির পত্তন করেন এবং নৌবাহিনীর সুবিধার্থে কতিপয় ব্যারাক নির্মাণ করেন। এইসব ব্যারাকে জাহাজের নাবিকরা শীতকালে স্বচ্ছন্দে অবস্থান করতেন।
তুর্কী আমীরুল বহরদের মধ্যে হাসান পাশা প্রথম ব্যক্তিত্ব, যিনি জাহাজের কর্মচারীদের শাস্ত্রীয় শিক্ষাদান মানসে একটি নৌ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন, তুর্কী ভাষায় নৌ-বিষয়ক গ্রন্থসমূহ তরজমা করান এবং তুর্কী তরুণদের মধ্যে নৌবিদ্যার উৎসাহ সৃষ্টি করেন।
তুর্কী সাম্রাজ্যের পতন আসন্ন। তাই যন্ত্রতন্ত্র বিদ্রোহ দানাবেঁধে উঠছিলো। প্রথম বিদ্রোহ করেন সিরিয়ার শায়খ তাহির নামক জনৈক গোত্রপতি। স্থল ও নৌ উভয় বাহিনীই ব্যবহৃত হয়। 'আক্কা বন্দর অবরোধ করে শায়খ তাহিরকে গ্রেফতার ও বন্দী করা হয়। এবং 'আক্কা বন্দর ও তার পুরো এলাকা কব্জা করে হাসান পাশা সেখানে একদল নৌ ও স্থলসেনা নিয়োগ করেন। অতঃপর সতেরোশ' সত্তর খৃস্টাব্দে তিনি মারীয়া বিদ্রোহ দমন করে সেখানে শান্তি স্থাপন করেন।
কিছুদিন পর মিসরে মামলুকদের বিদ্রোহ শুরু হয়। হাসান পাশা এই বিদ্রোহ দমনের জন্যেও স্থল ও নৌবাহিনী ব্যবহার করেন এবং অচিরেই কায়রো দখল করে বিদ্রোহের মূলোৎপাটন করেন।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন সম্রাজ্ঞী যারীনা ক্যাথারীন। এই মহিলা ভীষণ গোঁড়া ও তুর্কীবিদ্বেষী ছিলেন। তিনি তুর্কী জাতিকে ভূপৃষ্ঠ হতে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইলেন। তাই বড় বড় কূটকৌশল ও চক্রান্তজাল রচনা করলেন। তাঁর প্রথম লক্ষ্য ছিলো তুর্কীদের ইউরোপ থেকে বহিষ্কার করা। কনস্টান্টিনোপল থেকে পিটিয়ে তাড়িয়ে দেয়া। কনস্টানটিনোপলের সিংহাসনে বসানোর জন্য তিনি তাঁর পৌত্র যুবরাজ কনস্টানটাইনকে প্রস্তুত রাখলেন।
যারীনা ক্যাথারীন বিরাট প্রস্তুতির পর তুর্কীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। তুর্কী সুলতান আমীরুল বহর হাসান পাশাকে নৌ ও স্থল বাহিনীর কর্তৃত্ব প্রদান করে ক্যালবার্ন আক্রমণকল্পে উকাযাকোভ প্রেরণ করেন। ক্যালবার্ন নীটার নদীর মোহনায় উকাযাকোভের বিপরীত তীরে অবস্থিত। ক্যালবার্নে রুশ বাহিনীর প্রখ্যাত সিপাহ্-সালার সুভারভ শিবির ফেলে অবস্থান করছিলেন। সুভারভ সমকালের খ্যাতনামা জেনারেল ছিলেন। তিনি তুর্কী ফৌজের অধিকাংশকে বিনা বাধায় নদী পার হতে দিলেন।
অতঃপর এক ঝটিকা আক্রমণে তুর্কী বাহিনীর বৃহদংশের ক্ষতি-সাধন করেন। তুর্কী ও রুশ নৌবহরের মধ্যেও সংঘর্ষ হলো। তুর্কী বহরের ঘোরতর ক্ষতি হলো। হাসান পাশার অধিকাংশ নৌ-জাহাজ ধ্বংস ও বিনষ্ট হলো।
এরপর সতেরোশ' সাতাশি সাল পর্যন্ত দুই সরকারের মধ্যে কোনো লড়াই-বিবাদ বাধেনি।
তুরস্ক সতেরোশ' উনানব্বই খৃস্টাব্দে ইউসুফ পাশার নেতৃত্বে তরতযা নব্বই হাযার সৈন্য রাশিয়ার মুকাবিলায় চালনা করে। ইউসুফ পাশা একজন মস্ত অভিজ্ঞ তুর্কী সিপাহসালার ছিলেন। তিনি তাঁর সৈন্যের কিয়দংশ শত্রুর পশ্চাৎদেশে আক্রমণ পর্যবেক্ষণহেতু রেখে নব্বই হাযার আনকোরা সাহসী সৈন্যসহ দানিয়ুব নদী পার হয়ে ট্রানসিলভেনিয়ায় ঢুকে পড়েন। সেখান থেকে তিনি অস্ট্রিয়া আক্র- মণের উপক্রম করলেন। ইত্যবসরে সতেরোশ' উনানব্বই খৃস্টাব্দের সতেরোই এপ্রিল সুলতান প্রথম আবদুল হামীদ ইন্তিকাল করেন। ফলে ইউসুফ পাশাকে ফেরত ডেকে পাঠানো হয়। তিনি এই অভিযান অসমাপ্ত রেখে সসৈন্যে কনস্টানটিনোপল পৌছেন।
প্রথম আবদুল হামীদের পর শাহযাদা তৃতীয় সালীম তখন'শীন হন। তিনি তুর্কী সালতানাতকে সুবিন্যস্ত করে স্থল ও নৌবাহিনীকেও শক্তিশালী করার সঙ্কল্প করেন। কিন্তু শত্রুরা তাঁকে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার অবসর দেয়নি।
এই সময় যারীনা ক্যাথারীনের ইঙ্গিতে অস্ট্রিয়া তুর্কীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো। সুলতান সালীম তাঁর পুরাতন বিদগ্ধ আমীরুল বহর ও সিপাহসালার হাসান পাশাকে প্রধান সেনাপতি করে পাঠান। হাসান পাশা এক বিরাট বাহিনীসহ অস্ট্রিয়ার সিপাহসালার শাহযাদা কোবরগের মুকাবিলায় অগ্রসর হলেন। কোবরগ মলডেভিয়ার সীমান্তে ফকশানী নামক স্থানে শিবির পেতে বিশ্রাম করছিলেন। যদি রাশিয়ার রণদক্ষ সিপাহসালার সুভারভ কোবরগের সাহায্যে এগিয়ে না আসতেন, তাহলে কোবরগের পরাজয় অবধারিত ছিলো।
রাশিয়ার প্রবীণ সিপাহসালার সুভারত মাত্র ছত্রিশ ঘন্টার ব্যবধানে ষাট মাইল দুর্গম পাহাড়ী পথ অতিক্রম করে যথাসময়ে সাহায্যার্থ পৌঁছে গেলেন।
সুভারত তুর্কীদের হামলার অপেক্ষা না করে স্বয়ং তুর্কী বাহিনীর ওপর হামলা পরিচালনা করলেন। সুভারতের হামলা ফলবতী হলো। যুদ্ধক্ষেত্রে তুর্কীরা পরাভূত হলেন। শত্রুপক্ষ তুর্কীদের সমুদয় যুদ্ধোপ- করণ করায়ত্ত করলো।
এই ব্যর্থতার পর সুলতান তৃতীয় সালীম নতুন নতুন সেনাদল পাঠালেন। সতেরোশ' উনানব্বই খৃস্টাব্দের ৬ই সেপ্টেম্বর রম্নগ্ নদীর সন্নিকটে জেনারেল সুভারভের সৈন্যরা এই নতুন সৈন্যদেরও পরাজিত করেন।
এই উপর্যুপরি পরাজয়ের দরুন কনস্টানটিনোপলের জনগণ তুমুল হট্টগোল আরম্ভ করেন। তারা এই পরাজয়ের সমস্ত দায়-দায়িত্ব সেনাপতি হাসান পাশার স্কন্ধে চাপালেন। তারা সুলতান সকাশে হাসান পাশার শান্তিও দাবী করলেন।
যে হাসান পাশা দওলত-ই-'উছমানিয়ার শুশ্রুষা করতে করতে বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, যিনি 'উছমানীয় সাম্রাজ্যকে অধঃপাতের হাত থেকে রক্ষা করার প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন, তাঁর শত্রুরা তাঁকে কারারুদ্ধ করালো।
আত্মমর্যাদাশীল বীর আমীরুল বহর কারাগারেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আর স্বীয় উজ্জ্বল কর্মকাণ্ড অনাগত মুসলিম তরুণদের জন্যে রেখে যান।
তোমাদের কর্তব্য হচ্ছে, এই বীর বাহাদুর সেনাপতির আদর্শে স্বীয় জীবনযাত্রা নির্বাহ করা। ইসলামের কৃতী সন্তানরূপে নিজেদের গড়ে তোলা। যে জাতির নতুন বংশধররা কোনো মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে অগ্রসর হয়, কেবল তাদেরই সম্মানজনক জীবন যাপনের অধিকার আছে। তারাই পারে দুনিয়ায় সসম্মানে জীবন ধারণ করতে।
তোমরাও তোমাদের জীবনের লক্ষ্য স্থির করো। স্বীয় পূর্বপুরুষদের কীর্তিধন্য জীবন থেকে ফায়দা হাসিল করো। আল্লাহ, তোমাদের সাহায্য করবেন। কিন্তু স্মরণ রেখো, আল্লাহ্ তাদেরই সাহায্য করেন, যারা নিজেদের সাহায্য করে।