📄 ’আমীরুল বহর মুরাদ-ই-আ’জম
মুরাদ-ই-আ'জম আলজিরিয়ার শেষ আমীরুল বহরদের মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ, অভীক ও অটলপ্রতিজ্ঞ ছিলেন। তাঁর শিরা-উপশিরায় ইউরোপীয় শোণিতধারা প্রবাহিত ছিলো। তিনি আলবানিয়ার এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
শৈশবেই তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। আলজিরিয়ার গভর্নর মুস্তফা পাশার গৃহে প্রতিপালিত হন। বারো বছর বয়সেই তিনি তাঁর প্রতিপালক ও মুরব্বীর কাছে স্বীয় বীরত্বের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন।
মাল্টার নৌ-অবরোধকালে তিনি মুস্তাফা পাশার অনেক কাজে লেগেছিলেন। যুদ্ধচলাকালে সমুদ্রময় গোয়েন্দাবৃত্তি চালিয়েছিলেন। তাঁর ছোট্ট নৌকাটি প্রস্তরে ধাক্কা খেয়ে ভেঙ্গে গিয়েছিলো। কিন্তু নিজের এই অযোগ্যতা ও অনভিজ্ঞতার কথা তিনি তাঁর মুরব্বীকে জানতে দিলেন না।
তিনি তৎক্ষণাৎ চুপিসারে আলজিরিয়ায় গিয়ে পৌঁছেন এবং আরেকটি তরণী সংগ্রহ করে শিকারের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। অনভিজ্ঞ ও নব্য শিক্ষিত বারবার নৌসেনারা স্পেন উপকূলকে প্রশিক্ষণকেন্দ্র বানিয়েছিলেন। কতকটা এ কারণে যে, এ স্থানটি ছিলো আলজিরীয় উপকূল সংলগ্ন। আর কতকটা এ জন্যে যে, মাল্টাবাসীদের ন্যায় স্পেনবাসীরাও সর্বদা বারবারদের পিছে লেগে থাকতো।
যা হোক, মুরাদ-ই-আ'জম তাঁর এই ছোট্ট তরণী দ্বারা প্রায় দেড়শ' লোক গ্রেফতার করেন। অনুরূপ 'উল্জ্জী পাশা যখন ক্রু শেডনায়ক সেন্ট ক্রেমেন্টকে আক্রমণ করে তাঁর জাহাজ পাকড়াও করেছিলেন, তখন মুরাদও তাঁর সহকর্মী ছিলেন।
একবার পনেরোশ' আটাত্তর খৃস্টাব্দে মুরাদ-ই-আ'জম আটটি শিকারী নৌকাসহ কালবিরিয়ার সন্নিকটে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছিলেন।
হঠাৎ দূর আকাশের নীলাভ কোণে সিসিলীর জাতীয় পতাকা ভেসে উঠলো। কাছে আসতেই প্রতীয়মান হলো, পতাকাধারী একটি আরোহী। জাহাজযোগে নওয়াব টেরা নেভাদা তাঁর সঙ্গী সহচর সমভিব্যাহারে পোপের দরবার যিয়ারত করতে যাচ্ছিলেন। বারবারী কিন্তী দেখা মাত্রই সিসিলীর নিশানবাহক হতবুদ্ধি হয়ে পিঠটান দিলো। কিন্তু মুরাদ-ই-আ'জম ত্বরিতবেগে অগ্রসর হয়ে জাহাজটিকে পিছন দিক থেকে ঘিরে ফেললেন। নওয়াব টেরা নেভাদা সম্মুখভাগ দিয়ে পালায়ন করলেন।
বারবারদের কোনো কাপ্তান তখন পর্যন্ত সমুদ্র অভ্যন্তরে সফর করেছিলেন না। বরং সচরাচর তীরভূমির কাছাকাছি থাকতেন। কিন্তু মুরাদ-ই-আ'জম একবার কৃষ্ণসাগরের এতো দূর অভ্যন্তরে চলে যান যে, তীর ভূমি দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেলো। পথিমধ্যে পশ্চিম আফ্রিকীয় কেষী দ্বীপপুঞ্জের লিন্যারোট দ্বীপ আক্রমণ করে শহর ও গবর্নরের মহল লুট করে নিয়ে আসেন।
অনুরূপভাবে পনেরোশ' উনানব্বই খৃস্টাব্দে একবার মাল্টার নিকটে চক্কর দেওয়ার সময় তিনি কোনো এক ইউরোপীয় গোত্রের দু'তিনটি সওদাগরী জাহাজ পাকড়াও করে আলজিরিয়া নিয়ে আসেন। ওদিকে মাল্টার নৌদস্যুরা দু'টি তুর্কী জাহাজ ছিনতাই করে মাল্টার দিকে নিয়ে আসছিলো, পথে তাদের সাথেও মুকাবিলা হয়।
সেকালে ক্রুশেড পতাকা ছিলো নাবিকদের জন্য মৃত্যু পরওয়ানা-স্বরূপ। কিন্তু মুরাদ-ই-আ'জম ভয়ে পালিয়ে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। তিনি নির্ভয়ে শত্রুর জাহাজের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। যেমনিভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঈগল তার শিকারের ওপর। শত্রু জাহাজ কর্যা করে এইটু সামনে এগোতেই মেজরকা দ্বীপের ডাকু নৌশ্রেণীর সম্মুখীন হন। তিনি সেগুলোও বগলদাবা করে বিজয়ীবেশে আলজিরীয় বন্দরে প্রবেশ করেন।
মুরাদ-ই-আ'জমের এই রাজকীয় বিজয়ের দরুন আনন্দোৎসব পালিত হয়। আলজিরিয়া আলোকসজ্জিত হয়। আলজিরীয়াবাসিগণ মুরাদকে আ'জম (মহান) খিতাব দিয়ে আমীরুল বহর নিযুক্ত করেন।
আমীরুল বহর হওয়ার পর মুরাদ-ই-আ'জম জাহাজ চালনায় চরম উৎকর্ষ সাধন করেন।
পনেরোশ' চুরানব্বই খৃস্টাব্দে মুরাদ-ই-আ'জম চারটি হালকা তরণীসদৃশ জাহাজসহ সমুদ্র ভ্রমণে বের হন। পথে তিনি কতিপয় ইউরোপীয় দস্যু জাহাজ দেখতে পান। তিনি সহসা তাঁর জাহাজের মাস্তল নামিয়ে আলাদা করে ফেলেন। দস্যু জাহাজগুলো ভাবলো ওগুলো সওদাগরী জাহাজ। তারা সহর্ষে সেদিকে ধাবিত হলো।
দস্যু জাহাজ বেশী নিকটবর্তী না হতেই মুরাদ-ই-আ'জম সহসা সেগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং মুসলমান গোলাম ও খালাসীদের মুক্ত করে খৃস্টান কাপ্তান ও কর্মকর্তাদের বন্দী করেন।
মুরাদ-ই-আজ'ম ভূমধ্যসাগরে তুর্কী নৌ-বহরকে সংগঠিত ও সমৃদ্ধ করেন। তিনি খৃস্টীয় নৌবাহিনীর সাথে বেশ কয়েকবার সংঘর্ষে লিপ্ত ও কৃতকার্য হন।
মুরাদ তিরাশি বছর বয়ক্রমে ইহলোক ত্যাগ করেন। তিনি এক আদর্শ জীবনের অধিকারী ছিলেন। মুসলিম তরুণদের জন্যে তাতে অনেককিছু শেখার আছে।
একটি বারো বছরের খৃস্টান বালক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নৌসেনায় পরিণত হলো। আলজিরিয়ার গবর্নর তাকে পালকপুত্ররূপে বরণ করলেন। খৃস্টানদের বিরুদ্ধে তাকে গোয়েন্দাকাষে নিয়োগ করলেন।
এই বীর, তেজস্বী ও নির্ভীক নওজওয়ান যে বিক্রমের সাথে স্বীয় দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন, তার দৃষ্টান্ত শুধু ইসলামী ইতিহাসই নয়, বিশ্ব-ইতিহাসেও খুঁজে পাওয়া ভার।
এ ছিলো ইসলামের বরকত ও আশীর্বাদ। সে বহু অজ্ঞাত-অখ্যাত লোককেও স্বীয় পক্ষপুটে আশ্রয় দিয়ে পতিপালন করেছে। উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। এটা ইসলামের মহত্ত্ব। ইসলামেরই ঔদার্ঘ। তোমরাও মুসলমান। তোমরাও ইসলামের ছত্রছায়ায় লালিত। বর্দ্ধিত। তোমরাও চেষ্টা করো। পরিশ্রম করো। তাহলে তোমরাও মুরাদ-ই-আ'জমের মতো আমীরুল বহর হতে পারবে। পরিশ্রমীদের আল্লাহও সাহায্য করেন।
📄 ’আমীরুল বহর সাইয়্যিদী আলী রইস
সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সাইয়িদী আলী রঈস নামক এক প্রখ্যাত আমীরুল বহর আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি নৌযুদ্ধ ও জাহাজ পরিচালনায় খায়রুদ্দীন পাশা বারবারোসার সমকক্ষ এবং ইউরোপীয় এক বিখ্যাত খৃস্টান পরিবারের নও মুসলিম কাপ্তানের পুত্র ছিলেন।
আলী রঈস নৌযুদ্ধ ও জাহাজ চালনার ট্রেনিং লাভ করেছিলেন তাঁর পিতার কাছে। অতঃপর ক্রমান্বয়ে উন্নতি লাভ করে ষোলটি জাহাজের এক নৌবহরসহ দওলত-ই-উছমানিয়ার নৌ-বিভাগে চাকরি নেন। সুলতান তাঁকে তাঁর সুখ্যাতি ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমীরুল বহর নিযুক্ত করেন। এরপরই তাঁর কীতিকাণ্ডের স্বর্ণদ্বার খুলে যায়।
ষোলশ' আটত্রিশ খৃস্টাব্দে আলী রঈস তুর্কী নৌবহর দ্বারা ইটালীর পূর্ব উপকূল আক্রমণ করে আপুলিয়া প্রদেশের নকোত্রা লুট করেন।
এখানকার বিজয় পর্ব সম্পন্ন করে তিনি এ্যাড্রিয়াটিক সাগরে প্রবেশ করেন এবং কেট্রো উপসাগরের সন্নিকটে এক স্পেনীয় নৌবহরে হামলা করে সেগুলো দখল করেন। ভেনিসে যখন আলী রঈসের এই সামুদ্রিক ক্রিয়াকাণ্ডের খবর পৌঁছলো তখন ভেনিস সরকার আলী রঈসকে দমনকল্পে সেনাপতি ক্যাপেলুর নেতৃত্বে এক বিরাট নৌবহর প্রেরণ করলেন।
ভেনিসীয় নৌবহর আলী রঈসের ওপর হামলা করলো। আলী রঈস আত্মরক্ষাকল্পে আলবানিয়ার ভিলোনা নামক তুর্কী দুর্গে আশ্রয় নিলেন। সেনাপতি ক্যাপেলু প্রচণ্ড আঘাত হেনে তুর্কী জাহাজগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করলেন।
এর প্রতিশোধ মানসে কনস্টান্টিনোপল থেকে এক শক্তিশালী তুর্কী নৌবহর এসে সেনাপতি ক্যাপেলুকে চরমভাবে পর্যুদস্ত করলো।
এই নৌযুদ্ধে আলী রঈসের নৌবহরের এক বিরাট অংশ নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই দওলত-ই-'উছমানিয়া তাঁর জন্যে একটি নতুন নৌবহর তৈয়ার করলেন। এই নৌবহরে নতুন-পুরান মিলে মোট পঁয়ষট্রিটি জাহাজ ও ত্রিশ হাযার নৌসেনা ছিলো।
এই নৌবহরের বদৌলতে তিনি বিরাট খ্যাতি অর্জন করেন। ভূমধ্যসাগরে ইউরোপীয় মীরবহররা আলী রঈসের নামে সন্ত্রস্ত্র ছিলো। দক্ষিণ ইউরোপে তো তিনি তুর্কীদের নৌএকাধিপত্যই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
আলী রঈস তাঁর নৌসেনাদের কল্যাণ ও উন্নতি বিধানে সবিশেষ যত্নবান ছিলেন। তিনি ভূমধ্যসাগরের সকল নৌবন্দর সংলগ্ন স্বাস্থ্যকর স্থানসমূহে নৌসেনাদের চিত্তবিনোদনহেতু অনেক বালাখানা নির্মাণ করেছিলেন। এইসব বালাখানার চতুর্দিকে সেব গাছ লাগানো হতো। সেব গাছের সবুজ ডালপালা বালাখানার জানালা পর্যন্ত এসে পৌঁছতো।
আমীরুল বহর আলী রঈস ছিলেন একজন পূর্ণ আদর্শ নৌসেনানী। তিনি তাঁর নৌসেনা ও খালাসীদের সাথে অত্যন্ত প্রীতিপূর্ণ ও নম্র ব্যবহার করতেন। অধীনদেরকে সর্বদা 'হযরত' বলে সম্বোধন করতেন। তাদের দুঃখ-কষ্টকে নিজের দুঃখ-কষ্ট বলে মনে করতেন।
তাঁর কথা ও কাজে কখনো অমিল হতো না। তিনি নিজেও বলতেন-"আমার কথাই আমার কাজ।" বন্দীদের সাথে নিহায়েত কোমল ও সদয় ব্যবহার করতেন।
এই অকুতোভয় বাহাদুর ও অমিতপরাক্রম সিপাহসালার ছাপান্ন বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। তিনি তাঁর কর্মকাণ্ড দ্বারা উত্তর-সূরিদের এমনভাবে পথ-প্রদর্শন করে গেছেন, যেমনিভাবে মহাসমুদ্রে অন্ধকার রাতে পথভ্রষ্ট জাহাজসমূহকে আলোকস্তম্ভ পথ-প্রদর্শন করে থাকে।
তোমাদের কর্তব্য হচ্ছে, এই বীর আমীরুল বহরকে স্বীয় চলার পথের আলোকবর্তিকা রূপে গ্রহণ করা এবং সমুদ্রের তরঙ্গময় জীবনের সাথে খেলা করতে শেখা। স্থল ও নৌশক্তিতে পারদর্শিতা লাভের মধ্যেই জাতির গৌরবময় জীবন নিহিত। তোমরাও পারদর্শী হও।
📄 ’আমীরুল বহর পিয়ালে পাশা
পিয়ালে পাশা প্রথম দিকে একজন সাধারণ নৌসেনা ছিলেন। সুলায়মান-ই-আ'জম তাঁকে নৌ-বিভাগে কাপ্তান পদে উন্নীত করেন। অতঃপর ক্রমান্বয়ে তিনি আমীরুল বহর পদে অধিষ্ঠিত হন।
দু'শ' খৃস্টান জাহাজের এক বিশাল নৌবহর ত্রিপোলী বন্দর তুর্কীদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে সেনাপতি ডোরীয়ার নেতৃত্বে রওয়ানা হলো।
পিয়ালে পাশা তার মুকাবিলাহেতু দাররাই-দানিয়াল থেকে বেরিয়ে আসেন এবং তুরস্কের জেরবা দ্বীপ সমীপে অবস্থান গ্রহণ করেন। এখানে খৃস্টান সম্প্রদায় তাদের সৈন্যদল নামিয়েছিলেন এবং একটি দুর্গও নির্মাণ করেছিলেন। পনেরোশ' ষাট খৃস্টাব্দের চৌদ্দই মে পিয়ালে পাশা ডোরীয়ার নৌবহরে জোরদার আক্রমণ করে চরমভাবে পর্যুদস্ত করেন।
খৃস্টান পক্ষের প্রায় পঞ্চাশটি জাহাজ ধ্বংস ও সাতটি ধৃত হলো। যেসব সৈন্য দুর্গে আশ্রয় নিয়েছিলো, পিয়ালে পাশা তাদেরও গ্রেফতার করলেন। জেরবায় তুর্কী পতাকা পুনরুত্থিত হলো।
এই বিজয়ের পর পশ্চিম আলজিরিয়ায় অবস্থিত উরন প্রদেশে হামলা চালিয়ে তাকেও 'উছমানীয় সম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হলো।
পনেরোশ' পঁয়ষাট্ট খৃস্টাব্দে যখন তুর্কী নৌবাহিনী মাল্টা আক্রমণ করেন, তখন তার কর্তৃত্বও ছিলো পিয়ালে পাশার করপুটে। অর্থাৎ পিয়ালে পাশাই ছিলেন তখন তুর্কী নৌবহরের আমীরুল বহর।
খৃস্টীয় পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে স্পেনের পর যে দেশটি মুসল-মানদের বেশী ক্ষতি করেছে, তা ছিলো পূর্তগাল। স্পেনে যখন ইসলামী হুকুমত কায়েম হয়েছিলো তখন পূর্তগালও তার আওতাধীন ছিলো। কিন্তু এই ভূখণ্ডে যখন মুসলমানদের ভাগ্যরবি অস্তমিত হয় এবং
স্পেনের খৃস্টান সরকার মুসলিম নিধনযজ্ঞে মেতে ওঠে, তখন পূর্তগাল মুসলমানদের নিকট থেকে তার মনের বাসনা চরিতার্থ করলো।
অর্থাৎ-হিন্দুস্থান, চীন, জাভা, সুমাত্রা, ভারত দ্বীপপুঞ্জ, সিংহল, মালাবার, মম্বাসা, যাঞ্জিবার, ইথিওপিয়া, মিসর ও আরব প্রভৃতি অঞ্চলের সমুদয় ব্যবসা-বাণিজ্য আরব বণিকদের অধিকারে ছিলো। এক্ষণে সুযোগ বুঝে পূর্তগীযরা আরব বণিকদের হাত থেকে এই নৌপথগুলো কেড়ে নিলো।
আরব বণিকগণ প্রাচ্য দেশের পণ্যদ্রব্য জাহাজাযোগে মিসরে নিয়ে যেতো এবং সেখান থেকে ইউরোপীয় বাণিজ্য জাহাজ এইসব মালামাল ভেনিস ও জেনোয়ায় পৌছে দিতো। অপরদিকে ইউরোপীয় পণ্যদ্রব্য বহন করে আরব বণিকরা চীন দেশে পৌঁছে দিতো। এই নৌ-বাণিজ্যে مسلمانوں অনেক অর্থাগম হতো। কিন্তু ভাস্কোডা গামার ভারত আবিষ্কারের পর পূর্তগীষরা মুসলমানদের হাত থেকে এই সুবিধা চিরতরে ছিনিয়ে নেয়ার সঙ্কল্প করলো।
সুতরাং এই লক্ষ্যে পূর্তগীযরা আচানক মুসলিম নৌবহরে হামলা শুরু করলো। এমনকি ভারত ও ইরানেও আক্রমণ করলো। শুধু তাই নয়, তারা অমুসলিমদেরকে তাদের পণ্যদ্রব্য মুসলমানদের নিকট বিক্রয় না করতেও বাধ্য করলো।
মালাবারের মোল্লা বণিকদের ওপর ঘোর নির্যাতন চালালো। য়ামন ও হিজাযের উপকূলীয় শহরগুলো কষাই করলো। ভারতীয় নদী বন্দরগুলোর ওপর-অর্থাৎ সিন্ধু থেকে আরম্ভ করে মাদ্রাজ পর্যন্ত উপকূলীয় মুসলমানদের ওপর চড়াও হলো।
ভারতীয় উপকূল ও দ্বীপপুঞ্জে মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালালো। মসজিদসমূহ ভেঙ্গে গির্জায় রূপান্তরিত করলো। কালিকটের অসাম্প্রদায়িক রাজাকে তাঁর এলাকায় মুসলমানদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে বাধ্য করা হলো। কোচীনের তীরভূমি দখল করে মুসলমানদের কতল করলো।
এরপর পূর্তগীযরা আরব উপকূলবর্তী এডেন ও হরমুষ আক্রমণ করলো। কালিকট শহর লুন্ঠন করে স্থানীয় জামে মসজিদ জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করলো। আরব উপকূলীয় অঞ্চলসমূহে লুটতরাম অব্যাহত রাখলো। হজ্জযাত্রীরাও এই দৌরাত্ম্য থেকে রেহাই পেলো না।
গোয়ার বিখ্যাত নৌবন্দর বিজাপুর সুলতানের হাত থেকে ছিনিয়ে নিলো। গুজরাটরাজের বন্দরসমূহে লুটপাট শুরু করলো। পূর্তগীযরা জেদ্দা দখল করে হিজায আক্রমণের স্বপ্ন দেখছিলো। এমনকি মক্কা মুকাররামা ও মদীনা মুনাওয়ারা আক্রমণ করে (তওবা তওবা) এ দুটি শহরকেও ধ্বংস করতে চাচ্ছিলো।
এই অবস্থার প্রতিকারকল্পে মুসলিম মিল্লাতের অধিপতি হিসেবে সুলায়মান-ই-আ'জম এগিয়ে এলেন এবং পূর্তগীযদের এহেন অত্যাচার থেকে মুসলমানদের উদ্ধার মানসে কতিপয় নৌবহর প্রেরণ করেন। মহান পিয়ালে পাশা ও সুলায়মান পাশা ছিলেন এইসব নৌ-বহরের আমীরুল বহর।
তুর্কী নৌবহর এডেন অবরোধ করলো। পূর্তগীঘরা এডেনে শিকড় গেড়েছিলো। তাই এ যাত্রা তুর্কীদের পরাজয় ঘটলো। তবু তারা অতি বীরত্বের সাথে অবিচল রইল। ভারত সাগরে পূর্তগীষদের ঠেলতে ঠেলতে গুজরাট উপকূল পর্যন্ত পৌঁছে গেলো। এখানে তুর্কী ও পূর্তগীষ নৌবহরে কয়েক দফা লড়াই হলো।
এদিকে তুর্কী নৌবহরের সাহায্যার্থে এক বিরাট নৌবহর মিসর অধিনায়ক সুলায়মান পাশার নেতৃত্বে সুয়েযখাল থেকে রওয়ানা হলো এবং এডেন করা করে গুজরাটে পৌঁছলো। মালদ্বীপ পৌছে পাশা গুজরাটীদের সহযোগে পূর্তগীষদের আক্রমণ করলেন।
সুলায়মান পাশা মালদ্বীপ অবরোধ করলেন। তিনি যদি দুঢ়চিত্তে এই অবরোধ অব্যাহত রাখতে পারতেন, তবে নির্ঘাত পূর্তগীষদের হাত থেকে বন্দরটি রক্ষা পেতো। কিন্তু ইত্যবসরে কোন এক ব্যাপারে গুজরাট নেতাদের সাথে সুলায়মান পাশার মতান্তর ঘটলে তাঁরা তুর্কী বাহিনীকে রসদ প্রেরণ বন্ধ করে দেন। ফলে একদিন তৃর্কী নৌবাহিনী নোঙ্গর তুলে চলে গেলেন এবং মালদ্বীপ পূর্বের মতোই পূর্তগীযদের দখলে রইলো।
সুলায়মান-ই-আ'জম এই সংবাদ শ্রবণ করে যারপরনাই ক্ষুব্ধ হন। তিনি আমীরুল বহর সুলায়মান পাশাকে দরবারে ডেকে তীব্র ভর্ৎসনা করে বলেন : “আমি তোমাকে মালদ্বীপ থেকে পূর্তগীষদের উৎখাতকল্পে গুজরাটরাজের সাহায্যার্থে পাঠিয়েছিলাম—হিন্দুস্তানী মুসলমানদের ওপর শাসনকর্তা করে পাঠাইনি!”
পিয়ালে পাশাও এই ব্যপদেশে পূর্তগীষদের সাথে কয়েক দফা নৌযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। কখনো কৃতকার্য হয়েছেন, আবার কখনো ব্যর্থকাম। সুলায়মান পাশার ভ্রান্তির পর সুলায়মান-ই-আ'জম তাঁর সমস্ত আমীরুল বহর রদবদল করেন। এবার পীরী রঈস নতুন আমীরুল বহর নিযুক্ত হন। তিনি পূর্তগীষদের চূড়ান্তরূপে পর্যুদস্ত করেন।
পিয়ালে পাশার প্রাথমিক জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, তিনি ছিলেন নিতান্ত একজন সাধারণ নৌসৈন্য। অতঃপর তিনি কাপ্তানে উন্নীত হন। কাপ্তানের পর ক্রমে ক্রমে আমীরুল বহরের পদ অলঙ্কত করেন।
তোমরাও নও জওয়ান। তোমাদের মধ্যেও পিয়ালে পাশার মতো সাফল্য ও উন্নতির উপাদান বিদ্যমান। কিন্তু সাফল্যকে রূপদান করতে প্রয়োজন অনলস প্রচেষ্টা ও অদম্য উৎসাহ-উদ্যম।
📄 ’আমীরুল বহর পীরী রইস
তুর্কী নৌবহরকে ভারত মহাসাগরে পরাস্ত করার পর পর্তুগীজদের শক্তি-সাহস এতোই বেড়ে যায় যে, তারা দ্বিতীয়বার এডেন বন্দরটি দখল করে নিলো এবং হিজাযের বন্দর নগরী জেদ্দার ওপরও ক্রুদ্ধ ছোবল হানার তোড়জোড় শুরু করলো।
জেদ্দা কর্যা করার পর مسلمانوں প্রতি প্রতিহিংসাবশতঃ তারা খানা কা'বা বিধ্বংস এবং রসূলুল্লাহ (স.)-এর রওযা মুবারক বিনষ্ট করার (তওবা তওবা) ফন্দি আঁটছিলো। এই অভিসন্ধি প্রতিরোধ-কল্পে পূর্তগীযদের সাথে লড়াই করার লক্ষ্যে সুলায়মান-ই-আ'জম পীরী রঈসকে এক বিরাট শক্তিশালী তুর্কী নৗবহরসহ ভারত মহাসাগরে প্রেরণ করেন। আমীরুল বহর পীরী রঈস পর্তুগীজদের ওপর হামলা করে এডেন বন্দর পুনরুদ্ধার করেন এবং এডেন বন্দরের নিরাপত্তাহেতু এক বিরাট নৌবহর মোতায়েন করেন।
এডেন মুক্ত করার পর তিনি আরব উপকূল ঘেঁষে এগোতে এগোতে মাস্কাত বন্দরে পৌঁছেন। মাস্কাতে পর্তুগীজ নৌবাহিনী নিলিপ্ত হয়ে পড়েছিলো। পীরী রঈস তাদেরও পাকড়াও করলেন। অতঃপর তিনি মাস্কাত থেকে অগ্রসর হয়ে পারস্যোপসাগর উপকূলে পর্তুগীজদের পর্যুদস্ত করে হরমুষ পৌঁছেন। এখানে পর্তুগীজদের সাহায্যার্থ কিছু নতুন সৈন্য এসে যোগ দিলো। ফলে পীরী রঈস পরাস্ত হলেন। পীরী রঈস মাত্র দুটি নৌ-জাহাজ শত্রুর কবল থেকে রক্ষা করতে পারলেন। বাকী সব গ্রেফতার হলো।
পীরী রঈস নিছক একজন আমীরুল বহরই ছিলেন না, একজন যবরদস্ত ভূগোলবিদও ছিলেন। তিনি ভূগোলবিদ হিসেবে ঠিক ততখানিই সুবিখ্যাত ছিলেন, যতখানি সুবিখ্যাত একজন আমীরুল বহর হিসেবে। তিনি ঈজীয়ান সাগর ও ভূমধ্যসাগর সম্বন্ধে দু'খানি গ্রন্থ রচনা করেন। তাতে তাঁর ব্যক্তিগত তত্ত্বজ্ঞানের ভিত্তিতে ঐ দু'টি সাগরের স্রোতধারা, আশপাশের পরিবেশ, নৌবন্দর ও তীরে ওঠার উপযুক্ত স্থানসমূহের বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন।
আমীরুল বহর পীরী রঈস তাঁর অধিকাংশ নৌ-অভিযানই ভূমধ্য-সাগর ও ঈজীয়ান সাগরে চালিয়েছিলেন।
পীরী রঈসের পরাজয়ের খবর শুনে সুলায়মান-ই-আ'জম আমীরুল বহর মুরাদ-ই-আ'জমকে প্রেরণ করেছিলেন। যাঁর পরিচয় তোমরা পূর্বেই পড়ে এসেছো।
মুরাদ-ই-আ'জম তুর্কী নৌবহর উদ্ধারকল্পে হরমুষ উপসাগরের সামনে পর্তুগীজদের মুকাবিলা করেন। কিন্তু কৃতকার্য হতে পারেন নি।
পীরী রঈস একযুগ পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে আমীরুল বহর ছিলেন এবং পরিশেষে সত্তর বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। তিনি তাঁর পশ্চাতে গৌরবজনক নৌসৈনাপত্য ও ভৌগোলিক ক্রিয়াকাণ্ড রেখে গেছেন।