📘 সোনালী যুগের মুসলিম নৌশক্তি > 📄 ’আমীরুল বহর তুরগুত পাশা

📄 ’আমীরুল বহর তুরগুত পাশা


খায়রুদ্দীন পাশা বারবারোসা ব্যতীত সুলায়মান-ই-আ'জমের আরো দু'জন খ্যাতনামা আমীরুল বহরের খিদমত লাভের সৌভাগ্য হয়েছিলো। তাঁদের অসাধারণ বীরত্ব ও নৈপুণ্যের দাপটে ভূমধ্যসাগর ও তার উপকূলাঞ্চলসমূহ প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিলো।
একজনের নাম তুরগুত পাশা ও অপরজন পিয়ালে পাশা। তুরগুত পাশা বাল্যকাল থেকেই সমুদ্রপ্রিয় ছিলেন। তাই শুরুতেই তিনি এক নৌবহর গঠন করেন। একবার তিনি ত্রিশটি জাহাজের এক নৌবহর দ্বারা রোমান করসিকা দ্বীপে হামলা চালান। কিন্তু খৃস্টান আমীরুল বহর এনড্রিয়া ডোরীয়া তুরগুত পাশাকে গ্রেফতার করে তাঁর সমুদয় নৌ-জাহাজ ও মাঝিমাল্লাকে আটকে রাখেন।
কয়েক মাস যাবত তুরগুত পাশা এনড্রিয়া ডোরীয়ার কারাগারে বন্দী রইলেন। ইত্যবসরে খায়রুদ্দীন পাশা বারবারোসা এনড্রিয়া ডোরীয়াকে হুমকি দেন যে, "অবিলম্বে তুরগুত পাশাকে তাঁর মাঝি-মাল্লা ও জাহাজসুদ্ধ ছেড়ে না দিলে আমি জেনোয়াকে ধূলিসাৎ করে দেবো।"
ডোরীয়া তুরগুত পাশাকে তাঁর মাঝিমাল্লা ও জাহাজসহ মুক্ত করে দেন। বস্তুত তুরগুত পাশা ছিলেন রণকুশলী ও বাহাদুর হিসেবে খায়রুদ্দীন পাশার সমকক্ষ।
দওলত-ই-'উছমানিয়া তুরগুত পাশাকে আমীরুল বহর মনোনীত করেন। তিনি প্রবল নৌ-হামলা দ্বারা ইটালী ও স্পেনের উপকূলভাগ পদানত করেন। ইটালীয় ও স্পেনীয় নৌ-বহরগুলো তুরগুত পাশার নাম শুনে কাঁপতো।
তুরগুত পাশা এতো ক্ষিপ্র ও কার্যকরভাবে নৌ-হামলা চালাতেন যে, শত্রু বাহিনী নিজদের সামাল দেয়ারও সুযোগ পেতো না। কোনো কোনো সময় তিনি 'উছমানীয় মিত্রদের ওপরও হামলা করে বসতেন।
একবার তিনি ভেনিসের কয়েকটি জাহাজ গ্রেফতার করে আনেন। সুলায়মান-ই-আ'জম তার কৈফিয়ত তলব করে তাঁকে কনস্টানটিনোপল ডেকে পাঠান। কিন্তু তুরগুত পাশা কনস্টানটিনোপল না এসে স্বীয় নৌ-বহরসহ মরক্কো চলে যান এবং মরক্কো সুলতানের চাকরি গ্রহণ করেন।
তিনি মরক্কোর নৌবাহিনী সংগঠিত করে তাকে সমৃদ্ধির উচ্চ-শিখরে পৌঁছে দেন।
খায়রুদ্দীন পাশার ইন্তিকালের পর দওলত-ই-'উছমানিয়া তুরগুত পাশার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে উপলব্ধি করেন। তাই সুলায়মান-ই-আ'জম তুরগুত পাশাকে ক্ষমা করে দিয়ে পরম সমাদরে কনস্টানটিনোপল নিয়ে আসেন এবং আমীরুল বহর পদে অধিষ্ঠিত করেন।
এরপর তুরগুত পাশা ত্রিপোলী আক্রমণ করেন। ত্রিপোলী তখন ক্রুশেডারদের করতলগত। ক্রুশেডারদের কেন্দ্রভূমি মাল্টা। মাল্টায় তাদের যবরদস্ত নৌশক্তি। তুরগুত পাশা সেটি জয় করে 'উছমানীয় শাসনে আনেন। এরপর তিনি ত্রিপোলীর শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তিনি আফ্রিকীয় সকল নৌবন্দরের নিরাপত্তা বিধান এবং জাহাজ নির্মাণ কারখানাসমূহ পুনর্বিন্যস্ত করেন।
নয়শ' তিহাত্তর হিজরীতে কনস্টানটিনোপল থেকে তুর্কী নৌবহর মাল্টা আক্রমণ করে। তুরগুত পাশা তাঁর নৌবহরসহ ত্রিপোলী থেকে ছুটে আসেন এবং তুর্কী নৌবহরের পক্ষে প্রাণপণ লড়াই করেন। কিন্তু যুদ্ধকালে তিনি গোলার আঘাতে আহত হয়ে শাহাদত বরণ করেন।
তুরগুত পাশা তাঁর সমসাময়িককালের মস্ত বাহাদুর, যুদ্ধার্থী ও সমর-শাদুল ছিলেন। সমকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ রণনায়ক। খায়রুদ্দীন পাশার সমমর্যাদাসম্পন্ন। আমীরুল বহর ডোরীয়ার চাইতেও অধিক বলবান। তিনি বড় বড় আমীরুল বহরকে কুপোকাত করেছিলেন।
বস্তুত আমীরুল বহর তুরগুত পাশা ছিলেন নৌ-যুদ্ধের এক অতুল-নীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি প্রতিনিয়ত সৈনিক জীবন যাপন করতেন। উচ্চ পদমর্যাদার জন্যে তিনি কখনো লালায়িত ছিলেন না। বরং দেশ ও জাতির জন্যে ছিলেন সমর্পিতপ্রাণ। জয়-পরাজয়ের কথা তিনি কখনো ভাবতেন না।
তিনি ছিলেন পরাজিত শত্রু, বিশেষ করে কারাবন্দীদের সত্যিকার বন্ধু ও সহকর্মী। অত্যন্ত প্রাণোচ্ছল, স্বাধীনচেতা ও নিরহঙ্কার।
অধীনস্থদের তিনি সর্বদা সমঅধিকার দান করতেন। তাঁর লোক-লস্কর সব সময় তাঁর অনুগত থাকতো। নৌসেনাপত্যে তাঁর পরিপক্কতা ছিলো প্রশ্নাতীত। তাঁর তিরোধানের প্রায় আড়াইশ' বছর পর ইংরেজ আমীরুল বহর লর্ড নিলসনের মৃত্যু হয়। দু'জনেরই একই রকম মৃত্যু ঘটেছিলো। দু'জনই সত্য-সৈনিকের ন্যায় কর্তব্য পালনকালে ঘোর যুদ্ধে যখমী হয়ে মারা যান। উভয়জনই এরূপ পরিণামের প্রত্যাশী ছিলেন।
তুরগুত পাশার জীবন থেকে আমরা বীরত্ব, সাহসিকতা, দৃঢ়তা ও ত্যাগের শিক্ষা পাই। তোমরাও তুরগুত পাশার মতো সৈনিক হও।

📘 সোনালী যুগের মুসলিম নৌশক্তি > 📄 ’আমীরুল বহর ‘আলালু ‘উলুজী পাশা

📄 ’আমীরুল বহর ‘আলালু ‘উলুজী পাশা


'আলাল্ 'উলুজী পাশা তুরগুত পাশা ও খায়রুদ্দীন পাশার মতো বীর, সাহসী ও অনন্য আমীরুল বহর ছিলেন। তিনি তুরগুত পাশার সার্থক শাগরিদ ছিলেন। খায়রুদ্দীন পাশার মতো নির্ভীক ও তাঁর পদাঙ্কানু-সারী।
'আলাল্ 'উলুজী পাশা কালিল্বরিয়ার এক খৃস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আলজিরিয়ায় আগমন করে ইসলামে দীক্ষিত ও নৌবাহিনীতে ভর্তি হন। প্রথমে তিনি মাল্লার কাজ করেন। অতঃপর ক্রমান্বয়ে আমীরুল বহরে উন্নীত হন।
'আলাল্ 'উলুজী পাশা তিউনিসে রাজত্ব করেন। আফ্রিকার উপকূল নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ নির্মাণ কারখানা পুনর্গঠিত করেন।
এরপর তিনি আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল শত্রুমুক্ত করেন। পনেরোশ' সত্তর খৃস্টাব্দে তিনি পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে ভ্রমণ করতে গিয়ে সাকালিয়া উপকূলে ক্রুশেড বহরের সম্মুখীন হন। এই নৌবহরে পাঁচটি রণপোত ছিলো। এগুলো বিখ্যাত ক্রুশেড সেনাপতি ক্লেমেন্টের পরিচালনায় লুন্ঠিত দ্রব্য নিয়ে মাল্টা গমন করছিলো।
আল্কাতাই 'বন্দরে উভয় নৌবহরের ঘোরতর যুদ্ধ হয়। ক্রুশেড বাহিনী মুকাবিলার অক্ষম হয়ে তিনটি জাহাজ 'উলুজী পাশাকে উপঢৌকন পাঠালো।
ক্রুশেডদের এই লুন্ঠিত বহর মাল্টা ফিরে গেলে তারা ক্লেমেন্টের ওপর এতোই কুপিত হন যে, পোপ অতি কষ্টে তাঁর জান বাঁচাতে সক্ষম হন। কিন্তু মাল্টাবাসীরা ক্লেমেন্টকে ফাঁসি দিয়ে তাঁর লাশ নদীতে নিক্ষেপ করে।
পনেরোশ' একাত্তর খৃস্টাব্দে ক্রুশেডরা আল্কাতাই'র এই ক্ষুদ্র পরাজয়ের বিরাট প্রতিশোধ নিলো। আর সত্য বলতে কি, কিছুকালের জন্যে ক্রুশেডদের নৌশক্তি আলজিরিয়া ও কনস্টান্টিনোপলের মিলিত নৌশক্তিকে একদম কাবু করে ফেলেছিলো।
খায়রুদ্দীন পাশা সেনাপতি ডোরীয়ার পরিচালনাধীন ভেনিসের রাজকীয় নৌবহরকে প্রেভেসার অদূরে পর্যুদস্ত করেছিলেন। ফলে ভেনিসের রাজকীয় নৌশক্তি চিরতরে খতম হয়ে গেলো। কিন্তু তাদের উদ্দীপনা তখনো কিছুটা বাকী ছিলো। যখনই কোনো খৃস্টান শক্তি তাদের পোষকতায় এগিয়ে আসতো, তখনই তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতো।
ভেনিসের সমুদয় সমৃদ্ধ বন্দর ও নৌছাউনিসমূহ দওলত-ই-'উছমানি-য়ার করকবলিত হলেও তখনো ভেনিসের দখলে কিছু ভালো দ্বীপ রয়ে গিয়েছিলো।
এইসব দ্বীপদেশের মধ্যে সাইপ্রাস ছিলো অন্যতম। সাইপ্রাস ছিলো গ্রীকসাগরে ভেনিসের অতীত নৌ-আধিপত্যের স্মারকস্বরূপ। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে এর চেয়ে বড় কোনো সুরক্ষিত স্থান আর ছিলো না। এখানে ছিলো সমররত সৈনিকদের উত্তম ছাউনি, অস্ত্রশস্ত্রের উত্তম ভাণ্ডার এবং ফৌজী রসদপত্রের উত্তম গোডাউন।
সাইপ্রাস দ্বীপের প্রাকৃতিক অবস্থান সমরাভিযান পরিচালনার পক্ষে খুবই অনুকূল ছিলো। এখানে অবস্থান করে সমগ্র গ্রীক সাগরে নাবিক-দের নিঃক্লেশে পর্যবেক্ষণ করা যেতো। শত্রুপক্ষের সমস্ত গতিবিধিও অবগত হওয়া যেতো।
এই দ্বীপভূমির আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিলো, সিরিয়া প্রভৃতি অঞ্চলের নৌদস্যুরা এটাকে তাদের আশ্রয়স্থল মনে করতো। তাই সুলতান দ্বিতীয় সালীম ভেনিস রাজ্যের এই দ্বীপটি দখল করতে কৃতসংকল্প হন।
ভেনিসীয় নৌবহর ইউরোপীয় নৌবহরের লুণ্ঠননীতিতে মদদ যুগিয়েছিলো। তাই দওলত-ই-'উছমানিয়া পনেরোশ' সত্তর খৃস্টাব্দে ভেনিসকে নৌযুদ্ধের আহবান জানান।
ভেনিস এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে ক্রুশেডদের সাহায্যপ্রার্থী হলো। ক্রুশেডরাও ভেনিসের সাহায্যে সাড়া দিলো। তারা ইউরোপের সকল নৌশক্তির মদদ চাইলো। ইউরোপীয় বিভিন্ন নৌবহর এগিয়ে এলো।
দুইশ' ছয়টি নৌ-জাহাজ ও আটচল্লিশ হাযার নৌসৈন্য প্রস্তুত হলো। মার্ক এন্টনি এই সম্মিলিত বাহিনীর মীরবহর নিযুক্ত হলেন।
দওলত-ই-'উছমানিয়ার তরফ থেকে 'আলাল্ 'উলুজী পাশা বারবার নৌবহরকে পিয়ালে পাশা ও লালা মুস্তাফার নেতৃত্বে সোজা সাইপ্রাস অভিমুখে চালনা করেন এবং স্বয়ং দুশমনের শক্তি পরিমাপ নিবন্ধন ইটালীর উপকূলে নোঙ্গর ফেলেন। কেননা, এখান থেকে অতি সহজেই সম্মিলিত বাহিনীর গতিবিধি লক্ষ্য করা যেতো।
'আলাল্ 'উলুজী পাশা খুব ভালো করেই লক্ষ্য করলেন যে, শত্রু-পক্ষের বিশাল নৌবহর ও বিপুল বাহিনী সাইপ্রাস অভিমুখে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তবু 'উলুজী পাশা ও তাঁর ক্ষুদ্রকায় নৌবহর এতোটুকু বিচলিত হয়নি।
এছাড়া, খৃস্টান মীরবহরদের ওপর বারবার নৌবহরের প্রভাব ছিলো অত্যধিক। তাই লালা মুস্তাফা ও পিয়ালে পাশার সীমিত শক্তি সত্ত্বেও বারবার নৌবহর সাইপ্রাসের রাজধানী ও নিকোশিয়া বন্দর দখল করে হিলালী নিশান উড়িয়ে দেন।
এদিকে ইটালীর উপকূল থেকে 'উলুজী পাশাও সাইপ্রাস আগমন করেন। তিনি তাঁর সমুদয় নৌসেনা জাহাজ থেকে নামিয়ে দ্বীপের অভ্যন্তর বিজয়ে নিয়োগ করলেন।
এই সময় খৃস্টান বাহিনী তুর্কী শূন্য জাহাজগুলোকে নিঃক্লেশে ডুবিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু তারা অহেতুক আত্মাভিমান ও অহমিকার দরুন এই সুযোগ হাতছাড়া করলো। ফলে নিকোশিয়া জয় করার পর সাইপ্রাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ ফীমাগুস্তাও তুর্কীরা অধিকার করলেন। এইভাবে 'উলুজী পাশা সমন্বিত নৌবহরকে গ্রীকসাগরে পর্যুদস্ত করেন।
'আলাল 'উলুজী পাশা স্বীয় ও বারবার নৌবহরসহ গ্রীকসাগর থেকে নোঙ্গর তুলে লোপান্টো উপসাগর দিয়ে এ্যাড্রিয়াটিক হ্রদে প্রবেশ করেন এবং সেখানে নোঙ্গর ফেলে খৃস্টান সমন্বিত নৌবহরের অপেক্ষা করতে থাকেন।
সম্ভবত 'উলুজী পাশার মনে তুর্কী ও বারবার বহরের ওপর বেশী অহংকার জন্মেছিলো। পূর্ববর্তী বিজয়গুলোই তাঁকে অতিমাত্রায় আত্মম্ভরি করে তুলেছিলো। তাই শত্রুর শক্তিকে তিনি হীন জ্ঞান করলেন।
'উলুজী পাশা আরো এক ভুল ধারণায় পতিত হয়েছিলেন। মনে করেছিলেন, খায়রুদ্দীন বারবারোসা যেরূপ ভেনিসীয় খৃস্টান মীর- বহর ডোরীয়াকে প্রেভেসায় পরাজিত করেছিলেন, তদ্রুপ তিনিও খৃস্টান ঐক্যশক্তিকে লোপান্টোতে পরাভূত করবেন।
একাল ও সেকালের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান ছিলো। খৃস্টান নৌবহর- গুলোকে ব্রুশেডাররা সংঘবদ্ধ করেছিলো। তাছাড়া, খৃস্টান ধর্মযাজকরা তাঁদের অগ্নিক্ষরা বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে নৌসেনাদের উত্তেজিত করে তুলেছিলো।
তুর্কী নৌবহর উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে গিয়েছিলো। ফলে তাদের মধ্যে এক ধরনের স্থবিরতার সৃষ্টি হলো। ওদিকে খৃস্টান নৌবহরও ক্রমাগত পরাজয়ে পরম অপমানবোধ করেছিলো। এই অপমানবোধ তাদেরকে মারমুখী করে তুলেছিলো।
এছাড়া, খৃস্টানদের নতুন মীরবহর নিযুক্ত হয়েছিলেন ডন জন অব অস্ট্রিয়া। তাঁর পিতা গ্রেট চার্লস দক্ষিণ ইউরোপীয় খৃস্টান বহরকে তুর্কীদের কবল থেকে রক্ষা করেছিলেন। তাই ডন জন অব অস্ট্রিয়া ছিলেন একজন স্বনামধন্য মীরবহরের সুযোগ্য সন্তান। তিনি তখন বাইশ বছরের নও জওয়ান। যৌবনের উদ্দামতায় প্রাণোচ্ছল। তাঁর বৈপিতৃক ভ্রাতা ফিলিপ স্পেন থেকে مسلمانوں বিতাড়ন ও হত্যাকাণ্ডে দিশারীর ভূমিকা পালন করেছিলো।
যে ব্যক্তির বাপ-ভাই ছিলো مسلمانوں জানী দুশমন, মুসলমানদের বিরুদ্ধে তার বৈরিতার আবেগ ও অভিসন্ধি কতোটা প্রকট ছিলো, তা সহজেই অনুমেয়।
ডন জন অব অস্ট্রিয়াকে দক্ষিণ ইউরোপীয় সমুদয় নৌবহরের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হলো। আর এটা তাঁর মতো একজন সাহসী নায়কের পক্ষে মোটেই দুরূহ কাজ ছিলো না। কেননা, তাঁর বংশীয় ঐতিহ্যই একাজে তার হিম্মত যোগাতে যথেষ্ট ছিলো।
খৃস্টান ঐক্যবহর তুর্কী বহরের মুকাবিলায় মাসীনা উপসাগরে ঢুকলো। প্রথম নৌবহরটি প্রবেশ করলো সেনাপতি ভীযূর পরিচালনায়। ভীযূর নৌবহরে আটচল্লিশটি রণপোত ছিলো।
দ্বিতীয় নৌবহরটি-যার সেনানায়ক ছিলেন ডন জন অব অস্ট্রিয়া -ষাটটি রণপোতসহ বারসিলোনা হয়ে লিওন উপসাগরে ঢুকলো। বার-সিলোনা থেকে যাত্রা করার সময় পোপ পীস ডন জনকে পবিত্র পতাকাও সাফল্যের শুভাশিস দেন।
মাসীনা উপসাগরে ঢুকে স্বীয় নৌবহরকে উৎসাহ দানকল্পে বিউগল বাজিয়ে উক্ত পবিত্র পতাকা জাহাজের মাস্তুলে টাঙ্গানো হলো। ডন জনের নৌবহরে ছিলো দুইশ' পঁচাশিটি রণপোত। পবিত্র পতাকা উড্ডীন হওয়ার সাথে সাথেই বীর জওয়ানদের মধ্যে জম্বা পয়দা হলো।
মোটকথা, খৃস্টান ঐক্যবহর এক বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তুর্কী নৌবহরের মুকাবিলায় যাত্রা শুরু করলো। অন্যদিকে, 'উল্‌জ্জী পাশার সেনাপত্যে দুইশ' আটটি রণপোতসম্বলিত তুর্কী নৌবহরটিও এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় সাগরবক্ষে সারিবদ্ধ হলো। তুর্কী নৌসৈন্যের সংখ্যা ছিলো মোট পঁচিশ হাযার।
সাগরবক্ষে দুই বাহিনীর পাঞ্জালড়া শুরু হলো। একদিকে খৃস্টান ঐক্যবহর। আর অন্যদিকে সিরফ তুর্কী নৌবহর। খৃস্টান ঐক্যবহর প্রথমেই প্রবল আক্রমণ করলো। তুর্কীরা অসমশক্তির জওয়াব দিলো। খৃস্টান সেনাদল বীরবিক্রমে অগ্রসর হচ্ছিলো। আর তুর্কী নৌবহর তাদের পশ্চাতে ঠেলে দিচ্ছিলো। উভয় পক্ষের বহু রণপোত নিম-জ্জিত ও নৌসৈন্য নিহত হলো। 'উলুজী পাশার সহকারী আলী পাশাও এই সংঘর্ষে শহীদ হলেন।
এরপর ডন জন অব অস্ট্রিয়া ও ঐক্যবহরের লোকেরা 'উলুজী পাশার অবশিষ্ট রণপোতগুলো ঘিরে ফেললো। তুমুল সংঘর্ষের পর তুর্কী নৌবহরের পতন ঘটলো। কিন্তু এই নৌবিজয়ে খৃস্টানদের জানমালের বিপুল ক্ষতি হলো।
এই যুদ্ধ বাহ্যত তুর্কী নৌবহরকে চিরতরে খতম করে দিলো এবং দৃশ্যত তুর্কী নৌশক্তি চিরদিনের মতো ধূলিসাৎ হয়ে গেলো। বহু রণপোত নিমজ্জিত ও শত্রু কবলিত হলো। হাযারো নৌসৈন্য শহীদ হলেন। 'উলুজী পাশা পরাস্ত হয়ে কোনো মতে কনস্টান্টিনোপল ফিরে এলেন।
হাযার হাযার তুর্কী বাহাদুর শহীদ হলেও কিন্তু এই বীর জাতি হতাশ্বাস হলেন না। তাঁরা নবোদ্যমে নৌবহর গঠনে নিয়োজিত হলেন। সত্য বলতে কি, কোনো বাহাদুর কওমই জীবনের কোনো বিপর্যয়ে হতোদ্যম হন না। তাঁরা নীচে নামেন ওপরে ওঠার জন্যে।
যা হোক, এই বিরাট ক্ষতি সামলে উঠতে মাত্র দুটি বছর ব্যয়িত হলো। তৃতীয় বছর 'উলুজী পাশা তুর্কী নৌবহরকে তিউনিস নিয়ে চললেন। তিউনিস যাত্রাকালে তাঁর নৌবহরে দুইশ' পঞ্চাশটি রণপোত ও ত্রিশটি রণতরী ছিলো।
তিউনিসকে ডন জন অব অস্ট্রিয়া তুর্কী শাসন থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু 'উলুজী পাশা এই পাঁচ বছর পর তিউনিস আক্রমণ করলেন। তিনি অতি সহজেই তিউনিস পুনর্দখল করে সুলতান তৃতীয় মুরাদকে খবর পাঠালেন।
তিউনিস বিজয়ের পর তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে নৌযুদ্ধ বেধে গেলো। 'উলুজী পাশা কাস্পিয়ান সাগরে ইরানীদের পরাস্ত করলেন। ইরান সরকার সন্ধি করতে বাধ্য হলেন। সন্ধির শর্ত অনুসারে জজিয়া, তীবরীষ ও কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ তীর তুর্কী অধিকারে এলো।
এরপর 'আলাল 'উলুজী পাশা ইন্তিকাল করেন। তাঁর লকব ছিলো মুআযযিন্যাদা। তিনি তুরস্ক সরকারের ভূমধ্যসাগরীয় আমীরুল বহর ছিলেন। তাঁর নৌ-ক্রিয়াকাণ্ড খায়রুদ্দীন পাশার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলো না। তুরগুত পাশার মতো নির্ভীক ও সাহসী ছিলেন। তাঁর নৌ-আক্রমণে দুশমনের নাভিশ্বাস উঠে যেতো। তুর্কী আমীরুল বহরদের মধ্যে অভিজ্ঞ ও পারদর্শী ছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো বাহাত্তর বছর। তিনি সর্বদা সৈনিক জীবন-যাপন করতেন এবং সমকালের শ্রেষ্ঠ মীরবহর ছিলেন। তোমরাও বড় হয়ে 'উলুজী পাশার মতো খ্যাতিমান হও। আল্লাহ্ তোমাদের সহায় হোন!

📘 সোনালী যুগের মুসলিম নৌশক্তি > 📄 ’আমীরুল বহর মুরাদ-ই-আ’জম

📄 ’আমীরুল বহর মুরাদ-ই-আ’জম


মুরাদ-ই-আ'জম আলজিরিয়ার শেষ আমীরুল বহরদের মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ, অভীক ও অটলপ্রতিজ্ঞ ছিলেন। তাঁর শিরা-উপশিরায় ইউরোপীয় শোণিতধারা প্রবাহিত ছিলো। তিনি আলবানিয়ার এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
শৈশবেই তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। আলজিরিয়ার গভর্নর মুস্তফা পাশার গৃহে প্রতিপালিত হন। বারো বছর বয়সেই তিনি তাঁর প্রতিপালক ও মুরব্বীর কাছে স্বীয় বীরত্বের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন।
মাল্টার নৌ-অবরোধকালে তিনি মুস্তাফা পাশার অনেক কাজে লেগেছিলেন। যুদ্ধচলাকালে সমুদ্রময় গোয়েন্দাবৃত্তি চালিয়েছিলেন। তাঁর ছোট্ট নৌকাটি প্রস্তরে ধাক্কা খেয়ে ভেঙ্গে গিয়েছিলো। কিন্তু নিজের এই অযোগ্যতা ও অনভিজ্ঞতার কথা তিনি তাঁর মুরব্বীকে জানতে দিলেন না।
তিনি তৎক্ষণাৎ চুপিসারে আলজিরিয়ায় গিয়ে পৌঁছেন এবং আরেকটি তরণী সংগ্রহ করে শিকারের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। অনভিজ্ঞ ও নব্য শিক্ষিত বারবার নৌসেনারা স্পেন উপকূলকে প্রশিক্ষণকেন্দ্র বানিয়েছিলেন। কতকটা এ কারণে যে, এ স্থানটি ছিলো আলজিরীয় উপকূল সংলগ্ন। আর কতকটা এ জন্যে যে, মাল্টাবাসীদের ন্যায় স্পেনবাসীরাও সর্বদা বারবারদের পিছে লেগে থাকতো।
যা হোক, মুরাদ-ই-আ'জম তাঁর এই ছোট্ট তরণী দ্বারা প্রায় দেড়শ' লোক গ্রেফতার করেন। অনুরূপ 'উল্‌জ্জী পাশা যখন ক্রু শেডনায়ক সেন্ট ক্রেমেন্টকে আক্রমণ করে তাঁর জাহাজ পাকড়াও করেছিলেন, তখন মুরাদও তাঁর সহকর্মী ছিলেন।
একবার পনেরোশ' আটাত্তর খৃস্টাব্দে মুরাদ-ই-আ'জম আটটি শিকারী নৌকাসহ কালবিরিয়ার সন্নিকটে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছিলেন।
হঠাৎ দূর আকাশের নীলাভ কোণে সিসিলীর জাতীয় পতাকা ভেসে উঠলো। কাছে আসতেই প্রতীয়মান হলো, পতাকাধারী একটি আরোহী। জাহাজযোগে নওয়াব টেরা নেভাদা তাঁর সঙ্গী সহচর সমভিব্যাহারে পোপের দরবার যিয়ারত করতে যাচ্ছিলেন। বারবারী কিন্তী দেখা মাত্রই সিসিলীর নিশানবাহক হতবুদ্ধি হয়ে পিঠটান দিলো। কিন্তু মুরাদ-ই-আ'জম ত্বরিতবেগে অগ্রসর হয়ে জাহাজটিকে পিছন দিক থেকে ঘিরে ফেললেন। নওয়াব টেরা নেভাদা সম্মুখভাগ দিয়ে পালায়ন করলেন।
বারবারদের কোনো কাপ্তান তখন পর্যন্ত সমুদ্র অভ্যন্তরে সফর করেছিলেন না। বরং সচরাচর তীরভূমির কাছাকাছি থাকতেন। কিন্তু মুরাদ-ই-আ'জম একবার কৃষ্ণসাগরের এতো দূর অভ্যন্তরে চলে যান যে, তীর ভূমি দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেলো। পথিমধ্যে পশ্চিম আফ্রিকীয় কেষী দ্বীপপুঞ্জের লিন্যারোট দ্বীপ আক্রমণ করে শহর ও গবর্নরের মহল লুট করে নিয়ে আসেন।
অনুরূপভাবে পনেরোশ' উনানব্বই খৃস্টাব্দে একবার মাল্টার নিকটে চক্কর দেওয়ার সময় তিনি কোনো এক ইউরোপীয় গোত্রের দু'তিনটি সওদাগরী জাহাজ পাকড়াও করে আলজিরিয়া নিয়ে আসেন। ওদিকে মাল্টার নৌদস্যুরা দু'টি তুর্কী জাহাজ ছিনতাই করে মাল্টার দিকে নিয়ে আসছিলো, পথে তাদের সাথেও মুকাবিলা হয়।
সেকালে ক্রুশেড পতাকা ছিলো নাবিকদের জন্য মৃত্যু পরওয়ানা-স্বরূপ। কিন্তু মুরাদ-ই-আ'জম ভয়ে পালিয়ে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। তিনি নির্ভয়ে শত্রুর জাহাজের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। যেমনিভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঈগল তার শিকারের ওপর। শত্রু জাহাজ কর্যা করে এইটু সামনে এগোতেই মেজরকা দ্বীপের ডাকু নৌশ্রেণীর সম্মুখীন হন। তিনি সেগুলোও বগলদাবা করে বিজয়ীবেশে আলজিরীয় বন্দরে প্রবেশ করেন।
মুরাদ-ই-আ'জমের এই রাজকীয় বিজয়ের দরুন আনন্দোৎসব পালিত হয়। আলজিরিয়া আলোকসজ্জিত হয়। আলজিরীয়াবাসিগণ মুরাদকে আ'জম (মহান) খিতাব দিয়ে আমীরুল বহর নিযুক্ত করেন।
আমীরুল বহর হওয়ার পর মুরাদ-ই-আ'জম জাহাজ চালনায় চরম উৎকর্ষ সাধন করেন।
পনেরোশ' চুরানব্বই খৃস্টাব্দে মুরাদ-ই-আ'জম চারটি হালকা তরণীসদৃশ জাহাজসহ সমুদ্র ভ্রমণে বের হন। পথে তিনি কতিপয় ইউরোপীয় দস্যু জাহাজ দেখতে পান। তিনি সহসা তাঁর জাহাজের মাস্তল নামিয়ে আলাদা করে ফেলেন। দস্যু জাহাজগুলো ভাবলো ওগুলো সওদাগরী জাহাজ। তারা সহর্ষে সেদিকে ধাবিত হলো।
দস্যু জাহাজ বেশী নিকটবর্তী না হতেই মুরাদ-ই-আ'জম সহসা সেগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং মুসলমান গোলাম ও খালাসীদের মুক্ত করে খৃস্টান কাপ্তান ও কর্মকর্তাদের বন্দী করেন।
মুরাদ-ই-আজ'ম ভূমধ্যসাগরে তুর্কী নৌ-বহরকে সংগঠিত ও সমৃদ্ধ করেন। তিনি খৃস্টীয় নৌবাহিনীর সাথে বেশ কয়েকবার সংঘর্ষে লিপ্ত ও কৃতকার্য হন।
মুরাদ তিরাশি বছর বয়ক্রমে ইহলোক ত্যাগ করেন। তিনি এক আদর্শ জীবনের অধিকারী ছিলেন। মুসলিম তরুণদের জন্যে তাতে অনেককিছু শেখার আছে।
একটি বারো বছরের খৃস্টান বালক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নৌসেনায় পরিণত হলো। আলজিরিয়ার গবর্নর তাকে পালকপুত্ররূপে বরণ করলেন। খৃস্টানদের বিরুদ্ধে তাকে গোয়েন্দাকাষে নিয়োগ করলেন।
এই বীর, তেজস্বী ও নির্ভীক নওজওয়ান যে বিক্রমের সাথে স্বীয় দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন, তার দৃষ্টান্ত শুধু ইসলামী ইতিহাসই নয়, বিশ্ব-ইতিহাসেও খুঁজে পাওয়া ভার।
এ ছিলো ইসলামের বরকত ও আশীর্বাদ। সে বহু অজ্ঞাত-অখ্যাত লোককেও স্বীয় পক্ষপুটে আশ্রয় দিয়ে পতিপালন করেছে। উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। এটা ইসলামের মহত্ত্ব। ইসলামেরই ঔদার্ঘ। তোমরাও মুসলমান। তোমরাও ইসলামের ছত্রছায়ায় লালিত। বর্দ্ধিত। তোমরাও চেষ্টা করো। পরিশ্রম করো। তাহলে তোমরাও মুরাদ-ই-আ'জমের মতো আমীরুল বহর হতে পারবে। পরিশ্রমীদের আল্লাহও সাহায্য করেন।

📘 সোনালী যুগের মুসলিম নৌশক্তি > 📄 ’আমীরুল বহর সাইয়্যিদী আলী রইস

📄 ’আমীরুল বহর সাইয়্যিদী আলী রইস


সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সাইয়িদী আলী রঈস নামক এক প্রখ্যাত আমীরুল বহর আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি নৌযুদ্ধ ও জাহাজ পরিচালনায় খায়রুদ্দীন পাশা বারবারোসার সমকক্ষ এবং ইউরোপীয় এক বিখ্যাত খৃস্টান পরিবারের নও মুসলিম কাপ্তানের পুত্র ছিলেন।
আলী রঈস নৌযুদ্ধ ও জাহাজ চালনার ট্রেনিং লাভ করেছিলেন তাঁর পিতার কাছে। অতঃপর ক্রমান্বয়ে উন্নতি লাভ করে ষোলটি জাহাজের এক নৌবহরসহ দওলত-ই-উছমানিয়ার নৌ-বিভাগে চাকরি নেন। সুলতান তাঁকে তাঁর সুখ্যাতি ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমীরুল বহর নিযুক্ত করেন। এরপরই তাঁর কীতিকাণ্ডের স্বর্ণদ্বার খুলে যায়।
ষোলশ' আটত্রিশ খৃস্টাব্দে আলী রঈস তুর্কী নৌবহর দ্বারা ইটালীর পূর্ব উপকূল আক্রমণ করে আপুলিয়া প্রদেশের নকোত্রা লুট করেন।
এখানকার বিজয় পর্ব সম্পন্ন করে তিনি এ্যাড্রিয়াটিক সাগরে প্রবেশ করেন এবং কেট্রো উপসাগরের সন্নিকটে এক স্পেনীয় নৌবহরে হামলা করে সেগুলো দখল করেন। ভেনিসে যখন আলী রঈসের এই সামুদ্রিক ক্রিয়াকাণ্ডের খবর পৌঁছলো তখন ভেনিস সরকার আলী রঈসকে দমনকল্পে সেনাপতি ক্যাপেলুর নেতৃত্বে এক বিরাট নৌবহর প্রেরণ করলেন।
ভেনিসীয় নৌবহর আলী রঈসের ওপর হামলা করলো। আলী রঈস আত্মরক্ষাকল্পে আলবানিয়ার ভিলোনা নামক তুর্কী দুর্গে আশ্রয় নিলেন। সেনাপতি ক্যাপেলু প্রচণ্ড আঘাত হেনে তুর্কী জাহাজগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করলেন।
এর প্রতিশোধ মানসে কনস্টান্টিনোপল থেকে এক শক্তিশালী তুর্কী নৌবহর এসে সেনাপতি ক্যাপেলুকে চরমভাবে পর্যুদস্ত করলো।
এই নৌযুদ্ধে আলী রঈসের নৌবহরের এক বিরাট অংশ নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই দওলত-ই-'উছমানিয়া তাঁর জন্যে একটি নতুন নৌবহর তৈয়ার করলেন। এই নৌবহরে নতুন-পুরান মিলে মোট পঁয়ষট্রিটি জাহাজ ও ত্রিশ হাযার নৌসেনা ছিলো।
এই নৌবহরের বদৌলতে তিনি বিরাট খ্যাতি অর্জন করেন। ভূমধ্যসাগরে ইউরোপীয় মীরবহররা আলী রঈসের নামে সন্ত্রস্ত্র ছিলো। দক্ষিণ ইউরোপে তো তিনি তুর্কীদের নৌএকাধিপত্যই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
আলী রঈস তাঁর নৌসেনাদের কল্যাণ ও উন্নতি বিধানে সবিশেষ যত্নবান ছিলেন। তিনি ভূমধ্যসাগরের সকল নৌবন্দর সংলগ্ন স্বাস্থ্যকর স্থানসমূহে নৌসেনাদের চিত্তবিনোদনহেতু অনেক বালাখানা নির্মাণ করেছিলেন। এইসব বালাখানার চতুর্দিকে সেব গাছ লাগানো হতো। সেব গাছের সবুজ ডালপালা বালাখানার জানালা পর্যন্ত এসে পৌঁছতো।
আমীরুল বহর আলী রঈস ছিলেন একজন পূর্ণ আদর্শ নৌসেনানী। তিনি তাঁর নৌসেনা ও খালাসীদের সাথে অত্যন্ত প্রীতিপূর্ণ ও নম্র ব্যবহার করতেন। অধীনদেরকে সর্বদা 'হযরত' বলে সম্বোধন করতেন। তাদের দুঃখ-কষ্টকে নিজের দুঃখ-কষ্ট বলে মনে করতেন।
তাঁর কথা ও কাজে কখনো অমিল হতো না। তিনি নিজেও বলতেন-"আমার কথাই আমার কাজ।" বন্দীদের সাথে নিহায়েত কোমল ও সদয় ব্যবহার করতেন।
এই অকুতোভয় বাহাদুর ও অমিতপরাক্রম সিপাহসালার ছাপান্ন বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। তিনি তাঁর কর্মকাণ্ড দ্বারা উত্তর-সূরিদের এমনভাবে পথ-প্রদর্শন করে গেছেন, যেমনিভাবে মহাসমুদ্রে অন্ধকার রাতে পথভ্রষ্ট জাহাজসমূহকে আলোকস্তম্ভ পথ-প্রদর্শন করে থাকে।
তোমাদের কর্তব্য হচ্ছে, এই বীর আমীরুল বহরকে স্বীয় চলার পথের আলোকবর্তিকা রূপে গ্রহণ করা এবং সমুদ্রের তরঙ্গময় জীবনের সাথে খেলা করতে শেখা। স্থল ও নৌশক্তিতে পারদর্শিতা লাভের মধ্যেই জাতির গৌরবময় জীবন নিহিত। তোমরাও পারদর্শী হও।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00