📄 ’উছমানীয় রাজত্বে মুসলিম নৌবহর
যেসব ইউরোপীয় জাতি প্রাচ্যের সাথে সওদাগরী ও নৌ-সম্পর্ক স্থাপন করেন, ভেনিস ও জেনোয়াবাসীরা ছিলেন তাদের পুরোভাগে। এই দুটি দেশের দুরন্ত ও দুঃসাহসী নাবিকরাই ইউরোপীয়দেরকে জাহাজ চালনা ও জাহাজ নির্মাণ শিক্ষা দেন।
জেনোয়া ও ভেনিসবাসীদের সাথে তুর্কীদের সম্পর্ক ছিলো খুব সৌহার্দ্যপূর্ণ। তাই ইউরোপীয় নৃপতিরা 'উছমানীয় রাজ্য আক্রমণ করলে জেনোয়া ও ভেনিসের রণতরীর সাহায্যে তা প্রতিহত করা হতো।
কনস্টান্টিনোপল বিজয়ী সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ-এর 'আমল পর্যন্ত 'উছমানীয় সালতানাতের যে ক'জন রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন, তাঁরা সকলেই প্রয়োজনকালে ভেনিস ও জেনোয়ার নৌবহরগুলো কাজে লাগাতেন। কিন্তু সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ (বিজয়ী) অনুভব করলেন, কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের জন্য তুর্কীদের একটি স্বতন্ত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নৌবহর থাকা আবশ্যক এবং এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েই তিনি 'উছমানীয় নৌবহরের ভিত্তি স্থাপন করেন।
মুহাম্মদ ফাতিহ্ কনস্টান্টিনোপল অবরোধের সময় পাঁচ মাইল ভূমির ওপর দিয়ে জাহাজ চালিয়েছিলেন। সে কীতিকথা তোমরা মুহাম্মদ ফাতিহ্-এর নৌ-সেনাপত্যের আলোচনায় অবগত হতে পারবে। আহা! তোমাদের মধ্যেও যদি এমন কোনো নৌ-সেনাপতি বা নাবিকের জন্ম হতো!
কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পর মুহাম্মদ ফাতিহ্ তার রক্ষণাবেক্ষণ নিমিত্ত তুর্কী নৌবাহিনীকে আরো উন্নত ও পুনর্গঠিত করা আবশ্যক মনে করেন। তাই ভূমধ্যসাগরে তাদের প্রশিক্ষণ দান করে তুর্কী নৌবহরকে বলিষ্ঠতর করে তোলেন।
এরপর তিনি জেনোয়া জয়ের সঙ্কল্প করেন। চৌদ্দশ' পঁচাত্তর খৃস্টাব্দে এক সুবর্ণ সুযোগ এসে উপস্থিত হয়। ক্রীমীয়ার খানদের মধ্যে বহুদিন থেকেই গৃহযুদ্ধ চলে আসছিলো। জনৈক খান একদিকে এবং অন্যরা অপর জেনোয়াবাসীর সপক্ষে। জেনোয়া ক্রীমীয়ার ইয়াফা শহর দখল করে নিয়েছিলো। তাই অপর দল 'উছমানীয়দের সাহায্যপ্রার্থী হলো।
সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ্ কাপ্তান আহমদের সৈনাপত্যে এক বিরাট নৌবহর পাঠিয়ে ইয়াফা দখল করলেন। তিনি গ্রীক উপকূলীয় বন্দরগুলোও করায়ত্ত করলেন।
মুহাম্মদ ফাতিহ্ তুর্কী নৌবহরের গোড়া পত্তন করেছিলেন। তিনি যখন কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেন, তখন তাঁর সাথে ত্রিশটি রণপোতবিশিষ্ট এক নৌবহরও ছিলো। এই নৌবহরটি গোল্ডেন হর্নে তুর্কী আমীরুল বহর বোলু তুগলীর নৌসেনাপত্যে এক অসাধারণ কৃতিত্ব সর্বপ্রথম প্রদর্শন করেছিলো।
কনস্টান্টিনোপল জয় করার পর সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ্ তারাবিযূন, সানিউপ, কাফা, ইযাফ প্রভৃতি নামকরা কূলভূমিগুলো পদানত করেন। মারমোরা সাগর ও কৃষ্ণসাগরও তুর্কী অধিকারে আসে।
মোট কথা, তুর্কী নৌবাহিনী তখন উন্নতির উচ্চমার্গে আরোহণ করেছিলো। ভূমধ্যসাগর, মারমোরা সাগর ও কৃষ্ণসাগরে তাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই অবশিষ্ট ছিলো না। বিশেষ করে সুলায়মান-ই আ'জম কানুনীর সময় খায়রুদ্দীন পাশা 'উছমানীয় নৌবাহিনীকে দৃঢ়ভাবে সুসংহত করেন। খায়রুদ্দীন পাশা বারবারোসা ছিলেন দুনিয়ার একজন প্রথম সারির নৌসেনাধ্যক্ষ।
এখনো তুর্কীদের মধ্যে খায়রুদ্দীন বারবারোসার নাম নিতান্ত শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়ে থাকে। কারণ, তিনি তাঁর অসীম ক্ষমতা বলে 'উছমানীয় নৌবহরকে সমুন্নতি দান করেছিলেন। ইউরোপীয় নৌবহরগুলো 'উছমানীয় নৌবহরের মুকাবিলায় অক্ষম ও অপারক হয়ে পড়েছিলো। ইউরোপীয় খৃস্টান নৌবাহিনীর সম্মিলিত শক্তিও বারবারোসার নৌবহরকে ঠেকাতে পারতো না। খ্যাতনামা খৃস্টান নৌ-অধিনায়ক এন্ড্রিয়া ডোরীয়া খায়রুদ্দীন পাশার মুখোমুখি হতে রীতিমতো ভয় পেতো।
এখানে আমরা কয়েকজন তুর্কী আমীরুল বহরের নামোল্লেখ করছি। সামনে তাঁদের কিছু জীবনচিত্রও পেশ করবো। তাঁরা হচ্ছেনঃ মুহাম্মদ ফাতিহ, খায়রুদ্দীন পাশা, তুরঙত পাশা, হাসান পাশা, পীরী রঈস পাশা, সাইয়িদী আলী ও সুলায়মান পাশা।
এখন এদের প্রত্যেকের কিছুটা কর্মকুশলতার আভাস দান করা হচ্ছে। এতে তোমরা 'উছমানীয় আমীরুল বহরদের ঐতিহাসিক কীতি- কলাপ সম্পর্কে অবহিত হতে পারবে। তাদের বীরত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষালাভ করতে পারবে।
'উছমানীয় রাজত্বে 'উছমানীয় আমীরুল বহরের খিতাব ছিলো কাপুদান পাশা। সাম্রাজ্যের সমুদয় নৌবহর তাঁর অধীন থাকতো। কনস্টান্টিনোপল ছিলো তাঁর সদর দফতর। 'উছমানীয় নৌবাহিনীর সকল কর্মকর্তা ও নাবিকরা ছিলো খৃস্টান নওজওয়ান। এরা সকলেই ছিলো সুলতানের দাসানুদাস।
ইসলামী শিক্ষা ও সাহচর্য তাদের এমনভাবে গড়ে তুলেছিলো যে, ষোড়শ শতকের গোটা ইউরোপবাসীই এদের প্রবল প্রতাপে তটস্থ হয়ে থাকতো। আমীরুল বহরদের নাম পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের গুণ-গরিমা ও সুখ্যাতি কেবল ইসলামী ইতিহাসই নয়, ইউরোপীয় নৌ-ইতিহাসেও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। 'উছমানীয় কাপুদান পাশারা বিরাট বিরাট বিজয়াভিযান দ্বারা 'উছমানীয় সাম্রাজ্যের অনেক বিস্তৃতি ঘটান। নৌ-বিজয় ছাড়া জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতেও তাঁরা বহু কৃতিত্বের পরিচয় দেন।
পীরী রঈস ভূমধ্য সাগর ও ঈজীয়ান সাগরের একটি মানচিত্র তৈয়ার করেন। তাতে স্রোতের গতিবেগ, বিভিন্ন স্থানের গভীরতা ও নৌ-বন্দরসমূহের প্রয়োজনীয় জ্ঞাতব্য লিপিবদ্ধ ছিলো।
অনুরূপভাবে সাইয়িদী আলী যাঁর জাহাজ প্রতিকূল আবহাওয়ার দরুন ভারতের উপকূলে এসে ঠেকেছিলো-খোরাসন, বেলুচিস্তান ও ইরান হয়ে স্থলপথে তুরস্ক পৌঁছেন। তিনি তাঁর ভ্রমণ কাহিনী লিখে জাতিকে অনেক মূল্যবান তথ্য উপহার দিয়েছেন। এছাড়া তিনি ভারত মহাসাগরের ওপর 'মুহীত' (বেষ্টনকারী) নামক একখানি তথ্যবহুল গ্রন্থও রচনা করেছেন।
ষোড়শ শতকের শেষ পাদে 'উছমানীয় নৌবাহিনীতে ধস নামতে শুরু করে। অতঃপর ক্রমান্বয়ে এই বাহিনী দুর্বলতর হয়ে পড়ে।
এর মূলীভূত কারণ ছিলো রাষ্ট্রীয় ভ্রান্তনীতি ও তার বুনিয়াদী গলদ। 'উছমানীয় নৌবাহিনীর চাকরি ছিলো খৃস্টান যুবকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তার পরিণাম ফল যতখানি খারাপ হওয়ার ততখানিই হয়েছে।
তিনশ' বছর পর সুলতান 'আবদুল 'আযীয খান তাঁর ব্যক্তিগত অভিরুচি ও উৎসাহবশত মুসলিম নৌবাহিনী পুনঃস্থাপনে উদ্যোগী হন। তিনি মুসলিম নৌবহরকে ইউরোপীয় সেরা নৌবহরের সমপর্যায়ে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু সুলতান 'আবদুল হামীদ খানের সময় ওইসব রণতরীর গোল্ডেন হর্ন থেকে বের হওয়ারও সুযোগ ঘটেনি। সেখানে দণ্ডায়মান অবস্থায়ই সেগুলোতে মরচে পড়তে থাকে।
📄 কনস্টান্টিনোপল বিজয়ী মুহাম্মাদ ফাতিহ্
মুহাম্মদ ফাতিহ্ ছিলেন সমকালীন প্রখ্যাত দিগ্বিজয়ী। তিনি কনস্টান্টিনোপলকে স্বীয় সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ইতোপূর্বে রোমক শাসিত এশীয় অঞ্চলসমূহ তুর্কীদের করায়ত্ত হয়েছিলো। কেবল কনস্টান্টিনোপলই তাঁদের অনধিকৃত ছিলো।
মুহাম্মদ ফাতিহ কনস্টান্টিনোপল আক্রমণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করছেন। ওদিকে কনস্টান্টিনোপলের শাসনকর্তা সম্রাট কনস্টান্টাইনও প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্থলবাহিনীর অভিযান সম্পর্কে তোমরা অন্যত্র জ্ঞাত হতে পারবে। এখানে আমরা মুহাম্মদ ফাতিহর নৌ-অভিযান সম্পর্কে আলোকপাত করবো।
কনস্টান্টিনোপল অবরোধকালে প্রথমেই নৌযুদ্ধ বেধে যায়। পাঁচটি রোমান জাহাজ কনস্টান্টিনোপলের উদ্দেশ্যে রসদ বয়ে আনছিলো। মারমোরা সাগর অতিক্রম করে সেগুলো বসফোরাস প্রণালীতে প্রবেশ করতেই 'উছমানীয় নৌবহর পথ রোধ করে দাঁড়ায়।
রসদবাহী জাহাজ বন্দরে ঢোকা মাত্রই তুর্কী নৌবহর তার ওপর হামলা চালায়। ওদিকে রোমান নৌবহরও প্রস্তর ও অনলবর্ষণ শুরু করে। তুর্কী নৌবহর ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। ফলে রোমান জাহাজগুলো বন্দরে পৌঁছে যায়।
মুহাম্মদ ফাতিহ, নৌযুদ্ধে তাঁর প্রথম পরাজয়ের কারণ নির্ণয়ে আত্মনিয়োগ করলেন। তিনি গভীর পর্যবেক্ষণ দ্বারা বুঝতে পারলেন যে, বসফোরাস প্রণালীর যে অংশে পানির গভীরতা বেশী, সে অংশে তুর্কী নৌবহরগুলো রোমক বাহিনীর মুকাবিলায় সফল হতে পারবে না। তাই তিনি তাঁর গরিষ্ঠসংখ্যক রণতরী বন্দরের অপর দিকে স্থানান্তর করার সঙ্কল্প করেন। সেদিকে পানির পরিমাণ ছিলো অপেক্ষাকৃত কম।
বস্তুত এ ছিলো এক অদ্ভুত ও আশ্চর্য কৌশল। মুহাম্মদ ফাতিহ্ ইস্পাতকঠিন সঙ্কল্পের এক অবিনশ্বর দৃষ্টান্ত। তিনি বসফোরাস ও কনস্টান্টিনোপল বন্দরের মধ্যে কাঠের তক্তার এক সড়ক তৈয়ার করেন। অতঃপর তাতে বেশ করে চবি ঢালেন। সড়কটি তৈলাক্ত ও পিচ্ছিল হওয়ার পর এক নিঝুম রাতে তার ওপর দিয়ে আশিটি নৌ-জাহাজ টেনে নেয়া হয়। ফলে সহসাই কনস্টান্টিনোপলের পতন ঘটে।
কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পর মুহাম্মদ ফাতিহ গ্রীক দ্বীপপুঞ্জের প্রতি নজর দেন। অনেকগুলো দ্বীপদেশ গ্রীকদের অধীনে ছিলো। তিনি যুদ্ধ করে সেগুেলো হস্তগত করেন। লেস্বস, লেমনস, সেফালোনিয়া প্রভৃতি তাঁরই অধিকৃত কতিপয় বিশিষ্ট দ্বীপভূমি।
ভেনিস তার নৌশক্তির ওপর অত্যন্ত গর্বিত ছিলো। অপরদিকে বলকান রাজ্যসমূহের ওপর তুর্কী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর এড্রিয়াটিক সাগর ও ঈজীয়ান সাগরে তাঁরা রণপোতসংখ্যা বাড়াতে লাগলেন।
মুহাম্মদ ফাতিহ্ তাঁর নৌবহরের সাহায্যে আলবানিয়া জয় করেন। এড্রিয়াটিক সাগরের উপকূল অঞ্চলেও তুর্কী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। তুর্কী ও ভেনিসের নৌযুদ্ধ ষোলো বছরকাল স্থায়ী হয়েছিলো।
ভেনিসের সমগ্র তীরভূমি তুর্কীদের অধিকারে আসে। ভেনিসের ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপসমূহও তাঁদের হস্তগত হয়।
ভেনিস একদল প্রতিরোধী ফৌজ গঠন করে। কিন্তু জনৈক তুর্কী আমীরুল বহর সামনে অগ্রসর হয়ে তাদের চরমভাবে পরাস্ত করেন।
ভেনিসের নৌশক্তি ভেঙ্গে যাওয়ার পরও ঈজীয়ান সাগরের রোডস দ্বীপটি তুর্কী নৌবহরের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। এই দ্বীপদেশ দেড়শ' বছর যাবৎ খৃস্টান শাসনে ছিলো। খৃস্টানরা সেখান থেকে সহজেই ‘উছমানীয় নৌ-জাহাজে হামলা চালাতো।
মুহাম্মদ ফাতিহ, রোডস দ্বীপ অধিকার আবশ্যক মনে করলেন। তিনি চৌদ্দশ' আশি খৃস্টাব্দ মঞ্জুর আমীরুল বহর মাসীহ্ পাশাকে এই অভিযানে প্রেরণ করেন। মাসীহ্ পাশা রোডস দ্বীপ অবরোধ করলেন।
অপরদিকে খৃস্টানরাও পূর্ণ প্রতিরোধে প্রস্তুত ছিলো। দীর্ঘকাল অবরোধের পর অবশেষে তুর্কীরা এক ব্যাপক আক্রমণ চালালেন। রোডস হারতে হারতে জিতে গেলো। তুর্কীদের এই ব্যর্থতা পঞ্চাশ বছর স্থায়ী হয়।
রোডস দ্বীপে মাসীহ্ পাশা পরাস্ত হলেও ওদিকে আহমদ কেদক ইটালীর মূল ভূখণ্ডে পা রাখতে সক্ষম হন। ইতোপূর্বে কোনো তুর্কী সেনাই এখানে কদম রাখতে পারেননি। তুর্কী বাহিনী ইটালীর প্রসিদ্ধ টরেন্টো বন্দর দখল করলেন।
এই বিজয়ের মাধ্যমে মুহাম্মদ ফাতিহ্ তুর্কীদের জন্যে ইটালী জয়ের পথ উন্মুক্ত করেন। তিনি গোটা ইটালী জয় করে রোমে হিলালী নিশান উড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ইত্যবসরে মৃত্যু এসে তাঁর এই হারজিতের পাল্লাপাল্লি চিরতরে থামিয়ে দিলো।
📄 ’আমীরুল বহর ‘উরুজ বারবারোসা
গ্রীক দ্বীপমালার একটি ক্ষুদ্র দ্বীপের নাম আইউবিয়া। সুলতান মুহাম্মদ ছানী (দ্বিতীয়) চৌদ্দশ' বাষট্টি খৃস্টাব্দে এটি জয় করেন। অতঃপর তাঁর স্থানীয় প্রতিনিধি ইয়াকুবের নামে দ্বীপটি বন্দবস্ত দিয়ে তিনি কনস্টান্টিনোপল চলে আসেন।
তুর্কী ঐতিহাসিকগণ তাঁকে মুসলমান বলে বর্ণনা করেছেন আর খৃস্টান ঐতিহাসিকগণ বলেছেন খৃস্টান। যা হোক, আইউবিয়া শাসন করতে করতেই ইয়াকুবের মৃত্যু হয়।
মৃত্যুকালে তিনি চার পুত্র রেখে যান। ইস্হাক, ইলিয়াস, 'উরুজ ও খিফ্র। ইস্হাক ছিলেন আইউবিয়ার একজন ধনাঢ্য সওদাগর। 'উরুজ ও খিফ্র ছিলেন প্রথম থেকেই উদ্যমী ও সাহসী। তাই ইলিয়াস, 'উরুজ ও খিফ্র নৌ-বাহিনীতে ভর্তি হন। ইলিয়াস প্রথম দিকেই এক নৌ-যুদ্ধে মারা যান। কিন্তু 'উরুজ ও খিফ্রের (খায়রুদ্দীন) নৌকীতি আজো ইসলামী ইতিহাসে স্বমহিমায় ভাস্বর।
বারবারোসা বংশের লোকেরা নাবিকের কাজ কেনো বেছে নিয়েছিলেন ঐতিহাসিকগণ সে ব্যাপারে বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তার মোদ্দা কথা হলো, এই সময় দক্ষিণ ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরে নাবিকের কার্যেই যুবকরা বেশী উৎসাহ বোধ করতো। তাই বার-বারোসা গোত্রের নও জওয়ানরাও এই কাজকেই তাদের উপযুক্ত পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
'উরুজ ও খায়রুদ্দীন পাশার প্রথম জীবনের কাহিনী ঐতিহাসিকরা সোৎসাহে লিপিবদ্ধ করেছেন। তার সারমর্ম হচ্ছে, শুরু থেকেই এই ভ্রাতৃযুগল দুরন্ত ও দুঃসাহসী ছিলেন।
সর্বপ্রথম এখানে আমি 'উরূজের কীতিকথা বয়ান করবো। 'উরুজ আপন বাহুবলে একটি ক্ষুদ্রকায় নৌবহর গড়ে তুললেন।
তিনি গ্রীক দ্বীপমালাকে স্বীয় দৌড়ঝাঁপের পক্ষে অপ্রতুল মনে করতেন। তাছাড়া, তুর্কী নৌবহরের ক্রমোন্নতির দরুন এই ক্ষুদ্র স্রোতস্বিনীটিও ছিলো তাঁর নৌ-মহড়ার পক্ষে অনুপযোগী। তাই তাঁর জন্যে এক সুবিস্তৃত লীলাভূমির প্রয়োজন ছিলো।
এ হচ্ছে তখনকার কথা, যখন স্পেনের হাযার হাযার মজলুম মুসলমান স্পেন ত্যাগ করে আফ্রিকার তীরভূমিতে আশ্রয় গ্রহণ করছিলো আর খৃস্টান লুটেরারা তাদের লুটমার করে খতম করে দিচ্ছিলো।
উরূজ তাঁর নৌবহরকে ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার লক্ষ্যে ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকার مسلمانوں ত্রাণকার্যে নিয়োগ করেন।
পনেরোশ' চার খৃস্টাব্দে সেনানায়ক 'উরুজ তাঁর ছোট্ট নৌবহরটি আফ্রিকার বারবার উপকূলের এক সুরক্ষিত বন্দরে লুকিয়ে রাখেন এবং যখন শত্রুসেনারা স্পেনের মজলুম مسلمانوں পশ্চাদ্ধাবন করতো, তখন তিনি অমিতবিক্রমে তার মুকাবিলা করতেন।
তিউনিস বন্দরটি প্রাকৃতিকভাবেই সুদৃঢ় ও সুরক্ষিত ছিলো। হাল্কুল ওয়দ-এর ছোট্ট কিল্লাটি সেনানায়ক উরূজের ক্ষুদ্র নৌবাহিনীর কেন্দ্রস্বরূপ ছিলো। তাই সেনানায়ক 'উরুজ ওই দুর্গটিকেই তাঁর নৌকেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি স্পেনবিতাড়িত مسلمانوں এখানেই স্বাগত জানাতেন এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা করতেন।
'উরূজ তিউনিস সুলতানের দরবারে উপস্থিত হন এবং চাকরির দরখাস্ত করেন। সুলতান তাঁকে আমীরুল বহর নিযুক্ত করেন। তিনি নৌবন্দর ও নৌবহর গঠন করেন। ভূমধ্যসাগরে এক বিভীষিকার সৃষ্টি করেন। দক্ষিণ ইউরোপের খৃস্টান বাহিনীর মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেন।
সেনানায়ক 'উরূজ স্পেনের বিপন্ন মুসলমানদের স্পেন ত্যাগে সহায়তা করেন এবং এব্যাপারে খৃস্টান নৌবাহিনীর সকল অশুভ তৎপরতা প্রতিহত করেন।
রোমের খ্যাতনামা খৃস্টান পোপের নৌবহরটি তখন পর্যন্ত কেউ স্পর্শ করার দুঃসাহস করেনি। 'উরূজ সেটিও সুকৌশলে পাকড়াও করে তার সারেং-সুকানীদের কারারুদ্ধ করেন।
বারবারদের জন্যে এতটুকুই যথেষ্ট ছিলো। কিন্তু সেনানায়ক 'উরূজের লক্ষ্য ছিলো আরো সুদূরপ্রসারী। তিনি পোপের সারেং- সুকানী দ্বারা অনেক কাজ আদায় করেন। তাদের দ্বারাই তিনি স্বীয় নৌবহরটি সংগঠিত করেন।
নৌবাহিনী সংগঠিত হওয়ার পর 'উরূজ স্পেন অভিযানের তোড়- জোড় শুরু করেন। স্বল্পকালের মধ্যেই এক মস্ত নৌবাহিনী তৈয়ার হলো। বড় বড় বাহাদুর ও বাছা বাছা নও জওয়ান তাতে শরীক হলেন। তখনকার স্পেনীয় নৌশক্তি গোটা ইউরোপীয় নৌশক্তির চেয়েও অনেক শক্তিশালী ছিলো।
জিব্রাল্টারের অনতিদূরে উভয় বাহিনীর মুকাবিলা হলো। যুদ্ধের রায় 'উরুজের পক্ষেই ঘোষিত হলো। স্পেন পরাজয় বরণ করলো।
এই কামিয়াবী 'উরূজের 'আজমত এ শুহরাত শতগুণে বাড়িয়ে দিলো। এই সময় 'উরূজের নৌশক্তি পূর্ণ পারণতি লাভ করেছিলো। আটশ' রণপোত সতত 'হাক্কুল ওয়দ' বন্দরে 'উরুজের হুকুমের অপেক্ষা করতো। এছাড়া, আরো কিছু যুদ্ধজাহাজ 'উরুজের দুই ভ্রাতার কর্তৃত্বা- ধীন জেরবা বন্দরে অবস্থান করতো। তারা খৃস্টান নৌবহরের গতি- বিধি লক্ষ্য রাখতো।
'উরূজের মতো একজন বাহাদুর ও বীরকেশরীর পক্ষে ক্ষুদ্র দ্বীপ জেরবার রাজত্বে সন্তুষ্ট থাকা শোভন ছিলো না। তাঁর প্রয়োজন ছিলো আরো 'আজমত ও শুহরাত অর্জন করা।
পনেরোশ' বারো খৃস্টাব্দে এক নতুন সুযোগ উপস্থিত হয়। স্পেন বুজেয়া বন্দর দখল করে সেখানকার শাসনকর্তাকে মারপিট করে তাড়িয়ে দেয়। তিনি সকল দিক থেকে নিরাশ হয়ে 'উরুজের শরণাপন্ন হন। যুদ্ধে জয়লাভ করলে বুজেয়া বন্দরটি 'উরুজ ও তাঁর সহযোগীদের অবাধ ব্যবহারে ছেড়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
'উরূজের পক্ষে স্পেন অভিযানের এর চেয়ে উত্তম সুযোগ আর ছিলো না এবং বুজেয়ার চেয়ে বড় কোনো স্থানও আর ছিলো না। সুতরাং নির্দ্বিধায় চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হলো। এবার আমীরুল বহর তাঁর নৌ-অভিযানের প্রস্তুতি শুরু করলেন। তিনি স্পেন অভিযান শুরু করলে হাযার হাযার মুসলমান এসে তাতে যোগ দিলেন।
'উরূজ তাঁর নৌবহর সমভিব্যাহারে বুজেয়া বন্দরে পৌঁছলেন। দুই বাহিনী (বুজেয়ার সরকারী বাহিনী ও 'উরুজের নৌবাহিনী) সম্মিলিতভাবে স্পেন আক্রমণ করলেন। স্পেনীয় বাহিনী স্বল্পকাল মুকাবিলা করে একটি দুর্গে আশ্রয় নিলো। দশদিন অবরোধের পর দুর্গ-প্রাচীরে গোলা বর্ষিত হলো। কিন্তু তাতে কোনো ফলোদয় হলো না।
এই অবরোধে আমীরুল বহর আহত হন এবং চিকিৎসার্থ তিউনিসে নীত হন। তাঁর নৌবাহিনীও অবরোধ তুলে আফ্রিকায় পৌঁছলেন। ওয়াপস্কালে জেনোয়ার একটি বাণিজ্যতরী পাকড়াও করে আনেন।
'উরূজের অসুস্থ অবস্থায় খায়রুদ্দীন পাশা তাঁর কার্যভার গ্রহণ করেন। বাণিজ্যতরী 'ছিনতাই'র খবর পেয়ে ডোরীয়া তাঁর নৌবহর নিয়ে তিউনিস আক্রমণ করেন এবং তিউনিস বন্দর তছনছ করে উক্ত বাণিজ্যতরী ছিনিয়ে নেন।
এই পরাজয়ের গ্লানি খায়রুদ্দীন পাশাকে উত্তেজিত করে তুললো। তিনি ভ্রাতা 'উরূজকে রোগশয্যায় রেখেই সোজা জেরবা দ্বীপে গিয়ে উপস্থিত হন এবং সেখানে নতুনভাবে তাঁর নৌবাহিনী সংগঠিত করেন। ইত্যবসরে সেনানায়ক 'উরূজও রোগমুক্ত হয়ে অনুজ খায়রুদ্দীনের সাথে মিলিত হন।
'উরুজ তাঁর নৌবহরের লঙ্গর তুলে তড়িঘড়ি বুজেয়া পৌঁছেন। বুজেয়ার দুর্গ-প্রাকারে প্রচণ্ড আঘাত হানেন। কয়েকদিন পর যখন দুর্গটির পতন আসন্ন হয়ে উঠছিলো, ঠিক সেই মুহূর্তে স্পেনের নৌ-সাহায্য এসে পৌঁছলো। অগত্যা 'উরুজ বাহিনীকে ব্যর্থকাম হয়ে ফিরে আসতে হলো। 'উরূজ তাঁর অবশিষ্ট জাহাজগুলোয় আগুন লাগিয়ে ডুবিয়ে দিলেন, যাতে শত্রুপক্ষ তার দ্বারা উপকৃত হতে না পারে।
'উরুজ এই ব্যর্থতার দরুন যারপরনাই লজ্জিত হলেন। তিনি তিউনিস প্রত্যাবর্তন না করে জাবালে বনী হিলালের এক গোপন পার্বত্য খাড়িতে আশ্রয় নিলেন এবং জাবালে বনী হিলাল করতলগত করেন।
জাবালে বনী হিলালবাসীরা সাংঘাতিক প্রগল্ভ ছিলো। তারা তাদের দলপতি ছাড়া অন্য কারোরই আনুগত্য স্বীকার করতো না। 'উরুজ ইসলামী ভ্রাতৃত্বের সুকোমল ব্যবহার দ্বারা তাদের অন্তর জয় করলেন। ফলে, তারা শুধু তাঁর নেতৃত্বই মেনে নিলো না, তাঁর নৌযুদ্ধ- গুলোতেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে শরীক হতো।
স্পেনের হাযার হাযার গোত্র গ্রানাডা, আশ্বীলা, কাদিস ও আল্- ইয়ামামার সমৃদ্ধ শহরগুলো থেকে বিতাড়িত হয়ে আর্জিরীয় উপকূলে উদ্বাস্তুর ন্যায় পড়ে থাকতো। এখানেও স্পেনীয়রা উৎপীড়ন ও লুটতরাজ চালিয়ে তাদের সর্বহারায় পরিণত করতো।
আলজিরীয় শাসক সালীম শাহের স্থলবাহিনী শক্তিশালী ছিলো। কিন্তু তাঁর নৌবাহিনী ছিলো অতিশয় দুর্বল। তাই সালীম শাহ সেনানায়ক 'উরুজের কাছে নৌ-সাহায্য চেয়ে পাঠান এবং বলেন যে, স্পেনীয় জুলুম থেকে مسلمانوں রক্ষা করা আমাদের একান্ত কর্তব্য।
আমীরুল বহর 'উরূজ ছিলেন একজন পাক্কা মুসলমান। তাঁর অন্তঃকরণ ছিলো মুসলমানদের সমবেদনায় ভরপুর। তিনি সালীম শাহের প্রস্তাবে সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দেন। পনেরোশ' ষোল খৃস্টাব্দে ছয় হাযার জওয়ানের একটি ছোট্ট নৌবাহিনী পানি-ভূমি উভয় পথে আলজিরীয় অভিমুখে রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে স্থলবাহিনী শারশীল শহর পদানত করেন। শারশীল কেরাহ্ হাসান নামধেয় জনৈক তুর্কী শাসকের অধিকারে ছিলো। কেরাহ, হাসান তার মুকাবিলা করতে গিয়ে নিহত হন। 'উরূজের স্থলবাহিনী সামনে অগ্রসর হলেন। এদিকে নৌসেনারাও আলজিরিয়া পৌছে গেলেন। আলজিরিয়ার অদূরবর্তী একটি দুর্গ স্পেনীয়দের অধিকারে ছিলো। 'উরুজ ইসলামের বিধি অনুসারে দুর্গবাসীদের বলে পাঠান যে, "তোমরা দুর্গ খালি করে মুসলিম ফৌজের সোপর্দ করলে তোমাদের কোনো অনিষ্ট হবে না।" কিন্তু দুর্গাধিপতি জওয়াব দিলেন, "আমরা এমন মন-দিলের মানুষ নই যে, সামান্য নরম-গরম কথায়ই গলে যাবো। বুজেয়া দুর্গের কথা একটু স্মরণ রেখো!"
পরদিন থেকেই অবরোধ শুরু হলো। কুড়িদিন পর্যন্ত 'উরূজের বীরসেনারা দুর্গোপরি অগ্নিবর্ষণ করে। আরো কিছুদিন এরূপ গোলা- বর্ষণ অব্যাহত থাকলে দুর্গটির নির্ঘাত পতন ঘটতো।
এই সময় এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেলো। স্পেন-বিতাড়িত মুসলমান ও 'উরূজবাহিনীর মধ্যে কোনো এক ব্যাপারে বচসা হলো। বচসা বিদ্রোহের রূপ ধারণ করলো।
স্পেনীয়রা 'উরুজ বাহিনীর বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। কিন্তু এই বিদ্রোহের ষড়যন্ত্র ধরা পড়লো। ষড়যন্ত্রকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। দুর্গবন্দী খৃস্টান বাহিনী আশা করছিলো, এই বিদ্রোহের ফলে তারা অবরোধমুক্ত হবে। কিন্তু ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার ফলে তারা হতাশায় মুষড়ে পড়লো।
এবার তারা স্পেন সরকারের কাছে সামরিক সাহায্য প্রার্থনা করলো। স্পেনের নৌ-বিভাগ ডান ডি গোডী ভেরার সৈনাপত্যে সাত হাযার সশস্ত্র সেনার একটি নৌবহর প্রেরণ করলো। ডান ডি গোডী ভেরা ছিলেন একজন প্রবীণ পোড়খাওয়া নৌ-সেনাপতি।
এদিকে 'উরূজও কম অভিজ্ঞ ছিলেন না। উভয় বাহিনীর শক্তি পরীক্ষা শুরু হলো। প্রথম আঘাত আসলো ডান ডি গোডী ভেরার তরফ থেকে। 'উরূজ বাহিনী তা প্রতিহত করলেন। এক পর্যায়ে 'উরুজ বাহিনীর মধ্যে দুর্বলতার লক্ষণ দেখা দিলে তিনি সহসা তাদের মধ্যে সাহস ফিরিয়ে আনেন। চারঘন্টা অবধি তুমূল সংঘর্ষের পর উভয় বাহিনীর ভাগ্য নির্ধারিত হলো। ডান ডি গোডী ভেরার শোচনীয় পরাজয় হলো। তিনি তাঁর একটি জাহাজও রক্ষা করতে পারলেন না।
স্পেনীয় খৃস্টান সরকার-যারা স্পেন থেকে মুসলিম শাসন উচ্ছেদ করে আত্মম্ভরিতায় ফেটে পড়ছিলো-এই পরাজয়ের পর ইউরোপীয় নৃপতিদের নিকট মুখ দেখানোরও অযোগ্য হয়ে পড়লো।
এরপর 'উরুজ তাঁর ক্ষমতা বিস্তারের লক্ষ্যে স্থল ও নৌবাহিনী পুনর্গঠিত করেন এবং স্বল্পকালের মধ্যে স্বীয় স্থলবাহিনী দ্বারা গোটা আলজিরিয়া দখল করে এক শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এসময় 'উরূজ সমগ্র আলজিরিয়া শাসন করেন। রাজ্যে অনিন্দ্য নিয়ম-শৃংঙ্খলা কায়েম করলেন। আলজিরিয়ার কয়েকটি উপকূলীয় খাড়ি-দুর্গ স্পেনের অধিকারে ছিলো।
'উরূজ-সাম্রাজ্যের পরিধি ফেয ও মরক্কান সাম্রাজ্য অপেক্ষা কোনো অংশে কম ছিলো না। এবার তিনি ('উরূজ) স্পেন উপকূলে প্রবল হামলা চালান। তাঁর হামলাকারী নৌকাগুলো প্রতিবার হাযার হাযার স্পেনীয় মজলুম মুসলমানকে উদ্ধার করে আনতো।
স্পেন তো তার কৃতকর্মেরই শাস্তি ভোগ করছিলো। কিন্তু সেই সাথে দক্ষিণ ইউরোপীয় নৌবহরগুলোও 'উরুজের নামে থরে কম্পমান ছিলো। জেনোয়া, নেপল্স ও ভেনিস 'উরূজের নৌহামলার ভয়ে সদা সন্ত্রস্ত থাকতো। ভূমধ্যসাগরের নৌচৌকিগুলো 'উরূজের দখলে ছিলো। তাঁকে সমুদ্রশুল্ক না দিয়ে কোনো নৌকারই রক্ষা ছিলো না।
ভূমধ্যসাগর থেকে 'উরূজের কর্তৃত্ব খতম করার মানসে স্পেনীয় নাবিকরা স্পেন সরকার সকাশে বহু আবেদন-নিবেদন করেন। কিন্তু স্পেনীয়রা 'উরুজের মুকাবিলা করার সাহস পেতো না।
অবশেষে পঞ্চম চার্লস ক্ষমতাসীন হয়ে এই উদ্দেশ্যে এক বিশেষ নৌবহর গঠন করেন। তিনি পনেরো হাযার নৌসেনা ও দশ হাযার স্থলসেনার এক বিশাল বাহিনী আলজিরিয়া প্রেরণ করেন।
ঘটনাচক্রে তখন 'উরুজ আলজিরিয়ার তেলসম্মান অঞ্চলে এক ক্ষুদ্র স্থলবাহিনীর সাথে অবস্থান করছিলেন। তাঁর নিকট তখন কুল্লে দেড় হাযার সৈন্য ছিলো। এত অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে টিড্ডীদল শত্রুসেনার মুকাবিলায় নামা অসমীচীন জেনেও তিনি পলায়ন করলেন না। বরং সৈন্য সন্নিবদ্ধে লেগে গেলেন।
স্পেনীয় বাহিনী তেলসম্মানেই 'উরূজের ওপর হামলা করলো। 'উরুজ বাহিনীও প্রাণপণ মুকাবিলা করলেন।
জনৈক ইউরোপীয় ঐতিহাসিক লিখেছেন, "কোথায় পনেরোশ' সৈন্যের এক ক্ষুদ্র দল, আর কোথায় দশ হাযার সৈন্যের এক প্রবল জনস্রোত। অথচ মুসলমানরা বিস্ময়কর বিক্রমে তাদের মুকাবিলা করেন। তাঁদের প্রতিটি মরূদে মুজাহিদ শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত শার্দুলসম লড়াই করতে থাকেন। সংখ্যায় স্বল্প হলেও তাঁদের একটি সৈনিকও পৃষ্ঠপ্রদর্শন করলেন না। সকলেই শাহাদত বরণ করলেন।"
শহীদদের মধ্যে সেই বীরশ্রেষ্ঠ অমিতসাহসী আমীরুল বহরও ছিলেন, যার নাম শ্রবণে দক্ষিণ ইউরোপীয় খৃস্টান নাবিকরা ভয়ে কম্পমান থাকতো। 'উরুজের শবদেহ তাঁর ভাবগম্ভীর চেহারার দরুন সমস্ত শহীদের মধ্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিলো। তাঁর হস্তে ছিলো এমন এক তরবারি, যা স্পেনের मुसलमानों প্রাণ রক্ষা করেছিলো—যার চমক দেখে খৃস্টান বীর পাহলোয়ানরাও থরথর করে কাঁপতো।
আমীরুল বহর 'উরূজ পঁয়তাল্লিশ বছর বয়ক্রমে শাহাদত বরণ করেন। ইসলামের এই বীর সন্তান দশাসই গাঁট্টাগোঁট্টা সুপুরুষ ছিলেন। শ্মশ্রু ও শিরকেশ লোহিতবরণ। তীক্ষ্ণ, উজ্জ্বল ও সন্ধানী চোখ দুটি তাঁর চিত্তচাঞ্চল্যের পরিচায়ক। নাসিকা দীর্ঘকায় ও উন্নত। গৌর-বর্ণের নূরানী চেহারা।
এই খ্যাতনামা বীর আমীরুল বহর আদৌ রক্তপিপাসু ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন কোমলপ্রাণ দয়ালু লোক। তবে যুদ্ধের ময়দানে তিনি সিংহের মতো গর্জন করতেন। তিনি ইসলামের ইতিহাসে এমন উজ্জ্বল কারনামা রেখে গেছেন, যার বিকিরণ মুসলিম নৌ-ইতিহাসের পত্রে পত্রে দীপ্তিমান।
সেনানায়ক 'উরূজ তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে স্বীয় দুঃসাহসী বীর শিষ্য কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে রেখে যান। তিনিও ইসলামের নৌ-ইতিহাসে এমন কতক নিদর্শন রেখে গেছেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম জাতির রাজপথ বা ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করবে। বিশ্ব তাঁকে খায়রুদ্দীন পাশা বারবারোসা-ই আ'জম নামে স্মরণ করে থাকে। আজো তুর্কী নৌবহরগুলো সমুদ্রযাত্রাকালে বেকোশ নামক স্থানে গোল্ডেন হর্নের দারাদানিয়ালে খায়রুদ্দীন পাশার সমাধি পানে নৌ-সালামের তোপ দেগে অগ্রসর হয়।
খায়রুদ্দীন পাশার চরিতামৃত সামনে আলোচিত হবে। একটু চিন্তা করে দেখো, 'উরূজ ও খায়রুদ্দীন পাশা তোমাদের মতোই নওজওয়ান ছিলেন। তাঁরা তাঁদের যিন্দিগীকে ইসলামের পানে কতখানি উৎসর্গ করেছিলেন? দুই ভ্রাতাই স্পেনের লাখো নির্বাসিত মজলুম মুসলমানকে উদ্ধার করেছিলেন। তাঁদের নিরাপত্তাকল্পে স্বীয় জীবন পর্যন্ত বাজি রেখেছিলেন। এমনকি সহোদর ইলিয়াসকেও এই উদ্দেশ্যে শহীদ করিয়েছিলেন।
অথচ ইসলামী ইতিহাসে এই যুগটি ছিলো মুসলিম রাজ-রাজড়াদের স্বার্থপরতার যুগ। তাঁরা তাঁদের স্পেন-বিতাড়িত মুসলিম ভাইদের এতটুকু সাহায্য করতেও প্রস্তুত ছিলেন না। ইসলামী ইতিহাসের এই করুণ কাহিনী তোমরা বড় হয়ে অধ্যয়ন করবে।
'উরুজ ও খায়রুদ্দীন ভ্রাতৃযুগল খৃস্টান বংশোদ্ভূত ছিলেন। ইসলাম তাদের অন্তঃকরণে এমন উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিলো, যা অনেক সনাতন মুসলমানের মধ্যেও অবশিষ্ট ছিলো না।
বস্তুত ইসলামী শিক্ষার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে তার পোষ্যপুত্রদের মধ্যে বীরত্ব, সাহসিকতা ও বীর্যবত্তার সৃষ্টি করে। তোমরা ইসলামী ইতিহাসে এরূপ অনেক ব্যক্তিত্বের কথাই অধ্যয়ন করবে।
চেষ্টা করলে তোমরাও 'উরুজ ও খায়রুদ্দীন পাশার মতো মুসলিম নৌ-ইতিহাসে অনেক উজ্জ্বল কীর্তি রেখে যেতে পারবে। আল্লাহ্ তোমাদের সাহায্য করুন!
আল্লাহ্ তখনই সাহায্য করবেন, যখন আমরা-তোমরা প্রাণান্ত চেষ্টা করবো এবং বিশ্বমাঝে স্বীয় কর্মকাণ্ডের স্বাক্ষর রেখে যাবো। অন্যথায় দুনিয়ায় আমাদের আগমন উদ্দেশ্যই নিরর্থক হয়ে যাবে। আল্লাহ্ আমাদের দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন ইসলামের 'আজমত ও তারাক্কীর নিমিত্ত। তাই এ কাজে আমাদের প্রাণপাত করতে হলেও দ্বিধা করা অনুচিত।
📄 ’আমীরুল বহর খায়রুদ্দীন পাশা
আমীরুল বহর খায়রুদ্দীন পাশার জন্যেই ইতিহাসে বারবারোসা বংশের এতো প্রসিদ্ধি। সুলতান মুহাম্মদ ছানী গ্রীক দ্বীপপুঞ্জের আইউবিয়া জয় করে সেখানে এ্যাডমিরাল ইয়াকুবকে নিয়োগ করেন। এ্যাডমিরাল ইয়াকুবের দু'জন প্রতিশ্রুতিশীল পুত্র ছিলো। 'উরুজ ও খায়রুদ্দীন পাশা। খায়রুদ্দীন পাশা তাঁর অসাধারণ যোগ্যতার দরুন আমীরুল বহর বারবারোসা লাল দাড়িওয়ালা নামে সুবিখ্যাত। তিনি প্রথমদিকে কয়েকটি জাহাজ নিয়ে ভূমধ্যসাগরের বাণিজ্যতরীতে চড়াও হতেন।
ক্রমে ক্রমে তিনি আফ্রিকার উপকূলভাগে হামলা শুরু করেন। এক পর্যায়ে আলজেরিয়া আক্রমণ করে আলজেরিয়ার শহর ও তাঁর আশপাশ দখল করেন। কিন্তু খায়রুদ্দীন পাশা যখন দেখলেন যে, তিনি তাঁর এই রাজ্য কায়েম রাখতে পারবেন না, তখন তুর্কী সুলতান সালীমের সাম্রাজ্যভুক্ত হওয়ার দরখাস্ত করেন। এ হচ্ছে নয়শ' একচল্লিশ হিজরীর ঘটনা। তখন স্পেনের মজলুম মুসলমানদের ওপর সেখানকার খৃস্টান সরকার চরম অত্যাচার চালাচ্ছিলো। খায়রুদ্দীন পাশা তাঁর নৌবহর দ্বারা হাযার হাযার মুসলমানকে স্পেন থেকে আলজেরিয়া পৌঁছে দেন।
সুলতান সুলায়মান তুরস্কে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর খায়রুদ্দীন পাশাকে 'উছমানীয় নৌ-বিভাগের আমীরুল বহর নিযুক্ত করেন। খায়রুদ্দীন পাশা সম্রাট চার্লসের বিশাল নৌবহরের ওপর হামলা চালান এবং চার্লসের বিখ্যাত নৌ-সেনাপতি এনড্রিয়া ডোরীয়া অধিকৃত কোরন পেট্রাস ও অন্যান্য উপকূলীয় শহর পুনরুদ্ধার করে ইটালীর উপকূল আক্রমণ করেন।
অতঃপর সুলায়মান-ই-আ'জমের নির্দেশক্রমে তিনি উত্তর আফ্রিকার বিখ্যাত শহর ও বন্দর তিউনিস দখল করে আলজিরিয়ার অন্তর্ভুক্ত করেন। কিন্তু তিউনিসের সুলতান হাসান সম্রাট চার্লসের সাহায্য প্রার্থনা করলে চার্লস ত্রিশ হাযার সৈন্যসহ পাঁচশ' জাহাজের একটি নৌবহর নিয়ে তিউনিস চড়াও করেন। খায়রুদ্দীন পাশা পরাস্ত ও তিউনিস ত্যাগে বাধ্য হন।
চার্লস বিজয়ীবেশে তিউনিস প্রবেশ করে मुसलमानों ওপর নৃশংস ধ্বংসযজ্ঞ চালান। তিনি ত্রিশ হাযার মুসলিম নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধকে হত্যা করেন এবং জোরপূর্বক খৃস্টান বানান।
তিউনিস পতনের পর তুরস্ক ও ফ্রান্সের মধ্যে এক নৌচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিলো প্রয়োজনকালে পরস্পরকে সাহায্য করা। নয়শ' বিয়াল্লিশ হিজরীতে ফ্রান্স ও চার্লসের মধ্যে এক নৌযুদ্ধ সংঘটিত হয়।
সুলায়মান ফ্রান্সকে সাহায্য করেন। খায়রুদ্দীন পাশা তুর্কী নৌবহর নিয়ে চার্লসের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি কারফু দ্বীপ আক্রমণ ও অবরোধ করেন। অল্পদিনের মধ্যেই কারফু অধিকৃত হয়। অতঃপর ঈজীয়ান সাগরের সমগ্র দ্বীপমালা দখল করেন। এইসব দ্বীপাঞ্চল ভেনিসের কর্তৃত্বাধীন ছিলো। আর এখন থেকে তুর্কীদের শাসনভুক্ত হলো।
নয়শ' পঁয়তাল্লিশ হিজরীতে হাঙ্গেরী সম্রাট পোপ ফার্ডিন্যান্ড চার্লস ও জামহুরিয়া-ই-ভেনিসের সাথে মিলে তুরস্কের বিরুদ্ধে 'পবিত্র ঐক্য' গঠন করেন। ঐক্যজোটের সমন্বিত নৌবহর সংখ্যায় ও শক্তিতে তুর্কী নৌবহর অপেক্ষা অনেকগুণ বেশী ছিলো। চার্লসের প্রখ্যাতনামা নৌ-অধিনায়ক এনড্রিয়া ডোরীয়ার নির্দেশনায় প্রুসিয়া দ্বীপের সম্মুখে উভয় বাহিনীর মুকাবিলা হয়।
সেনানায়ক ডোরীয়ার উপচেপড়া প্রসিদ্ধি ও খৃস্টান নৌবহরের মিলিত শক্তিই খৃস্টানদের বিজয় সুনিশ্চিত করার পক্ষে যথেষ্ট মনে হচ্ছিলো। কিন্তু খায়রুদ্দীন পাশার প্রচণ্ড আঘাতে তাদের ঐক্যশক্তি ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে যায়। অধিকৃত নৌ-এলাকাও তাদের হাতছাড়া হয়। খায়রুদ্দীন পাশা সমগ্র দ্বীপমালাই তুর্কী সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।
আলজিরিয়ার ওপর খায়রুদ্দীন পাশার দখলদারী চার্লসের স্পেনীয় ও ইটালীয় অঞ্চলের জন্যে বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। তাই নয়শ' সাতচল্লিশ হিজরীতে চার্লস আলজিরিয়া অভিমুখে এক নৌবহর প্রেরণ করেন।
এই অভিযান সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। এর পরের বছর ফ্রান্স নাইস চুক্তি বাতিল করে পুনরায় চার্লসের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেন। ফ্রান্স তুর্কী নৌ-সাহায্যে নাইস নগর আক্রমণ ও দখল করেন।
ফ্রান্স তুর্কী নৌ-সাহায্যের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ টুলন বন্দর তুর্কীদের হাওয়ালা করেন।
নয়শ' একান্ন হিজরী থেকে নয়শ' তিপ্পান্ন হিজরী পর্যন্ত খায়রুদ্দীন পাশা অত্যন্ত বীরত্ব ও বিক্রমের সাথে ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন নৌশক্তির মুকাবিলা করেন। তুর্কী নৌবহরও শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি লাভ করে। নয়শ' তিপ্পান্ন হিজরীর শেষপাদে খায়রুদ্দীন পাশা ইন্তিকাল করেন। তিনি তাঁর বিস্ময়কর বীরত্ব, রণ-নৈপুণ্য ও দৃঢ়তা দ্বারা কেবল তুর্কী সাম্রাজ্যের নৌ-বিজয়ই বৃদ্ধি করেন নি, উপরন্তু ভূমধ্যসাগর, লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরেও তুর্কী নৌশক্তি শীর্ষে পৌছান। এমনকি ইউরোপের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী সম্রাট পঞ্চম চার্লসও এককভাবে তাঁর মুকাবিলা করতে ভয় পেতেন। খায়রুদ্দীন পাশা ছিলেন জন্মগত সৈনিক। তিনি সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের সাথে নির্ভয়ে খেলা করতেন।
স্বীয় সম্পদ ও সময়ের বৃহদংশই তিনি নৌবহর ও নৌবাহিনী সংগঠনে ব্যয় করতেন। এক কথায়, খায়রুদ্দীন পাশার উঠা-বসা, হাঁটা-চলা, খাওয়া-পরা, শোয়া-জাগা-সব কিছুই ছিলো নৌবহর গঠনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত।
আর একারণেই খায়রুদ্দীন পাশার মহত্ত্ব ও সুখ্যাতি ইসলামী ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।
আজো খায়রুদ্দীন পাশা বেকোশে তাঁর সমাধি মাঝে স্বস্তিতে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। সমুদ্রের উমিমালা চব্বিশ ঘন্টা বেকেশ্- তাশকে চুম্বন করছে।
খায়রুদ্দীন পাশা দেহত্যাগ করেন নব্বই বছর বয়ঃক্রমে। তিনি যদিও বেশী উঁচু-লম্বা ছিলেন না, কিন্তু খুবই সুশ্রী ও সুদর্শন ছিলেন।
নৌ-জীবন-যাপন হেতু তাঁর দেহাবয়ব সুঠাম ও সুগঠিত হয়েছিলো। দাড়ির কেশ ছিলো ঘন ও কুঞ্চিত। চোখ দুটি উজ্জ্বল, চমকদার ও বীরত্বব্যঞ্জক।
খায়রুদ্দীনের চেহারা থেকে এক বিশেষ ধরনের প্রতিপত্তি ঠিকরে পড়তো। সমুদ্র অভিযানে তাঁর দক্ষতা ছিলো অসাধারণ। শত্রুর ওপর এতো ত্বরিত ও তীব্র আক্রমণ চালাতেন যে, মুহূর্তে রাশি রাশি শত্রুসেনা ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতো।
বস্তুত খায়রুদ্দীন পাশা ছিলেন সমকালের অতুল্য ও অনন্য নৌ-অধিনায়ক। তিনি পরাজিত শত্রুর সাথে বিনম্র ও সদয় ব্যবহার করতেন। অধীনস্থ কর্মচারী ও সৈন্যদের সুখ-সুবিধার প্রতিও সর্বদা লক্ষ্য রাখতেন।
নৌযুদ্ধে তাঁর উৎসাহ ছিলো অদম্য ও দুর্নিবার। তাই জাহাজ নির্মাণ থেকে আরম্ভ করে সাধারণ মাঝি-মাল্লা ও খালাসীর কাজ পর্যন্ত স্বহস্তে আঞ্জাম দিতেন।
খায়রুদ্দীন পাশা ইসলামের সাচ্চা জাননিছার ও হিতাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। তাঁর চৌদ্দ বছরের নৌসৈনাপত্য ইসলামী ইতিহাসে চির-স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তুর্কী রাজত্বের অনেককাল পর্যন্ত তুর্কী নৌবহর যুদ্ধ যাত্রাকালে খায়রুদ্দীনের মাযারে ফাতিহা ও তোপদাগার মাধ্যমে সালামী দিয়ে গোল্ডেন হর্ন থেকে নোঙ্গর তুলতো।
সত্যই দুনিয়ায় শ্রম ও সাধনা সম্মান বয়ে আনে। তোমরাও সম্মান কুড়াতে চাইলে খায়রুদ্দীন পাশার মতো সমুদ্র-তরঙ্গের সাথে খেলতে শিখো।