📄 সাকালিয়া বিজয়ী আবুল আগলাব
আফ্রিকায় বনু আগলাব নামে এক প্রখ্যাতনামা রাজবংশ ছিলো। এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ইব্রাহীমুল আগলাব। বীরত্ব ও শৌর্যবীর্যের দরুন এই রাজবংশ ইসলামী ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন।
আবুল আগলাব এই বংশেরই এক স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি আফ্রিকীয় সরকার কর্তৃক আমীরুল বহর (অ্যাডমিরাল) ও গবর্নর নিযুক্ত হয়ে সাকালিয়া অভিমুখে গমন করছিলেন। পথিমধ্যে দৈবাৎ তাঁর জাহাজখানি উত্তাল তরঙ্গাভিঘাতে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। অগত্যা তিনি যানান্তরে আরোহণ করেন।
এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার পরই তাঁর নৌযানটি রোমীয় নৌদস্যুর কবলে পড়ে। নৌদস্যুরা তাঁর নৌযানে অগ্নি-সংযোগ করতে চাইলে তিনি নৈপুণ্যের সাথে তা প্রতিহত করেন। রোমীয় নৌদস্যুরা কোনো মতে প্রাণ নিয়ে পলায়ন করলো। আবুল আগলাবের নৌবহর সগৌরবে বলরাম পৌঁছে।
আবুল আগলাব অতি বুদ্ধিমান, সুচতুর ও দুঃসাহসী নৌযোদ্ধা ছিলেন। তিনি সাকালিয়ার শাসনদণ্ড সংহত করেই নৌশক্তির প্রতি মনোনিবেশ করেন। কারণ, তিনি আগমন-পথেই রোমান নৌশক্তি সম্পর্কে জ্ঞাত হয়েছিলেন। তাই সর্বাগ্রে নৌ-ডিপার্টমেন্টের পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন।
আবুল আগলাব ভূমধ্যসাগরের সবগুলো দ্বীপ দখল করে মুসলিম শাসনভুক্ত করার সঙ্কল্প করলেন এবং তাঁর আশুব্যবস্থা হিসাবে আফ্রিকা ও সাকালিয়ার মধ্যবর্তী দ্বীপগুলোকে কব্যা করে আফ্রিকা সাকালিয়ার যোগাযোগ পথটি নিষ্কণ্টক করতে চাইলেন। যাতে উভয় দেশের যোগাযোগ যথারীতি চালু ও সুগম থাকে।
আবুল আগলাব সর্বপ্রথম এক বিশাল নৌবহর তৈয়ার করে রোমান নৌবহরের পশ্চাদ্ধাবনে প্রেরণ করেন। কেননা, ইতিপূর্বে ওই রোমীয় নৌবহর কয়েক দফা হামলা চালিয়ে মুসলিম নৌ-বহরের যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করেছিলো।
আবুল আগলাব স্বয়ং মুসলিম নৌবহরকে কমাণ্ড দেন। মুসলিম নৌবহর সুদৃঢ়, সুগঠিত ও সমরোপকরণে সুসজ্জিত ছিলো। মুসলিম নৌবহর রোমান নৌবহরের ওপর অনলবর্ষণ শুরু করে। রোমান নৌবহর প্রতিরোধ শক্তি রহিত হয়ে আত্মসমর্পণ করে। এইভাবে মুসলিম নৌবহর স্বীয় স্থিতাবস্থায় ফিরে আসে।
অতঃপর আবুল আগলাব স্বীয় পরিকল্পনা অনুসারে ভূমধ্যসাগরের দ্বীপগুলোর প্রতি মনোযোগ দেন। এই দ্বীপপুঞ্জের প্রথম দ্বীপটি ছিলো কাওসারা। এটি আফ্রিকা ও সাকালিয়ার মাঝখানে অবস্থিত। মুসলিম নৌবহর এটি পদানত করে। আরেকবার রোমান নৌবহর মুসলিম নৌবহরের মুখোমুখি হলে মুসলিম নৌবহর আচমকা হামলা চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করলো। রোমান নৌবহর মুসলিম দখলে আসলো।
কাওসারা বিজয়ের পর আবুল আগলাব আরো কয়েকটি দ্বীপাঞ্চল দখল করলেন। মুসলিম নৌবহর তার ঝাণ্ডা উড়াতে উড়াতে ভূমধ্য-সাগরে চক্কর দিয়ে বেড়াচ্ছিলো আর রোমান নৌবহর তীরে তীরে লুকিয়ে ফিরছিলো।
এবার আবুল আগলাব সাকালিয়ার অভ্যন্তর জয়ে মনঃসংযোগ করেন। গোটা সাকালিয়া ও সাকালিয়ার সমুদয় নৌবন্দর مسلمانوں করগত হলো। ভূমধ্যসাগর সম্পূর্ণ রোমান নৌমুক্ত হলো। তাদের সাধারণ নৌযানগুলোও মুসলমানরা পাকড়াও করলেন।
আবুল আগলাব এই নৌ-অভিযান ব্যতীত সাকালিয়ার অভ্যন্তর ভাগেও সৈন্য চালনা শুরু করেন। দু'শ' একুশ হিজরীতে ইটনার আগ্নেয়গিরি পর্যন্ত মুসলিম সেনাদল গিয়ে পৌঁছেন। তাঁরা কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ দখল করলেন। অতঃপর কাসরিয়ানা অভিযানে রওয়ানা হন। সগৌরবে কার্সিয়ানাও হস্তগত করলেন।
কাস্ট্রিয়ানা বিজয়ের পর জাফলুষী অবরোধ শুরু হয়। জাফলুযী ছিলো সাকালিয়ার এক উপকূলীয় শহর। মুসলিম বাহিনী উভয় দিক থেকে অর্থাৎ স্থল বাহিনী ও নৌবাহিনী একসাথে হামলা করেন। রোমান সরকার কনস্টান্টিনোপল থেকে এক বিরাট নৌবহরের মদদ তলব করে। উভয় পক্ষে প্রবল যুদ্ধ আরম্ভ হয়।
ইত্যবসরে আফ্রিকার স্বনামধন্য অধিনায়ক যিয়াদাতুল্লাহ ইব্ন্ ইব্রাহীম ইহধাম ত্যাগ করেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ শুধু আফ্রিকাই নয়, সাকালিয়ার মুসলমানদের ওপরও বজ্রপাত ঘটায়। মুসলিম সেনাদলে শোকের কালোছায়া নেমে আসে। তাঁরা যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে রাজধানীতে ফিরে আসেন।
যিয়াদাতুল্লাহ একুশ বছর সাত মাস রাজত্ব করেন। তিনি ছিলেন সমকালের শ্রেষ্ঠতম রাষ্ট্রনায়কদের অন্যতম। তিনি আফ্রিকার শাসন ব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত করে সাকালিয়া বিজয়ে আত্মনিয়োগ করেন।
যিয়াদাতুল্লাহ্ পর তদীয় ভ্রাতা আবু 'আক্কাল আগলাব আফ্রিকার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। শুরুতে আবু 'আক্কালকে রাজ্যময় বিদ্রোহ ও গোলযোগের সম্মুখীন হতে হয়। আফ্রিকা ও সাকালিয়া দু'জাগার অবস্থাই সঙ্গীন হয়ে পড়েছিলো।
কিন্তু আবু 'আক্কাল অতি দ্রুত আফ্রিকার অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনেন। অতঃপর দু'শ' চব্বিশ হিজরীতে এক বিরাট সৈন্যদল সাকালিয়ায় প্রেরণ করেন। সৈন্য পাঠানোর খবর পাওয়া মাত্রই সমগ্র সাকালিয়া শান্ত হয়ে যায়। সাকালিয়ার দুর্গে দুর্গে ইসলামী নিশান উড়তে থাকে।
আবুল আগলাব পুনরায় গোটা সাকালিয়ার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা লাভ করলেন। এবার তিনি সাকালিয়ার বাইরের দিকে স্বীয় প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। দক্ষিণ ইটালীর কোনো এক রাজনৈতিক ব্যাপারে তাঁর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ালো। তিনি নেপল্স সরকারের সাহায্যার্থ স্বীয় নৌবহরও প্রেরণ করেন। তাঁরা বীরত্ব ও নৈপুণ্যের সাথে নেপল্সকে সাহায্য করেন।
এরপর আবুল আগলাব সাকালিয়ার অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনকার্যে অভিনিবেশ করেন। স্বল্প সময়ের মধ্যেই সাকালিয়া বিপুল উন্নতি লাভ করে।
দু'বছর সাত মাস রাজত্ব করার পর আবু 'আক্কাল ইন্তিকাল করেন। তদস্থলে মুহাম্মদ ইব্ন আগলাব আফ্রিকার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তিনিও আবুল আগলাবকে সাকালিয়ার গবর্নর ও আমীরুল বহর পদে বহাল রাখেন।
আবুল আগলাব সাকালিয়াকে দৃঢ়ভাবে কব্জা করলেন। সাকা-লিয়ার তীরবর্তী শহরে নানাবিধ নৌ-ছাউনি স্থাপন করেন। নৌবহরকে আরো শক্তসমর্থ করেন। দু'শ' ছত্রিশ হিজরীতে আবুল আগলাব ওফাত পান। আবুল আগলাব সমসাময়িককালের শ্রেষ্ঠতম নৌ-অধ্যক্ষ ছিলেন। সুদীর্ঘ ষোড়শ বছর কাল তিনি সগৌরবে সাকালিয়া শাসন করেন।
আবুল আগলাবের শাসনকাল সাকালিয়ার সর্বোত্তম কাল বলে সুবিদিত। তাঁর সংগঠিত নৌবাহিনী ও শাসনব্যবস্থা সর্বদা সুষ্ঠুভাবে কার্যকর ছিলো।
আবুল আগলাবের বীরত্ব, শৌর্যবীর্য, উচ্চাভিলাষ ও দৃঢ়তা সত্যই অনুকরণযোগ্য। মুসলিম নৌবাহিনী সংগঠন তাঁর প্রতিটি লম্হ্য ব্যয়িত।
📄 আমীরুল বহর ‘উবায়দুল্লাহ আলমাহ্দুনী
আগলাবীদের পর উত্তর আফ্রিকা ও সাকালিয়ার শাসনদণ্ড ফাতিমীদের হস্তগত হয়। ফাতিমীদের বিরুদ্ধে সাকালিয়ায় কয়েক দফা বিদ্রোহ ও শোরহাঙ্গামা হলেও শেষ পর্যন্ত ফাতিমীদেরই ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
ফাতিমীদের আমীরুল বহরগণ তাঁদের অতুলনীয় সাহসিকতা ও অত্যুজ্জ্বল কীতিকান্ডের দরুন মুসলিম ইতিহাসে সুবিখ্যাত হয়ে আছেন। তাঁদের সবার জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা এই স্বল্পায়ত পুস্তকে সম্ভবপর নয়। তোমরা বড় হয়ে বড় বড় গ্রন্থ পড়ে তা জানতে পারবে। আমরা এখানে শুধু ফাতিমীয় মঞ্জুর আমীরুল বহর সালিম ইব্ন আবী রাশিদের বৃত্তান্ত বর্ণনা করবো।
সালিম ইব্ন আবী রাশিদ ফাতিনী তিনশ' পাঁচ হিজরীতে সাকালিয়ার গভর্নর হয়ে আসেন। তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার দ্বারা সাকালিয়ায় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করলেন। সাকালিয়ায় শাসন-শৃংখলা কায়েম করতে তাঁর আটটি বছর অতিবাহিত হয়। এরপর তিনি সাকালি-য়ার পোতাশ্রয় ও জাহাজ নির্মাণ কারখানাসমূহ বিন্যস্ত করেন।
এবার তিনি ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন দ্বীপ করতলগত করেন এবং এই ব্যাপদেশে তাঁকে রোমক ও গ্রীক নৌবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হয়।
তিনশ' দশ হিজরীতে ফাতিমিগণ ইটালীর উপকূল অঞ্চলসমূহে নবরূপে নৌহামলা চালান। এই নৌহামলার সূত্রপাত হয় উত্তর আফ্রিকা থেকে। অভিযানের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন সাকালিয়ার গভর্নর সালিম ইব্ন আবী রাশিদ।
অভিযান পরিচালনা করেন কাওয়ারিব নামক জনৈক কুশলী নৌসেনানী। এরা ইটালীর উপকূলভাগে পুনরায় মুসলিম বিজয় নিশান উত্তোলন করেন। ইটালীর বেশ ক'টি বৃহৎ অঞ্চল পদানত হয়।
পরবর্তী বছর মাস'উদ নামক জনৈক নৌসেনাপতির অধীনে ইটালীতে এক বিরাট নৌবহর প্রেরিত হয়। এই নৌবহরের কুড়িটি রণপোত ছিল। ইটালীর বিখ্যাত আগাছি শহর আক্রমণ করে মাস'উদ বিরাট নৌবিজয় অর্জন করেন।
এই সফল অভিযানের পর মাস'উদ তাঁর নৌবহরসহ উত্তর আফ্রিকার মাহ্দীয়ায় গমন করেন।
মাস'উদের এই নিদারুণ সফলতায় ইটালীতে ফাতিমী রাজত্বের এক শানদার ভবিষ্যৎ ঝিলিক দিয়ে ওঠে। সাকালিয়ার তরফ থেকে এক যবরদস্ত নৌবহর তৈয়ার করা হয়। দু'জন খ্যাতনামা আমীরুল বহরের হাতে এই নৌবহরের নেতৃত্ব ন্যস্ত ছিলো। তাঁদের একজন ছিলেন আমীর সালিম এবং অপরজন আমীর জা'ফর।
ইটালীর সাগর তীরে নেমে তাঁরা দু'জনেই বিভিন্ন দিক থেকে সৈন্য চালনা শুরু করেন। ইটালীর মহর বারীসানা শহর দখল করে তার সর্বত্র ইসলামী নিশান উড়িয়ে দেন।
আমীর জা'ফর তাঁর বাহিনী দ্বারা ইটালীর ওয়ারী নগর দখল করেন। ওয়ারীর গবর্নর ও কয়েকজন বড় ফৌজী অফিসার গ্রেফতার হন। ফাতিমী নৌসেনারা ইটালীর ওয়ারী নগর থেকে বিপুল পরিমাণ 'মালে গনীমত' লাভ করেন।
এই ফৌজী সাফল্য ফাতিমী নৌবহরে এক নতুন আশার সঞ্চার করে। তিনশ' পনেরো হিজরীতে সারিব নামক নৌসেনাপতির নেতৃত্বে এক নৌঅভিযানের প্রস্তুতি চলে। তিনি চুয়াল্লিশটি রণপোত দ্বারা দক্ষিণ ইটালীর বিখ্যাত শহর ও বন্দর টরেন্টো আক্রমণ করে পদানত করেন। এই সাফল্যের পর সারিব তাঁর নৌবহরসহ সাকালিয়া ফিরে আসেন।
পর বছর তিনি সাকালিয়া থেকে নতুনভাবে নৌঅভিযান শুরু করেন। ইটালীর উপকূল থেকে রোমক ও গ্রীক নৌবহর গ্রেফতার করে সাকালিয়ায় নিয়ে আসেন। কিছুদিন বিশ্রাম করার পর পুনরায় তিনি ইটালী আক্রমণ করে এক নতুন শহর অধিকার করেন।
তিনশ' সতেরো হিজরীতে সারিব রোমকদের সাথে নৌযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। সারিবের হাতে ছিলো মাত্র চারটি রণতরী। আর রোমান পক্ষে ছিলো তার দ্বিগুণ নৌসেনা। উভয় দলই প্রতিপক্ষের রণতরী ঘায়েল করার প্রাণান্ত প্রয়াস চালায়। কিন্তু বিজয় ও সাফল্য ছিলো সারিবের ললাট-লিখন। তাই সাফল্যের জয়মাল্য সারিবেরই কণ্ঠলগ্ন হলো।
এই বিজয়ের পর সারিব ইটালীস্থ তারমূলা নগরে উপনীত হন। তারমূলা নগর ইটালীর পূর্ব উপকূলে অবস্থিত। সারিব এই বিখ্যাত শহরটি অধিকার করে প্রচুর মালে গনীমতসহ সাকালিয়া প্রত্যাবর্তন করেন।
দুঃসাহসী ফাতিমী জওয়ানরা তিনশ' দশ হিজরী থেকে তিনশ' সতেরো হিজরী পর্যন্ত উপর্যুপরি নৌ-হামলা চালিয়ে ইটালীতে এক বিভীষিকার সৃষ্টি করলেন। ফলে ইটালী সরকার কর প্রদানে সম্মত হয়ে ফাতিমীদের সাথে সন্ধি করতে বাধ্য হন। অতঃপর মুসলিম বাহিনী ইটালী ত্যাগ করেন আর ইটালী সরকার যথারীতি আফ্রিকায় কর পাঠাতে থাকেন।
ইটালীর সাথে সন্ধি হওয়ার পর 'উবায়দুল্লাহ আলমাহ্দী ফ্রান্স ও ইটালীর সীমান্ত শহর জেনোয়ার দিকে দৃষ্টিপাত করেন। তিনশ' বাইশ হিজরীতে 'উবায়দুল্লাহ আলমাহ্দী প্রখ্যাত নৌসেনানায়ক ইয়াকুব ইবন ইসহাকের নেতৃত্বে এক প্রবল নৌবহর প্রেরণ করেন। নৌবহরটি জেনোয়ার সুদৃঢ় নৌ-রক্ষাব্যবস্থা দেখে ওয়াপস চলে আসে।
ইউরোপে মুসলিম বিজয়স্রোত জেনোয়ার প্রাচীরগাত্র স্পর্শ করতেই 'উবায়দুল্লাহ আলমাহ্দী তাঁর আরব্ধ কার্যক্রম ভবিষ্যৎ বংশধরদের ওপর ন্যস্ত করে তিনশ' বাইশ হিজরীতে ইহলোক ত্যাগ করেন।
'উবায়দুল্লাহ আলমাহ্দী ফাতিমী রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা এবং ফাতিমী বংশের একজন অমিততেজা পরাক্রান্ত আমীরুল বহর ছিলেন। তিনি তাঁর নৌবহরের সাহায্যে ভূমধ্যসাগরকে করায়ত্ত করেছিলেন। আফ্রিকীয় ও ইউরোপীয় উপকূল ছিলো তাঁর নৌ-ক্রীড়াকেন্দ্র।
'উবায়দুল্লাহ আলমাহ্দী কেবল একজন নৌ-সেনাধ্যক্ষই ছিলেন না, রাজনীতি সম্পর্কেও তিনি ছিলেন সম্যক ওয়াকিফহাল। তিনি তাঁর বাহুবল ও বুদ্ধি-কৌশল দ্বারা অল্প দিনের মধ্যে অর্থাৎ মাত্র চব্বিশ বছর দশ মাসের মধ্যেই আফ্রিকা, ত্রিপোলী, বারকা ও সাকালিয়া জয় করেন। অতঃপর স্বীয় নৌ-দক্ষতা বলে ইটালীকে তাঁর বশ্যতা স্বীকারেও বাধ্য করেন।
ইটালীর পর তিনি ফ্রান্সের দিকে তাকান। কিন্তু পরপারের ডাক তাঁর সে আশা পূরণ হতে দেয়নি।
'উবায়দুল্লাহ আলমাহ্দীর নৌ-ক্রিয়াকাণ্ড ও বীরত্বব্যঞ্জক ঘটনাবলী থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। সাথে সাথে একথাও জেনে রাখা উচিত যে, দুনিয়ার ইয্যত কেবল সেইসব জাতিরই প্রাপ্য, যাঁরা আল্লাহর নিয়ামতরাজির কদর করতে জানেন এবং যাঁরা পানিতে ও ডাঙ্গায় স্বীয় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সম্মান লাভে সচেষ্ট হন।
📄 ’উছমানীয় রাজত্বে মুসলিম নৌবহর
যেসব ইউরোপীয় জাতি প্রাচ্যের সাথে সওদাগরী ও নৌ-সম্পর্ক স্থাপন করেন, ভেনিস ও জেনোয়াবাসীরা ছিলেন তাদের পুরোভাগে। এই দুটি দেশের দুরন্ত ও দুঃসাহসী নাবিকরাই ইউরোপীয়দেরকে জাহাজ চালনা ও জাহাজ নির্মাণ শিক্ষা দেন।
জেনোয়া ও ভেনিসবাসীদের সাথে তুর্কীদের সম্পর্ক ছিলো খুব সৌহার্দ্যপূর্ণ। তাই ইউরোপীয় নৃপতিরা 'উছমানীয় রাজ্য আক্রমণ করলে জেনোয়া ও ভেনিসের রণতরীর সাহায্যে তা প্রতিহত করা হতো।
কনস্টান্টিনোপল বিজয়ী সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ-এর 'আমল পর্যন্ত 'উছমানীয় সালতানাতের যে ক'জন রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন, তাঁরা সকলেই প্রয়োজনকালে ভেনিস ও জেনোয়ার নৌবহরগুলো কাজে লাগাতেন। কিন্তু সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ (বিজয়ী) অনুভব করলেন, কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের জন্য তুর্কীদের একটি স্বতন্ত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নৌবহর থাকা আবশ্যক এবং এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েই তিনি 'উছমানীয় নৌবহরের ভিত্তি স্থাপন করেন।
মুহাম্মদ ফাতিহ্ কনস্টান্টিনোপল অবরোধের সময় পাঁচ মাইল ভূমির ওপর দিয়ে জাহাজ চালিয়েছিলেন। সে কীতিকথা তোমরা মুহাম্মদ ফাতিহ্-এর নৌ-সেনাপত্যের আলোচনায় অবগত হতে পারবে। আহা! তোমাদের মধ্যেও যদি এমন কোনো নৌ-সেনাপতি বা নাবিকের জন্ম হতো!
কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পর মুহাম্মদ ফাতিহ্ তার রক্ষণাবেক্ষণ নিমিত্ত তুর্কী নৌবাহিনীকে আরো উন্নত ও পুনর্গঠিত করা আবশ্যক মনে করেন। তাই ভূমধ্যসাগরে তাদের প্রশিক্ষণ দান করে তুর্কী নৌবহরকে বলিষ্ঠতর করে তোলেন।
এরপর তিনি জেনোয়া জয়ের সঙ্কল্প করেন। চৌদ্দশ' পঁচাত্তর খৃস্টাব্দে এক সুবর্ণ সুযোগ এসে উপস্থিত হয়। ক্রীমীয়ার খানদের মধ্যে বহুদিন থেকেই গৃহযুদ্ধ চলে আসছিলো। জনৈক খান একদিকে এবং অন্যরা অপর জেনোয়াবাসীর সপক্ষে। জেনোয়া ক্রীমীয়ার ইয়াফা শহর দখল করে নিয়েছিলো। তাই অপর দল 'উছমানীয়দের সাহায্যপ্রার্থী হলো।
সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ্ কাপ্তান আহমদের সৈনাপত্যে এক বিরাট নৌবহর পাঠিয়ে ইয়াফা দখল করলেন। তিনি গ্রীক উপকূলীয় বন্দরগুলোও করায়ত্ত করলেন।
মুহাম্মদ ফাতিহ্ তুর্কী নৌবহরের গোড়া পত্তন করেছিলেন। তিনি যখন কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেন, তখন তাঁর সাথে ত্রিশটি রণপোতবিশিষ্ট এক নৌবহরও ছিলো। এই নৌবহরটি গোল্ডেন হর্নে তুর্কী আমীরুল বহর বোলু তুগলীর নৌসেনাপত্যে এক অসাধারণ কৃতিত্ব সর্বপ্রথম প্রদর্শন করেছিলো।
কনস্টান্টিনোপল জয় করার পর সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ্ তারাবিযূন, সানিউপ, কাফা, ইযাফ প্রভৃতি নামকরা কূলভূমিগুলো পদানত করেন। মারমোরা সাগর ও কৃষ্ণসাগরও তুর্কী অধিকারে আসে।
মোট কথা, তুর্কী নৌবাহিনী তখন উন্নতির উচ্চমার্গে আরোহণ করেছিলো। ভূমধ্যসাগর, মারমোরা সাগর ও কৃষ্ণসাগরে তাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই অবশিষ্ট ছিলো না। বিশেষ করে সুলায়মান-ই আ'জম কানুনীর সময় খায়রুদ্দীন পাশা 'উছমানীয় নৌবাহিনীকে দৃঢ়ভাবে সুসংহত করেন। খায়রুদ্দীন পাশা বারবারোসা ছিলেন দুনিয়ার একজন প্রথম সারির নৌসেনাধ্যক্ষ।
এখনো তুর্কীদের মধ্যে খায়রুদ্দীন বারবারোসার নাম নিতান্ত শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়ে থাকে। কারণ, তিনি তাঁর অসীম ক্ষমতা বলে 'উছমানীয় নৌবহরকে সমুন্নতি দান করেছিলেন। ইউরোপীয় নৌবহরগুলো 'উছমানীয় নৌবহরের মুকাবিলায় অক্ষম ও অপারক হয়ে পড়েছিলো। ইউরোপীয় খৃস্টান নৌবাহিনীর সম্মিলিত শক্তিও বারবারোসার নৌবহরকে ঠেকাতে পারতো না। খ্যাতনামা খৃস্টান নৌ-অধিনায়ক এন্ড্রিয়া ডোরীয়া খায়রুদ্দীন পাশার মুখোমুখি হতে রীতিমতো ভয় পেতো।
এখানে আমরা কয়েকজন তুর্কী আমীরুল বহরের নামোল্লেখ করছি। সামনে তাঁদের কিছু জীবনচিত্রও পেশ করবো। তাঁরা হচ্ছেনঃ মুহাম্মদ ফাতিহ, খায়রুদ্দীন পাশা, তুরঙত পাশা, হাসান পাশা, পীরী রঈস পাশা, সাইয়িদী আলী ও সুলায়মান পাশা।
এখন এদের প্রত্যেকের কিছুটা কর্মকুশলতার আভাস দান করা হচ্ছে। এতে তোমরা 'উছমানীয় আমীরুল বহরদের ঐতিহাসিক কীতি- কলাপ সম্পর্কে অবহিত হতে পারবে। তাদের বীরত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষালাভ করতে পারবে।
'উছমানীয় রাজত্বে 'উছমানীয় আমীরুল বহরের খিতাব ছিলো কাপুদান পাশা। সাম্রাজ্যের সমুদয় নৌবহর তাঁর অধীন থাকতো। কনস্টান্টিনোপল ছিলো তাঁর সদর দফতর। 'উছমানীয় নৌবাহিনীর সকল কর্মকর্তা ও নাবিকরা ছিলো খৃস্টান নওজওয়ান। এরা সকলেই ছিলো সুলতানের দাসানুদাস।
ইসলামী শিক্ষা ও সাহচর্য তাদের এমনভাবে গড়ে তুলেছিলো যে, ষোড়শ শতকের গোটা ইউরোপবাসীই এদের প্রবল প্রতাপে তটস্থ হয়ে থাকতো। আমীরুল বহরদের নাম পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের গুণ-গরিমা ও সুখ্যাতি কেবল ইসলামী ইতিহাসই নয়, ইউরোপীয় নৌ-ইতিহাসেও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। 'উছমানীয় কাপুদান পাশারা বিরাট বিরাট বিজয়াভিযান দ্বারা 'উছমানীয় সাম্রাজ্যের অনেক বিস্তৃতি ঘটান। নৌ-বিজয় ছাড়া জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতেও তাঁরা বহু কৃতিত্বের পরিচয় দেন।
পীরী রঈস ভূমধ্য সাগর ও ঈজীয়ান সাগরের একটি মানচিত্র তৈয়ার করেন। তাতে স্রোতের গতিবেগ, বিভিন্ন স্থানের গভীরতা ও নৌ-বন্দরসমূহের প্রয়োজনীয় জ্ঞাতব্য লিপিবদ্ধ ছিলো।
অনুরূপভাবে সাইয়িদী আলী যাঁর জাহাজ প্রতিকূল আবহাওয়ার দরুন ভারতের উপকূলে এসে ঠেকেছিলো-খোরাসন, বেলুচিস্তান ও ইরান হয়ে স্থলপথে তুরস্ক পৌঁছেন। তিনি তাঁর ভ্রমণ কাহিনী লিখে জাতিকে অনেক মূল্যবান তথ্য উপহার দিয়েছেন। এছাড়া তিনি ভারত মহাসাগরের ওপর 'মুহীত' (বেষ্টনকারী) নামক একখানি তথ্যবহুল গ্রন্থও রচনা করেছেন।
ষোড়শ শতকের শেষ পাদে 'উছমানীয় নৌবাহিনীতে ধস নামতে শুরু করে। অতঃপর ক্রমান্বয়ে এই বাহিনী দুর্বলতর হয়ে পড়ে।
এর মূলীভূত কারণ ছিলো রাষ্ট্রীয় ভ্রান্তনীতি ও তার বুনিয়াদী গলদ। 'উছমানীয় নৌবাহিনীর চাকরি ছিলো খৃস্টান যুবকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তার পরিণাম ফল যতখানি খারাপ হওয়ার ততখানিই হয়েছে।
তিনশ' বছর পর সুলতান 'আবদুল 'আযীয খান তাঁর ব্যক্তিগত অভিরুচি ও উৎসাহবশত মুসলিম নৌবাহিনী পুনঃস্থাপনে উদ্যোগী হন। তিনি মুসলিম নৌবহরকে ইউরোপীয় সেরা নৌবহরের সমপর্যায়ে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু সুলতান 'আবদুল হামীদ খানের সময় ওইসব রণতরীর গোল্ডেন হর্ন থেকে বের হওয়ারও সুযোগ ঘটেনি। সেখানে দণ্ডায়মান অবস্থায়ই সেগুলোতে মরচে পড়তে থাকে।
📄 কনস্টান্টিনোপল বিজয়ী মুহাম্মাদ ফাতিহ্
মুহাম্মদ ফাতিহ্ ছিলেন সমকালীন প্রখ্যাত দিগ্বিজয়ী। তিনি কনস্টান্টিনোপলকে স্বীয় সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ইতোপূর্বে রোমক শাসিত এশীয় অঞ্চলসমূহ তুর্কীদের করায়ত্ত হয়েছিলো। কেবল কনস্টান্টিনোপলই তাঁদের অনধিকৃত ছিলো।
মুহাম্মদ ফাতিহ কনস্টান্টিনোপল আক্রমণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করছেন। ওদিকে কনস্টান্টিনোপলের শাসনকর্তা সম্রাট কনস্টান্টাইনও প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্থলবাহিনীর অভিযান সম্পর্কে তোমরা অন্যত্র জ্ঞাত হতে পারবে। এখানে আমরা মুহাম্মদ ফাতিহর নৌ-অভিযান সম্পর্কে আলোকপাত করবো।
কনস্টান্টিনোপল অবরোধকালে প্রথমেই নৌযুদ্ধ বেধে যায়। পাঁচটি রোমান জাহাজ কনস্টান্টিনোপলের উদ্দেশ্যে রসদ বয়ে আনছিলো। মারমোরা সাগর অতিক্রম করে সেগুলো বসফোরাস প্রণালীতে প্রবেশ করতেই 'উছমানীয় নৌবহর পথ রোধ করে দাঁড়ায়।
রসদবাহী জাহাজ বন্দরে ঢোকা মাত্রই তুর্কী নৌবহর তার ওপর হামলা চালায়। ওদিকে রোমান নৌবহরও প্রস্তর ও অনলবর্ষণ শুরু করে। তুর্কী নৌবহর ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। ফলে রোমান জাহাজগুলো বন্দরে পৌঁছে যায়।
মুহাম্মদ ফাতিহ, নৌযুদ্ধে তাঁর প্রথম পরাজয়ের কারণ নির্ণয়ে আত্মনিয়োগ করলেন। তিনি গভীর পর্যবেক্ষণ দ্বারা বুঝতে পারলেন যে, বসফোরাস প্রণালীর যে অংশে পানির গভীরতা বেশী, সে অংশে তুর্কী নৌবহরগুলো রোমক বাহিনীর মুকাবিলায় সফল হতে পারবে না। তাই তিনি তাঁর গরিষ্ঠসংখ্যক রণতরী বন্দরের অপর দিকে স্থানান্তর করার সঙ্কল্প করেন। সেদিকে পানির পরিমাণ ছিলো অপেক্ষাকৃত কম।
বস্তুত এ ছিলো এক অদ্ভুত ও আশ্চর্য কৌশল। মুহাম্মদ ফাতিহ্ ইস্পাতকঠিন সঙ্কল্পের এক অবিনশ্বর দৃষ্টান্ত। তিনি বসফোরাস ও কনস্টান্টিনোপল বন্দরের মধ্যে কাঠের তক্তার এক সড়ক তৈয়ার করেন। অতঃপর তাতে বেশ করে চবি ঢালেন। সড়কটি তৈলাক্ত ও পিচ্ছিল হওয়ার পর এক নিঝুম রাতে তার ওপর দিয়ে আশিটি নৌ-জাহাজ টেনে নেয়া হয়। ফলে সহসাই কনস্টান্টিনোপলের পতন ঘটে।
কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পর মুহাম্মদ ফাতিহ গ্রীক দ্বীপপুঞ্জের প্রতি নজর দেন। অনেকগুলো দ্বীপদেশ গ্রীকদের অধীনে ছিলো। তিনি যুদ্ধ করে সেগুেলো হস্তগত করেন। লেস্বস, লেমনস, সেফালোনিয়া প্রভৃতি তাঁরই অধিকৃত কতিপয় বিশিষ্ট দ্বীপভূমি।
ভেনিস তার নৌশক্তির ওপর অত্যন্ত গর্বিত ছিলো। অপরদিকে বলকান রাজ্যসমূহের ওপর তুর্কী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর এড্রিয়াটিক সাগর ও ঈজীয়ান সাগরে তাঁরা রণপোতসংখ্যা বাড়াতে লাগলেন।
মুহাম্মদ ফাতিহ্ তাঁর নৌবহরের সাহায্যে আলবানিয়া জয় করেন। এড্রিয়াটিক সাগরের উপকূল অঞ্চলেও তুর্কী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। তুর্কী ও ভেনিসের নৌযুদ্ধ ষোলো বছরকাল স্থায়ী হয়েছিলো।
ভেনিসের সমগ্র তীরভূমি তুর্কীদের অধিকারে আসে। ভেনিসের ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপসমূহও তাঁদের হস্তগত হয়।
ভেনিস একদল প্রতিরোধী ফৌজ গঠন করে। কিন্তু জনৈক তুর্কী আমীরুল বহর সামনে অগ্রসর হয়ে তাদের চরমভাবে পরাস্ত করেন।
ভেনিসের নৌশক্তি ভেঙ্গে যাওয়ার পরও ঈজীয়ান সাগরের রোডস দ্বীপটি তুর্কী নৌবহরের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। এই দ্বীপদেশ দেড়শ' বছর যাবৎ খৃস্টান শাসনে ছিলো। খৃস্টানরা সেখান থেকে সহজেই ‘উছমানীয় নৌ-জাহাজে হামলা চালাতো।
মুহাম্মদ ফাতিহ, রোডস দ্বীপ অধিকার আবশ্যক মনে করলেন। তিনি চৌদ্দশ' আশি খৃস্টাব্দ মঞ্জুর আমীরুল বহর মাসীহ্ পাশাকে এই অভিযানে প্রেরণ করেন। মাসীহ্ পাশা রোডস দ্বীপ অবরোধ করলেন।
অপরদিকে খৃস্টানরাও পূর্ণ প্রতিরোধে প্রস্তুত ছিলো। দীর্ঘকাল অবরোধের পর অবশেষে তুর্কীরা এক ব্যাপক আক্রমণ চালালেন। রোডস হারতে হারতে জিতে গেলো। তুর্কীদের এই ব্যর্থতা পঞ্চাশ বছর স্থায়ী হয়।
রোডস দ্বীপে মাসীহ্ পাশা পরাস্ত হলেও ওদিকে আহমদ কেদক ইটালীর মূল ভূখণ্ডে পা রাখতে সক্ষম হন। ইতোপূর্বে কোনো তুর্কী সেনাই এখানে কদম রাখতে পারেননি। তুর্কী বাহিনী ইটালীর প্রসিদ্ধ টরেন্টো বন্দর দখল করলেন।
এই বিজয়ের মাধ্যমে মুহাম্মদ ফাতিহ্ তুর্কীদের জন্যে ইটালী জয়ের পথ উন্মুক্ত করেন। তিনি গোটা ইটালী জয় করে রোমে হিলালী নিশান উড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ইত্যবসরে মৃত্যু এসে তাঁর এই হারজিতের পাল্লাপাল্লি চিরতরে থামিয়ে দিলো।