📘 সোনালী যুগের মুসলিম নৌশক্তি > 📄 ’আব্বাসীয় ‘আমলে মুসলিম নৌবহর

📄 ’আব্বাসীয় ‘আমলে মুসলিম নৌবহর


'আব্বাসীয় 'আমলে মুসলিম জয়যাত্রা কতকটা থিতিয়ে পড়েছিলো। কারণ, তখন মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি অত্যধিক বেড়ে গিয়েছিলো। মুসলিম দেশসমূহের নিরাপত্তা ও আইন-শৃংখলা বিধান করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছিলো। তাই দেশের নিরাপত্তা ও শাসন ব্যবস্থার প্রতিই তাঁদের সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ হয়ে পড়েছিলো।
কিন্তু এতদসত্ত্বেও তাঁরা মাঝে-মধ্যে স্থল ও নৌ-অভিযান চালিয়ে সাফল্য অর্জন করেছিলেন। এখানে তাঁদের কয়েকটি নৌ-অভিযান বৃত্তান্ত তুলে ধরা হলো।
'আব্বাসীয় 'আমলের সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা হচ্ছে 'সাকালিয়া' বিজয়। মামুনের রাজত্বকালে মুসলিম নৌবাহিনী 'সাকালিয়া' আক্রমণ করেন। 'সাকালিয়া' ইতোপূর্বে মুসলমানদের অধিকারে ছিলো। কিন্তু রোমকরা হামলা করে সেটি পুনরুদ্ধার করে। তখন 'সাকালিয়ার' শাসনকর্তা ছিলেন কনস্টান্টাইন। 'সাকালিয়ার' নৌ-অধিনায়ক ছিলেন ফেমী। ফেমী মুসলিম নৌবহরের ওপর কয়েকবার হামলা চালান। একবার রোম সম্রাট সেনানায়ক ফেমীর ওপর ভীষণভাবে রুষ্ট হন এবং তাঁকে গ্রেফতার করে মৃত্যুদণ্ড দিতে 'সাকালিয়ার' গবর্নরকে নির্দেশ দেন।
এতে ফেমীর বন্ধু-বান্ধব ও অনুরক্তরা দারুণ ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে গবর্নরের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়। ফেমী আফ্রিকা থেকে সাকালিয়া পেঁৗছে রাজধানী 'সারকাওসা' করায়ত্ত করেন।
সাকালিয়ার গভর্নর তাঁকে অপসারণ করার ফন্দি আঁটেন। কিন্তু পরাজিত হয়ে গ্রেফতার ও নিহত হন। ফেমী সাকালিয়ার স্বাধীন সম্রাট ঘোষিত হন।
এই সময় আমীর যিয়াদাতুল্লাহ মুসলিম নৌযুদ্ধে খুব প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। আমীর যিয়াদাতুল্লাহ আফ্রিকার শাসনকর্তা ছিলেন। আফ্রিকা থেকে তিনি আসাদ ইব্‌ন ফুরাতের নেতৃত্বে তিনশ' বারো হিজরীতে সাকালিয়ায় অভিযান চালান। ফেমীর শোচনীয় পরাজয় ঘটে। মুসলমানরা কয়েকটি দুর্গ দখল করেন। রোমকরা প্রতারণার আশ্রয় নিলে মুসলমানরা তা দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করেন।
মুসলিম নৌবহর 'সারকাওসা' অবরোধ করে অল্প দিনের মধ্যেই তার পতন ঘটায়। 'সারকাওসা' বিজয়ের পর তার পার্শ্ববর্তী এলাকা-সমূহ অধিকার করে। এইভাবে স্বল্পকালের মধ্যেই গোটা 'সাকালিয়া'র ওপর মুসলিম প্রভুত্ব কায়েম হয়। ভূমধ্যসাগরে মুসলিম নৌবহরের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পায়।
'সাকালিয়া' বিজয়ের পর মুসলিম নৌবাহিনী অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপও অধিকার করেন।
দু'শ' আটাশ হিজরীতে খলীফা ওয়াছিক বিল্লাহর 'আমলে ভূমধ্য-সাগরের দ্বীপসমূহে মুসলিম সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। রণপোত কারখানা স্থাপন করা হয়। 'সাকালিয়া'র প্রসিদ্ধ নৌবন্দর মেসিনীরও মানোন্নীত হয়। এখান থেকে ভূমধ্যসাগরের নৌপথসমূহ পর্যবেক্ষণ করা যেতো।
দু'শ' উনচল্লিশ হিজরীতে তিনজন রোমান সেনানায়ক তিনশ' রণতরী যোগে মিসর আক্রমণ করেন। তাঁরা মিসরের দামিয়াত বন্দরে লঙ্গর ফেলেন।
ঘটনাক্রমে মুসলিম নৌবহরের সমুদয় নাবিক তখন ঈদ-উৎসব পালন উপলক্ষে মিসরের অভ্যন্তরভাগে জামা'আতবদ্ধ হয়েছিলেন। দামিয়াত বন্দর বিস্কুল ফাঁকা পড়ে ছিলো। রোমকরা নির্বিবাদে নগরবাসীদের নিধন করে ধন-সম্পদ ও অস্ত্রশস্ত্র লুণ্ঠন করে।
জনৈক মুসলিম সেনানায়ক-যিনি কারাগারে বন্দী ছিলেন-এই দৃশ্য অবলোকন করে স্বীয় পদবেড়ী ভেঙ্গে ফেলেন এবং مسلمانوں জমা করে রোমানদের ওপর এমন জোরে হামলা করলেন যে, ঊর্ধশ্বাসে পলায়ন ছাড়া তাদের গত্যন্তর রইলো না। এই ঘটনার পর দামিয়াতের নৌ-ছাউনি আরো মযবুত করা হয়। উপকূলে দুর্গ নির্মাণ করা হয়। নৌবহর আরো বাড়ানো হয়।
পূর্বেই বলা হয়েছে, সাকালিয়ার দ্বীপসমূহ ও তাঁর বিখ্যাত নৌ- বন্দর 'সারকাওসা' দীর্ঘদিন ধরে রোমান ও মুসলমানদের মধ্যে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। কখনো মুসলমানরা সাকালিয়া ও তার নৌবন্দরটি দখল করতেন, আবার কখনো রোমকরা।
দু'শ' চৌষট্টি হিজরীতে মুসলমানদের আমীর সাকালিয়ার জা'ফর ইন মুহাম্মদ সাগর ও ভূমি উভয় দিক দিয়ে সারকাওসা আক্রমণ করেন। রোমকরা তাদের গোটা নৌবাহিনী মুসলমানদের মুকা- বিলায় নিয়োগ করেও ব্যর্থকাম হয়। আরেক বারের মতো সাকালিয়ার ওপর মুসলিম আধিপত্য কায়েম হয়। মুসলিম নৌবহর কর্তৃক রোমান নৌবহর পরাভূত ও অধিকৃত হয়।
খলীফা মু'তাযিদের শাসনামলে দু'শ' সাতাশি হিজরীতে মুসলমানরা 'তারতুসের' বিখ্যাত নৌবন্দর দিয়ে রোমকদের আক্রমণ করেন। রোমকদের ত্রিশটি রণতরী ধৃত ও প্রজ্বলিত হয়। ত্রিশ হাযার নৌসেনা নিহত হয়।
রোমকরা তার পাল্টা ব্যবস্থা হিসাবে তারতুসের নৌবন্দর আক্রমণ করে তাকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইলো। কিন্তু তারতুসের শাসনকর্তা আবু ছাবিত প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলে তাদের পাল্টা আক্রমণ ব্যর্থ করে দেন।
'আব্বাসীয়গণ তাঁদের গৌরব যুগে মুসলিম নৌবহরের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার সর্বাত্মক প্রয়াস চালান এবং অবিরাম রোমান নৌবহরের সাথে সাগরবক্ষে যুদ্ধরত থাকেন। কিন্তু যখন 'আব্বাসীয়দের শক্তি হ্রাস পেতে লাগলো, তখন তুর্কী ও বিভিন্ন সেনানায়ক সবল হয়ে উঠলো। 'আব্বাসীয়দের সুবিশাল সাম্রাজ্য সেনানায়কদের মধ্যে বণ্টিত হলো। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য কায়েম হলো। মুসলিম নৌবহরও বিলীন হতে লাগলো। অবশ্য কতিপয় নতুন খানদান মুসলিম নৌশক্তিকে পুনরুদ্ধার করার প্রয়াস পান। পরবর্তী স্ব স্ব স্থানে সেগুলো আলোচিত হবে।

📘 সোনালী যুগের মুসলিম নৌশক্তি > 📄 ’আগলাবী ‘আমলে মুসলিম নৌবহর

📄 ’আগলাবী ‘আমলে মুসলিম নৌবহর


আগলাবিগণ মাত্র একশ' এগারো বছর মাস কয়েক আফ্রিকা ও সাকালিয়া শাসন করেন। এই স্বল্পকালের মধ্যেই তাঁরা বিরাট বিরাট কীর্তি স্থাপন করেন।
আগলাবী বংশ উত্তর আফ্রিকায় ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলভাগ শাসন করছিলেন। তাঁদের রাজধানী ছিলো আফ্রিকার বিখ্যাত কায়রোয়ান নগরী, উত্তর আফ্রিকা ও সাকালিয়ার মধ্যবর্তী দ্বীপগুলো مسلمانوں অধিকারভুক্ত থাকায় আগলাবিগণ অনন্য নৌশক্তি অর্জন করেছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন দুর্জয় নৌবহর।
ভূমধ্যসাগরের নৌবন্দর ও নৌছাউনিসমূহ আগলাবীদের দখলে ছিলো। সবগুলো দ্বীপাঞ্চল তাদেরই অধিকারভুক্ত ছিলো।
সাকালিয়ায় মুসলিম নৌ-অভিযান আমীর মু'আবিয়ার 'আমলেই শুরু হয়েছিলো। কিন্তু রোমকদের প্রতিহত করে এই দ্বীপদেশে مسلمانوں পূর্ণ ও স্থায়ী আধিপত্য কায়েমের প্রচেষ্টা শুরু হয় আগলাবী 'আমলে।
আগলাবিগণ সাকালিয়ায় অধিকার কায়েম রাখার নিমিত্ত ভূমধ্য-সাগরীয় অধিকাংশ দ্বীপভূমি করগত করেছিলেন। সাকালিয়া ও ইটালীর মধ্যবর্তী দ্বীপগুলোসহ মাসীনা সাগরেও আগলাবীদের শাসন কায়েম ছিলো। তাদের দুর্ধর্ষ নাবিকরা ইটালীর উপকূলীয় বন্দরসমূহ দখল করে ইটালীর অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েন। শুধু ইটালীই নয়, বরং ফ্রান্সের উপকূলেও তাঁরা উপনীত হন। আগলাবীদের এই সফলতার মূলে ছিলো তাঁদের অনন্য ও অকুতোভয় নৌশক্তি।
অবশেষে ইউরোপের সমস্ত খৃস্টান দেশ এবং বিশেষ করে রোমকরা আগলাবীদের নৌ-আধিপত্য মেনে নেয়।
আর এ কারণেই উত্তর আফ্রিকা ও সাকালিয়ার মধ্যবর্তী দ্বীপসমূহে মুসলিম আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলো। ইটালীর উপকূলীয় শহর ও রাজ্যসমূহও মুসলিম অধিকারে আসলো। ইটালীর মাসীনা প্রণালী থেকে শুরু করে আপ্স পর্বত পর্যন্ত মুসলমানরা বুক ফুলিয়ে যাতায়াত করতেন। কোনো শক্তিই তাদের গতিরোধ করতে পারতো না। মোটকথা রোমানদের সাথে যুদ্ধ করে আগলাবিগণ ভূমধ্যসাগরে যে পরিমাণ বিজয় লাভ করেছিলেন, তা আফ্রিকীয় ও স্পেনীয় অন্য আরবদের তুলনায় বিপুলাঙ্কে বেশী।
আগেই বলা হয়েছে, আগলাবীদের পুরো রাজত্বকাল ছিলো একশ' এগারো বছর মাস কয়েক মাত্র। তাঁরা তাঁদের এই গোটা রাজত্বকালব্যাপী সকল সাধ্য-সাধনা ব্যয় করেন মুসলিম নৌশক্তি সংগঠনে। তাঁরা বহু নৌঘাঁটি ও বড় বড় নৌ-কারখানা স্থাপন করেন।
আগলাবী 'আমলে বহু বড় বড় নৌসেনাপতির আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু এখানে আমরা মাত্র একজন নৌসেনাপতির অবস্থা বিবৃত করবো। তাঁর নাম আবুল আগলাব। তোমরা আবুল আগলাবের জীবন থেকে এই শিক্ষাই গ্রহণ করবে যে, সাগর-তরঙ্গের সাথে কোলাকুলির মধ্যেই জাতীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও সমুন্নতি নিহিত। যেসব জাতি সমুদ্রের ভয়ঙ্কর পৃষ্ঠদেশকে নিজেদের ওড়না-বিছানা বানিয়েছেন, তাঁরাই দুনিয়ায় 'ইয্যত ও ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন।

📘 সোনালী যুগের মুসলিম নৌশক্তি > 📄 সাকালিয়া বিজয়ী আবুল আগলাব

📄 সাকালিয়া বিজয়ী আবুল আগলাব


আফ্রিকায় বনু আগলাব নামে এক প্রখ্যাতনামা রাজবংশ ছিলো। এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ইব্রাহীমুল আগলাব। বীরত্ব ও শৌর্যবীর্যের দরুন এই রাজবংশ ইসলামী ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন।
আবুল আগলাব এই বংশেরই এক স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি আফ্রিকীয় সরকার কর্তৃক আমীরুল বহর (অ্যাডমিরাল) ও গবর্নর নিযুক্ত হয়ে সাকালিয়া অভিমুখে গমন করছিলেন। পথিমধ্যে দৈবাৎ তাঁর জাহাজখানি উত্তাল তরঙ্গাভিঘাতে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। অগত্যা তিনি যানান্তরে আরোহণ করেন।
এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার পরই তাঁর নৌযানটি রোমীয় নৌদস্যুর কবলে পড়ে। নৌদস্যুরা তাঁর নৌযানে অগ্নি-সংযোগ করতে চাইলে তিনি নৈপুণ্যের সাথে তা প্রতিহত করেন। রোমীয় নৌদস্যুরা কোনো মতে প্রাণ নিয়ে পলায়ন করলো। আবুল আগলাবের নৌবহর সগৌরবে বলরাম পৌঁছে।
আবুল আগলাব অতি বুদ্ধিমান, সুচতুর ও দুঃসাহসী নৌযোদ্ধা ছিলেন। তিনি সাকালিয়ার শাসনদণ্ড সংহত করেই নৌশক্তির প্রতি মনোনিবেশ করেন। কারণ, তিনি আগমন-পথেই রোমান নৌশক্তি সম্পর্কে জ্ঞাত হয়েছিলেন। তাই সর্বাগ্রে নৌ-ডিপার্টমেন্টের পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন।
আবুল আগলাব ভূমধ্যসাগরের সবগুলো দ্বীপ দখল করে মুসলিম শাসনভুক্ত করার সঙ্কল্প করলেন এবং তাঁর আশুব্যবস্থা হিসাবে আফ্রিকা ও সাকালিয়ার মধ্যবর্তী দ্বীপগুলোকে কব্যা করে আফ্রিকা সাকালিয়ার যোগাযোগ পথটি নিষ্কণ্টক করতে চাইলেন। যাতে উভয় দেশের যোগাযোগ যথারীতি চালু ও সুগম থাকে।
আবুল আগলাব সর্বপ্রথম এক বিশাল নৌবহর তৈয়ার করে রোমান নৌবহরের পশ্চাদ্ধাবনে প্রেরণ করেন। কেননা, ইতিপূর্বে ওই রোমীয় নৌবহর কয়েক দফা হামলা চালিয়ে মুসলিম নৌ-বহরের যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করেছিলো।
আবুল আগলাব স্বয়ং মুসলিম নৌবহরকে কমাণ্ড দেন। মুসলিম নৌবহর সুদৃঢ়, সুগঠিত ও সমরোপকরণে সুসজ্জিত ছিলো। মুসলিম নৌবহর রোমান নৌবহরের ওপর অনলবর্ষণ শুরু করে। রোমান নৌবহর প্রতিরোধ শক্তি রহিত হয়ে আত্মসমর্পণ করে। এইভাবে মুসলিম নৌবহর স্বীয় স্থিতাবস্থায় ফিরে আসে।
অতঃপর আবুল আগলাব স্বীয় পরিকল্পনা অনুসারে ভূমধ্যসাগরের দ্বীপগুলোর প্রতি মনোযোগ দেন। এই দ্বীপপুঞ্জের প্রথম দ্বীপটি ছিলো কাওসারা। এটি আফ্রিকা ও সাকালিয়ার মাঝখানে অবস্থিত। মুসলিম নৌবহর এটি পদানত করে। আরেকবার রোমান নৌবহর মুসলিম নৌবহরের মুখোমুখি হলে মুসলিম নৌবহর আচমকা হামলা চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করলো। রোমান নৌবহর মুসলিম দখলে আসলো।
কাওসারা বিজয়ের পর আবুল আগলাব আরো কয়েকটি দ্বীপাঞ্চল দখল করলেন। মুসলিম নৌবহর তার ঝাণ্ডা উড়াতে উড়াতে ভূমধ্য-সাগরে চক্কর দিয়ে বেড়াচ্ছিলো আর রোমান নৌবহর তীরে তীরে লুকিয়ে ফিরছিলো।
এবার আবুল আগলাব সাকালিয়ার অভ্যন্তর জয়ে মনঃসংযোগ করেন। গোটা সাকালিয়া ও সাকালিয়ার সমুদয় নৌবন্দর مسلمانوں করগত হলো। ভূমধ্যসাগর সম্পূর্ণ রোমান নৌমুক্ত হলো। তাদের সাধারণ নৌযানগুলোও মুসলমানরা পাকড়াও করলেন।
আবুল আগলাব এই নৌ-অভিযান ব্যতীত সাকালিয়ার অভ্যন্তর ভাগেও সৈন্য চালনা শুরু করেন। দু'শ' একুশ হিজরীতে ইটনার আগ্নেয়গিরি পর্যন্ত মুসলিম সেনাদল গিয়ে পৌঁছেন। তাঁরা কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ দখল করলেন। অতঃপর কাসরিয়ানা অভিযানে রওয়ানা হন। সগৌরবে কার্সিয়ানাও হস্তগত করলেন।
কাস্ট্রিয়ানা বিজয়ের পর জাফলুষী অবরোধ শুরু হয়। জাফলুযী ছিলো সাকালিয়ার এক উপকূলীয় শহর। মুসলিম বাহিনী উভয় দিক থেকে অর্থাৎ স্থল বাহিনী ও নৌবাহিনী একসাথে হামলা করেন। রোমান সরকার কনস্টান্টিনোপল থেকে এক বিরাট নৌবহরের মদদ তলব করে। উভয় পক্ষে প্রবল যুদ্ধ আরম্ভ হয়।
ইত্যবসরে আফ্রিকার স্বনামধন্য অধিনায়ক যিয়াদাতুল্লাহ ইব্‌ন্‌ ইব্রাহীম ইহধাম ত্যাগ করেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ শুধু আফ্রিকাই নয়, সাকালিয়ার মুসলমানদের ওপরও বজ্রপাত ঘটায়। মুসলিম সেনাদলে শোকের কালোছায়া নেমে আসে। তাঁরা যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে রাজধানীতে ফিরে আসেন।
যিয়াদাতুল্লাহ একুশ বছর সাত মাস রাজত্ব করেন। তিনি ছিলেন সমকালের শ্রেষ্ঠতম রাষ্ট্রনায়কদের অন্যতম। তিনি আফ্রিকার শাসন ব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত করে সাকালিয়া বিজয়ে আত্মনিয়োগ করেন।
যিয়াদাতুল্লাহ্ পর তদীয় ভ্রাতা আবু 'আক্কাল আগলাব আফ্রিকার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। শুরুতে আবু 'আক্কালকে রাজ্যময় বিদ্রোহ ও গোলযোগের সম্মুখীন হতে হয়। আফ্রিকা ও সাকালিয়া দু'জাগার অবস্থাই সঙ্গীন হয়ে পড়েছিলো।
কিন্তু আবু 'আক্কাল অতি দ্রুত আফ্রিকার অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনেন। অতঃপর দু'শ' চব্বিশ হিজরীতে এক বিরাট সৈন্যদল সাকালিয়ায় প্রেরণ করেন। সৈন্য পাঠানোর খবর পাওয়া মাত্রই সমগ্র সাকালিয়া শান্ত হয়ে যায়। সাকালিয়ার দুর্গে দুর্গে ইসলামী নিশান উড়তে থাকে।
আবুল আগলাব পুনরায় গোটা সাকালিয়ার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা লাভ করলেন। এবার তিনি সাকালিয়ার বাইরের দিকে স্বীয় প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। দক্ষিণ ইটালীর কোনো এক রাজনৈতিক ব্যাপারে তাঁর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ালো। তিনি নেপল্স সরকারের সাহায্যার্থ স্বীয় নৌবহরও প্রেরণ করেন। তাঁরা বীরত্ব ও নৈপুণ্যের সাথে নেপল্সকে সাহায্য করেন।
এরপর আবুল আগলাব সাকালিয়ার অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনকার্যে অভিনিবেশ করেন। স্বল্প সময়ের মধ্যেই সাকালিয়া বিপুল উন্নতি লাভ করে।
দু'বছর সাত মাস রাজত্ব করার পর আবু 'আক্কাল ইন্তিকাল করেন। তদস্থলে মুহাম্মদ ইব্‌ন আগলাব আফ্রিকার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তিনিও আবুল আগলাবকে সাকালিয়ার গবর্নর ও আমীরুল বহর পদে বহাল রাখেন।
আবুল আগলাব সাকালিয়াকে দৃঢ়ভাবে কব্জা করলেন। সাকা-লিয়ার তীরবর্তী শহরে নানাবিধ নৌ-ছাউনি স্থাপন করেন। নৌবহরকে আরো শক্তসমর্থ করেন। দু'শ' ছত্রিশ হিজরীতে আবুল আগলাব ওফাত পান। আবুল আগলাব সমসাময়িককালের শ্রেষ্ঠতম নৌ-অধ্যক্ষ ছিলেন। সুদীর্ঘ ষোড়শ বছর কাল তিনি সগৌরবে সাকালিয়া শাসন করেন।
আবুল আগলাবের শাসনকাল সাকালিয়ার সর্বোত্তম কাল বলে সুবিদিত। তাঁর সংগঠিত নৌবাহিনী ও শাসনব্যবস্থা সর্বদা সুষ্ঠুভাবে কার্যকর ছিলো।
আবুল আগলাবের বীরত্ব, শৌর্যবীর্য, উচ্চাভিলাষ ও দৃঢ়তা সত্যই অনুকরণযোগ্য। মুসলিম নৌবাহিনী সংগঠন তাঁর প্রতিটি লম্হ্য ব্যয়িত।

📘 সোনালী যুগের মুসলিম নৌশক্তি > 📄 আমীরুল বহর ‘উবায়দুল্লাহ আলমাহ্দুনী

📄 আমীরুল বহর ‘উবায়দুল্লাহ আলমাহ্দুনী


আগলাবীদের পর উত্তর আফ্রিকা ও সাকালিয়ার শাসনদণ্ড ফাতিমীদের হস্তগত হয়। ফাতিমীদের বিরুদ্ধে সাকালিয়ায় কয়েক দফা বিদ্রোহ ও শোরহাঙ্গামা হলেও শেষ পর্যন্ত ফাতিমীদেরই ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
ফাতিমীদের আমীরুল বহরগণ তাঁদের অতুলনীয় সাহসিকতা ও অত্যুজ্জ্বল কীতিকান্ডের দরুন মুসলিম ইতিহাসে সুবিখ্যাত হয়ে আছেন। তাঁদের সবার জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা এই স্বল্পায়ত পুস্তকে সম্ভবপর নয়। তোমরা বড় হয়ে বড় বড় গ্রন্থ পড়ে তা জানতে পারবে। আমরা এখানে শুধু ফাতিমীয় মঞ্জুর আমীরুল বহর সালিম ইব্‌ন আবী রাশিদের বৃত্তান্ত বর্ণনা করবো।
সালিম ইব্‌ন আবী রাশিদ ফাতিনী তিনশ' পাঁচ হিজরীতে সাকালিয়ার গভর্নর হয়ে আসেন। তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার দ্বারা সাকালিয়ায় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করলেন। সাকালিয়ায় শাসন-শৃংখলা কায়েম করতে তাঁর আটটি বছর অতিবাহিত হয়। এরপর তিনি সাকালি-য়ার পোতাশ্রয় ও জাহাজ নির্মাণ কারখানাসমূহ বিন্যস্ত করেন।
এবার তিনি ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন দ্বীপ করতলগত করেন এবং এই ব্যাপদেশে তাঁকে রোমক ও গ্রীক নৌবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হয়।
তিনশ' দশ হিজরীতে ফাতিমিগণ ইটালীর উপকূল অঞ্চলসমূহে নবরূপে নৌহামলা চালান। এই নৌহামলার সূত্রপাত হয় উত্তর আফ্রিকা থেকে। অভিযানের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন সাকালিয়ার গভর্নর সালিম ইব্‌ন আবী রাশিদ।
অভিযান পরিচালনা করেন কাওয়ারিব নামক জনৈক কুশলী নৌসেনানী। এরা ইটালীর উপকূলভাগে পুনরায় মুসলিম বিজয় নিশান উত্তোলন করেন। ইটালীর বেশ ক'টি বৃহৎ অঞ্চল পদানত হয়।
পরবর্তী বছর মাস'উদ নামক জনৈক নৌসেনাপতির অধীনে ইটালীতে এক বিরাট নৌবহর প্রেরিত হয়। এই নৌবহরের কুড়িটি রণপোত ছিল। ইটালীর বিখ্যাত আগাছি শহর আক্রমণ করে মাস'উদ বিরাট নৌবিজয় অর্জন করেন।
এই সফল অভিযানের পর মাস'উদ তাঁর নৌবহরসহ উত্তর আফ্রিকার মাহ্দীয়ায় গমন করেন।
মাস'উদের এই নিদারুণ সফলতায় ইটালীতে ফাতিমী রাজত্বের এক শানদার ভবিষ্যৎ ঝিলিক দিয়ে ওঠে। সাকালিয়ার তরফ থেকে এক যবরদস্ত নৌবহর তৈয়ার করা হয়। দু'জন খ্যাতনামা আমীরুল বহরের হাতে এই নৌবহরের নেতৃত্ব ন্যস্ত ছিলো। তাঁদের একজন ছিলেন আমীর সালিম এবং অপরজন আমীর জা'ফর।
ইটালীর সাগর তীরে নেমে তাঁরা দু'জনেই বিভিন্ন দিক থেকে সৈন্য চালনা শুরু করেন। ইটালীর মহর বারীসানা শহর দখল করে তার সর্বত্র ইসলামী নিশান উড়িয়ে দেন।
আমীর জা'ফর তাঁর বাহিনী দ্বারা ইটালীর ওয়ারী নগর দখল করেন। ওয়ারীর গবর্নর ও কয়েকজন বড় ফৌজী অফিসার গ্রেফতার হন। ফাতিমী নৌসেনারা ইটালীর ওয়ারী নগর থেকে বিপুল পরিমাণ 'মালে গনীমত' লাভ করেন।
এই ফৌজী সাফল্য ফাতিমী নৌবহরে এক নতুন আশার সঞ্চার করে। তিনশ' পনেরো হিজরীতে সারিব নামক নৌসেনাপতির নেতৃত্বে এক নৌঅভিযানের প্রস্তুতি চলে। তিনি চুয়াল্লিশটি রণপোত দ্বারা দক্ষিণ ইটালীর বিখ্যাত শহর ও বন্দর টরেন্টো আক্রমণ করে পদানত করেন। এই সাফল্যের পর সারিব তাঁর নৌবহরসহ সাকালিয়া ফিরে আসেন।
পর বছর তিনি সাকালিয়া থেকে নতুনভাবে নৌঅভিযান শুরু করেন। ইটালীর উপকূল থেকে রোমক ও গ্রীক নৌবহর গ্রেফতার করে সাকালিয়ায় নিয়ে আসেন। কিছুদিন বিশ্রাম করার পর পুনরায় তিনি ইটালী আক্রমণ করে এক নতুন শহর অধিকার করেন।
তিনশ' সতেরো হিজরীতে সারিব রোমকদের সাথে নৌযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। সারিবের হাতে ছিলো মাত্র চারটি রণতরী। আর রোমান পক্ষে ছিলো তার দ্বিগুণ নৌসেনা। উভয় দলই প্রতিপক্ষের রণতরী ঘায়েল করার প্রাণান্ত প্রয়াস চালায়। কিন্তু বিজয় ও সাফল্য ছিলো সারিবের ললাট-লিখন। তাই সাফল্যের জয়মাল্য সারিবেরই কণ্ঠলগ্ন হলো।
এই বিজয়ের পর সারিব ইটালীস্থ তারমূলা নগরে উপনীত হন। তারমূলা নগর ইটালীর পূর্ব উপকূলে অবস্থিত। সারিব এই বিখ্যাত শহরটি অধিকার করে প্রচুর মালে গনীমতসহ সাকালিয়া প্রত্যাবর্তন করেন।
দুঃসাহসী ফাতিমী জওয়ানরা তিনশ' দশ হিজরী থেকে তিনশ' সতেরো হিজরী পর্যন্ত উপর্যুপরি নৌ-হামলা চালিয়ে ইটালীতে এক বিভীষিকার সৃষ্টি করলেন। ফলে ইটালী সরকার কর প্রদানে সম্মত হয়ে ফাতিমীদের সাথে সন্ধি করতে বাধ্য হন। অতঃপর মুসলিম বাহিনী ইটালী ত্যাগ করেন আর ইটালী সরকার যথারীতি আফ্রিকায় কর পাঠাতে থাকেন।
ইটালীর সাথে সন্ধি হওয়ার পর 'উবায়দুল্লাহ আলমাহ্দী ফ্রান্স ও ইটালীর সীমান্ত শহর জেনোয়ার দিকে দৃষ্টিপাত করেন। তিনশ' বাইশ হিজরীতে 'উবায়দুল্লাহ আলমাহ্দী প্রখ্যাত নৌসেনানায়ক ইয়াকুব ইবন ইসহাকের নেতৃত্বে এক প্রবল নৌবহর প্রেরণ করেন। নৌবহরটি জেনোয়ার সুদৃঢ় নৌ-রক্ষাব্যবস্থা দেখে ওয়াপস চলে আসে।
ইউরোপে মুসলিম বিজয়স্রোত জেনোয়ার প্রাচীরগাত্র স্পর্শ করতেই 'উবায়দুল্লাহ আলমাহ্দী তাঁর আরব্ধ কার্যক্রম ভবিষ্যৎ বংশধরদের ওপর ন্যস্ত করে তিনশ' বাইশ হিজরীতে ইহলোক ত্যাগ করেন।
'উবায়দুল্লাহ আলমাহ্দী ফাতিমী রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা এবং ফাতিমী বংশের একজন অমিততেজা পরাক্রান্ত আমীরুল বহর ছিলেন। তিনি তাঁর নৌবহরের সাহায্যে ভূমধ্যসাগরকে করায়ত্ত করেছিলেন। আফ্রিকীয় ও ইউরোপীয় উপকূল ছিলো তাঁর নৌ-ক্রীড়াকেন্দ্র।
'উবায়দুল্লাহ আলমাহ্দী কেবল একজন নৌ-সেনাধ্যক্ষই ছিলেন না, রাজনীতি সম্পর্কেও তিনি ছিলেন সম্যক ওয়াকিফহাল। তিনি তাঁর বাহুবল ও বুদ্ধি-কৌশল দ্বারা অল্প দিনের মধ্যে অর্থাৎ মাত্র চব্বিশ বছর দশ মাসের মধ্যেই আফ্রিকা, ত্রিপোলী, বারকা ও সাকালিয়া জয় করেন। অতঃপর স্বীয় নৌ-দক্ষতা বলে ইটালীকে তাঁর বশ্যতা স্বীকারেও বাধ্য করেন।
ইটালীর পর তিনি ফ্রান্সের দিকে তাকান। কিন্তু পরপারের ডাক তাঁর সে আশা পূরণ হতে দেয়নি।
'উবায়দুল্লাহ আলমাহ্দীর নৌ-ক্রিয়াকাণ্ড ও বীরত্বব্যঞ্জক ঘটনাবলী থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। সাথে সাথে একথাও জেনে রাখা উচিত যে, দুনিয়ার ইয্যত কেবল সেইসব জাতিরই প্রাপ্য, যাঁরা আল্লাহর নিয়ামতরাজির কদর করতে জানেন এবং যাঁরা পানিতে ও ডাঙ্গায় স্বীয় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সম্মান লাভে সচেষ্ট হন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00