📄 সাগরবক্ষে মুসলমানদের আধিপত্য
উত্থান যুগে মুসলমানরা ছিলেন সারা বিশ্বজগতে উন্নতশির। তামাম দুনিয়ার সাগর-মহাসাগরেই তাঁদের আধিপত্য ছিলো প্রতিষ্ঠিত। পারস্য উপসাগর ছিলো প্রাচ্য দেশসমূহের নৌকেন্দ্র।
হিন্দবাদ ও সিন্দবাদের কিস্সা তোমরা নিশ্চয়ই পড়ে থাকবে। কি মজার কাহিনী তাই না! এসব কাহিনী কিন্তু ওই নৌকেন্দ্রের সাথেই জড়িত। এসব রূপকথা রচনার উদ্দেশ্য ছিলো মুসলমান জওয়ানদেরকে সাগর ভ্রমণ ও নৌ-অভিযানে উদ্বুদ্ধ করে তোলা।
পূর্বাঞ্চলের নৌপথসমূহ হিন্দুস্তানের উপকূল ঘেঁষে চীন, জাভা, সুমাত্রা ও মালয় প্রভৃতি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। এই সমগ্র নৌপথই মুসলিম নাবিকদের কব্জায় ছিলো। এইসব নৌপথে শুধু ইসলামের ঝাণ্ডাই উড়তো না, বরং ওই বীর নাবিকদের বদওলতে জাভা, সুমাত্রা, মালয় প্রভৃতি অঞ্চলে ইসলামের আশীষবার্তাও পৌঁছে গিয়েছিলো। ফলে এইসব সাগরপথে মুসলমানদের নৌ-চালনা ছিলো শান্তিপূর্ণ বাণিজ্য- ভিত্তিক। মুসলিম সওদাগররা জাহাজযোগে চীন ও ভারতবর্ষ থেকে বাণিজ্যদ্রব্য পশ্চিম দেশে পৌছে দিতেন।
ভূমধ্যসাগরে মুসলমানদের নৌশক্তি ছিলো জঙ্গী নৌবহরের। ভূমধ্যসাগরের উপকূলবর্তী প্রায় সবগুলো জাতিই ছিলো নৌবহরের অধিকারী। নৌযুদ্ধেও ছিলো তারা পারদর্শী। তাই মুসলমানদেরও নৌবহর সংগঠন ও রণপোত কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে হয়। ফলে অনতিকালের মধ্যেই ভূমধ্যসাগর মুসলিম অধিকারে আসে। দুনিয়ার কোনো নৌশক্তিই তাঁদের মুকাবিলা করতে পারতো না।
মুসলিম শাসন কায়েমের পর যখন তাঁদের নৌ-কর্তৃত্বও হাসিল হলো, তখন বিভিন্ন পেশার লোক তাঁদের নিকট চাকরিপ্রার্থী হলো।
মুসলমানরা মাঝি-মাল্লা ও নাবিকদেরকে চাকরি দিলেন। তাঁদের সমুদ্র- জ্ঞান ও নৌ-দক্ষতা বৃদ্ধি পেলো। বড় বড় নাবিক ও নৌ-বিশেষজ্ঞ সৃষ্টি হলো। নৌযুদ্ধের উৎসাহ বাড়লো। যুদ্ধ-জাহাজ বানালেন। সেগুলোকে নৌসেনা ও অস্ত্রসজ্জিত করলেন। নৌবাহিনীকে সমুদ্র-পৃষ্ঠে সওয়ার করালেন। ভূমধ্যসাগরের অপর পারে লড়তে পাঠালেন।
নৌযুদ্ধের জন্য মুসলমানরা সিরিয়া, আফ্রিকা, মরক্কো ও স্পেনের উপকূল বেছে নিলেন। 'আবদুল মালিক ইব্ন মারওয়ান আফ্রিকার গভর্নর হাসান ইব্ নু'মানকে তিউনিসে জাহাজ নির্মাণ কারখানা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিলেন।
তিনি তিউনিসে এক বিশাল জাহাজ নির্মাণ কারখানা কায়েম করেন। এই কারখানার জাহাজে ভূমধ্যসাগরের বন্দরগুলো ছেয়ে যায়। সেকালের তিউনিস ছিলো مسلمانوں এক বিশাল নৌকেন্দ্র।
এই কেন্দ্র থেকেই সিসিলীতে গালবিয়া শাসনামলে যিয়াদাতুল্লাহ্ ইব্ন ইব্রাহীম আগলাব সাকালিয়ায় নৌ-হামলা চালান। সাকালিয়া পদানত ও কাওসারা বিজিত হয়।
আগলাবিয়াদের পর 'উবায়দিয়া ও উমাইয়া শাসনামলে আফ্রিকা ও স্পেনের নৌবহরগুলো অপর পারে হামলা চালাতো। 'আবদুর রহমান আন্নাসিরের 'আমলে স্পেনীয় নৌবহরে প্রায় দু'শ' রণপোত ছিলো। আফ্রিকার নৌবহরেও সমসংখ্যক যুদ্ধ-জাহাজ ছিলো।
স্পেনীয় আমীরুল বহর (নৌবাহিনী প্রধান) ছিলেন ইবন রামাহাস। আর এই জাহাজগুলোর কেন্দ্রীয় বন্দর ছিলো বিজায়া ও মারীয়া। প্রতিটি নৌবন্দরে আবার একজন উচ্চতর কর্মকর্তা নিযুক্ত থাকতেন। তিনি সমস্ত জাহাজ, জাহাজের কাপ্তান ও নৌসেনাদের তত্ত্বাবধান করতেন। প্রতিটি জাহাজের কাপ্তানকে বলা হতো 'রঈস' বা সর্দার। রঈস তাঁর জাহাজের পূর্ণ তদারককারী ছিলেন।
যুদ্ধ বাধলে সমস্ত যুদ্ধ জাহাজ বন্দরে একত্রিত করে রণসম্ভারে সজ্জিত করা হতো এবং একজন আমীরের অধীনে যুদ্ধে পাঠানো হতো। সোনালী যুগে ভূমধ্যসাগরের সামরিক ঘাঁটিগুলো মুসলমানদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিলো। খৃস্টান নৌশক্তি ছিলো মুসলমানদের তুলনায় অতি নগণ্য। ফলে সর্বত্রই মুসলমানদের নৌ-বিজয় সূচিত হয়। ভূমধ্যসাগরের গোটা উপকূলভাগ অধিকৃত হয়। বিশেষ করে মীওরকা, মানওরকা, ইয়াবিসা, সারদানিয়া, সাকালিয়া, কাওসারা, মাল্টা, ক্রীট ও সাইপ্রাস প্রভৃতি এলাকা।
আবুল কাসিম ও তাঁর পুত্রগণ ভূমধ্যসাগরের বিখ্যাত বন্দর 'মাহ- দীয়া' থেকে নৌবহর নিয়ে বের হতেন এবং ইউরোপের উপকূল ভাগে হামলা চালিয়ে বিভিন্ন এলাকা কব্জা করতেন।
দানীয়ার ওয়ালী মুজাহিদ 'আমিরী ৪০৫ হিজরীতে তাঁর নৌবহর দিয়ে সারদানিয়া দখল করেন। মুসলমানরা তখন গোটা ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ও উপকূলভাগ শাসন করতেন।
ইবন হুসায়ন খান্দানের 'আমলে মুসলিম নৌবহর খৃস্টান নৌবহরের ওপর এমনভাবে হামলা করতো, যেমনিভাবে বাজপাখি তার শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তখন সমগ্র সমুদ্র এলাকায় মুসলমানদের প্রভুত্ব কায়েম ছিলো।
যুদ্ধ ও শান্তি সব সময়েই সাগরময় মুসলিম রণতরীর আনাগোনা লেগে থাকতো। কিন্তু খৃস্টানদের একটিও তরীও ভূমধ্যসাগরে খুঁজে পাওয়া যেতো না।
'উবায়দী 'আমলে যখন মুসলিম নৌশক্তি দুর্বল হয়ে পড়লো, তখন খৃস্টান নৌবহর ক্রুশেডারদের নিয়ে সিরিয়া ও মিসরের উপকূলে প্রভুত্ব বিস্তার শুরু করে।
কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দীন 'উবায়দীদের উৎখাত করে সিরিয়া ও মিসর উপকূল থেকে খৃস্টানদের তাড়িয়ে দেন। সালাহুদ্দীন মুসলিম নৌবহরেরও উন্নয়ন সাধন করেন। তিনি 'আক্কায় এক বিরাটকায় নৌ-কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এই কারখানায় যুদ্ধ জাহাজ তৈরী হতো। সিরীয় উপকূল ছাড়া আরেকটি নৌকেন্দ্র ছিলো আলেকজান্দ্রিয়ায়।
সুলতান সালাহুদ্দীন যখন বায়তুল মুকাদ্দাসের যুদ্ধে ব্যাপৃত ছিলেন, তখন তিনি মিসরের গবর্নরকে লিখে পাঠান যে, "অতি সত্বর জাহাজ বোঝাই করে খাদ্যদ্রব্য ও বীরসেনাদের পাঠিয়ে দাও।”
এই জাহাজগুলো সিরীয় উপকূলে পৌঁছামাত্র খৃস্টান জাহাজগুলো চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু মুসলিম জাহাজগুলো বীরত্বের সাথে লড়াই করে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় তীরে পৌঁছায়। 'উবায়দী বংশের পতনের পর মুসলিম নৌবহরের অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে পড়েছিলো। অবশ্য আফ্রিকার কয়েকটি বন্দরে কিছু সংখ্যক যুদ্ধ জাহাজ অবশিষ্ট ছিলো।
মরক্কান নৌবহরের অবস্থা ভালোই ছিলো। তাদের ওপর তখনো কোনো আঘাত আসেনি। লামাতুনার শাসনকাল পর্যন্ত আরব নৌবহরের শক্তি অক্ষুণ্ণ ছিলো। অতঃপর মুয়াহহিদের শাসনকাল শুরু হয়। তাঁরাও এই নৌশক্তিকে সমুন্নত রাখেন। মুয়াহহিদদের উত্থানকালে স্পেন ও আফ্রিকায় মুসলিম নৌবহরের আধিপত্য কায়েম ছিলো। মুয়াহ্- হিদের নৌবাহিনী প্রধান ছিলেন আহমদ সাকালী। তিনি সিসিলীর অধিবাসী ছিলেন।
মুসলমানদের গৌরবময় যুগে যুদ্ধের লীলাকেন্দ্র ভূমধ্যসাগরে তাঁদের পূর্ণ কর্তৃত্ব কায়েম হয়েছিলো। তখন মুসলমানদের বিনা অনুমতিতে ভূমধ্যসাগরে অন্য কোনো জাতির যুদ্ধ জাহাজ প্রবেশ করতে পারতো না।
মুসলিম রণপোতগুলো তখন ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো শিকারের অন্বেষণে হন্যে হয়ে বেড়াতো এবং শিকারের খোঁজ পাওয়ার সাথে সাথে অকস্মাৎ তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। অন্য কথায়, শত্রু পক্ষের যুদ্ধজাহাজ দেখামাত্রই তাকে পাকড়াও করে নিয়ে আসতো। এভাবে সমগ্র সমুদ্র এলাকায় মুসলমানদের একাধিপত্য কায়েম হয়েছিলো।
কিন্তু বাষ্প-যুগ শুরু হওয়ার সাথে সাথে মুসলমানদের পতন-যুগও শুরু হলো। মুসলমানরা তখন আরামপ্রিয় হয়ে গেলো। তারা স্থল- ভাগের রাজত্বেই সন্তুষ্ট রইলো। সমুদ্রের তরঙ্গময় জীবনকে ভয় পেলো। ফলে মুসলমানদের নৌশক্তি চিরতরে খতম হয়ে গেলো।
আমাদের কর্তব্য এখন পুনরায় নৌশক্তি অর্জন করা। আমাদের তরুণ, কিশোর ও যুব সমাজ যখন সমুদ্র-তরঙ্গের সাথে লড়াই করতে শিখবে, সমুদ্রের অভিজ্ঞান লাভ করবে, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ চালনায় পারদর্শী হবে, ঠিক তখনই আমরা আমাদের হারানো নৌশক্তি ফিরে পাবো। এটা এক সর্বসম্মত সত্য যে, যে জাতির কাছে নৌশক্তি নেই, সে জাতি দুনিয়ায় চিরদিনই দুর্বল হয়ে থাকবে।
কুরআন পাক নদনদী, নৌযান ও নৌভ্রমণকে আল্লাহর রহমত, বরকত ও নি'মত বলে অভিহিত করেছে। একথা তোমরা এ বইয়ের প্রথম অধ্যায়েই পড়ে এসেছো। তাই এখানে তার বিস্তারিত আলোচনা অনাবশ্যক।
যে জাতির নৌবহর মযবুত, দুনিয়াতে সে-ই রাজত্ব করার যোগ্য। দুনিয়ার সকল ঐশ্বর্ষই তার হাতের মুঠোয়। যার নৌশক্তি কমযোর, সে দুনিয়ায় বাস করার অযোগ্য।
📄 মুসলিম নৌবহরের প্রতিষ্ঠাতা আমীর মু’আবিয়া (রাঃ)
মু'আবিয়া নাম। আবু 'আবদুর রহমান কুনিয়াত বা পিতৃবাচক উপনাম। পিতার নাম আবু সুফিয়ান। আবু সুফিয়ান কুরায়শদের মধ্যে বিশিষ্ট খান্দানের অধিকারী ছিলেন। কুরায়শ বংশের ঝাণ্ডা তাঁর কাছেই রক্ষিত ছিলো।
আবু সুফিয়ান ও তাঁর স্ত্রী হিন্দা মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত ইসলামের ঘোর শত্রু ছিলেন। রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ও মুসল-মানদের উৎপীড়নে উভয়ই অগ্রণী ছিলেন। ইসলামের মূলোৎপাটন করতে এরা কোনো চেষ্টারই ত্রুটি করেননি।
মক্কা বিজয়ের দিন আবু সুফিয়ান, হিন্দা ও মু'আবিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। মুসলমান হওয়ার আগে আবু সুফিয়ান ইসলামের ঘোর বিরুদ্ধাচরণ করলেও মু'আবিয়া বিশেষ কোনো বৈরিতা পোষণ করতেন না। মক্কা বিজয়ের পূর্বে বদর, উহুদ প্রভৃতি কোনো বড় যুদ্ধেই তিনি কুরায়শদের পক্ষাবলম্বন করেননি।
কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, মু'আবিয়া হুদায়বিয়ার সন্ধির পর গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি তা জনসমক্ষে প্রকাশ করতেন না। মক্কা বিজয়ের পর তিনি প্রকাশ্যে মুসলমান হন।
কথিত আছে, মু'আবিয়ার ইসলাম গ্রহণের খবর শুনে রসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁকে মুবারকবাদ জানান। মুসলমান হওয়ার পর সর্বপ্রথম তিনি হুনায়ন ও তাইফের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত বীরত্বের সাথে লড়াই করেন। অতঃপর রসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর ওপর 'ওহী' লেখার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন।
আমীর মু'আবিয়ার বীরত্ব প্রদর্শনের সুযোগ ঘটে প্রথম হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর খিলাফত 'আমলে। তিনি তখন সিরিয়া অভিযানে ভ্রাতা ইয়াযীদ ইব্ন সুফিয়ানের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছিলেন। ইয়াযীদ ইব্ন সুফিয়ান তখন সিরীয় বাহিনীর প্রধান সেনানায়ক ছিলেন।
সিরিয়া অভিযানে মু'আবিয়া বড় বড় কীর্তি প্রদর্শন করেন। রোমান বাহিনীর সাথে লড়াই করতে তিনি আমোদ অনুভব করতেন। সিরিয়ায় রোমকদের বিরুদ্ধে প্রায় সবগুলো যুদ্ধেই তিনি বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেন।
সিরিয়া বিজয়ের পর মু'আবিয়ার ভ্রাতা ইয়াযীদ ইব্ন আবী সুফিয়ান সিরিয়ার গবর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর অকাল মৃত্যুতে হযরত 'উমর (রাঃ) গভীর শোকাভিভূত হন। কেননা, ইয়াযীদ ইবন্ আবী সুফিয়ান সৈন্য সংগঠন ও রাজ্য শাসনে অতিশয় দক্ষ ছিলেন।
হযরত 'উমর (রাঃ) মু'আবিয়াকে সিরিয়ার গবর্নর নিয়োগ করেন। কারণ, মু'আবিয়া ছিলেন সরেস অন্তঃকরণের সুপুরুষ। রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও অমিতসাহসিকতার জন্য হযরত 'উমর (রাঃ) তাঁকে 'কিস্সা-ই-আরব' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
হযরত 'উমর (রাঃ)-এর খিলাফতকালে মু'আবিয়া চার বছর-কাল সিরিয়ার গবর্নর ছিলেন। সিরিয়ায় শান্তি-শৃংখলা, দেশ শাসন-ব্যবস্থা ও সৈন্য-বিন্যাসে তিনি এক আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
মু'আবিয়া গোড়াতেই রোমান বাহিনীর সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সিরিয়ায় রোমান স্থলবাহিনী ও নৌবাহিনী দুই-ই পাশাপাশি অবস্থান করতো। সিরিয়ার উপকূল অঞ্চলে তাই রোমের স্থলবাহিনী ও নৌবহরের যুগল সমাবেশ ঘটেছিলো।
মু'আবিয়া স্থলযুদ্ধে রোমানদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে সক্ষম ছিলেন। আর ওইসব যুদ্ধে তিনি সর্বদা সফলকামও হতেন। কিন্তু নৌবহরের কোনো জবাব তাঁর কাছে ছিলো না। মুসলমানদের নৌবাহিনী না থাকায় তাঁরা সিরিয়ার উপকূল অঞ্চল রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। রোমান নৌবহর এসে বারংবার উপকূল ভাগে হামলা, আমীর মু'আবিয়া এসব ঘটনা স্বচক্ষে অবলোকন করছিলেন। তাঁর অন্তরাত্মা মুসলিম নৌবহর প্রতিষ্ঠাকল্পে অস্থির হয়ে উঠেছিলো।
কেননা, তিনি পাল্লায় পড়েছিলেন রোমান যুদ্ধবাযদের। আর একটি শক্তিমান নৌবহর ছাড়া রোমকদের সম্পূর্ণ পরাজিত করা কিছুতেই সম্ভবপর ছিলো না।
ঘটনার এই প্রেক্ষাপটে আমীর মু'আবিয়া হযরত 'উমর (রাঃ)-এর নিকট এই মর্মে এক দরখাস্ত পেশ করেন যে, রোমানদের যথোচিত মুকাবিলা নিবন্ধন মুসলিম নৌবহর গঠন করা আবশ্যক।
হযরত 'উমর (রাঃ) তখন মু'আবিয়াকে নৌবহর গঠনে হাত দিতে বারণ করেন। হযরত 'উমর (রাঃ) সে সময় মুসলিম নৌবহর গঠনকে উপযুক্ত বিবেচনা করেননি। তাঁর দৃষ্টিতে তখন নৌবহর প্রতিষ্ঠার চাইতেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ পড়েছিলো।
কিন্তু আমীর মু'আবিয়া এরপরও অধিক পীড়াপীড়ি করতে থাকলে হযরত 'উমর (রাঃ) এ ব্যাপারে অন্যান্য গভর্নরের পরামর্শ চেয়ে পাঠান। তাঁর তখনো পর্যন্ত মুসলিম নৌবহর প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। ফলে হযরত 'উমর (রাঃ) মু'আবিয়ার আবেদন নাকচ করে দেন।
হযরত 'উমর (রাঃ) শাহাদতবরণ করলে হযরত 'উসমান (রাঃ) মুসলমানদের খলীফা নিযুক্ত হন। তাঁর খিলাফতকালেও আমীর মু'আবিয়া একইভাবে নৌবাহিনী গঠনের আবেদন পেশ করেন। হযরত 'উসমান (রাঃ) তাঁর আবেদন মনজুর করেন। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে শর্ত আরোপ করেন যে, নৌবাহিনীতে লোক ভর্তির ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক হতে হবে। কাউকেই এ ব্যাপারে জবরদস্তি করা চলবে না।
অনুমতি পেয়ে আমীর মু'আবিয়া অতি দ্রুত মুসলিম নৌবহর গঠনে তৎপর হন এবং অনতিকালের মধ্যে একটি শক্তিশালী নৌবহর গঠন করে আটাশ হিজরীতে সাইপ্রাস আক্রমণ করেন। সাইপ্রাসবাসীরা টাল সামলাতে না পেরে সন্ধি করতে বাধ্য হয়। সন্ধির শর্তগুলো ছিলো নিম্নরূপঃ
১. মুসলমানদের বার্ষিক সাত হাযার স্বর্ণমুদ্রা কর দেয়া হবে। রোমকদেরও সমপরিমাণ অর্থ দান করা হবে। মুসলমানদের তাতে কোনো আপত্তি থাকবে না।
২. সাইপ্রাস কারো দ্বারা আক্রান্ত হলে মুসলমানরা তার মুকাবিলার যিম্মাদার হবে না।
৩. মুসলমানরা রোম আক্রমণ করতে চাইলে সাইপ্রাস তাঁদের জন্যে পথ ছেড়ে দিবে।
এই অঙ্গীকারের চার বছর পর বত্রিশ হিজরীতে সাইপ্রাস সন্ধির বরখেলাফ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে রোমকদের যুদ্ধ জাহাজ দিয়ে সাহায্য করে।
আমীর মু'আবিয়া তেত্রিশ হিজরীতে পাঁচশ' রণপোত বিশিষ্ট এক বিরাট নৌবহরসহ ভূমধ্যসাগরে অবতীর্ণ হন এবং সাইপ্রাসের ওপর প্রচণ্ড আঘাত হানেন। প্রথম দফায়ই সাইপ্রাস মুসলিম বাহিনীর করতলগত হয়। আমীর মু'আবিয়া সাইপ্রাস দ্বীপে এগারো হাযার মুসলমানকে পুনর্বাসিত করেন।
তিউনিস, আলজিরিয়া ও মরক্কো-আফ্রিকার এইসব উপকূলীয় অঞ্চল রোম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। হযরত 'উসমান (রাঃ)-এর খিলাফতকালে এইসব এলাকায় রাশি রাশি রোম সৈন্য নিহত হয়। এ কারণে রোমের কায়সর (কায়সর প্রাচীন রোম সম্রাটদের উপাধি) প্রতিশোধস্পৃহায় উন্মত্ত হয়ে উঠেন।
কায়সর মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ ও হারানো এলাকা পুনরুদ্ধার মানসে বিরাট সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ইতিপূর্বে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কায়সর কখনো এতবড় সামরিক আয়োজন গ্রহণ করেননি। রোমান রণপোতের সংখ্যা ছিলো ছয়শ'। আমীর মু'আবিয়াও তাঁর উপযুক্ত জবাব দান মানসে স্বীয় রণবহরসহ সামনে অগ্রসর হন। এমন সময় সমুদ্রে প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়। অগত্যা উভয় পক্ষই তখন একরাতের জন্যে আপসে সন্ধিবদ্ধ হন। উভয় পক্ষই যার যার মতো আল্লাহ্র 'ইবাদতে মণ্ডন হন।
পরদিন ভোরে রোমান বাহিনী যুদ্ধের জন্যে সর্বাত্মক প্রস্তুত হলো। মুসলিম বাহিনীও সামনে উপস্থিত হলো। রোমান বাহিনী হঠাৎ হামলা শুরু করলো। মুসলিম বাহিনীও চকিতে পাল্টা জবাব দিলো।
উভয় তরফ থেকেই তরবারি চলতে লাগলো। ঘোরতর যুদ্ধের ফলে সাগরের পানি রক্তে লাল হয়ে উঠলো।
যুদ্ধস্থল থেকে উপকূল পর্যন্ত রক্তের ঢেউ খেলছিলো। দুই তরফেরই বীর যোদ্ধারা কেটে কেটে সাগরে পড়ছিলো। আর সাগরের পানি তাদের উছলে উছলে দূরে নিক্ষেপ করছিলো। এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধ দীর্ঘক্ষণ চলতে থাকলো। আমীর মু'আবিয়া স্বীয় স্থির সংকল্প ও দৃঢ়তার সাথে সৈন্য পরিচালনা করতে লাগলেন। পরিশেষে রোমান বাহিনীর কদম দুলে উঠলো এবং রোমান নৌবাহিনী প্রধান লঙ্গর তুলে পলায়ন করলেন।
রোমকদের নৌযুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের পর আমীর মু'আবিয়া ভূমধ্যসাগরকে জঞ্জালমুক্ত করলেন। রোমকদের ধাওয়া করতে করতে কনস্টান্টিনোপল উপসাগরের শেষ সীমা পর্যন্ত পৌছে গেলেন। মোটের ওপর, পূর্ণ আটঘাট বেঁধেই আমীর মু'আবিয়া রোমকদের মুকাবিলায় নেমেছিলেন। তিনি রোমকদের যেমন স্থলযুদ্ধে মার দিয়েছিলেন, তেমনি তাদের নৌযুদ্ধেও পর্যুদস্ত করেছিলেন।
এরপর আভ্যন্তরীণ কোন্দলের দরুন কিছুদিন مسلمانوں বিজয়াভিযান মূলতবি থাকে। কিন্তু চুয়াল্লিশ হিজরীর দিকে এই কোন্দল স্তিমিত হওয়ার পর আমীর মু'আবিয়া পুনরায় তাঁর নৌতৎপরতা শুরু করেন। রোমকদের নৌ-মুকাবিলার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন আমীরুল বহরকে পাঠাতে লাগলেন। তাঁরা খুব সফলভাবেই রোমানদের মুকাবিলা করেন।
হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রাঃ)-এর পুত্র 'আব্দুর রহমান কয়েকবার রোমকদের সার্থক মুকাবিলা করেন। বুস্ত্র ইব্ন আবী আরা ভূমধ্যসাগরে মুসলিম নৌবহর রেস্ দিয়ে ফিরতেন।
উনপঞ্চাশ হিজরীতে মালিক ইব্ন হুবায়রা রোমকদের সাথে যখন-তখন যুদ্ধে লিপ্ত হতেন। ফুযালা, খিরা জয় করে বিপুল মালে-গনীমত হাসিল করেন। অনুরূপভাবে ইয়াযীদ ইব্ন শাজরা রাহাবী বহুবার নৌ-হামলা চালিয়ে রোমান নৌশক্তিকে তছনছ করে দেন।
আটচল্লিশ হিজরীতে 'উব্বা ইবন 'আমির মিসরীয় বাহিনীর সাথে নৌযুদ্ধে লিপ্ত থাকেন।
এইসব সামরিক অভিযান ছিলো নৌযুদ্ধের মহড়াস্বরূপ। আমীর মু'আবিয়া এইসব নৌ-মহড়ায় অতি পুলক বোধ করতেন। তাঁর মনস্কামনা ছিলো মুসলিম নও জওয়ানদের নৌযুদ্ধে পারদর্শী করে তোলা। তাই আমীর মু'আবিয়ার আমলে বিপুল সংখ্যক মুসলিম আমীরুল বহর সৃষ্টি হন এবং তাঁরাই রোমান শক্তিকে চিরতরে খতম করে দেন।
আমীর মু'আবিয়া কনস্টান্টিনোপল আক্রমণ করেন। এই আক্র-মণের জন্যে তিনি স্থল ও নৌবাহিনীকে সংগঠিত করেন। কনস্টান-টিনোপলের অত্যধিক গুরুত্ব ছিলো। কারণ, কনস্টান্টিনোপল ছিলো পূর্ব ইউরোপের প্রাণকেন্দ্র।
আমীর মু'আবিয়া কনস্টান্টিনোপল আক্রমণ করে খৃস্টান শক্তিসমূহ বিশেষ করে রোমকদের বিতাড়িত করতে কৃতসংকল্প ছিলেন। তদুপরি একটি মুসলিম নৌবহর গঠন করাও ছিলো তাঁর ঐকান্তিক অভিলাষ।
তাঁর এই অভিলাষের কারণেই ভূমধ্যসাগর মুসলিম নৌবহরের লীলাক্ষেত্রে পরিণত হলো। আমীর মু'আবিয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিলো ভূমধ্যসাগরের সবগুলো দ্বীপ দখল করে সিরিয়া, আনাতোলিয়া ও মিসর পরিবেষ্টিত ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলাঞ্চলসমূহকে রোমকদের নৌ-হামলা থেকে চির নিরাপদ রাখা।
উনপঞ্চাশ হিজরীতে আমীর মু'আবিয়া সুফিয়ান ইবন 'আওফের নেতৃত্বে এক বিরাট বাহিনী প্রেরণ করেন। এই রণবহরটি ভূমধ্য-সাগরের তরঙ্গের সাথে খেলতে খেলতে বসফোরাস প্রণালীতে প্রবেশ করে। কনস্টান্টিনোপল রোমকদের মস্তবড় সমরকেন্দ্র ছিলো। তারা মুসলমান-দের মুকাবিলা করলো এবং তীব্রভাবেই করলো। ফলে মুসলমানদের পিছু হটতে হলো। কনস্টান্টিনোপল অজেয় থাকলো।
যাহোক, আমীর মু'আবিয়ার আমলে مسلمانوں বছরে অন্তত কয়েক দফা করে রোমকদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হতো। এইসব যুদ্ধে মুসলমানরা অনেকগুলো দ্বীপ দখল করেন।
তিপ্পান্ন হিজরীতে আমীর মু'আবিয়া আনাতোলিয়ার অদূরবর্তী রোডস দ্বীপ অধিকার করেন। এই দ্বীপটি সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিরতিশয় গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। আমীর মু'আবিয়া এটি দখল করে مسلمانوں বসতি স্থাপন করেন।
অনুরূপভাবে চুয়ান্ন হিজরীতে তিনি কনস্টান্টিনোপলের সন্নিহিত ইরওয়াদ দ্বীপ দখল করে সেখানেও مسلمانوں বসতি স্থাপন করেন। এই সময় সাকালিয়া দ্বীপেও মুসলমানরা হামলা করেন, কিন্তু তা বিজিত হয়নি।
ষাট হিজরীতে আমীর মু'আবিয়া ইন্তিকাল করেন। তাঁর গোটা শাসনকাল হচ্ছে উনিশ বছর তিন মাস। তিনি মুসলিম নৌবহর গঠনের ক্ষেত্রে যে সংকল্প, দৃঢ়তা ও স্বাধীনচিত্তের পরিচয় দিয়েছেন, তা থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। তাঁর সংগঠিত নৌবাহিনীই অভিজ্ঞ রোমান নৌবাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাভূত করেছিলো।
তাঁর শাসন 'আমলেই মুসলিম নৌবহরের বিশেষ উৎকর্ষ সাধিত হয়। অত্যল্প কালের মধ্যেই মুসলিম নৌবহর সুবিখ্যাত রোমান নৌবহরকেও ছাড়িয়ে যায়।
আমীর মু'আবিয়া কেবল মুসলিম নৌবহরেরই প্রতিষ্ঠাতা নন, বরং জাহাজ নির্মাণেরও তিনিই সূচনা করেছিলেন। তিনি তাঁর শাসন 'আমলে বেশ ক'টি জাহাজ নির্মাণ কারখানা স্থাপন করেন। সিরিয়া, ফিলিস্তীন ও মিসরের উপকূলে কারখানা নির্মাণ করেন।
আমীর মু'আবিয়া স্বতন্ত্র নৌ-বিভাগ কায়েম করে তার উন্নয়ন বিধান করেন। রণবহর, নৌসেনা, নৌ-সমরোপকরণ ও তার যাবতীয় ব্যবস্থাপনা এই বিভাগেরই অধীন ছিলো।
📄 ’উমাইয়া যুগে মুসলিম নৌবহর
উমাইয়াদের গোটা শাসনকালই ছিলো বিজয় অভিযান ও শান-শওকতপূর্ণ। আভ্যন্তরীণ গোলযোগ ও বিদ্রোহ সর্বদা লেগে থাকলেও ফৌজী দৃষ্টিকোণ থেকে উমাইয়া শাসন খুব মযবুত ছিলো।
ভূমি ও পানি উভয় ক্ষেত্রেই উমাইয়াদের বিজয় অভিযান ছিলো। আমীর মু'আবিয়া কেবল মুসলিম নৌবহর প্রতিষ্ঠাই করেননি, তিনি তাঁর শাসনকালে তা সমুন্নত ও সুদৃঢ়ও করেছিলেন। তার বিশদ বিবরণ তোমরা পূর্বেই পড়েছো। এখানে আমরা তাঁর উত্তরসূরিদের কিছু কীতিকথা তুলে ধরবো মাত্র।
আমীর মু'আবিয়া সতেরোশ' সশস্ত্র রণতরী রেখে যান। তাঁর পরে মুসলিম নৌবহরের যথেষ্ট উন্নয়ন সাধিত হয়। নৌযুদ্ধে নতুন নতুন এলাকা অধিকৃত হয়।
ইয়াযীদের শাসনকালে মুসলিম বিজয়াভিযান আফ্রিকার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলো। এ কারণে ভূমধ্যসাগরে মুসলিম নৌবহরের উপস্থিতি একান্ত আবশ্যক হয়ে পড়েছিলো। আবশ্যক হয়ে পড়েছিলো তা নিহায়ত শক্তিশালী অবস্থায় রাখা। তাই মিসর থেকে মরক্কো পর্যন্ত সকল নৌবন্দরেই নৌ কর্মকাণ্ডের সুবন্দবস্ত ছিলো।
ইয়াযীদের শাসনামলে উত্তর আফ্রিকার বন্দরগুলো নৌবহরে ভরপুর হয়ে থাকতো। তার কারণ ছিলো রোমান নৌবহরের মুকাবিলা করা। এই সময় বহুবার মুসলিম নৌবহরের হাতে রোমান নৌবহরের নিষ্করুণ বিপর্যয় ঘটে। যেসব কীর্তিমান পুরুষ মুসলিম নৌবহরের নেতৃত্ব দেন, তন্মধ্যে 'আবদুল্লাহ্ ইব্ কায়স হারিছী ও জানাদা ইব্ আবী উমাইয়ার নাম সমধিক পরিচিত। তাঁরা স্বীয় বীরত্ব ও অমিত-তেজ বলে রোমান নৌবহরকে চরমভাবে পর্যুদস্ত করেন।
এইসব জানবায বীর সেনানীই সাইপ্রাস, রোডস ও ক্রীট দ্বীপপুঞ্জ জয় করেন এবং সেগুলো রক্ষাকল্পে সেখানে নৌবহর প্রস্তুত রাখেন।
এ ছাড়া ইয়াযীদের সময় কয়েকবার কনস্টান্টিনোপলে স্থলাভিযানের সাথে সাথে নৌ-হামলাও করা হয়। আফ্রিকার উপকূল রক্ষার্থ সেখানকার বন্দরগুলোতে বিরাট নৌবহর মোতায়েন ছিলো। 'আরব মুসলমানরাই গোটা নৌ-ডিপার্টমেন্টটি পরিচালনা করতেন।
ওয়ালীদ ইব্ন 'আবদুল মালিকের শাসনকালে আটাশি হিজরীতে মুসলিম নৌবহর পুনর্গঠিত হয়। দুটি কারণে এই পুনর্গঠনের প্রয়োজন দেখা দেয়।
১. মুসলিম অধিকৃত ভূমধ্যসাগরীয় আফ্রিকান উপকূল রক্ষার্থ নৌবহরের প্রয়োজন ছিলো। আর নৌবহর পুনর্গঠন ব্যতীত তা সম্ভবপর ছিলো না।
২. রোমান নৌশক্তির মুকাবিলা হেতু ভূমধ্যসাগরের মেওরকা ও মানোরকা দ্বীপ দুটি দখল করা দরকার ছিলো। কেননা, উত্তর আফ্রিকার উপকূল অঞ্চলে রোমান নৌবাহিনী উপর্যুপরি হামলা করে চলছিলো।
সারডিনিয়া ভূমধ্যসাগরের একটি বিখ্যাত দ্বীপ। শস্যশ্যামল ও চিরহরিতের জন্যে এর বড় শুহরাত। আয়তনেও বেশ বড়সড়। মুসলিম নৌবহর তার উপর হামলা করলো। সারডিনিয়াবাসীরা কোনো প্রতিরোধই করলো না। বিনাযুদ্ধে সারডিনিয়া অধিকৃত হলো।
ওই সময় মুসলিম নৌবাহিনী ভূমধ্যসাগরের আরো কতিপয় দ্বীপাঞ্চল দখল করে ফেললো। রোমান নৌশক্তি মুসলিম নৌবহরের নিকট ফিকে ও বিবর্ণ হয়ে পড়েছিলো।
ওয়ালীদ যুগে আফ্রিকার উপকূলে নতুন নতুন জাহাজ নির্মাণ কারখানা স্থাপিত হয়। অনুরূপ সিরিয়া ও মিসরের পুরান কারখানাগুলোও পুনর্গঠিত হয়।
হিশাম ইব্ন 'আব্দুল মালিকের শাসনামলে স্থল-অভিযানের সাথে সাথে নৌ-অভিযানও পুনরারম্ভ হয়। এদিকে কিছুদিন থেকে ভূমধ্যসাগরে মুসলিম নৌ-অভিযান থমকে পড়েছিলো। হিশামের বিখ্যাত আমীরুল বহর ইব্ন হিজাব পুরাতন জাহাজ কারখানাগুলো পুনর্নির্মাণ করেন। তিনি কতিপয় নতুন কারখানাও স্থাপন করেন।
একশ' সতেরো হিজরীতে হাবীব ইব্ন আবী 'উবায়দার নেতৃত্বে সারদানিয়ার নৌ-অভিযান শুরু ও কামিয়াব হয়। মুসলিম নৌবাহিনী গোটা দ্বীপাঞ্চল দখল করে সেখানে একটি নৌ-ছাউনি স্থাপন করেন।
রোমকরা সাকালিয়ায় স্বীয় অধিকার সুদৃঢ় করেছিলো। কিন্তু হিশাম যুগে একশ' বাইশ হিজরীতে হাবীব সাকালিয়া আক্রমণ করেন। সাকালিয়ার বিখ্যাত শহর ও নৌবন্দর সারকাওসা বিজিত হয়। দ্বীপের অভ্যন্তরে স্থলযুদ্ধে হাবীবের খ্যাতিমান বীর পুত্র 'আবদুর রহমান রোমান বাহিনীকে বিপুলভাবে পর্যুদস্ত করেন। হাবীবের ইরাদা ছিলো পুরো দ্বীপাঞ্চলটি অধিকার করা। কিন্তু এই সময় উত্তর আফ্রিকায় বারবারদের ঘোর বিদ্রোহ শুরু হয়। এখানে ফৌজী শক্তি অপ্রতুল ছিলো। তাই ইব্ন হিজাব হাবীবকে ফেরত ডেকে পাঠান।
মোটের ওপর, হিশামের শাসনকাল মুসলিম শান-শওকতের স্বর্ণ যুগ ছিলো। এ সময় সবদিকে সমৃদ্ধি সাধিত হয়। বিশেষত ফৌজী নিজাম সুবিন্যস্ত ছিলো। সিপাহসালার ও আমীরুল বহর সুদক্ষ ছিলেন। তাই নৌ-অভিযানসমূহও অব্যর্থ ছিলো।
প্রশাসনিক অগ্রগতির সাথে সাথে সামরিক উন্নতিও বৃদ্ধি পায়। সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মযবুত কিল্লা তৈরী হয়।
মুসলিম ও রোমান সাম্রাজ্যর সীমান্তে অবস্থিত ইন্তাকিয়ায় কাতারগাশ, বোরা ও বুফা নামক তিনটি সুবৃহৎ মযবুত দুর্গ নির্মিত হয়। এছাড়া, সমগ্র সীমান্ত অঞ্চল সুদৃঢ় করে সেখানে সব রকম সমরোপকরণ সন্নিবেশ করা হয়।
গোটা নৌব্যবস্থাপনা পুনরায় ঢেলে সাজানো হয়। নৌবহরের মানোন্নয়নকল্পে নতুন নতুন প্রস্তাব ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। উত্তর আফ্রিকায় নৌবন্দরগুলো মেরামত করা হয়। উপযুক্ত স্থানসমূহে নৌ-কারখানা স্থাপন করা হয়। ভূমধ্যসাগরে সফল নৌ-আক্রমণ চালিয়ে রোমান নৌ-শক্তিকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়া হয়।
উমাইয়াগণ মাটি ও পানিতে ইসলামের বিজয়-বৈজয়ন্তী সমুন্নত রাখেন। ভূমির উচ্চ শিখরে ইসলামের বিজয় কেতন সগর্বে উড়তে থাকে।
মুসলিম সেনাবাহিনী ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় সদা ব্যাপৃত থাকে। মুসলিম নৌবহর ভূমধ্যসাগরের পৃষ্ঠদেশে সর্বক্ষণ চক্কর দিতে থাকে। রোমান নৌবহরগুলো মুসলিম নৌবহর থেকে এমনভাবে পালিয়ে বেড়াতো, যেমনিভাবে পালিয়ে বেড়ায় ছোট ছোট পাখিরা বাযপাখির ঝাঁপটা থেকে।
আহা! আজকের মুসলিম শাসকরা যদি তাঁদের এই বুনিয়াদী দুর্বল দিকটির প্রতি একটু নজর দিতেন, তা হলে ইসলামের সেই সোনালী যুগ আবার ফিরে আসতো। শুধু একটু ইচ্ছার প্রয়োজন।
📄 ’আব্বাসীয় ‘আমলে মুসলিম নৌবহর
'আব্বাসীয় 'আমলে মুসলিম জয়যাত্রা কতকটা থিতিয়ে পড়েছিলো। কারণ, তখন মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি অত্যধিক বেড়ে গিয়েছিলো। মুসলিম দেশসমূহের নিরাপত্তা ও আইন-শৃংখলা বিধান করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছিলো। তাই দেশের নিরাপত্তা ও শাসন ব্যবস্থার প্রতিই তাঁদের সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ হয়ে পড়েছিলো।
কিন্তু এতদসত্ত্বেও তাঁরা মাঝে-মধ্যে স্থল ও নৌ-অভিযান চালিয়ে সাফল্য অর্জন করেছিলেন। এখানে তাঁদের কয়েকটি নৌ-অভিযান বৃত্তান্ত তুলে ধরা হলো।
'আব্বাসীয় 'আমলের সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা হচ্ছে 'সাকালিয়া' বিজয়। মামুনের রাজত্বকালে মুসলিম নৌবাহিনী 'সাকালিয়া' আক্রমণ করেন। 'সাকালিয়া' ইতোপূর্বে মুসলমানদের অধিকারে ছিলো। কিন্তু রোমকরা হামলা করে সেটি পুনরুদ্ধার করে। তখন 'সাকালিয়ার' শাসনকর্তা ছিলেন কনস্টান্টাইন। 'সাকালিয়ার' নৌ-অধিনায়ক ছিলেন ফেমী। ফেমী মুসলিম নৌবহরের ওপর কয়েকবার হামলা চালান। একবার রোম সম্রাট সেনানায়ক ফেমীর ওপর ভীষণভাবে রুষ্ট হন এবং তাঁকে গ্রেফতার করে মৃত্যুদণ্ড দিতে 'সাকালিয়ার' গবর্নরকে নির্দেশ দেন।
এতে ফেমীর বন্ধু-বান্ধব ও অনুরক্তরা দারুণ ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে গবর্নরের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়। ফেমী আফ্রিকা থেকে সাকালিয়া পেঁৗছে রাজধানী 'সারকাওসা' করায়ত্ত করেন।
সাকালিয়ার গভর্নর তাঁকে অপসারণ করার ফন্দি আঁটেন। কিন্তু পরাজিত হয়ে গ্রেফতার ও নিহত হন। ফেমী সাকালিয়ার স্বাধীন সম্রাট ঘোষিত হন।
এই সময় আমীর যিয়াদাতুল্লাহ মুসলিম নৌযুদ্ধে খুব প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। আমীর যিয়াদাতুল্লাহ আফ্রিকার শাসনকর্তা ছিলেন। আফ্রিকা থেকে তিনি আসাদ ইব্ন ফুরাতের নেতৃত্বে তিনশ' বারো হিজরীতে সাকালিয়ায় অভিযান চালান। ফেমীর শোচনীয় পরাজয় ঘটে। মুসলমানরা কয়েকটি দুর্গ দখল করেন। রোমকরা প্রতারণার আশ্রয় নিলে মুসলমানরা তা দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করেন।
মুসলিম নৌবহর 'সারকাওসা' অবরোধ করে অল্প দিনের মধ্যেই তার পতন ঘটায়। 'সারকাওসা' বিজয়ের পর তার পার্শ্ববর্তী এলাকা-সমূহ অধিকার করে। এইভাবে স্বল্পকালের মধ্যেই গোটা 'সাকালিয়া'র ওপর মুসলিম প্রভুত্ব কায়েম হয়। ভূমধ্যসাগরে মুসলিম নৌবহরের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পায়।
'সাকালিয়া' বিজয়ের পর মুসলিম নৌবাহিনী অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপও অধিকার করেন।
দু'শ' আটাশ হিজরীতে খলীফা ওয়াছিক বিল্লাহর 'আমলে ভূমধ্য-সাগরের দ্বীপসমূহে মুসলিম সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। রণপোত কারখানা স্থাপন করা হয়। 'সাকালিয়া'র প্রসিদ্ধ নৌবন্দর মেসিনীরও মানোন্নীত হয়। এখান থেকে ভূমধ্যসাগরের নৌপথসমূহ পর্যবেক্ষণ করা যেতো।
দু'শ' উনচল্লিশ হিজরীতে তিনজন রোমান সেনানায়ক তিনশ' রণতরী যোগে মিসর আক্রমণ করেন। তাঁরা মিসরের দামিয়াত বন্দরে লঙ্গর ফেলেন।
ঘটনাক্রমে মুসলিম নৌবহরের সমুদয় নাবিক তখন ঈদ-উৎসব পালন উপলক্ষে মিসরের অভ্যন্তরভাগে জামা'আতবদ্ধ হয়েছিলেন। দামিয়াত বন্দর বিস্কুল ফাঁকা পড়ে ছিলো। রোমকরা নির্বিবাদে নগরবাসীদের নিধন করে ধন-সম্পদ ও অস্ত্রশস্ত্র লুণ্ঠন করে।
জনৈক মুসলিম সেনানায়ক-যিনি কারাগারে বন্দী ছিলেন-এই দৃশ্য অবলোকন করে স্বীয় পদবেড়ী ভেঙ্গে ফেলেন এবং مسلمانوں জমা করে রোমানদের ওপর এমন জোরে হামলা করলেন যে, ঊর্ধশ্বাসে পলায়ন ছাড়া তাদের গত্যন্তর রইলো না। এই ঘটনার পর দামিয়াতের নৌ-ছাউনি আরো মযবুত করা হয়। উপকূলে দুর্গ নির্মাণ করা হয়। নৌবহর আরো বাড়ানো হয়।
পূর্বেই বলা হয়েছে, সাকালিয়ার দ্বীপসমূহ ও তাঁর বিখ্যাত নৌ- বন্দর 'সারকাওসা' দীর্ঘদিন ধরে রোমান ও মুসলমানদের মধ্যে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। কখনো মুসলমানরা সাকালিয়া ও তার নৌবন্দরটি দখল করতেন, আবার কখনো রোমকরা।
দু'শ' চৌষট্টি হিজরীতে মুসলমানদের আমীর সাকালিয়ার জা'ফর ইন মুহাম্মদ সাগর ও ভূমি উভয় দিক দিয়ে সারকাওসা আক্রমণ করেন। রোমকরা তাদের গোটা নৌবাহিনী মুসলমানদের মুকা- বিলায় নিয়োগ করেও ব্যর্থকাম হয়। আরেক বারের মতো সাকালিয়ার ওপর মুসলিম আধিপত্য কায়েম হয়। মুসলিম নৌবহর কর্তৃক রোমান নৌবহর পরাভূত ও অধিকৃত হয়।
খলীফা মু'তাযিদের শাসনামলে দু'শ' সাতাশি হিজরীতে মুসলমানরা 'তারতুসের' বিখ্যাত নৌবন্দর দিয়ে রোমকদের আক্রমণ করেন। রোমকদের ত্রিশটি রণতরী ধৃত ও প্রজ্বলিত হয়। ত্রিশ হাযার নৌসেনা নিহত হয়।
রোমকরা তার পাল্টা ব্যবস্থা হিসাবে তারতুসের নৌবন্দর আক্রমণ করে তাকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইলো। কিন্তু তারতুসের শাসনকর্তা আবু ছাবিত প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলে তাদের পাল্টা আক্রমণ ব্যর্থ করে দেন।
'আব্বাসীয়গণ তাঁদের গৌরব যুগে মুসলিম নৌবহরের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার সর্বাত্মক প্রয়াস চালান এবং অবিরাম রোমান নৌবহরের সাথে সাগরবক্ষে যুদ্ধরত থাকেন। কিন্তু যখন 'আব্বাসীয়দের শক্তি হ্রাস পেতে লাগলো, তখন তুর্কী ও বিভিন্ন সেনানায়ক সবল হয়ে উঠলো। 'আব্বাসীয়দের সুবিশাল সাম্রাজ্য সেনানায়কদের মধ্যে বণ্টিত হলো। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য কায়েম হলো। মুসলিম নৌবহরও বিলীন হতে লাগলো। অবশ্য কতিপয় নতুন খানদান মুসলিম নৌশক্তিকে পুনরুদ্ধার করার প্রয়াস পান। পরবর্তী স্ব স্ব স্থানে সেগুলো আলোচিত হবে।