📄 মুসলিম রণপোত কারখানা
'আরবরা জাহাজ নির্মাণ কারখানাকে 'দারুস্সানা'আ' বলতো। জাহাজ নির্মাণ শিল্পে তারা পূর্ণ পারদর্শিতা অর্জন করেছিলো। আরবদের বদওলাতেই আজ বিশ্ববাসী نৌশিল্পে এত উৎকর্ষ সাধন করতে সক্ষম হয়েছে।
আধুনিক রণপোত শিল্প 'আরবরাই পত্তন করেছিলো। ইউরোপের অধিবাসীরা স্পেন, সিসিলী এবং আফ্রিকায় 'আরবদের নিকট থেকে এই বিদ্যা শিক্ষা করেছিলো। আরবদের পূর্বে জাহাজ-নির্মাতা ও জাহাজ- চালক ছিলো রোমকরা। কিন্তু তাদের জাহাজ-নির্মাণ ও নৌ-চালনা ছিলো সম্পূর্ণ পুরানো ধাঁচের। রোমকরা নিছক ছোট ছোট রণতরীই নির্মাণ করতে পারতো। বড় বড় যুদ্ধ-জাহাজ তাদের কারখানায় তৈরী হতো না। 'আরবরাই এই শিল্পে নতুনত্ব আনয়ন করেন। নতুন নতুন মডেল ও কৌশল আবিষ্কার করেন। 'আরবরাই সর্বপ্রথম নৌ-দফতর প্রতিষ্ঠা করেন। এই দফতরের নাম ছিলো 'দীওয়ানুল উন্ন'। এই দফতরের অধীনে অনেক বড় বড় ইঞ্জিনীয়ার ছিলেন। তাঁরা রণতরীর নতুন নতুন মডেল ও নক্সা তৈরী করতেন।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্পেন, আফ্রিকা, মিসর ও সিরিয়া ছিলো মুসলমানদের বড় বড় নৌকেন্দ্র। এই সবগুলো দেশই ভূমধ্য- সাগরের উপকূলে অবস্থিত। ভূমধ্যসাগরের উপকূলভাগ সব সময়ই তার মনোরম আবহাওয়ার দরুন তাহযীব-তামাদ্দুনের কেন্দ্রভূমি ছিলো।
মুসলমানরা তাঁদের সর্বপ্রথম 'দারুস্সানা'আ' প্রতিষ্ঠা করেন হিজরী প্রথম শতাব্দীতে মিসরের 'ফুসতাত্' নামক স্থানে। আহমদ ইব্ন তুলুন এই কারখানার উন্নতি বিধানে প্রাণান্ত চেষ্টা করেন। আশেদী খান্দানের শাসকরাও এর সবিশেষ উন্নতি সাধন করেন।
ফাতিমী শাসকগণ এটি 'ফুস্তাত্' থেকে 'মাকাসে' স্থানান্তর করে আরো শ্রীবৃদ্ধি ও বিস্তৃতি দান করেন। নদনদী ও সাগর-মহাসাগরেই ছিলো তাঁদের প্রকৃত রাজস্ব। তাঁদের রণতরী যেমন দেশের প্রতিরক্ষা কাজে নিরত থাকতো, তেমনি তাঁদের বাণিজ্যতরীগুলো প্রাচ্য দেশসমূহের পণ্যসম্ভার বহন করে পাশ্চাত্য দেশসমূহে পৌঁছে দিতো।
ফাতিমী আমলে দুই ধরনের জাহাজ নির্মিত হতো। এক-যুদ্ধ জাহাজ। এগুলোকে 'উস্কুল' বলা হতো। শুধু যুদ্ধের কাজেই ব্যবহৃত হতো। বিভিন্ন রণসম্ভার ও নৌসেনারা অবস্থান করতো। দুই-তেজারতী জাহাজ। এগুলো দ্বারা শুধু একদেশ থেকে আরেক দেশে পণ্যসামগ্রী আনা-নেয়া হতো। এগুলোকে বলা হতো 'নীলী' জাহাজ। 'নীলী' জাহাজগুলো 'উজ্জ্বল' থেকে আকারে ছোট হতো। ছোট নদ-নদীতেও যাতায়াত করতে পারতো।
'দারুস্সানা'আ'য় ছোট-বড় অনেক রকম যুদ্ধ জাহাজ তৈরী হতো। নামও ছিলো বিভিন্ন। আকার-আকৃতি ও গঠন-প্রকৃতিও ছিলো নানারূপ। এগুলোর সমষ্টিকে 'উজ্জ্বল' বলা হতো। আমরা এখানে কয়েকটি যুদ্ধ জাহাজের নাম উল্লেখ করছি।
শূনাঃ এগুলো বিরাটকায় ছিলো। এতে শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য কিল্লা ও মিনার তৈরী হতো।
হাররাকা: এগুলোতে 'মিজানীক' স্থাপন করা হতো। 'মিজানীক' দ্বারা শত্রু পক্ষের ওপর বিস্ফোরক দ্রব্য নিক্ষেপ করা হতো।
তার রাদাঃ এ ছিলো এক ধরনের ছোট দ্রুতগামী নৌবিশেষ।
উশারিয়াতঃ (এক বচনে 'উশারী'): এতে করে নৌ-সেনারা নীল নদে টহল দিয়ে বেড়াতো।
শালান্ দিয়াত্: (এক বচনে 'শালান্দী'): এসব দিয়ে বিভিন্ন খবরাখবর পৌঁছানো হতো।
মিস্তাহাত: (এক বচনে 'মিস্তাহ্'): 'মিস্তাহ্' সাধারণ যুদ্ধের কাজে ব্যবহৃত হতো।
'আরবী জাহাজের আকার-আকৃতি গ্রীক ও রোমান জঙ্গী জাহাজের অনুরূপ ছিলো। কারণ, 'আরবরা এই বিদ্যাটি গ্রীক ও রোমকদের নিকট থেকেই শিখেছিলেন।
'আরবদের জঙ্গী জাহাজে সাধারণত এইসব রণসম্ভার মওজুদ থাকতোঃ যিরাহ্ (লৌহবর্ম), খোদ (শিরস্ত্রাণ), ঢাল, নেযা, কামান, লৌহ যিঞ্জীর ও মিজানীক। মিজানীক দ্বারা শত্রু জাহাজের ওপর প্রস্তর নিক্ষেপ করা হতো।
যুদ্ধ-জাহাজের থামের ওপর বড় বড় সিন্দুক বাঁধা থাকতো। তাতে নৌসেনারা ওত পেতে বসে থেকে শত্রু পক্ষের ওপর পাথর, বিস্ফোরক, গরম চুন ইত্যাদি নিক্ষেপ করতো।
'আরব রণপোতগুলোতে নব-উদ্ভাবিত যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহৃত হতো। যখন যুদ্ধাস্ত্র আবিষ্কৃত হতো তাই দিয়ে তা সজ্জিত করা হতো।
জাহাজের চারদিকে চামড়া, পশমী কাপড় প্রভৃতি মুড়ে দেয়া হতো। আবার কখনো কখনো জাহাজের কাঠে এমন এমন জিনিস সেঁটে দেয় হতো, যাতে সেগুলোতে আগুন ধরে যেতে না পারে। যুদ্ধের সময় শত্রুর নজর থেকে বাঁচার জন্যে জাহাজে নিষ্প্রদীপ মহড়ার ব্যবস্থা করা হতো। হাঁস-মুরগী ও পাখ-পাখালি রাখা হতো না। অধিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে জাহাজের ওপর নীল রঙের কাপড় চড়িয়ে দেয়া হতো, যাতে শত্রুপক্ষ দূর থেকে জাহাজ দেখতে না পায়।
মুসলমানরা তাঁদের রণতরীর চারপাশে লোহার নেযা ও লম্বা সুচালো লৌহখণ্ড লাগিয়ে দিতো। ফলে, শত্রু জাহাজ তাঁদের কাছে ঘেঁষতে পারতো না। ঘেঁষা মাত্র ফুটো হয়ে পানিতে ডুবে যেতো।
মুসলমানরা জাহাজ নির্মাণের নতুন নতুন কৌশল আবিষ্কার করেন। এসব কৌশল গ্রীক ও রোমানদের মধ্যে প্রচলিত ছিলো না। ইউরোপের লোকেরা মুসলমানদের নিকট থেকে এগুলো লুফে নেয়। পরে তারা এর আরো উন্নতি সাধন করে।
ইউরোপে বাষ্প আবিষ্কৃত হওয়ার পর নৌ-জাহাজেও তার ব্যবহার শুরু হয়। এখন এই শিল্পটি জাতীয় উন্নতির চাবিকাঠি। যে জাতির নিকট উন্নত নৌশক্তি নেই, তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। দেশের নিরাপত্তা ও বাণিজ্য দুই-ই বিপন্ন।
📄 মুসলিম নৌবন্দরসমূহ
ইসলাম 'আরবদের মধ্যে এক নতুন প্রাণ-চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ফলে 'আরবদের বিচ্ছিন্ন গোত্রগুলো পরস্পর একসূত্রে গ্রথিত হয়েছে।
ইসলাম 'আরবদের একটি নতুন দীন দিয়েছে। একটি নতুন তামাদ্দুন দিয়েছে। নতুন উদ্যম ও নতুন আবেগ দিয়েছে। তাদের ব্যবসা- বাণিজ্য ও রাজনীতির শিরা-উপশিরায় নতুন শোণিত প্রবাহিত করেছে।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলায়হি ওয়া সাল্লামের যুগে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা 'আরবদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও খিলাফতে রাশিদার যুগে তার পরিধি 'ইরাক, সিরিয়া, মিসর ও আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। হযরত 'উমর রাদিয়াল্লাহু 'আনহু'র খিলাফতকালে মুসলমানরা একদিকে পারস্য উপসাগর ও অপরদিকে সিরিয়া ও ফিলিস্তিন অতিক্রম করে আলেকজান্দ্রিয়া পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাঁদের তখন সমসাময়িক বিশ্বের দুই বৃহৎ নৌশক্তি-ইরান ও রোমের মুকাবিলা করতে হয়েছিলো। ইরানীদের নৌকেন্দ্র ছিলো পারস্যোপসাগরের উবাল্লা বন্দর। আর ভূমধ্যসাগরের আলেকজান্দ্রিয়া বন্দর ছিলো রোমকদের নৌকেন্দ্র।
উবাল্লা ছিলো ইরানীদের সর্ববৃহৎ নৌবন্দর। এখান থেকেই ইরানী-দের বাণিজ্যতরীগুলো হিন্দুস্তান ও চীন দেশে যাতায়াত করতো। তেমনি-ভাবে রোমানদের বাণিজ্যতরীগুলোও আলেকজান্দ্রিয়া নৌ-বন্দর থেকে কনস্টান্টিনোপল ও পশ্চিম আফ্রিকার বন্দরগুলো পর্যন্ত পৌছে যেতো।
দুটি নৌকেন্দ্রই 'আরবদের দখলে আসে। তখন তারা আরো সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য হযরত 'উমর (রাঃ)-এর নিকট দরখাস্ত করেন। অভাবিত বিজয়োদ্দীপনা তাদের আরো সামনে বাড়ার জন্য ব্যাকুল করে তুলেছিলো। কিন্তু হযরত 'উমর (রাঃ) তাদের অনুমতি দিলেন না।
হযরত 'উমর (রাঃ) যে সমুদ্রের ভয়াল স্মৃতি দেখে ঘাবড়ে গিয়ে-ছিলেন, তা নয়। বরং তাঁর অনুমতি না দেয়ার কারণ ছিলো, 'আরবদের সমুদ্র অভিযানে পূর্ব-অনভিজ্ঞতা। ইরান ও রোমের অধিবাসীরা ছিলো নৌবিদ্যায় পারদর্শী। হযরত 'উমর (রাঃ) এ ব্যাপারে আগেই বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিপথে ছিলো 'আলা ইব্ন হাফ্রমীর একটি সদ্য পরাজয়ের ঘটনা। 'আলা ইব্ন্ন হাফ্রমী যে মাত্র কিছুদিন আগেই শত্রু পক্ষের কাছে পরাজয় বরণ করেছিলেন, সে কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। সংক্ষেপে এখানেও তা তুলে ধরা হলো।
'আলা ইব্ন হাফ্রমী ছিলেন বাহ্রায়নের গবর্নর। তিনি বাহ্রায়নে কতকগুলো রণতরী যোগাড় করে নদীপথে ইরানের বিখ্যাত পারস্য অঞ্চলে হামলা করেন। কিন্তু ইরানীরা নদীর তীর ধরে সামনে অগ্রসর হয়ে মুসলিম বাহিনীকে ঘিরে ফেলে। ফলে মুসলমানরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং স্থলপথে ফৌজী সাহায্য এসে পৌঁছলে পর তাঁরা এই অবরোধ থেকে মুক্তি পান।
হযরত 'উমর (রাঃ) শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌ-চালনার বিরোধী ছিলেন না। বরং তিনিই নৌ-বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। কি করে? এখন তাই শোনো!
একবার 'আরবে ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তখন ছিলো হযরত উমর (রাঃ)-এর খিলাফতকাল। অষ্টাদশ হিজরী সাল। হযরত 'উমর (রাঃ) 'আরবদের জন্য মিসর থেকে খাদ্য আমদানী শুরু করেন। কিন্তু স্থলপথে খাদ্য পৌঁছতে অনেক বিলম্ব ঘটছিলো। তাই তিনি এই সমস্যা সমাধানকল্পে এক সহজ পন্থা উদ্ভাবন করেন। তিনি উনসত্তর মাইল দীর্ঘ এক নহর খনন করে নীলনদকে লোহিত সাগরের সাথে মিলিয়ে দেন। এই খননকার্য ছয় মাসে সম্পন্ন হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই এই নহর দিয়ে নৌকাযোগে প্রচুর খাদ্যদ্রব্য মিসর থেকে 'আরবের 'জার' বন্দরে পৌঁছে যায়। এরপর বহুদিন পর্যন্ত এই খাল 'আরবদের অনেক উপকারে আসে।
'আমর ইবন 'আস (রাঃ) মিসরের গবর্নর ছিলেন। তিনিই সর্ব-প্রথম সুয়েজ খাল কেটে লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরকে মিলিয়ে দেয়ার সংকল্প করেছিলেন। কিন্তু হযরত 'উমর (রাঃ) তাঁর এই প্রস্তাব এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে, "এর ফলে রোমকরা মুসলিম হজ্জযাত্রীবাহী জাহাজ ছিনতাই করার সুযোগ পাবে।"
এখন আমরা মুসলিম অধিকৃত নৌবন্দরগুলোর একটু বিস্তারিত আলোচনা করবো।
জার: এ নৌবন্দরটি লোহিত সাগরের 'আরব উপকূলে বর্তমান য়াম্বু' বন্দরের সন্নিকটে অবস্থিত ছিলো। সপ্তম হিজরীতে যে মুসলিম দলটি হাবশা (আবিসিনিয়া) থেকে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন, তাঁরা এই বন্দরেই অবতরণ করেন। এতে বোঝা যায় যে, এই বন্দরটি প্রাক-ইসলামী 'আমল থেকেই সুপরিচিত ছিলো। অনন্তর হযরত 'উমর (রাঃ)-এর খিলাফতকালে মিসর ও সিরিয়া বিজয়ের পর এর গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়।
অতঃপর খাল কেটে নীল নদ ও লোহিত সাগরের মধ্যে সংযোগ সাধন করলে এটি প্রভূত মর্যাদার অধিকারী হয়। কেননা, তখন ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী ছিলো মদীনা মুনাওয়ারা আর 'জার' ছিলো তারই নৌবন্দর।
মদীনা মুনাওয়ারার জন্যে চতুর্দিক থেকে এখানেই মালামাল এসে নামতো এবং এই 'জার' বন্দর থেকেই মুসলিম বাণিজ্যতরীগুলো হাবশা, মিসর, এডেন, হিন্দুস্তান ও চীনদেশ পর্যন্ত যাতায়াত করতো।
ইসলামের প্রারম্ভকাল থেকেই এর শোভা-সৌন্দর্য ও চাকচিক্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। 'জার' কেবল নৌবন্দরই ছিলো না, মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যেরও পীঠস্থানে পরিণত হয়েছিলো। এখানে বড় বড় মুসলিম পণ্ডিত ও শিক্ষাবিদ জন্মগ্রহণ করেন। বড় বড় অট্টালিকা নির্মিত হয়।
জারের বিপরীত দিকে সমুদ্র মাঝে এক বর্গমাইলের একটি দ্বীপ ছিলো। দ্বীপটির নাম ছিলো 'কারাফু'। সেখানে লোকজন নৌকায় যাতায়াত করতো। জারের ন্যায় এখানেও একটি মনোরম সওদাগর বসতি ছিলো।
উবাল্লা: বসরার অদূরে দজলা (তাইগ্রিস) নদীর তীরে সুপ্রাচীন এক ইরানী নৌবন্দর ছিলো। নাম উবাল্লা। ইসলামী 'আমলে এটি কেন্দ্রীয় মর্যাদা লাভ করেছিলো। ইসলাম-পূর্বকালে ইরানী সেনা- ছাউনি ও বাণিজ্য বন্দর ছিলো। চতুর্দশ হিজরীতে মুসলিম অধিকার- ভুক্ত হয়। এখানে বিশেষভাবে চীন ও হিন্দুস্তানগামী জাহাজ থাকতো। এটি দখল করার দরুনই মুসলমানগণ পূর্ণরূপে ইরান দখল করতে সক্ষম হন। ২৫৬ হিজরী পর্যন্ত এর দব্দবা অক্ষুণ্ণ ছিলো। অতঃপর ক্রমান্বয়ে তার গুরুত্ব লোপ পায়।
বসরাঃ এই নৌবন্দরটি হযরত 'উমর (রাঃ)-এর নির্দেশক্রমে চতুর্দশ হিজরীতে 'কারনা' ও 'শাতিল 'আরবের' মধ্যস্থলে নির্মিত হয়। ভৌগোলিক অবস্থানগত গুরুত্বের দরুন স্বল্পকালের মধ্যেই বসরা সমৃদ্ধি লাভ করে উবাল্লার দীপ্তিকেও ম্লান করে দেয় এবং ক্রমে ক্রমে চীন ও হিন্দুস্তানগামী জাহাজের এক বিশিষ্ট কেন্দ্রে পরিণত হয়। মুসলমানদের সিন্ধু বিজয়ের পর এর রওনক আরো বৃদ্ধি পায়। সিন্ধু ও বস্ত্রার যোগাযোগ আরো ঘনিষ্ঠ হয়।
সীরাফ: এই নৌবন্দরটি হিজরী তৃতীয় শতকে বসরার অদূরে পারস্যোপসাগরে স্থাপিত হয়। এটিরও জৌলুস ছিলো অত্যধিক। 'আরবের বাণিজ্য তরী এখান দিয়েই চীন ও হিন্দুস্তান যাতায়াত করতো।
এডেন: য়ামন উপকূলে এডেন বন্দর অবস্থিত। সুপ্রাচীন নৌ- বন্দর। হিজরী তৃতীয় শতকে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছিলো। এডেন য়ামনের রাজধানী সানা'আর নৌবন্দর ছিলো। এখান দিয়ে হাক্কা, মানদাব, জেদ্দা, হিন্দুস্তান ও চীনের বাণিজ্য তরী আসা-যাওয়া করতো। হিজরী চতুর্থ শতকে সমৃদ্ধির উচ্চশিখরে আরোহণ করে। এডেন বাজার খুবই জমজমাট ও মালামালে ভরপুর ছিলো।
সুহার: সুহার আম্মানের রাজধানী ও নৌবন্দর ছিলো। হিজরী চতুর্থ শতকে এই বন্দরটি স্বীয় ঔজ্জ্বল্য, বৈভবের প্রাচুর্য ও বর্ণাঢ্য বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে সানা'আর চাইতেও উন্নত ছিলো। সমকালীন পর্যটকদের ভাষায়: সুহারের বাজারটি অত্যন্ত জৌলুসময়। গোটা সমুদ্র উপকূল জুড়ে বিস্তৃত। সুউচ্চ ও সুরুচিময় ঘরদোর শালকাঠ ও ইট দ্বারা নির্মিত। উপকূলে মিঠা পানির নহর প্রবাহিত।
জেদ্দাঃ এ নৌবন্দরটি প্রাচীনকাল থেকেই আবাদ ছিলো। ইসলাম- পূর্ব জাহিলী যুগেও এটি মক্কা মু'আজ্জমার নৌবন্দর ছিলো। অতঃপর আফ্রিকা, আবিসিনিয়া, সিন্ধু ও ইরানে ইসলামের অগ্রগতির সাথে সাথে এরও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। অধুনা এটি বিশেষ করে প্রাচ্য দেশীয় হজ্জযাত্রীদের বন্দরে পরিণত হয়েছে।
শহর কুল্ল্ফমঃ লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত এক বিরাট শহর ও নৌবন্দর ছিলো। বিশেষভাবে খাদ্য সরবরাহ কেন্দ্ররূপে ব্যবহৃত হতো। যেসব সওদাগর মিসর থেকে হিজাজ ও য়ামনে খাদ্যশস্য সরবরাহ করতেন এই বন্দরটিই তাঁদের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র ছিলো। এখানে বিভিন্ন দেশের সওদাগররা বসবাস করতেন।
ঈলা: ঈলার বর্তমান নাম আকাবা। এটি ছিলো সিরিয়ার সুপ্রসিদ্ধ নৌবন্দর। ঈলা বন্দর লোহিত সাগরের পাড়ে সমৃদ্ধিশালী শহর ছিলো। এখানে সিরিয়া, মিসর ও উত্তর আফ্রিকার বাণিজ্য তরী যাতায়াত করতো। ঈলা ছিলো হরেক রকম পণ্যদ্রব্যের বাণিজ্যকেন্দ্র। উত্তর আফ্রিকার হজ্জযাত্রিগণ এই বন্দরেই অবতরণ করতেন।
ভূমধ্যসাগর সিরিয়ার উপকূল থেকে উত্তর আফ্রিকার 'জাবালুত্ তারিক' পর্যন্ত বিস্তৃত। মুসলমানদের ওপর রোমানদের আক্রমণ আশঙ্কা বরাবরই লেগেছিলো। তাই মুসলমানরা সিরিয়ার উপকূলবর্তী 'সূর' নামক স্থানে জাহাজ নির্মাণ কারখানা স্থাপন করেছিলেন। 'আরব-দের সমুদ্র বিজয় যতই আগু বাড়ছিলো, রোমানরাও ততই পিছু হটছিলো। বনু উমাইয়ার পর বনু 'আব্বাস মুসলিম নৌশক্তির অধিকারী হন। তাঁদের পর উত্তর আফ্রিকার অধিপতি হন 'উবায়দী ফাতিমী।
ফাতিমীদের রাজত্ব ভীষণ শক্তিশালী ছিলো। সিসিলী, সিরিয়া ও মিসরের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। ফাতিমিগণ নৌবাহিনী সম্পর্কে বড় উৎসাহী ছিলেন। এ ছাড়া, তাঁদের বেশীর ভাগ পথই নৌ-নির্ভর ছিলো। তাই নৌ-উন্নয়ন তাদের অত্যাবশ্যকীয় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাঁরা তিউনিসের পুরান নৌ-কারখানা সমৃদ্ধ করে তোলেন।
মাসীনা: মাসীনা ছিলো সিসিলীর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ও সামরিক বন্দর। এখানে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সওদাগররা বাণিজ্যিক পণ্যদ্রব্য লেনদেন করতেন। মাসীনাতেই সিসিলীর সর্ববৃহৎ রণপোত কারখানা স্থাপিত হয়েছিলো।
পালার্মোঃ পালার্মো ছিলো সিসিলীর রাজধানী ও বিশাল নৌবন্দর। এখানেও যুদ্ধ জাহাজের একটি বিরাট কারখানা ছিলো। হাযার হাযার শ্রমিক-মিস্ত্রী এই কারখানায় কাজ করতো।
মারীয়া: মারীয়া স্পেনের সর্ববৃহৎ নৌবন্দর। এখান থেকে সওদাগররা জাহাজে আরোহণ করতেন। মস্তবড় বাণিজ্য ও রণপোত কেন্দ্র ছিলো। স্বীয় বিশালত্ব ও যাতায়াত সুবিধার জন্যে এটিকে স্পেনে প্রাচ্যের সিংহদ্বার বলা হতো। সাগরের পানি নগর দেওয়ালে এসে আছড়ে পড়তো। এখানে উন্নতমানের রেশমী কাপড় তৈরী হতো।
বিজায়াঃ বিজায়া ছিলো উত্তর আফ্রিকা ও মরক্কোর সর্বাধিক পরিচিত নৌবন্দর। আলজিরিয়া ও তিউনিসের মাঝখানে অবস্থিত। প্রথমদিকে অতি সাধারণ নৌবন্দর ছিলো। ৪৫৭ হিজরীতে নাসির ইবন 'আন্নাস এটিকে উপযুক্ত নৌস্থল ভেবে আবাদ করেন। ফলে ক্রমে ক্রমে এক বিশাল নৌবন্দরে পরিণত হয়। এখান থেকে সর্বত্র জাহাজ চলাচল করতো।
সান্তাঃ এটি মরক্কোর বিখ্যাত নৌবন্দর ছিলো। স্পেনের উল্টো দিকে আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত। এক সময় পৃথিবীর উৎকৃষ্টতম পোতাশ্রয় ছিলো।
মাহদীয়াঃ ফাতিমী রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা ৩০০ (তিনশ') হিজরীতে আফ্রিকার উপকূলে মাহদীয়া নির্মাণ করেন। স্বীয় স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে খ্যাতিমান বন্দর ছিলো। উপকূলের পাথর কেটে নির্মিত হয়েছিলো। এখানে একটি সুন্দর প্রবেশপথ ছিলো। শিকল দিয়ে বাঁধা হতো। জাহাজ ভিড়ার সময় শিকল খুলে ফেলে পুনরায় বেঁধে দেয়া হতো।
তিউনিসঃ এই নৌবন্দরটি অতি সুপ্রাচীন। 'আবদুল মালিক ইব্ন মারওয়ান তিউনিস বন্দরকে জাহাজ নির্মাণের জন্যে নির্বাচন করেছিলেন। মুসলমানদের জাহাজ নির্মাণ শিল্পে এই বন্দরটি বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেছিলো। বলতে গেলে, এখান থেকেই মুসলমানদের জাহাজ নির্মাণ ও নৌ-চালনার অভিযাত্রা শুরু হয়েছিলো। এই বন্দরটি ছিলো অতি সুরক্ষিত ও অপার্থিব শক্তি মহিমায় মণ্ডিত। এখানে জাহাজ ভিড়ার পর সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়ে যেতো। কোনো ঝড়-তুফানের আশঙ্কা থাকতো না। এর সন্নিকটে দুটি প্রকাণ্ড ঝিল আছে। একটির নাম 'বারাস্তা' ও আরেকটির নাম 'হাল্কুল ওদ'। দুই ঝিলের মাঝখানে একটি ভূখণ্ড বিদ্যমান। এই ভূখণ্ডটি কেটে ঝিল দুটিকে মিলিয়ে দিলে তিউনিস এমন এক সুবিস্তৃত নৌবন্দর হতে পারে, যেখানে ভূমধ্য-সাগরের সকল নৌযান একত্রে থাকা সম্ভব।
শহর রশীদঃ হিজরী তৃতীয় শতকের শেষভাগে মিসরের তিউনিস সাগরে বড় বড় জাহাজ চলাচল করতো। এখানে শহর রশীদ নামে একটি বর্ণোজ্জ্বল নৌবন্দর ছিলো। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিলো নীল নদের পানি সাগরে পতিত হওয়ার দরুন সাগরের জাহাজ অনায়াসেই নীল নদে প্রবেশ করতে পারতো।
শহর কাওস: মামলুক 'আমলে এই বন্দরটি খুবই সরগরম ছিলো। এটি মস্তবড় উপকূলীয় শহর। মিসরের 'বন্দর সাঈদ' নামে খ্যাত। দক্ষিণ দেশ থেকে 'শূর' নদ দিয়ে জাহাজযোগে আগত সওদাগররা এখানে থামতেন। এডেনের সওদাগররাও এখানে থামতেন। নৌ-বাণিজ্যের দরুন এখানে বিপুল ধন-ঐশ্বর্য ছিলো।
দামিয়াত: এই বন্দরটির একপ্রান্ত নীল নদের সাথে এবং অপর প্রান্ত ভূমধ্যসাগরের সাথে যুক্ত ছিলো। এটি মিসরের সুবৃহৎ নৌবন্দর ছিলো। এখানে নৌযুদ্ধের মহড়া অনুষ্ঠিত হতো। দামিয়াতে দুটি মিনার ছিলো। মিনার দুটির সাথে লোহার মোটা শিকল টানা থাকতো। ফলে সরকারের বিনা অনুমতিতে এখানে কেউ জাহাজ নোঙ্গর করতে পারতো না।
আলেকজান্দ্রিয়া: আলেকজান্দ্রিয়া মিসরের প্রাচীন নামকরা নৌবন্দরসমূহের অন্যতম। গ্রীকদের 'আমলে নির্মিত হয়েছিলো। নাম থেকেই বোঝা যায়, এটি সম্রাট আলেকজান্ডারের সৃষ্টি। সেই থেকে আজো তার ঔজ্জ্বল্য অম্লান। আলেকজান্দ্রিয়া মুসলিম 'আমলে একটি বিখ্যাত নৌবন্দর ছিলো।
ওপরে আমরা মুসলিম নৌবন্দরগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরলাম। তোমরা বড় হয়ে আরো অনেক কথা জানতে পারবে। দেশের প্রতিরক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যে নৌবন্দর অত্যাবশ্যক।
যে সব দেশের কাছে নৌবন্দর নেই, তারা শক্তিশালী হতে পারে না। ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামরিক শক্তির জন্যে নৌবন্দর, জাহাজ নির্মাণ ও নৌ-চালনা শিক্ষা অপরিহার্য। যে জাতির উন্নত নৌবন্দর আছে, যাদের নৌ-কারখানায় অহর্নিশ নির্মাণ কাজ চলে, যাদের নৌযান সাগরবক্ষ চিড়ে দেশ-দেশান্তরে নতুন নতুন জিনিসপত্র আমদানী-রফতানী করছে, তারা সত্যই সৌভাগ্যবান।
নাবিক সেজে দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করা তোমাদেরও কর্তব্য। আল্লাহ্ তোমাদের শক্তি ও সামর্থ্য দান করুন। জাতির মান-মর্যাদা নৌশক্তিতেই নিহিত।
📄 মুসলমানদের বাণিজ্য
সমুদ্রপথে নৌ-চলাচলের সুবিধার্থে বিশেষ বিশেষ স্থানে বাতিঘর স্থাপন করা হয়। কুরআন মজীদে বলা হয়েছে: নক্ষত্র ব্যতীত আরো কিছু নিদর্শন আছে, যদ্দ্বারা তারা (মানুষেরা) পথের দিশা লাভ করে (সূরা নাহল)।
দুনিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রথম বাতিঘর নির্মিত হয় আলেকজান্দ্রিয়ায়। আজ থেকে দু'হাজার বছরেরও আগে এ বাতিঘরটি নির্মিত হয়েছিলো। এর একশ' বছর পর সমুদ্রগামী জাহাজের পথ-নির্দেশক হিসেবে বিভিন্ন স্থানে বাতিঘর নির্মাণ করা হয়। সমুদ্রে জাহাজ চালনায় নক্সা অঙ্কনের পর দ্বিতীয় জরুরী জিনিস হচ্ছে বাতিঘর। মুসলমানগণ সমুদ্রে জাহাজ চালনার সময় এইসব বাতিঘর থেকে পথ-নির্দেশ লাভ করতেন।
মুসলমানদের বাতিঘরগুলোর আকার-আকৃতি ও রূপ-প্রকৃতি ছিলো এরূপঃ সমুদ্রের বিশেষ বিশেষ স্থানে বড় বড় খাম্বা গেড়ে তার ওপর বাতিঘর নির্মিত হতো। এইসব বাতিঘরে কিছু লোক অবস্থান করতো। তারা রাতের বেলা বাতি জ্বালিয়ে রাখতো এবং কোনো কারণে তা নিভে গেলে পুনরায় জ্বালিয়ে দিতো।
এইসব বাতিঘর সাধারণত জাহাজ চলাচলের পক্ষে বিপজ্জনক স্থানে তৈরী হতো। এর দ্বারা এটাই বুঝানো হতো যে, জাহাজ চলাচলের জন্যে এ স্থানটি বিপদসঙ্কুল। এখান থেকে জাহাজ দূরে রাখতে হবে। কিংবা এটি হচ্ছে একটি সামুদ্রিক নৌবন্দর। এখানে এসে জাহাজ থামবে।
মুসলমানরা আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘরটি সযত্নে রক্ষা করেছেন। আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর দুনিয়ার অন্যতম আশ্চর্য বস্তু। এটি ২৭৫ ফুট উঁচু। আলেকজান্দ্রিয়ার সুবৃহৎ প্রাচীন নৌ-বন্দরের সম্মুখে দণ্ডায়মান।
মুসলিম 'আমলে এই বাতিঘরে একটি আতশদান জ্বালিয়ে রাখা হতো। অনুরূপভাবে পারস্যোপসাগরেও বড় বড় খাম্বা পুঁতে এরূপ নিদর্শন তৈয়ার করা হতো।
মুসলিম শাসনামলে এইসব বাতিঘরের প্রচলন অত্যধিক বেড়ে গিয়েছিলো। ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন গমনপথে আলোকস্তম্ভ নির্মিত হয়েছিলো। মুসলমানগণ নৌ-উন্নয়নের সাথে সাথে বাতিঘরেরও উন্নয়ন সাধন করেন।
আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর তৈরীর পর রোমকরা বিভিন্ন স্থানে বাতিঘর তৈরী শুরু করে। অষ্টাদশ খৃস্টাব্দে ইংল্যাণ্ডের উপকূলে মাত্র ২৫টি বাতিঘর ছিলো। সমুদ্র মাঝে প্রথম বাতিঘর নির্মিত হয়েছিলো ১৬৯৬ খৃস্টাব্দে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে এই বাতিঘর নিমিত হতো কাঠের দ্বারা। সর্বপ্রথম পাথরের বাতিঘর নির্মিত হয় ১৮০৭ খৃস্টাব্দে। ইংল্যাণ্ডের খ্যাতনামা ইঞ্জিনীয়ার রবার্ট স্টিভিসন এই বিরাট বাতিঘরটি নির্মাণ করেন। ছয় লাখ টাকা ব্যয়ে চার বছরে এটি নির্মিত হয়।
মুসলমানরা এই প্রয়োজনীয় আবিষ্কারটি দুনিয়ার অন্যান্য জাতিকে দান করেছেন। প্রথম দিকে এইসব বাতিঘর এক বিশেষ ধরনের তেল দ্বারা জ্বালানো হতো। অতঃপর বিদ্যুৎ আবিষ্কার হলে বিদ্যুৎ দ্বারাই তা প্রজ্বলিত হয়।
কোনো কোন বাতিঘরে এখনো তেলের বাতি জ্বলে। পশ্চিম অস্ট্রে-লিয়ার ক্লিপ্সন দ্বীপে একটি বাতিঘর আছে। এই বাতিঘরটি এগারো লাখ ষাট হাযার মোমবাতি শক্তিসম্পন্ন। অর্থাৎ এগারো লাখ ষাট হাজার মোমবাতি জ্বালালে যতখানি আলো হয়, ওই বাতিঘরটির আলোও ঠিক ততখানি। এই বাতিঘরেও তেল ব্যবহৃত হয়। ফ্রান্সের বিখ্যাত 'কেপ ডি হিউ' নামক বাতিঘরটি সাম্প্রতিক বিশ্বে সর্বাধিক আলোকো-জ্জ্বল। এই বাতিঘরের আলো হচ্ছে দুই কোটি পঁচিশ লাখ মোমবাতি শক্তিসম্পন্ন।
যে জাতির বাতিঘর উজ্জ্বল, সে জাতির কপালও উজ্জ্বল। বাতি-ঘরের আলো ও মাহাত্ম্য দ্বারাই একটি জাতির নৌশক্তি পরিমাপ করা যায়।
বর্তমানে পৃথিবীর শক্তিমান দেশগুলোর বারো হাযার বাতিঘর চালু রয়েছে। তন্মধ্যে তিন হাযার আমেরিকার উপকূল অঞ্চলে অবস্থিত। এর কোনো কোনোটি আবার সমুদ্রের অতি বিপজ্জনক নৌপথে দণ্ডায়মান। এগুলোর অনির্বাণ দীপশিখা হাযার হাযার মানুষের প্রাণরক্ষা করছে। এটা আমেরিকান জাতির গৌরবের প্রতীক।
ইংল্যাণ্ডের উপকূল অঞ্চলে প্রায় তিনশ' আলোকস্তম্ভ আছে। এগুলো দিন-রাত নৌ-জাহাজকে পথ-প্রদর্শন করছে। এটা ইংরেজ দ্বীপাঞ্চল-বাসীদের নৌ-তৎপরতারই উজ্জ্বল নিদর্শন। যে জাতির আলোকস্তম্ভ আলোকযুক্ত, সে জাতির ললাটপিদিমও প্রদীপ্ত।
আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, নৌশক্তি প্রবৃদ্ধি করা। জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ চালনায় অংশগ্রহণ করা। সমুদ্রভীতি উপেক্ষা করা। যে জাতির তরুণ সমাজ সাগরের ঝঞ্ঝাবর্ত ও সমুদ্রের তরঙ্গাভিঘাতকে ভয় করে না, আল্লাহ্ তাঁদের নতুন জগৎ প্রদান করেন। বিশ্বসভায় মর্যাদার আসন প্রতিষ্ঠা করেন। তোমরাও এটা পরীক্ষা করে দেখো!
যে জাতি সমুদ্রকে ভয় করে, যে জাতির তরুণ সমাজ সমুদ্র তরঙ্গে প্রবেশ করতে অনীহ, আল্লাহ্ তাদের কেবল রাজত্বই ছিনিয়ে নেন না, তাদের মান-ইজ্জতও খতম করে দেন। সমুদ্রের উপকারিতা ও নৌ-সফরের হিতকারিতার আলোচনায় কুরআন মজীদ ভরপুর হয়ে আছে। কুরআন মজীদের নির্দেশ মতো যদি আমরা চলতাম, তাহলে দুনিয়ায় আমরা সম্মান ও সৌভাগ্যের অধিকারী হতাম। চেষ্টা করে দেখো! আল্লাহ কারো শ্রমই বৃথা নষ্ট করেন না।
📄 সাগরবক্ষে মুসলমানদের আধিপত্য
উত্থান যুগে মুসলমানরা ছিলেন সারা বিশ্বজগতে উন্নতশির। তামাম দুনিয়ার সাগর-মহাসাগরেই তাঁদের আধিপত্য ছিলো প্রতিষ্ঠিত। পারস্য উপসাগর ছিলো প্রাচ্য দেশসমূহের নৌকেন্দ্র।
হিন্দবাদ ও সিন্দবাদের কিস্সা তোমরা নিশ্চয়ই পড়ে থাকবে। কি মজার কাহিনী তাই না! এসব কাহিনী কিন্তু ওই নৌকেন্দ্রের সাথেই জড়িত। এসব রূপকথা রচনার উদ্দেশ্য ছিলো মুসলমান জওয়ানদেরকে সাগর ভ্রমণ ও নৌ-অভিযানে উদ্বুদ্ধ করে তোলা।
পূর্বাঞ্চলের নৌপথসমূহ হিন্দুস্তানের উপকূল ঘেঁষে চীন, জাভা, সুমাত্রা ও মালয় প্রভৃতি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। এই সমগ্র নৌপথই মুসলিম নাবিকদের কব্জায় ছিলো। এইসব নৌপথে শুধু ইসলামের ঝাণ্ডাই উড়তো না, বরং ওই বীর নাবিকদের বদওলতে জাভা, সুমাত্রা, মালয় প্রভৃতি অঞ্চলে ইসলামের আশীষবার্তাও পৌঁছে গিয়েছিলো। ফলে এইসব সাগরপথে মুসলমানদের নৌ-চালনা ছিলো শান্তিপূর্ণ বাণিজ্য- ভিত্তিক। মুসলিম সওদাগররা জাহাজযোগে চীন ও ভারতবর্ষ থেকে বাণিজ্যদ্রব্য পশ্চিম দেশে পৌছে দিতেন।
ভূমধ্যসাগরে মুসলমানদের নৌশক্তি ছিলো জঙ্গী নৌবহরের। ভূমধ্যসাগরের উপকূলবর্তী প্রায় সবগুলো জাতিই ছিলো নৌবহরের অধিকারী। নৌযুদ্ধেও ছিলো তারা পারদর্শী। তাই মুসলমানদেরও নৌবহর সংগঠন ও রণপোত কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে হয়। ফলে অনতিকালের মধ্যেই ভূমধ্যসাগর মুসলিম অধিকারে আসে। দুনিয়ার কোনো নৌশক্তিই তাঁদের মুকাবিলা করতে পারতো না।
মুসলিম শাসন কায়েমের পর যখন তাঁদের নৌ-কর্তৃত্বও হাসিল হলো, তখন বিভিন্ন পেশার লোক তাঁদের নিকট চাকরিপ্রার্থী হলো।
মুসলমানরা মাঝি-মাল্লা ও নাবিকদেরকে চাকরি দিলেন। তাঁদের সমুদ্র- জ্ঞান ও নৌ-দক্ষতা বৃদ্ধি পেলো। বড় বড় নাবিক ও নৌ-বিশেষজ্ঞ সৃষ্টি হলো। নৌযুদ্ধের উৎসাহ বাড়লো। যুদ্ধ-জাহাজ বানালেন। সেগুলোকে নৌসেনা ও অস্ত্রসজ্জিত করলেন। নৌবাহিনীকে সমুদ্র-পৃষ্ঠে সওয়ার করালেন। ভূমধ্যসাগরের অপর পারে লড়তে পাঠালেন।
নৌযুদ্ধের জন্য মুসলমানরা সিরিয়া, আফ্রিকা, মরক্কো ও স্পেনের উপকূল বেছে নিলেন। 'আবদুল মালিক ইব্ন মারওয়ান আফ্রিকার গভর্নর হাসান ইব্ নু'মানকে তিউনিসে জাহাজ নির্মাণ কারখানা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিলেন।
তিনি তিউনিসে এক বিশাল জাহাজ নির্মাণ কারখানা কায়েম করেন। এই কারখানার জাহাজে ভূমধ্যসাগরের বন্দরগুলো ছেয়ে যায়। সেকালের তিউনিস ছিলো مسلمانوں এক বিশাল নৌকেন্দ্র।
এই কেন্দ্র থেকেই সিসিলীতে গালবিয়া শাসনামলে যিয়াদাতুল্লাহ্ ইব্ন ইব্রাহীম আগলাব সাকালিয়ায় নৌ-হামলা চালান। সাকালিয়া পদানত ও কাওসারা বিজিত হয়।
আগলাবিয়াদের পর 'উবায়দিয়া ও উমাইয়া শাসনামলে আফ্রিকা ও স্পেনের নৌবহরগুলো অপর পারে হামলা চালাতো। 'আবদুর রহমান আন্নাসিরের 'আমলে স্পেনীয় নৌবহরে প্রায় দু'শ' রণপোত ছিলো। আফ্রিকার নৌবহরেও সমসংখ্যক যুদ্ধ-জাহাজ ছিলো।
স্পেনীয় আমীরুল বহর (নৌবাহিনী প্রধান) ছিলেন ইবন রামাহাস। আর এই জাহাজগুলোর কেন্দ্রীয় বন্দর ছিলো বিজায়া ও মারীয়া। প্রতিটি নৌবন্দরে আবার একজন উচ্চতর কর্মকর্তা নিযুক্ত থাকতেন। তিনি সমস্ত জাহাজ, জাহাজের কাপ্তান ও নৌসেনাদের তত্ত্বাবধান করতেন। প্রতিটি জাহাজের কাপ্তানকে বলা হতো 'রঈস' বা সর্দার। রঈস তাঁর জাহাজের পূর্ণ তদারককারী ছিলেন।
যুদ্ধ বাধলে সমস্ত যুদ্ধ জাহাজ বন্দরে একত্রিত করে রণসম্ভারে সজ্জিত করা হতো এবং একজন আমীরের অধীনে যুদ্ধে পাঠানো হতো। সোনালী যুগে ভূমধ্যসাগরের সামরিক ঘাঁটিগুলো মুসলমানদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিলো। খৃস্টান নৌশক্তি ছিলো মুসলমানদের তুলনায় অতি নগণ্য। ফলে সর্বত্রই মুসলমানদের নৌ-বিজয় সূচিত হয়। ভূমধ্যসাগরের গোটা উপকূলভাগ অধিকৃত হয়। বিশেষ করে মীওরকা, মানওরকা, ইয়াবিসা, সারদানিয়া, সাকালিয়া, কাওসারা, মাল্টা, ক্রীট ও সাইপ্রাস প্রভৃতি এলাকা।
আবুল কাসিম ও তাঁর পুত্রগণ ভূমধ্যসাগরের বিখ্যাত বন্দর 'মাহ- দীয়া' থেকে নৌবহর নিয়ে বের হতেন এবং ইউরোপের উপকূল ভাগে হামলা চালিয়ে বিভিন্ন এলাকা কব্জা করতেন।
দানীয়ার ওয়ালী মুজাহিদ 'আমিরী ৪০৫ হিজরীতে তাঁর নৌবহর দিয়ে সারদানিয়া দখল করেন। মুসলমানরা তখন গোটা ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ও উপকূলভাগ শাসন করতেন।
ইবন হুসায়ন খান্দানের 'আমলে মুসলিম নৌবহর খৃস্টান নৌবহরের ওপর এমনভাবে হামলা করতো, যেমনিভাবে বাজপাখি তার শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তখন সমগ্র সমুদ্র এলাকায় মুসলমানদের প্রভুত্ব কায়েম ছিলো।
যুদ্ধ ও শান্তি সব সময়েই সাগরময় মুসলিম রণতরীর আনাগোনা লেগে থাকতো। কিন্তু খৃস্টানদের একটিও তরীও ভূমধ্যসাগরে খুঁজে পাওয়া যেতো না।
'উবায়দী 'আমলে যখন মুসলিম নৌশক্তি দুর্বল হয়ে পড়লো, তখন খৃস্টান নৌবহর ক্রুশেডারদের নিয়ে সিরিয়া ও মিসরের উপকূলে প্রভুত্ব বিস্তার শুরু করে।
কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দীন 'উবায়দীদের উৎখাত করে সিরিয়া ও মিসর উপকূল থেকে খৃস্টানদের তাড়িয়ে দেন। সালাহুদ্দীন মুসলিম নৌবহরেরও উন্নয়ন সাধন করেন। তিনি 'আক্কায় এক বিরাটকায় নৌ-কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এই কারখানায় যুদ্ধ জাহাজ তৈরী হতো। সিরীয় উপকূল ছাড়া আরেকটি নৌকেন্দ্র ছিলো আলেকজান্দ্রিয়ায়।
সুলতান সালাহুদ্দীন যখন বায়তুল মুকাদ্দাসের যুদ্ধে ব্যাপৃত ছিলেন, তখন তিনি মিসরের গবর্নরকে লিখে পাঠান যে, "অতি সত্বর জাহাজ বোঝাই করে খাদ্যদ্রব্য ও বীরসেনাদের পাঠিয়ে দাও।”
এই জাহাজগুলো সিরীয় উপকূলে পৌঁছামাত্র খৃস্টান জাহাজগুলো চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু মুসলিম জাহাজগুলো বীরত্বের সাথে লড়াই করে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় তীরে পৌঁছায়। 'উবায়দী বংশের পতনের পর মুসলিম নৌবহরের অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে পড়েছিলো। অবশ্য আফ্রিকার কয়েকটি বন্দরে কিছু সংখ্যক যুদ্ধ জাহাজ অবশিষ্ট ছিলো।
মরক্কান নৌবহরের অবস্থা ভালোই ছিলো। তাদের ওপর তখনো কোনো আঘাত আসেনি। লামাতুনার শাসনকাল পর্যন্ত আরব নৌবহরের শক্তি অক্ষুণ্ণ ছিলো। অতঃপর মুয়াহহিদের শাসনকাল শুরু হয়। তাঁরাও এই নৌশক্তিকে সমুন্নত রাখেন। মুয়াহহিদদের উত্থানকালে স্পেন ও আফ্রিকায় মুসলিম নৌবহরের আধিপত্য কায়েম ছিলো। মুয়াহ্- হিদের নৌবাহিনী প্রধান ছিলেন আহমদ সাকালী। তিনি সিসিলীর অধিবাসী ছিলেন।
মুসলমানদের গৌরবময় যুগে যুদ্ধের লীলাকেন্দ্র ভূমধ্যসাগরে তাঁদের পূর্ণ কর্তৃত্ব কায়েম হয়েছিলো। তখন মুসলমানদের বিনা অনুমতিতে ভূমধ্যসাগরে অন্য কোনো জাতির যুদ্ধ জাহাজ প্রবেশ করতে পারতো না।
মুসলিম রণপোতগুলো তখন ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো শিকারের অন্বেষণে হন্যে হয়ে বেড়াতো এবং শিকারের খোঁজ পাওয়ার সাথে সাথে অকস্মাৎ তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। অন্য কথায়, শত্রু পক্ষের যুদ্ধজাহাজ দেখামাত্রই তাকে পাকড়াও করে নিয়ে আসতো। এভাবে সমগ্র সমুদ্র এলাকায় মুসলমানদের একাধিপত্য কায়েম হয়েছিলো।
কিন্তু বাষ্প-যুগ শুরু হওয়ার সাথে সাথে মুসলমানদের পতন-যুগও শুরু হলো। মুসলমানরা তখন আরামপ্রিয় হয়ে গেলো। তারা স্থল- ভাগের রাজত্বেই সন্তুষ্ট রইলো। সমুদ্রের তরঙ্গময় জীবনকে ভয় পেলো। ফলে মুসলমানদের নৌশক্তি চিরতরে খতম হয়ে গেলো।
আমাদের কর্তব্য এখন পুনরায় নৌশক্তি অর্জন করা। আমাদের তরুণ, কিশোর ও যুব সমাজ যখন সমুদ্র-তরঙ্গের সাথে লড়াই করতে শিখবে, সমুদ্রের অভিজ্ঞান লাভ করবে, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ চালনায় পারদর্শী হবে, ঠিক তখনই আমরা আমাদের হারানো নৌশক্তি ফিরে পাবো। এটা এক সর্বসম্মত সত্য যে, যে জাতির কাছে নৌশক্তি নেই, সে জাতি দুনিয়ায় চিরদিনই দুর্বল হয়ে থাকবে।
কুরআন পাক নদনদী, নৌযান ও নৌভ্রমণকে আল্লাহর রহমত, বরকত ও নি'মত বলে অভিহিত করেছে। একথা তোমরা এ বইয়ের প্রথম অধ্যায়েই পড়ে এসেছো। তাই এখানে তার বিস্তারিত আলোচনা অনাবশ্যক।
যে জাতির নৌবহর মযবুত, দুনিয়াতে সে-ই রাজত্ব করার যোগ্য। দুনিয়ার সকল ঐশ্বর্ষই তার হাতের মুঠোয়। যার নৌশক্তি কমযোর, সে দুনিয়ায় বাস করার অযোগ্য।