📘 সোনালী যুগের মুসলিম নৌশক্তি > 📄 জাহাজ নির্মাণ ও নৌ-চালনার সূচনা

📄 জাহাজ নির্মাণ ও নৌ-চালনার সূচনা


পুরাকালে মানুষ সমুদ্রকে দুনিয়ার শেষ সীমা মনে করতো। সমুদ্রে পা রাখতে তারা ভীষণভাবে ভয় পেতো। খৃস্টপূর্ব দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ সাল পর্যন্ত মানুষ এই ধারণাই পোষণ করতো।
অনুমান, প্রথম দিকে মানুষ বিলেঝিলে নৌকা চালাতো। হয়তো প্রথম প্রথম তারা বড় বড় গাছের গুঁড়ি, ঘাসের আঁটি দ্বারা নদনদী পারাপার করতো। ঘাসের নৌকা আজো নীল নদে দেখতে পাওয়া যায়।
অতঃপর গাছের বড় বড় গুঁড়ি খোল্লা করে কিন্তী তৈয়ার করতে শুরু করে। দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে আজো এ ধরনের নৌকার প্রচলন আছে।
১৯০৪ খৃস্টাব্দে গাছের গুঁড়ি খোল্লা করে ক্যাপ্টেন দাস একটি নৌকা তৈরী করেন। তিনি এর দ্বারা বৃটিশ কলাম্বিয়া আমেরিকা থেকে শুরু করে সারা বিশ্ব ভ্রমণে বের হন। তিন বছরে তাঁর এ ভ্রমণ শেষ হয়।
দজলা (তাইগ্রিস) নদীর জনৈক মাঝি এক প্রকাণ্ড কাষ্ঠখণ্ডের ওপর চামড়া বিছিয়ে নৌকা হিসেবে ব্যবহার করেন। তাতে এক সঙ্গে বিশজন লোক আরোহণ করতে পারতো।
দুনিয়ার প্রাচীনতম ও শ্রেষ্ঠতম নৌযান নির্মাণ করেন হযরত নূহ (আঃ)। এটি দৈর্ঘ্যে ২৫০ ফুট, প্রস্থে ৭৫ ফুট, উচ্চতায় ৪৫ ফুট এবং ১৫ হাজার টন ভারী ছিল।
খৃস্টপূর্ব সপ্ত শতাব্দীতে ফেনেকী জাতিও বহু বড় বড় নৌযান নির্মাণ করেন। এসব নৌযানে তারা কেবল ভূমধ্যসাগরের উপকূলবর্তী শহরগুলোতেই বাণিজ্য করতেন না, দক্ষিণে আফ্রিকা ও উত্তরে বহুদূর পর্যন্ত চলে যেতেন।
ফেনেকী জাতির পূর্বে আটলান্টিক জাতিরও জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ চালনার ক্ষেত্রে বিশেষ খ্যাতি ছিলো। তাদের নৌঘাঁটি ছিলো ক্রীট দ্বীপে। এরও আগে কারথেগী নামক এক বিখ্যাত জাতি ছিলো। তারা জাহাজ নির্মাণ শিল্পে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। তাদের জাহাজগুলোতে আটটি করে দাঁড় ছিলো। তারা মালয় উপকূল পর্যন্ত নৌকা বাইচ দিতো। ঘন্টায় ৯ মাইল ছিল সেগুলোর গতিবেগ।
এরপর জাহাজ নির্মাণ শিল্পের মান আরো উন্নত হয়। নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়। কোনো কোনো অংশে লোহা ব্যবহৃত হয়। এরূপ জাহাজ প্রথম ব্যবহার হয় ইরানী ও পিলে পোনিজের যুদ্ধে। এ সব জাহাজ ছিলো বিশ দাঁড়ী করে। যে সব জাহাজে রাজা-বাদশাহ্ কিংবা নৌবাহিনী প্রধান সওয়ার হতেন, সেগুলোর রশি ও দাঁড় ছিলো রঙ্গীন। এসব জাহাজের পেছন দিকটা ছিলো তাম্র ও রৌপ্য নির্মিত। কোনো কোনোটির দৈর্ঘ্য ছিলো ৯০ ফুট থেকে ৪৫০ ফুট পর্যন্ত। এগুলো ছিলো তেজারতী জাহাজ। যুদ্ধ জাহাজ ছিলো এর চেয়ে কিঞ্চিৎ ছোট।
রোমকরা ইংল্যাণ্ড আক্রমণ করার পর তাদের যুদ্ধ জাহাজ দেখে অভিভূত হয়ে পড়ে। কেননা, ইংল্যাণ্ডের যুদ্ধ জাহাজগুলো ছিলো অত্যন্ত মযবুত। কারণ, আটলান্টিক মহাসাগর ছিলো ভূমধ্যসাগর অপেক্ষা অধিক তরঙ্গময়। তাই জাহাজগুলোও বেশী শক্ত দরকার হতো।
প্রাচীনকালে নারসীমীন নামক এক জাতি ছিলো। তারা তাদের মৃত ব্যক্তিদের নৌকায় করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতো।
এক সময় ডেনমার্কের অধিবাসীরা যুদ্ধ করে ইংল্যাণ্ড দখল করে নেয়। তার প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত সম্রাট আলফ্রেড বড় বড় যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ করান। ফলে সম্রাট আলফ্রেডের হাতে ডেনমার্কের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। তিনি যুদ্ধে ডেনমার্কের ছয়টি জাহাজ অধিকার করেন আর বাকীগুলো ডুবিয়ে দেন। সম্রাট আলফ্রেডই বৃটিশ জাহাজ নির্মাণ শিল্পের প্রবর্তক।
১১৭০ খৃস্টাব্দে ইংল্যাণ্ডে এক বিরাট জাহাজ নির্মিত হয়। এতে এক সঙ্গে ৪০০ যাত্রী আরোহণ করতে পারতো। ইংল্যাণ্ডের প্রথম জাহাজ শিল্প আইন রচনা করেন সম্রাট রিচার্ড। তাঁর কাছে ২০৩টি বড় ধরনের জাহাজ ছিলো। অতঃপর কিংজন ও তৃতীয় এডওয়ার্ড জাহাজ শিল্প নিজ হাতে নেন। তৃতীয় এডওয়ার্ড যখন কেলে অবরোধ করেন, তখন তাঁর হাতে ৭০০ রণপোত ছিলো।
প্রথম প্রথম যুদ্ধ জাহাজে মিজানীক স্থাপন করা হতো। অতঃপর নতুন নতুন আবিষ্কারের ফলে তোপ লাগানো শুরু হয়। যুদ্ধ জাহাজে সর্ব প্রথম তোপ ব্যবহার করেন ইংল্যাণ্ডের সপ্তম হেনরী। তাঁর হাতে প্রকাণ্ড দু'টি জাহাজ ছিলো। কলম্বাস এ জাহাজ দু'টিতে করেই আমেরিকা আবিষ্কারে বের হয়েছিলেন।
খৃস্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে ইউরোপে জাহাজ শিল্পের উৎকর্ষ আরম্ভ হয়। এ সময় জাহাজ চালনার বাষ্পও আবিষ্কৃত হয়। অষ্টাদশ খৃস্টাব্দের প্রথম পাদে ইউরোপের অনেক দেশেই লাখ টনী ওজনের জাহাজ ছিলো। বৃটেন ছিল এদের সবার অগ্রণী। আর এখন তো নিছক ইংল্যাণ্ডের হাতেই ১৫ কোটি টন ওজনের বহু জাহাজ বিদ্যমান।
দু'শ' বছরে ইংল্যাণ্ড জাহাজ নির্মাণ শিল্পে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করে। প্রথম দিকে ইংল্যাণ্ড ছিল একটি দুর্বল ও দরিদ্র দেশ। অতঃপর তার বীর যুবশক্তি রাত-দিন পরিশ্রম করে জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ নৌশক্তিতে পরিণত করে।
পক্ষান্তরে মুসলিম সম্প্রদায় আজ থেকে বহু বছর আগেই দুনিয়ার এক জবরদস্ত নৌশক্তির অধিকারী ছিলো। কলম্বাসকে আমেরিকা আবিষ্কারে মুসলিম নাবিকরাই পথ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু আজ আমরা কি দেখছি! বলতে গেলে কিছুই নয়! আজ মুসলিম জাতির নিকট যুদ্ধ জাহাজও নেই। বাণিজ্য জাহাজও নেই। সমুদ্রের নাম শুনলেই তারা ভয়ে কম্পমান। অথচ কুরআন মজীদ স্পষ্ট ঘোষণা করছে যে, "সমুদ্রে ভাসমান পর্বতসম জাহাজগুলো হচ্ছে আল্লাহ্র অন্যতম নিদর্শন।”
১৯৩৬ খৃস্টাব্দে নেথন হিল্স সর্ব প্রথম বাষ্পীয় জাহাজ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি এতে পুরাপুরি সফল হতে পারেননি। তাঁর নির্মিত জাহাজে কিছুটা ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। ১৮০৬ খৃস্টাব্দে রবার্ট ফিল্টন নামক জনৈক আমেরিকান আবিষ্কারক একটি বাষ্পীয় তরণী নির্মাণ করেন। এটি বায়ুর বিপরীত দিকে ঘন্টায় সাড়ে চার মাইল বেগে ছুটে চলতো। এই আবিষ্কারকই ১৮১৭ খৃস্টাব্দে পাঁচ শ' টন ওজনের এক বাষ্পীয় জাহাজ তৈরী করেন। এটি নির্মাণ করতে ২২ হাজার পাউণ্ড খরচ হয়েছিলো।
এরপর বাষ্পীয় জাহাজ সর্বত্র দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৮৩৬ খৃস্টাব্দে ইংল্যাণ্ডের নৌবন্দরসমূহে যে সব বাণিজ্য জাহাজ ভিড়তো, তন্মধ্যে তেরো হাযারই ছিলো বাষ্প পরিচালিত। একটি মাত্র শতাব্দীর সাধ্য-সাধনাই ইউরোপ-আমেরিকাকে সাফল্যের এই দ্বারপ্রান্তে পৌছে দেয়।
এ সময় ইউরোপের জাহাজ নির্মাতারা এ শিল্পকে আরো সামনে অগ্রসর করতে তৎপর হয়। নতুন নতুন পন্থা উদ্ভাবন করে। ১৮৬৮ খৃস্টাব্দে ইংল্যাণ্ডের জাহাজ নির্মাতারা চার হাযার টনী এক দ্রুতগামী জাহাজ নির্মাণ করে। এ জাহাজটি মাত্র চার দিন ১৭ ঘন্টায় দুনিয়ার সর্ববৃহৎ মহাসাগর আটলান্টিক পাড়ি দেয়।
১৯৩৩ খৃস্টাব্দে ফ্রান্স এক ভয়ঙ্কর জাহাজ নির্মাণ করে। এটির ওজন ছিল ৬৮ হাযার টন। ওই বছরই ইংরেজরা ৭৩ টনী এক জাহাজ নির্মাণ করে। এটির ইঞ্জিনশক্তি ছিল আশি হাযার অশ্বশক্তিবিশিষ্ট। একই সময় ইংরেজরা অলিম্পিক নামে এক নতুন জাহাজ তৈয়ার করে। যার দৈর্ঘ্য ছিলো ৮৫২ ফুট, প্রস্থ ৯২ ফুট এবং গভীরতা ১৭৫ ফুট। ইঞ্জিনের শক্তি ৯০ হাযার অশ্বশক্তিসম্পন্ন। এতে ৮৬০ জন মাঝি-মাল্লা কর্মরত ছিলো।
বস্তুত এরূপ শক্তিমত্তাই হচ্ছে একটি জীবন্ত জাতির উজ্জ্বল প্রতীক। এরূপ বীর্যবত্তাই একটি উদীয়মান জাতিসত্তার প্রকৃষ্ট সোপান। এরূপ প্রতিপত্তি বলেই একটি জাতি বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে।
সত্যই 'নৌযান আল্লাহ্ এক অপূর্ব নিদর্শন-যা সমুদ্রবক্ষে পর্বতের ন্যায় সন্তরণ করে বেড়ায়।'
সত্যই একটি জীবন্ত জাতি দুনিয়ায় এমনভাবে বসবাস করে, যা বিশ্ববাসীকে পদে পদে উপলব্ধি করতে হয়। একটি জীবন্ত জাতি তার শত্রু পক্ষের জন্য দুর্ভেদ্য দুর্গবিশেষ। শিসাঢালা প্রাচীরসদৃশ। একটি জীবন্ত জাতির শক্তি হবে দুরন্ত-দুর্গার। কার্যক্ষমতা হবে অপরিমেয়। সামরিক ছাউনি হবে সেনা-সৈন্য পরিপূর্ণ। নৌঘাঁটি থাকবে ভয়ঙ্কর রণপোতে সজ্জিত এবং আকাশ-পথ হবে অত্যাধুনিক জঙ্গী বিমানে মুখরিত।
কুরআন মজীদ مسلمانوں বরাবর স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, 'তোমরা দুনিয়ায় এমনভাবে বসবাস করবে যে, মানুষ তোমাদের অস্তিত্ব হরদম অনুভব করবে।' 'তোমরা আল্লাহর নাফরমানদের জন্যে কঠোর হও।' 'আমি তোমাদেরকে ইস্পাত দান করেছি, যা এক প্রকার ভয়ঙ্কর ধাতু বিশেষ। তোমরা তার দ্বারা শক্তিমান হও।' 'নৌযান আল্লাহ্ নিদর্শন।' তোমরা এমন শক্তি সঞ্চয় করো এবং তোমাদের আস্তাবলসমূহ এমনসব রণমত্ত অশ্বে সজ্জিত করো-যা দেখে তোমাদের প্রতিপক্ষসমূহের পিলে চমকে যায়।'

📘 সোনালী যুগের মুসলিম নৌশক্তি > 📄 নৌ-চালনায় মুসলমানদের অবদান

📄 নৌ-চালনায় মুসলমানদের অবদান


আরবের অধিবাসীরা ইসলাম-পূর্ব যুগে সমুদ্র পর্যটনে অভ্যস্ত ছিলো না। অবশ্য য়ামনের হিমিয়ার ও সাবা গোত্রের নিকট কিছু মা'মূলী ধরনের নৌযান ছিলো। তারা এগুলো দ্বারা কোনোমতে আভ্যন্তরীণ নৌপরিবহনের কাজ চালাতো।
হিজাজের অধিবাসীরা সব সময় সমুদ্রযাত্রা এড়িয়ে চলতো। তারা নৌপথে কদম রাখতে ভীষণ ভয় পেতো। অন্য কথায় বলতে গেলে তারা ছিলো নৌ-পর্যটনে সর্বতোই নিঃস্পৃহ।
ইসলাম-পরবর্তী যুগে মিসর ও সিরিয়ার উপকূলে যখন ইসলামী পতাকা উড্ডীন হলো এবং মুসলমানরা রোমকদের যুদ্ধ জাহাজ ও সমুদ্র যুদ্ধ অবলোকন করলো, তখন তারাও ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার স্বার্থে শত্রুর মুকাবিলার জন্য নৌবাহিনী গড়ে তোলার প্রয়োজন অনুভব করলো। এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম এগিয়ে এলেন মুসলিম সিপাহসালার 'আলা ইব্‌ন আল্হাযরমী। ইনি ছিলেন হযরত উমর (রাঃ)-এর খিলাফত-কালে বাহরায়নের শাসনকর্তা।
'আলা ইবনে আল্হাযরমীর ইরাদা ছিল ইরানের উপকূলবর্তী এলাকাগুলোকে ইসলামী শাসনের অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু তাঁর এই সংকল্পের পথে একমাত্র অন্তরায় ছিলো পারস্য উপসাগর। বাহরায়ন থেকে ইরান উপকূলে সৈন্য পরিচালনা করতে হলে পারস্য উপসাগরের নৌপথ ছাড়া গত্যন্তর ছিলো না। তাই তিনি পানিপথেই সৈন্য পরিচালনার সিদ্ধান্ত করেন।
সিদ্ধান্ত অনুসারে নৌযানেই তিনি সৈন্য পরিচালনা করেন। কিন্তু এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পরাজয় ঘটে। কারণ 'আলা ইব্‌ন আল্হাযরমী খলীফা হযরত 'উমর (রাঃ)-এর অনুমতি ব্যতিরেকেই সৈন্য পরিচালনা করেছিলেন। মুসলিম বাহিনীর এই পরাজয়ের ঘটনায় এক বিরাট শিক্ষা নিহিত রয়েছে। তা হলো, নেতার অনুমতি ছাড়া যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া ঠিক নয়।
খলীফা 'উমরের নিকট যখন এই স্বেচ্ছাচারিতার খবর পৌঁছলো তখন তিনি অতিশয় রাগান্বিত হন এবং 'আলা ইব্‌ন আল্হাযরমীকে সেখান থেকে হটিয়ে কুফার শাসনকর্তা হযরত সা'আদ ইব্‌ন আবী আক্কাস (রাঃ)-এর অধীনস্থ করে দেন, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কেউ এরূপ স্বেচ্ছাচারমূলক কার্যক্রম গ্রহণ না করে।
উক্ত সামুদ্রিক আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ার পর খলীফা হযরত 'উমর (রাঃ) মুসলিম সিপাহসালারদের প্রতি এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। কেননা, তখন তিনি স্থল বাহিনী সংগঠনে ব্যাপৃত ছিলেন। তাঁর মতে, নৌবাহিনী গড়ে তোলার উপযুক্ত সময় তখনো হয়নি। এজন্যে তিনি সেদিকে মনোযোগ দেয়ার প্রয়োজনবোধ করেন নি।
আমীর মু'আবিয়া ইব্‌ন আবী সুফিয়ান সিরিয়া ও পশ্চিম জর্দান বাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন উচ্চাভিলাষী দক্ষ বীর সেনানী। রোমক বাহিনীর সাথে তাঁর প্রায়ই মুকাবিলা করতে হতো। এজন্যে নৌবাহিনী গড়ে তোলার গুরুত্ব তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতেন। তাঁর মতে, একটি সুসংগঠিত নৌবাহিনী ছাড়া রোমকদের সার্থক মুকাবিলা ছিলো দুরূহ ব্যাপার। তাই তিনি আমীরুল মু'মিনীন হযরত 'উমর (রাঃ)-এর দরবারে একটি নৌবাহিনী সংগঠনের আবেদন পেশ করেন। আবেদনে তিনি নৌবাহিনী গঠনের গুরুত্ব ও উপকারিতা সম্পর্কে বিশদ বিবরণ দান করেন। খলীফা 'উমর (রাঃ) মিসরের গবর্নর 'আমর ইবনুল 'আসের নিকট সমুদ্র-ভ্রমণ সম্পর্কে সঠিক তথ্য চেয়ে এক পত্র লিখেন। হযরত 'আমর ইবনুল 'আস এই মর্মে পত্রের উত্তর লিখেনঃ "আমীরুল মু'মিনীন! সমুদ্র যেনো আল্লাহ্ এক মস্তবড় সৃষ্টি। তার ওপর আল্লাহ্ এক ক্ষুদ্র সৃষ্টি মানুষ আরোহণ করে। সমুদ্রে বসে আকাশ এবং পানি ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। আকাশ যদি মেঘাচ্ছন্ন হয়, তাহলে পিলে চমকে ওঠে। আর সমুদ্র যদি উমিমুখর হয়, তাহলে মূর্ছা যাওয়ার অবস্থা দাঁড়ায়। এরূপ অবস্থায় আল্লাহর প্রতি সন্দেহ হ্রাস পায় এবং একীন বেড়ে যায়। মানুষের সমুদ্র-যাত্রার অবস্থা এরূপঃ "একটি ভাসমান কাষ্ঠখণ্ডের ওপর যেনো একটি পতঙ্গ উড়ে পড়লো। কাষ্ঠখণ্ডটি যদি উল্টে যায়, তা হলে পতঙ্গটি ডুবে যাবে আর কাষ্ঠখণ্ডটি সঠিকভাবে কিনারে পৌঁছলে পতঙ্গটি সোল্লাসে উড়ে যাবে।"
'আমর ইবনুল 'আসের এই উত্তর আসার পর খলীফা 'উমর (রাঃ) এই মর্মে আমীর মু'আবিয়ার পত্রের উত্তর দেনঃ "আমি সেই সত্তার শপথ করে বলছি-যিনি হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে সত্য নবীরূপে প্রেরণ করেছেন-আমি সমুদ্র অভিযানে একজন মুসলমানকেও প্রেরণ করবো না।” এরপরও আমীর মু'আবিয়া রোমান নৌবাহিনীর মুকাবিলার কথা গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে থাকেন।
হযরত 'উসমান (রাঃ)-এর খিলাফতকালে আমীর মু'আবিয়া পুনরায় মুসলিম নৌবাহিনী গঠনের প্রস্তাব করেন এবং বিষয়টি ভেবে দেখার জন্যে খলীফার নিকট বার বার অনুরোধ জানান। খলীফা 'উসমান (রাঃ) এই শর্তে আমীর মু'আবিয়ার দরখাস্ত মঞ্জুর করেন যে, সামুদ্রিক যুদ্ধে যারা স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করতে চাইবে, তিনি কেবল তাদেরই নিতে পারবেন। যারা স্বেচ্ছায় রাজী না হবে, তাদের তিনি বাধ্য করতে পারবেন না।
মোট কথা, ২৮ হিজরীতে মুসলিম নৌবাহিনীর গোড়াপত্তন হয়। আমীর মু'আবিয়া ছিলেন এই বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি যারপর- নাই উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে মুসলিম নৌবাহিনী গড়ে তোলেন এবং পরীক্ষামূলকভাবে সর্বপ্রথম সাইপ্রাস দ্বীপে নৌ-আক্রমণ চালান। সাই- প্রাস বাসীরা আমীর মু'আবিয়ার নিকট সন্ধির প্রস্তাব পাঠায়। আমীর মু'আবিয়া ৭২০০ স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে সাইপ্রাসবাসীদের সাথে সন্ধি স্থাপন করেন।
মুসলিম নৌবাহিনীর প্রথম হামলা সফল হওয়ার পর তাঁদের উৎসাহ- উদ্দীপনা আরো বেড়ে যায়। এবার তারা মুসলিম নৌবাহিনীকে আরো মযবুত করে পুনর্গঠন করেন। কিছুদিনের মধ্যে তাঁদের নৌশক্তি রোমানদেরকেও ছাড়িয়ে যায়। তাঁরা বিভিন্ন মওসুমে বিভিন্ন দ্বীপাঞ্চল আক্রমণের পরিকল্পনা করেন।
'আরবদের নৌ-পর্যটন ও সমুদ্র-অভিযানের কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা ছিলো না। তাই তাঁরা প্রথম দিকে এ বিষয়টি রোমানদের নিকট শিক্ষা লাভ করেন। রোমান নৌ-বন্দীদের তাঁরা এই কাজে নিয়োগ করতেন। নৌযুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর হাতে অসংখ্য রোমান জাহাজ-মিস্ত্রী ও কাপ্তান বন্দী হয়েছিলো।
এরা মুসলমানদের জন্য জাহাজ নির্মাণ করতো, নৌসেনা তৈরী করতো এবং রণপোতগুলোকে যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত করে তার ওপর মুসলিম ফৌজী নও-জওয়ানদের আরোহণ শিক্ষা দিতো।
রণপোত সমষ্টিকে (নৌবহর) মুসলমানরা 'উস্কুল' বলতেন। তাঁদের এইসব উস্কুলের ঘাঁটি (নৌঘাঁটি) ছিলো ভূমধ্যসাগর। মুসলিম নৌবাহিনীতে সিরিয়া, আফ্রিকা ও স্পেনের মুসলমানগণ সবিশেষ আকর্ষণ বোধ করেন। এইসব দেশের মুসলমানগণ বিরাট বিরাট জাহাজ নির্মাণ কারখানা স্থাপন করেন। এইসব কারখানাকে তাঁরা 'তার্ত্সানা' (দারুস্ সানাআ'র বহুল ব্যবহৃত রূপ) নামে অভিহিত করতেন।
এইসব 'তার্ত্সানা'য় জাহাজ নির্মাণের আসবাবপত্র ও খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরী হতো। সমকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ 'তারসানা' নির্মিত হয়েছিলো বনু উমাইয়ার প্রখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক 'আবদুল মালিক ইব্‌ন মারওয়ানের শাসনকালে তিউনিসে।
এই 'তারসানা'টি নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিলো ভূমধ্যসাগর ও তার ছোট বড় দ্বীপগুলোকে মুসলিম শাসনাধীন রাখা। আবদুল মালিক ইব্‌ন মারওয়ানের নির্দেশে আফ্রিকার গভর্ণর হাসান ইব্‌ নু'মান তিউনিসের পোতাশ্রয়ে নৌযুদ্ধের সামান তৈরী ও মহড়া অনুষ্ঠিত করেন।
অল্প দিনের মধ্যেই তিউনিস মুসলমানদের এক উৎকৃষ্টতম নৌকেন্দ্রে পরিণত হয়। এই নৌবহর মুসলিম উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহ এবং ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের নিরাপত্তা বিধান করতো।
ভূমধ্যসাগরের এক বিরাট দ্বীপ। দ্বীপটির নাম 'সাকালিয়া'। মুসলমানরা এটিকে দখল করতে চাইলেন। 'আবদুল মালিক ইব্‌ন মারওয়ানের শাসনকালে এটি দখল করার প্রচেষ্টা চলে। কিন্তু সে প্রচেষ্টা সফল হয়নি। বনু গালিব খানদানের শাসন 'আমলে এই দ্বীপটি বিজিত হয়। এই বংশের বিখ্যাত সম্রাট যিয়াদাতুল্লাহ্ ইব্‌ন ইব্রাহীম ইব্‌ন আগ্লাবের নৌশক্তির কথা মুসলিম ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। এই কীর্তিমান পুরুষের শাসন আমলেই 'সাকালিয়া' মুসলমানদের পদানত হয়।
এই ঘটনার পর মুসলমানগণ অচিরেই তাঁদের নৌশক্তি দ্বারা ভূমধ্য-সাগরের সমস্ত উপকূলবর্তী এলাকা ও দ্বীপাঞ্চলসমূহ করায়ত্ত করতে সক্ষম হন। তাঁদের মুকাবিলা করার আর কোনো শক্তিই অবশিষ্ট ছিলো না। তখন মুসলিম নৌবাহিনী প্রধান ছিলেন আসাদ ইব্‌ন ফুরাত। তিনি ভূমধ্যসাগরে রোমান নৌবাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পর্যুদস্ত করেন। এরপর থেকে মুসলমানদের মধ্যে নৌযুদ্ধের উৎসাহ আরো প্রবল হয়ে ওঠে। তাঁরা আফ্রিকা, স্পেন ও সিরিয়ায় অসংখ্য তার্সানা (জাহাজ নির্মাণ কারখানা) প্রতিষ্ঠা করেন।
'আব্দুর রহমান আন্নাসিরের আমলে একমাত্র স্পেনেই দুইশ'টি বিরাটকায় রণপোত বিদ্যমান ছিলো। এগুলো অহর্নিশ স্পেনের উপকূল অঞ্চলের নিরাপত্তা বিধান করতো। আফ্রিকায়ও এক বিশাল নৌবহর গড়ে উঠেছিলো। এ হচ্ছে হিজরী চার শতকের কথা।
স্পেনে বেশ ক'টি 'তার্সানা' গড়ে উঠেছিলো। প্রতিটি 'তার্সানার' নিজস্ব উজ্জ্বল (নৌবহর) ছিলো। প্রতিটি উস্কুলের আবার একেকজন নৌ-প্রধান ও সর্দার ছিলেন। নৌ-প্রধানগণ নৌবহরের অস্ত্রশস্ত্র ও নৌসেনাদের নিয়ন্ত্রণ করতেন। আর সর্দারগণ রণপোতে পালতোলা ও তার পরিচালনার উপকরণাদির যোগান দিতেন। রণপোতের মাঝি-মাল্লাও সর্দারগণই সরবরাহ করতেন।
নৌবহরের পরিচালন ব্যবস্থাও অত্যন্ত সুশৃংখল ছিলো। কোনো নৌবহর যখন কোনো বিশেষ স্থান আক্রমণের প্রস্তুতি নিতো কিংবা সমুদ্র অভিযানের মহড়া প্রদর্শনের সংকল্প করতো, তখন তা এক বিশেষ নৌবন্দরে এসে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যেতো। গোটা নৌবহরটি পরিচালনা করতেন একজন সুদক্ষ নৌ-প্রধান।
মিসরে হিজরী প্রথম শতকে যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ কারখানার পত্তন হয়। এখানে সর্ব প্রথম উস্কুল (নৌবহর) প্রতিষ্ঠা করেন মিসরের শাসনকর্তা গিতা ইব্‌ন ইসহাক। ইনি মুতাওয়াক্কিল 'আলাল্লাহ্ 'আব্বাসীর আমলে মিসরের শাসনকর্তা ছিলেন। তখন রোমান বাহিনী 'দামিয়াত' অধিকার করে সেখানে ব্যাপক লুটতরাজ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা চালাচ্ছিলো। এতে মিসর অধিপতি গিতা ইবন ইসহাক যারপরনাই মর্মাহত হন এবং রোমানদের সমুচিত শাস্তিদান মানসে একটি নৌবহর প্রতিষ্ঠা করেন। আর এভাবেই মিসরে একটি নৌবাহিনী সংগঠিত হয়।
মিসর অধিপতি নৌসেনার জন্যে বিভিন্ন পুরস্কার ও দৈনিক মজুরি বরাদ্দ করেন। ফলে সবাই তাদের জওয়ান ছেলেদের নৌবাহিনীতে ভতি করা শুরু করেন। তিনি এইসব নও জওয়ানকে ফৌজী তা'লীম দানের উদ্দেশ্যে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কমাণ্ডার নিয়োগ করেন।
নৌসেনাদের উপযুক্ত ট্রেনিং দানের পর তিনি 'দামিয়াত' আক্রমণ করেন। তীব্র সংঘর্ষের পর রোমান বাহিনী পর্যুদস্ত ও 'দামিয়াত' পুনর্দখল হয়।
'আব্বাসিয়াদের পর মিসরে ফাতিমী যুগের সূচনা হয়। তাঁরা অচিরেই 'দামিয়াত' ও আলেকজান্দ্রিয়ায় নৌবহর গড়ে তোলার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। মিসরে ফাতিমী যুগেই নৌশক্তির উৎকর্ষ সূচিত হয়। তাঁরা নৌসেনাদের বেতন ছাড়া জায়গীরও প্রদান করতেন। এসব জায়গীরকে তাঁরা 'গাষীদের আয়াব' নামে অভিহিত করতেন। যুদ্ধের সময় নৌ-প্রধান গোটা নৌবহরের দায়িত্ব নিজ হাতে গ্রহণ করতেন।
বেতন ও ওযীফা বাদশাহ্ খোদ নিজ হাতে বণ্টন করতেন। এতে দেশের অন্যান্য বাহিনী অপেক্ষা নৌবাহিনীর সম্মান বৃদ্ধি পেতো। মু'ইযষ্ণু লিদীনিল্লাহ্ শাসনামলে যুদ্ধ জাহাজের সংখ্যা ৬০০-তে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো।
নৌবহরের যুদ্ধ যাত্রাকালে মহা ধুমধামে জলসা অনুষ্ঠিত হতো। সাড়ম্বরে আনন্দ-উৎসব চলতো। জলসায় স্বয়ং বাদশাহ্ তাঁর পারিষদসহ উপস্থিত থাকেতন। বাদশাহ্ ও তাঁর পারিষদবর্গ নীলনদের তীরবর্তী 'মাকাস' নামক স্থানে এক বিশেষ ছাউনিতে বসে এই দৃশ্য উপভোগ করতেন। জাহাজীরা এই ছাউনির নীচে যুদ্ধ জাহাজ নিয়ে আসতো। জাহাজগুলো যুদ্ধাস্ত্র ও আসবাবপত্রে সুসজ্জিত হয়ে জাতীয় পতাকা ধারণ করতো। তারপর যুদ্ধের বিভিন্ন কলা-কৌশল প্রদর্শন করে বেরিয়ে যেতো।
যুদ্ধে যেসব রণ-নৈপুণ্যের প্রয়োজন পড়তো, তার সবগুলোই তখন দেখাতে হতো। অতঃপর প্রতিটি জাহাজের নৌ-প্রধান ও সর্দারগণ বাদশাহ্ সামনে হাযির হতেন। বাদশাহ্ তাঁদের পুরস্কৃত করতেন।
যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনকালেও এরূপ জমকালো উৎসব অনুষ্ঠিত হতো। নৌযুদ্ধ বিভাগের এক আলাদা দফতরও খোলা হয়েছিলো। এই দফতরের নাম ছিলো 'দিওয়ানুল উস্কুল'। নৌবাহিনীর সমস্ত খরচপত্র এই দিওয়ানই নির্বাহ করতো।
মুসলিম শাসন বিস্তারে মুসলিম নৌবাহিনীর ভূমিকা ছিলো অপরিসীম। মুসলিম শাসকগণ নৌবাহিনীর সাহায্যেই ভূমধ্যসাগরের বড় বড় দ্বীপাঞ্চল-সাডিনিয়া, সিসিলী, মাল্টা, ক্রীট ও সাইপ্রাস প্রভৃতি অধিকার করেন। এইসব দ্বীপাঞ্চল ব্যতীত মুসলমানগণ বহু উপকূলীয় এলাকাও করায়ত্ত করেন। বহু ইউরোপীয় অঞ্চলও মুসলিম অধিকারে আসে।
মুসলিম নৌবহরসমূহ গোটা ভূমধ্যসাগরে চক্কর দিয়ে বেড়াতো। ইউরোপের উপকূলবর্তী দেশসমূহে যখন-তখন হামলা করতো।
ভূমধ্যসাগর উপকূলের ইউরোপীয় দেশসমূহে সবচেয়ে বড় আক্রমণ হয় সিসিলীর সম্রাট বানুল হাসানের শাসনকালে। তাঁর প্রচণ্ড নৌ-আক্রমণে ইউরোপে এক সন্ত্রাসের সৃষ্টি হয়েছিলো।
মোট কথা, মুসলমানগণ নৌবহরের সাহায্যে গোটা ভূমধ্যসাগরের একচ্ছত্র মালিক বনে গিয়েছিলেন। তাঁরা স্থলভাগের ন্যায় পানিভাগেরও সর্বাধিনায়ক বনেছিলেন। এ হচ্ছে তখনকার কথা, যখন গোটা ইউরোপবাসী অধঃপতন ও অজ্ঞতার অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছিলো। তাদের নৌশক্তি ছিলো মুসলমানদের তুলনায় নির্জীব ও হীনবল।
আজ মুসলমানদের নৌশক্তি ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। আর ইউরোপের অধিবাসীরা গা ঝেড়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে। তারা বহু মুসলিম রাজ্য ও উপকূলীয় অঞ্চলে সৈন্য পরিচালনা করে রাজত্ব ও নৌবহর উভয়ই দখল করে নিয়েছে।
স্পেন থেকে মুসলমানরা বিতাড়িত হয়েছে। স্পেনের মুসলিম নৌ-শক্তি ইউরোপীয়দের হস্তগত হয়েছে। সিসিলীর মুসলমানরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সেখানকার মুসলিম নৌশক্তিও চিরতরে শেষ করে দেয়া হয়েছে।
একদিন যে নৌসেনাদের 'মুজাহিদীন ফী সাবীলিল্লাহ্' এবং 'গুযাত্ ফী আ'দাইল্লাহ্'র গৌরবদীপ্ত উপাধিতে ভূষিত করা হতো, আজ অধঃপতন ও লাঞ্ছনার যুগে সেই 'উস্কুল'-কে একটি বাজারী শব্দ ভাবা হচ্ছে। আর যুদ্ধ-জাহাজের ক্রিয়াকাণ্ডকে গণ্য করা হচ্ছে অপমান ও লজ্জার বিষয় হিসেবে।
বস্তুত যেদিন থেকে মুসলমানরা তাদের নৌশক্তি হারিয়ে ফেললো, সেদিন থেকেই তারা দ্রুত অবনতির দিকে ধাবিত হলো। রাজ্য গেলো। রাজত্ব গেলো। স্থলভাগেরও আধিপত্য গেলো। মৃত্যুভয় প্রবলতর হলো। সমুদ্রাতঙ্ক বৃদ্ধি পেলো। শৌর্যবীর্য বিলুপ্ত হলো। পরিণাম ফল ইতিহাসে লিপিবদ্ধ। আমাদের এখন তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

📘 সোনালী যুগের মুসলিম নৌশক্তি > 📄 মুসলিম রণপোত কারখানা

📄 মুসলিম রণপোত কারখানা


'আরবরা জাহাজ নির্মাণ কারখানাকে 'দারুস্সানা'আ' বলতো। জাহাজ নির্মাণ শিল্পে তারা পূর্ণ পারদর্শিতা অর্জন করেছিলো। আরবদের বদওলাতেই আজ বিশ্ববাসী نৌশিল্পে এত উৎকর্ষ সাধন করতে সক্ষম হয়েছে।
আধুনিক রণপোত শিল্প 'আরবরাই পত্তন করেছিলো। ইউরোপের অধিবাসীরা স্পেন, সিসিলী এবং আফ্রিকায় 'আরবদের নিকট থেকে এই বিদ্যা শিক্ষা করেছিলো। আরবদের পূর্বে জাহাজ-নির্মাতা ও জাহাজ- চালক ছিলো রোমকরা। কিন্তু তাদের জাহাজ-নির্মাণ ও নৌ-চালনা ছিলো সম্পূর্ণ পুরানো ধাঁচের। রোমকরা নিছক ছোট ছোট রণতরীই নির্মাণ করতে পারতো। বড় বড় যুদ্ধ-জাহাজ তাদের কারখানায় তৈরী হতো না। 'আরবরাই এই শিল্পে নতুনত্ব আনয়ন করেন। নতুন নতুন মডেল ও কৌশল আবিষ্কার করেন। 'আরবরাই সর্বপ্রথম নৌ-দফতর প্রতিষ্ঠা করেন। এই দফতরের নাম ছিলো 'দীওয়ানুল উন্ন'। এই দফতরের অধীনে অনেক বড় বড় ইঞ্জিনীয়ার ছিলেন। তাঁরা রণতরীর নতুন নতুন মডেল ও নক্সা তৈরী করতেন।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্পেন, আফ্রিকা, মিসর ও সিরিয়া ছিলো মুসলমানদের বড় বড় নৌকেন্দ্র। এই সবগুলো দেশই ভূমধ্য- সাগরের উপকূলে অবস্থিত। ভূমধ্যসাগরের উপকূলভাগ সব সময়ই তার মনোরম আবহাওয়ার দরুন তাহযীব-তামাদ্দুনের কেন্দ্রভূমি ছিলো।
মুসলমানরা তাঁদের সর্বপ্রথম 'দারুস্সানা'আ' প্রতিষ্ঠা করেন হিজরী প্রথম শতাব্দীতে মিসরের 'ফুসতাত্' নামক স্থানে। আহমদ ইব্‌ন তুলুন এই কারখানার উন্নতি বিধানে প্রাণান্ত চেষ্টা করেন। আশেদী খান্দানের শাসকরাও এর সবিশেষ উন্নতি সাধন করেন।
ফাতিমী শাসকগণ এটি 'ফুস্তাত্' থেকে 'মাকাসে' স্থানান্তর করে আরো শ্রীবৃদ্ধি ও বিস্তৃতি দান করেন। নদনদী ও সাগর-মহাসাগরেই ছিলো তাঁদের প্রকৃত রাজস্ব। তাঁদের রণতরী যেমন দেশের প্রতিরক্ষা কাজে নিরত থাকতো, তেমনি তাঁদের বাণিজ্যতরীগুলো প্রাচ্য দেশসমূহের পণ্যসম্ভার বহন করে পাশ্চাত্য দেশসমূহে পৌঁছে দিতো।
ফাতিমী আমলে দুই ধরনের জাহাজ নির্মিত হতো। এক-যুদ্ধ জাহাজ। এগুলোকে 'উস্কুল' বলা হতো। শুধু যুদ্ধের কাজেই ব্যবহৃত হতো। বিভিন্ন রণসম্ভার ও নৌসেনারা অবস্থান করতো। দুই-তেজারতী জাহাজ। এগুলো দ্বারা শুধু একদেশ থেকে আরেক দেশে পণ্যসামগ্রী আনা-নেয়া হতো। এগুলোকে বলা হতো 'নীলী' জাহাজ। 'নীলী' জাহাজগুলো 'উজ্জ্বল' থেকে আকারে ছোট হতো। ছোট নদ-নদীতেও যাতায়াত করতে পারতো।
'দারুস্সানা'আ'য় ছোট-বড় অনেক রকম যুদ্ধ জাহাজ তৈরী হতো। নামও ছিলো বিভিন্ন। আকার-আকৃতি ও গঠন-প্রকৃতিও ছিলো নানারূপ। এগুলোর সমষ্টিকে 'উজ্জ্বল' বলা হতো। আমরা এখানে কয়েকটি যুদ্ধ জাহাজের নাম উল্লেখ করছি।
শূনাঃ এগুলো বিরাটকায় ছিলো। এতে শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য কিল্লা ও মিনার তৈরী হতো।
হাররাকা: এগুলোতে 'মিজানীক' স্থাপন করা হতো। 'মিজানীক' দ্বারা শত্রু পক্ষের ওপর বিস্ফোরক দ্রব্য নিক্ষেপ করা হতো।
তার রাদাঃ এ ছিলো এক ধরনের ছোট দ্রুতগামী নৌবিশেষ।
উশারিয়াতঃ (এক বচনে 'উশারী'): এতে করে নৌ-সেনারা নীল নদে টহল দিয়ে বেড়াতো।
শালান্ দিয়াত্: (এক বচনে 'শালান্দী'): এসব দিয়ে বিভিন্ন খবরাখবর পৌঁছানো হতো।
মিস্তাহাত: (এক বচনে 'মিস্তাহ্'): 'মিস্তাহ্' সাধারণ যুদ্ধের কাজে ব্যবহৃত হতো।
'আরবী জাহাজের আকার-আকৃতি গ্রীক ও রোমান জঙ্গী জাহাজের অনুরূপ ছিলো। কারণ, 'আরবরা এই বিদ্যাটি গ্রীক ও রোমকদের নিকট থেকেই শিখেছিলেন।
'আরবদের জঙ্গী জাহাজে সাধারণত এইসব রণসম্ভার মওজুদ থাকতোঃ যিরাহ্ (লৌহবর্ম), খোদ (শিরস্ত্রাণ), ঢাল, নেযা, কামান, লৌহ যিঞ্জীর ও মিজানীক। মিজানীক দ্বারা শত্রু জাহাজের ওপর প্রস্তর নিক্ষেপ করা হতো।
যুদ্ধ-জাহাজের থামের ওপর বড় বড় সিন্দুক বাঁধা থাকতো। তাতে নৌসেনারা ওত পেতে বসে থেকে শত্রু পক্ষের ওপর পাথর, বিস্ফোরক, গরম চুন ইত্যাদি নিক্ষেপ করতো।
'আরব রণপোতগুলোতে নব-উদ্ভাবিত যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহৃত হতো। যখন যুদ্ধাস্ত্র আবিষ্কৃত হতো তাই দিয়ে তা সজ্জিত করা হতো।
জাহাজের চারদিকে চামড়া, পশমী কাপড় প্রভৃতি মুড়ে দেয়া হতো। আবার কখনো কখনো জাহাজের কাঠে এমন এমন জিনিস সেঁটে দেয় হতো, যাতে সেগুলোতে আগুন ধরে যেতে না পারে। যুদ্ধের সময় শত্রুর নজর থেকে বাঁচার জন্যে জাহাজে নিষ্প্রদীপ মহড়ার ব্যবস্থা করা হতো। হাঁস-মুরগী ও পাখ-পাখালি রাখা হতো না। অধিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে জাহাজের ওপর নীল রঙের কাপড় চড়িয়ে দেয়া হতো, যাতে শত্রুপক্ষ দূর থেকে জাহাজ দেখতে না পায়।
মুসলমানরা তাঁদের রণতরীর চারপাশে লোহার নেযা ও লম্বা সুচালো লৌহখণ্ড লাগিয়ে দিতো। ফলে, শত্রু জাহাজ তাঁদের কাছে ঘেঁষতে পারতো না। ঘেঁষা মাত্র ফুটো হয়ে পানিতে ডুবে যেতো।
মুসলমানরা জাহাজ নির্মাণের নতুন নতুন কৌশল আবিষ্কার করেন। এসব কৌশল গ্রীক ও রোমানদের মধ্যে প্রচলিত ছিলো না। ইউরোপের লোকেরা মুসলমানদের নিকট থেকে এগুলো লুফে নেয়। পরে তারা এর আরো উন্নতি সাধন করে।
ইউরোপে বাষ্প আবিষ্কৃত হওয়ার পর নৌ-জাহাজেও তার ব্যবহার শুরু হয়। এখন এই শিল্পটি জাতীয় উন্নতির চাবিকাঠি। যে জাতির নিকট উন্নত নৌশক্তি নেই, তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। দেশের নিরাপত্তা ও বাণিজ্য দুই-ই বিপন্ন।

📘 সোনালী যুগের মুসলিম নৌশক্তি > 📄 মুসলিম নৌবন্দরসমূহ

📄 মুসলিম নৌবন্দরসমূহ


ইসলাম 'আরবদের মধ্যে এক নতুন প্রাণ-চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ফলে 'আরবদের বিচ্ছিন্ন গোত্রগুলো পরস্পর একসূত্রে গ্রথিত হয়েছে।
ইসলাম 'আরবদের একটি নতুন দীন দিয়েছে। একটি নতুন তামাদ্দুন দিয়েছে। নতুন উদ্যম ও নতুন আবেগ দিয়েছে। তাদের ব্যবসা- বাণিজ্য ও রাজনীতির শিরা-উপশিরায় নতুন শোণিত প্রবাহিত করেছে।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলায়হি ওয়া সাল্লামের যুগে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা 'আরবদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও খিলাফতে রাশিদার যুগে তার পরিধি 'ইরাক, সিরিয়া, মিসর ও আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। হযরত 'উমর রাদিয়াল্লাহু 'আনহু'র খিলাফতকালে মুসলমানরা একদিকে পারস্য উপসাগর ও অপরদিকে সিরিয়া ও ফিলিস্তিন অতিক্রম করে আলেকজান্দ্রিয়া পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাঁদের তখন সমসাময়িক বিশ্বের দুই বৃহৎ নৌশক্তি-ইরান ও রোমের মুকাবিলা করতে হয়েছিলো। ইরানীদের নৌকেন্দ্র ছিলো পারস্যোপসাগরের উবাল্লা বন্দর। আর ভূমধ্যসাগরের আলেকজান্দ্রিয়া বন্দর ছিলো রোমকদের নৌকেন্দ্র।
উবাল্লা ছিলো ইরানীদের সর্ববৃহৎ নৌবন্দর। এখান থেকেই ইরানী-দের বাণিজ্যতরীগুলো হিন্দুস্তান ও চীন দেশে যাতায়াত করতো। তেমনি-ভাবে রোমানদের বাণিজ্যতরীগুলোও আলেকজান্দ্রিয়া নৌ-বন্দর থেকে কনস্টান্টিনোপল ও পশ্চিম আফ্রিকার বন্দরগুলো পর্যন্ত পৌছে যেতো।
দুটি নৌকেন্দ্রই 'আরবদের দখলে আসে। তখন তারা আরো সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য হযরত 'উমর (রাঃ)-এর নিকট দরখাস্ত করেন। অভাবিত বিজয়োদ্দীপনা তাদের আরো সামনে বাড়ার জন্য ব্যাকুল করে তুলেছিলো। কিন্তু হযরত 'উমর (রাঃ) তাদের অনুমতি দিলেন না।
হযরত 'উমর (রাঃ) যে সমুদ্রের ভয়াল স্মৃতি দেখে ঘাবড়ে গিয়ে-ছিলেন, তা নয়। বরং তাঁর অনুমতি না দেয়ার কারণ ছিলো, 'আরবদের সমুদ্র অভিযানে পূর্ব-অনভিজ্ঞতা। ইরান ও রোমের অধিবাসীরা ছিলো নৌবিদ্যায় পারদর্শী। হযরত 'উমর (রাঃ) এ ব্যাপারে আগেই বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিপথে ছিলো 'আলা ইব্‌ন হাফ্রমীর একটি সদ্য পরাজয়ের ঘটনা। 'আলা ইব্‌ন্ন হাফ্রমী যে মাত্র কিছুদিন আগেই শত্রু পক্ষের কাছে পরাজয় বরণ করেছিলেন, সে কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। সংক্ষেপে এখানেও তা তুলে ধরা হলো।
'আলা ইব্‌ন হাফ্রমী ছিলেন বাহ্রায়নের গবর্নর। তিনি বাহ্রায়নে কতকগুলো রণতরী যোগাড় করে নদীপথে ইরানের বিখ্যাত পারস্য অঞ্চলে হামলা করেন। কিন্তু ইরানীরা নদীর তীর ধরে সামনে অগ্রসর হয়ে মুসলিম বাহিনীকে ঘিরে ফেলে। ফলে মুসলমানরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং স্থলপথে ফৌজী সাহায্য এসে পৌঁছলে পর তাঁরা এই অবরোধ থেকে মুক্তি পান।
হযরত 'উমর (রাঃ) শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌ-চালনার বিরোধী ছিলেন না। বরং তিনিই নৌ-বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। কি করে? এখন তাই শোনো!
একবার 'আরবে ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তখন ছিলো হযরত উমর (রাঃ)-এর খিলাফতকাল। অষ্টাদশ হিজরী সাল। হযরত 'উমর (রাঃ) 'আরবদের জন্য মিসর থেকে খাদ্য আমদানী শুরু করেন। কিন্তু স্থলপথে খাদ্য পৌঁছতে অনেক বিলম্ব ঘটছিলো। তাই তিনি এই সমস্যা সমাধানকল্পে এক সহজ পন্থা উদ্ভাবন করেন। তিনি উনসত্তর মাইল দীর্ঘ এক নহর খনন করে নীলনদকে লোহিত সাগরের সাথে মিলিয়ে দেন। এই খননকার্য ছয় মাসে সম্পন্ন হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই এই নহর দিয়ে নৌকাযোগে প্রচুর খাদ্যদ্রব্য মিসর থেকে 'আরবের 'জার' বন্দরে পৌঁছে যায়। এরপর বহুদিন পর্যন্ত এই খাল 'আরবদের অনেক উপকারে আসে।
'আমর ইবন 'আস (রাঃ) মিসরের গবর্নর ছিলেন। তিনিই সর্ব-প্রথম সুয়েজ খাল কেটে লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরকে মিলিয়ে দেয়ার সংকল্প করেছিলেন। কিন্তু হযরত 'উমর (রাঃ) তাঁর এই প্রস্তাব এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে, "এর ফলে রোমকরা মুসলিম হজ্জযাত্রীবাহী জাহাজ ছিনতাই করার সুযোগ পাবে।"
এখন আমরা মুসলিম অধিকৃত নৌবন্দরগুলোর একটু বিস্তারিত আলোচনা করবো।
জার: এ নৌবন্দরটি লোহিত সাগরের 'আরব উপকূলে বর্তমান য়াম্বু' বন্দরের সন্নিকটে অবস্থিত ছিলো। সপ্তম হিজরীতে যে মুসলিম দলটি হাবশা (আবিসিনিয়া) থেকে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন, তাঁরা এই বন্দরেই অবতরণ করেন। এতে বোঝা যায় যে, এই বন্দরটি প্রাক-ইসলামী 'আমল থেকেই সুপরিচিত ছিলো। অনন্তর হযরত 'উমর (রাঃ)-এর খিলাফতকালে মিসর ও সিরিয়া বিজয়ের পর এর গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়।
অতঃপর খাল কেটে নীল নদ ও লোহিত সাগরের মধ্যে সংযোগ সাধন করলে এটি প্রভূত মর্যাদার অধিকারী হয়। কেননা, তখন ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী ছিলো মদীনা মুনাওয়ারা আর 'জার' ছিলো তারই নৌবন্দর।
মদীনা মুনাওয়ারার জন্যে চতুর্দিক থেকে এখানেই মালামাল এসে নামতো এবং এই 'জার' বন্দর থেকেই মুসলিম বাণিজ্যতরীগুলো হাবশা, মিসর, এডেন, হিন্দুস্তান ও চীনদেশ পর্যন্ত যাতায়াত করতো।
ইসলামের প্রারম্ভকাল থেকেই এর শোভা-সৌন্দর্য ও চাকচিক্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। 'জার' কেবল নৌবন্দরই ছিলো না, মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যেরও পীঠস্থানে পরিণত হয়েছিলো। এখানে বড় বড় মুসলিম পণ্ডিত ও শিক্ষাবিদ জন্মগ্রহণ করেন। বড় বড় অট্টালিকা নির্মিত হয়।
জারের বিপরীত দিকে সমুদ্র মাঝে এক বর্গমাইলের একটি দ্বীপ ছিলো। দ্বীপটির নাম ছিলো 'কারাফু'। সেখানে লোকজন নৌকায় যাতায়াত করতো। জারের ন্যায় এখানেও একটি মনোরম সওদাগর বসতি ছিলো।
উবাল্লা: বসরার অদূরে দজলা (তাইগ্রিস) নদীর তীরে সুপ্রাচীন এক ইরানী নৌবন্দর ছিলো। নাম উবাল্লা। ইসলামী 'আমলে এটি কেন্দ্রীয় মর্যাদা লাভ করেছিলো। ইসলাম-পূর্বকালে ইরানী সেনা- ছাউনি ও বাণিজ্য বন্দর ছিলো। চতুর্দশ হিজরীতে মুসলিম অধিকার- ভুক্ত হয়। এখানে বিশেষভাবে চীন ও হিন্দুস্তানগামী জাহাজ থাকতো। এটি দখল করার দরুনই মুসলমানগণ পূর্ণরূপে ইরান দখল করতে সক্ষম হন। ২৫৬ হিজরী পর্যন্ত এর দব্‌দবা অক্ষুণ্ণ ছিলো। অতঃপর ক্রমান্বয়ে তার গুরুত্ব লোপ পায়।
বসরাঃ এই নৌবন্দরটি হযরত 'উমর (রাঃ)-এর নির্দেশক্রমে চতুর্দশ হিজরীতে 'কারনা' ও 'শাতিল 'আরবের' মধ্যস্থলে নির্মিত হয়। ভৌগোলিক অবস্থানগত গুরুত্বের দরুন স্বল্পকালের মধ্যেই বসরা সমৃদ্ধি লাভ করে উবাল্লার দীপ্তিকেও ম্লান করে দেয় এবং ক্রমে ক্রমে চীন ও হিন্দুস্তানগামী জাহাজের এক বিশিষ্ট কেন্দ্রে পরিণত হয়। মুসলমানদের সিন্ধু বিজয়ের পর এর রওনক আরো বৃদ্ধি পায়। সিন্ধু ও বস্ত্রার যোগাযোগ আরো ঘনিষ্ঠ হয়।
সীরাফ: এই নৌবন্দরটি হিজরী তৃতীয় শতকে বসরার অদূরে পারস্যোপসাগরে স্থাপিত হয়। এটিরও জৌলুস ছিলো অত্যধিক। 'আরবের বাণিজ্য তরী এখান দিয়েই চীন ও হিন্দুস্তান যাতায়াত করতো।
এডেন: য়ামন উপকূলে এডেন বন্দর অবস্থিত। সুপ্রাচীন নৌ- বন্দর। হিজরী তৃতীয় শতকে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছিলো। এডেন য়ামনের রাজধানী সানা'আর নৌবন্দর ছিলো। এখান দিয়ে হাক্কা, মানদাব, জেদ্দা, হিন্দুস্তান ও চীনের বাণিজ্য তরী আসা-যাওয়া করতো। হিজরী চতুর্থ শতকে সমৃদ্ধির উচ্চশিখরে আরোহণ করে। এডেন বাজার খুবই জমজমাট ও মালামালে ভরপুর ছিলো।
সুহার: সুহার আম্মানের রাজধানী ও নৌবন্দর ছিলো। হিজরী চতুর্থ শতকে এই বন্দরটি স্বীয় ঔজ্জ্বল্য, বৈভবের প্রাচুর্য ও বর্ণাঢ্য বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে সানা'আর চাইতেও উন্নত ছিলো। সমকালীন পর্যটকদের ভাষায়: সুহারের বাজারটি অত্যন্ত জৌলুসময়। গোটা সমুদ্র উপকূল জুড়ে বিস্তৃত। সুউচ্চ ও সুরুচিময় ঘরদোর শালকাঠ ও ইট দ্বারা নির্মিত। উপকূলে মিঠা পানির নহর প্রবাহিত।
জেদ্দাঃ এ নৌবন্দরটি প্রাচীনকাল থেকেই আবাদ ছিলো। ইসলাম- পূর্ব জাহিলী যুগেও এটি মক্কা মু'আজ্জমার নৌবন্দর ছিলো। অতঃপর আফ্রিকা, আবিসিনিয়া, সিন্ধু ও ইরানে ইসলামের অগ্রগতির সাথে সাথে এরও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। অধুনা এটি বিশেষ করে প্রাচ্য দেশীয় হজ্জযাত্রীদের বন্দরে পরিণত হয়েছে।
শহর কুল্ল্ফমঃ লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত এক বিরাট শহর ও নৌবন্দর ছিলো। বিশেষভাবে খাদ্য সরবরাহ কেন্দ্ররূপে ব্যবহৃত হতো। যেসব সওদাগর মিসর থেকে হিজাজ ও য়ামনে খাদ্যশস্য সরবরাহ করতেন এই বন্দরটিই তাঁদের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র ছিলো। এখানে বিভিন্ন দেশের সওদাগররা বসবাস করতেন।
ঈলা: ঈলার বর্তমান নাম আকাবা। এটি ছিলো সিরিয়ার সুপ্রসিদ্ধ নৌবন্দর। ঈলা বন্দর লোহিত সাগরের পাড়ে সমৃদ্ধিশালী শহর ছিলো। এখানে সিরিয়া, মিসর ও উত্তর আফ্রিকার বাণিজ্য তরী যাতায়াত করতো। ঈলা ছিলো হরেক রকম পণ্যদ্রব্যের বাণিজ্যকেন্দ্র। উত্তর আফ্রিকার হজ্জযাত্রিগণ এই বন্দরেই অবতরণ করতেন।
ভূমধ্যসাগর সিরিয়ার উপকূল থেকে উত্তর আফ্রিকার 'জাবালুত্ তারিক' পর্যন্ত বিস্তৃত। মুসলমানদের ওপর রোমানদের আক্রমণ আশঙ্কা বরাবরই লেগেছিলো। তাই মুসলমানরা সিরিয়ার উপকূলবর্তী 'সূর' নামক স্থানে জাহাজ নির্মাণ কারখানা স্থাপন করেছিলেন। 'আরব-দের সমুদ্র বিজয় যতই আগু বাড়ছিলো, রোমানরাও ততই পিছু হটছিলো। বনু উমাইয়ার পর বনু 'আব্বাস মুসলিম নৌশক্তির অধিকারী হন। তাঁদের পর উত্তর আফ্রিকার অধিপতি হন 'উবায়দী ফাতিমী।
ফাতিমীদের রাজত্ব ভীষণ শক্তিশালী ছিলো। সিসিলী, সিরিয়া ও মিসরের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। ফাতিমিগণ নৌবাহিনী সম্পর্কে বড় উৎসাহী ছিলেন। এ ছাড়া, তাঁদের বেশীর ভাগ পথই নৌ-নির্ভর ছিলো। তাই নৌ-উন্নয়ন তাদের অত্যাবশ্যকীয় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাঁরা তিউনিসের পুরান নৌ-কারখানা সমৃদ্ধ করে তোলেন।
মাসীনা: মাসীনা ছিলো সিসিলীর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ও সামরিক বন্দর। এখানে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সওদাগররা বাণিজ্যিক পণ্যদ্রব্য লেনদেন করতেন। মাসীনাতেই সিসিলীর সর্ববৃহৎ রণপোত কারখানা স্থাপিত হয়েছিলো।
পালার্মোঃ পালার্মো ছিলো সিসিলীর রাজধানী ও বিশাল নৌবন্দর। এখানেও যুদ্ধ জাহাজের একটি বিরাট কারখানা ছিলো। হাযার হাযার শ্রমিক-মিস্ত্রী এই কারখানায় কাজ করতো।
মারীয়া: মারীয়া স্পেনের সর্ববৃহৎ নৌবন্দর। এখান থেকে সওদাগররা জাহাজে আরোহণ করতেন। মস্তবড় বাণিজ্য ও রণপোত কেন্দ্র ছিলো। স্বীয় বিশালত্ব ও যাতায়াত সুবিধার জন্যে এটিকে স্পেনে প্রাচ্যের সিংহদ্বার বলা হতো। সাগরের পানি নগর দেওয়ালে এসে আছড়ে পড়তো। এখানে উন্নতমানের রেশমী কাপড় তৈরী হতো।
বিজায়াঃ বিজায়া ছিলো উত্তর আফ্রিকা ও মরক্কোর সর্বাধিক পরিচিত নৌবন্দর। আলজিরিয়া ও তিউনিসের মাঝখানে অবস্থিত। প্রথমদিকে অতি সাধারণ নৌবন্দর ছিলো। ৪৫৭ হিজরীতে নাসির ইবন 'আন্নাস এটিকে উপযুক্ত নৌস্থল ভেবে আবাদ করেন। ফলে ক্রমে ক্রমে এক বিশাল নৌবন্দরে পরিণত হয়। এখান থেকে সর্বত্র জাহাজ চলাচল করতো।
সান্তাঃ এটি মরক্কোর বিখ্যাত নৌবন্দর ছিলো। স্পেনের উল্টো দিকে আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত। এক সময় পৃথিবীর উৎকৃষ্টতম পোতাশ্রয় ছিলো।
মাহদীয়াঃ ফাতিমী রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা ৩০০ (তিনশ') হিজরীতে আফ্রিকার উপকূলে মাহদীয়া নির্মাণ করেন। স্বীয় স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে খ্যাতিমান বন্দর ছিলো। উপকূলের পাথর কেটে নির্মিত হয়েছিলো। এখানে একটি সুন্দর প্রবেশপথ ছিলো। শিকল দিয়ে বাঁধা হতো। জাহাজ ভিড়ার সময় শিকল খুলে ফেলে পুনরায় বেঁধে দেয়া হতো।
তিউনিসঃ এই নৌবন্দরটি অতি সুপ্রাচীন। 'আবদুল মালিক ইব্‌ন মারওয়ান তিউনিস বন্দরকে জাহাজ নির্মাণের জন্যে নির্বাচন করেছিলেন। মুসলমানদের জাহাজ নির্মাণ শিল্পে এই বন্দরটি বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেছিলো। বলতে গেলে, এখান থেকেই মুসলমানদের জাহাজ নির্মাণ ও নৌ-চালনার অভিযাত্রা শুরু হয়েছিলো। এই বন্দরটি ছিলো অতি সুরক্ষিত ও অপার্থিব শক্তি মহিমায় মণ্ডিত। এখানে জাহাজ ভিড়ার পর সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়ে যেতো। কোনো ঝড়-তুফানের আশঙ্কা থাকতো না। এর সন্নিকটে দুটি প্রকাণ্ড ঝিল আছে। একটির নাম 'বারাস্তা' ও আরেকটির নাম 'হাল্কুল ওদ'। দুই ঝিলের মাঝখানে একটি ভূখণ্ড বিদ্যমান। এই ভূখণ্ডটি কেটে ঝিল দুটিকে মিলিয়ে দিলে তিউনিস এমন এক সুবিস্তৃত নৌবন্দর হতে পারে, যেখানে ভূমধ্য-সাগরের সকল নৌযান একত্রে থাকা সম্ভব।
শহর রশীদঃ হিজরী তৃতীয় শতকের শেষভাগে মিসরের তিউনিস সাগরে বড় বড় জাহাজ চলাচল করতো। এখানে শহর রশীদ নামে একটি বর্ণোজ্জ্বল নৌবন্দর ছিলো। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিলো নীল নদের পানি সাগরে পতিত হওয়ার দরুন সাগরের জাহাজ অনায়াসেই নীল নদে প্রবেশ করতে পারতো।
শহর কাওস: মামলুক 'আমলে এই বন্দরটি খুবই সরগরম ছিলো। এটি মস্তবড় উপকূলীয় শহর। মিসরের 'বন্দর সাঈদ' নামে খ্যাত। দক্ষিণ দেশ থেকে 'শূর' নদ দিয়ে জাহাজযোগে আগত সওদাগররা এখানে থামতেন। এডেনের সওদাগররাও এখানে থামতেন। নৌ-বাণিজ্যের দরুন এখানে বিপুল ধন-ঐশ্বর্য ছিলো।
দামিয়াত: এই বন্দরটির একপ্রান্ত নীল নদের সাথে এবং অপর প্রান্ত ভূমধ্যসাগরের সাথে যুক্ত ছিলো। এটি মিসরের সুবৃহৎ নৌবন্দর ছিলো। এখানে নৌযুদ্ধের মহড়া অনুষ্ঠিত হতো। দামিয়াতে দুটি মিনার ছিলো। মিনার দুটির সাথে লোহার মোটা শিকল টানা থাকতো। ফলে সরকারের বিনা অনুমতিতে এখানে কেউ জাহাজ নোঙ্গর করতে পারতো না।
আলেকজান্দ্রিয়া: আলেকজান্দ্রিয়া মিসরের প্রাচীন নামকরা নৌবন্দরসমূহের অন্যতম। গ্রীকদের 'আমলে নির্মিত হয়েছিলো। নাম থেকেই বোঝা যায়, এটি সম্রাট আলেকজান্ডারের সৃষ্টি। সেই থেকে আজো তার ঔজ্জ্বল্য অম্লান। আলেকজান্দ্রিয়া মুসলিম 'আমলে একটি বিখ্যাত নৌবন্দর ছিলো।
ওপরে আমরা মুসলিম নৌবন্দরগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরলাম। তোমরা বড় হয়ে আরো অনেক কথা জানতে পারবে। দেশের প্রতিরক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যে নৌবন্দর অত্যাবশ্যক।
যে সব দেশের কাছে নৌবন্দর নেই, তারা শক্তিশালী হতে পারে না। ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামরিক শক্তির জন্যে নৌবন্দর, জাহাজ নির্মাণ ও নৌ-চালনা শিক্ষা অপরিহার্য। যে জাতির উন্নত নৌবন্দর আছে, যাদের নৌ-কারখানায় অহর্নিশ নির্মাণ কাজ চলে, যাদের নৌযান সাগরবক্ষ চিড়ে দেশ-দেশান্তরে নতুন নতুন জিনিসপত্র আমদানী-রফতানী করছে, তারা সত্যই সৌভাগ্যবান।
নাবিক সেজে দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করা তোমাদেরও কর্তব্য। আল্লাহ্ তোমাদের শক্তি ও সামর্থ্য দান করুন। জাতির মান-মর্যাদা নৌশক্তিতেই নিহিত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00