📄 সাফল্যের বংশাণু
কিছু মুসলিম উদ্যোক্তার শুরুটা হয়েছিল দেউলিয়া অবস্থা থেকে। যেমন : জনাব মুহাম্মাদ সালিম সিদ্দিকির পরিবার। দেশভাগ ও যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাদের। প্রচুর মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয় ওই বছরগুলোতে। তারপরও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে শেষমেশ তিনি হয়েছেন সফল। এই জিনিসটাকেই আমি বলি সাফল্যের জিন (gene)। সাফল্য বা ব্যর্থতা কারও জন্যই নির্ধারিত না। কিন্তু পুরো পরিবার একসাথে সফল হলে বুঝতে হবে যে, এটা স্রেফ ভাগ্যের জোর নয়। ঘটনার আরও গভীর ব্যাখ্যা আছে। অতীতে কাজ হয়েছে, তাই এবারও হবে—এই বিশ্বাসটাই এখানে সাফল্যের জন্মদাতা।
ধরুন একটা বাচ্চা হাঁটতে চায়। সে তার বাবা-মাকে হাঁটতে দেখবে। চারপাশে সবাই হাঁটছে, কথা বলছে, লাফাচ্ছে। শীঘ্রই বাচ্চাটাও অনুকরণ করতে শুরু করবে সেগুলো। কেন? এটা বংশানুক্রমিক সাফল্য। আপনি নিজেও সফলভাবে হাঁটতে শিখেছেন। সহজ ছিল না কাজটা। শুরুতে হয়তো বেশ কয়েকবার হোঁচট খেয়েছেন, ব্যথা পেয়েছেন... কিন্তু পেরে গেছেন শেষমেশ! এখন হাঁটতে হাঁটতে আপনি সব করতে পারেন, হাঁটাটাই হয়ে গেছে অবচেতন। এই সবকিছু দেখে শিশু ভাবে, 'আমাকেও হাঁটতে হবে। আমিও মানুষ। সব মানুষ হাঁটছে।' আপনারও সাফল্যকে দেখতে হবে এভাবে। নিজেকে দেখুন কোনোকিছু প্রথমবার শিখতে চলা শিশুর মতো। ব্যর্থ হলে সমস্যা নেই। পড়ে যাবেন, কাঁদবেন, খিলখিল করে হাসবেন, এরপর উঠে দাঁড়াবেন। বাচ্চারা ব্যর্থতা গায়ে মাখে না। ভাবে, 'সবাই পারছে, আমিও পারব!' এই হলো বিজয়ী মানসিকতা। এটা সাফল্যের বংশাণু।
নিজের চারপাশে দেখে বলুন, 'কত মুসলিম উদ্যোক্তা সফল হয়েছে! আমিও হব।' তাই তো ব্যবসায়ী পরিবারে ব্যবসায়ী, ডাক্তার পরিবারে ডাক্তার, আর আইনজীবী পরিবারে আইনজীবী জন্ম নেয়। চারপাশের সবাইকে সফল হতে দেখলে সাফল্যটা একরকম বংশগত স্বভাবে পরিণত হয়। তাই এমন মানুষদের খুঁজে বের করুন, যারা আপনার মতো একই জিনিসে বিশ্বাসী। পর্যবেক্ষণ করুন তাদের। দেখবেন যে, তারাও স্বাভাবিক মানুষ। চলাফেরা-জীবনযাপন করছে স্বাভাবিক মানুষের মতোই। হয়তো-বা শিক্ষাদীক্ষায় আপনার চেয়ে কমই হবেন। কিন্তু তারা সফল হয়েছেন মানে আপনিও হবেন। আর এটাই সাফল্যের মূল উপাদান।
ইয়াইয়া এন্দিয়ানোরের একটি উদাহরণ দিয়ে শেষ করি। সেনেগালের এই কোটিপতি এককালে ইউরোপ, মধ্য আফ্রিকা ভ্রমণ করে শেষে কঙ্গোতে থিতু হন। হঠাৎ সহিংসতা শুরু হয় সে দেশে। সঙ্গীদের-সহ বন্দি হন, কোনোরকমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসেন বন্দুকের মুখ থেকে। এই বিপর্যয়ের ফলেই তিনি পেয়েছেন শক্তি। বলতে শিখেছেন, 'নিজের লক্ষ্যকে তাড়া করতে গিয়ে আমি মরতে বসেছিলাম। তার মানে আমি পারব!' এখন তিনি কোটিপতি। এরকম প্রচুর গল্প আছে। মোটকথা, আপনার যদি একটা বাড়ি, একটা খাট, একটা চাকরি থাকে, আর পড়াশোনার মধ্যে থাকেন...তাহলে বহু মানুষের চেয়ে এগিয়ে আছেন আপনি। আল্লাহর অনুগ্রহ গুনে শেষ করা অসম্ভব। তাই নিজেকে সফল হিসেবে দেখতে শিখুন।
📄 প্রশিক্ষকের ব্যাপারে আরও কিছু কথা
প্রশিক্ষক বা পরামর্শদাতা কেন দরকার? কারণ তিনি আপনাকে প্রভাবিত করবেন। প্রথমে বুঝতে হবে যে, নিকটতম বন্ধুর কাছে আপনার বাজারমূল্য ২০০০ ডলারের কম। বলছি না যে, শুধু বড়লোকদের সাথেই ঘুরঘুর করতে হবে। এরকম মানসিকতা মোটেও থাকা উচিত না। বরং বিভিন্ন ধরনের বন্ধুমহল রাখুন। ব্যবসায়িক পরামর্শ লাগলে ওইরকম বন্ধুদের কাছে যাবেন। দ্বীন সংক্রান্ত সহযোগিতা লাগলে দ্বীনদার মুত্তাকি বন্ধুদের শরণাপন্ন হবেন। দ্বীন বলতে কিন্তু আখলাক, মুয়ামালাত সবকিছুর সমষ্টি বোঝাচ্ছি। তেমনি ব্যবসার পরামর্শ নিতে দেউলিয়া বন্ধুদের কাছে যাবেন না। পরিচিতদের মাঝে কোনো কোটিপতি না থাকলে প্রয়োজনে আমার সাথে যোগাযোগ করুন। আমি সাহায্য করব। দেখিয়ে দেবো কীভাবে ওইরকম মানুষের সাথে যোগাযোগ তৈরি করতে হয়।
ধরুন আমি অন্টারিও থেকে মরক্কোতে নৌকা দিয়ে ভ্রমণ করতে চাই। গ্রীষ্মকালে গেলাম কানাডার পূর্ব উপকূলে। দিলাম রওনা। যাচ্ছি কিন্তু পূর্ব দিকেই। কিন্তু এর ফলে আমি ইংল্যান্ডেও চলে যেতে পারি, ফ্রান্সেও যেতে পারি, গ্রিনল্যান্ডেও যেতে পারি। কিন্তু সাথে যদি একজন পেশাদার নাবিক থাকত? অথবা থাকত ত্রুটিহীন কোনো জিপিএস? তাহলে যাত্রা কত সহজ হয়ে যেত না? এবার এমন কারও কথা ভাবুন, যিনি আপনার কাঙ্ক্ষিত কাজগুলো ইতোমধ্যে করেছেন। আপনারই মতো একজন মুসলিম উদ্যোক্তা। তাদের পরামর্শ নিন। সময় নষ্ট করবেন না। আমি বিশেষভাবে জোর দিচ্ছি ব্যাপারটায়। পরামর্শদাতা আপনার দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করবেন। তাই পরামর্শদাতার নামে মিষ্টভাষী বন্ধু খুঁজবেন না। স্পষ্টভাষী সত্যবাদী খুঁজুন। সত্য ব্যথাদায়ক হতে পারে, কিন্তু সেইসাথে আপনার মুক্তিদাতাও।
📄 শেষ কথা
উদ্যোক্তা হওয়া মানেই সুখ-শান্তি নিশ্চিত করে ফেলা নয়। কিন্তু এ আপনাকে মুক্তি দেবে। দেবে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা। নিজের পছন্দমতো কাজ করার স্বাধীনতা। হোক তা এই দুনিয়ার জন্য বা আখিরাতের জন্য। তাই বড় বড় মহান কাজ করার স্বপ্ন অনেক মুসলিমেরই আছে। কিন্তু অনেকেরই নেই তা বাস্তবায়নের মতো অর্থ। অনেকে আবার চাকরির মাধ্যমে নিজের সময়কে বন্দি করে ফেলে। ব্যাপারটা দুঃখজনক। এমন অনেক মুসলিমকে দেখেছি, যারা স্রেফ সামর্থ্যের অভাবে স্বপ্নকে পুরোপুরি উপভোগ করতে পারে না। কারণ চাকরি করতে গিয়ে অন্যের স্বপ্ন পূরণে জীবন শেষ করে ফেলে তারা। আর নিজেরা শুধু বিল পরিশোধ করে কোনোরকমে বেঁচেবর্তে থাকে। চল্লিশটা বছর ধরে কাজ করেও থাকে আর্থিকভাবে অনিরাপদ। তাই আমার একটাই পরামর্শ: নিজের পরিকল্পনা পালটে ফেলুন। মুসলিম উদ্যোক্তা হোন। আপনার এটা দরকার; আপনার পরিবারের দরকার, উম্মাহর দরকার। বইটি লিখতে পেরে সম্মানিত বোধ করছি। আশা করি ভবিষ্যতেও আপনাদের সেবা করে যেতে পারব। আসসালামু আলাইকুম। আপনাদের সাফল্য কামনায় উমার সুল