📘 সম্পদ গড়ার কৌশল > 📄 কর্মচারী থেকে উদ্যোক্তা

📄 কর্মচারী থেকে উদ্যোক্তা


পড়াশোনা শেষ করে কিছু না কিছু আপনাকে করাই লাগবে। অনেকে সরাসরি উদ্যোক্তা হয়ে যায়। কারণ নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে জানে তারা। ধরুন আপনি সেই ছাত্রজীবন থেকে কম্পিউটার কোড লিখে আসছেন। পঁচিশ বছর বয়সে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ সম্পন্ন করবেন, ততদিনে সত্যিই আপনি নিজের একটি কোম্পানি তৈরি করতে প্রস্তুত। আমি এ ব্যাপারে খুবই উৎসাহ দিই। সন্তানদের এমন কোনো শখের প্রতি উৎসাহিত করুন, যেটাকে পরে দক্ষতায় পরিণত করা সম্ভব। গড়ে তুলুন স্বনির্ভর সন্তান। শিক্ষাজীবন শেষে চাকরিতে ঢোকা এখন সবচেয়ে জনপ্রিয়। কিন্তু আগের আলোচনা থেকেই দেখেছি যে, চাকরি করলে ট্যাক্সের পেছনে কী পরিমাণ খরচ হয়। সময়ের ওপরও থাকে না নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ। তাই কিছু মানুষ করবে ব্যবসা। আর এ বইয়ের উদ্দেশ্যও তা-ই; মুসলিম উদ্যোক্তা হওয়া। আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী ও শক্তিশালী হওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় এটিই।

ফেডারেল রিজার্ভ পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী শুধু উত্তর আমেরিকাতেই ব্যবসামালিকদের মোট সম্পদ চাকরিজীবীদের মোট সম্পদের পাঁচ গুণ। পাঁচ গুণ! বুঝতেই পারছেন ঘটনা। উদ্যোক্তা হওয়ার পর নিজের ব্যবসাকে স্বয়ংক্রিয় করে ফেলতে হবে। অভিজ্ঞতার জন্য একজন উপদেষ্টা জোগাড় করুন। ব্যবসা পুরোদমে চালু হয়ে গেলে মনোযোগ দিন রেসিড্যুয়াল আয়ের দিকে। ভাড়া দেওয়ার মতো কোনো জিনিস বা নিজের নামে প্যাটেন্ট করা কিছু, যার মাধ্যমে অনবরত আয় আসবে। বই লেখা, সৃষ্টিশীল কোনো কাজ। রেসিড্যুয়াল উপার্জনের ব্যাপারটাই দারুণ উত্তেজনাকর। একসময় ওই উপার্জন দিয়ে অন্য কোনো উদ্যোগে অংশীদার হতে পারবেন। উভয়দিকে লাভ।

📘 সম্পদ গড়ার কৌশল > 📄 স্বর্ণালী পরশ

📄 স্বর্ণালী পরশ


কিছু মানুষ যেখানেই হাত দেয়, সেখানেই সোনা ফলে—খেয়াল করেছেন? তারা যেন জানে, কোথায় টাকা রাখা আছে। অন্যরা যখন মাথার ঘাম পায়ে ফেলছে, তারা টাকা বানাচ্ছে অনায়াসে। এই মানুষগুলোর একটি বৈশিষ্ট্য হলো কোনো সুযোগ না ছাড়া। জনাব রিজভি বলেন, ‘নিজের গায়ে নির্দিষ্ট কোনো প্রাইস ট্যাগ লাগিয়ে দেবেন না। সবরকম সম্ভাবনা লুফে নিতে প্রস্তুত থাকতে হবে। ওই সম্ভাবনাকে পরিণত করবেন মুনাফায়।’

আরেকটা ব্যাপার হলো, ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলেই হয় না। ধরুন, আপনি সেলুন ব্যবসা শুরু করতে চান, কিন্তু সেখানে কাজ করার ব্যাপারে কিছু জানেনই না। তাহলে লাভ আদায় করা হবে খুবই দুঃসাধ্য। চৌকস হতে হলে ব্যবসার ভেতর-বাহির সব জেনে নিন আগে। তরুণ বয়সেই পরিবার থেকে ব্রোকারেজ ব্যবসা সম্পর্কে জেনে গেছেন জনাব রিজভি। তার বাবা-দাদা উভয়ই ছিলেন উদ্যোক্তা। তাকে শিখিয়েছেন রিয়েল এস্টেট সম্পর্কে। তাই এই ব্যবসার সাথে পরিচিত হওয়ার সময় তার বয়স অত বেশি ছিল না। এমনকি মাটির বৈশিষ্ট্য সংক্রান্ত জ্ঞানও পেয়ে গেছেন ততদিনে। কানাডায় বিশেষ করে এর গুরুত্ব আরও বেশি। এখানকার মানুষ বাগান খুব ভালোবাসে। এই বিষয়ক সূক্ষ্ম জ্ঞান তাকে করে তুলেছে বাড়ি বিক্রি ব্যবসার পাকা খেলোয়াড়। পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ও জেনে নেন ভালো করে। আশপাশের এলাকা, নিষ্কাশন ব্যবস্থা ইত্যাদি। ক্রেতারা এই তথ্যগুলো চায়। অর্ধমিলিয়ন ডলার তো আর এমনি এমনি পানিতে ঢেলে দেবে না কেউ।

ব্যবসাকে ওপরের ধাপে নিতে হয় এভাবেই। ওই খাতের আগা-পাশ-তলা জেনে নিন। সেরা কর্মীরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে দক্ষ বলেই সেরা। যেমন: ড. আমিনা কক্সন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ হাসপাতাল নিউ ইয়র্কের জন হপকিন্সে। প্রশিক্ষণ যখন এই মানের, তখন লন্ডনের হার্লি স্ট্রিটে চেম্বার খুলতে আর বাধা কোথায়! ওই দেশে ডাক্তারি চর্চার জন্য এ এক অসাধারণ এলাকা। ড. আমিনার প্রশিক্ষণের কার্যকারিতার একটি উদাহরণ আগেই দেখেছেন। বিশ বছর হবে না দেখা একটি রোগ তিনি ধরে ফেলেছেন ১৫ মিনিটের ডায়াগনোসিসে। এর কারণ নিজ পড়াশোনার বিষয়ের প্রতিটা খুঁটিনাটি সম্পর্কে জ্ঞান। বই খুলে দেখা বা মনে করার পেছনে সময় দিতে হয় না তাকে। রোগীরাও অবাক! বিশেষত বেসরকারিভাবে পরিচালিত চেম্বারে এত দক্ষতা ও সততা পেয়ে তারা যথেষ্ট মুগ্ধ। তিনি জানেন যে, আরও সময় দিলে আরও টাকা কামাতে পারতেন। কিন্তু এতে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত হতো না। ব্যক্তিগত পড়াশোনা বা পরিবারকে দেওয়ার মতো সময়ও কমে যেত সেক্ষেত্রে। তাই নিজ ব্যবসা সম্পর্কে ভালোভাবে জানাশোনা থাকার সুবিধা বহুমুখী।

📘 সম্পদ গড়ার কৌশল > 📄 নিজের প্রতি পুনঃবিনিয়োগ

📄 নিজের প্রতি পুনঃবিনিয়োগ


ব্যবসা যেহেতু পুরোদমে চলছে, এখন সবার আগে নিজের প্রতি বিনিয়োগ করুন। দক্ষতা শিখুন। বাড়ান যোগাযোগ দক্ষতা। সঠিক ব্যবসাকৌশল জেনে নিন। আর এই শিক্ষার্জন ধারাবাহিক; থামবে না কখনও। আপনার কর্মক্ষেত্রের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন তো থেমে নেই। আপনি কেন থামবেন? লর্ড নাজির আহমেদ একটা কথা বললেন যে, অনেকের ব্যবসা সারা জীবন ছোটই থেকে যায়। যেভাবে শুরু করেছিল, সেভাবেই। একটা নির্দিষ্ট সীমার পর এদের আর বাড়তে না পারার কারণ সাধারণত নতুন নতুন দক্ষতা না শেখা। নিজের যথেষ্ট পরিমাণ উন্নতি না ঘটানো। সময়ের সাথে বাড়তে থাকতে হবে আপনাকে। কৌশলগত দক্ষতার অভাব থাকলে শিখে নিন। পরিচিতির পরিধি কম হলে বাড়ান। বেড়ে ওঠার জন্য যা কিছু দরকার, তা-ই করুন। প্রযুক্তি দ্রুত গতিতে এগুচ্ছে। এর ফলে যাদের পণ্য ও সেবা পুরাতন হয়ে যাচ্ছে, তাদের জন্য বাজারে টিকে থাকা কষ্টকর। আপনার তো লক্ষ্য হওয়া চাই নিজ ক্ষেত্রের নেতা হওয়া।

জনাব রিজভি তেমনটা হতে পেরেছেন তার উদ্ভাবনী বৈশিষ্ট্যের কারণে। তিনি ব্যবসা স্থাপনই করেছেন এমনভাবে, যার ফলে বছরের পর বছর ধরে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে উৎপাদন হয়েছে বেশি। এর কারণ তার অনুসৃত পদ্ধতি। এখন অনেক কোম্পানিই তার মার্কেটিং কৌশল অনুসরণ করছে। তিনি এতে চিন্তিত নন। কারণ ব্যবসানেতা হিসেবে আপনাকে খোলামেলা হতে হবে। সবকিছু নিজের কাছে চেপে রাখা যাবে না। নেতা হিসেবে আপনার কাজ একটি আন্দোলন তৈরি করা, যার ইতিবাচক ফল ভোগ করবে ক্রেতা, ভোক্তা, সমাজ ও মানবজাতি। ব্যবসায় এমনভাবে বিনিয়োগ করুন, যাতে মূলধন খেয়ে ফেলতে না হয়। যে পরিমাণ বিনিয়োগ করবেন, তা যেন পুনরায় বিনিয়োগযোগ্য পরিমাণ হিসেবে ফেরত আসে। তারপর হিসেব করুন কত সঞ্চয় করবেন আর কত দান করবেন। এরপর নির্ধারণ করুন ব্যক্তিগত খরচ। এগুলো সবই গুরুত্বপূর্ণ।

📘 সম্পদ গড়ার কৌশল > 📄 সাফল্যের বংশাণু

📄 সাফল্যের বংশাণু


কিছু মুসলিম উদ্যোক্তার শুরুটা হয়েছিল দেউলিয়া অবস্থা থেকে। যেমন : জনাব মুহাম্মাদ সালিম সিদ্দিকির পরিবার। দেশভাগ ও যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাদের। প্রচুর মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয় ওই বছরগুলোতে। তারপরও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে শেষমেশ তিনি হয়েছেন সফল। এই জিনিসটাকেই আমি বলি সাফল্যের জিন (gene)। সাফল্য বা ব্যর্থতা কারও জন্যই নির্ধারিত না। কিন্তু পুরো পরিবার একসাথে সফল হলে বুঝতে হবে যে, এটা স্রেফ ভাগ্যের জোর নয়। ঘটনার আরও গভীর ব্যাখ্যা আছে। অতীতে কাজ হয়েছে, তাই এবারও হবে—এই বিশ্বাসটাই এখানে সাফল্যের জন্মদাতা।

ধরুন একটা বাচ্চা হাঁটতে চায়। সে তার বাবা-মাকে হাঁটতে দেখবে। চারপাশে সবাই হাঁটছে, কথা বলছে, লাফাচ্ছে। শীঘ্রই বাচ্চাটাও অনুকরণ করতে শুরু করবে সেগুলো। কেন? এটা বংশানুক্রমিক সাফল্য। আপনি নিজেও সফলভাবে হাঁটতে শিখেছেন। সহজ ছিল না কাজটা। শুরুতে হয়তো বেশ কয়েকবার হোঁচট খেয়েছেন, ব্যথা পেয়েছেন... কিন্তু পেরে গেছেন শেষমেশ! এখন হাঁটতে হাঁটতে আপনি সব করতে পারেন, হাঁটাটাই হয়ে গেছে অবচেতন। এই সবকিছু দেখে শিশু ভাবে, 'আমাকেও হাঁটতে হবে। আমিও মানুষ। সব মানুষ হাঁটছে।' আপনারও সাফল্যকে দেখতে হবে এভাবে। নিজেকে দেখুন কোনোকিছু প্রথমবার শিখতে চলা শিশুর মতো। ব্যর্থ হলে সমস্যা নেই। পড়ে যাবেন, কাঁদবেন, খিলখিল করে হাসবেন, এরপর উঠে দাঁড়াবেন। বাচ্চারা ব্যর্থতা গায়ে মাখে না। ভাবে, 'সবাই পারছে, আমিও পারব!' এই হলো বিজয়ী মানসিকতা। এটা সাফল্যের বংশাণু।

নিজের চারপাশে দেখে বলুন, 'কত মুসলিম উদ্যোক্তা সফল হয়েছে! আমিও হব।' তাই তো ব্যবসায়ী পরিবারে ব্যবসায়ী, ডাক্তার পরিবারে ডাক্তার, আর আইনজীবী পরিবারে আইনজীবী জন্ম নেয়। চারপাশের সবাইকে সফল হতে দেখলে সাফল্যটা একরকম বংশগত স্বভাবে পরিণত হয়। তাই এমন মানুষদের খুঁজে বের করুন, যারা আপনার মতো একই জিনিসে বিশ্বাসী। পর্যবেক্ষণ করুন তাদের। দেখবেন যে, তারাও স্বাভাবিক মানুষ। চলাফেরা-জীবনযাপন করছে স্বাভাবিক মানুষের মতোই। হয়তো-বা শিক্ষাদীক্ষায় আপনার চেয়ে কমই হবেন। কিন্তু তারা সফল হয়েছেন মানে আপনিও হবেন। আর এটাই সাফল্যের মূল উপাদান।

ইয়াইয়া এন্দিয়ানোরের একটি উদাহরণ দিয়ে শেষ করি। সেনেগালের এই কোটিপতি এককালে ইউরোপ, মধ্য আফ্রিকা ভ্রমণ করে শেষে কঙ্গোতে থিতু হন। হঠাৎ সহিংসতা শুরু হয় সে দেশে। সঙ্গীদের-সহ বন্দি হন, কোনোরকমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসেন বন্দুকের মুখ থেকে। এই বিপর্যয়ের ফলেই তিনি পেয়েছেন শক্তি। বলতে শিখেছেন, 'নিজের লক্ষ্যকে তাড়া করতে গিয়ে আমি মরতে বসেছিলাম। তার মানে আমি পারব!' এখন তিনি কোটিপতি। এরকম প্রচুর গল্প আছে। মোটকথা, আপনার যদি একটা বাড়ি, একটা খাট, একটা চাকরি থাকে, আর পড়াশোনার মধ্যে থাকেন...তাহলে বহু মানুষের চেয়ে এগিয়ে আছেন আপনি। আল্লাহর অনুগ্রহ গুনে শেষ করা অসম্ভব। তাই নিজেকে সফল হিসেবে দেখতে শিখুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00