📘 সম্পদ গড়ার কৌশল > 📄 উপার্জনের আরও ধারা তৈরি

📄 উপার্জনের আরও ধারা তৈরি


আধুনিক সমাজগুলোতে ৯০% মানুষের চলমান উপার্জন থাকে। অর্থাৎ, তারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা বিশেষ কোনো দক্ষতার প্রশিক্ষণ নেয়, তারপর কোনো প্রতিষ্ঠানে তা প্রয়োগ করে। এর বিনিময়ে লাভ করে টাকা; মাসিক, সাপ্তাহিক ইত্যাদি ভিত্তিতে। কতটুকু সময় দিলেন, তার ভিত্তিতে নিজের উৎপাদনের একটা ভগ্নাংশ পান আপনি। এটি বর্তমানে উপার্জনের সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি। একে বলে চলমান আয়। গড়পড়তা ২৫ থেকে ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত কাজ করে যায় মানুষ।

দ্বিতীয় ধরনের উপার্জন হলো ব্যবসায়িক আয়। এটা দুই প্রকার। একটা হলো সরাসরি ব্যবসায় জড়িত হওয়া। এখানে আপনি নিজের শ্রম দিয়ে ক্রেতা বা অন্যান্য ব্যবসার কাছ থেকে টাকা লাভ করেন। এটাও একরকম নিজের সময় বিনিয়োগ করে টাকা আয়ের মতো। যেমন: সেলুন, রেস্তোরাঁ বা অ্যাকাউন্টিং বিজনেস। মালিক এখানে নিজের দক্ষতা ও শিক্ষা ব্যবহার করে সেবা দেয়। বিনিময়ে লাভ করে চলমান উপার্জন। এটাও চলমান, তবে ব্যবসা। এভাবে খুবই ধনবান হওয়া সম্ভব। ভোক্তার সাথে আপনি সরাসরি লেনদেন করছেন। ব্যবসার কাঠামো ঠিকঠাকমতো নির্ধারণ করতে পারলে চাকরিজীবীর তুলনায় ঘণ্টাপ্রতি অনেক বেশি আয় করতে পারবেন। আমার দেখা অনেক উদ্যোক্তা কোটিপতি হয়েছেন এভাবেই। একে বলে চলমান ব্যবসায়িক আয়।

ব্যবসায়িক আয়ের দ্বিতীয় যে প্রকার, সেটা প্রথমবার শুনলে মনে হবে দিবাস্বপ্ন। এমন উপার্জন, যেখানে কাজ করার দরকারই নেই। একে বলে রেসিড্যুয়াল উপার্জন। বিভিন্ন ধরনের সৃষ্টিশীল কাজ এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন: বই লেখা বা কোনো ধরনের শৈল্পিক বস্তু উৎপাদন; হোক তা কোনো রেকর্ড বা স্থাপত্য। রেসিড্যুয়াল উপার্জন হলো যেমনটা সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা কোম্পানি পরিচালক জমির মালিকরা করেন। প্যাটেন্টধারী মানুষদের কাজ। কোনো একটা জিনিসকে নিজের নামে প্যাটেন্ট করিয়ে নেওয়ার পর অন্যদের তা ব্যবহার করতে দেন তারা। ওই ব্যবহারের বিনিময়েই আসতে থাকে টাকা। পরের বিশ, ত্রিশ, পঞ্চাশ বছর নিজের আর কোনো কাজই করা লাগে না। স্বপ্নের আয়!

অবসর গ্রহণের সময় রেসিড্যুয়াল উপার্জন যেন আপনার চলমান উপার্জনের চেয়ে শক্তিশালী হয়, এটা নিশ্চিত করবেন। বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমাদের দৈহিক ক্ষমতা সীমিত। আমরা অসুস্থ হই, বুড়িয়ে যাই। বছরে কয়দিন কাজ করতে পারব, তাও নির্দিষ্ট। তাই রেসিড্যুয়াল উপার্জন শক্ত করা জরুরি। এখানে এ নিয়েই কথা বলব।

কথা হচ্ছে, এই ধরনের উপার্জন কি নতুন কোনো ধারণা? কারণ মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে ৯০% মানুষ চাকরিজীবী। এ এক বিশ্বজনীন বাস্তবতা। আগেকার দিনে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। মানুষের ছিল ভেড়া, গরু, মাঠ। ভূমি, খনিজ, ব্যবসা বা অস্ত্রের মতো দৃশ্যমান সম্পদ থাকার অর্থ ছিল মানুষ নিরাপদ। অথচ বর্তমানে বেশিরভাগ মানুষকে শেখানো হয় নিরাপত্তা মানে চাকরি। তাই উপার্জনের সবচেয়ে বিখ্যাত পদ্ধতি চলমান আয়। এর সর্বোচ্চ পর্যায় হলো বড়জোর কোনো পেশাদারী পদ; ডাক্তার, উকিল ইত্যাদি। কিছু মানুষ এভাবে ধনী হয় বটে, কিন্তু এর পেছনে সাধারণত দিতে হয় অগণিত ঘণ্টা।

তাই চৌকস হতে হলে নিজের রেসিড্যুয়াল উপার্জন বাড়িয়ে সম্পদ তৈরি করুন। ব্যবসা করলে খেয়াল রাখবেন সেটাকে কতটা রেসিড্যুয়াল করা যায়, যাতে চল্লিশ বছর যাবৎ সপ্তাহে সত্তর ঘণ্টা করে কাজ করা না লাগে। বেশিরভাগ মানুষ কাজ করে এভাবেই। বিনিময়ে আশা করে কিছু প্রতিদান এবং অবসরজীবনে নিরাপত্তা। অবসরকালে উপার্জন অর্ধেক বা তারও কম হয়ে যায়। তাই রেসিড্যুয়াল হওয়ার চেষ্টা করুন। এটি ধনী হওয়ার প্রথম ধাপ।

ইসলামী সমাজে রেসিড্যুয়াল সম্পদ নতুন কিছু না। আল্লাহ তাআলা সম্পদ এবং সন্তানের কথা একসাথে উল্লেখ করেন। কারণ এককালে মানুষের রেসিড্যুয়াল উপার্জনের প্রধান মাধ্যম ছিল সন্তান। বিশের আগে বিয়ে, তারপর বাচ্চা জন্ম দেওয়া। চল্লিশ বছর বয়স হতে হতেই চলে আসত কর্মক্ষেত্রে জায়গা করে নেওয়ার মতো আরেকটা প্রজন্ম। ব্যস, আগের প্রজন্মের এবার হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করার পালা। এখন এই মডেল আর কাজ করছে না, কারণ মানুষ বিয়েও করছে দেরিতে, সন্তানও নিচ্ছে কম। ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি ব্যবহার না করে মানুষকে নিজের থেকে অনেক কাজ করা লাগে এখন।

তাই এমন ব্যবসা চালু করুন, যার সাথে কোনো না কোনো ধরনের রেসিড্যুয়াল উপার্জন জড়িত। অথবা নিজের নামে কিছু প্যাটেন্ট করিয়ে নিন, কিছু লিখুন, করুন সৃষ্টিশীল কোনো কিছু। ব্যবসানির্মাণের রেসিড্যুয়াল অংশটাতে কাজ করুন। একটা ভালো উদাহরণ হলো পার্কিং স্পেস। এরকম কোনো জায়গা কিনে নিলে বছরের পর বছর মানুষের থেকে ফি সংগ্রহ করেই আরামে চলতে পারবেন। এরকম বহু উপায় আছে রেসিড্যুয়াল উপার্জনের। সম্পদশালী হওয়ার কার্যকরতম একটি উপায় এটি।

📘 সম্পদ গড়ার কৌশল > 📄 সঞ্চয়, সঞ্চয়, সঞ্চয়

📄 সঞ্চয়, সঞ্চয়, সঞ্চয়


সম্পদ তৈরির প্রথম ধাপ আসলেই সঞ্চয়। সঞ্চয়ের অভ্যাস না থাকা বড় খারাপ। মুহাম্মাদ সালিম বলেন যে, স্থায়ী সাফল্যকামী মুসলিম উদ্যোক্তার উচিত নিজ সামর্থ্যের মাঝে চলা। আল্লাহ অপচয় পছন্দ করেন না। নিজের ব্যবসা আগে গড়ে তুলুন। নিজের টাকা ব্যবহার করুন ব্যবসা গড়তে। এরপর যত আসবাবপত্র কিনতে মন চায়, কিনবেন! মুহাম্মাদ সালিম তার ব্যবসা দাঁড় করানোর শুরুর দিকে এমন একটা ঘর কিনেছিলেন, যার নির্মাণ অসম্পূর্ণ। ওই ঘরেই থেকেছেন তিন থেকে চার বছর। মাশাআল্লাহ, এখন তার পরিবার থাকে কোটি টাকার অট্টালিকায়!

কী পরিমাণ সঞ্চয় করলে ভালো? যতজন আলিমের সাথে কথা বলেছি, বেশিরভাগই আমাকে বলেছেন আয়ের যতটুকু অলস পড়ে থাকে, তার ১৫ থেকে ২০% দান করে দেওয়া ভালো। যদিও যাকাত শুধু ২.৫%, কিন্তু লক্ষ্য থাকতে হবে ২০%। আমাদের অনেকের কাছে অঙ্কটা বেশ বড়ই।

কীভাবে সঞ্চয় করতে হয়, তার একটা উদাহরণ দিচ্ছিলেন জনাব রিজভি। ২০০৯ সালেও তিনি একটা ২০০০ টয়োটা করোলা চালাতেন। অতি সম্প্রতি কিনেছেন মার্সিডিজ। চলন-বলন পরিপাটি, মার্জিত; কিন্তু গাড়ি সস্তা। অথচ তখন থেকেই তিনি পুরো কানাডার সেরা আবাসন ব্যবসায়ী। মানুষ ভাবত তিনি বুঝি মজা করছেন। কিন্তু আসলেই তার কাছে মনে হয়েছে যে, গাড়িটা এখানে বড় কথা না। মানুষ দেখে গুণগত মান।

এভাবে চিন্তা করুন। ঘর মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এই জিনিস বিক্রি করতে হলে বুঝেশুনে পা ফেলতে হয়। নাহলে জনগণের আর্থিক অবস্থা ধ্বংস করে দেওয়া আপনার পক্ষে খুবই সম্ভব। তাই জনাব রিজভির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল কাজের মান ঠিক রাখা, টাকা খরচ করা না। ওই সময় থেকে যে সাফল্য পেয়েছেন, তার বদৌলতে এখন ইচ্ছেমতো খরচ করলেও সমস্যা হবে না আর।

তবে একেবারে কৃপণ হওয়াও চলবে না। কারণ এতেও সম্পদ বাড়ে না। অপচয় ও কৃপণতা দুই-ই নিন্দনীয়। আল্লাহ যদি সম্পদ দিয়ে থাকেন, তা দেখান, যেন অভাবীরা আপনার কাছে সাহায্যের জন্য আসে। কোটিপতির জন্য ভাঙাচোরা ঘরে থাকা ঠিক নয়। অবস্থা অনুযায়ী জীবনযাপন করুন। 'আর আপনার প্রতিপালকের অনুগ্রহের ব্যাপারে (কথা এই যে), তা প্রচার করুন।' [২০]

সম্প্রতি এ নিয়ে এক জায়গায় আলাপ করছিলাম। পশ্চিম আফ্রিকার সবচেয়ে বিখ্যাত একজন উদ্যোক্তা দানশীলতার জন্য বেশ সুপরিচিত। তিনি আবার প্রায়ই উমরাহ করতে যান ব্যক্তিগত জেটে চড়ে। সম্পদ যখন ২০ বিলিয়ন ডলার, তার ক্ষেত্রে এটা অপচয় না। ওই প্রাইভেট জেট হয়তো তার সম্পদের হাজার ভাগের এক ভাগ হবে। সেখানে অনেক সাধারণ মানুষই আয়ের এক-দশমাংশ ব্যয় করে গাড়ির পেছনে। বলুন তো, কে বেশি সঞ্চয় করছে? প্লেনের মালিক বিলিয়নেয়ার, না গাড়ির মালিক মধ্যবিত্ত?

টিকাঃ
[২০] সূরা আদ-দুহা ৯৩:১১

📘 সম্পদ গড়ার কৌশল > 📄 দান মানে বিনিয়োগ

📄 দান মানে বিনিয়োগ


সফলতম মুসলিম উদ্যোক্তাগণ মহত্তম দাতাও। কোটিপতি হওয়ার উদ্দেশ্য শুধু নিজের অট্টালিকা, নিজের গাড়িই হওয়া উচিত না। এগুলোও থাকতে হবে। জীবনের মজা লুটতে হবে। কিন্তু মুসলিম কোটিপতি হওয়ার আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত অনেক অনেক দান করতে পারা। আপনার ধনী হওয়ার ইচ্ছেকে বাঁকা চোখে দেখার অধিকার কারও নেই। যদি কেউ করেও, তাকে চ্যালেঞ্জ করলাম এই পরিমাণ সদকা করতে, যতটা আপনি ধনী হওয়ার পর করবেন।

কতটা দান করা উচিত? ইমাম আশরাফের পরামর্শের পুনরাবৃত্তি করছি। পরামর্শটি সুন্নাহভিত্তিকও বটে। যদি ১০% দান করেন, আপনার ব্যবসায় জীবনে মন্দা হবে না। আর ৩৩% দান করলে ব্যবসা হবে লালে লাল। যে পরিমাণ মুনাফা ঘরে আনছেন, তার ৩৩%। অনেকের কাছে মনে হতে পারে এতে উলটো লাল বাতি জ্বলবে ব্যবসায়। কিন্তু খেয়াল করে দেখবেন যে, অনেক পশ্চিমা দেশের নাগরিকরা সরকারকে ট্যাক্সই দেয় উপার্জনের এই পরিমাণ। কিছু ক্ষেত্রে আরও বেশি! তাই পরিমাণটা যথেষ্ট যৌক্তিক। নিজে কত টাকার মালিক হতে চান, তার ওপরই নির্ভর করবে সব।

📘 সম্পদ গড়ার কৌশল > 📄 অর্থ ব্যবস্থাপনা

📄 অর্থ ব্যবস্থাপনা


অর্থ ব্যবস্থাপনা শুনে মনে হচ্ছে যেন এটা কোনো কোটি ডলার কোম্পানির কাজ! না। অর্থ ব্যবস্থাপনা করতে অত বড়ও হওয়া লাগবে না আপনাকে। যা আছে, তা-ই দিয়ে শুরু করুন। আমার মনে আছে, সেনেগালে থাকতে আমি পয়সার হিসেবে সঞ্চয় শুরু করেছিলাম। যথেষ্ট লম্বা সময় সঞ্চয় চালিয়ে গেলে ভালোই ধনী হয়ে উঠবেন একসময়। একসময় এমনকি মানুষকে ধার দেওয়ার সামর্থ্যও হয়ে যায় আমার; প্রতিদিন কয়েক পয়সা জমানোর মাধ্যমেই।

টাকার ব্যবস্থাপনা আসলে একটা মানসিকতা। কত আয় করছেন, সেটা বিষয় না। আসল হলো কতটুকু জমাচ্ছেন। তাই 'বিশাল খরচ' থেকে 'বিশাল সঞ্চয়' এর দিকে ঘুরিয়ে দিন নিজের মনকে। ব্যবসায় কতটুকু খাটাবেন, সেটাও আপনার অর্থ ব্যবস্থাপনার অংশ। আমাকে সাক্ষাৎকারদাতা বেশিরভাগ ব্যক্তিই বলেছেন যে, ব্যবসা চালাতে গিয়ে ঋণে পড়ে যাওয়ার দরকার নেই। মোটকথা, সতর্ক থাকা চাই। বিশেষত এই ব্যাংক আর সুদের কারবারের যুগে। ঋণে পতিত হওয়া খুবই ঝামেলার ব্যাপার। কেউ কেউ সামলে উঠতে পারে, বেশিরভাগই পারে না। বেশিরভাগ সফল মুসলিম উদ্যোক্তা নিজের টাকায় ব্যবসা করেছেন। অন্তত শুরুর দিকে। ফান্ড গড়ে তুলেছেন পরে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00