📄 হাওয়া থেকে টাকা
কুরআনে অল্প যে কয়টি পেশার কথা স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছে, তার একটি হলো বেচাবিক্রি। আল্লাহ বলেন যে, তিনি বেচাবিক্রি হালাল করেছেন। মুসলিম উদ্যোক্তার জন্য এ এক বিরাট উৎসাহমূলক বাণী। বিক্রির মাধ্যমে আসে টাকা। হোক তা ভোক্তার কাছ থেকে, অন্য ব্যবসা থেকে অথবা পুঁজি বাজার থেকে। মাধ্যম যা-ই হোক, বিক্রয় মানেই কোনো না কোনোভাবে টাকার লেনদেন। তাই বিক্রি ও দামাদামির পদ্ধতি শেখা জরুরি।
ড. মির্জা জানান যে, তিনি বিক্রির শিল্প শিখেছেন বাবা ও দাদার কাছ থেকে। বিক্রয়ের একটি মূল উপাদান দামাদামি। সম্ভাব্য বিনিয়োগকর্তার সাথে কথা বলার অর্থ আসলে নিজের সামর্থ্য বিক্রি করার চেষ্টা। তাদের টাকা নিজের কাছে আসা নিশ্চিত করার মাধ্যমে কার্যোদ্ধার করা। যেকোনো উদ্যোগে সাফল্যের সিংহদ্বার হলো বিক্রয়। দেখবেন যে, সবচেয়ে উচ্চবেতনের পেশাদাররা মূলত সেলসপিপল। কে বেশি টাকা কামায় বলে মনে হয়? নিজ শাস্ত্রে প্রচণ্ড দক্ষ ডাক্তার, নাকি তার হসপিটালে দামি যন্ত্রপাতি বিক্রি করা সেলসম্যান? ঠিকই ধরেছেন। সেলসম্যানের আয় কমপক্ষে ডাক্তারের দ্বিগুণ। তাই কোম্পানির কাছে ভালো সেলসপার্সনের মূল্য সবচেয়ে বেশি। ব্যবসামালিকের কাজ এটাই। বিক্রয়ের কলাকৌশল একবার শিখে ফেললেই শুরু হবে উন্নতি।
এটি নবির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পেশাও বটে। কর্মজীবনের শুরুর দিকে ব্যবসায়ী ছিলেন তিনি। রিযকের ৯০% আসে ব্যবসা থেকে। তাই ধনী হতে চাইলে বিক্রি করুন, বিক্রি! ব্যক্তি হিসেবে আমরা কিন্তু সারাক্ষণই কিছু না কিছু বিক্রি করছি। এমনকি চাকরিজীবীও নিজের দক্ষতা বিক্রি করে চাকরিদাতার কাছে। মালিককে আশ্বস্ত করতে হয় যে, আপনাকে চাকরি দেওয়ার মাধ্যমে তার সময় ও অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। আপনাকে চাকরি দিয়ে দয়া করছে না সে। আপনার দক্ষতাকে ক্রয় করছে। আর আপনি একই জিনিস বিক্রি করছেন তার কাছে।
একজন বাবা অথবা মা তার সন্তানের কাছে সুন্দর ব্যবহার ও নীতি-নৈতিকতা 'বিক্রি' করে। বাবা-মার কাজই হলো সন্তানকে বোঝানো যে, ভালো মানুষ হলে তার নিজেরই লাভ। জোর দিয়ে বোঝানো ও সম্মতি আদায় করতে পারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। তাই বড় বড় ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলতে গেলে খেয়াল করি যে, তাদের কথা যথেষ্ট জোরালো ও বিশ্বাসযোগ্য। মাঝে মাঝে মনে হয় এই বুঝি তাদের পণ্য বা সেবা কিনে ফেলি! তারা বিষয়টাকে তুলেই ধরেন খুব আকর্ষণীয়ভাবে। তাই বিক্রি করতে শিখুন। কীভাবে শিখবেন? চর্চার মাধ্যমে।
📄 প্রচারণা
কোনো না কোনো কিছুর প্রচারণাও আমরা করতে থাকি সব সময়। বিশেষত আত্মপ্রচার। আগে এ নিয়ে আলাপ হয়েছে। নিজের ব্যবসা, পণ্য বা সেবার প্রচারণাও করতে শিখুন সবচেয়ে ভালো উপায়ে। শিখে নিন মার্কেটপ্লেসের নিয়মকানুন। শুরুটা হবে আপনার নিজেকে দিয়ে। ভালো একটা ভাবমূর্তি তৈরি করুন নিজের। ভালোভাবে নিজের যত্ন নেওয়ার জন্য বিশেষভাবে পরামর্শ দিয়েছেন রেডকো'র মালিক মুজীবুর রহমান। তুলে ধরেছেন নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার গুরুত্ব। পোশাক-আশাক থেকে আচার-আচরণ সব ক্ষেত্রে। সাক্ষাৎকারদাতা প্রত্যেক মুসলিম উদ্যোক্তার মাঝে এই বিষয়টি দেখেছি আমি। তারা নিজেদের যত্ন নেন। এটি নবির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সুন্নাহও বটে। আপনার যা আছে, তা জীবনযাপন পদ্ধতিতে প্রকাশ করুন।
শাইখ সাইয়্যিদ রিগাইহ বলেছেন যে, আর্থিক সামর্থ্যবান মানুষের উচিত বাহ্যিকভাবে এ সামর্থ্যের প্রকাশ ঘটানো। এটি আল্লাহর দেওয়া নিয়ামাতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম। এতে অন্যরাও জানতে পারে যে, সাহায্য লাগলে আপনার কাছে আসা যাবে। নিয়ামাত নিয়ে লুকোচুরি না করা ভালো অভ্যাস।
পণ্যের প্রচার ও ভাবমূর্তি তৈরির পদ্ধতি শেখার একটি চমৎকার পদ্ধতি হলো ভ্রমণ। অন্যদের থেকে শিখুন। আল্লাহ বলেন, 'আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক নর ও এক নারী হতে এবং পরিণত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা পরস্পরের সাথে পরিচিত হতে পারো। [১৯]'
ঘর থেকে বেরিয়ে অন্যদের কাছে শেখার জন্য এ এক চমৎকার উৎসাহবাণী। সাহাবিগণও এ কাজ করেছেন। তাই আজও দেখবেন মুসলিমরা এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্যে, আমেরিকা বা পূর্ব আফ্রিকায়, মোটকথা স্বদেশ থেকে অন্যান্য জায়গায় যাচ্ছেন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য। সারা দুনিয়ার মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে শিখছেন দিবারাত্র। অতীতেও মুসলিমরা সব ধরনের সমাজ থেকে শিক্ষণীয় বিষয় গ্রহণ করেছে; ভারতীয়, গ্রীক, ইথিওপীয়, পারস্য, ইউরোপীয়। এর মাধ্যমে সমৃদ্ধ করেছে নিজেদের সভ্যতাকে। তাই ভ্রমণ খুবই উত্তম একটি কাজ।
জনাব রিজভি প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করে ভোক্তাসেবা সম্পর্কে নতুন নতুন জ্ঞান অর্জন করেন। ক্রেতা আপনার আসল লক্ষ্য। তাই তাদের সেবা দেওয়ার সেরা পদ্ধতিটি জেনে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। মানসম্পন্ন কাস্টমার সার্ভিস সম্পর্কে জানতে দুবাইয়ে গিয়ে বিশ্বের একমাত্র সেভেন স্টার হোটেলে থেকেছেন মিস্টার রিজভি। সেখানে তার সন্তান আহত হলে হোটেল কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে ডাক্তার এনে দেখায়। তার পরিবারকে জায়গা থেকে নড়তেও হয়নি, অতিরিক্ত টাকাও দিতে হয়নি। সুইজারল্যান্ডের একটি পাঁচ তারকা হোটেলে একইরকম একটি চিকিৎসাসেবার জন্য তাকে গুনতে হয়েছিল অতিরিক্ত ৫০০ ইউরো। সে তুলনায় দুবাইয়ের সাত তারকা হোটেলটির সেবা ছিল একেবারে বিশ্বমানের। ঠিক এরকমটা করার চেষ্টা করতে হবে আপনার ব্যবসায়। ভোক্তাকে সম্ভাব্য সেরা মানের সেবা প্রদান। যতভাবে তাদের কেনাকাটা সহজ করা যায়। বাজারের অন্য সবার চেয়ে আপনি যদি তাদের বেশি দাম দেন, তবেই আপনার জন্য নিজের টাকা খরচ করবেন তারা.
টিকাঃ
[১৯] সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১৩
📄 ভোক্তার প্রয়োজন
ব্যবসায়িক কারণে আপনাকে জানতে হবে আপনার ক্রেতার প্রয়োজন কী কী। এ সংক্রান্ত ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করা যাক। ইতিহাসজুড়ে দেখবেন যে, সেরা ব্যবসায়ীরা লেনদেন সম্পন্ন করার আগে ভোক্তার প্রয়োজন চিহ্নিত করে। ব্যবসা যে ক্ষেত্রেই করেন, স্রেফ ক্রেতার প্রয়োজন চিহ্নিত করে তা পূর্ণ করুন। উদ্যোক্তা হিসেবে আমাদের কাজই হলো বাজারে মূল্যমান স্থানান্তরিত করা। তাই যথার্থই বলতে হয় যে, ক্রেতা সবার আগে।
ফিরে যাই জনাব রিজভির কাছে। তার মতে, প্রত্যেক ক্রেতাকে ভাবতে হবে নিজের একমাত্র ক্রেতা। রাজারানি হিসেবে বিবেচনা করুন তাদের। দিন সর্বোচ্চ সমীহ। কেন? কারণ একজন ক্রেতা মানে স্রেফ একজন ক্রেতা নন। ওই একজনই আপনার সেবার মানে সন্তুষ্ট হয়ে আরও দুই, পাঁচ, দশজনকে বলতে পারে আপনার দোকানে আসতে। নিজেও পরেরবার কেনার জন্য ফিরে আসবে আপনার কাছেই। গোটা জীবনভর। তাই ওই একজন ক্রেতার ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজখবর রাখাও ব্যবসায়ী হিসেবে আপনার দায়িত্ব। একটা বিক্রি করেই হাত ঝেড়ে ফেলবেন না। যাচাই করে দেখুন ক্রেতা সন্তুষ্ট কি না। সেরা পণ্যটা তো হাতে তুলে দেবেনই। তারপর যাচাই করবেন আরও কোন কোন পণ্য তার চাহিদার সাথে মেলে। তাকে বলতে থাকুন কোনগুলো আপনার কাছে আছে বা ভবিষ্যতে মজুদ আসবে। এ কাজটা আরও ভালোভাবে কীভাবে করা যায়, তা জানতে মার্কেটিং নিয়ে আরও পড়াশোনা করুন।
পাশাপাশি বুঝতে হবে যে, বিক্রয় মানে বিশ্বাসেরও লেনদেন। এজন্যই ক্রেতার সাথে মতের মিল হলে এত ভালো লাগে। যদি বিশ্বাস করেন যে, আপনার পণ্য ভালো, ক্রেতার চাহিদা আছে এর ব্যাপারে, তাহলে ওই পণ্য সরবরাহ করে খুশি করে দিন ক্রেতাকে। এভাবে যা করলেন, তা হলো বিশ্বাসের লেনদেন। ওই বিশ্বাসের জোরেই পারছেন পণ্যের বিনিময়ে টাকার আদান-প্রদান সম্পন্ন করতে। লেনদেন সফল করতে হলে এই সব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।
📄 কোনো জুয়া নয়
জুয়া খেলবেন না, ঠিক আছে? একদমই না! এখানে জুয়া খেলা মানে অজানা বিষয়ে বিনিয়োগ। এই জিনিসটা ড. ইয়াকুব মির্জার কাছে শিখেছি। তিনি যে বিষয়ে জানেন না, সেখানে বিনিয়োগও করেন না। মূলধনকে অন্ধভাবে ঝুঁকিতে ফেলেন না তিনি। যে ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন, তা সম্পর্কে যথেষ্ট মৌলিক পড়াশোনা করে তিনি কার্যকর বিনিয়োগ কৌশল প্রয়োগ করেন। বিনিয়োগকর্তাদের টাকা সংগ্রহ করে এ থেকে কমিশন নির্ধারণ করেন আগে। দুর্দান্ত এক কৌশল এটি। গত দশকে এভাবে তার প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩%। যেকোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে অনেক বেশি। ব্যবসা ক্রয় করার ক্ষেত্রেও তিনি বেশ পটু। সশরীরে গিয়ে ব্যবসা মালিকের সাথে দর কষাকষি করেন কেনার আগে।
ড. মির্জা এসব দক্ষতা শিখেছেন কাজের মাধ্যমে, স্রেফ তত্ত্ব থেকে না। অথচ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের এই তত্ত্বই শেখায় শুধু। উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছে যাদের ছিল, তাদের অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে ফেলে এভাবে। যে জায়গায় শেখানোর কথা ছিল সুযোগ ও উদারতা, সেখানে পড়ানো হচ্ছে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে হুজুর হুজুর করার বিদ্যে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আমাদের হিসেবি ঝুঁকি নিতে শেখায় না, শেখায় গা বাঁচাতে।
জনাব রিজভির মতে, 'বিক্রি হয়ে যাবেন না।' এর অর্থ হলো চাকরি। এর অর্থ ঘুষ নেওয়ার মাধ্যমে অন্যের কাজ করে দেওয়া, যাতে ওই ব্যক্তি আর্থিকভাবে লাভবান হয়। অথচ আপনার স্থায়ী সম্পদ তৈরি হয় না ওই ঘুষের মাধ্যমে। অনেক মানুষ সঞ্চয় বাড়াতে ব্যাংককে ব্যবহার করে। অথচ টাকা সবচেয়ে দ্রুত বাড়ানোর পদ্ধতি হলো নিজস্ব উদ্যোগ। ঘুষের শিকার হওয়া থেকে বাঁচতে হিসেবি ঝুঁকিগ্রহণ শিখুন, গড়ে তুলুন নিজের প্রতিষ্ঠান। আর সাহায্যের জন্য প্রযুক্তি তো আছেই। ইন্টারনেট আসলেই পৃথিবীকে সমতল বানিয়ে দিয়েছে। বলতে গেলে যেকোনো জায়গায় ব্যবসা দাঁড় করিয়ে ফেলা সম্ভব। শিক্ষাব্যবস্থার দিকেও তাকান। হার্ভার্ডের মতো প্রতিষ্ঠান এখন ব্যবসায়ী নেতা উৎপন্ন করছে। সামরিক থেকে শিল্প হয়ে সাংবাদিকতা পর্যন্ত, প্রতিষ্ঠান-নির্মাতা সমাজনেতারা তৈরি হচ্ছে সবখান থেকে। চারপাশে যত প্রতিষ্ঠান দেখছেন, সবই কারও না কারও প্রতিষ্ঠা করা। চাইলে আমরাও করতে পারি একই কাজ। কেবল লক্ষ্য, কর্ম-নৈতিকতা ও সুযোগ খুঁজে নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। এতেই তৈরি হবে নিজ নিজ ক্ষেত্র ও সমাজের মাঝে বিপ্লব।
মনে রাখবেন, সুদ হারাম করার একটা কারণ হলো এটি শোষণের হাতিয়ার। নিজের পুঁজি ও অংশ বিক্রি থেকে মূলধন তৈরি করা প্রায়ই বেশ খরুচে। সেই তুলনায় ব্যাংক থেকে লোন নেওয়া যেন হাতের মোয়া। আর এ কারণেই অধিকাংশ ব্যবসা মালিক লোন নেয়। এতে ব্যাংক সুযোগ পেয়ে যায় মানুষের বাসাবাড়ি ও উপার্জনকে জিম্মি করে রাখার। ব্যাংকের এ এক শোষণমূলক নিরাপত্তাজাল। একইভাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠান অনুদানের নামে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা নেয়। নিয়ে কী করে? ব্যাংকে রেখে দেয় নিরাপত্তার জন্য। ইসলাম মোটেও একে উৎসাহিত করে না। ইসলাম উৎসাহ দেয় ঝুঁকি নিতে, হিসেবি ঝুঁকি। যেখানে আপনি জানবেন আপনি কী করছেন। এর অর্থ ধনীর সম্পদ কিছুটা কমে যেতে পারে, আবার গরিব হয়ে যেতে পারে ধনী। কিন্তু অন্তত সুযোগ সবার জন্য সমানভাবে খোলা থাকে। এভাবেই ইসলাম মানুষের সম্পদবৃদ্ধির জন্য উত্তম একটি পদ্ধতি দান করে।