📄 প্রথম সম্পদ
উদ্যোক্তা হিসেবে আপনাকে সারাক্ষণই মানুষের সাথে লেনদেন করতে হবে। ক্রেতা হিসেবে, বিক্রেতা হিসেবে, চাকরিদাতা বা কর্মচারী হিসেবে, বিনিয়োগকারী হিসেবে, পরিবার বা সমাজের সদস্য হিসেবে। মানুষ আর মানুষ! মুসলিম ব্যবসায়ী ও সমাজনেতাদের একটি অনন্য দিক হলো নেতৃত্বগুণের শিক্ষাকে নিজের উন্নতিতে কাজে লাগানো। যেমন: সম্পর্ক তৈরিতে তারা খুবই দক্ষ। লর্ড নাজির আহমেদের পদ্ধতি হলো ইনভেস্টমেন্ট ক্লাবের সাথে জড়িত না হওয়া। তরুণ উদ্যোক্তাদের পরিচিতির পরিসর বাড়াতে সেগুলো ভালোই। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত পরিচয়। যাদের সাথে কাজ করছেন, তাদের সাথে ব্যক্তিগত পর্যায়ে পরিচিতি জরুরি। তাদের সাথে দেখা করে করে আস্থা অর্জন করুন, যাতে ব্যবসায়ও ভালো করা যায়। বিজয়ীরা দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক গড়ে।
নাজির আহমেদ বড় বড় কোম্পানির সম্মিলিত বোর্ডে বসেন। বহুজাতিক ফার্মগুলোকে বাড়তে সাহায্য করেন সঠিক পদে সঠিক লোককে বসিয়ে। এটা তিনি পারেন, কারণ ওই মানুষদের ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন তিনি। কয়েক বছরের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছাড়া এই পরিমাণ পরিচিতি কখনও তৈরি হয় না। তাই ব্যক্তিপরিসরে যোগাযোগ বৃদ্ধি করুন। মানুষের সাথে লেনদেন সহজ করার আরেকটি পদ্ধতি নিজের কোম্পানির একটি সংস্কৃতি তৈরি করা।
জনাবা উমু এনদিয়াইর কথাই ধরুন। সেনেগালে একটি কাস্টমস ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। তিনি কর্মচারীদের কোম্পানির মালিকের আসনে বসাতে উৎসাহী। এমনকি পরিচ্ছন্নতাকর্মী আয়ার সাথে কথা বলার সময়ও এত অন্তরঙ্গতা দেখান, যেন এই কোম্পানি তার নিজের। কর্মচারীরা এতে সম্মানিত বোধ করে। কোম্পানিকে সত্যিকার অর্থে আপন করে ভাবতে পারে। কোম্পানির সংস্কৃতির ভূমিকা বিশাল। এই সংস্কৃতি যদি নেতিবাচক ও শোষণমূলক হয়, তাহলে কেউই দীর্ঘকাল এর অংশ হয়ে থাকতে চাইবে না। তাই উদ্যোক্তা হিসেবে কোম্পানিতে এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করুন, যা একে উন্নত করতে সাহায্য করবে।
জনাব রিজভি কীভাবে কর্মচারী বেছে নেন, শুনুন। একজনের কয়েকবার করে সাক্ষাৎকার নেন তিনি। একেকবার তাকে ফেলেন একেকটি পরীক্ষামূলক পরিস্থিতিতে। দেখতে চান তাদের প্রতিক্রিয়া ও সিদ্ধান্তগ্রহণের নমুনা। তার কাছে এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশজনেরও অধিক প্রার্থীকে পরখ করেন সঠিক একজনকে বেছে নেওয়ার জন্য। কারণ, যাদের সাথে কাজ করবেন, তাদের ভালো করে চেনা জরুরি। তারা আপনার প্রথম সম্পদ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। বিনিয়োগ আর টাকা নিয়ে কত কথা হয়। অথচ আসল মূলধন তো মানবসম্পদ। উন্নতি করতে হলে তাদের সাথে সদাচরণ করতে হবে। তাদের সৃষ্টিশীলতাকে নিজের কোম্পানির স্বার্থে কাজে লাগান, সাথে সাথে বাড়তে দিন তাদেরও।
📄 হোম-অফিস
টাকা বাড়ানো ও ব্যবসা বড় করার প্রথম উপায় হলো নিজের আশপাশের সমাজে বিনিয়োগ করা। সাক্ষাৎকারদাতা বহু উদ্যোক্তার কাছে এর গুরুত্ব শুনেছি। ড. আতহার খতিবের ব্যবসা শুরু হয়েছে স্ত্রীর সাথে আপন ঘরের লিভিং রুম থেকে। এখন তারা পরিচালনা করেন বিশাল এক ক্লিনিক। সেবাভোক্তা তালিকায় আছেন বার্মার সুলতানের মতো মানুষও। চক্ষু-চিকিৎসক হিসেবে তার এই পরিমাণ খ্যাতি। এত ব্যস্ততা সত্ত্বেও তিনি স্থানীয় মাসজিদে নিয়মিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান আয়োজন করেন হাইস্কুল সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের জন্য। তাদের অর্জনকে পুরস্কৃত করে উৎসাহিত করেন সমাজকে।
আপনিও সমাজকে সেবা দিন, বিশেষত গরিবদের। ইসলামে এর বিশেষ নির্দেশনা আছে; অভাবীদের সেবা। আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, এর ফলে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থানে বিনিময় পাবেন। দ্বিতীয় উপায়, নিজের বিনিয়োগ নিজের ব্যবসায় করা। কারও দ্বারস্থ হবেন না। ব্যাংকের তো না-ই। এটা একেবারেই আপনার নিজের উদ্যোগ। নিজের পণ্যকে বিশ্বাস করে সামনে এগিয়ে যান। টাকা এলে আবারও বিনিয়োগ করে বাড়তে থাকুন দ্রুততর গতিতে। নিজের টাকা দিয়ে বিনিয়োগ করার গুরুত্ব অপরিসীম। অন্যের টাকায় নির্ভরকারীরা ব্যর্থ হয় ফান্ড শেষ হয়ে গেলে নতুন বিনিয়োগকর্তা না পাওয়ার ফলে।
তৃতীয় উপায়, কার্যক্রমের খরচ যথাসম্ভব কম রাখা। উল্লিখিত ঘটনাগুলো থেকে বুঝেছেন যে, অনেক উদ্যোক্তা নিজের ঘরের বেজমেন্ট থেকে, নিজের ফোন দিয়ে, নিজেকে কর্মচারী বানিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন। ফলে খরচ কমে গিয়ে টিকে থাকতে পেরেছেন ময়দানে। ব্যবসা বাড়াতে চাইলে টাকার ব্যবস্থাপনা খুবই জরুরি। ড. মাইলস ডেভিসের কাছে শুনেছি যে, টাকার অভাবে অনেক উদ্যোগ মাঠে মারা যায়। বিনিয়োগ নেই, কী করবে? হয় প্রচুর ফান্ড হাতে রেখে কাজ শুরু করুন, নাহলে নিজ উদ্যোগে কমিয়ে আনুন খরচ। কাউকে ভাড়া না করে নিজে করুন কাজ। নিজেকে ব্যবহার করে আগে বড় করে নিন ব্যবসাকে। তারপর বাকি সব।
📄 ফ্যাঞ্চাইজ
ফ্র্যাঞ্চাইজ ব্যবসা শুরু করলেই হবে না, সঠিক কাঠামোও লাগবে। শুরুতেই অতিরিক্ত লোক ভাড়া করবেন না। বাজারে টিকে থাকতে যা লাগে, ততটুকু করুন। অন্ধ-অনুকরণ করবেন না অন্যদের। প্রচুর কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে তাদের ঝাঁ-চকচকে ইউনিফরমের পেছনে এত খরচ করে ফেললেন, দেখা গেল বেতনই দিতে পারছেন না। তা না করে সীমিত টাকাকে সঠিক জায়গায় খাটান। ছোট পরিসর থেকে শুরু করতেও সাহস লাগে। মানুষের হাসাহাসিকে অগ্র্যাহ্য করার সাহস।
ব্যবসা আদতে লোকদেখানো বা দামি গাড়িতে চড়ার নাম নয়। বাহ্যিক বেশভূষারও গুরুত্ব আছে। কিন্তু বাইরে ফিটফাট হলেই হলো না, ভেতরের সদরঘাট ভর্তি করা নিয়েই কথা। দিনশেষে সেবা বা পণ্যই ক্রেতার মূল মাথাব্যথা। যেমন: কোটি টাকার বিক্রিবাট্টা করাকালেও মিস্টার রিজভি চালাতেন একটা টয়োটা করোলা। এমনকি মাল্টি-মিলিয়ন উদ্যোগ শুরু করার দুই বছর পরেও। কোম মির্জার সাথে দেখা করার সময় আমার পরনে ছিল স্যুট আর চকচকে জুতা। কিন্তু অর্ধ-বিলিয়নের মালিক ৩৩ বছর বয়সি ব্যক্তিটি এলেন একটি পোলো-নেক পরে, করোলায় চড়ে। আশ্বস্ত করলেন যে, তার রোলস-রয়েসটি দুবাইয়ে বুর্জ খলিফার গ্যারেজে পার্ক করা আছে।
বিক্রিই যে সবকিছু-তা নিয়ে আলাপ করলাম। টাকার কারবার এখানেই। পণ্য বা সেবা যদি বিক্রিই না হয়, তবে কোম্পানির কোনো দাম নেই। তাই এমন কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত, যার ফলে উপার্জন তৈরি হয়। এবার পরের ধাপ। ব্যবসার মালিক হিসেবে প্রায়ই কঠিন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া লাগবে। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন কেমন লাগছে। যদি তা আপনার ও আপনার কোম্পানির জন্য ভালো বলে বোধ হয়, ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো সমস্যা না থাকে, তাহলে ওটাই সঠিক। আর যদি নিজের পরিবারের জন্যও উত্তম হয়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। সিদ্ধান্তের দিকে এগুতে হয় এভাবেই। আর একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে আর ইতস্তত করবেন না। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। সাফল্য আসবে।
জনাব রিজভির কাছে এটাও শিখলাম। সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে জানুন এবং বাস্তবায়ন করে ফেলুন। মানুষ কর্মের দ্বারাই বিচার্য, কথা দিয়ে নয়। মনে রাখবেন, বিরাট পদক্ষেপের মাধ্যমে রীতিমতো আন্দোলন তৈরি করে ফেলা যায়। একটা কথা প্রচলিত আছে যে, ব্যবসা করার জন্য একটা বড়সড় অফিস আর চমৎকার একটা গাড়ি থাকা চাই। ভুল; এগুলো জরুরি কিছু না। ব্যবসা মানে আপনার আর ক্রেতার মাঝে লেনদেন। অফিস না থাকলে নেই। ব্যবসা বড় হলে ওটা পরেও করা যাবে। গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, তথা ক্রেতাদের আগে সামলান।
যেমন: জহুর কুরেশি শিখিয়েছেন মানের ব্যাপারে কখনোই আপস না করতে। হবি ক্রাফট ব্যবসা স্থাপন করার সময় পণ্যে সামান্যতম ত্রুটি পেলেই তিনি পুরো চালান থামিয়ে দিতেন। বাজারেই আনতেন না সেই পণ্য। কারণ আনলেই সেটা সুনামে ধস নামাবে। পাশাপাশি কাজটা ঠিকও নয়। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য কাজ করা সেরা ডিজাইনারদের পেছনে বিনিয়োগ করেন তিনি। আইডিয়াও আনেন সবচেয়ে ভালো গুলো।
লর্ড নাজির যেমনটি বলেন, সৎ হতে হবে। সামর্থ্যের বেশি প্রতিজ্ঞা দিয়ে ফেলা যাবে না। যা দেবেন, তা-ই ফেরত আসবে বহুগুণে। যেমন কর্ম, তেমন ফল। লর্ড নাজিরের কাছে একবার এক শিখ কাস্টমার আসেন একটি দোকান কেনার উদ্দেশ্যে। লর্ড নাজির জানতেন যে, দোকান মাসে ১৫০০০ ইউরোর কাছাকাছি আয় করতে সক্ষম। কিন্তু রয়েসয়ে বললেন ৭০০০। কিছুকাল দোকান চালানোর পর উচ্ছ্বসিত ক্লায়েন্ট ফিরে এসে বলেন, 'আরে দারুণ! দশ হাজারেরও বেশি রোজগার হচ্ছে মাসে!' লেনদেনে প্রতারিত হননি বলে তিনি খুশি। দোকানের আয়ের নিম্নসীমাটি বলা হয়েছিল তাকে। যখন দেখলেন প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি আয় হচ্ছে, তার সন্তুষ্টি আরও বেড়ে যায়। তাই কথা নয়, কাজ। মানুষ ধনী হয় সঠিক কাজটি করলে। ক্রেতাকে একবার ঠকালে দ্বিতীয়বার আর আসবে না। তাই দীর্ঘমেয়াদী ফল পেতে সেবার মান নিশ্চিত করুন।