📄 শত্রু চেনা
বদভ্যাস ছাড়তে হলে আগে শত্রুটিকে চিনুন। তারপর দূর করুন তাকে। কীভাবে? ভালো অভ্যাস দিয়ে প্রতিস্থাপিত করার মাধ্যমে। মুসলিম উদ্যোক্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলোর একটি হলো সুন্নাহ। কুরআন এমনি এমনি নাযিল হয়নি। এর সাথে প্রেরিত হয়েছেন কুরআনের জ্বলজ্যান্ত রূপ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। আল্লাহ যে গুণাবলি ভালোবাসেন, নবিজি তার আদর্শ দৃষ্টান্ত। তাই সুন্নাহর অনুসারী হোন।
নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যা কিছু করেছেন, তা-ই ভালো অভ্যাস। এগুলোরই পুনরাবৃত্তি করতে হবে। তিনি যেহেতু গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠতেন, তার মানে তা স্বাস্থ্যকর। নিয়মিত রাতের বেলা ঘণ্টাখানেক সালাতে দাঁড়িয়ে থাকার অভ্যাস থাকলে স্থূলকায় হওয়া কঠিন। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছিলেন রুক্ষ মরুপরিবেশে হেঁটে ও বাহনে চড়ে অভ্যস্ত। আজ আমাদের ঘোড়া বা উট নেই। কিন্তু শরীরচর্চার মাধ্যমে তার বিকল্প বের করা সম্ভব। সুন্নাহর সবকিছুই ভালো অভ্যাস। মুসলিম উদ্যোক্তাগণও তা-ই বলেছেন আমাকে।
সৌদি আরবের হারফ আল-বাতিনে অবস্থিত নূর খান হাসপাতালের সিইও ড. নূরের সাথে কথা হচ্ছিল। জিজ্ঞেস করলাম, 'সফল হওয়ার জন্য কী নিয়ে পড়াশোনা করেন?' তিনি জবাব দিলেন, কুরআন পাঠ ও সুন্নাহর অনুকরণ। বিদেশীরা সৌদি নাগরিকত্ব তেমন একটা পায় না। কিন্তু ড. নূরের জন্য সম্মানসূচক সৌদি নাগরিকত্ব ঘোষণা করেছেন স্বয়ং সৌদি রাজা। এটি ওই দেশের স্বাস্থ্যখাতে তার দৃষ্টান্তসূচক অবদানের স্বীকৃতি। এই ৮০ বছর বয়সে এসেও ব্যবসা বাড়িয়ে চলেছেন তিনি। কাজে যান প্রতিটি দিন। কুরআনও পড়েন রোজ রোজ। সত্যিকারের উদ্যোক্তাকে আসলে থামানো যায় না। তাই ভালো অভ্যাস গড়ার ইচ্ছে থাকলে সুন্নাহ অনুসরণ করুন।
📄 টাকার অভ্যাস
সঞ্চয় করা একটি অভ্যাস, বিনিয়োগ করা অভ্যাস, টাকা অপচয় করাও অভ্যাস। কোনোকাজ যথেষ্ট পরিমাণ পুনরাবৃত্তি করলেই অভ্যাসে পরিণত হয় তা। এই বই টাকা সংক্রান্ত। এখানে টাকা নিয়ে যত ভালো অভ্যাসের কথা বলা আছে, সেগুলো জীবনে আনতে পারলে সফল হবেনই ইনশাআল্লাহ।
টাকা সামলানোর ভালো অভ্যাস তাহলে কীভাবে করা যায়? কুরআনে এর প্রচুর উদাহরণ আছে। আল্লাহ অপচয় পছন্দ করেন না। অপচয়কারীদের তিনি বলেছেন শয়তানের ভাই। কারণ লালসার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই মানিব্যাগ মোটা করতে চাইলে টাকা সেখানেই রাখুন। ওই পোশাকটা খুব পছন্দ হয়েছে? বাদ দিন। কিনতে হবে না। চকলেট খেতে ইচ্ছে করছে? অথবা সুস্বাদু মুরগির মাংস? সামলে নিন। এগুলোই সিয়ামের শিক্ষা।
অমুক-তমুক ধনী প্রতিবেশীর সাথে পাল্লা দেওয়া নিষ্প্রয়োজন। তারা হয়তো বাড়িটা আরেক তলা উঁচু করেছে, কিনেছে নতুন লেক্সাস। যদি দেখেন এসব করতে গেলে সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে যাবে, তাহলে পিছিয়ে আসুন প্রতিযোগিতা থেকে। অন্যের নজর কাড়ার কথা ভুলে যান। টাকা সম্পর্কে জানুন। এ বইয়ে যে তথ্য আছে, তা মানুন। অন্যকে দিন বইটি। এই তথ্যগুলো জীবনে প্রয়োগ করুন। অল্প কয়েক বছর পর দেখবেন আপনি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। আর আপনার প্রতিবেশীরা তখনও ওই নতুন বাড়ি আর গাড়ির ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যস্ত। আপনার প্রতিযোগিতা নিজের সাথে।
একটা সাধারণ নিয়ম হলো মোট উপার্জনের ১০% থেকে ২৫% সঞ্চয় করা। আর সম্পদ বৃদ্ধি করা বিনিয়োগের মাধ্যমে। ড. নূর জানান যে, তিনিও টাকা সঞ্চয় করেন। এটি সাফল্যের অন্যতম মূলনীতি। তিনি অবশ্যই কৃপণও নন। পরিবার-নাতিনাতনীকে যথেষ্ট খুশি রেখেই বাকিটুকু সঞ্চয় করেন তিনি। অপ্রয়োজনীয় জিনিসে খরচ করেন না একটা পয়সাও। বিশেষত তরুণ বয়সে ব্যবসা শুরু করার সময়টায়। তাই যত দ্রুত সম্ভব শুরু করুন। বিনিয়োগ করতে চাইলে টাকাকে বেড়ে ওঠার সময় দিন। তাই আগে আগে শুরু করা ভালো। বিশেষত বয়স যখন বিশের দশকে।
📄 কথার এপিঠ-ওপিঠ
অসার কথা পরিত্যাগ করতে হবে। এমনকি নিজের ব্যাপারেও। নিজেকে নিজে নেতিবাচক কথা শুনিয়ে নিরুৎসাহিত করা চলবে না। এমন কথা আদৌ বলছেন কি না, খেয়াল করে দেখুন। অন্যরা যারা অসার কথা বলে, তাদের থেকে দূরে সরে যান। এটি স্বয়ং কুরআনের নির্দেশ। টিভি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার যা কিছু উপকারী নয়, সেগুলোও ত্যাগ করুন একই কারণে। অদরকারি জিনিস জানারও প্রয়োজন নেই।
দ্বিতীয়ত, কথার ব্যাপারে কৃপণ হবেন না। যা বলতে চান, তা বলুন স্পষ্ট করে। লক্ষ্য, স্বপ্ন ও বর্তমান বাস্তবতার মাঝে যেন কোনো সংঘাত না থাকে। মনে রাখবেন, আল্লাহ একজনের মাধ্যমে আরেকজনের রিযকের ব্যবস্থা করেন। তাই স্পষ্ট কথা বলুন ক্রেতা বা চুক্তির অপর পক্ষের সাথে। কীভাবে? ভালো জিনিস শোনার মাধ্যমে। বাগ্মী ও বাচনদক্ষ মানুষের অডিও শুনুন। শিখুন কীভাবে কথা বলতে হয়। এই বইয়ে উল্লিখিত ব্যক্তিদের অডিও-ভিডিও থেকেও উপকৃত হতে পারেন আপনি। নিজের বাচনভঙ্গি সুন্দর করার এ এক মোক্ষম উপায়।
তাই সম্পদশালী মুসলিমদের চিন্তাচেতনার ভাষা বুঝতে হলে তাদের সাথে সময় যেমন কাটাতে হবে, তেমনি শুনতে হবে তাদের কথাও। সরাসরি হোক বা প্রযুক্তির মাধ্যমে।
📄 যিকরের শক্তি
ইসলামে যিকরের বিশেষ স্থান রয়েছে। ঠোঁটকে আল্লাহর স্মরণে ক্রমাগত নাড়াতে থাকা। এ কাজ প্রায় সব সময় করা যায়। গাড়িতে উঠতে, কাজ করতে করতে, ঘুমাতে যেতে, পানাহারের আগে-পরে, সালাম দিতে গিয়ে, সালাতের সময়। এভাবে প্রতিটা কাজে আল্লাহকে স্মরণ করুন। যিকরের শক্তি এখানেই। ভয়, সংশয় ও কঠিন পরিস্থিতিতেও তাহলে ভুলতে পারবেন না যে, আল্লাহই রিযকদাতা। লক্ষ্যের পানে কাজ করতে করতে একটা সময় চাপ অনুভূত হবেই। যিকরের মাধ্যমে লাঘব করুন সেই চাপ।
যিকর এবং দুআর এমনই ক্ষমতা। ক্ষমতার যিনি উৎস, তাঁর সাথে সর্বদা যোগাযোগের মধ্যে থাকা। আরিফ মির্জা আমাকে বলেছেন, 'অমুসলিমদের সাথে আমাদের একটা পার্থক্য হলো যে, তারা নিজেকেই নিজেদের সাফল্যের কারণ মনে করে।' কিন্তু মুসলিম উদ্যোক্তা জানে যে, এ কথা সত্য নয়। সর্বোপরি এ সাফল্য আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে বাবা-মা, পরিবার-সহ অনেকের অবদান থাকতেও পারে। এজন্যই পরিবারের সাথেও মুসলিম উদ্যোক্তাদের সম্পর্ক গভীর।
জনাব সিদ্দিকির একটা নজরকাড়া ব্যাপার হলো তার পিতৃবাৎসল্য। তাহাজ্জুদগুজার বাবার স্মৃতি তার জন্য আদর্শ ব্যবসায়ীর রোল মডেল হিসেবে কাজ করে। সৌম্য, একাগ্র, বুদ্ধিমান বাবার কথা বলতে গিয়ে তার কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে সমীহের চিহ্ন। বোঝা গেল যে, সাফল্য আমাদের নিজেদের পক্ষ থেকে নয়। এতে অন্য মানুষদেরও অবদান আছে। বিশেষত বাবা-মায়ের। যে ভালোবাসা, শিক্ষা ও দ্বীন তারা আমাদের দিয়েছেন, সেগুলোর। মুসলিম উদ্যোক্তাদের এই ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তা আমি অন্যদের মাঝে পাইনি।