📄 বদভ্যাস ত্যাগ
আজেবাজে অভ্যাস কোত্থেকে আসে? অন্যের কাছ থেকে শেখার মাধ্যমে। পাপকাজ, অথচ শেখা সম্ভব। বদভ্যাসের উৎস হতে পারে সামান্য একটি টিভিও। একে বরং বন্ধই রাখুন। আমার দেখা সফল উদ্যোক্তারা টিভি দেখেন না বললেই চলে। দ্বীনি ও পেশাগত কাজ, পরবর্তী মহাপরিকল্পনার স্বপ্ন, সমাজের সেবার পেছনেই ব্যস্ত থাকেন তারা। এর মাঝে টিভি চালু করার সময় কই? উদ্যোগের জন্য শিক্ষণীয় কোনো বিষয় টিভিতে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ভালো জিনিস শিখতে হয় ভালো মানুষের কাছ থেকে। ইতিবাচক পরিবেশ থেকে। সফল উদ্যোক্তারা পরামর্শ দেওয়ার ব্যাপারেও বেশ খোলামেলা। আপনি গেলেও দেখবেন যে, এত বছরের পুঞ্জিত অভিজ্ঞতা আপনার সাথে ভাগাভাগি করতে একটুও কার্পণ্য করছেন না তারা। এভাবে শেখার সুযোগ পেয়ে সত্যিই আমি কৃতজ্ঞ।
বদভ্যাসের আরেক উৎস রিয়াহ, লোকদেখানো। মানুষের সামনে 'কুল' হওয়ার চেষ্টা। এমন মানুষ দুর্লভ, যারা একইসাথে ধনী, আবার 'কুল'। তাদের ভক্ত আছে বটে, কিন্তু আছে শত্রুও। সাফল্যের সাথে এ দুটো জিনিস আপনাআপনিই আসে। তবে এতে তারা ভীত নন। বিশেষত মুসলিম উদ্যোক্তারা। কারণ তাদের মাঝে বিনয়ও সবচেয়ে বেশি। লোকদেখানোর তাড়া তাদের নেই। তাই আপনার বর্তমান ক্যারিয়ারটি বেছে নেওয়ার মূল কারণ যদি হয় মানুষের সামনে নিজেকে ভালো দেখানো, তাহলে এই রাস্তায় সত্যিকার সাফল্য পাওয়া একটু কঠিনই হবে।
সফল উদ্যোক্তা উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বাদাম বেচতেও লজ্জিত না। জনাব আলিকো দাঙ্গোতের নানা নাইজেরিয়াতে বাদাম বিক্রি করে ধনী হয়েছেন। আপনার কাছে হাস্যকর লাগতে পারে। কিন্তু তার জন্য এটিই ছিল স্বদেশের সবচেয়ে বড় ধনী ব্যক্তি হওয়ার রাস্তা। এটা আপনাকে বুঝতে হবে। বড় বড় সম্পদশালী উদ্যোক্তাদের কোনো বৈধ কাজে অনাগ্রহ নেই। কুরআনে এই স্বভাবের প্রশংসা করা হয়েছে। এর উপকারিতাও অনেক। এই মানুষগুলো লোক দেখাতে কাজ করছেন না। তাই রিয়ার বদভ্যাস গড়ে তুলবেন না। এতে আপনার ব্যবসা, জীবন, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য সব নষ্ট হয়ে যাবে। আমাদের যে কারও সাথে হতে পারে এই জিনিস। তাই নিয়্যাত সংক্রান্ত অধ্যায়টি আবার পড়ুন। ঝালিয়ে নিন নিজের 'কেন'কে। যা করছেন, তা কেন করছেন? সাক্ষাৎকারদাতা উদ্যোক্তারা প্রায়ই আমাকে উপদেশ দিয়েছেন বারবার নিজের নিয়্যাত যাচাই করার।
শয়তান বদভ্যাসকে ছোট করে দেখায়। যেন এটা কোনো ব্যাপারই না, করাই যায়। যেমন: দেরি করা। পার্টিতে দেরি করে গেলে হয়তো সমস্যা নেই। কিন্তু এভাবেই একদিন কোনো এক গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশে দেরি করে ফেলবেন। ক্ষতিগ্রস্ত হবে আপনার ব্যবসা। ধরা যাক, কোনো ঠিকাদার আপনার কাছে কাঁচামালের অর্ডার দিলো। আপনি তা সরবরাহ করলেন দেরিতে। হারাবেন একজন ক্রেতাকে। তাই বদভ্যাসকে হেলাফেলা করতে নেই। সব মন্দ জিনিসকে গুরুতরভাবে নিন। এক বিলিয়নেয়ারের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম, যিনি খুবই সময়নিষ্ঠ। বললেন, 'জানেন, উমার? গত এক বছরে আমি কোথাও দেরি করিনি।' কথা সত্য। যেকোনো মিটিং-এ সবার আগে হাজির হওয়া ব্যক্তি তিনি। এত বড় ধনীর কীসের ঠেকা সবার আগে উপস্থিত থাকার? অন্যরাই তো তার দেখা পেতে উদগ্রীব। কিন্তু তিনি সময়ের চেয়ে এগিয়ে।
তাই যদি কাউকে বলতে শোনেন, 'ওই লোক এমনি এমনি ধনী।' তাহলে বলবেন, 'না।' অবশ্যই তারা এসব সদগুণের অধিকারী। মন্দ লোক শেষমেশ জিততে পারে না। সফল ব্যক্তিদের নীতি থাকে। অতএব, বদভ্যাসকে অবহেলা না করে সংশোধন করুন। আপনিও উঠবেন সাফল্যের চূড়ায়।
📄 শত্রু চেনা
বদভ্যাস ছাড়তে হলে আগে শত্রুটিকে চিনুন। তারপর দূর করুন তাকে। কীভাবে? ভালো অভ্যাস দিয়ে প্রতিস্থাপিত করার মাধ্যমে। মুসলিম উদ্যোক্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলোর একটি হলো সুন্নাহ। কুরআন এমনি এমনি নাযিল হয়নি। এর সাথে প্রেরিত হয়েছেন কুরআনের জ্বলজ্যান্ত রূপ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। আল্লাহ যে গুণাবলি ভালোবাসেন, নবিজি তার আদর্শ দৃষ্টান্ত। তাই সুন্নাহর অনুসারী হোন।
নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যা কিছু করেছেন, তা-ই ভালো অভ্যাস। এগুলোরই পুনরাবৃত্তি করতে হবে। তিনি যেহেতু গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠতেন, তার মানে তা স্বাস্থ্যকর। নিয়মিত রাতের বেলা ঘণ্টাখানেক সালাতে দাঁড়িয়ে থাকার অভ্যাস থাকলে স্থূলকায় হওয়া কঠিন। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছিলেন রুক্ষ মরুপরিবেশে হেঁটে ও বাহনে চড়ে অভ্যস্ত। আজ আমাদের ঘোড়া বা উট নেই। কিন্তু শরীরচর্চার মাধ্যমে তার বিকল্প বের করা সম্ভব। সুন্নাহর সবকিছুই ভালো অভ্যাস। মুসলিম উদ্যোক্তাগণও তা-ই বলেছেন আমাকে।
সৌদি আরবের হারফ আল-বাতিনে অবস্থিত নূর খান হাসপাতালের সিইও ড. নূরের সাথে কথা হচ্ছিল। জিজ্ঞেস করলাম, 'সফল হওয়ার জন্য কী নিয়ে পড়াশোনা করেন?' তিনি জবাব দিলেন, কুরআন পাঠ ও সুন্নাহর অনুকরণ। বিদেশীরা সৌদি নাগরিকত্ব তেমন একটা পায় না। কিন্তু ড. নূরের জন্য সম্মানসূচক সৌদি নাগরিকত্ব ঘোষণা করেছেন স্বয়ং সৌদি রাজা। এটি ওই দেশের স্বাস্থ্যখাতে তার দৃষ্টান্তসূচক অবদানের স্বীকৃতি। এই ৮০ বছর বয়সে এসেও ব্যবসা বাড়িয়ে চলেছেন তিনি। কাজে যান প্রতিটি দিন। কুরআনও পড়েন রোজ রোজ। সত্যিকারের উদ্যোক্তাকে আসলে থামানো যায় না। তাই ভালো অভ্যাস গড়ার ইচ্ছে থাকলে সুন্নাহ অনুসরণ করুন।
📄 টাকার অভ্যাস
সঞ্চয় করা একটি অভ্যাস, বিনিয়োগ করা অভ্যাস, টাকা অপচয় করাও অভ্যাস। কোনোকাজ যথেষ্ট পরিমাণ পুনরাবৃত্তি করলেই অভ্যাসে পরিণত হয় তা। এই বই টাকা সংক্রান্ত। এখানে টাকা নিয়ে যত ভালো অভ্যাসের কথা বলা আছে, সেগুলো জীবনে আনতে পারলে সফল হবেনই ইনশাআল্লাহ।
টাকা সামলানোর ভালো অভ্যাস তাহলে কীভাবে করা যায়? কুরআনে এর প্রচুর উদাহরণ আছে। আল্লাহ অপচয় পছন্দ করেন না। অপচয়কারীদের তিনি বলেছেন শয়তানের ভাই। কারণ লালসার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই মানিব্যাগ মোটা করতে চাইলে টাকা সেখানেই রাখুন। ওই পোশাকটা খুব পছন্দ হয়েছে? বাদ দিন। কিনতে হবে না। চকলেট খেতে ইচ্ছে করছে? অথবা সুস্বাদু মুরগির মাংস? সামলে নিন। এগুলোই সিয়ামের শিক্ষা।
অমুক-তমুক ধনী প্রতিবেশীর সাথে পাল্লা দেওয়া নিষ্প্রয়োজন। তারা হয়তো বাড়িটা আরেক তলা উঁচু করেছে, কিনেছে নতুন লেক্সাস। যদি দেখেন এসব করতে গেলে সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে যাবে, তাহলে পিছিয়ে আসুন প্রতিযোগিতা থেকে। অন্যের নজর কাড়ার কথা ভুলে যান। টাকা সম্পর্কে জানুন। এ বইয়ে যে তথ্য আছে, তা মানুন। অন্যকে দিন বইটি। এই তথ্যগুলো জীবনে প্রয়োগ করুন। অল্প কয়েক বছর পর দেখবেন আপনি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। আর আপনার প্রতিবেশীরা তখনও ওই নতুন বাড়ি আর গাড়ির ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যস্ত। আপনার প্রতিযোগিতা নিজের সাথে।
একটা সাধারণ নিয়ম হলো মোট উপার্জনের ১০% থেকে ২৫% সঞ্চয় করা। আর সম্পদ বৃদ্ধি করা বিনিয়োগের মাধ্যমে। ড. নূর জানান যে, তিনিও টাকা সঞ্চয় করেন। এটি সাফল্যের অন্যতম মূলনীতি। তিনি অবশ্যই কৃপণও নন। পরিবার-নাতিনাতনীকে যথেষ্ট খুশি রেখেই বাকিটুকু সঞ্চয় করেন তিনি। অপ্রয়োজনীয় জিনিসে খরচ করেন না একটা পয়সাও। বিশেষত তরুণ বয়সে ব্যবসা শুরু করার সময়টায়। তাই যত দ্রুত সম্ভব শুরু করুন। বিনিয়োগ করতে চাইলে টাকাকে বেড়ে ওঠার সময় দিন। তাই আগে আগে শুরু করা ভালো। বিশেষত বয়স যখন বিশের দশকে।
📄 কথার এপিঠ-ওপিঠ
অসার কথা পরিত্যাগ করতে হবে। এমনকি নিজের ব্যাপারেও। নিজেকে নিজে নেতিবাচক কথা শুনিয়ে নিরুৎসাহিত করা চলবে না। এমন কথা আদৌ বলছেন কি না, খেয়াল করে দেখুন। অন্যরা যারা অসার কথা বলে, তাদের থেকে দূরে সরে যান। এটি স্বয়ং কুরআনের নির্দেশ। টিভি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার যা কিছু উপকারী নয়, সেগুলোও ত্যাগ করুন একই কারণে। অদরকারি জিনিস জানারও প্রয়োজন নেই।
দ্বিতীয়ত, কথার ব্যাপারে কৃপণ হবেন না। যা বলতে চান, তা বলুন স্পষ্ট করে। লক্ষ্য, স্বপ্ন ও বর্তমান বাস্তবতার মাঝে যেন কোনো সংঘাত না থাকে। মনে রাখবেন, আল্লাহ একজনের মাধ্যমে আরেকজনের রিযকের ব্যবস্থা করেন। তাই স্পষ্ট কথা বলুন ক্রেতা বা চুক্তির অপর পক্ষের সাথে। কীভাবে? ভালো জিনিস শোনার মাধ্যমে। বাগ্মী ও বাচনদক্ষ মানুষের অডিও শুনুন। শিখুন কীভাবে কথা বলতে হয়। এই বইয়ে উল্লিখিত ব্যক্তিদের অডিও-ভিডিও থেকেও উপকৃত হতে পারেন আপনি। নিজের বাচনভঙ্গি সুন্দর করার এ এক মোক্ষম উপায়।
তাই সম্পদশালী মুসলিমদের চিন্তাচেতনার ভাষা বুঝতে হলে তাদের সাথে সময় যেমন কাটাতে হবে, তেমনি শুনতে হবে তাদের কথাও। সরাসরি হোক বা প্রযুক্তির মাধ্যমে।