📄 অভ্যাস গড়ে চরিত্র
চরিত্র আপনার অস্তিত্বের নির্যাস। চারপাশে কেউ না থাকা অবস্থায় আপনি যেমন, সেটাই আপনার আসল রূপ। নিজেকে জানুন। আমরা যেমন, তেমনটা কীভাবে হলাম? কিছু মানুষ খুব প্রশংসা কুড়ায়, 'এই লোকটা খুবই কাজপাগল, খুবই উদ্যমী, কখনও দেরি করে না, যথেষ্ট ইতিবাচক, অনেক দানশীল, বড়ই ধার্মিক' ইত্যাদি। অমনটা সে হলো কী করে? সাধারণত এরকম হয়ে কেউ জন্ম নেয় না। আমার দেখা উদ্যোক্তাদের অনেকেই ছিলেন একেবারে সাদামাটা মানুষ। ব্যবসার শুরুটা করতেই হিমশিম খাচ্ছিলেন তারা। কিন্তু আজ তারা একেবারেই আলাদা।
মনে রাখবেন, অভ্যাস হলো যা বারবার করা হয়। ছোটকালে একটা তোতলা ছেলেকে চিনতাম। তার সাথে আমার মেলামেশাকে ভালো চোখে দেখতেন না বাবা-মা। শুরুতে বুঝিনি। তোতলামি আসল কারণ না। খেয়াল করলাম যে, ওই ছেলেটা কাজ না করে সারাক্ষণ খেলাধুলায় ব্যস্ত। তার সাথে অনেকদিন চলাফেরার পর খেয়াল করলাম যে, আমিও তোতলাচ্ছি। কী অদ্ভূত! আশপাশের মানুষের কাছ থেকে আমরা কতকিছু রপ্ত করে ফেলি। তাই ভালো পরিবেশ, ভালো ইসলামী পরিবেশের গুরুত্ব অপরিসীম। সব সময় আশপাশের মানুষদের অভ্যাস দিয়ে প্রভাবিত হবেন আপনি। হোক তা কর্মক্ষেত্র বা সমাজ বা অন্যকিছু। ওই তোতলানোর অভ্যাস থেকে মুক্তি পেতেই অনেক সময় লেগেছে আমার। অজান্তেই অভ্যাস তৈরি হয়ে যায়। তারপর তা ছাড়তে নিজের থেকে বেশ কসরত করা লাগে।
আগেও একটা গোত্রের কথা উল্লেখ করেছি, যাদের ভাষায় 'তোতলানো' বোঝাতে কোনো শব্দ নেই। আর কোনো তোতলা মানুষও নেই ওই এলাকায়। যা আপনার জ্ঞান বা শব্দভাণ্ডারে নেই, তা আপনি জীবনেও করবেন না। এজন্যই পাপ করে ফেললে তা প্রচার করতে নেই। নিজের নেতিবাচক অতীত দিয়ে অন্যকে প্রভাবিত করে ফেলা ঠিক নয়।
শুধু তোতলানো না, জীবনের সব কাজে এই মূলনীতি প্রযোজ্য। এমনকি বর্তমানে আপনি যেভাবে চিন্তা করেন, সেটার কারণও হলো অনেক বছর ধরে এইভাবে চিন্তা করে আসা। এই চিন্তাপদ্ধতি পালটাতে চাইলে সচেতন চেষ্টা ছাড়া পারবেন না। তাই সঠিক চিন্তা করতে পারাটাও এক ধরনের অভ্যাসের বিষয়।
তাই প্রথমে অভ্যাস গড়ে তুলুন। সেই অভ্যাসই ঠিক করে দেবে কোন কাজকে প্রাধান্য দেবেন। সারাক্ষণ যদি একদম প্রাত্যহিক চাহিদাগুলো মেটানোর কথাই ভাবতে থাকেন, ওটাই হয়ে উঠবে আপনার বাস্তবতা। ওইসব চাহিদা মেটানো পর্যন্তই হবে আপনার সামর্থ্য। করবেনও ওই মানের কোনো চাকরি।
কিন্তু উদ্যোক্তা হতে হলে চিন্তার অভ্যাস হতে হবে অন্যরকম। খাবার কীভাবে কিনব, বিল কীভাবে পরিশোধ করব—এসব চিন্তায় সীমাবদ্ধ থাকা যাবে না। ভাবতে হবে এমন কী মূল্যবান কাজ করা যায়, যার মাধ্যমে সমাজ উপকৃত হবে। এতে করে ওই বিল পরিশোধের সীমা ছাড়িয়ে অভাবনীয় উন্নতি করতে পারবেন আপনি।
যত উদ্যোক্তার সাথে কথা বললাম, সবার চিন্তা বিল পরিশোধের বহু ঊর্ধ্বে। যেমন: শুধু অ্যাকাউন্টিং-এর মতো একটা কঠিন পেশার মাধ্যমে কোটিপতি হয়ে যাওয়া জনাব সিদ্দিকি। এই পরিমাণ আর্থিক সাফল্য সাধারণত অ্যাকাউন্টেন্টরা অর্জন করতে পারে না। এখান থেকেই বলে দেওয়া সম্ভব যে, শুরু থেকেই জনাব সিদ্দিকির চিন্তাধারা ছিল প্রাত্যহিক চাহিদা মেটানোর অনেক ঊর্ধ্বে। নাহলে তিনি আজীবন ভালো বেতনের চাকরি করেই সন্তুষ্ট থাকতেন। সেই নিরাপদ মাসিক বেতন ছেড়ে ঘরের বেজমেন্ট থেকে ব্যবসা শুরু করতে পারতেন না। এমনও রাত গেছে, যখন মাদুর পেতে মেঝেতে ঘুমোতে হয়েছে তাকে। সেই তিনি এখন কোথায়! তাই জানুন যে, সাফল্য আপনার নাগালের মধ্যেই আছে। সঠিকভাবে চিন্তা করাই আসল।
📄 ছোট ছোট বিন্দুজল
আরেকটা আষাঢ়ে গল্প আছে এরকম, 'হ্যাঁ, ওই মানুষগুলো পরিশ্রম-অধ্যবসায় করেছে বটে। কিন্তু এরপর হঠাৎ করেই বড়লোক হয়ে গেছে একদিন।'
না, এভাবে হয় না। জগতে আল্লাহর তৈরি করে দেওয়া কিছু নিয়ম আছে। এগুলোর বাইরে কেউই যেতে পারে না। যেমন: বীজ রোপণ করার সাথে সাথে গাছ বের হয়ে আসে না। নিয়্যাত সংক্রান্ত অধ্যায়ে এ ব্যাপারেই আলোচনা করেছি আমরা। বীজ বপন করে ফসলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে, ঠিক কৃষকের মতো।
আপনার ক্ষেত্রে তা কীভাবে প্রযোজ্য? রাতারাতি সফল হওয়ার দিবাস্বপ্ন পরিত্যাগ করার মাধ্যমে। এতে বছরের পর বছর লেগে যাওয়াও সম্ভব। এজন্যই অধ্যবসায় ও সবরের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলাপ করেছি কয়েক পৃষ্ঠা আগে।
পশ্চিমে আরবি ভাষা ও কুরআন শিক্ষার চর্চা প্রসারে কতটা পরিশ্রম করতে হয়েছে, সে সম্পর্কে বলছিলেন উস্তাদ নুমান আলি খান। এখন তার প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেটের মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিচিতির অধিকারী। এ উদ্যোগ যখন শুরু করেন, তার কয়েক বছর আগ থেকেই তিনি আরবি ভাষা শিক্ষকতার সাথে জড়িত। সেই কোর্স যথেষ্ট জনপ্রিয় পাওয়ার পরেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন পূর্ণকালীন কাজ শুরু করার। তাই রাতারাতি সব ঘটে যায়নি। এককালের শখ পরিণত হয় তার আজীবনের লক্ষ্যে—আরবি ভাষা শিক্ষা ও শিক্ষণ। বর্তমানে ইন্টারনেট মার্কেটিং ব্যবহার করে ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন। তার চ্যানেল বাইয়্যিনাহ ডট টিভির গ্রাহকসংখ্যা এখন মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। এখন হয়তো তিনি প্রচণ্ড বিখ্যাত। কিন্তু এ সবই এসেছে দৃশ্যমান কোনো ফলাফল না দেখে অনেক বছর সাধনা করার পর।
তাই মানুষ এক লাফে চাঁদে চলে গেছে, এসব আষাঢ়ে গল্প কখনও বিশ্বাস করবেন না। এভাবে দুনিয়া চলে না। সবাই পার হয় ধাপে ধাপে। তাই আমার পরামর্শ হলো ছোট থেকে শুরু করুন, উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাজটুকু করুন, তারপর বেড়ে উঠুন প্রকাণ্ড আকারে।
ছোট থেকে শুরু করে বিশাল হয়ে যাওয়া আরেকটি উদ্যোগ ড. মির্জার কোম্পানি আমানাহ মিউচ্যূয়াল ফান্ডস। ড. মির্জা তার বিনিয়োগ ব্যবসা চালাচ্ছেন আজ ত্রিশ বছর যাবৎ। আপনার কি মনে হয় না যে, এই ত্রিশ বছরে তিনি এ কাজের নাড়ী-নক্ষত্র চিনে ফেলেছেন? অবশ্যই! তার অধ্যবসায়ের ফলাফল আসছে এখন।
WiLan Inc.-এর প্রতিষ্ঠাতা হাতিম জগলুল সাত বছর যাবৎ অফিসে এসেছেন ভোর ৬টায়, সব কর্মচারীর চেয়ে আগে। প্রতিটা দিন। সাত বছর ধরে এই রুটিন অনুসরণের পর অবশেষে সাফল্যের দরজা খোলে। মানুষ কী দেখে? শুধু ফলাফলটা: বিলিয়ন ডলার কোম্পানি। কিন্তু এর জন্য যে কত বছরের শ্রম দিতে হয়েছে, তা থেকে যায় আড়ালেই।
তাই ধনী লোকে ধনী হয় একঘেয়ে কাজ করে। দিনের পর দিন একই রুটিন অনুসরণ করে। দেখবেন যে, তারা একটা কোম্পানির সাথেই লেগে থেকে বড় করেন সেটাকে। এমনকি বিনিয়োগকারী হলেও দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখেন একটি জায়গায়। হয়তো বিনিয়োগ করেন অনেক ব্যবসায়। কিন্তু মূলত তাদের পরিচিতি একটি বিশেষ ক্ষেত্রে। বাজার আসলে এত প্রতিযোগিতামূলক, এখানে একটা কাজ উদ্ধার করার মতো সুযোগই থাকে শুধু।