📄 টাকা ভালোবাসে গতিকে
গতির দিকে টাকা আকৃষ্ট হয়। ব্যবসা শুরু করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান গতি। উদ্যোক্তার মাঝে একটা তাড়াহুড়ো ভাব থাকতে হবে। তাড়া যে, ধনী হওয়ার জন্য হাতে একশ বছর সময় নেই। সে সুযোগ থাকলে তো চাকরিই করা যেত। আস্তে আস্তে টাকা জমিয়ে বিনিয়োগ করতেন, এখানে আধেকটা, ওখানে সিকি... এরকম। কিন্তু উদ্যোক্তাকে সুযোগ দেখামাত্র কাজ করতে হয়।
উদ্বোধন তো ঠিকঠাক মতো হলো। এবার হবে বৃদ্ধি। সেটাও খুব দ্রুত। টাকা খুইয়েছেন? দ্রুত পুষিয়ে নিন। ধনী হওয়ার পর কত মানুষকে সাহায্য করবেন বলে নিয়্যাত করেছেন আপনি! যত দেরি করবেন, তাদেরও সাহায্য পেতে দেরি হবে।
দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারাটা আমার দেখা সফল উদ্যোক্তাদের অনন্য গুণ। তাদের মনে দোটানা নেই। মন যা বলে, তার ওপর আস্থা আছে তাদের। আপনিও গড়ে তুলুন এ অভ্যাস। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে আগে বেড়ে যান। পরিকল্পনার ভেতরেই আজীবন পড়ে থাকবেন না। পরিকল্পনা শেষ করে কাজে ঢুকে পড়ুন দ্রুত। ফলাফলের জন্য পরিকল্পনা যতটা জরুরি, বাস্তবায়নও ততটাই দরকারি। ফলাফল যতটুকুই হোক, অন্তত চোখে দেখা যাবে। বিনিয়োগকারীরা দৃশ্যমান ফলাফল চান। সবকিছু যদি আপনার মনের ভেতরই অদৃশ্য আকারে থাকবে, বিনিয়োগকর্তারা বুঝতে পারবে না আপনি বাস্তবিকই সিরিয়াস কি না। কারণ আপনার ধ্যানধারণাকে প্রমাণ করার মতো ভিত্তি তো এখনও নেই। তাই কিছু ফলাফল দৃশ্যমান করে নিন, হোক তা আকারে ছোট। তাহলে বাজারের গতিবিধিও বুঝে আসবে। এগুতে পারবেন সে অনুযায়ী। আর হ্যাঁ, অবশ্যই দ্রুত আগাবেন।
মনে ইচ্ছে আছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হওয়ার? এখনই সে অনুযায়ী কাজ করুন। এখনই চাকরি ছেড়ে দিয়ে শুরু করুন নিজের জন্য কাজ। নিয়্যাতকে আমলে রূপ দিন। ফলাফল আল্লাহর অধীনে। শক্তি ও নিশ্চয়তা নিয়ে দ্রুত সামনে চলুন। কাজ করলেই ফলাফল দেখবেন, অন্যথায় নয়।
📄 ১৫ মিনিটের পরীক্ষা
কাজ শুধু দ্রুত করলেই হবে না, করতে হবে কার্যকরভাবে। ব্রিটিশ চিকিৎসক ড. আমিনা কক্সন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন আমেরিকার একটি সেরা হসপিটাল জন হপকিন্স থেকে। খ্রিষ্টান পরিবারে জন্ম নেওয়া আমিনা ছোটকাল থেকেই ছিলেন অনুসন্ধানী স্বভাবের। নিজের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। বয়স যখন ৫০, তখন একবার স্বপ্নে দেখেন একটি আলো তাকে কাবার দিকে নিয়ে চলেছে। এভাবেই আজ থেকে ২৩ বছর আগে তার ইসলামকে খুঁজে পাওয়া শুরু হয়।
একবার খুবই জটিল এক রোগী আসে তার কাছে। তার রোগ পরীক্ষা করতে যেকোনো গড়পড়তা ডাক্তারের লাগবে কমপক্ষে এক ঘণ্টা। ড. আমিনা সেটা ১৫ মিনিটের মাঝে করে ফেলেন। তার এক্স-রে টেকনিশিয়ান তো হতবাক! নিজ বিষয় নিয়ে নিবিড় পড়াশোনাই তাকে দিয়েছে এরকম কার্যকরী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা।
লোকে তাকে ডাকে, 'চক্ষুবিজ্ঞানের রকস্টার!' এটা মোটেও রসিকতা নয়। যদি কখনো তার অপরেশনের ভিডিওগুলো দেখেন, তাহলে বুঝবেন, কেন তাকে দুনিয়ার সেরা চক্ষু সার্জনদের একজন বিবেচনা করা হয়। ড. আমিনার প্রশিক্ষণের কার্যকারিতার একটি উদাহরণ আগেই দেখেছেন। বিশ বছর হবে না দেখা একটি রোগ তিনি ধরে ফেলেছেন ১৫ মিনিটের ডায়াগনোসিসে। এর কারণ নিজ পড়াশোনার বিষয়ের প্রতিটা খুঁটিনাটি সম্পর্কে জ্ঞান। বই খুলে দেখা বা মনে করার পেছনে সময় দিতে হয় না তাকে। রোগীরাও অবাক! বিশেষত বেসরকারিভাবে পরিচালিত চেম্বারে এত দক্ষতা ও সততা পেয়ে তারা যথেষ্ট মুগ্ধ। তিনি জানেন যে, আরও সময় দিলে আরও টাকা কামাতে পারতেন। কিন্তু এতে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত হতো না। ব্যক্তিগত পড়াশোনা বা পরিবারকে দেওয়ার মতো সময়ও কমে যেত সেক্ষেত্রে। তাই নিজ ব্যবসা সম্পর্কে ভালোভাবে জানাশোনা থাকার সুবিধা বহুমুখী।
📄 দলবদ্ধ শিকার
কর্ম, ধর্ম আর জীবনের মাঝে সমন্বয় করা তো শিখলেন। এবার শিখবেন কাজ ভাগাভাগি। ব্যবসার সব কাজ নিজে করতে গেলে চাকরিজীবীর মতোই সময়ের বাঁধনে বাঁধা পড়বেন। বরং কাজের ছোট ছোট টুকরো এমনভাবে মানুষের মাঝে ভাগ করে দিন, যেন সবারই আয়ের চাকা ঘুরতে থাকে। আর আপনিও হয়ে যান মুক্ত।
ব্যবসার ভাষায় একে বলে ডেলিগেটিং। এটা নেতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। জামাআতের সাথে আল্লাহর সাহায্য থাকার ব্যাপারটি নিয়ে সামনে আরও আলাপ হবে। নেতা হিসেবে ডেলিগেটিং কেন করবেন, সে আলোচনায় থাকা যাক আপাতত। মানুষ যেসব বড় বড় কোম্পানির দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকায়, সেগুলোকে বিশ্লেষণ করুন। দেখুন নিজের আশপাশের উদ্যোক্তাদেরও। এরা কেউই একাকী কাজ করে না, করেনি। জনসমক্ষে একজন দেখা দিলেও পর্দার আড়ালে থাকে বিনিয়োগকারীদের পুরো একটা দল। প্রকল্পের পৃষ্ঠপোষক তারা। এছাড়াও পুরো দলের মধ্যে রয়েছে নানারকম দক্ষতা, নানারকম দৃষ্টিভঙ্গিবিশিষ্ট মানুষ। একেই বলে ডেলিগেটিং। অন্যদের বিশ্বাস করা।
একাও কাজ করা যায়। তবে সেটা খুবই ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। নিজেকে সীমাবদ্ধ করে ফেলার রেসিপি যাকে বলে! ব্যবসা বড় করতে চাইলে লোক লাগবেই। আপনার সাথে সাথে আরও অনেক মানুষ আলাদাভাবে নিজ নিজ লক্ষ্য অর্জন করবে। কিন্তু সবাই মিলে আবার একটি অভিন্ন বৃহৎ লক্ষ্যের পথিক।
দলবদ্ধ কাজ শেখার জন্য নেটওয়ার্ক মার্কেটিং নিয়ে পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। মানুষ-কেন্দ্রিক দক্ষতা বাড়ে এর ফলে। সবাই মিলে একই লক্ষ্যে কাজ করার সামর্থ্য তৈরি হয়। দলটিকে ডেলিগেট করে দেওয়া মানে একজনও এখন আর প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়। সবাইকেই দরকার আছে আলাদা করে। দুজন মানুষ পরস্পর প্রতিস্থাপনযোগ্য হওয়া মানে দুজনের শক্তি ও দুর্বলতা একই। ব্যবসায়ী দলকে এমন হলে হবে না। মানুষেরা প্রায়ই সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয় নিজের মতো কাউকে। ব্যক্তিগতভাবে পছন্দের কোনো মানুষকে। এর ফলে তারা প্রতিস্থাপনযোগ্য হয়ে যায়। ব্যবসায়ে এভাবে দল গড়বেন না। ধরা যাক, আপনি বিজ্ঞানী। তাহলে সঙ্গী হিসেবে নিন কোনো আইনজীবীকে। তারা সামলাবে লেখালেখি, আপনি করবেন অঙ্ক। দলের সদস্যরা একে অপরের পরিপূরক হলেই কার্যকর ডেলিগেটিং সম্ভব।
📄 কিশোর-পরিচালিত বিলিয়ন ডলার ব্যবসা
সংকীর্ণ মানসিকতার মানুষেরা নিজের আইডিয়া লুকিয়ে রাখতে চায়। চেষ্টা করে একাই সেটা নিয়ে কাজ করতে। ইমাম আশরাফের আলোচনা থেকে জেনেছি যে, এটা কোনো কাজের কথা নয়। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে ছোট ব্যবসা ছোটই রয়ে যায়। আমরা চাই প্রাচুর্য মানসিকতা। আইডিয়া ভাগাভাগি করুন অন্যের সাথে। তিনি যে আপনার অংশীদার হবেনই, এমন কোনো কথা নেই। হতে পারে নিজের কাজ সামলে তার আর নতুন কিছুতে অংশগ্রহণের সময় নেই। আর যদি সে নিজেই হয় অসফল উদ্যোক্তা, তাহলে আপনার আইডিয়াকে সফল করার সম্ভাবনাও তার পক্ষে ক্ষীণ। হয়তো তার কর্ম-নৈতিকতা, অভিজ্ঞতা বা সামর্থ্যের অভাব আছে। কিন্তু সে যা-ই হোক, আপনার তাতে ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। আপনার আইডিয়া ছড়িয়ে দিন সবখানে। মাটি খুঁড়ে বের করে আনুন বিনিয়োগকারী আর অংশীদারদের। জামাআতের সাথে কাজ করুন, আল্লাহর হাত আপনাদের সাথে থাকবে।
অংশীদারই হলো সঠিক সিস্টেম তৈরি করার পথ। দলবদ্ধ কাজই পারে আপনাকে ওপরের ধাপে নিয়ে যেতে। কাবাব শপের উদাহরণ দেখুন। কাবাব শপ খুবই ছোট ব্যবসা। একজন মানুষ ভালো মানসম্পন্ন কাবাব পরিবেশন করে। এই মডেলের ওপরের ধাপে রয়েছে ম্যাকডোনাল্ড'সের মতো মডেল। এদের ব্যবসা নিয়মতান্ত্রিক। একটা কিশোরও চালাতে পারবে এই মডেলের ব্যবসা। কারণ তা একেবারে সহজ। কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হলেও সহজ। রান্না, পরিবেশন ও অর্ডার গ্রহণের প্রতিটা জিনিস শিখিয়ে দেওয়া হয় ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতির এই ব্যবসায়। সবকিছু নিয়মতান্ত্রিক। নিজে থেকে অনুমান করে বের করার কিছু নেই, এমনকি রান্নার তাপমাত্রাও না। এ কারণেই ম্যাকডোনাল্ড'সের খাবার যেখান থেকেই কিনুন, স্বাদ একই।
তাই একটি সিস্টেম দাঁড় করিয়ে নিন। সময়, শ্রম ও শক্তি বাঁচবে। ধনী লোকেরা একঘেয়েমিপূর্ণ কাজ করতে পারে। এটা তাদের একটি গুণ। ধনী লোক একই বিরক্তিকর কাজ একটানা বিশ বছর করে যেতে পারে। অন্যরা খালি এখান থেকে ওখানে লাফাবে। বর্তমানে উত্তর আমেরিকায় মানুষ একটা চাকরিতে থাকে গড়ে চার থেকে পাঁচ বছর। এরপর একঘেয়ে লাগতে শুরু করায় লাফিয়ে চলে যায় অন্যত্র। সফল লোকেরা ওই একঘেয়ে কাজটাই বিশ, চল্লিশ বা তারও বেশি বছর ধরে করে যেতে সক্ষম। সক্ষম বলেই তারা সফল। যেই কাজে সবচেয়ে বেশি ফলাফল আসে, মাথা গুঁজে পড়ে থাকুন সেটায়। একঘেয়ে কাজ করতে অভ্যস্ত হোন।