📄 পাইপভর্তি সাফল্য
অনেকের অনুযোগ, 'ব্যবসা তো করতে চাই ঠিকই। কিন্তু কাজ আর জীবনের ভারসাম্য করতে পারব কি না, বুঝতে পারছি না। সারাটা সময় কাজ নিয়ে পড়ে থাকার কোনো ইচ্ছে নেই।'
সবকিছুরই নির্ধারিত সময় আছে। ইসলাম আমাদের শৃঙ্খলা শিক্ষা দেয়। যেমন: জুমুআর সময় হলে ব্যবসা থামিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জুমুআর খুতবা দেওয়ার সময় একটি ব্যবসায়ী কাফেলা ফিরে আসে মদীনায়। এর শব্দ শুনে কিছু সাহাবি দৌড়ে যান সেদিকে। এরই প্রেক্ষিতে উল্লিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করে নাযিল হয় সূরা আল-জুমুআ। আযান হয়ে গেলে সব বন্ধ। সালাতের সময় সালাত, ব্যবসার সময় ব্যবসা। একইভাবে আপনার ওপর অধিকার আছে আপনার পরিবারের। অন্ন জোগানোই আপনার একমাত্র দায়িত্ব নয়। পরিবারকে সময়ও দিতে হয়। নাহলে মায়া-মমতা হারিয়ে যায় পরিবারের সদস্যদের মাঝ থেকে।
তাই ব্যবসার শুরুর দিকে প্রচুর সময় দিতে হয় বটে। কিন্তু ব্যবসার কাঠামোটা এমনভাবে সাজানো সম্ভব, যার ফলে সময়ের ব্যাপারে স্বাধীনতাও পাবেন আপনি। যেমন: ছোট রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সেই সময়টুকু পাবেন না। সেখানে কর্মী থাকবে কম। রান্না থেকে নিয়ে পরিবেশন পর্যন্ত অনেক কাজ করতে হবে আপনার একার। ফলে নিজেকে ও পরিবারকে দেওয়ার মতো সময়ও কমে যাবে। সময়ের স্বাধীনতা উপভোগ করার পাশাপাশি সফলভাবে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করতে হলে ব্যবহার করতে হবে ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি। আগে থেকে বিদ্যমান সফল ব্যবস্থাগুলোকে টাকা দিয়ে নিজের কাজ করানো। ম্যাকডোনাল্ড'স এমনটিই করেছে। মুসলিম উদ্যোক্তার জগতে অনুরূপ কাজ করেছেন তারিক ফরিদ। তিনি এডিবল অ্যারেঞ্জমেন্টসের চেয়ারম্যান। ফুলের তোড়ার মতো সাজানো চকলেট মাখানো ফল বিক্রি করে কোম্পানিটি। ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি ব্যবহার করেই বেড়ে উঠেছে তার ব্যবসা। এখন তাদের বার্ষিক বিক্রয় অর্ধ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। তাই সঠিক কাঠামো অনুসরণ করুন। তাহলে সব কাজ আর নিজের করা লাগবে না।
ধরা যাক খুব উঁচু একটা জায়গায় পানির উৎস আছে। আপনার গ্রামে পানি আনার উৎস এই একটিই। এখন দুইভাবে পানি আনতে পারেন। প্রথম পদ্ধতি, অনেকগুলো বালতি সাথে করে নিয়ে গিয়ে একটা একটা করে ভর্তি করা। তারপর একটা একটা করে নিয়ে আসা। এটা হলো ওই ছোট রেস্টুরেন্ট ব্যবসার মতো। সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাধ্য। দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো পানির উৎস থেকে গ্রাম পর্যন্ত একটা পাইপলাইনের ব্যবস্থা করা। এটিই চৌকস পদ্ধতি। শুরুতে ওই পাইপলাইন স্থাপন করতেই যা একটু খাটাখাটনি। এরপর বাকিটা সময় আরাম। তাই ব্যবসাকাঠামো নিয়ে পড়াশোনা করুন। জীবনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলোর জন্য সহজেই সময় বেরিয়ে আসবে।
📄 সময় নষ্ট
কুরআনের সবচেয়ে ছোট সূরাগুলোর একটি সূরা আসর। এতে বলা হয়েছে, 'সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই সব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। তারা ছাড়া, যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে, সত্যের উপদেশ দেয় ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়। [১৬]'
অগুরুত্বপূর্ণ জিনিসে সময় অপচয় করতে কেউই চায় না। কাজ করলেই হয় না শুধু। করতে হয় সঠিক লক্ষ্য ও কারণ মাথায় রেখে। এজন্যই বইয়ের শুরুতে নিয়্যাত নিয়ে এত কথা বলেছি আমরা। যথাযথ নিয়্যাত মানে সঠিক কারণ। এই শর্ত পূরণ হলেই আপনার কাজটি ইবাদাত বলে গণ্য হবে। নিয়্যাত ঠিক করে ফেলার পর সময়ের ব্যবস্থাপনা করুন বুঝেশুনে। সময় অপচয়কারীরা মূলত খেল-তামাশা আর অসার কথাবার্তায় লিপ্ত থাকে। কুরআনে নিন্দা করা হয়েছে এদের। মনে রাখবেন, এমনকি জান্নাতেও কোনো অসার কথাবার্তা নেই। আল্লাহ জান্নাতেও শুধুমাত্র উত্তম কথাবার্তা বলার অনুমতি দিয়েছেন। সময় অপচয় হতে পারে সোশ্যাল মিডিয়াতেও। সামাজিক জীবনযাপন খারাপ কিছু নয়। কিন্তু ওতেই বুঁদ হয়ে গেলে হবে না। সফল মানুষেরা এমনভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন, যাতে ক্ষতির বদলে আরও লাভ হয়।
পোশাক ঠিক আছে কি না, কথা বলা ঠিক আছে কি না, এগুলো দেখার পেছনে অনেকে ঘনঘন সময় নষ্ট করে। হ্যাঁ, এতে প্র্যাকটিস হয় বটে। কিন্তু আয়নার সামনে এসব কাজ বারবার করার চেয়ে আসল কর্মক্ষেত্রে একবার করলে বেশি লাভ হয়। সময়ও বাঁচে দারুণভাবে। কয়েকবার ব্যর্থ হবেন হয়তো। কিন্তু বাস্তব জীবনের এই অভিজ্ঞতা অমূল্য। চর্চার মাধ্যমে কিছুই নিখুঁত হয় না, আগের চেয়ে ভালো হয় মাত্র।
সফল মুসলিম উদ্যোক্তাগণ আখিরাতের জন্যও সময় রাখেন। অনেকেই আদায় করেন তাহাজ্জুদের সালাত। এই অভ্যাস মোটেও সহজ নয়। কিন্তু ব্যবসা, জীবন ও আখিরাতের সাফল্যের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষত তাহাজ্জুদে। আগেও উল্লেখ করেছি যে, আরিফ মির্জা আমাকে এ উপদেশই দিয়েছেন। মানুষ তাকে প্রায়ই বলে, 'এত বেশি চান কেন?' তার জবাব, 'আল্লাহর মহত্ত্বের কাছে এই কয়েক কোটি টাকা কী আর এমন!' একে বলে প্রাচুর্য মানসিকতা। সংকীর্ণ মানসিকতার বিপরীত। আল্লাহ সব করতে পারেন। চাইতে দোষ কী? সময়ের সদ্ব্যবহার করে দেখুন। ব্যবসাও বাড়বে, দ্বীনদারিও বাড়বে।
টিকাঃ
১৬. সূরা আল-আসর ১০৩:১-৩
📄 গোড়ায় সঠিক
যা করার, তাড়াতাড়ি করতে হবে। পড়তি শুরু হওয়ার আগেই লাভজনক হয়ে যেতে হবে আপনাকে। যত দ্রুত লাভজনক হবেন, দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা টিকে থাকার সম্ভাবনা তত বাড়বে। অনিশ্চিত ভঙ্গিতে পদক্ষেপ নেবেন না। শুরু থেকেই প্রত্যয়ী থাকতে হবে। দিতে হবে প্রচুর শ্রম।
উদাহরণস্বরূপ, নেটওয়ার্ক মার্কেটিং-এ প্রথম সপ্তাহটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসা যদি দশ-বিশ বা এমনকি একশ বছরও টিকে থাকে, তবুও। কারণ প্রথম সপ্তাহটিই বাকি দশ-বিশ বা একশ বছরের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। রেস্টুরেন্ট ব্যবসার ক্ষেত্রেও একই কথা। প্রথম সপ্তাহেই সব বন্ধু-প্রতিবেশীকে দাওয়াত দিয়ে দিন। উদ্বোধনী যেন হয় জাঁকালো, উত্তেজনাময়। কাস্টমার একবার পেয়ে গেলে তাদেরকে পরে ধরে রাখার জন্য হাজারো কৌশল আছে।
কিন্তু ৮০% শক্তি উদ্বোধনীর পেছনে খরচ করুন। আমার এক প্রশিক্ষক বলেছেন যে, জিনিসটা চাঁদে যাওয়ার মতো। রকেট ছাড়ার সময়ই ৮০% শক্তি খরচ করে সেটাকে বায়ুমণ্ডলের বাইরে ছুঁড়ে দিতে হবে। বিনিয়োগ জগতে এরকমই দেখবেন চারিদিকে। পুঁজিবাজারে কোনো কোম্পানি উদ্বোধনের দিনই প্রচুর অফার দেয়। সবখানে একটা সাজসাজ রব ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। প্রচুর লেখালেখি, প্রচুর বিজ্ঞাপন; যতভাবে মানুষের মনোযোগ কেড়ে নিয়ে ফান্ডের ব্যবস্থা করা যায়।
📄 টাকা ভালোবাসে গতিকে
গতির দিকে টাকা আকৃষ্ট হয়। ব্যবসা শুরু করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান গতি। উদ্যোক্তার মাঝে একটা তাড়াহুড়ো ভাব থাকতে হবে। তাড়া যে, ধনী হওয়ার জন্য হাতে একশ বছর সময় নেই। সে সুযোগ থাকলে তো চাকরিই করা যেত। আস্তে আস্তে টাকা জমিয়ে বিনিয়োগ করতেন, এখানে আধেকটা, ওখানে সিকি... এরকম। কিন্তু উদ্যোক্তাকে সুযোগ দেখামাত্র কাজ করতে হয়।
উদ্বোধন তো ঠিকঠাক মতো হলো। এবার হবে বৃদ্ধি। সেটাও খুব দ্রুত। টাকা খুইয়েছেন? দ্রুত পুষিয়ে নিন। ধনী হওয়ার পর কত মানুষকে সাহায্য করবেন বলে নিয়্যাত করেছেন আপনি! যত দেরি করবেন, তাদেরও সাহায্য পেতে দেরি হবে।
দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারাটা আমার দেখা সফল উদ্যোক্তাদের অনন্য গুণ। তাদের মনে দোটানা নেই। মন যা বলে, তার ওপর আস্থা আছে তাদের। আপনিও গড়ে তুলুন এ অভ্যাস। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে আগে বেড়ে যান। পরিকল্পনার ভেতরেই আজীবন পড়ে থাকবেন না। পরিকল্পনা শেষ করে কাজে ঢুকে পড়ুন দ্রুত। ফলাফলের জন্য পরিকল্পনা যতটা জরুরি, বাস্তবায়নও ততটাই দরকারি। ফলাফল যতটুকুই হোক, অন্তত চোখে দেখা যাবে। বিনিয়োগকারীরা দৃশ্যমান ফলাফল চান। সবকিছু যদি আপনার মনের ভেতরই অদৃশ্য আকারে থাকবে, বিনিয়োগকর্তারা বুঝতে পারবে না আপনি বাস্তবিকই সিরিয়াস কি না। কারণ আপনার ধ্যানধারণাকে প্রমাণ করার মতো ভিত্তি তো এখনও নেই। তাই কিছু ফলাফল দৃশ্যমান করে নিন, হোক তা আকারে ছোট। তাহলে বাজারের গতিবিধিও বুঝে আসবে। এগুতে পারবেন সে অনুযায়ী। আর হ্যাঁ, অবশ্যই দ্রুত আগাবেন।
মনে ইচ্ছে আছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হওয়ার? এখনই সে অনুযায়ী কাজ করুন। এখনই চাকরি ছেড়ে দিয়ে শুরু করুন নিজের জন্য কাজ। নিয়্যাতকে আমলে রূপ দিন। ফলাফল আল্লাহর অধীনে। শক্তি ও নিশ্চয়তা নিয়ে দ্রুত সামনে চলুন। কাজ করলেই ফলাফল দেখবেন, অন্যথায় নয়।