📄 নিজের সেরাটা দেওয়াই যথেষ্ট নয়
আপনার এলাকার কিছু মানুষের সর্বদা ডিমান্ড থাকে, খেয়াল করেছেন? মানুষ তাদের কাছে আসে, সাহায্য চায়। তাদেরকে সব সময় মানুষের দরকার। কোনো এক কারণে এ ধরনের মানুষগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খুবই, খুবই প্রাচুর্যশালী। তাদের পেশা যা-ই হোক। কেউ হয়তো মাসজিদের ইমাম, কেউ উদ্যোক্তা, কেউ জনসেবক। কিন্তু কেন যেন তাদের হাতে সব কাজ সহজ হয়ে যায়। এই লোকগুলোর সাফল্যের আসল রহস্য দানশীলতা। তারা দিয়েই যায়, দিয়েই যায়। একসময় তা বহুগুণে ফিরে আসে তাদেরই কাছে।
বেশি দেওয়ার একটা উপায় হলো যা করছেন, তাতে নিজের সবটুকু মনোযোগ ঢেলে দেওয়া। হয়তো আপনি ব্যবসায়ীও নন, চাকরিজীবী। তারপরও। আজিম রিজভীর মতে, চাকরিজীবীদের উচিত কাজের সময় ওই কাজই করা। বিশেষত অফিস আওয়ারে অন্য কিছু না করা। তিনি নিজেও ক্যারিয়ার শুরু করেছেন চাকরিজীবী হিসেবে। জরুরি কোনো দরকার পড়লে রাত-বিরাতে গিয়েও হাজির হতেন অফিসে। চাকরি করুন বা জনসেবা, শতভাগ প্রচেষ্টা দিয়ে করুন সেটা। এই অভ্যাস ব্যবসায় দারুণভাবে কাজে লাগবে।
এত উঁচু মানদণ্ড স্থাপন করুন, যেন অন্যরা নিজেদের মাপতে সেটা ব্যবহার করে। অর্থাৎ, উদ্যোক্তা হিসেবে কর্ম-নৈতিকতার আদর্শ উদাহরণে পরিণত হোন। কর্মচারীরা যদি বসকে গড়িমসি করতে দেখে, তাহলে তারাও অমনই করবে। মনে রাখবেন, আপনি কিন্তু নেতা।
ইসলামে ইহসান বলে একটি কথা আছে। সেরাটা দেওয়া যাকে বলে। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন যে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন, যারা ইহসান সহকারে সুচারুভাবে কাজ করে। তাই ঈদ বা আকীকার জন্য প্রাণী জবেহ করলেও ভালো করে ধার দিয়ে নিতে হয় ছুরিতে। নিশ্চিত করতে হবে, যেন সম্ভাব্য সর্বনিম্ন ব্যথা পেয়ে প্রাণ বেরিয়ে যায় প্রাণীর। এই মূলনীতি সব কাজে প্রযোজ্য। ইহসান করা অর্থ মানসম্মত কাজ করা। আর মান হলো নিশ্চয়তা। মানুষ বিএমডব্লিউ গাড়ির কথা আলাদা করে বলে কেন? কারণ তারা জানে যে, বিএমডব্লিউ’র গাড়ি মানে ভালো। জানে যে, কোম্পানিটি তাদের পণ্যের পেছনে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। তাই দাম বেশি হওয়ায় আপত্তি নেই। বিয়ের পোশাকে কেন হাজার ডলার খরচ করে লোকে? কারণ বিয়ের পোশাক খুবই ভালো করে বানানো হয়। প্রচুর শ্রম-ঘাম আর দক্ষতার ফসল এর শৈল্পিক বুনন। প্রাইস ট্যাগে থাকে এরই বহিঃপ্রকাশ। ভোক্তারা ভালো মানের পণ্য চেনে, কিনে নেয় ন্যায্য দামে। তাই যা করবেন, চমৎকারভাবে করবেন।
শুধু নিজের সেরাটা না; উদ্যোক্তার জন্য নিজ সামর্থ্যের সেরাটা দেওয়া যথেষ্ট নয়। নিজের সেরা দিয়ে হয়তো পারবেনও না কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছাতে। কারণ ময়দানে আপনার চেয়েও অনেক বাঘা বাঘা প্রতিযোগী আছে। যেমন ধরুন, জনাব ইয়াকুব মির্জা পুরো বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। বর্তমানে তিনি উত্তর আমেরিকায় এমনসব বিনিয়োগের নেতৃত্ব হাতে নিয়েছেন শুধুমাত্র, যেগুলো হালাল হওয়ার পাশাপাশি কোনো-না-কোনোভাবে সমাজসেবা ও জনসেবামূলক। তাই প্রতিযোগিতা সামলাতে তাকে দিতে হয়েছে খুবই উঁচু মানের ও নির্ভরযোগ্য পণ্য। খেয়াল করলাম যে, তিনি ফলাফল-কেন্দ্রিক মানুষ। তার মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগগুলো বছরে গড়ে ১৩% এর বেশি ফল পেয়েছে। তৎকালীন আর্থিক মন্দাকে বিবেচনায় নিলে অঙ্কটা বিশাল।
তাই যে ধরনের ব্যবসাই করুন, ফলাফল না পেলে নিজেকে ছাড়িয়ে যান। কারণ আপনার নিজের সেরাটা হয়তো বাজারে যথেষ্ট নয়। করতে হবে ফলাফল অর্জনে যতটুকু দরকার, ততটুকু। সেলস নিয়ে আমি প্রচুর কথা বলি। কারণ একটা সময় আমি নিজে এতে জড়িত ছিলাম। প্রায় প্রত্যেক উদ্যোক্তা এই কাজ করেছে জীবনের কোনো না কোনো সময়। প্রাইভেট কোম্পানিগুলো তা-ই করে। শুরুর দিকে আমি দিনে একশ দরজায় কড়া নেড়েছি। পণ্য ছোটখাটোই। ওটা আমার জীবনে প্রথম সরাসরি বিক্রয়ের অভিজ্ঞতা। কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। যথেষ্ট হওয়ার জন্য দরকার ছিল দৈনিক দুই শতাধিক দরজায় কড়া নাড়া। একবার যখন পেরেছি সেই লক্ষ্যকে সামনে রাখতে, এরপর থেকে ছাড়িয়ে গেছি সকল প্রতিযোগীকে। কোম্পানির বাকি সবাইকে। আমার সেলস উঠে আসে চার্টের চূড়ায়। সবাই অবাক। আপনিও এভাবে সংখ্যা বাড়িয়ে দেখুন কী আসে ফলাফল। প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বেশি কাজ করুন, বিশেষত ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে।
📄 পূর্ণতার শক্তি
যত প্রকল্পে হাত দিয়েছেন, একটাও পূর্ণ না করে ছাড়বেন না। নিজের টীম বা এমনকি স্ত্রীর সাথে বসেও হিসেব কষতে পারেন দৈনিক কতটুকু কাজ হলো। কী করছেন, কী এর ভবিষ্যৎ। পরিকল্পনা, লক্ষ্য নির্ধারণ, শক্তি অর্জন, অংশীদার সংগ্রহ করে ব্যবসা শুরু করে দিয়েছেন। পাশাপাশি পেতে শুরু করেছেন অল্পবিস্তর ফলাফলও। এবার মনোযোগ দিন পরিপূর্ণতার ওপর।
পরিপূর্ণতা কী? যা শুরু করেছেন, তা শেষ করা। কোনো ডিগ্রি অর্জন শুরু করে থাকলে শেষ করুন। যদিও উদ্যোক্তার জন্য উচ্চতর পড়াশোনা তেমন জরুরি নয়। যেমন: অনেক উদ্যোক্তা হাইস্কুলও সম্পন্ন করেননি। কিন্তু নিজেদের কোনো প্রকল্প শুরু করলে ঠিকই পূর্ণ করেন তারা। কারণ এই কাজটির প্রতি তাদের আগ্রহ-উদ্দীপনা আছে। কঠিন বলেই কোনোকিছু আধাখেচড়া ফেলে রাখবেন না। একটা উপসংহার আসা পর্যন্ত লেগে থাকুন, যদিও শেষটা হয় ব্যর্থতা দিয়ে। ফলাফল আসা চাই। নাহলে পুরো সময় আর শ্রমের অপচয়। সেইসাথে আত্মসম্মানের অবক্ষয়।
কাজ পুরো করার অভ্যাস গড়তে পারলে লক্ষ্যপূরণও সহজ হবে। বড় কাজের ছোট ছোট অংশগুলো আলাদা আলাদা করে শেষ করুন। চোখ রাখুন ভবিষ্যতের ওপর। শিখুন অতীতের ভুল থেকে। সংশোধন করে নিন বর্তমানের কর্মখসড়া।
এই মূলনীতি প্রয়োগের এক আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন স্টাইল টেক্সটাইলসের সিইও শাহজাদ আসগার। তিনি যা শুরু করেন, তা শেষ করে ছাড়েন; সব সময়। সফল মানুষদের এই এক বৈশিষ্ট্য। কাজ করলে ইহসান সহকারে করে। নাইকির মতো স্পোর্টিং কোম্পানি তাদের পণ্য তৈরিতে যেসব কাঁচামাল ব্যবহার করে, তা উৎপাদন করেন শাহজাদ। তার কৌশল হলো সব সময় সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা, তাও ৯৮% এর বেশি বিশুদ্ধতা সহকারে। গুণগত মান আর সরবরাহের সময়ে একচুলও এদিক-সেদিক করেন না কখনও। এভাবে তিনি রয়েছেন প্রতিযোগিতার শীর্ষে।
পূর্ণতার এই মূলনীতি প্রয়োগ করেন জনাব ফারুক শেইখ। উদ্যোগ বিষয়ে একটি বক্তব্য দিয়ে নেমে আসার পর কথা বলছিলাম তার সাথে। ফ্রান্স থেকে আগত এক উদ্যমী তরুণ আমাদের সাথে যোগ দেয়। কয়েকটি প্রকল্প একসাথে চালাচ্ছিল সে। জনাব ফারুক শুনলেন তার সকল প্রস্তাবনা। তারপর বললেন, 'সফল হতে চাইলে একটিতে লেগে থাকুন। সাফল্য আসার আগ পর্যন্ত ছাড়বেন না ওটা।' এ থেকেই বোঝা যায় মুসলিম উদ্যোক্তাদের আচরণ কতটা বাস্তবসম্মত। তাদের লক্ষ্য ও মনোযোগ অখণ্ড। এভাবেই সফল হন তারা। একটি প্রকল্প শুরু করলে তা পূর্ণ করেন। যদি ব্যর্থও হয়, তবুও।
📄 দৈনিক ১৫ ঘণ্টা কাজ
কর্ম-নৈতিকতা ভালো করতে হলে উচ্চাশা রাখতে হবে। নিচু আশার একটি চিহ্ন হলো সারাদিন ঘুমানো আর আকাশ-কুসুম কল্পনা। এটি আমাদের যে কারও সাথে ঘটতে পারে। স্বল্প ইচ্ছেশক্তির মানুষ প্রচুর স্বপ্ন দেখে কিন্তু তা বাস্তবায়নে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয় না। তার লক্ষ্য আসলে লক্ষ্য নয়, শখ।
ধরা যাক একটা বাচ্চা বাইসাইকেল চায়। কিন্তু বাবা-মা কিছুতেই দেবেন না, কারণ সে এখনও ছোট। বাচ্চাটার মনের অবস্থা কী হবে? বাইরে গেলেই তার চোখে পড়বে বাইসাইকেল আর বাইসাইকেল। আর তর সইবে না নিজের একটা সাইকেল পাওয়ার জন্য। এটাই সত্যিকারের ইচ্ছা। এতে কোনো খাদ নেই। বাইসাইকেল তার স্বপ্ন। মাসের পর মাস চলে গেলেও বাবার কানের কাছে ঘ্যানঘ্যানানি থামবে না তার। এখন বাবা যদি শর্ত দেন পড়াশোনায় ভালো করলে সাইকেল কিনে দেবেন, কী করবে বাচ্চাটা? জানপ্রাণ দিয়ে পড়াশোনা করবে। আগে আগে ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসবে মন না চাইলেও। একসময় এই ইচ্ছেশক্তিই তাকে এনে দেবে কাঙ্ক্ষিত বাইসাইকেল। তাই কাজ সমাধা করার পেছনে আবেগের গুরুত্ব কতটা বাস্তব। তাই কাজের জন্য কারণ খুঁজে নিন। হোক তা আপনার পরিবার বা নিজের অভাবমুক্তি।
শুরুর দিকে কর্মঘণ্টা দীর্ঘ হওয়াই স্বাভাবিক। রেডকো'র সিইও মুজীবুর রহমানের কাছ থেকে শিখলাম ব্যাপারটা। মধ্যপ্রাচ্য ও পাকিস্তানে বিরাট কন্সট্রাকশান কোম্পানি পরিচালনা করেন তিনি। তার কর্ম-নৈতিকতা অবিশ্বাস্য। দিনে পনেরো ঘণ্টা করে কাজ করার উপদেশ দেন তিনি মানুষকে। ঠিক ওই বাইসাইকেলপ্রেমী বাচ্চার মতো, যে দৈনিক পনেরো ঘণ্টা বাবার কাছে কান্নাকাটি করেও ক্লান্ত হয় না। দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে হলে এভাবেই শুরু করা চাই।
📄 গন্ডারের মতো আক্রমণ
উদ্যমী উদ্যোক্তাকে আমার কাছে আসলেই গন্ডারের মতো মনে হয়। আল্লাহ এই প্রাণীগুলোকে দৃষ্টান্ত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। পরিশ্রমীদের প্রশংসায় আল্লাহ বলেন, 'যারা আল্লাহকে স্মরণ করে, দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে। আর গভীর চিন্তাভাবনা করে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি নিয়ে। [১৫]'
আল্লাহর সৃষ্টিজগতে ছড়িয়ে আছে প্রচুর শিক্ষা। গন্ডার উদ্যমী ও শক্তিশালী। সামনে যে বাধাই থাকুক, তা ভেঙেচুরে এগিয়ে যায়। উদ্যোক্তা হিসেবে আপনাকেও হতে হবে এমন। ফান্ডিং চান কিন্তু কর্মোদ্যম নেই, তাহলে তো বিনিয়োগকর্তারা আগ্রহ পাবে না। তাই গন্ডারের মতো শক্তি গড়ে তুলুন।
উদ্যমী উদ্যোক্তার উদাহরণ কোম মির্জা। তার চেহারা থেকে যেন ঠিকরে পড়ে শক্তি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও কখনও কখনও দেখবেন তা। ব্যবসা দাঁড় করাতে চাইলে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে কখনও অনুপস্থিত রাখবেন না নিজেকে। কোম মির্জা সব সময় লম্বা লম্বা পোস্ট লিখে কাজের গতিবিধি ধরে রাখেন। গাড়ির ডিলারশিপ সফটওয়্যার দিয়ে কাজ শুরু করে এখন তিনি নানা ময়দানের বিনিয়োগকারী। তার কর্মোদ্যম আসলে সংক্রামক। আশপাশের মানুষদেরও চনমনে করে দেয়।
জনাবা উমু এন্দিয়াই এরকম আরেকজন। কাস্টমসের জন্য সফটওয়্যার প্রস্তুতকারী একটি কোম্পানির শীর্ষব্যক্তি তিনি। মা হওয়ার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও তার উদ্যম রীতিমতো ছোঁয়াচে। ডেডলাইন ঠিক রাখা যে কারও জন্যই ক্লান্তিকর। তাই নিজের টীমকে সেই শক্তি সরবরাহ করতে হবে আপনারই। এমন একজন ব্যবসায়ীও চিনি না, যিনি উদ্যমী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী নন। না তাদের কেউ অলস। পরিশ্রমের একটি গুণ হলো তা আশপাশ থেকে জীবন কেড়ে নেয় না, উলটো জীবনীশক্তি দান করে। পরিশ্রমীর উপস্থিতিতে ভালো বোধ করে অন্যরাও। উৎসাহ পায় নিজ নিজ লক্ষ্য অর্জনের। আপনিও যদি এমনই একজন মানুষ হতে চান, তাহলে এরকম মেজাজ গড়ে তুলুন।
টিকাঃ
১৫. সূরা আলে ইমরান ৩:৯১