📄 ভয়ের সত্য-মিথ্যা
জন্মের সময় শিশুর মাঝে কেবল দুটি জিনিসের ভয় থাকে। উচ্চ আওয়াজ এবং পড়ে যাওয়া। এ দুটো ভয় একেবারে স্বাভাবিক। এরকম আরেকটি স্বাভাবিক ভয় আল্লাহভীতি। ইসলামে একে বলা হয় ফিতরাত। এ ছাড়া বাকি যত রকমের ভয় আছে, সবই আসে অস্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা থেকে। প্রায়ই আমরা নিজেরা নিজেদের ওপর এসব ভয় চাপিয়ে দিই। এগুলোর বেশিরভাগ আসে পরিবেশ থেকে।
যেমন: বাবা-মা সন্তানকে বলেন, 'ওটা তুমি পারবে না।' অথবা অন্য কাউকে ব্যর্থ হতে দেখা। এগুলো শুনে ও দেখেই মানুষের মাঝে ভয় দানা বাঁধতে থাকে।
আজগুবি সব সীমাবদ্ধতার ধারণা তৈরির জন্য দায়ী সমাজ। যেমন: অনেকে ভাবে মুসলিম নারী হওয়া মানে পশ্চাৎপদতা। অথচ ইসলামের ইতিহাসে রয়েছেন খাদীজার (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) মতো সম্পদশালী নারী। তিনি কিন্তু বাইরে গিয়ে নিজে সব কাজ করেননি। তাঁর ছিল যোগ্য প্রতিনিধি ও ব্যবস্থাপক নিয়োগ করার মতো বুদ্ধি। ছিলেন প্রাজ্ঞ বিনিয়োগকারী হিসেবে সম্পদ ব্যবস্থাপনা করা এক উদ্যোক্তা। নবির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাথে তাঁর বিয়েও হয় এভাবেই। মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মাঝে প্রথমে তিনি দেখেছেন একজন দুর্দান্ত ব্যবস্থাপককে। কালক্রমে তাঁর চরিত্রে অভিভূত হয়ে এগিয়েছেন বিয়ের দিকে। তাই ইসলাম নারীকে সীমাবদ্ধ করে না। শুধু কোথায় কীভাবে আচরণ করতে হবে, তার দিকনির্দেশনা দিয়ে দেয়। বিরাট ধনী মুসলিমার উদাহরণ তাই ইতিহাসে বিরল নয়।
📄 ধনাঢ্য মালয়েশিয়া
নেতিবাচক চিন্তা আপনার সবচেয়ে দামি সম্পদটি কেড়ে নেবে: বিশ্বাস। ধরুন আপনার কাছে অনেকগুলো স্বর্ণের বার আছে। সেগুলোকে রাখলেন শক্তিশালী লকারে কম্বিনেশান লক দিয়ে। এখন বলুন, এই কম্বিনেশান কি আর কাউকে জানাবেন? মানুষের মন এর চেয়েও অনেক দামি সম্পদ।
নেতিবাচক চিন্তা হলো পাহাড়ে চড়ার সময় পিঠে থাকা ভারী বস্তার মতো। যাত্রাকালে আমরা ব্যাগে একটাও অপ্রয়োজনীয় জিনিস রাখি না। সে জায়গায় পাথরভর্তি বস্তা নিয়ে দশ মাইল হেঁটে যাওয়া কত্তবড় বোকামি! অতীতের ভ্রান্তবিশ্বাস আঁকড়ে ধরে রাখা মানুষেরা এরকমই বোকা। তারা ভাবে, 'আগেরবার যেহেতু কাজ হয়নি, এবারও হবে না।'
এগুলো বাস্তবতাকে বোঝার ভুল পদ্ধতি। আগেরবার চেষ্টা করে হয়নি মানে এবার অন্যভাবে চেষ্টা করতে হবে। মুসলিম উদ্যোক্তারা তো এভাবেই সফল হন। নিজের প্রতি সঠিক বিশ্বাস রাখার ওপর অনেককিছুই নির্ভরশীল।
ব্যক্তিপর্যায় ছাড়িয়ে দেশ-জাতি নিয়েও নেতিবাচক চিন্তা করা যায়, যা একইরকম ক্ষতিকর। জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় বরণ করেছে। তারপরও নিজেদের দরিদ্র ভাবেনি তারা। মালয়শিয়ানরা তাদের দেশকে বলে 'ধনাঢ্য মালয়শিয়া'! তাই নিজের দেশকে গরিব ভাববেন না। এতে নিজের ব্যর্থতাই ডেকে আনা হয়।
সফল মুসলিম উদ্যোক্তারা নিজ দেশের ব্যাপারে খুবই ইতিবাচক। এমনকি যদি তা ধনবান দেশ না-ও হয়। নিজ দেশকে পরিচ্ছন্ন, দক্ষতর, সুন্দরতর ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করানোর লক্ষ্য নিয়েই কাজ শুরু করেছেন তারা।
📄 জগতে যথেষ্ট আছে
বিশ্বাসটা হওয়া চাই নিজের জন্য উপকারী। কোন কোন বিশ্বাস আপনাকে পেছন থেকে আঁকড়ে ধরে রাখছে, খুঁজে দেখুন। যেমন: সম্পদ সীমিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই বিশ্বাস দিয়ে দারুণভাবে মগজধোলাই করা হয়। কিন্তু সত্য হলো, জগতে যথেষ্ট রয়েছে। তারা বলে বিশ্বে নাকি জনসংখ্যা বেশি হয়ে গেছে। এ বিশ্বাস ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। আল্লাহ আমাদের যথেষ্ট জোগান দিয়েই সৃষ্টি করেছেন।
শুধু অস্ট্রেলিয়াতেই এই পরিমাণ জায়গা আছে, যেখানে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ নিজস্ব একটি বাগানবাড়ি-সহ স্বচ্ছন্দে থাকতে পারে! তাই পৃথিবী দরকারের চেয়ে যথেষ্ট বড়। জোগানও প্রচুর। পাহাড়-মহাসাগরে কত জায়গা পড়ে আছে এখনও অনাবিষ্কৃত।
যদি মনে করেন আপনার বর্ণ, লিঙ্গের কারণে পৃথিবী আপনার প্রতি নির্দয়, তবে কেবল পেছনেই পড়ে থাকবেন। হয়তো বৈষম্যের ব্যাপারটি বাস্তব। কিন্তু কিছুক্ষেত্রে অতিকল্পনাও। সে যা-ই হোক, এই চিন্তাগুলো আপনার কাজে আসবে না। তাই ব্যবহারও করবেন না এগুলো। শুধু এমনসব বিশ্বাস ব্যবহার করুন, যা দিয়ে সম্পদ, সাফল্য ও উন্নতি তৈরি করে নেওয়া যায়।
বর্ণবাদ ও বৈষম্যের শিকার ভাইবোনদের জন্য একটি নসিহত দিয়ে এই অংশ শেষ করছি। সফল উদ্যোক্তারা এসব কুৎসিত বাস্তবতার ব্যাপারে অজ্ঞ নন। তারা শুধু সেগুলো নিয়ে পড়ে থাকার বিরোধী। সাফল্যের চেয়ে ভালো প্রতিশোধ কিছুই হতে পারে না। তাই নিজের সব শক্তি ঢেলে দিন বিজয় অর্জনের পেছনে, অভিযোগ করার পেছনে নয়।
📄 বিশ্বাসের প্রমাণ
বিশ্বাস যেমন অপ্রমাণিত হতে পারে, তেমনই হতে পারে প্রমাণিত এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। মুসলিম উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার শুরুটা হবে প্রমাণবিহীন বিশ্বাস দিয়ে। উদ্যোগ শুরু করে বিশ্বাস রাখবেন যে, সাফল্য আসবে। ভবিষ্যৎ তো অজানাই। কিন্তু একটা-দুটা করে বিক্রিবাট্টা যখন বাড়তে থাকে, তখন আসে সপ্রমাণ বিশ্বাস।
তুর্কি স্থপতি জনাবা সেলভা গুরদোগানের কাছ থেকে যেসব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছি, তার একটি হলো নিজের ব্যবসাকে ভালো করে জানা। বিশ্বাসের স্বপক্ষে প্রমাণ পেতে হলে কাজের ভেতর-বাহির খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে হবে। স্থাপত্য প্রকৌশলের কয়েকটি শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন তিনি। বর্তমানে নগর পরিকল্পনার কিছু ময়দানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিশ্বকে। তার একটি বিখ্যাত প্রকল্প ইস্তাম্বুলে বাইসাইকেলের জন্য পরিসর নির্মাণ করা। আরেকটি হলো এই মেগাসিটির পঁচিশ লক্ষেরও বেশি গাড়ির স্থান সংকুলানের ব্যবস্থা। নিজের সামর্থ্যের ব্যাপারে বিশ্বাস থাকলে কোনোকিছুই মুসলিম উদ্যোক্তাকে থামাতে পারবে না।
হয় ১০০% বিশ্বাস থাকতে হবে, আর নয়তো ভয়। ৯৯% বিশ্বাস বলে কোনো জিনিস নেই।