📄 অবিচলতা
এটা আমার সবচেয়ে প্রিয় অধ্যায়গুলোর একটি। বিশ্বাস! সত্যিকারের বিশ্বাস আসলে কী?
আমার সাক্ষাৎকার নেওয়া সফল উদ্যোক্তাদের মাঝে নও-মুসলিমও রয়েছেন। ইসলামের পথে তাদের যাত্রাও আগ্রহোদ্দীপক। কারও কারও বিশ্বাসের সূচনা হয় স্বপ্নের মাধ্যমে। যেমন ড. আমীনা কক্সন। এরপর কুরআন খুলেই তারা দেখতে পান: 'এ এমন এক গ্রন্থ, যাতে কোনো সন্দেহই নেই।' [১]
জগতে কয়টা বই এভাবে শুরু হয়? নিজেকে সন্দেহবিহীন বলে ঘোষণা করার মাধ্যমে? এ থেকে কী বোঝা যায়, বলুন তো?
প্রথম কথা হলো, আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে পূর্ণ নিশ্চয়তা সহকারে। টালমাটাল বিশ্বাস নয়। 'হয়তো' ধাঁচের বিশ্বাস নয়; সন্দেহাতীত বিশ্বাস। এরকম বিশ্বাসটাই আমরা চাই।
ব্যবসার ক্ষেত্রে অনুসরণ করা চাই এমনই এক দর্শন। নিজেই যদি নিজের বিশ্বাসে টলায়মান হন, মানুষ কি আপনাকে বিশ্বাস করবে? তাই প্রথম ধাপ হলো নিজের বিশ্বাস তৈরি ও বৃদ্ধি করা।
দ্বিতীয় কথা, ইসলামের বিশ্বাস কোনো কুসংস্কার নয়। এটি দলীল-প্রমাণভিত্তিক বিশ্বাস। আপনার ব্যবসাকেও হতে হবে এমন।
টিকাঃ
[১] সূরা আল-বাকারাহ ২:২
📄 সাফল্যের আয়াত
মুসলিম উদ্যোক্তার মন-মানসিকতার সমষ্টি এখানেই। লক্ষ্য নির্ধারণ, পরিকল্পনা, পুনর্নির্ধারণ নিয়ে তো অনেক কথা হলো। এবার আসুন কুরআন ব্যবহার করে সত্যিকার অর্থে লক্ষ্যে পৌঁছানোর আলোচনায়।
এই নসিহতটি দিয়েছেন আমার বন্ধু এবং বহুজনের প্রশিক্ষক ইমাম আশরাফ, এনটিজি ক্ল্যারিটি ইনক-এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি এটাকে বলেন সাফল্যের আয়াত।
আগের আয়াতেই আছে, 'যে নগদ কামনা করে, তা থেকে আমি যাকে ইচ্ছে যতটুকু ইচ্ছে দ্রুত দিয়ে দিই...' [১০]
এরপর আসে সাফল্যের আয়াত, 'কিন্তু যে কামনা করে আখিরাত, আর যথাযথ চেষ্টা করে এবং একইসাথে বিশ্বাসীও বটে, তাদের প্রচেষ্টাই পায় যথাযথ মূল্যায়ন।' [১১]
কিছু অর্জনের ইচ্ছে থাকলে বিশ্বাস থাকতে হবে যে, তা আপনি পাবেন। বিশ্বাসই মানুষকে বিশেষ করে তোলে। সবকিছুই নির্ভরশীল বিশ্বাসের ওপর। মুসলিম হিসেবে আমাদের কাছে এর অর্থ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস।
অমুসলিমদের ক্ষেত্রেও কথাটি খাটবে, যদি তারা নিজেদের প্রতি এবং নিজেদের উদ্যোগ ও পণ্যের ব্যাপারে বিশ্বাস রাখে। বিক্রেতা হিসেবে আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে যে, আপনার পণ্য বা সেবা সাফল্য পাবে। মুসলিম হিসেবে বিশ্বাস রাখবেন যে, আল্লাহ আপনাকে যেসকল সামর্থ্য দিয়েছেন, সেগুলোর মাধ্যমে দেবেন সাফল্যও। যিনি বেহিসাব দান করতে সক্ষম, তিনি আপনাকেও দেবেন। বিশ্বাসের কারণেই আমরা জানি এই কথাটি। এই সেই সাফল্যের আয়াত। এর অনুসরণ করুন আর দেখুন নিজের উন্নতি।
এই আয়াত থেকে আমরা বুঝলাম যে, সাফল্য আসলে কী। এর শুরুটা হয় বিশ্বাসের দ্বারা। সাফল্য মানে বিশ্বাসভিত্তিক কর্ম।
তাই যত দ্রুত পারেন, বিশ্বাস গড়ে নিন। বেশি সময় নেবেন না। নিজের প্রতি বিশ্বাস না থাকলে মানুষ আপনার কাছে বিনিয়োগ করবে কোন ভরসায়?
জনাব সালিম সিদ্দিকির ব্যবসা শুরু হয়েছিল তার ঘরের বেজমেন্টে। তাও একেবারে বয়স যখন পড়তির দিকে। নিজেই নিজের বস হওয়ার ব্যাপারে তার বিশ্বাস ছিল। কোনো পৃষ্ঠপোষক নেই, নেই বড় অংকের টাকা। কিন্তু এগুলোকে অজুহাত বানাননি তিনি। স্রেফ বিশ্বাস রেখেছেন সাফল্যের ব্যাপারে।
এজন্যই আয়াতে সাফল্যের আগে বিশ্বাসের কথা এসেছে। এটি সবচেয়ে অমূল্য সম্পদ। এটি ছাড়া কিছুই সম্পন্ন হয় না।
তাই বিশ্বাস গড়ে না তুলেই যদি বর্তমানে কোনো ব্যবসার মালিক হয়ে থাকেন, দ্রুত এ মানসিকতা পালটে নিন। বিশ্বাসবিহীন কর্ম আসলে নিতান্ত কসরত। কেবলই স্রোতের সাথে ভেসে চলা। কিন্তু বিশ্বাস রাখলেই সবকিছু বেড়ে যাবে বহুগুণে। জিনিসটা ছোঁয়াচেও বটে! কারও বিশ্বাস ও অবিশ্বাসকে অন্যরা টের পায়। ঠিক যেভাবে হাজার মাইল দূর থেকে নারী টের পায় ভালোবাসা। এত বিশ্বাস করুন, এত বিশ্বাস করুন, যেন আপনার প্রতি আস্থাহীন মানুষেরাও বলতে বাধ্য হয়, 'মনে হয় না আপনি এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারবেন... কিন্তু... কিন্তু আপনার উন্মাদনার প্রশংসা করতে হয় বটে!' একটা না একটা সময় মানুষ আপনাকে বিশ্বাস করবে। বিশ্বাস এভাবেই কাজ করে। এটি আসলেই সংক্রামক।
টিকাঃ
[১০] সূরা আল-ইসরা ১৭:১৮
[১১] সূরা আল-ইসরা ১৭:১৯
📄 দেখা দিল টাকা
আর দশটা মানুষের সাথে মুসলিম উদ্যোক্তার প্রধান পার্থক্য আল্লাহর প্রতি এই অবিচল বিশ্বাস। এর একটি বহিঃপ্রকাশ হলো আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ তাওয়াক্কুল।
সকালে খালিপেটে বেরোনোর সময় পাখি জানে না যে, সে আদৌ কী খাবে। কিন্তু এতটুকু জানে যে, সন্ধ্যায় সে ঠিকই ভরপেটে ফিরে আসবে। পাবে পরিবারের জন্য খাবারও। আপনার জীবনটা কি এরকম? রিযকের ব্যাপারে কি আপনি এতটাই নিশ্চিত? চাকরিজীবী যেরকম বেতনের ব্যাপারে নিশ্চিত, আপনিও কি তা-ই?
ইদানীং চাকরির দিকে মানুষের ঝোঁক বেশি হওয়ার কারণ এটাই। মাস শেষে নিশ্চিত বেতন। অর্থ উৎপাদনের ব্যাপারে নিজেদের প্রতি কিন্তু তাদের আস্থা নেই। কিন্তু আস্থা আছে যে কোম্পানির অধীনে সে কর্মরত, সেটার প্রতি।
মুসলিম উদ্যোক্তা হিসেবে আপনাকে এতটাই নিশ্চিত হতে হবে ব্যবসার মাধ্যমে রিযক আসার ব্যাপারে। চাকরিজীবীর সাথে আপনার পার্থক্য এখানেই।
ইমাম আশরাফ যখন ব্যবসামন্দার সময় অধীনস্তদের বেতন দিতে পারছিলেন না, তখনও তিনি তাওয়াক্কুল হারাননি। তিনি নিজেও প্রচুর ইস্তিগফার করেছেন, অফিসের সবাইকেও বলেছেন তা করতে। নিজের অ্যাকাউন্ট্যান্টকেও। কিছুদিনের মাঝেই দেখা দিলো টাকা। তাই আল্লাহর কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করুন, আর দেখুন ভালো ফলাফল কীভাবে আসে।
তাওয়াক্কুল রাখতে হবে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ আপনার উপকার করতে সক্ষম নয়। উদ্যোক্তা হিসেবে নিজ নিজ কাজ করার সময় এ ব্যাপারটি মাথায় রাখবেন।
মুজীবুর রহমান যখন কারাগারে, তার পরিবারের জীবন যখন হুমকির মুখে, পরিচিত কেউ কোনো সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেনি। জীবনের এই ক্রান্তিলগ্নে তিনি সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করেন যে, আল্লাহই একমাত্র ত্রাতা। তার মানে পরিচিতির পরিসর বাড়াতে হবে বটে, কিন্তু নিয়্যাত থাকতে হবে সঠিক। মানুষ আপনার উপকার করতে পারে না; না পারে অপকার করতে। সবই আল্লাহর ইচ্ছাধীন।
📄 বিশ্বাসের কর্মপন্থা
আগেই বলেছি যে, বিশ্বাসবিহীন কর্ম নিতান্ত কসরত। কিন্তু বিশ্বাসকে আসলে কীভাবে কাজে লাগাতে হয়? দেখুন, ভয় জিনিসটা স্রেফ আমাদের মাথার ভেতর। বাস্তবতা ভিন্ন। তাই ভয় ও অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার নাম বিশ্বাস। উদ্যোগের ক্ষেত্রেও একই কথা।
নিজের ব্যাপারে নেতিবাচক কথা বলাও পরিহার করতে হবে। ইতিবাচক কথার সাথে সাথে বাড়ে বিশ্বাস।
আমেরিকার প্রথম বিখ্যাত 'মুহাম্মাদ' নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ আলি। ইসলাম কবুলকারী এক আফ্রিকান আমেরিকান বক্সার। ষাটের দশক থেকে শুরু করে আশির শুরু পর্যন্ত বিশ্বসেরা বক্সার ছিলেন তিনি। ১৯৬৪ সালে তরুণ আলি মুখোমুখি হয়েছিলেন তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন সনি লিস্টনের। সেসময়কার একটি উক্তি মুহাম্মাদ আলিকে স্মরণীয় করে দেয়, 'আমিই সেরা।' সেরার পক্ষে তো পরাজিত হওয়া অসম্ভব, হোক তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। কথার এই ক্ষমতাকে ব্যবসাতেও ব্যবহার করুন।