📄 পরিকল্পনার ছক
লক্ষ্য ঠিক হলো, কল্পনা হলো, প্রত্যয় হলো, লোভ হলো। প্রায় পৌঁছে গেছেন বলে! এবার দরকার একটা সুন্দর পরিকল্পনা। আমার দেখা সফল উদ্যোক্তারা প্রাধান্য দেন সম্ভাব্য দ্রুততম পথকে। পারতপক্ষে তারা দীর্ঘতর পথগুলো না মাড়ানোর চেষ্টা করেন। সঠিক মানুষকে সঠিক প্রশ্নটি করে এ পথ চিনে নেওয়া সম্ভব। তাহলেই গ্রহণ করা যায় সঠিক কর্মপরিকল্পনা। অন্যরা সাহায্য করলেও পুরো পরিকল্পনা তৈরি করে দেবে না। আপনি নিজেকে চেনেন, নিজের সামর্থ্য জানেন। জানেন আপনার পক্ষে কতটুকু কী করা সম্ভব।
লক্ষ্যের মতো পরিকল্পনাও হবে বাস্তবসম্মত। প্রতিদিন কী করবেন, তা টুকে রাখুন। কিন্তু চাপ নেবেন না। হতে পারে দিনে আট ঘণ্টা কাজ। হতে পারে প্রতিদিন দুজন মানুষকে ফোন করা। অথবা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমানো, বিনিয়োগের জন্য সঞ্চয় ও নিজের ব্যবসা শুরু করা। সে যা-ই হোক, এমন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, যা আপনি বাস্তবায়ন করতে পারবেন বলে বিশ্বাস করেন। এরপর শুরু করুন পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ। হ্যাঁ, কর্ম করতে হবে বলেই তো কর্মপরিকল্পনা! সে কথা পরে আসবে।
পরিকল্পনার কথা আগে শেষ করা যাক। পরিকল্পনা হতে হবে ক্রমবর্ধমান। ধরুন পরের মাসে আপনি এই পরিমাণ টাকা রোজগার করতে চান। পরের মাসের লক্ষ্য হবে এর চেয়ে বেশি। পরিকল্পনা যা-ই হোক, তা ঊর্ধ্বমুখী হওয়া চাই। আধুনিক যুগে বহুল প্রচারিত একটি ভুল ধারণা হলো সাফল্য হুট করে অর্জন করা সম্ভব। এ কারণেই আজকাল লটারি এত বিখ্যাত। কিন্তু হালাল পদ্ধতিতে লটারি জয়ের উপায় হলো আয়কে ক্রমবর্ধমান করা। ধরুন, তিন বছরে দশ লাখ ডলার কামাতে চান। তাহলে প্রথম ছয় মাসে ৫,০০০ ডলার করে কামানোর পর পরের ছয় মাসের জন্য পরিকল্পনা থাকতে হবে ১০,০০০ করে উপার্জনের। এরকম ক্রমবর্ধমান ও বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনাই পারে সাফল্য এনে দিতে।
📄 দ্রুততম রাস্তা
অনুপ্রেরণা অনেকটা গোসল করার মতো। নিয়মিত নিতে হয়। তবে যে জিনিসটা স্বপ্ন ও লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দেয়, তা হলো প্রত্যয়। প্রত্যয়ী মানুষ দুঃসময়ে হাল ছাড়ে না। আর দুঃসময় এমন এক জিনিস, যা কখনও না কখনও আসবেই।
এনটিজি ক্ল্যারিটি'র সিইও ইমাম আশরাফের ব্যবসায় একসময় বিরাট মন্দা দেখা দেয়। কর্মচারীদের বেতনই দিতে পারছেন না, লাভ তো দূরের কথা। কিন্তু স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন তিনি তখন। বিশ্বাস রেখে দুআ করেছেন। আর প্রচুর ইস্তিগফার করেছেন। ইস্তিগফারের মাধ্যমে সম্পদ বাড়ে। বলতে গেলে জাদুর মতো টাকা ফিরে আসে তার হাতে। কারণ তিনি প্রত্যয়ী ছিলেন। বলে বসেননি, 'ধুর! চাকরিতে ঢুকে যাই।' অথবা 'এই ব্যবসা বাদ দিয়ে অন্যটা ধরি।' লেগে থেকে কার্যোদ্ধার করেছেন। সাফল্য আসে কিছু মূলনীতি মেনে, জাদু দিয়ে নয়। হলটন বাগস যেমনটি বলেছেন, 'চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় থাকলে মন-মেজাজ সুস্থিরতা লাভ করে।'
দৈনিক যেসব কাজ ও শৃঙ্খলা আপনাকে ধাপে ধাপে সাফল্যের দিকে নিয়ে চলে, সেগুলোর ব্যাপারে প্রত্যয়ী থাকতে হবে। এমনটা করলে অস্থিরতা থাকবে না। কারণ ফলাফলের পরোয়া থাকবে না তখন। মনোযোগ থাকবে প্রক্রিয়ার দিকে। যেটা করা উচিত, সেটা করছেন জেনেই শান্ত থাকবে মন। অন্যথায় হৃদয় অস্থির হয়ে থাকবে। নিজের প্রতি বাড়বে দুঃখ-বিতৃষ্ণা। চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় থাকা মানে পিছিয়ে না আসা। পিছিয়ে না আসা মানে অনন্তর সামনে চলা। আর সামনে এগিয়ে চলাই যদি হয় একমাত্র পথ, তবে পরাজয়ের কোনো সুযোগ নেই। পরাজয়ের সুযোগ না থাকে মানে সাফল্য অবশ্যম্ভাবী। তাই চলতে থাকুন! সাফল্য সুনিশ্চিত।
📄 যারা জানে, তাদের জিজ্ঞেস করা
সকলেই চায় সঠিক কর্মসঙ্গী বেছে নিতে। লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করে তারা। জীবনে আপনার যা কিছু চাওয়া, আল্লাহ তার প্রতিটিই অন্য কাউকে না কাউকে দিয়ে রেখেছেন। শিশুর দরকার যত্ন। পিতামাতা যেটা দিতে সক্ষম। শিক্ষার্থীর দরকার শিক্ষা। তা দেওয়ার মতো জ্ঞান আছে শিক্ষকের। ব্যবসার জগতটাও এমনই। অনেকেই সাহায্য-পরামর্শ চাইতে কুণ্ঠিত। অথচ এতে লজ্জার কিছু নেই। আপনার যেমন সাহায্য লাগবে, বিনিময়ে আপনিও একসময় অন্যদের সাহায্য করবেন।
তাই খুঁজে নিন এমন সাহায্যকারীদের। আল্লাহর কাছে দুআ করুন, যেন তিনি সঠিক মানুষদের সাথে আপনার সাক্ষাৎ করিয়ে দেন। সফল মুসলিম উদ্যোক্তাদের এই আরেক অভ্যাস। তার মানে আপনারও এই অভ্যাস করা উচিত। আল্লাহর কাছে সঠিক মানুষ, সঠিক সুযোগ ও সঠিক সময় চান। আর দেখুন কী হয়।
📄 লক্ষ্য পুনর্নির্ধারণ
সফল হতে হলে গন্তব্যকে মাথায় রেখে যাত্রা শুরু করতে হয়। একসময় না একসময় সেখানে পৌঁছেই যাবেন। ব্যর্থ হলেও তা সাময়িক মাত্র। ধরা যাক, আপনার লক্ষ্য এক বছরে 'ক' পরিমাণ টাকা উপার্জন। বছর শেষ, কিন্তু কোনো কারণে ওই পরিমাণ টাকা আসেনি। সমস্যা নেই। লক্ষ্য পুনঃস্থাপন করুন। নির্ধারণ করুন নতুন সময়সীমা। আবারও সময় পেরিয়ে গেলে আবারও একই কাজ করুন। আপনি নিজেই নিজের বস। নিজেকে বরখাস্ত করার তো কিছু নেই। মানিয়ে নিন, সামলে নিন। আজ হোক বা কাল, লক্ষ্য অর্জিত হবেই। দ্রুত লক্ষ্যে পৌঁছানোর আরেকটি সহায়ক হলো সর্বনিম্ন কাজ করে থেমে না যাওয়া। যদি একটি পণ্য বিক্রি করতে পাঁচজনকে কল করার প্রয়োজন হয়, তাহলে দশ বা বিশজনকে কল দিন। নিম্নসীমাকে নিজের ঊর্ধ্বসীমা বানাবেন না।
ধরুন কোটিপতি হয়েই গেলেন। তারপর? সব ছেড়েছুড়ে সোফায় আস্তানা গাড়বেন? এরকমটা বহু অলিম্পিক অ্যাথলেটের ক্ষেত্রে হয়েছে। তাদের লক্ষ্যই ছিল অলিম্পিকে একটা স্বর্ণপদক জয়। হয়ে গেছে, ব্যস শেষ! আপনিও আপনার মেডেল পেয়ে গেছেন। তাতে কী? লক্ষ্য পুনর্নির্ধারণকে অভ্যাসে পরিণত করা উচিত। একটা লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে? ভালো কথা, আনন্দ করুন! এরপর নতুন লক্ষ্য বানান। আগে এক কোটি ছিল? এবার হবে দশ কোটি, বিশ কোটি। পাঁচ হাজার মানুষকে আর্থিক মুক্তি দিয়েছেন? এবার তাহলে দশ হাজার জনের কর্মসংস্থান করুন। ঠিক জনাব শাহজাদ আজগরের মতো। পাকিস্তানে তিনি নিজস্ব পোশাক কারখানার মালিক। দশ হাজার মানুষের বেতনের দায়িত্ব তার হাতে। এ এক অসাধারণ অর্জন! আপনি কি বর্তমানে একশ জন মানুষের কর্মসংস্থানকারী? লক্ষ্য উঁচু করুন, এক হাজার! এখন দশ কোটি কামাই করছেন? এক বিলিয়নের জন্য তৈরি হোন! অসুবিধে কী? আল্লাহর ভাণ্ডার নিঃসীম।
নাসা একবার টের পেল যে, তাদের অবসরপ্রাপ্ত নভোচারীরা সোফাবাসী হয়ে যাচ্ছেন। একবার যখন মহাশূন্যে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ করে ফেললেন, এরপর জীবনে আর কিছু করার বাকিই রইল না তাদের। কারও কারও শেষ পরিণতি হয়েছে অপরাধে জড়িয়ে পড়া। তাই নভোচারীদের উচ্চতর লক্ষ্য পুনর্নির্ধারণের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করল নাসা। প্রতিবার আগেরবারের চেয়ে ভালো করতে হবে। এভাবে একসময় সমাধা হয় সমস্যাটি। স্কুলে সারাবছর সর্বোচ্চ মার্কস পাওয়া আঁতেলগুলোর কথা মনে আছে? ব্যবসার জগতে তারা সাধারণত ভালো করে না। কারণ তাদের লক্ষ্য এককালীন শেষ। সাফল্য কোনো উপলক্ষ্য নয়, বরং প্রক্রিয়া। একে উপভোগ করুন। একসময় যেটাকে সাফল্য ভাবতেন, তাতে পৌঁছে গিয়ে থাকলে শোকর করুন। তারপর নির্ধারণ করুন উচ্চতর লক্ষ্য। এভাবেই চলতে থাকুন। সর্বোচ্চ সাফল্য পাওয়ার চেষ্টা করা মুসলিম মাত্রেরই বৈশিষ্ট্য। জান্নাতের উচ্চতম স্তর জান্নাতুল ফিরদাউস। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন যে, জান্নাতের জন্য দুআ করলে ফিরদাউসের দুআ করতে। অল্পে থেমে যাবেন না। এর মানে এই না যে, নিম্নতর লক্ষ্যগুলো অর্জনের পর মুখ গোমড়া করে রাখতে হবে। প্রতিটি অর্জনকে উদযাপন করুন। ছোট ভাববেন না কোনোটিকেই। মানুষকে জানান। জানান যে, আল্লাহ আপনাকে কোনো একটি নিয়ামাত দিয়েছেন। ব্যবসায় উন্নতি হচ্ছে? পরিবারের সাথে উদযাপন করুন সেটা। স্ত্রীকে কিছু কিনে দিন। নিয়ামাত উপভোগ করলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছোট হয়ে যাবে না।