📄 ভারোত্তোলন রহস্য
কারণ ছাড়া কেউ কিছু করে না। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য এই 'কেন'টা বোঝা জরুরি। বিজয়ের জন্য দৃঢ়প্রত্যয়ী হতে হলে সঠিক মনস্তত্ত্ব ধারণ করা চাই। যা করছেন তা কেন করছেন, সেটা জানা না থাকলে বেশিদিন আগ্রহ পাবেন না কাজে। 'কেন'র শক্তিশালী উত্তর না থাকলে উদ্যোক্তা অল্প কদিন পরই ব্যবসাপাতি গুটিয়ে চাকরিতে ঢুকে যাবে।
লক্ষ্য নির্ধারণের ব্যাপারে আমরা কথা বলেছি। আশা করি এতক্ষণে করে নিয়েছেন তা। এরপরের কাজ হলো লক্ষ্যের সাথে আবেগের সংযোজন। উদ্দেশ্য হাসিল করতে হলে এর সাথে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ আবেগের পরশ জড়িয়ে রাখতে হবে। কাঠখোট্টা জ্ঞান দিয়ে সব চলে না। জ্ঞান তো কেবল তথ্য। সবাইকে আন্দোলিত করতে পারে না এটি। আপনার দরকার ব্যবহারিক জ্ঞান। তত্ত্ব থেকে ব্যবহারিকের দিকে যাওয়ার জন্য যে বেগ প্রয়োজন, তা আসবে আবেগ থেকে।
'কেন'র উত্তর জানা থাকলে 'কীভাবে'র উত্তর এমনিই চলে আসে। ধরা যাক, আপনি কোনো ইন্টারনেট ব্যবসা শুরু করতে চান। এই চাওয়ার কারণ জানা থাকার অর্থ সেটার প্রতি আপনার আবেগ আছে। আছে বলেই তার পেছনে দিন-রাত কাজ করবেন আপনি। একসময় বের করেই নেবেন সে কাজের সবরকম পদ্ধতি ও কৌশল।
একবার এক নারীর ছোট্ট সন্তানটি গাড়ির নিচে আটকে যায়। নারীটি খালি হাতে একাই গাড়িটি উঁচু করে তুলে ফেলেন! উদ্ধার করে আনেন বাচ্চাকে। এ কাজের জন্য কিন্তু তাকে ভারোত্তোলনের নিয়ম-কানুন নিয়ে পড়াশোনা করতে হয়নি। প্রয়োজন পড়েনি জিমে গিয়ে পেশী শক্ত করার। ঘটনার আকস্মিক মুহূর্তে স্রেফ আবেগের শক্তিতে কাজটা করে ফেলেছেন তিনি। তিনি জানতেন এই কাজের পেছনের 'কেন'টা। চোখের মণি সন্তান গাড়ির নিচে চাপা পড়ে আছে। এই ঘটনার পরে কিন্তু তিনি আর এভাবে কোনো গাড়ি তুলতে পারেননি। তখন তো আর আগের সেই কারণ উপস্থিত নেই। বুঝেই পারছেন কাজ সমাধা করার পেছনে আবেগের গুরুত্ব কতটা বাস্তব। তাই কাজের জন্য কারণ খুঁজে নিন। হোক তা আপনার পরিবার বা নিজের অভাবমুক্তি।
সুবিখ্যাত অ্যাপোলো-১১ প্রোগ্রামে কাজ করেছেন মিশরীয় বিজ্ঞানী ড. ফারুক এল বায। তার সাথে এ ব্যাপারে কথা বলেছি আমি। তার 'কেন' হলো তার দুই কন্যা। ওদের মুখে খাবার জোগানো লাগবে। এই ইচ্ছার কারণেই অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা সামলাতে পেরেছেন তিনি। বাগিয়ে নিয়েছেন প্রথম চন্দ্রাভিযান প্রকল্পে অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদোন্নতি। এবার বলুন, আপনার 'কেন'টা কী?
📄 অতল থেকে অট্টালিকা
লালসা শব্দটির সাথে একধরনের নেতিবাচক দ্যোতনা জুড়ে গেছে। দুনিয়ার লোভ খারাপ জিনিস, এ কথা সত্য। আল্লাহ তাআলা দুনিয়ালোভীকে এমন এক কুকুরের সাথে তুলনা করেছেন, যার জিব সব সময় মুখ থেকে বেরিয়ে থাকে। এখন আপনাকে দেখাব যে, উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য সঠিক প্রকারের লালসা ধারণ করা কতটা জরুরি। যেই নেতিবাচক লোভ আমাদেরকে দুনিয়ার দাসে পরিণত করে, সঠিক লোভ পারে সেখান থেকে মুক্তি দিতে।
লোভ ছাড়া প্রয়োজনীয় আবেগ ধরে রাখা অসম্ভব। যাত্রা অবশ্যই কঠিন। কিন্তু ভেতরের ওই লালসাটাই কঠিনকে করে দেবে সহজ। দূর করবে কাজের ক্লান্তি। জোগাবে রাত জেগে স্বপ্ন বাস্তবায়নের শক্তি। দেবে আপন হাতিয়ার শানানোর উদ্যম। একসময় ক্লান্তি টের পাওয়াই ভুলে যাবেন।
জনাব মুহাম্মাদ সালিম সিদ্দিকি একজন সফল অ্যাকাউন্টেন্ট হওয়ার পাশাপাশি নিজস্ব ব্যবসার মালিক। একটি ফার্মে আঠারো বছর ধরে নিষ্ঠা সহকারে কাজ করার পর হঠাৎই চাকরি হারিয়ে বসেন। কোম্পানির অবস্থা খারাপ হয়ে গেলে এই দুর্ভোগ অনেককেই পোহাতে হয়। অনিশ্চিত চাকরিজগতের দুঃখজনক বাস্তবতা এমনই। কিন্তু সালিমের লোভ ছিল সাফল্যের প্রতি। ছিল পরিবারের অন্ন জোগানোর লালসা। এমনকি কপর্দকহীন এই অবস্থাতেও। তিনি ও তার স্ত্রী সিদ্ধান্ত নিলেন বাসার বেজমেন্ট ব্যবহার করে অ্যাকাউন্টিং ব্যবসা শুরু করার। প্রথম ক্লায়েন্ট পাওয়ার জন্য ধৈর্য ধরে দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়েছে। প্রথম ফোনকল পাওয়ার পর তাদের খুশি আর দেখে কে! এরপর বাকিটা ইতিহাস। এখন তাদের বসবাস এক বিশাল অট্টালিকায়। অন্য উদ্যোক্তাদের জন্য তারা এক অনুপ্রেরণার নাম। তাই লোভী হোন। সামনে এগোনোর জন্য এর দরকার আছে।
লালসা থাকলেই ইচ্ছেশক্তি মগজে গেঁড়ে বসে। উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট সময় ধরে রাখা যায় সে শক্তিকে। বেশিরভাগ সফল ব্যবসায়ীকেই দেখেছি নিজ নিজ কাজে দশ, পনেরো, বিশ বছর ধরে একটানা লেগে থাকতে। কারণ সে কাজের প্রতি তাদের ভালোবাসা ও উচ্চাশা রয়েছে। সে সংক্রান্ত সব তথ্য-উপাত্ত তাদের নখদর্পণে। ভালোবাসা না থাকলে একবার এই ব্যবসায়, আরেকবার ওই ব্যবসায় লাফিয়ে বেড়াবেন। এটা সাফল্যের চৌকস পদ্ধতি নয়। স্থির থাকুন। খুঁজে নিন ওই ময়দানের সফল মানুষদের। এভাবেই সফল হতে হয়।
📄 লক্ষ্য বনাম শখ
লক্ষ্যকে চোখের সামনে রাখার কথা প্রায়ই শোনা যায়। সবচেয়ে ভালো হয় আক্ষরিক অর্থেই চোখের সামনে রাখলে। নিজের লক্ষ্যের কথা লিখে রাখুন। এর ফলে প্রত্যয় দৃঢ় হয়। আপনাআপনি একটা চেষ্টা চলে আসে নিজের মনে। তারপর সেই লেখা এমন জায়গায় রাখুন, যেখানে তা চোখে পড়বে প্রতিদিন।
ফ্রান্সের শ্রেষ্ঠ প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিপরীক্ষা দেওয়ার সময়ের কথা। এর জন্য আমার মনে এত অদম্য বাসনা ছিল যে, তার একটি ছবি এঁকে পড়ার টেবিলের সামনে সেঁটে রাখলাম। নিচে লেখা, 'ছুটে চলো!' প্রতিদিন অঙ্ক করতে বসলেই চোখে পড়ত ছবিটি। আপনার জন্যও একই কথা প্রযোজ্য। সত্যিই যদি কোনোকিছুকে লক্ষ্য বানিয়ে থাকেন, তাহলে আপনাআপনি মন সেদিকে ছুটবে। লক্ষ্য-নির্ধারণের ওপর লেখা কোনো বইপত্র না পড়েই তা করতে পেরেছি আমি। যেন এমনটা করতে পারাই স্বাভাবিক। সফল মানুষেরা এমনটিই করেন।
তবে লক্ষ্য হতে হবে সুনির্দিষ্ট। প্রচুর টাকার মালিক হতে চাইলেই হবে না। ঠিক কত টাকা চান, ঠিক করুন। দশ লক্ষ? পঞ্চাশ লক্ষ? এক কোটি? দশ কোটি? তারপর নির্ধারণ করুন সময়কাল। স্বল্পমেয়াদী হোক বা দীর্ঘমেয়াদী, হতে হবে বাস্তবসম্মত। নাহলে লক্ষ্যকে আজগুবি ও নিরর্থক মনে হবে। শেষ ধাপটা অত বেশি আপনাআপনি হবে না। তা হলো লক্ষ্য অর্জিত হয়ে যাওয়ার পর কতটুকু ভোগ করবেন, তা নির্ধারণ। ধরুন এক লোক মানবসেবায় জড়িত। কোনো এলাকা বা জনগোষ্ঠীর সাহায্যার্থে সে এক কোটি টাকা জোগাড় করতে চায়। সে বলল, 'যদি এক কোটি টাকা পাই, তাহলে এর পুরোটা এতিমদের সেবায় দান করে দেবো।' বিশ্বাস হয়? আসলেই কি সে এই লক্ষ্য পূরণ করবে? সম্ভাবনা কম। দিনশেষে ব্যর্থ হয়ে সে বলবে, 'যা-ই হোক, চেষ্টা তো করেছি।' নিজের কিছু হাসিল হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে কাজও এগোয় না। মনে রাখবেন, 'লক্ষ্য ও শখ এক জিনিস নয়।'
লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে শাস্তি ও অর্জিত হলে পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখুন নিজের জন্য। নাহলে তা সমাধা করা কঠিন হয়ে যাবে। লক্ষ্য অর্জনের কোনো চেষ্টাই থাকবে না আপনার মাঝে। নিজেকে কিছু দিন, সে যা-ই হোক। মজাদার কেক, কোথাও ঘুরতে যাওয়া, জীবনসঙ্গীর সাথে এক সপ্তাহের ছুটি কাটানো অথবা আগেরটার চেয়ে ভালো নতুন একটা গাড়ি। নিজের পাওনা ঠিক রাখুন আর দেখুন কী হয়। ছোট থাকতে আমার লক্ষ্য ছিল ক্লাসে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া, বিশেষত গণিত আর পদার্থবিজ্ঞানে। যতবার ২০-এ কমপক্ষে ১৮ পেতাম, ততবার আব্বা আমাকে টাকা দিতেন। এই টাকার জন্য এত উত্তেজিত থাকতাম যে, ছাদ ফুঁড়ে যেতে থাকে আমার পারফরম্যান্স! মুসলিম উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার জন্যও এ কথা খাটে। একেকটি ধাপ সম্পন্ন করতে পারলে নিজেকে ইনাম দিন।
📄 পরিকল্পনার ছক
লক্ষ্য ঠিক হলো, কল্পনা হলো, প্রত্যয় হলো, লোভ হলো। প্রায় পৌঁছে গেছেন বলে! এবার দরকার একটা সুন্দর পরিকল্পনা। আমার দেখা সফল উদ্যোক্তারা প্রাধান্য দেন সম্ভাব্য দ্রুততম পথকে। পারতপক্ষে তারা দীর্ঘতর পথগুলো না মাড়ানোর চেষ্টা করেন। সঠিক মানুষকে সঠিক প্রশ্নটি করে এ পথ চিনে নেওয়া সম্ভব। তাহলেই গ্রহণ করা যায় সঠিক কর্মপরিকল্পনা। অন্যরা সাহায্য করলেও পুরো পরিকল্পনা তৈরি করে দেবে না। আপনি নিজেকে চেনেন, নিজের সামর্থ্য জানেন। জানেন আপনার পক্ষে কতটুকু কী করা সম্ভব।
লক্ষ্যের মতো পরিকল্পনাও হবে বাস্তবসম্মত। প্রতিদিন কী করবেন, তা টুকে রাখুন। কিন্তু চাপ নেবেন না। হতে পারে দিনে আট ঘণ্টা কাজ। হতে পারে প্রতিদিন দুজন মানুষকে ফোন করা। অথবা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমানো, বিনিয়োগের জন্য সঞ্চয় ও নিজের ব্যবসা শুরু করা। সে যা-ই হোক, এমন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, যা আপনি বাস্তবায়ন করতে পারবেন বলে বিশ্বাস করেন। এরপর শুরু করুন পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ। হ্যাঁ, কর্ম করতে হবে বলেই তো কর্মপরিকল্পনা! সে কথা পরে আসবে।
পরিকল্পনার কথা আগে শেষ করা যাক। পরিকল্পনা হতে হবে ক্রমবর্ধমান। ধরুন পরের মাসে আপনি এই পরিমাণ টাকা রোজগার করতে চান। পরের মাসের লক্ষ্য হবে এর চেয়ে বেশি। পরিকল্পনা যা-ই হোক, তা ঊর্ধ্বমুখী হওয়া চাই। আধুনিক যুগে বহুল প্রচারিত একটি ভুল ধারণা হলো সাফল্য হুট করে অর্জন করা সম্ভব। এ কারণেই আজকাল লটারি এত বিখ্যাত। কিন্তু হালাল পদ্ধতিতে লটারি জয়ের উপায় হলো আয়কে ক্রমবর্ধমান করা। ধরুন, তিন বছরে দশ লাখ ডলার কামাতে চান। তাহলে প্রথম ছয় মাসে ৫,০০০ ডলার করে কামানোর পর পরের ছয় মাসের জন্য পরিকল্পনা থাকতে হবে ১০,০০০ করে উপার্জনের। এরকম ক্রমবর্ধমান ও বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনাই পারে সাফল্য এনে দিতে।