📄 দূরদৃষ্টি
নিয়্যাত সঠিক থাকা মানে আপনি সাহায্য গ্রহণের জন্য প্রস্তুত। এবার সেটা আসমানী সাহায্যও হতে পারে, ব্যবসা সহযোগীদের সাহায্যও হতে পারে। কী করছেন, কেন করছেন এবং করার মাধ্যমে বাজারে কী অবদান রাখতে চাচ্ছেন—এসব জেনে রাখুন আগে থেকেই। নিজের ব্যবসা, পণ্য ও সেবা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান রাখুন। জেনে নিন ব্যবসাটি শুরু করার সঠিক সময় কখন। শুরু করবেন সঠিক নিয়্যাত সহকারে। মাঝপথে দিকপরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য থাকবে অটুট।
আমাকে সাক্ষাৎকার দেওয়া উদ্যোক্তাদের মাঝে এ বিষয়টি দেখেছি। যেমন: অক্সফোর্ড প্রেস পাকিস্তানের পরিচালক জনাবা আমীনা সাঈদ। শুরু থেকেই জানতেন যে, প্রধান সম্পাদক ও বই প্রকাশক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চান তিনি। জানতেন বলেই আজ তিনি এত সফল। শুরু করেছিলেন নিজস্ব বই বিতরণ কোম্পানির মাধ্যমে। এখন তিনি পাকিস্তানে একটি বিশাল আন্তর্জাতিক প্রকাশনীর শাখা প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত। বোঝা গেল যে, ফল পড়লে গাছের কাছেই পড়ে। সঠিক নিয়্যাত নিয়ে শুরু করলে একসময় তা ঘূর্ণিবাতের মতো আপনাকে নিয়ে যাবে সাফল্যের কাছে। লক্ষ্য ও স্বপ্ন স্থির রাখতে সাহায্য করবে এটি।
📄 স্বচ্ছ মন
আজকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জ্বালায় মনকে শান্ত রাখাই দায়। অনেক আইডিয়া একসাথে মগজে ঢুকে সেটাকে পরিণত করে বিতিকিচ্ছিরি জঙ্গলে। পক্ষান্তরে আমার দেখা সফল মানুষদের মন শান্ত-পরিচ্ছন্ন। ধারণা পরিষ্কার না থাকলে সাফল্য পাবেন কীভাবে? পরিকল্পনা তৈরি, জটিল সমস্যা সমাধান বা নতুন ব্যবসায়িক বুদ্ধি পাওয়ার জন্য মন শান্ত থাকা চাই। নতুন কিছু শেখা বা ব্যবসায়িক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এমনকি এই বইটি লেখার সময়ও আগে আমাকে মাথা ঠান্ডা করতে হয়েছে। মনোযোগ ছাড়া কোনো কাজই হয়ে ওঠে না আসলে।
একজন আলিমের সাথে কথা বলছিলাম। তিনি জানালেন যে, শৈশব মানে দিবাস্বপ্ন আর অশান্ত মনের ছোটাছুটি। যখন থেকে মানুষ চিন্তার লাগাম ধরতে এবং হাতের কাজে মনোযোগ দিতে শেখে, সেটাকেই বলে বয়ঃপ্রাপ্তি। মনোযোগের এই শক্তিকে ব্যবহার করতে পারেন আপনার উদ্যোগে। প্রথমে ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের একটি চিত্র এঁকে নিন মনে মনে। আপনার চাওয়া কী? নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা? ব্যবসায় নির্দিষ্ট পরিমাণ মুনাফা? মালিকানাধীন দোকানটা কীভাবে সাজাতে চান? কেমন হবে আপনার স্বপ্নের বাড়িটি? মনে মনে এই সবকিছুর স্পষ্ট ছবি এঁকে নিতে হবে। এটি সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
দ্বিতীয় ধাপ হলো নিজেকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের অধিকারী হিসেবে দেখা। সুন্দর একটি বাড়ির মালিক, সুদৃশ্য জায়গায় আনন্দভ্রমণরত ব্যক্তি, নির্দিষ্ট পেশার অধিকারী, নিজ বিষয়ের বিশ্বসেরা বিশেষজ্ঞ—যেটাই হোক। নিজেকে ওই কাজে রত হিসেবে চিন্তা করলেই সেটার বাস্তবায়ন সম্ভব। বাচ্চাদের দেখুন। সব সময় বড়দের নকল করতে থাকে তারা। এভাবে প্রতিদিন তারা দক্ষ হয়ে ওঠে নতুন নতুন কাজে। আমার ভাতিজাদের দেখি দুই বছর বয়স থেকে তিন তিনটে ভাষা প্রায় অনর্গল বলতে শিখে যায়। হয়তো মনে মনে ভাবে, 'সবাই যখন বলতে পারে, আমিও পারব।' আর সত্যিই পেরে ফেলে!
হয়তো এই সফল মুসলিম উদ্যোক্তাদের দেখার পর আপনিও বলবেন, 'আমিও পারব।' মুসলিমদের আরেকটি বাড়তি সুবিধা আছে: প্রতিদিন রুটিনমাফিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়। আখিরাতের লক্ষ্যকে সামনে রেখে বারবার, বারবার এর জন্য কাজ করে যাওয়া। হাতের কাজে মনোযোগ বৃদ্ধির প্রশিক্ষণও হয়ে যায় এর সাথে সাথে। সালাতে একাগ্রতা ঠিক রাখার অভ্যাস যদি থাকে, জাগতিক কাজে মনোযোগ দেওয়া কোনো ব্যাপারই না।
📄 সাফল্যের সরল পথ
চারপাশে একবার তাকান। বেশিরভাগ মানুষ জানেই না তারা যা করছে, তা কেন করছে। সকলে যেন এক অজানা পথের পথিক। পুরোনো কালের বন্ধু ইবরাহীমের (ছদ্মনাম) সাথে দেখা হলো অনেক দিন পর। প্রকৌশলবিদ্যায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছে। জিজ্ঞেস করলাম এরপর কী করার ইচ্ছা। সে বলল, এই একটা ফার্মে কাজ করে কিছু টাকা পয়সা রোজগার। অবশ্যই সম্মানযোগ্য সিদ্ধান্ত। তারপরও মনে হলো এতে কী যেন একটা নেই। সিদ্ধান্তটায় আসলে সুস্থিরতার অভাব। কত দিন ধরে কী পরিমাণ কাজ করবে, এ নিয়ে তার নির্দিষ্ট কোনো ধারণা নেই। যাচ্ছে জীবন, যাক না চলে! যুবসমাজে ইদানীং এ সমস্যা ব্যাপক। কেউ জানে না সে আসলে কী করতে চায়।
পরকালীন লক্ষ্য তো অবশ্যই আল্লাহর ইবাদাত। কিন্তু দুনিয়ার জীবনে আপনি কীসের উপযুক্ত? ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী রেখে যেতে চান? কী হবে আপনার কাজ বা অবদান? এগুলো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। উত্তরবিহীন ফেলে রাখলে একসময় ব্যর্থতা এসে হানা দেয়। ব্যবসায়ী-চাকরিজীবী সবার ক্ষেত্রে এ কথা সত্য। দুই বছর পর আবার যখন দেখা, তখনও ইবরাহীম নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কর্মরত। এখনও অপেক্ষা করছে তার কাঙ্ক্ষিত পেশার জন্য। জীবনধারণে যতটুকু লাগে, ততটুকুর জন্যই কাজ করেছে সে। আর পেয়েও গেছে অতটুকু। কিন্তু এরপর কী? তাই কী চাইছেন, বুঝেশুনে চান। ওটাই হয়ে যেতে পারে আপনার প্রাপ্তির শেষ সীমা।
হয়তো শিক্ষকতা করে আপনি সন্তুষ্টচিত্তে জীবন কাটাতে পারেন। হয়তো হতে চান অনন্যসাধারণ মা, যার হাতে গড়ে উঠবে সৎকর্মশীল মুসলিম সন্তান। অথবা হয়তো আপনার লক্ষ্য কোটিপতি হওয়া। লক্ষ্য যা-ই হোক, সেটা সুস্থির হতে হবে। হাজার হাজার লক্ষ্যের ভিড়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরলে চলবে না। কত মানুষ আজ এখানে তো কাল ওখানে চাকরি নেয়। জীবন-সায়াহ্নে হয়ে পড়ে একেবারে দেউলিয়া।
এরকম ভবিষ্যৎ না চাইলে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য তৈরি করুন। অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে খুব করে চান, এরকম কিছু। আগের পরিচ্ছেদে আমরা দেখেছি, কীভাবে প্রতিদিন লক্ষ্যকে চোখের সামনে রাখতে হয়। অন্তত একবার ওই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে তাকান। সম্ভব হলে লিখে রাখুন সেটার কথা। অথবা এঁকে রাখুন সেটার কোনো ছবি। সম্পদের জন্য অদম্য বাসনা একবার তৈরি হয়ে গেলে আর কোনোকিছুই আপনাকে থামাতে পারবে না। মন হলো চুম্বকের মতো। যথেষ্ট সময় একটি বিষয়ে চিন্তা করলে চারপাশে তা বাস্তবায়নের অসংখ্য সুযোগ চোখে পড়ে। একটা সাম্প্রতিক উদাহরণ দিই। আমার প্রশিক্ষক জনৈক মুসলিম উদ্যোক্তা। সেদিন বিকেলে গিয়েছিলাম তার ওখানে। তিনি চোখে আঙুল দিয়ে একটি বিষয় দেখালেন আমাকে। সেসময় নতুন এক ধরনের গাড়ি চালাচ্ছিলাম। তাই যখনই আশপাশ দিয়ে একই মডেলের গাড়ি যায়, সেটা চোখে ধরা পড়ে আমার। এমনকি পেছনে থাকলেও। আপনার লক্ষ্যও এরকমই। লক্ষ্যকে সারাক্ষণ চোখের সামনে রাখলে সে সংক্রান্ত সুযোগও চোখে পড়বে বেশি। মন শুধু কম্পাসের মতো সঠিক পথের দিকে তাক হয়ে থাকে। এই মনের শক্তি অবাক করার মতো। আর এটিই একমাত্র হাতিয়ার, যার ওপর আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আছে। এমনকি কঠিন পরিস্থিতিতেও মন শান্ত থাকা মানে সব নিয়ন্ত্রণে থাকা। যা ভাবতে চান, মনকে দিয়ে তা-ই ভাবাতে পারছেন। তাকে দিয়ে করাতে পারেন কাঙ্ক্ষিত নিয়্যাত। এটাই আসল স্বাধীনতা। এই সেই একমাত্র স্বাধীনতা, যা আমাদের স্রষ্টা প্রত্যেকটি মানুষকে দিয়েছেন।
📄 ১০০ কোটির ১%
আপনার চিন্তাই আপনাকে আজকের অবস্থানে এনেছে। যদি সর্বোত্তম চিন্তা করেও অপছন্দনীয় ফলাফল পান, তাহলে বদলে ফেলুন চিন্তার পুরো দর্শন। দেখুন নতুন ফলাফল আসে কি না। কী যে জানেন না, সেটাই এখনও জানেন না হয়তো। অতীতে বেশ কয়েকটি ব্যবসা চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছি আমি। অথচ প্রত্যেকটা শুরু করার আগ থেকেই যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে, কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু যতই এগিয়েছি, ততই মনে হয়েছে, 'ইশ্! অমুক অভিজ্ঞ ব্যক্তির কাছ থেকে এই এই বিষয় জেনে নিলে আরও ভালো হোতো।' যেকোনো উদ্যোগের ক্ষেত্রে এই কথা সত্য। লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে না মানে সে সম্পর্কে আপনার জানার ঘাটতি আছে। সেগুলো জানা থাকলে বেশ সহজ হয়ে যেত সাফল্য। অন্য কথায়, ধনীদের মতো চিন্তা করতে জানলে সাফল্যের সম্ভাবনা বেড়ে যেত।
এনটিজি ক্ল্যারিটির সিইও ইমাম আশরাফ। তার সাথে একবার আলোচনা করছিলাম যে, অনেক উদ্যোক্তাই একটা ঘোরের মধ্যে বাস করে। মনে করে তার নতুন ব্যবসায়িক বুদ্ধিটি এত্ত দামি যে, সবার কাছ থেকে যেকোনো মূল্যে লুকিয়ে রাখতে হবে তা। এটা ধনী উদ্যোক্তাদের চিন্তাপদ্ধতি নয়। সাধারণত ইমাম আশরাফ কোনো ব্যবসায় হাত দিলে সে কাজের যোগ্যতম ব্যক্তিটিকে খুঁজে নিয়ে নিয়োগ দেন। এভাবে সাফল্যের সাথে বাজারে তুলে আনেন উদ্যোগটিকে। তিনি খুঁজে দেখেন সম্ভাব্য দ্রুততম ও সবচেয়ে কার্যকর পথ। পক্ষান্তরে বিফল উদ্যোক্তারা থাকে লুকোচুরিতে ব্যস্ত। তাই তাদের ব্যবসাও আর বাড়ে না।
একবার এক শখের উদ্যোক্তা এল তার ব্যবসায়িক বুদ্ধি নিয়ে। চাচ্ছিল, ইমাম আশরাফ সে ব্যবসায়ে অংশীদার হোন। কিন্তু একটা সমস্যা ছিল সেখানে। সে চাচ্ছিল ইমাম আশরাফ তার সময় ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি টাকা দিয়েও শরিক হবেন। বিনিময়ে পাবেন লভ্যাংশের মাত্র ৫%। আশরাফ যে আগ্রহ পাননি, তা বলাই বাহুল্য। ওই লোকের চিন্তাপদ্ধতিই আসলে ঠিক ছিল না। একটা বিলিয়ন ডলার কোম্পানির ১% মালিকানা পেলেও আপনি কোটিপতি। পক্ষান্তরে ঋণে জর্জরিত কোনো কোম্পানির ১০০% মালিকানা মানে পুরোটাই লস। এভাবে চিন্তা করতে পারা খুবই উঁচু পর্যায়ের দক্ষতা। অংশীদারি ব্যবসা শুরু করার আগে তাই এভাবে ভেবে দেখুন। এভাবেই স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যেতে হয়।