📄 পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা
মুসলিমের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে তো অনেক কথা হলো। এ সবই বৃথা যাবে, যদি নিজেদের পরিবর্তনই করতে না পারি। ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন করা কি আসলেই সম্ভব? আজ যেমন আছি, সেভাবেই কি জন্মেছিলাম আমরা সবাই? সফল উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে আমার শেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলোর মাঝে এটি একটি। তারা সব সময়ই শিখে চলেছেন। কেউ নেতা হয়ে জন্মাননি। আবারও বলি, উদ্যোক্তা হয়ে কেউ জন্মায় না। উদ্যোক্তা তৈরি করতে হয়। মির্জা ব্রাদার্স একসময় ছোট একটি পিৎজার দোকান চালাতেন। এখন তাদের অর্ধ বিলিয়ন ডলার সম্পদের পাশাপাশি রয়েছে বিশ্বজোড়া ব্যবসা। এতে কর্মসংস্থান হচ্ছে হাজারো মানুষের, প্রভাবিত হচ্ছে আরও অনেক মানুষের জীবন। এসব কি একদিনেই হয়ে গেছে? স্যার আনওয়ার পারভেজ একসময় ইংরেজি না জানা বাস ড্রাইভার ছিলেন। সেখান থেকে বেস্টওয়ে ইউকে'র বিলিয়নেয়ার চেয়ারম্যান হয়েছেন কি এমনি এমনি?
এগুলো সবই পরিবর্তনের ফসল। পরিবর্তন ভালো। পরিবর্তনের দরকার আছে। পৃথিবী প্রতিনিয়ত পালটাচ্ছে। এই মুসলিম উদ্যোক্তাগণ কীভাবে পালটালেন? প্রথমত, অন্যের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জনের ব্যাপারে খোলামেলা হতে হবে। আগে করে অভ্যাস নেই, সুযোগ পেলে সেসব কাজ করতে হবে। থাকতে হবে পরামর্শ গ্রহণের মানসিকতা। বড় বড় অনেক ব্যবসায়ীর কোনো না কোনো প্রশিক্ষক ছিল। যারা ব্যবসায়ী পরিবার থেকে উঠে আসা, তাদের প্রশিক্ষক বাবা-মা বা বড় ভাই-বোন। তা না হলেও এমন কাউকে খুঁজে নিয়েছেন তারা। হয় প্রশিক্ষণকেন্দ্রে কোর্স করেছেন, নয়তো দূরবর্তী যোগাযোগ রেখেছেন কারও সাথে। সে যা-ই হোক, সব সময় শেখা ও উন্নতি করার মধ্য দিয়ে গেছেন তারা।
পরিবর্তনকে সম্ভব মনে করার মানসিকতাও গড়তে হবে। কিছুদিন আগে সস্ত্রীক ফ্লোরিডা গিয়েছিলাম। সেখানে অরল্যান্ডোতে এক বিশ্ববিখ্যাত চিড়িয়াখানা আছে। একটা মেরুভালুক বল নিয়ে নানারকম কসরত দেখায়। দুই পায়ে দাঁড়িয়ে নাক দিয়ে এমনভাবে বল খেলে, যেন ঝানু খেলোয়াড়। এমনকি ছোট একটা সাইকেলও চালাতে জানে সে। চিন্তা করুন! একটা ভালুক যদি প্রশিক্ষণের ফলে এতকিছু পারে, মানুষ হয়ে আপনার পক্ষে কত কী করা সম্ভব? স্রেফ ইচ্ছেশক্তির ব্যাপার। চাইলেই পারবেন।
📄 সবচেয়ে ধনী আফ্রিকান
কুরআনে সচ্চরিত্রের যত বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা, তার মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধৈর্য। অধৈর্য চিরকালই পাপের প্রবেশপথ হিসেবে কাজ করেছে। ধৈর্য হলো উদ্যোক্তার মেরুদণ্ডের মতো। ব্যর্থদের সাথে সফলদের পার্থক্য গড়ে দেয় এটিই। অন্যরা হাল ছেড়ে দিলেও ধৈর্যশীল একাই লড়ে যায়। যেকোনো সফল ব্যক্তির জীবনী পড়ে দেখুন। সেখানে ধৈর্যের একটা বিশাল অবদান পাবেনই পাবেন। এর হাত ধরেই আসে অবিচলতা ও সাফল্য।
বহু মুসলিম উদ্যোক্তার মাঝে গভীরভাবে এই গুণটি আছে। কোম মির্জার কথাই ধরুন। তিনি একসময় দশটির মতো ব্যবসায় হাত দিয়েছিলেন। একটিতেও সফল হননি। কিন্তু এতে স্বপ্ন ত্যাগ করেননি তিনি। এখন তিনি ৫০০ মিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক। কিন্তু আচার-আচরণে ধরে রেখেছেন নম্রতা ও বিনয়। জনাব ইয়াকুব মির্জা তার কোম্পানির গোড়াপত্তন করেন ১৯৮০'র দিকে। আজ পর্যন্ত তা সমহিমায় চলমান। ধৈর্য না থাকলে একটা কোম্পানি এত দিন ধরে চালানো অসম্ভব। অথচ বড় পরিসরে লাভের মুখ দেখেছেন এই তো মাত্র গত দশকে।
নাইজেরিয়ার জনাব আলিকো দাঙ্গোতে বর্তমানে আফ্রিকার বৃহত্তম উদ্যোগের মালিক। তার যাত্রাও হয়েছে একইরকম। এক বিলিয়ন ডলার জড়ো করতে তার লেগেছে বিশ বছর। অথচ পরের অল্প কয়েক বছরে তা ফুলে ফেঁপে বিশ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এসব কেন বলছি, জানেন? কারণ সবার মাঝে সাধারণ একটি বিষয় ছিল—ধৈর্য। এটা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আনা অসম্ভব। উদ্যোক্তা সঠিক মৌসুমে বীজ বপন করতে পারে কেবল। ফসলের জন্য অপেক্ষা করা লাগতে পারে ছয় মাস, এক বছর, পাঁচ বছর... যতদিন দরকার। কুরআনে সাফল্য বোঝাতে আল্লাহ তাআলা 'আফলাহা' শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এর অর্থ দীর্ঘ সময় পর সাফল্য। আক্ষরিক অর্থে আফলাহা বলতে বোঝায় দীর্ঘকাল অপেক্ষার পর কৃষক যে ফসল তোলে, সেটাকে। কৃষক কিন্তু আজ বীজ রোপণ করে আগামীকালই ফসল না পেয়ে হা-হুতাশ করে না। সে দীর্ঘ সময় ধরে বীজের যত্ন নেয়, রোপণ করে, হালচাষ করে, পানি দেয়, কীটপতঙ্গ আর আগাছা দূর করে, উৎপন্ন চারার যত্ন করে। এভাবে করে কয়েক বছর পর পায় এর বিনিময়। যেমন: কফি বীজ বপনের তিন বছর পর ফসল তোলা যায়। উদ্যোগের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা থাকা চাই। কখনও বড় ফলাফল পাওয়ার জন্য প্রতীক্ষার প্রহর হয়ে যায় কয়েক বছর। কিন্তু এই অপেক্ষা বৃথা যায় না।
📄 এক নম্বর ব্রোকার
ধৈর্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ইতিবাচক গুণ বিনয়। এটা আসলে ব্যক্তিত্বের কোনো বৈশিষ্ট্য না। বিনয় মানে কিছু একটা না থাকাকে স্বীকার করা। শিখতে প্রস্তুত থাকা। যে জানে, তার কাছ থেকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেওয়ার মানসিকতা। উদ্যোগের প্রসঙ্গে আসি। এখানে বিনয়ী হওয়া মানে কাঙ্ক্ষিত ফলাফলের অধিকারী ব্যক্তিদের কাছ থেকে শিখে নেওয়া। এই বইয়ে সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিরা সেরকমই কিছু মানুষ। কীসের বলে তারা সফল হচ্ছেন, দেখে নিন। তাদের চিন্তাপ্রক্রিয়া কেমন? এমনকি তারা নিজেরাও এই বিনয়ের গুণে গুণান্বিত। শিখতে আপত্তি নেই কারোরই।
জনাব আযিম রিজভীর সাথে কথা বলে জানলাম যে, তিনি নিয়মিত এখানে ওখানে যাতায়াত করেন। অংশ নেন ব্যবসা ও প্রযুক্তি বিষয়ক বিভিন্ন কনফারেন্সে। নিজের ব্যবসাকে এর মাধ্যমে করে তুলতে চান একবিংশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী। তার চিন্তাধারা কিন্তু খুবই উঁচু। সাফল্যের চূড়ায় বসে থেকেও তিনি জ্ঞানার্জন থামিয়ে দেননি। দুবাইয়ে বিশ্বের একমাত্র সাত তারকা হোটেলে তিনি ভ্রমণ করেছেন সেখানকার সেবার মান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে। সেই শিক্ষা এখন তিনি কাজে লাগাচ্ছেন তার আবাসন প্রকল্পের ভোক্তাদের সেবায়। প্রাপ্ত ফলাফলে স্পষ্টত দেখা যায় এই পরিশ্রমের প্রভাব। সাহায্য চাইতেও দ্বিধা করতে নেই। ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনে দাঁড়ানোর সময় মুসলিম সমাজ ও বৃহত্তর পরিসরে পুরো শহরের কাছে সাহায্য চেয়েছেন তিনি। তাই ব্যবসা বলুন বা গোটা জীবন, বিনয়-নম্রতা সাফল্যের চাবিকাঠি। তাই যথাস্থানে সাহায্য চান। তাতে ফলাফলও বাড়বে।
📄 ৫০ বছরের তরুণ
ইতিবাচক মানসিকতার আরেক উপাদান আশাবাদ। আশাবাদী মনোভাব রাখতে পারাও এক ধরনের দক্ষতা। এটি দুঃসময়ের বন্ধু। এমনকি মৃত্যুপথযাত্রী মুসলিমের দায়িত্বও মুখে লাগাম রাখা। অভিযোগ করতে শুরু না করা। যুদ্ধ, ক্ষুধা ও রোগ-বালাইয়ের সময় আশাবাদের চর্চা করি আমরা। যদিও মুখে বলা সহজ। কিন্তু একবার এই দক্ষতায় হাত পাকিয়ে নিতে পারলে বাস্তবে করাও সহজ হয়ে যাবে। আধ্যাত্মিক তো বটেই, ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ারতেও তখন সাফল্যের উঁচু স্তরে উঠে যাওয়া সম্ভব।
সফল মুসলিম উদ্যোক্তাদের মাঝে আমার দেখা অন্যতম গুণ হলো সব পরিস্থিতিতে মানুষের মাঝে ভালোটা দেখতে পারা। যেমন: দেউলিয়াত্ব, কারাবরণ-সহ আরও নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও আশাবাদী মনোভাব ধরে রেখেছিলেন জনাব মুজীবুর রহমান। সফল মুসলিম উদ্যোক্তাদের এ এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। এই পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সে এসেও তাকে মনে হয় যেন যুবক! জীবনে এত ধাক্কা খাওয়ার পরও তিনি পোশাকে ও আচরণে পরিপাটি, গোছালো। তাই জীবনে বাধা-বিপত্তি আসবেই। কিন্তু চাইলেই সেগুলোকে ভবিষ্যতের জন্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।