📘 সম্পদ গড়ার কৌশল > 📄 আশাবাদীদের দ্বীন

📄 আশাবাদীদের দ্বীন


মুসলিম উদ্যোক্তার প্রথম সম্পদ ইতিবাচকতা। মিসেস উমু এনদিয়াইর সাথে সাক্ষাৎকারের অভিজ্ঞতা বলি। তিনি সেনেগাল-ভিত্তিক একটি সফটওয়্যার ডেভেলাপমেন্ট কোম্পানির মালিক। বিভিন্ন কাস্টমস কোম্পানি ও সরকারের জন্য সফটওয়্যার নির্মাণ করে কোম্পানিটি। জন্ম ও বেড়ে ওঠা সেনেগালেই। তারপর ফ্রান্সে গিয়ে পড়াশোনা করেন ফলিত গণিত বিষয়ের ওপর। দেশে ফিরে এসে শুরু করেন ব্যবসা। দেখলেন যে, তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা সকলে হয় ইউরোপের, আর নয়তো উত্তর আমেরিকার বাঘা বাঘা সব কোম্পানি।
নিজেকে বললেন, 'এরা যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, আমিও পড়েছি সেখানেই। কিন্তু আফ্রিকার প্রেক্ষাপট আমি ভালো জানি বিদেশি কোম্পানিগুলোর চেয়ে। আমার বিশ্বাস, আমি পারব।' দামে আর মানে প্রতিযোগীদের হারিয়ে নিজের প্রথম বড় চুক্তিটি বাগিয়ে নেন তিনি। বাকিটা ইতিহাস। আজ তিনি আফ্রিকার একাধিক দেশের সাথে ব্যবসায় নিয়োজিত। পরিকল্পনা করছেন ইউরোপ ও এশিয়ার মার্কেটে হানা দেওয়ার। এ সবই সম্ভব হয়েছে তিনি নিজের ওপর আস্থা রেখেছেন বলে। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও তিনি ছিলেন আশাবাদী।
তাই মুসলিম উদ্যোক্তার চেতনা অদম্য হওয়া চাই। পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখেই হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। ইতিবাচকতার চর্চা করুন। যেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আপনাকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এনেছেন, তিনি আপনার পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণ অবগত। অবশ্যই আপনাকে সাহায্য করবেন তিনি। মুসলিম উদ্যোক্তার ইতিবাচকতার প্রধান প্রেরণা আল্লাহর প্রতি এই বিশ্বাস। তার সাথে রয়েছে কল্যাণ ছড়িয়ে দেওয়া এবং অকল্যাণ রোধ করার কুরআনি আদেশ। বারবার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে এই নির্দেশটির।
মুসলিম হিসেবে সর্বদা আপনাকে ভালোটা চিন্তা করতে হবে। এটিও নববি বৈশিষ্ট্যের অংশ। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর সাহাবিদের বলেছেন, যেন তারা অপর ভাইয়ের দোষ না বলেন। বললে পরবর্তী সাক্ষাতে মনে কুধারণার উদয় হবে তার ব্যাপারে। এর সাথে তুলনা করুন আজকাল টিভিতে দেখানো যতসব নেতিবাচকতা। বিশেষত আমাদের নিজেদের ভাইবোনদের ব্যাপারে। কাউকে এত খারাপ কাজ করতে দেখলে তার ব্যাপারে সুধারণা তৈরি করাই দুষ্কর। এ কারণেই আমার সাক্ষাৎকার নেওয়া উদ্যোক্তাগণ কেউ টিভি দেখে সময় নষ্ট করেন না। দেখলেও নিজ নিজ ক্ষেত্র সংক্রান্ত খবর জানতে অল্প কিছুক্ষণের জন্য দেখেন। টিভি দেখা মানেই খারাপ, এমনটা বলছি না। কিন্তু স্বপ্ন যাদের উঁচু, তাদের জন্য খারাপ বটে।

📘 সম্পদ গড়ার কৌশল > 📄 আস্থার নির্মাণ

📄 আস্থার নির্মাণ


নবির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একটি উপাধি বিশ্বাসভাজন (আল-আমিন)। সাহাবিদের মাঝেও প্রতিফলিত হয়েছে এই গুণ। তাই আবু বাকরের (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) উপাধি সত্যবাদী (আস-সাদীক)। এ ধরনের জীবনপদ্ধতি একেবারে সোজাসাপ্টা। কোনো ইতস্তত ভাব নেই এতে। চারিত্রিক এই গুণের গুরুত্ব বিশ্বজনীন। ওয়ারেন বাফেট আমেরিকার সফলতম বিনিয়োগকারী। তিনি একবার বলেছিলেন যে, তার পুরো ব্যবসা টিকে আছে আস্থার ভিত্তিতে। কেন? অপর পক্ষকে বিশ্বাস না করলে আপনি তার সাথে কোনো লেনদেনেই জড়িত হতেন না।
আমানাহ মিউচুয়াল ফান্ডের সিইও ড. ইয়াকুব মির্জার কাছ থেকেও জেনেছি যে, সাফল্যের প্রধান অনুঘটক আস্থা ও সততা। মানুষের সাথে কীভাবে লেনাদেনা করছেন, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ড. মির্জার বাবাও ছিলেন উদ্যোক্তা। দরকষাকষি ও চুক্তি স্থাপনের শিল্প বাবার কাছ থেকেই শিখেছেন তিনি। একবার তিনি জিম্বাবুয়েতে একটি কোম্পানির সাথে চুক্তির শর্ত কষছিলেন। দেখা গেল অপর পক্ষ এত সহজে কথা মেনে নিচ্ছে যে, রীতিমতো ফায়দা লোটা সম্ভব এখান থেকে। কিন্তু ড. মির্জা তা করেননি। কারণ সততা ও ন্যায়পরায়ণতা ঠিক রাখতে হবে। এই সততার বলেই তার কোম্পানির কাছে ছুটে আসে ৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের সম্পদ।
ড. আইক আহমেদ কানাডায় একটি বড় চক্ষুনিরাময় কেন্দ্র চালান। তিনি একজন বিশ্ববিখ্যাত গ্লুকোমা-বিশেষজ্ঞ। দিনে ছয়শ রোগী দেখেন। সৎ ও সোজাসাপ্টা আচরণের মাধ্যমে রোগীদের আস্থা গড়ে তোলা তার অন্যতম ব্যবসায়িক হাতিয়ার। কারও যদি সার্জারির প্রয়োজন না হয়, তিনি সেটা সরাসরি জানিয়ে দেন। অযথা টাকা শুষে নেন না রোগীদের কাছ থেকে।
আপনাকে বুঝতে হবে যে, চরিত্রই একসময় আপনার ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে। তাহলে এরকম নববি চরিত্র গড়ার উপায় কী? আপনার বিশ্বাস ও কর্মই হবে এর ভিত্তি। মুসলিমের চরিত্র তাই আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা। যা কিছু হবে, সব ইতোমধ্যে তাকদীরে লিখা আছে। লিখা আছে ঠিক কতটুকু আপনি রোজগার করবেন। চুরি-চামারি করে এর চেয়ে একটা পয়সাও বেশি পকেটে ঢুকানো সম্ভব নয়। এ এক প্রচণ্ড শক্তিশালী বিশ্বাস। যা পাওয়ার, তা পাবেনই। এর পাশাপাশি মুসলিমের চরিত্র ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক। তাই যা কিছু ভালো খবর পান, তা ছড়িয়ে দিন। মন্দ পরিহার করুন। মানুষকে দূরে ঠেলে দেবেন না। এটি নবিজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দেশ। নিজের ব্যবসা-সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে হলে অনুসরণ করুন এই মৌলিক নীতিমালা। স্থান ও পেশা নির্বিশেষে এগুলো আপনাকে সাফল্যের দ্বারে পৌঁছে দেবে।

📘 সম্পদ গড়ার কৌশল > 📄 সদা হাস্যোজ্জ্বল

📄 সদা হাস্যোজ্জ্বল


সাফল্যের জগতে দৃষ্টিভঙ্গি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনোকিছুকে নেতিবাচকভাবে দেখলে সেটা ওরকমই হয়ে যাবে। সেইসাথে প্রভাব ফেলবে আপনার কর্মদক্ষতায়। আর ইতিবাচক হিসেবে দেখলে বাস্তবেই হয়ে যাবে ইতিবাচক। এখন ইসলামের সাথে এর কী সম্পর্ক? নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, 'সহজ করো। কঠিন কোরো না। মানুষকে সুসংবাদ দিয়ে খুশি করো। দূরে ঠেলে দিয়ো না...' এটি একেবারে মৌলিক একটি নীতি। বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ আমাদের জন্য সহজতা চান। বিশ্বাস করতে হবে যে, আপনার জীবনে ঘটতে থাকা প্রতিটি জিনিস আল্লাহর পক্ষ থেকে। ব্যবসা ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রতিটি চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রেও একই কথা।
জনাব মুজীবুর রহমানের (সিইও, রেডকো) একটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করি। তার পরিবার ব্যবসায়ী পরিবার। শিক্ষাজীবন শেষ করেই ভাইকে সাথে নিয়ে কাতারের একটি লোভনীয় নির্মাণ ব্যবসায় যোগ দেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে হকি টিমের অধিনায়ক হিসেবে যেরকম উদ্যম নিয়ে কাজ করেছেন, ঠিক সেরকম উৎসাহ ঢেলে দেন নতুন ওই কোম্পানির পেছনে। কঠোর অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে চক্রবৃদ্ধি হারে বড় করে তোলেন ব্যবসাটিকে। কিন্তু এরপরই শুরু হয় বিপদ। ব্যবসা এত বড় হয়ে যায় যে, রাজনীতিবিদদের কুনজরে পড়ে যায় তা। দুই ভাইকে কারাবন্দি করা হয়। প্রাণসংহারী অনেক বিপদের সম্মুখীন হন মুজীব। কিন্তু তার অন্তরে ছিল কুরআনের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত, যেমন নবি ইউসুফের (আলাইহিসসালাম) কারাবরণ। এভাবে স্থৈর্য ধরে রাখলে দিনশেষে সাফল্য চলেই আসে। বর্তমানে মুজীবুর রহমান আবারও পুরোদমে ব্যবসা করছেন। আল্লাহর প্রতি ইতিবাচক বিশ্বাসের কারণে তার চেহারা সদা হাস্যোজ্জ্বল।
মুচকি হাসির জন্য সুপরিচিত ছিলেন মহানবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। তাঁকে সব সময় দেখা যেত হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল ও কর্মোদ্যমী। আর এতে প্রভাবিত হয় আশপাশের মানুষেরাও। তাই চলতে থাকুন, চলতে থাকুন! যা-ই ঘটুক, ইতিবাচকভাবে নিয়ে সামনে এগিয়ে যান। সাফল্য আসবেই।

📘 সম্পদ গড়ার কৌশল > 📄 না হলে ভালো, হলে আরও ভালো

📄 না হলে ভালো, হলে আরও ভালো


gratefulness সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। প্রথমে নিজের অবস্থান যাচাই করুন। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, 'আমি কি আসলেই অত গরিব?' যদি লিখতে-পড়তে জানেন, সেলফোনের মালিক হন, ইন্টারনেট সংযোগ ও ল্যাপটপের অধিকারী হন, তাহলেই আপনি সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণীতে পড়েন। তার ওপর আছে জগতের শ্রেষ্ঠতম সম্পদ 'আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস'। অল্পকিছু সৌভাগ্যবান মানুষের কপালে জোটে এই জিনিস। স্বাস্থ্য যদি গড়পড়তা ভালো হয়, কৃতজ্ঞ হোন। আর কী লাগে? বলুন, 'আলহামদুলিল্লাহ'। প্রত্যেক সালাতে এ কথা বলি আমরা।
আল্লাহর নিয়ামাত স্মরণ রাখার একটি সুন্দর পদ্ধতি আছে। যেকোনো দশটি প্রাপ্তির কথা কাগজে লিখে এমন কোথাও লাগিয়ে রাখুন, যেখানে প্রতিদিন তা চোখে পড়বে। তাহলে নিজের অবস্থার কারণে অন্তরে কৃতজ্ঞতা থাকবে সব সময়। যে চাকরিতে আছেন, তার অনেক বিষয় হয়তো আপনার পছন্দ নয়। তারপরও চাকরি আছে বলে কৃতজ্ঞ হোন। জানি, আপনার ইচ্ছে উদ্যোক্তা হওয়ার। এসব ছাপোষা চাকরি আপনার জন্য নয়। তারপরও আপাতত চাকরি থাকাটাই একটা দুর্দান্ত ব্যাপার। শোকর করুন এর জন্য। লক্ষ লক্ষ মানুষ হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজে বেড়াচ্ছে এই মুহূর্তে। আল্লাহর কাছে এবং আপনার চাকরিদাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হোন এই সুযোগটি পেয়েছেন বলে।
বর্তমান অবস্থান যেহেতু জেনে গেলেন, এবার দেখতে হবে গন্তব্য কোথায়। সেটার জন্যও আলহামদুলিল্লাহ বলুন, যেন ইতোমধ্যেই সেখানে পৌঁছে গেছেন। 'কোটিপতি হয়েছি বলে আলহামদুলিল্লাহ', 'আমার অমুক কোম্পানি সফল হয়েছে বলে আলহামদুলিল্লাহ'। যা আছে, তা নিয়ে তো সন্তুষ্ট হলেনই। সামনের আসতে চলা সুযোগগুলোর জন্যও এখন আপনি প্রস্তুত। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার গুরুত্ব এখানেই। তিনি যা দিয়েছেন, তা নিয়ে শোকর করবেন। ফলে নতুন নতুন নিয়ামাত গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুতও হয়ে যাবেন। যত বেশি কৃতজ্ঞতা, তত বেশি সাফল্যের নিশ্চয়তা।
সাফল্যের জন্য কৃতজ্ঞতা আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। নিজের অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে আসন্ন সুযোগগুলো স্পষ্টভাবে চোখে ধরা পড়ে। 'আরে ধুর, এটা হবে না!' এই চিন্তা আপনাআপনি মাথায় আসবে না। কৃতজ্ঞতার কারণে আপনার নৈরাশ্যবাদী ও প্রত্যাখ্যান-কেন্দ্রিক মানসিকতা দূর হয়ে গেছে। কৃতজ্ঞতা আর গ্রহণশীলতা পরস্পর সম্পর্কিত। যা হাতে আসে, তা-ই ভালো। এভাবে চিন্তা করলে চোখ-কানও খোলা হয়ে যাবে আপনার। চারিদিকে দেখবেন সুযোগ আর সুযোগ। সেগুলো স্রেফ লুফে নিয়ে কাজে লাগানো বাকি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00