📄 সফল মুসলিমরা কোথায়?
তারা সর্বত্র। আপনারই চারপাশে রয়েছেন হয়তো।
জনাব আলিকো দাঙ্গোতে বাস করেন আফ্রিকায়। বিরাট ধনী এই ব্যক্তিটির মোট সম্পদের পরিমাণ কুড়ি বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে আসা আলিকো এখন আফ্রিকার সর্বোচ্চ সম্পদশালী উদ্যোক্তা।
উত্তর আমেরিকাতেও এমন উদাহরণের অভাব নেই। ইন্টারনেট মার্কেটিং খাতের মির্জা ব্রাদার্স, আবাসন উন্নয়ন খাতের মিস্টার রিজভী প্রমুখের নাম সবার আগে আসবে। জগলুল ব্রাদার্স কানাডা ও মিশরে বিশাল ব্যবসা দাঁড় করিয়ে ফেলছেন। তাদের ব্যবসার সংখ্যা এখন দশটিরও অধিক। তুরস্কের জনাবা সেলভা গুরদোগানের স্থাপত্য কারখানা সুপারপুল এখন বিশ্ববিখ্যাত। লন্ডনের হার্লি স্ট্রিটে বসবাসকারী এক সফল ফিজিশিয়ান ড. আমিনা কক্সন।
পাকিস্তানের শাহিদ টাটা সুবৃহৎ এক পোশাক ব্যবসার পরিচালক, যার নাম টাটা কর্পোরেশান। দোহায় অবস্থিত রেডকো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা রহমান ব্রাদার্স। সেনেগালের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাগুলো জনাব দিয়ামিলি লো-এর মালিকানাধীন। অথচ তার পেশাগত জীবন শুরু হয়েছিল ডাকার শহরে রাস্তার পাশে একটিমাত্র টেবিল নিয়ে দোকানদারি করে। এখন খাবার প্রক্রিয়াকরণ ও প্যাকেটজাত করার পুরো ব্যবস্থা তার দায়িত্বে।
আফ্রিকা থেকে এশিয়া, উত্তর আমেরিকা থেকে ওশেনিয়া। মুসলিম সাফল্যের গল্প সবখানে। ধন-সম্পদের মাধ্যমে মানবজীবনে বিরাট অবদান রাখছেন মুসলিম উদ্যোক্তাগণ।
যেখানেই যাচ্ছেন, মুসলিম উদ্যোক্তারা সেখানেই বিজয় ছিনিয়ে আনছেন। কারণ তাদের রয়েছে ওয়াহীর জ্ঞান থেকে পাওয়া মূলনীতির বাড়তি সুবিধা।
কদাচিৎ ব্যতিক্রম যে মেলে না, তা নয়। দুরাচারী ও অসৎ লোকেরা সাময়িকভাবে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে সাফল্যের পথে। তবে মনে রাখবেন, আল্লাহর দুনিয়া প্রশস্ত। কেউ দেশান্তরী হয়, কেউ থাকে জন্মভূমিতেই। তাই বলে সাফল্য কি স্থানের সাথে সম্পর্কিত?
না।
যেখানেই থাকুন না কেন, কেন, সেখানেই ধনী হওয়া সম্ভব। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ না না হলেই হলো। কারণ অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কোনো কারখানা গড়ে তুলতে পারবেন না। মোটামুটি স্থিতিশীল পরিস্থিতি বজায় থাকলে সাফল্য আশা করা যায়। সম্ভব ধনী হওয়া। রাসেল কনওয়েলের লেখা অ্যাকরস অব ডায়ামন্ড বইটি পড়ে দেখুন। স্থান নির্বিশেষে সম্পদ খুঁড়ে বের করা সম্ভব।
এখন কথা হলো, অন্যদের তুলনায় মুসলিম উদ্যোক্তাদের স্থান ঠিক কোথায়? পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় থাকবেন তারা। জনাব দাঙ্গোতের কথা বললাম, যিনি ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পত্তির মালিক। ভারতের জনাব প্রেমজির সম্পদও বিশ বিলিয়নের বেশি। আরব উপদ্বীপে দেখুন। সম্প্রতি সংবাদ শিরোনামে এসেছেন প্রিন্স আল ওয়ালীদ বিন তালাল। ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ দাতব্য খাতে খরচ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
তাই পার্থিব সাফল্যের বিচারেও মুসলিমরা যথেষ্ট অগ্রগামী। কিন্তু চিরকাল কি ব্যাপারটা এমনই ছিল? জি। অতীতেও যথেষ্ট ধনী ছিল মুসলিমরা।
মানসা মুসার কথা ধরুন। পশ্চিম আফ্রিকার মালি সাম্রাজ্যের মুসলিম রাজা ছিলেন। ষাট হাজার অনুসারী-সহ হাজ্জে যাচ্ছিলেন তিনি। কায়রোতে যাত্রাবিরতি করে সেখানে এত স্বর্ণ দান করেন যে, পরবর্তী দুইশ বছর ধরে কায়রোর স্বর্ণের বাজারে ধুন্ধুমার অবস্থা বিরাজ করে।
তাই সাফল্য সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। আছে প্রতিটি প্রজন্মে। আপনার মতো মানুষই হেঁটে গেছেন সাফল্যের এই পথে। তারা পারলে আপনিও পারবেন। হাল ছাড়বেন না। সুসংবাদ গ্রহণ করুন।
📄 বিশুদ্ধতা রক্ষা
ইসলামে নিয়্যাতের ধারণাটি আমাদের সাফল্যের পথে বহু দূর এগিয়ে দেয়। ভালো কাজ সঠিক উদ্দেশ্যে করাটাই সাফল্য লাভের দ্রুততম উপায়। আর এই উদ্দেশ্যের পরিশুদ্ধিই নিয়্যাতের অর্থ।
রাগ, ভয়, হতাশা, দুশ্চিন্তার মতো খারাপ অনুভূতিগুলোর সাথে পরিচয় আছে নিশ্চয়ই? এগুলো ভুল চিন্তাধারার ফল। যেমন: 'আল্লাহ আমাকে খাওয়াবেন না', 'দুনিয়ায় সবার জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ নেই”, 'আমি ব্যর্থ হব'-এগুলো সব নেতিবাচক চিন্তাভাবনা। জীবনকে স্থবির করে দেয় এগুলো। এরকম মানসিকতার মানুষ খুব একটা সাফল্য পায় না বললেই চলে।
একবার পরীক্ষার আগে আমি এরকম নেতিবাচক চিন্তায় আচ্ছন্ন ছিলাম। দুশ্চিন্তার চাপে অন্যান্য সময়ের চেয়ে খারাপ পরীক্ষা হলো সেবার। যদিও পাশ করে গেছি একটুর জন্য। কিন্তু অন্যান্য পরীক্ষায় আবার ঠিকই হালকা মন-মেজাজ নিয়ে দারুণভাবে উতরে গেছি। প্রথম পরীক্ষায় তাহলে ভুলটা কোথায় হচ্ছিল? আমি তখন এমন একটা জিনিসকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিলাম, যা আসলে আমার নিয়ন্ত্রণাধীন নয়: ভবিষ্যৎ।
যেখানেই যান, এ কথা প্রযোজ্য। সঠিক চিন্তা বা উদ্দেশ্য নিয়ে সঠিক কাজটা করলে সঠিক ফলাফল আসবেই। সঠিক ফলাফল আসবেই। ব্যবসায়, জীবনে, জীবনে, সবকিছুতে। ইসলাম আমাদের নিয়্যাত সঠিক রেখে ভালো কাজ করতে শেখায়।
হয়তো আপনার নিয়্যাত, 'আমি এই কোম্পানিতে কাজ করতে চাই। এই পরিমাণ টাকা কামাতে চাই।'
কিন্তু উদ্দেশ্যটা কী এখানে? ভাবনার এই সুতো আরও এগিয়ে নিয়ে গেলে হবে, 'আমার পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য, অভাবীদের দান করার জন্য, আরেকটু ভালো পরিবেশে থাকা, হাজ্জ করা, বাবা-মাকে খুশি করা, সর্বোপরি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।' চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি।
তাই সঠিক নিয়্যাতটি খুঁজে বের করুন, আর দেখুন ফলাফল কী হয়।
📄 ধনীদের মন-মানসিকতা
দারিদ্র্য বা ধনাঢ্যতা কোনো বাহ্যিক অবস্থা নয়। এগুলো একেকটা মানসিকতা।
কুরআনে এমন কিছু দরিদ্র মুসলিমের আলোচনা রয়েছে, যারা অভাব সত্ত্বেও হাত পাতেন না। দেখুন, টাকা বা সহায়-সম্পদ না থাকা থাকা দোষের কিছু নয়। নয়। এরকম কোটি কোটি কোটি মানুষ রয়েছে। সাময়িক দারিদ্র্য ঠিক আছে, কিন্তু স্থায়ী দারিদ্র্য বিপজ্জনক। স্থায়ী দারিদ্র্য মানে চিরকাল গরীব থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে বসা। আসল দারিদ্র্য হলো মনের এই অবস্থাটি।
তাহলে ধনী মুসলিম উদ্যোক্তার সাথে গরিব, গড়পড়তা, সাধারণ মানুষের পার্থক্য কী? প্রধান পার্থক্য হলো বড়লোকের চিন্তাও বড়। আমেরিকার অর্থব্যবস্থার সাপেক্ষে কিছু উদাহরণ দিই। যদি মনে করেন আপনার বাৎসরিক পাওনা ৫০ হাজার ডলার, তাহলে খুব সম্ভবত আপনি প্রকৌশলী বা অনুরূপ কিছু হওয়ার চেষ্টা-সাধনা করবেন। একসময় সে পেশায় নিয়োজিত হয়ে কামাই করতে থাকবেন সেই পরিমাণ টাকা।
যদি মনে করেন বার্ষিক প্রাপ্য ৩ লাখ ডলার, তাহলে হতে চাইবেন ক্রীড়াবিদ, সার্জন বা বা এরকম কিছু। এরচেয়েও বড় করে ভাবলে হয়তো চলে আসবেন উৎপাদন খাতে। গড়ে তুলবেন নিজের ফ্যাক্টরি। সম্পূর্ণ চিত্রটা ধরতে পেরেছেন এবার?
যদি বিলিয়নেয়ার হওয়াকে লক্ষ্য বানান, তাহলে এতক্ষণে আপনি হোটেল ও বিশাল বিশাল কর্পোরেশান বানানো শুরু করে দিয়েছেন। কাজ করে চলেছেন অবিরাম।
দেখতেই পাচ্ছেন যে, পুরো পুরো বিষয়টা বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল। বড় করে চিন্তা করুন, তাহলে ব্যবসায় সফল হবেন। আপাতত যদি অন্যের অধীনে চাকরি চাকরি করেও থাকেন, উপার্জিত টাকার পরিমাণে আপনার এই বিশ্বাসের প্রতিফলন থাকবে। নিজেকে নিজেকে যতটা দামি দামি ভাবেন, আপনার আপনার দাম ততটুকুই। এর এক পয়সা কমও নয়, বেশিও নয়।
কখনও খেয়াল করেছেন যে, প্রত্যেক মাস শেষে আপনার হাতে হাতে প্রায় একই পরিমাণ টাকা থাকে? ধরা যাক, বর্তমানে আপনার বার্ষিক আয় ৫০,০০০ ডলার। দেখবেন যে, প্রতি মাসে আপনি ঠিক ওই অনুযায়ীই টাকা কামাচ্ছেন। এমনকি চাকরি হারিয়ে ফেললেও এমন কোনো কাজ আপনি খুঁজে নেন, যেটার বেতন ঘুরেফিরে ওই পরিমাণের কাছাকাছি।
কারণ নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় করে অভ্যস্ত ব্যক্তির পক্ষে হঠাৎ করে এর চেয়ে বেশি চিন্তা করাটাও দুঃসাধ্য। সে বিশ্বাসই করে যে, তার পাওনা অতটুকু। যে নিজেকে নিজেকে এর চেয়ে চেয়ে দামি মনে করে, সে আয়ও করে বেশি। এর কম হলেই নিজেকে দেউলিয়া দেউলিয়া মনে মনে হয় তার কাছে। কাছে। তাই চেষ্টাও করে প্রত্যাশা অনুযায়ী আয় করার।
ব্যবসাও এরকমই। যদি বিশ্বাস করতে পারেন যে সফল হবেন, তাহলেই সফল হবেন। সফল হবেন। এজন্যই আমার পরামর্শ পরামর্শ হলো বড় বড় করে চিন্তা করার। করার। উচ্চাশা আর আর স্বপ্নের পারদকে চড়িয়ে রাখুন সর্বোচ্চ মাত্রায়। আর এটি মুমিনের বৈশিষ্ট্যও বটে।
নবির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মৃত্যুর প্রায় একশ বছর পর খিলাফতের দায়িত্ব পান উমার বিন আব্দুল আযীয। কিন্তু ন্যায়পরায়ণতার কারণে তাকেই ধরা হয় পঞ্চম খলিফার রাশিদ। ধনকুবের পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি।
উমার বিন আব্দুল আযীয বলেছেন, 'আমার লক্ষ্য সর্বদাই উঁচু।' একেবারে তরুণ বয়সে তিনি বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন ফাতিমাকে। সম্ভ্রান্ত পরিবারের এই নারীর যেমন বংশমর্যাদা, তেমনই তার রূপ। উমার তাকেই বিয়ে করতে সমর্থ হন। এরপর উমারের লক্ষ্য হয় প্রশাসক হওয়া। সেটাও অর্জন করে ফেলেন তিনি। উচ্চতর পদ পেতে পেতে একসময় হয়ে যান মুসলিম উম্মাহর খলিফা। বয়সকালে যখন মৃত্যু আসন্ন, তখন বলেছেন, 'আমার লক্ষ্য বড় উঁচু। আশা করি আমি জান্নাতুল ফিরদাউস লাভ করব।' ফিরদাউস জান্নাতের উচ্চতম স্তর।
এই হলো মুসলিমের মানসিকতা। লক্ষ্য উঁচু রাখুন, দুনিয়ায় এবং আখিরাতে। সফল মানুষদের সাধারণের চেয়ে আলাদা করে এই মানসিকতাই। বড় পরিসরে চিন্তা করুন, ফলাফলও পাবেন বড় আকারে।