📄 এই খেলার নিয়ম
সাফল্য বড় ছলনাময় জিনিস। হয়তো কিছু একটা পাওয়ার জন্য কঠোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রতিবার একটুর জন্য ফসকে যায়। লক্ষ্য আপনার সুস্থির। কিন্তু কিছুতেই যেন ধরা দিচ্ছে না।
কেন জানেন?
এর কারণ প্রস্তুতি। আপনার কাঙ্ক্ষিত কল্যাণ যেকোনো সময় চলে আসতে পারে। কিন্তু আপনি হয়তো সেটা গ্রহণের জন্য তৈরি নন। সাফল্য আসবে, কিন্তু সঠিক সময়ে। আগেও না, পরেও না; যথাসময়ে।
সঠিক সময়ের আগেই ধনী হয়ে বসে থাকলে প্রবল সম্ভাবনা আছে যে, এই সম্পদ খুব শীঘ্রই হারিয়ে ফেলবেন। শত চেষ্টা সত্ত্বেও পুনরুদ্ধার করা যাবে না তা আর।
এমনটা প্রায়ই ঘটে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ লটারি বিজয়ীরা। জুয়া খেলে কামানো লাখ লাখ টাকা খুইয়ে বসতে পাঁচ বছরও লাগে না এদের। দুর্নীতির মাধ্যমে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি দেখা যায়।
তাই সাফল্য ও সম্পদ অর্জনের পথে ব্যর্থতার সম্মুখীন হলে হতাশ হবেন না। বুঝে নেবেন যে, আপনি এখনও তৈরি নন সেটার জন্য। আত্মোন্নয়ন করতে থাকুন। সাফল্য যখন আসবে, তখন যেন তার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারেন।
নিজের সেরাটা বাস্তবায়নের দ্বিতীয় প্রভাবক হলো সঠিক জায়গায় নিজেকে স্থাপিত করা।
এভাবে চিন্তা করুন: সফল উদ্যোক্তা হয়ে আর্থিক সাফল্য অর্জন করতে হলে কী করতে হবে? ব্যবসা শুরু করতে হবে। একদম জানা কথা। কিন্তু সম্ভাবনাময় অনেক উদ্যোক্তা ভুলটা করে এখানেই। এই শুরু করাটাই আর হয়ে ওঠে না তাদের।
মানুষকে সাফল্যবঞ্চিত করা সর্বশেষ প্রভাবক হলো জ্ঞানের অভাব। কী করছেন, কোথায় যাচ্ছেন—এটাই যদি না জানেন, তাহলে লক্ষ্যে পৌঁছানো দুষ্কর। অনেকে তো কী যে জানে না, তা-ই জানে না। জানলে ঠিকই দ্রুত উদ্দেশ্য হাসিল হতো।
তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো অভিজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ। এই বইয়েই সেরকম কিছু মানুষের দেখা পাবেন। জানবেন যে, এই বিরাট সাফল্য অর্জন করতে ঠিক কী করেছেন তারা।
📄 অর্থনৈতিক জ্বালানি
যাকাত প্রদান ফরয। এটি ইসলামের পাঁচটি রুকনের একটি। আর প্রথম রুকন ঈমানের সাক্ষ্য। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ব্যাপারে সঠিক বিশ্বাস পোষণ। এই সঠিক আকিদাই আপনাকে এনে দেবে সত্যিকারের সত্যিকারের স্থায়ী সাফল্য। কারণ আপনি এখন সত্যিকারের আর-রাযযাক (রিযকদাতা) আল-খালিকের (সবকিছুর স্রষ্টা) প্রতি নির্ভর করছেন। আপনার এখন ইয়াকীন আছে যে, আপনার রিযক আপনার কাছে আসবেই। পাশাপাশি জীবনে অনুসরণ করবেন নবিজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দৃষ্টান্ত।
দ্বিতীয় রুকন সালাত। এ হলো স্রষ্টা ও রিযকদাতা আল্লাহর সাথে এক আত্মিক যোগাযোগ। দিনে পাঁচবার করা হয় তা। উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার যা কিছু দরকার, তাও আল্লাহই আপনাকে দেবেন।
তারপর আসে যাকাত। নিজের যে অতিরিক্ত সম্পদ আপনি কোনো উৎপাদনশীল কাজে ব্যয় করছেন না, তা অভাবী-দরিদ্রদের দিয়ে দেওয়ার নামই যাকাত। যেমন : কারও যদি এমনি এমনি পড়ে থাকা কোনো সঞ্চয় থাকে, তাহলে সেখান থেকে ২.৫% দিয়ে দিতে হবে এর সত্যিকার প্রয়োজনধারীদের। ফকির, মিসকীন, অভাবী মুসাফির-সহ আরও বেশ কিছু খাত রয়েছে এর। যাকাত নিয়ে ফিকহশাস্ত্রে রয়েছে ব্যাপক পরিমাণ আলোচনা। সালাতের পরই এই মহান ইবাদাতের মর্যাদা। কুরআনে এর উল্লেখও রয়েছে সালাতের প্রায় সমান সংখ্যকবার।
কিন্তু এটাও বুঝতে হবে যে, অতিরিক্ত সম্পদ না থাকলে যাকাতের প্রশ্নও আসবে না। আপনার সব টাকাই যদি মৌলিক চাহিদা ও বিল পরিশোধে কাজে লাগে, তাহলে এই টাকার ওপর কোনো যাকাত প্রযোজ্য নয়।
সম্পদের অধিকারী হতে উৎসাহিত করা হয়েছে, যেন আপনার অতিরিক্ত সম্পদ থেকে গরীব-দুঃখীদের প্রয়োজন মেটে। তাই যাকাত নির্ভর করে অতিরিক্ত সম্পদ, উৎপাদন ও উপকরণের ওপর।
পার্থিব ও অর্থনৈতিক সাফল্য তাই এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এটি আপনাকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাতটি করার যোগ্য করে তুলবে। চাকরিজীবীর চেয়ে ব্যবসায়ীর পক্ষে এই সুযোগ লাভ করা সহজতর। এ এক বিস্ময়কর বাস্তবতা। যাকাতের বিধান আছে মানেই আপনাকে ধনী হতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
📄 ১০-৩৩% সূত্র
উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের সাফল্যের সম্ভাবনা তুমুলভাবে বাড়িয়ে তোলার কিছু সূত্র আছে।
এরকম সোজাসাপটা একটি সূত্র: 'বেশি দিন, বেশি পান।'
যদি আপনার পিতামাতা এখনও জীবিত থাকে, তাহলে আপনার সামনে স্বর্ণালি সুযোগের হাতছানি! তাদেরকে খুশি রাখুন। দেখবেন এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আপনার সাফল্যের ওপর। নিজের উপার্জনের একটি অংশ পিতামাতার জন্য একেবারে নির্ধারিত করে ফেলুন। আর যদি তারা বেঁচে না থাকেন, তবুও বিভিন্ন আমল করুন তাদের পক্ষ থেকে। যেমন: বদলি হাজ্জ।
এ ছাড়া নিজের সাফল্য সুনিশ্চিত করার আরেকটি দারুণ উপায় সদকা। এনটিজি ক্ল্যারিটি নেটওয়ার্ক ইনক. এর প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আশরাফের মতে, উপার্জনের ১০% দান করতে থাকলে আর কখনোই ব্যবসায় মন্দা দেখা দেখা দেবে না। কেমন লাগল? আর বিপদ-আপদের সময় এ কথা আরও বেশি প্রযোজ্য।
বলতে পারেন, 'কিন্তু উমার ভাই, আমি তো এখনও ব্যবসা শুরুই করিনি। মন্দা না হওয়াটাই যথেষ্ট নয়। আমার দরকার দ্রুত মুনাফা, প্রচুর মুনাফা।'
এর সমাধানও দানশীলতা। বর্তমান উপার্জনের ৩৩% সদকায় খরচ করুন। চিরতরে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে যাবে অর্থযোগ।
আবার কিছু জিনিস পরিহারও করতে হবে।
ভালো কাজ করতে থাকলে স্বভাবতই খারাপ কাজ পরিত্যক্ত হয়ে যায়। তবে মনের ভুলে হারাম জিনিসেও পতিত হতে পারে উদ্যোক্তা।
এমন কিছু জিনিস উল্লেখ করছি, যেগুলো পরিহার করা সফল মুসলিম উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
তালিকায় সবার আগে আছে রিবা, যার সর্বাধিক প্রচলিত রূপের নাম সুদ। 'সম্পদ গড়ার কৌশল' অধ্যায়ে আমরা দেখব কীভাবে মুসলিম উদ্যোক্তাগণ সুদের শরণাপন্ন না হয়েই বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করতে পারেন।
দ্বিতীয় পরিহার্য বিষয় বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক। এগুলো সমাজে ব্যাধি, অবিশ্বাস ও দারিদ্র্য ছড়ানোর পেছনে দায়ী। 'ঐক্যের শক্তি' অধ্যায়ে এর সমাধান আলোচিত হবে। সঠিক মানুষটির সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া সাফল্যের পথে এক বড় নিয়ামক।
📄 সত্যিকারের বাসনা
ইসলামের মতে মানবজীবনের উদ্দেশ্য আল্লাহর ইবাদাত। কুরআন বলে, 'আমি জিন ও মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমার ইবাদাত করার উদ্দেশ্যে। আমি তাদের কাছে জীবনোপকরণ বা আহার্য চাই না।' [৪]
এ আয়াতটির উদ্ধৃতি প্রায়ই দেখা যায়। তবে আয়াতটি পড়ার সময় মনে রাখতে হবে যে, উৎপাদন ও উপার্জনও ইবাদাতের অংশ। তবে তা করতে হবে ইহসান সহকারে। ইহসান মানে কোনো কাজ সঠিক নিয়তে সর্বোত্তম পন্থায় করা। কর্ম-নৈতিকতা সংক্রান্ত অধ্যায়ে পরে আমরা এটি বিস্তারিত আলোচনা করব।
আপাতত এতটুকু বুঝে নিন যে, মানবসমাজের জন্য মূল্যবান কোনোকিছু উৎপাদন করাও ইবাদাত। এসব কাজে সাফল্য অর্জন করাও ইবাদাত।
সূরা আদ-দুহার ব্যাপারে অসাধারণ একটি তথ্য দিয়েছেন শাইখ সাইয়্যিদ রিগাইহ। আল্লাহ বলেন, 'আর আপনার প্রতিপালকের নিয়ামাতের ব্যাপারে কথা হলে, এর প্রচার করুন।' [৫]
শাইখ বলেছেন, নিজের ব্যবসায়িক সাফল্য এবং কোটিপতি হওয়ার খবর মানুষকে জানাতে হবে। ফলে মানুষ আপনার মাধ্যমে আল্লাহর নিয়ামাত স্মরণ করবে। জানবে যে, সাহায্যের জন্য কার কাছে যেতে হবে। এটিও ইবাদাতের অংশ।
নবিকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আদেশ করা হয়েছে, 'বলুন, "আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ- সবকিছু আল্লাহর জন্য।"' [৬]
তাই মুসলিম উদ্যোক্তার সকল কাজই ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত। ইবাদাতের সাথে পার্থিব সাফল্যের কোনো বিরোধ নেই। স্ত্রীর সাথে প্রেমময় সম্পর্কও ইবাদাত, সন্তান গ্রহণ ইবাদাত, ভালো বাড়ির মালিক হওয়া ইবাদাত। তাই তো জীবনব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম এত সুন্দর। ঐতিহাসিক পর্যায়ের সাফল্য অর্জনের অনুমতি আছে এখানে। অনুমতি আছে পার্থিব সাফল্যকে ইবাদাত বলে গণ্য করার।
সব কাজই যেহেতু ইবাদাত হওয়া সম্ভব, এখন প্রশ্ন হলো বিশেষভাবে আল্লাহ আপনার জন্য কী চান।
এর জন্য আত্ম-অনুসন্ধান প্রয়োজন। নিজের ব্যক্তিত্ব যাচাই করে নিজেই সিদ্ধান্ত নিন। কী করতে সবচেয়ে ভালো লাগে আপনার? নিজের জীবনের সত্যিকারের বাসনা আবিষ্কার করার পদ্ধতি আলোচনার সময় আমরা এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানব। ওটাও কিন্তু ইবাদাত!
টিকাঃ
[৪] সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৬
[৫] সূরা আদ-দুহা ৯৩:১১
[৬] সূরা আল-আন'আম ৬:১৬২