📄 পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক
মহানবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেও উদ্যোক্তা ছিলেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন দেখা যায়। তাঁর সুন্নাহ অনুসরণে আগ্রহী যেকোনো মুসলিমের মাঝেও এর প্রভাব স্পষ্ট।
ইসলামের বিকাশ ঘটেছে প্রাচীন আরবের সবচেয়ে গমগমে বাণিজ্যিক শহরে। এটি ইসলামের এক অনন্যতা। ইসলামের প্রসারও হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের হাত ধরে। ব্যবসা কীভাবে মুসলিম পরিচয়কে সংজ্ঞায়িত করে, তার একটি অনুপম দৃষ্টান্ত তিন মহাদেশ জুড়ে বিস্তৃত সিল্ক রোড।
সিল্ক রোড ধরে ব্যবসা করার অভিজ্ঞতা আছে, এরকম কিছু মুসলিম উদ্যোক্তার সাক্ষাৎকারও নিয়েছি আমি। আফ্রিকায় বসতি স্থাপন করেছে তাদের পরিবার। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে—যেখানেই যান না কেন, সুযোগ সবখানেই বিদ্যমান। তাদের কেউ কেউ আজ কোটিপতি।
আপনিও গড়ে তুলতে পারেন এই মানসিকতা। আর এটা আপনার জন্য বিরাট একটি সুবিধাও। দুনিয়ার সাফল্য আর আখিরাতের সাফল্যের মাঝে কোনো ঠোকাশুকি নেই। উভয়টিই অর্জন করা সম্ভব। আর এ বিষয়টি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য আমরা নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও তাঁর অসাধারণ সাহাবিদের কাছে কৃতজ্ঞ। জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবিদের অধিকাংশই সম্পদশালী অবস্থায় মারা গেছেন।
সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) মারা যাওয়ার পর তাঁর সম্পদ হিসেব করতে ও উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টন করতেই লেগে যায় তিন বছর। সাহাবিদের জীবনের এই দিকটি নিয়ে কেন যেন খুব একটা আলোচনা হয় না।
উসমান বিন আফফানের (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) উদাহরণও উল্লেখযোগ্য। এক পর্যায়ে মুসলিম ভূমিতে সংঘটিত মোট ব্যবসার অর্ধেকের মালিক ছিলেন তিনি একাই। আজকের যুগে কোটিপতি আলেম বা ইমামের কথা ভাবা যায়! যায়। এই বইতেই সামনের দিকে এমন কয়েকজনের দেখা পাবেন।
📄 সততার ফল
কুরআনে ব্যবসার গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এরকম একটি ঘটনা আছে শুআইবের (আলাইহিসসালাম)। তিনি তাঁর জাতিকে বলেছেন, 'মাপে পূর্ণ করে দাও। মানুষকে ঠকিয়ো না...যদি মুমিন হয়ে থাকো, তাহলে এটিই তোমাদের জন্য উত্তম।' [১]
নবিগণ ছিলেন সৎ ও নীতিবান। আমাদের নবিকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সবাই চিনত বিশ্বাসভাজন বা আল-আমিন নামে। সততার গুণেই উন্নতি করেছেন তিনি।
ড. মাইলস ড্যাভিস একজন আফ্রিকান-আমেরিকান মুসলিম। তিনি শেনোদোয়াহ বিজনেস স্কুলের ডিন। ড. ড্যাভিস বলেন, 'উন্নত মানের পণ্য ও সেবা সকলেই চাই। অপর পক্ষ যদি জানতে পারে যে, মান ও সততার ব্যাপারে আপনার সুনাম আছে, তাহলে তার কাছে আপনি সোনার চেয়েও দামি।'
রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সততার একটি অনুপম দৃষ্টান্ত দেখা যাক। যে লোকগুলো তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করত, এমনকি তারাও তাঁর কাছে আমানত রাখত দামি দামি জিনিস। এমনকি হত্যা ষড়যন্ত্র করার সময়ও সেসব আমানত আগে ফেরত চায়নি তারা। মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সততার প্রতি তাদের এই পরিমাণ আস্থা ছিল। তিনি আস্থাভাজন, ন্যায়পরায়ণ এবং কথা ও কাজে মিল রাখা মানুষ।
ঠিক এই আস্থার কারণেই কিছু ব্যবসায়ী উন্নতি লাভ করেন। পুঁজিবাজার টিকেই আছে মানুষে-মানুষে বিশ্বাসের কারণে। ইন্টারনেটের ক্ষেত্রেও একই কথা। ধরুন, আমি অনলাইনে একটি ল্যাপটপ কিনব। যে ওয়েবসাইটে লগইন করছি, তাদের প্রতি আমার আস্থা থাকাই লাগবে। ক্রয় করার বোতামটি চাপা মাত্রই টাকা কেটে নেওয়া হলো আমার অ্যাকাউন্ট থেকে। পণ্য কিন্তু এখনও আমার হাতে আসেনি, কিন্তু টাকা ঠিকই চলে গেছে। এ পরিস্থিতিতেও আমি নিশ্চিন্ত থাকব, যদি ওই ওয়েবসাইটের সততার প্রতি বিশ্বাস থাকে আমার। আস্থা না থাকলে সব কাজই ধীর হয়ে যায়। বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকলে আমি সশরীরে তাদের দোকানে যেতাম, মালিকের নাম, এমনকি ঠিকানা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করতাম হয়তো-বা। তাহলে বুঝতেই পারছেন, আস্থার অভাব মানে শম্বুকগতির বাণিজ্য।
তাই উন্নতি করতে চাইলে আগে আস্থার ভিত গড়ে নিন।
আস্থা তৈরি করতে সারাটা জীবন লেগে যায়। কিন্তু ভেঙে যেতে প্রয়োজন একটি মাত্র মুহূর্ত। বিশ্বস্ততা শুধু ব্যবসার না, চরিত্রেরও অংশ।
যত যা-ই হোক, নিজের কাছ থেকে তো আর লুকানো সম্ভব না। মানুষের কাছ থেকে যতই আড়াল হই না কেন। উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হয়ে যাওয়ার পর আমরা ইহসান নিয়ে আলোচনা করব।
📄 শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত
নবির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) চরিত্র অদ্বিতীয় ও অনন্য। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে অনেক অমুসলিমও মানব-ইতিহাসের সফলতম ব্যক্তি বলে মানেন। অনাথ অবস্থায় দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে কেটেছে তাঁর শৈশব। অথচ নববি মিশন শুরু করার পর সেই তিনিই হয়ে ওঠেন উন্নত ও শান্তিপূর্ণ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত এক রাষ্ট্রের নেতা। আর ওই রাষ্ট্রটিই পরে একসময় পরিণত হয় বিশ্বের অন্যতম বিশাল এক সাম্রাজ্যে। শুরুর দিকের রাষ্ট্রগুলো দুর্বল ও বিলুপ্ত হয়ে যাবার বহুকাল পরও আরও অনেক রাষ্ট্রের আবির্ভাব হয়েছে, যেগুলো ইসলামী মূলনীতি দিয়ে প্রভাবিত।
আপত্তি আসতে পারে যে, অন্যান্য ধর্মেও তো অনেক ভালো ভালো শিক্ষা রয়েছে। খ্রিষ্টান ধর্ম, ইয়াহুদী ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম ইত্যাদি। হ্যাঁ, কথা সত্য। কিন্তু এমন আরেকজন ধর্মনেতা দেখান তো, যিনি আজকের যুগে প্রয়োগ করার মতো নিখুঁট বিনিয়োগ-নীতিমালা দিয়ে গেছেন। আমি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছাড়া আর এমন কাউকে পাইনি। এমনকি বাড়ি বিক্রি করে পাওয়া টাকা দিয়ে কী করতে হবে, তাও শিখিয়ে দিয়ে গেছেন তিনি। আর মুসলিম উদ্যোক্তার জন্য এসব শিক্ষা এক বিরাট প্রাপ্তি।
তাই এই একবিংশ শতাব্দীতেও নামিদামি অনেক মুসলিম ব্যবসায়ী নবিজির নীতি ও দর্শন অনুসরণ করে সফল হচ্ছেন।
📄 সমাজকল্যাণ
মুসলিম উদ্যোক্তার একটি প্রধান লক্ষ্য হবে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা। ন্যায়ের হাত ধরেই আসে শান্তি ও উন্নতি—এ কথা সর্বজনবিদিত।
আমার দেখা উদ্যোক্তাদের যিনি যত সফল, তিনি তত দানশীল। যে সমাজ ও জনপদে তারা বাস করেন, সত্যিকার অর্থেই তাদের সাহায্য ও সেবা করে চলেন তারা।
বিশ্বখ্যাত উদ্যোক্তা আযিম রিযভীর সাথে আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছে। কানাডার ওন্টারিও-তে বাস করেন তিনি। সেখানকার সমাজের প্রতি তার অবদান ব্যাপক। পুরো দেশের মাঝে তার শহরটি এখন সবচেয়ে দ্রুত বর্ধমান। একদম শূন্য থেকে শুরু করে দুই কি তিন বছরের মাঝে তিনি দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন সেখানকার এক নম্বর ব্রোকারেজ ফার্ম। আরও কয়েকজন সফল মুসলিম উদ্যোক্তা ও স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় তিনি আরেকটি প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রকল্পটির ফলে সেখানকার স্থানীয় হাসপাতালটির সম্প্রসারণ হবে। রিযভী ও তার মুসলিম সঙ্গীরা এর নাম দিয়েছেন 'দ্য মুসলিম লেগ্যাসি উইং'।
দানশীলতার হাত ধরে উন্নতি চলে আসে, কী আশ্চর্য! এখন পালটা বলতে পারেন যে, কিছু মুসলিম তো অবৈধ আত্মসাৎ ও অসততার মাধ্যমেও উন্নতি করে ফেলছে! এটা খোঁড়া যুক্তি। নিজেকেই প্রশ্ন করুন, 'মুসলিম উদ্যোক্তাগণ জনগণকে কী পরিমাণ সেবা দেন? তাদের উসিলায় কত মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে?' তাহলেই বুঝবেন যে, এই উদ্যোক্তারা সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার মূলনীতি অনুসরণ করছেন। এই ইসলামী মূল্যবোধটির প্রয়োগের কারণেই তারা পাচ্ছেন দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য। অসততার মাধ্যমে এরকম সামষ্টিক উন্নতি আসে না।
ইসলামের অনুশাসন এখানেই শেষ নয়। পূর্ণ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম সুদকেও হারাম করেছে। সামাজিক ন্যায়বিচারের এই ব্যাপারটি নিয়ে সামনের অধ্যায়গুলোতে আরও আলোচনা হবে। উদ্যোক্তা হিসেবে এ বিষয়টি আপনার ক্ষেত্রে কীভাবে প্রযোজ্য, তাও দেখব আমরা।