📄 ১০. আমিনা ক্সন
লন্ডনের হার্লি স্ট্রিটে বসবাসকারী এক সফল ফিজিশিয়ান ড. আমিনা কক্সন। তিনি একজন সফল নিউরোলজিস্ট। সফলতা মানুষকে যেভাবে ধোঁকা দেয়, আমিনার ব্যাপারে তেমনটা ঘটেনি। বরং তিনি বিনয়ী হতে শিখেছেন। তিনি বলেন, 'একেকজন রোগী মানে একেকটা নাটকীয় পরিস্থিতি। রোগীদের সাহস দেখে আপনি বিনয়ী হবেন, আর নিজের অপারগতার কথা ভেবে বিনয়ী হবেন। আপনি ডাক্তার হয়েও খুব বেশি কিছু করতে পারেন না। একজন সার্জনের জন্য একটা ব্যর্থ অপারেশন মানে দুনিয়া ভেঙে পড়া। কারণ আপনি বুঝতে পারবেন, আপনি না পারলেও একজন সার্জন ঠিকই এই রোগীকে সাহায্য করতে পারতো। আরো ভালো কিছু করা যেত— এই চিন্তা থেকে আপনি মুক্তি পাবেন না। আপনাকে নিজের সেরাটা দিতে হবে, এরপর আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে। এজন্যই আমি সব সময় বিসমিল্লাহ বলি। নিজের ভুলের কারণে রোগীর ক্ষতি করতে চাই না। তাই আল্লাহর কাছে সাহায্য চাই।'
এই ইতিবাচক মানসিকতাই তাকে দিয়েছে সাফল্য। আমিনা কক্সের জীবনে অনেক নাটকীয় ঘটনা আছে। এগার বছর বয়সে দুইবার কিডন্যাপিং এর অভিজ্ঞতা পেয়েছেন তিনি। একই রকম ঘটনা ঘটেছিল দুইবার। পাঁচ বছরের বড় ভাইয়ের সাথে ট্যাক্সিতে ছিলেন। 'হঠাৎ ড্রাইভার ভুল পথে গাড়ি চলতে শুরু করলো। আমি আর আমার ভাই বুঝে গেলাম, ঘটনা খারাপ। চলন্ত গাড়ি থেকে কিভাবে নেমে পড়বো সেই সুযোগ খুঁজছিলাম। আমি চিৎকার করছিলাম। যেন সিনেমার দৃশ্য এটা!'
সদ্য কলোনিয়ালমুক্ত মিসরে বাস করতেন তিনি। মিশরের লোকজন ব্রিটিশদের খুব ঘৃণা করতো। তিনি বললেন, 'একবার আমাদের স্কুল বাস থামানো হলো। খুবই বাজে একটি ঘটনা ঘটেছিল। আমরা দেখলাম একটি (ইংরেজ) বাচ্চার সারা গায়ে মানুষের কামড়ের দাগ! বাচ্চাটা বাঁচেনি!' মিশরীয়রা সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের এতটাই ঘৃণা করতো। 'এসব কারণে কখনোই মুসলিমদেরকে আমার খুব ভালো মানুষ মনে হয়নি। যদিও আমি তাদেরকে ঠিক মুসলিম মনে করতাম না, তাদেরকে মিশরীয় ভাবাটাই বেশি যুক্তিযুক্ত মনে হতো।'
মিশরে থাকাকালীন এসব অভিজ্ঞতার কারণে তিনি কখনোই ইসলামের প্রতি খুব একটা আগ্রহী হননি। কিন্তু অবচেতন মনে কী যেন একটা ছিল! 'বিপদের সময় মুসলিমরা যেভাবে তাদের বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে, এটা দেখে আমি মুগ্ধ হতাম। একবার এক বৃদ্ধা মহিলা এলো। একটু পরেই তার অপারেশন হবে। মহিলার সাথে তার মেয়েও এসেছিল। আমি মেয়েটার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে দেখলাম, তার ব্রেস্ট ক্যান্সার হয়েছে। যদিও এটা প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। আমি তাকে বুঝিয়ে বললাম, এটা খুবই মারাত্মক অসুখ। আরো বললাম বাড়ির সবাইকে অবশ্যই জানাবে। পরদিন দেখলাম, ওর পরিবারের লোকেরা হাসি তামাশা করছে! আমি খেপে গেলাম মেয়েটার প্রতি। ওকে বললাম, তুমি কি ওদের জানাওনি তুমি খুবই অসুস্থ? কিন্তু দেখা গেল, বাড়িতে ও ঠিকই জানিয়েছে। কিন্তু এই খবরে ওরা কেউই ভেঙে পড়েনি। মেয়েটি সারারাত আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছে। কারণ প্রাথমিক পর্যায়েই ওর ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছে। তার ঈমানের শক্তি দেখে আমি অবাক হলাম।'
আমিনা বলেন, 'অসুস্থতার মধ্যেও রহমত থাকে। এতে জীবনের বাস্তবতা বুঝতে পারবেন। তখন দুনিয়া টাকা পয়সা কোন কাজে লাগে না। আল্লাহর রহমত ছাড়া সবকিছুই অর্থহীন।'
আমিনা কক্সের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটা বেশ নাটকীয়। এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন, লন্ডনের রাস্তায় একা গাড়ি চালাচ্ছেন। আশেপাশের বাড়িগুলোতে সব আগুন জ্বলছে, আর রাস্তার দুই পাশ থেকে বড় বড় পাথর এসে তার গাড়ির ওপর পড়ছে! এরপর তিনি একটি ব্রীজের ওপর বাঁক নিলেন, আর যেন একটা মরুভূমির দিকে চলে গেলেন! সেখানে একটি রহস্যময় আলো দেখতে পেলেন। সেই আলোর মাঝে আল্লাহর নাম লেখা! স্বপ্নের মধ্যে একটা আলো তাকে পথ দেখিয়ে এখানে নিয়ে এল! আমিনা বলেন, 'মনে হলো ইসলাম গ্রহণের জন্য আমাকে মেসেজ দেওয়া হল!' এর দুই বছর পর ১৯৯০ সালে তিনি মুসলিম হন।
📄 ১১. শহীদ আনওয়ার টাটা
পাকিস্তানের শাহিদ টাটা সুবৃহৎ এক পোশাক ব্যবসার পরিচালক, যার নাম টাটা কর্পোরেশান। তার সাফল্যের রহস্য 'উদ্ভাবনী-চিন্তা' করা।
“টাটা গ্রুপের মালিক শহিদ আনওয়ার। পারিবারিক ব্যবসাকে ঐক্যবদ্ধ রাখার দায়িত্ব তখন তার ঘাড়ে। গৎবাঁধা চিন্তার বিরুদ্ধে গেলেন তিনি। তার পোশাক কারখানা তখন চলছিল পুরনো আমলের রাশিয়ান মেশিনারি দিয়ে। মানুষ ভেবেছিল আর টিকবে না এ কোম্পানি। নিজের লক্ষ্যের সাথে পুরো কোম্পানির ব্যবস্থাপনাকে এক কাতারে নিয়ে আসেন শহিদ টাটা। এক দশকের মধ্যে সম্পূর্ণ আধুনিকায়িত কোম্পানিটি পুনরায় লাভজনক হয়ে ওঠে। সুদৃঢ় লক্ষ্যের ফলাফল এমনই। সব বাধা-বিপত্তি ভেঙেচুড়ে যায়।”
এটাই উদ্যোক্তা হওয়ার সুফল। মনে রাখবেন, উত্তরাধিকারসূত্রে আপনি কোন চাকরি পাবেন না, তবে ব্যবসা পাবেন। চাকরি শেষে আপনাকে অবসর নিতে হবে। কিন্তু ব্যবসায় ব্যাপারটা এমনটা নয়। আপনার গড়ে তোলা ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে যাবে আপনার সন্তান। পাকিস্তানের শহীদ টা্টাও এভাবে শিখেছেন। শিখেছেন আরও অনেক উদ্যোক্তা।
📄 ১২. ড. আইক আহমেদ
ড. আইক আহমেদ কানাডায় একটি বড় চক্ষুনিরাময় কেন্দ্র চালান। তিনি একজন বিশ্বখ্যাত গ্লুকোমা-বিশেষজ্ঞ। দিনে ছয়শ রোগী দেখেন! সৎ ও সোজাসাপ্টা আচরণের মাধ্যমে রোগীদের আস্থা গড়ে তোলাই তার ব্যবসায়িক হাতিয়ার। যদি সার্জারির প্রয়োজন না হয়, তিনি সেটা সরাসরি জানিয়ে দেন। অযথা টাকা শুষে নেন না রোগীদের কাছ থেকে।
মাত্র ত্রিশের ঘরে বয়স হলেও গ্লুকোমা চিকিৎসার ময়দানে তিনি নেতৃত্বস্থানীয়। ক্ষেত্রটা খুবই সংকীর্ণ, কিন্তু এ থেকেই তার বার্ষিক আয় ছয় বিলিয়ন ডলার। হাজার হোক, গ্লুকোমা সারা বিশ্বে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ। ড. আইক আবিষ্কার করেছেন যে, বহুল প্রচলিত চোখের ড্রপ ও সার্জারি চিকিৎসা হিসেবে যথেষ্ট নয়।
লোকে তাকে ডাকে, 'চক্ষুবিজ্ঞানের রকস্টার!' এটা মোটেও রসিকতা নয়। যদি কখনো তার অপরেশনের ভিডিওগুলো দেখেন, তাহলে বুঝবেন, কেন তাকে দুনিয়ার সেরা চক্ষু সার্জনদের একজন বিবেচনা করা হয়।
📄 ১৩. ডক্টর ফারুক এল বায
আজ থেকে প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগের কথা। এইমাত্র ঈগল নামের 'লুনার মডিউল' অবতরণ করেছে চাঁদের পৃষ্ঠে। টেক্সাসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে রুদ্ধশ্বাস দৃশ্যটি দেখছেন কয়েকজন বিজ্ঞানী ও মহাকাশ বিশেষজ্ঞ। সাথে দেখছে সারা দুনিয়ার মানুষ। চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করলেন এডউইন অলড্রিন ও নীল আর্মস্ট্রং। আর মাইকেল কলিন্স ছিলেন স্পেস ক্রাফটে। টেক্সাসের হিউস্টন গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে পুরো বিষয়টি তদারক করছিলেন একদল দক্ষ ক্রু। এটাই সেই বিখ্যাত অ্যাপোলো-১১ প্রজেক্ট। যাতে কাজ করছেন কয়েকজন বাঘা-বাঘা বিজ্ঞানী। তাদের মাঝেই একজন একত্রিশ বছর বয়সী মিশরীয় বিজ্ঞানী ফারুক আল-বায। চন্দ্রপৃষ্ঠের কোথায় স্পেস ক্রাফট অবতরণ করবে, এই দায়িত্বে নিয়োজিত কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন তিনি।
সুবিখ্যাত চন্দ্রাভিযান প্রোগ্রামে কাজ করেছেন মিশরীয় বিজ্ঞানী ড. ফারুক এল বায। তার সাথে কথা বলেছি আমি। তার "কেন" হলো তার দুই কন্যা। ওদের মুখে খাবার জোগানো লাগবে। এই ইচ্ছার কারণেই অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা সামলাতে পেরেছেন তিনি। বাগিয়ে নিয়েছেন প্রথম চন্দ্রাভিযান প্রকল্পে অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদোন্নতি। এবার বলুন, আপনার "কেন"টা কী?