📘 সম্পদ গড়ার কৌশল > 📄 ২. তারিক ফরিদ

📄 ২. তারিক ফরিদ


তিনি এডিবল অ্যারেঞ্জমেন্টসের চেয়ারম্যান। ২০০৯ সালে তিনি বর্ষসেরা উদ্যোক্তার পুরস্কার পেয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল ফ্রাঞ্চাইজ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে। আর ২০১৭ সালে পেয়েছেন আন্তর্জাতিক ফ্রানচাইজ অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সম্মাননা পুরস্কার। তিনি তার বিজনেস মডেল বড় করেছেন ফ্র্যাঞ্চাইজ পদ্ধতি ব্যবহার করে।

এক সাক্ষাতকারে প্রশ্ন করা হয়েছিল, 'আপনার পাঁচটি বিশেষ টিপস বলুন। যেগুলো সিইও হওয়ার আগে জানলে আপনি আরও উপকৃত হতে পারতেন। আর প্রতিটি টিপসের সাথে একটি করে ঘটনা বলবেন প্লিজ!' তারিক ফরিদ বলেন, 'মনে রাখবেন:

১. প্রতিটি বড় সফলতাই শুরু হয় ছোট থেকে— আজকে এডিবল অ্যারেঞ্জমেন্ট সবার কাছে একটি পরিচিত নাম। সামান্য লোকাল ব্যবসা থেকে শুরু করেছি। আজকে এটি বিশাল চেইন বিজনেস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি সব সময় শুরুর দিনগুলোর কথা মনে রাখি। আপনিও যদি কোন ছোট ব্যবসা শুরু করেন, তাহলে চারপাশে বড় বড় ব্র্যান্ডের নাম দেখে ঘাবড়াবেন না। রাস্তার কোথাও 'বার্গার কিং' কিংবা 'ওয়ালগ্রিন্স' এর নাম দেখলে ভাববেন, এরাও একদিন ছোট থেকেই শুরু করেছিল। ছোট ব্যবসা শুরু করা মানে বাস্তববাদী হওয়া। কিভাবে এক ডলারকে দুই ডলার বানানো যায়, এই চিন্তা করতে হয়। সবার গল্পটা এমনই। কেউই রাতারাতি বড়লোক হয়নি। প্রত্যেক সিইও'র উচিত দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হওয়া। যেন তিনি নিজের প্রতিষ্ঠানকে এক ধাপ করে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন।

২. নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন— আমাদের ব্যবসা যখন বড় হতে লাগল, শুভাকাঙ্খীরা বলছিল, এখন আমার একজন 'সিইও' লাগবে! তখন আমার অতটা আত্মবিশ্বাস ছিল না। আমিও ভাবলাম, আমি একা পুরোটা সামাল দিতে পারব না। তাই 'ঠিকভাবে' কোম্পানি চালানোর জন্য একজন 'সিইও' খুঁজতে লাগলাম। এরপর বিভিন্ন প্রার্থীদের সিভি দেখে মাথা ঘাবড়ে যাওয়ার দশা। আমি তো তাদের যোগ্যতার ধারেকাছেও নেই! কিন্তু সাহস করে ইন্টারভিউ নেওয়া শুরু করলাম। দেখলাম, সবাই বলছে, 'আমি আপনার কোম্পানী দেখে মুগ্ধ! এতদিন আপনি যা করেছেন সত্যিই অসাধারণ! আমরা শুধু এই মোমেন্টাম ধরে রাখতে চাই।' আমি মনে মনে ভাবলাম, আমি শুন্য থেকে শুরু করে ৬০% পর্যন্ত এসেছি। এখন বাকি ৪০% এগিয়ে নেয়া বাকি। বাকি অগ্রগতিটুকু অর্জন করাই কঠিন। আমি এমন কাউকে খুঁজছিলাম, যে আমার কোম্পানিকে এই পরের ধাপে নিয়ে যাবে। কিন্তু এতগুলো প্রার্থীর সাথে কথা বলে বুঝলাম, অন্য কাউকে দিয়ে হবে না, এই কাজ আমাকেই করতে হবে! আমিই আমার বেস্ট চয়েস! কারণ আমার চোখে স্বপ্ন আছে, একটা ভিশন আছে! আমি জানি কিভাবে পরের ধাপে উঠতে হবে। ব্যবসায় সাফল্যের মুখ দেখার জন্য যা-যা করা প্রয়োজন, এতদিন করেছি। তাই কোন ভাড়াটে সিইও না এনে, আমিই হয়ে গেলাম আমার প্রতিষ্ঠানের সিইও!

৩. ব্যবসা শুরু করা আর ব্যবসা বড় করার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই— সিইও হিসেবে আপনাকে ব্যবসার প্রসার ধরে রাখতে হবে। একটা প্রচলিত মিথ হলো শুন্য থেকে শুরু করে ৫০% পর্যন্ত কাজ করা একরকমের, আর বাকি ৫০% আরেক রকমের। আমিও শুরুতে তাই ভাবতাম। হ্যাঁ, কিছু কলা-কৌশলগত পার্থক্য তো থাকবেই। কিন্তু একই কর্মনীতি ও কমিটমেন্ট মেনে কাজ করতে হবে। 'বিগ-পিকচার-মাইন্ডসেট' থাকতে হবে। তা আপনি ছোট কোন উদ্যোগ নেন, কিংবা কোন মিলিয়ন ডলার কর্পোরেশনের সিইও হোন না কেন!

৪. ধারাবাহিকতা খুব জরুরী— যখন নতুন নতুন সুযোগ সামনে আসতে থাকে, তখন আদি লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার লোভ সামলানো খুব কঠিন। প্রাথমিক সফলতা দেখে উত্তেজিত না হয়ে মূল লক্ষ্যকে ধরে রাখুন। সরে যাওয়া চলবে না। আমি সবসময় "পঞ্চ-পি" নীতি মেনে চলি। এগুলো হলো— প্রমিস, প্রডাক্ট, প্লেস, পিপল ও পারপাস। অর্থাৎ, প্রতিজ্ঞা, পণ্য, লোকেশন, মানুষ ও লক্ষ্য। এর কোনোটি ছুটে গেলে আমি মূল পথ থেকে সরে যাব।

৫. জাস্ট ডু ইট!— নাইকির এই কথাটা আমার দারুণ লাগে। কোন সুযোগ হারানো যাবে না। সব আইডিয়াই আপনাকে সফলতা দেবে না। কিছু ব্যর্থতাও আসবে। কিন্তু এটাই সাফল্যের পথ। চেষ্টা না করলে সফল হবেন কিভাবে?

আমার মা একটা দারুণ কথা বলতেন। মা বলতেন, 'জ্ঞান হলো পানির মতো। পানি সব সময় নিচের দিকে গড়ায়। কাজেই তুমি যদি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা চাও, তোমাকে বিনয়ী হতে হবে, নত হতে হবে। কারো কাছে জ্ঞানের সন্ধান পেলে, তার কাছে ছুটে যাও। তার সামনে বিনয়ী হও। তাহলেই কিছু শিখতে পারবে।' তারিক ফরিদের চোখে তার মা-ই ছিলেন তার প্রথম উপদেষ্টা। তিনি বলেন, "মা বলতেন, 'টাকার পিছনে ছুটো না। টাকা তো খরচ হয়েই যায়। তোমার কাজটা ঠিকমতো করো, টাকা এমনিতেই আসবে।' শুধু টাকার পেছনে ছুটতে থাকলে আপনি কুলাতে পারবেন না। কারণ, টাকা যতই থাকুক চাহিদার শেষ নেই!"

বলতে গেলে প্রায় শূন্য থেকে শুরু করেছেন তারিক। বাবার হাত ধরে যখন প্রথম আমেরিকায় এলেন, তখন তিনি তের বছরের একজন বালক। সেই দিনগুলো অনেক কষ্টের ছিল। গায়ে ভালো জামা কাপড়ও ছিল না তার। এক প্রতিবেশীর বাড়ির ঘাস কেটে দিতেন, আর শীতকালে তুষারপাত হলে সেগুলো পরিষ্কার করে দিতেন। এটাই ছিল তাঁর প্রথম উপার্জন। এসব কাজ করে কয়েকটি বিস্কুট পেতেন তিনি! কিন্তু কোন কাজকেই ছোট করে দেখতেন না ফরিদ। একদিন খুব সকালে প্রতিবেশীর বাড়ির লনে চলে এলেন শাবল নিয়ে। অথচ তখনও তুষারপাত হচ্ছে! বাড়িওয়ালী আন্টি বললেন, 'বাবা! এখনো তো তুষারপাত থামেনি!' ফরিদ বললেন, 'আমি জানি। কিন্তু আমার আসতে দেরি হলে অন্য কেউ এসে এই কাজ নিয়ে নেবে! তাই আগেই চলে এসেছি!' মহিলাটি অবাক হয়ে বলল, 'পরিশ্রমের এই মানসিকতা ধরে রাখো। একদিন কোটিপতি হতে পারবে!'

কথাটি ভুল হয়নি। সেই তের বছরের বালক ঠিকই কোটিপতি হয়েছিলেন, বয়স পঁয়ত্রিশ হওয়ার আগেই! ফরিদ বললেন, '১৯৮৬ সালে আমার বয়স ছিল সতের। মাত্র ৬০০ স্কয়ার ফুটের একটি ফুলের দোকান কিনলাম। তাও আবার এক বন্ধুর কাছ থেকে টাকা ধার করে। দোকানের প্রথম কর্মচারী ছিল আমার মা! স্কুলে যাওয়ার পথে মাকে দোকানে নামিয়ে যেতাম। স্কুল ছুটির পর বাকি সময় আমি দোকানে থাকতাম। মা পাকিস্তানে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছিলেন। কিন্তু তার কাছ থেকেই আমি সফলতার রহস্য শিখেছি। প্রথমদিকে আমরা দিন-রাত পরিশ্রম করতাম মাত্র একশো ডলার রোজগারের জন্য।

এরপর একদিন মাথায় এই আইডিয়াটি এলো— ফুলের তোড়ার বদলে ফল সাজিয়ে বিক্রি করলে কেমন হয়! নানা রকমের ফল কেটে, বিভিন্ন আকৃতি দিয়ে ফুলের তোড়ার মত সাজিয়ে বিক্রি করব! আইডিয়া শুনে সবাই ভাবল আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে! কিন্তু প্রথমবার যখন এক ঝুড়ি ফল সাজালাম, মা বললেন— 'দারুন লাগছে তো দেখতে! মনে হয় এই ব্যবসা ক্লিক করবে!' মায়ের কথা মেনে আমি চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। এরপর ১৯৯৯ সালের ইস্টারে আমরা একদিনেই ২৮টি অর্ডার পেয়েছিলাম। তখন থেকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আমরা বুঝলাম, 'আমাদের সোনার খনি খুঁজে পেয়েছি!'"

📘 সম্পদ গড়ার কৌশল > 📄 ৩. আলিকো দাঙ্গোতে

📄 ৩. আলিকো দাঙ্গোতে


জনাব আলিকো দাঙ্গোতে বাস করেন আফ্রিকায়। বিরাট ধনী এই ব্যক্তিটির মোট সম্পদের পরিমাণ কুড়ি বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। মিশরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে আসা আলিকো এখন আফ্রিকার সর্বোচ্চ সম্পদশালী উদ্যোক্তা।

তিনি আফ্রিকার শীর্ষ ধনী। ছোটবেলা থেকেই তার ছিল ব্যবসায়ী মন। তিনি বলেন, 'যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম, স্কুলে যাওয়ার সময় এক বাক্স ক্যান্ডি কিনে নিতাম। স্কুলে গিয়ে এগুলো বিক্রি করতাম। আর টাকা কামাতাম! তখন থেকেই ব্যবসার প্রতি আগ্রহ ছিল আমার।'

আলীকো দাঙ্গোতে যেন সত্যিই সেই মানুষদের একজন, যাদের হাতে সোনা ফলে। যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই সফল হয়েছেন। অন্যরা যেখানে 'রিস্ক-ফেইলিওর' হিসাব করে, সেখানে তিনি সফলতা দেখতে পান। অন্যেরা যখন হাল ছেড়ে দেয়, তিনি সেখানে ঝুঁকি নেন। ঝুঁকি নিতে মোটেও ভয় পান না তিনি।

'২০০৮ সালে আমি দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী কৃষ্ণাঙ্গ হয়েছি। এই সাফল্য একদিনে আসেনি। এর জন্য তিরিশ বছর কাজ করতে হয়েছে। আজকালকার তরুণরাও আমার মত হতে চায়। কিন্তু তারা পরিশ্রম করতে চায় না। রাতারাতি সফলতা চায়। এভাবে হয় না। ব্যবসায় সফল হতে হলে, ছোট থেকেই শুরু করতে হয়। তবে স্বপ্ন দেখতে হয় বড় বড়। জিদ থাকলে সফল হবেন, এটাই সকল উদ্যোগের মূলকথা।'—আলীকো দাঙ্গোতে।

📘 সম্পদ গড়ার কৌশল > 📄 ৪. আযিম রিযভী

📄 ৪. আযিম রিযভী


মিনম্যাক্স রিয়েলিটি ইনকর্পোরেশন এর কর্ণধার আযিম রিযভী মনে করেন, কর্মচারীদেরকে স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, 'দৈনিক কয়জন মানুষের পিছনে লেগে সম্ভব? সবার খুঁটিনাটি বিষয়ে তদারকি করা কি সম্ভব?'

সম্ভব নয়। তাই না? আপনি সর্বোচ্চ একজন মানুষের খুঁটিনাটি বিষয় তদারকি করতে পারবেন। কাজেই, বিশ্বস্ত কর্মচারী নিয়োগের বিকল্প নেই। আপনি সবার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। এর পরিবর্তে সঠিক মানুষকে কাজে নিয়োগ দিন, তাদের সাথে ঠিকঠাক চুক্তি করে নিন, এরপর তাদেরকে কাজে ছেড়ে দিন। এটাই উন্নত মাত্রার নিয়ন্ত্রণ-কৌশল। মিস্টার রিজভী তার কর্মচারীদেরকেই একেকজন উদ্যোক্তা বানিয়ে ছাড়তেন। এটাই ছিল তার বিজনেস মডেল।

তার জন্ম পাকিস্তানের লাহোরে। কয়েক বছর রিয়েল এস্টেট ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার পর নিজের কোম্পানি মিনম্যাক্স এর যাত্রা শুরু হয় ২০০৬ সালে। কিন্তু শুরুটা হয়েছিল আরো আগে। প্রায় পঁচিশ বছর আগে লাহোরে তার প্রথম বাড়িটি বানিয়েছিলেন তিনি। রিজভী বলেন, 'একটি স্বপ্নের বাড়ি মানে আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ। আপনার নিজের বাড়ির স্বপ্ন পূরণ করা বা অন্যদের স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করতে পারাই আমার কাজের প্রধান শক্তি!'

📘 সম্পদ গড়ার কৌশল > 📄 ৫. REDCO এর সিইও জনাব মজিবুর রহমান

📄 ৫. REDCO এর সিইও জনাব মজিবুর রহমান


"নগণ্য পরিমাণ সম্পদের অধিকারী কিছু মানুষ কী শান্তিতে জীবন কাটায়! এই ব্যাপারটি সবসময় বিস্মিত করে এসেছে আমাকে। এর চেয়েও বেশি বিস্মিত হয়েছি কী দেখে, জানেন? বিরাট বড় ধনকুবের, কিন্তু সে সম্পদ হারিয়ে ফেলার পরও একটুও চিন্তিত নন। যেমন— REDCO এর সিইও জনাব মুজীবুর রহমান। মিথ্যে অভিযোগে একবার জেল খাটতে হয়েছিল তাকে। সেসময় তিনি হারিয়ে বসেন কোটি ডলারের নির্মাণকাজের ব্যবসা। কিন্তু তিনি তা নিয়ে উদ্ভ্রান্ত হয়ে যাননি। এজন্যই শূন্য থেকে শুরু করে আবারও গড়ে তুলতে পেরেছেন হারানো সম্পদ।"

সুদর্শন মুজিবুর রহমান খান ছিলেন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড, পিসিবির সাবেক চেয়ারম্যান। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতির পদেও ছিলেন তিনি। নির্মাণকাজ ও ব্যাবসায়িক সেক্টরে তার আছে প্রভূত অভিজ্ঞতা। ১৯৮০ সাল থেকেই পাকিস্তান ও কাতারের বাজারে ব্যবসা চালিয়ে আসছেন তিনি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00