📄 যৌগিক উপকার
অর্থাৎ একই সময়ে দুই ধরনের কাজ করা। যেমন:
ধরো, তুমি কারও সাথে ব্যায়াম করতে যাচ্ছ। তাহলে এই সুযোগে যেমন ব্যায়াম বা বিনোদনের কাজ করা সম্ভব, তেমনই সামাজিক কাজও করা সম্ভব।
ধরো, তুমি ব্যায়াম বা বিনোদন করছ। পাশাপাশি মোবাইলের মাধ্যমে অথবা সাউন্ডবক্সের মাধ্যমে কোনো দরসও শুনছ। তাহলে একসাথে তোমার ব্যায়ামও হলো জ্ঞানার্জনও হলো। বর্ণিত আছে যে, হাফিজ জাহাবি তার লিখিত 'তাজকিরাতুল হুফফাজ' কিতাবে উল্লেখ করেছেন, খতিব বাগদাদি হাঁটার সময় হাতে কিতাব রাখতেন এবং তা পড়তেন।
তুমি কোনো আত্মীয়ের সাথে দেখা করতে যাওয়ার সময় যদি পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত মুখস্থ করো, তাহলে একই সময়ে তোমার সামাজিক সম্পর্কও রক্ষা হলো, আমলের দিকটিও রক্ষা হলো।
এটা হচ্ছে প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ। যা দ্বারা একই সাথে অনেক কাজ করা সম্ভব। আব্দুর রহমান বিন ইমাম আবি হাতিম আর-রাজি বলেছেন, 'প্রায় সময় আমি খাওয়ার সময় পড়তাম, হাঁটার সময় পড়তাম, বাইতুল খলায় প্রবেশ করার সময় পড়তাম-এমনকি কিছু খোঁজার জন্য ঘরে প্রবেশ করার সময়ও পড়তাম।'
অবসরের এই সময়গুলোকে তিনি গুরুত্ব দেওয়ার ফলশ্রুতিতে আজ আমরা পেয়েছি নয় খণ্ডের কিতাব 'আল- জারহ ওয়াত তা'দিল', একাধিক খণ্ডের তাফসিরের কিতাব এবং প্রায় এক হাজার খণ্ডের সনদের কিতাব।
📄 চোরের হাত কর্তন
তুমি ছাড়া কেউ তোমার সময় নষ্ট করতে পারবে না। যদি মনে করো যে, কেউ এসে তোমার সময় নষ্ট করে, তাহলে তুমিই তো তাকে সুযোগ করে দিলে সময় নষ্ট করার জন্য এবং তোমার ধনভান্ডার চুরি করার জন্য। যেমন:
• সহসা কারও আগমন
হঠাৎ কেউ তোমার কাছে চলে আসার দ্বারা তোমার সময় নষ্ট হতে পারে। এটার সমাধান মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে কারিমে দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন:
وَإِن قِيلَ لَكُمُ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا هُوَ أَزْكَى لَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ
যদি তোমাদের বলা হয় ফিরে যাও, তবে ফিরে যাবে। এতে তোমাদের জন্য অনেক পবিত্রতা আছে এবং তোমরা যা করো, আল্লাহ তা ভালোভাবে জানেন।' ৩০
• কাউকে নিষেধ করতে না পারা
- যখন তোমাকে কেউ কোনো কাজ দেয় আর তুমিও নিশ্চিত থাকো যে, কাজটি তোমার পক্ষে সম্পাদন করা সম্ভব নয়, তাহলে তার কাছে অক্ষমতার কথা প্রকাশ করার সাহস আছে তোমার, নাকি বিব্রতবোধের কারণে নতি স্বীকার করবে?
- তোমার বন্ধুরা যখন তোমার ঘুমের সময়েও পাশে বসে বসে আড্ডা দিতে থাকে, তখন মুখ খুলে তাদের কিছু বলতে পারবে?
- যখন তোমার কোনো সহপাঠী বা সহকর্মী এমন কোথাও যেতে বলবে, যেখানে গেলে আল্লাহর অবাধ্যতা করতে হবে, তখন পারবে কি তাকে বারণ করতে?
• পরিকল্পনায় দুর্বলতা
পরিকল্পনা হলো একটি সেতু। যা তোমার বর্তমান ও তোমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের মাঝে সম্পর্ক তৈরি করে। যেকোনো কাজের দুটি অংশ থাকে। একটি হলো পরিকল্পনার অংশ। আরেকটি হলো বাস্তবায়নের অংশ। স্টিফেন কোভি বলেছেন, 'আমরা যদি কাজের শুরুতে পরিকল্পনা না করি, তাহলে সেই কাজের বাস্তবায়ন আমাদের ইচ্ছানুযায়ী হবে না।'
• ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট টিভি
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, বর্তমানে আরব যুবকরা দৈনিক প্রায় ৭ ঘণ্টা সময় নষ্ট করে ইন্টারনেটে। কেউ কেউ সামান্য উপকৃত হলেও অধিকাংশেরই ফলাফল শূন্য।
তাই সুন্দর সমাধান হলো, তোমার সময়ের প্রত্যেকটি মুহূর্তকে ভালো কাজ দ্বারা পূর্ণ করে নাও; সময়ের চারটি দিক বাস্তবায়ন করো—যাতে শয়তান তোমাকে কোনোভাবে অবহেলা, অলসতা ও হারাম কাজে লিপ্ত করতে না পারে।
• কালক্ষেপণ
এটি একটি কঠিন রোগ। আল্লাহ তাআলা এর থেকে আমাদের হিফাজত করে বেশি বেশি তাঁর আনুগত্য করার তাওফিক দান করুন। ইবনুল আতা বলেন, 'সময় পেলেই ভালো কাজ দ্বারা তা শিকলাবদ্ধ করে ফেলো, যাতে বিলম্বিত করার সুযোগ থাকলেও তা তোমাকে গ্রাস করতে না পারে।'
প্রত্যেক আমলের জন্য নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। সেই সময়েই তা আদায় করতে হয়। তার আগে বা পরে আদায় করা যায় না। যেমন: ফজরের সালাত সূর্য উদিত হওয়ার আগে আদায় করতে হয়। অন্যথায় শয়তান তোমার কানে প্রশ্রাব করবে। এভাবে প্রত্যেক সালাতের জন্য সময় নির্ধারণ করা আছে। পরবর্তী সালাতের সময় হওয়ার আগেই তা আদায় করে নিতে হয়। যদি আদায় করা না হয়, তাহলে সালাত আদায় হবে না; বরং কাজা হয়ে যাবে। আরাফার ময়দানে অবস্থানের শেষ সময় হলো সূর্য ডুবার পূর্ব পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে আরাফায় অবস্থান করতে না পারলে হজই আদায় হবে না। ইদুল ফিতরের সদাকা ইদের সালাতের পূর্বেই আদায় করে দিতে হয়। রমাজানের রাতে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত পানাহারের সুযোগ থাকে। এ সব কিছুতেই সময় বেঁধে দেওয়ার কারণ হলো, মানুষ যেন কালক্ষেপণ না করে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা যেই পন্থায় আমল করতে বলেছেন, সেই পন্থাই অবলম্বন করো। যাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞার সাথে আমল করাই তোমার জীবনের লক্ষ্য হয়ে যায়। অক্ষমতা ও অলসতা নয়।
• অসৎ সঙ্গ
জীবনে বহুবার তুমি অসৎ সঙ্গীদের ডাকে সাড়া দিয়ে রাতের পর রাত অতিবাহিত করেছ হারাম কাজে।
- অনেকবার তুমি তোমার উদাসীন ও গাফিল বন্ধুদের উস্কানিতে প্রলুব্ধ হয়ে হারাম কথায় বা হারাম কিছু দেখায় লিপ্ত হয়েছ।
- অসৎ সঙ্গীরা জীবনে কতবার তোমার মাঝে অশ্লীলতার প্রবণতা আর হারামের বীজ বপন করেছে! ফলে তুমি তাতে সময় নষ্ট করেছ। যা কিয়ামতের দিন তোমার কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
অলস ও সময় নষ্টকারীদের সাথে সঙ্গ দেওয়া যুবকদের সময় ও যৌবনের শক্তি নষ্ট করে। এ ছাড়াও যেকোনো ব্যক্তিকে তার সঙ্গী-সাথিদের দ্বারাই চেনা যায়। এ জন্যই আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ পুরুষদের দৃঢ়তার জন্য বলেছেন, 'ব্যক্তিকে তার সঙ্গীদের ওপর ভিত্তি করে বিবেচনা করো। কেননা, কোনো ব্যক্তি তার মতো কারও সাথেই মিশে।'
এ সকল সমস্যার সমাধান হলো, পরিবর্তন। অর্থাৎ খারাপ সঙ্গগুলোকে ভালো সঙ্গ দ্বারা পরিবর্তন করা। খারাপ বন্ধুদের সঙ্গ ছেড়ে খুব দ্রুত আরও উত্তম, মুত্তাকি ও নেককার সঙ্গী নির্বাচন করো।
**টিকাঃ**
৩০. সুরা আন-নুর: ২৮।
📄 দুঃখিত, সময় ফুরিয়ে গেছে!
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে কারিমে মানুষের দুটি অবস্থার চিত্র তুলে ধরেছেন। যেখানে মানুষ চূড়ান্তভাবে পরিতাপ করবে, হা-হুতাশ করবে অতীতের নষ্ট হওয়া সময়গুলো নিয়ে এবং প্রতিটি সময়ের মূল্য হাড়ে হাড়ে অনুভব করবে। কিন্তু তার এই পরিতাপ সেদিন কোনো কাজে আসবে না।
প্রথম অবস্থান হলো, মৃত্যুর সময়। তখন অবহেলাকারীরা চিৎকার করে বলতে থাকবে : حَتَّى إِذَا جَاء أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُونِ لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ
'যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, তখন সে বলে, “হে আমার পালনকর্তা, আমাকে পুনরায় (দুনিয়াতে) প্রেরণ করুন। যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি করিনি।” ৩১
দ্বিতীয় অবস্থান হলো, আখিরাতে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ كَأَن لَّمْ يَلْبَثُوا إِلَّا سَاعَةً مِّنَ النَّهَارِ يَتَعَارَفُونَ بَيْنَهُمْ
'আর যেদিন তিনি (আল্লাহ) তাদের সমবেত করবেন, যেন তারা দিনের এক মুহূর্তের বেশি অবস্থান করেনি। তারা একে অপরকে চিনতে পারবে। ' ৩২
كَاَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا عَشِيَّةٌ أَوْ ضُحَاهَا
'যেদিন তারা একে দেখবে, সেদিন মনে হবে যেন তারা দুনিয়াতে মাত্র এক সন্ধ্যা অথবা এক সকাল অবস্থান করেছে।' ৩৩
**টিকাঃ**
৩১. সুরা আল-মুমিনুন: ৯৯-১০০।
৩২. সুরা ইউনুস: ৪৫।
৩৩. সূরা আন-নাজিআত: ৪৬।