📄 যৌবনের সময়
হে যুবক, নিশ্চয় যৌবনের সময়গুলো দীপ্তিমান ক্ষমতা, বেগবান প্রাণশক্তি এবং সীমাহীন দানের সময়। যেই সুযোগটাতে তুমি বিস্ময়কর কিছু করতে পারতে এবং প্রজ্বলিত করতে পারতে আশার প্রদীপগুলো। যদি এই সুযোগগুলোতে উত্তম কিছু না করো, তাহলে তুমি সফলতার রেলগাড়ি হারালে। কবি বলেন :
إذا المرء أعيته المروءة ناشئا فمطلبها كهلا عليه عسير
'জীবনের সূচনাতে যদি মানুষ ব্যক্তিত্ব অর্জনে সক্ষম না হয়, তবে বয়সকালে তা অর্জন কঠিনই বটে।'
যৌবন যেহেতু তোমার প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গনিমত, তাই তোমাকে এ সম্পর্কে দুবার হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। প্রথমত, তোমার জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে এবং দ্বিতীয়ত, তোমার যৌবন সম্পর্কে।
হে যুবক, সময়, সুস্থতা, শক্তি, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ— সবগুলোই আছে তোমার। এই নিয়ামতগুলোর কিছু চাহিদা ও হক রয়েছে তোমার ওপর। বর্তমানে সবাই প্রতিযোগিতা করে চলে। নেককাররাও প্রতিযোগিতা করে, বদকাররাও প্রতিযোগিতা করে। কেউ বিনাশী লক্ষ্যের দিকে ছোটে, আর কেউ ভালো লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়। ফেরেশতারাও প্রতিযোগিতা করে আবার শয়তানও প্রতিযোগিতা করে। জান্নাত নিয়েও প্রতিযোগিতা করা হয় আবার জাহান্নামের দিকেও প্রতিযোগিতা করা হয়। এবার তুমিই নির্বাচন করো, তুমি কোন দিকে প্রতিযোগিতা করবে?
বি.দ্র.
যুবকরা বিয়ের পরের তুলনায় বিয়ের পূর্বে বেশি অবসর থাকে।
কাজের পূর্বে ও পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকেও যুবকরা অবসর থাকে।
যুবকরা যদি দ্রুতই সময়ের মূল্য অনুধাবন করত, তাহলে তাদের জন্য বিষয়টি কল্যাণকর হতো। আর তা অনুধাবনে যতই দেরি হবে, ততই ক্ষতি হবে।
কবি বলেন :
اثنان لو بكت الدماء عليهما عيناي حتي يؤذنا بذهاب لم يبلغا المعشار من حقيهما فقد الشباب وفرقة الأحباب
'দুটি বিষয়ের জন্য যদি চক্ষু কাঁদতে কাঁদতে রক্ত প্রবাহিত করে, এমনকি যদি চক্ষু আলোকহীন হয়ে যায়।
তবুও তার দশ ভাগের এক ভাগ হকও আদায় করতে পারবে না, বিষয় দুটি হলো, যৌবন ও প্রিয়জনের বিচ্ছেদ।'
📄 কল্পনার সাথে সম্পৃক্ত হোয়ো না
এখানে বোঝানো হয়েছে যে, কাজ বিলম্বিত করে ভবিষ্যতে অবস্থা ভালো হওয়ার আশা রাখা এবং সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিকটবর্তী সময়ে না করা। আবুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ খুব সুন্দর কথা বলেছেন। তিনি বলেন, 'প্রিয় ভাই, যখন তোমার বয়স বেড়ে যাবে, তখন দায়িত্বও বেড়ে যাবে, সম্পর্ক বেড়ে যাবে, সময় সংকীর্ণ হয়ে যাবে, শক্তি হ্রাস পেতে থাকবে। বার্ধক্যকালে সময় খুবই সংকীর্ণ হয়ে যাবে, শরীর দুর্বল হয়ে পড়বে, সুস্থতা লোপ পাবে, উদ্যম কমে যাবে, দায়িত্ব-কর্তব্যগুলো জীবনকে কোণঠাসা করে তুলবে। সুতরাং জীবনে যখনই সময় পাবে, তা কাজে লাগাও। কেননা, এটাই তোমার সুযোগ। অজানা ভবিষ্যতের জন্য কিছু রেখে দিয়ো না। প্রতিটি পাত্র অর্থাৎ সময় কোনো না কোনো ব্যস্ততা দ্বারা পরিপূর্ণ।'
📄 মাঝামাঝির শূন্যস্থানগুলো
জনৈক ব্যক্তি তার ভাইকে একটি বালতি পাথর দিয়ে পূর্ণ করতে বলল। ফলে সে বালতিটিকে পাথর দিয়ে পূর্ণ করে ফেলল। অতঃপর তাকে সে বলল, 'আরও ভর্তি করতে থাকো।' উত্তরে তার ভাই বলল, 'বলতি শেষ পর্যন্ত পরিপূর্ণ হয়ে গেছে।' সে বলল, 'বালতিতে এখনো জায়গা আছে। আরও ভর্তি করো।' অতঃপর তার ভাই ছোট ছোট পাথর দিয়ে বড় পাথরের মধ্যকার ফাঁকা জায়গাগুলোতে বালু ঢেলে দিল। কিন্তু তাতেও হলো না। লোকটি আরও পূর্ণ করতে বলল। এখন তার ভাই বুঝতে পারছিল না যে, সে ঠিক কী করবে? ভাবতে ভাবতে সে কিছু বালু নিয়ে ছোট পাথরের মধ্যকার ফাঁকা জায়গাগুলোতে বালু ঢেলে দিল। চতুর্থবার লোকটি তার ভাইকে আবারও বলল যে, 'বালতি আরও পূর্ণ করো।' অতঃপর তার ভাই রাগে উত্তেজিত হয়ে তার চেহারার দিকে তাকিয়ে বলল, 'আর কী পূর্ণ করব?!' অতঃপর সে কিছু পানি নিয়ে এসে পরিপূর্ণ বালতির মাঝে ঢেলে দিল।
যারা জীবনের সময়গুলোকে শেষ করে ফেলছ, প্রতিনিয়ত জীবনের মূল্যবান রত্নগুলোকে নষ্ট করে ফেলছ, তাদের বলছি! তোমার কাছে তো অনেক সময় ও শক্তি আছে। কিন্তু তুমি তো সেগুলোর প্রতি যত্নবান নয় এবং সেগুলোর সঠিক ব্যবহারও করো না।
প্রিয় যুবক ভাইয়েরা, তোমরা যেই অবসর সময়টুকু পার করছ, তাতে শারীরিকভাবে কোনো প্রতিযোগিতা করারও সুযোগ ছিল। অথবা এমন কোনো সামাজিক কাজ করতে পারতে, যা দ্বারা মানবতা উপকৃত হতো। অথবা মৃত ব্যক্তিদের জন্য কিছু করতে পারতে। কিছু মানুষ মরেও অমর হয়ে আছে। স্রোতের ময়লার মতো ভেসে চলে যায়নি। তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু দুনিয়াবাসীদের জন্য কিছু উত্তম কর্ম রেখে গেছে।
• ডেল কার্নেগি বলেছেন, বহু মানুষ সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছে কাজের ফাঁকে ফাঁকে অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে।
• চার্লস ফ্রস্ট একজন মুচি ছিলেন। কিন্তু তিনি দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে নির্দিষ্ট করে একটি ঘণ্টা সময় ব্যয় করে গণিতে উল্লেখযোগ্য পাণ্ডিত্যের অধিকারী হতে পেরেছেন।
■ জন হান্টার ছিলেন একজন কাঠ মিস্ত্রি। কিন্তু তিনি তার কাজের ফাঁকে অবসর সময়ে পড়ালেখা করতে শুরু করেন। তিনি রাতে মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমাতেন। অবশেষে তিনি এই জগতের একজন নক্ষত্র হয়ে গেছেন।
• স্যার জন লেয়ুক একটি ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। দিনভর এত ব্যস্ততা সত্ত্বেও তিনি নির্দিষ্ট কিছু সময় ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনা করতেন। ফলে তিনি হয়েছেন একজন যুগশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক।
■ জর্জ স্টিফেনসন একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। রাতের বেলা সামান্য সময় ব্যয় করে তিনি রীতিমতো গণিত পড়তেন। এভাবে তিনি রেলগাড়ির ইঞ্জিন আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন।
■ জেমস ওয়াট পেশায় একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। কিন্তু তিনি ব্যবসার ফাঁকে ফাঁকে রসায়ন ও গণিত অধ্যয়ন করতেন। ফলে তিনি বাষ্পইঞ্জিন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
আফসোস সেসব মানুষের জন্য, যারা ব্যস্ততার মধ্যকার সময়গুলোকে কাজে না লাগিয়ে দুনিয়া ও আখিরাতের দিক থেকে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, মুসলিমরা হলো সময়কে কাজে লাগানোর জন্য অধিক হকদার, কিন্তু আজ তারাই সবচেয়ে বেশি সময় নষ্ট করছে!
হে আমার ভাই, তোমার অপচয় করা সময়গুলোকে আর নষ্ট না করে জীবনের সাথে আরও একটি জীবন যুক্ত করো। যেমন: কারও সাথে সাক্ষাতের সময়, কোনো কাজের জন্য অপেক্ষার সময়, ডাক্তারের সাথে সাক্ষাতের পূর্বের সময়, চুল কাটার পূর্বের অবসর সময় এবং বিশ্রামের সময়। এই সময়গুলোকে কাজে লাগিয়ে জীবনের মাঝে ভিন্ন একটি জীবন খুঁজে পাবে তুমি。
📄 পকেটের কুরআন আমার অন্তরের প্রশান্তি
ধরে নিলাম যে, তুমি দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে পাঁচ আয়াত করে মুখস্থ করতে পারো। এভাবে একমাসে তোমার মুখস্থ আয়াতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫০-এ। যদি তুমি সুরা বাকারা থেকে এক মাসে ১৫০ আয়াত মুখস্থ করো, তাহলে তো তোমার এক পারার চেয়েও বেশি মুখস্থ হয়েছে। কারণ সুরা বাকারার ১৪২ তম আয়াত দ্বারা প্রথম পারা শেষ হয়েছে। এভাবে দুই মাসে তোমার মুখস্থ আয়াতের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩০০-তে। অর্থাৎ তুমি দুই মাসে সম্পূর্ণ সুরা বাকারা মুখস্থ করে ফেললে। সুরা বাকারার মোট আয়াতসংখ্যা হলো ২৮৬টি। এভাবে যদি চেষ্টা চালিয়ে যাও, তাহলে প্রায় সাড়ে তিন বছর সময়ে তুমি পূর্ণ কুরআনে কারিম হিফজ করতে সক্ষম হবে। অতএব আজ থেকে অবসর সময়গুলোতে একটু একটু করে পবিত্র কুরআনের হিফজ শুরু করার ব্যাপারে কী মনে করো তুমি?
প্রতিদিন কতগুলো সময় তুমি নষ্ট করে ফেলো অবহেলায়...!
অনেক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, আমরা কাজের ফাঁকে একটু একটু করে প্রতিদিন বহু সময় নষ্ট করে ফেলি। যা বাৎসরিক হিসাবে কয়েকটি দিনে পরিণত হয়। ধরো, তোমার বাড়ি থেকে কর্মস্থলে যেতে ১০ মিনিট সময় ব্যয় হয় এবং কর্মস্থল থেকে বাড়িতে ফিরতে আরও ১০ মিনিট সময় ব্যয় হয়। এর অর্থ হলো প্রতিদিন তোমার বাড়ি থেকে কাজে যেতে এবং কাজ থেকে বাড়িতে ফিরতে মোট ২০ মিনিট করে সময় লাগে। আমরা ধরে নিলাম, সপ্তাহে পাঁচ দিন তোমার কর্মস্থলে যেতে হয়। তাহলে এবার আমরা পরিসংখ্যান বের করি যে, প্রতি সপ্তাহে এবং বছরে মোট কত মিনিট সময় তোমার এ কাজে ব্যয় হয়।
৫ (দিন) × ২০ (মিনিট) = ১০০ মিনিট
১০০ মিনিট X ৫৩ (সপ্তাহ) = ৫৩০০ (মিনিট) = ৮৮ (ঘণ্টা)।
এবার চিন্তা করো। যদি তুমি প্রতিদিন আসা-যাওয়ার পথে এই বিশ মিনিটকে কোনো ভালো কাজে ব্যয় করতে, তাহলে বছরে ৮৮টি ঘণ্টা পেয়ে যেতে। তুমি তো ভাবো যে, আমার আসা-যাওয়ার সময়ে তো কিছু করা সম্ভব নয়। কিন্তু তুমি যদি কিছু করার হিম্মত করতে, তাহলে অনেক কিছুই করতে পারতে। হয়তো তোমার সময় আরও বেশিও ব্যয় হয়। তাহলে একটু ভাবো তো! তোমার নিজের কাছেই তো কত সময় পড়ে আছে, যা নষ্ট করে যাচ্ছ প্রতিদিন; অথচ তুমি টেরও পাচ্ছ না।