📄 প্রথমত, লক্ষ্য নির্ধারণ করো
তুমি কোথায় যাবে, যদি সেটাই না জানো—তাহলে কোন পথে যাবে, সেটা না জানাটাই স্বাভাবিক। লক্ষ্যহীন তোমার অবস্থা হবে সেই তরীর মতো, যাকে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ ও প্রবল বাতাস সহজেই গ্রাস করে ফেলে এবং অজানা তীরে নিয়ে পৌঁছায়। ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন যে, এক ঘণ্টার পরিকল্পনাই তোমার জন্য দশ ঘণ্টার কাজ বাস্তবায়নে যথেষ্ট হবে। কারণ, পরিকল্পনা করে কাজ করলে একটি কাজ নিয়ে দুবার ভাবতে হয়। প্রথমত, পরিকল্পনা করার সময়। অর্থাৎ কাজ শুরু করার পূর্বে সেই ব্যাপারে মস্তিষ্ক দিয়ে ভালোভাবে চিন্তা-গবেষণা করা। দ্বিতীয়ত, বাস্তবায়নের সময়। অর্থাৎ পরিকল্পনার পর কাজ সম্পাদনের সময়কে বোঝানো হয়েছে। তবে সবচেয়ে চমৎকার ও বুদ্ধিমানের কাজ হলো, একটি পূর্ণ বছরের জন্য সময়গুলোকে এমনভাবে পরিকল্পনা করে সাজিয়ে ফেলা, যাতে তোমার সময়ের চারটি বাহু তাতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। অর্থাৎ সেই পরিকল্পনার মাঝে তোমার পুরো বছরের আমল করা, যোগ্যতা অর্জন করা, সামাজিক কাজগুলো সম্পাদন করা ও বিনোদন করা-সহ সবগুলোই অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। তা দেখে দেখে তুমি দৈনন্দিন কাজগুলো আনজাম দেবে। যখনই সেই সূচি অনুসরণ করতে গিয়ে তোমার অলসতা পেয়ে বসবে অথবা তুমি ভুলে যাবে, তখনই জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, সফলতা, ব্যর্থতা নিয়ে একটু একটু করে চিন্তা করবে।
📄 আগামী দিনের পরিকল্পনা
ইমাম হাসান আল-বান্না নিজের লোকদের প্রশংসা করে বলেন, 'তাদের একজন এমন, যে শ্রেষ্ঠ সংকল্প নিয়ে ঘুমায়।' এটি একটি উত্তম নাসিহা। যা কেবল তারাই বলতে পারে, যারা নিজেদের সময়কে গনিমত মনে করে। আর যখন তুমি আগামী দিনের পরিকল্পনা করে ঘুমিয়ে পড়ো, তখন রাতের বেলা তো তুমি ঘুমেই অতিবাহিত করলে; কিন্তু আগামী দিন তুমি কী করবে, তা সম্পাদন করার পূর্বেই তোমার আমলনামায় প্রতিদান লিপিবদ্ধ হতে থাকবে এবং তোমার মিজানে একত্রিত হতে থাকবে। আর যদি জাগ্রত থাকো, তাহলে আগামী দিনের সময়সূচি তৈরি করো এবং ঘুমের আগেই তা সম্পূর্ণ করো। আর আগামী দিনের জন্য পরিকল্পনা করে রাখার বিষয়টি মহান রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে কারিমে ইরশাদ করেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللهَ
'হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামী কালের জন্য সে কী প্রেরণ করে, তা চিন্তা করা। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। ' ২৯
এই আয়াতের শেষে উল্লেখিত وَاتَّقُوا اللهَ এর মধ্যে বর্ণিত তাকওয়ার মাঝে দুটি দিক রয়েছে। প্রথমটি হলো, এর পূর্বে বর্ণিত وَاتَّقُوا এর প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো, প্রথম وَاتَّقُوا দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, অতীতের গুনাহগুলো থেকে তাওবা করা এবং দ্বিতীয় وَاتَّقُوا দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ভবিষ্যতে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকা।
সুতরাং তোমার সামনের দিনগুলোতে কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতা করো এবং অতীতের পাপগুলো থেকে তাওবা করো। প্রতিদান অর্জনের জন্য তোমার একেকটি সময় যেন আরেকটি সময়ের সাথে প্রতিযোগিতা করে। কবি মুতানাব্বির ভাষায় :
هو الجد حتي تفضل العين أختها وحتي يكون اليوم لليوم سيدا
'চেষ্টা তো ওই জিনিস, যার ফলে চক্ষু একটির ওপর অন্যটি শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে। আর একটি দিন অন্য দিনের জন্য বাদশাহ হয়ে যায়।'
**টিকাঃ**
২৯. সুরা আল-হাশর: ১৮।
📄 সময় সব এক নয়
এখানে সময়ের চারটি দিক নিয়েই সামান্য আলোচনা করব, যাতে পূর্বের পয়েন্টটি বুঝতে সহজ হয়।
আমলের অংশ
এর কয়েকটি ভাগ রয়েছে। যথা:
✓ বাৎসরিক কিছু আমল রয়েছে। যেমন: রমাজান মাস, শাবান, মুহাররমের মতো মুবারক মাসগুলোর আমল। এই মাসগুলো অত্যন্ত বরকতপূর্ণ, কল্যাণে পরিপূর্ণ এবং এই মাসগুলোতে এমন উৎকৃষ্ট প্রতিদান আল্লাহ তাআলা নিহিত রেখেছেন, যা অন্যান্য মাসের মধ্যে রাখেননি।
✓ বিভিন্ন বিশেষ দিনের আমল। যেমন: জিলহজ মাসের দশ তারিখ, রমাজানের শেষ দশ দিন, প্রতি সপ্তাহের জুমাআর দিন। মর্যাদার দিক থেকে এগুলো অন্যান্য দিনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
✓ দৈনিক কিছু আমল রয়েছে। যেমন: রাতের শেষ তৃতীয়াংশ, আজান ও ইকামাতের মধ্যবর্তী সময়, সালাতের পরবর্তী সময়, ফজরের পর থেকে সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত। এই সময়গুলো দিনের অন্যান্য সময়ের চেয়ে প্রতিদানের দিক থেকে অধিক শ্রেষ্ঠ।
বুদ্ধিমান সে নয়, যে তার শ্রম ব্যয় করেই যায়। বরং বুদ্ধিমান তো সে, যে বুঝে, কখন শ্রম ব্যয় করতে হবে। কারণ, উপযুক্ত সময় বুঝে পরিশ্রম করলে অল্প কষ্টে অনেক বেশি প্রতিদান অর্জন করা যায়।
যোগ্যতা অর্জনের অংশ
যোগ্যতাকে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন সময় রয়েছে। তবে এর মধ্যে ছুটির সময়গুলো অধিক উপযোগী সময়।
সামাজিক কাজের অংশ
ইদের সময়, বিভিন্ন মৌসুম, অসুস্থতার সময় এবং কারও ইনতিকালের সময় পরিবারের সাথে সময় ব্যয় করার সর্বোত্তম সুযোগ।
মুসলিমদের দুর্ভোগের সময়, বিপদগ্রস্তদের সাহায্য প্রার্থনার সময়, দুঃখপীড়িতদের বিপদের সময় দান করার এবং মুসলিম উম্মাহর হক আদায়ের অত্যন্ত উপযুক্ত সময়।
বিনোদনমূলক কাজের অংশ
✓ সপ্তাহের শেষ দিন, বাৎসরিক ছুটির দিন ইত্যাদি সময়গুলো বিনোদন ও ব্যায়াম করার জন্য উপযুক্ত সময়।
✓ যুবকদের জন্য এটি অধিক প্রয়োজন। এ ছাড়াও যে কারও জন্য শরীরচর্চা করা আবশ্যক। তবে যারা অবসর, তারা যেন এই সুযোগ হাতছাড়া না করে।
📄 যৌবনের সময়
হে যুবক, নিশ্চয় যৌবনের সময়গুলো দীপ্তিমান ক্ষমতা, বেগবান প্রাণশক্তি এবং সীমাহীন দানের সময়। যেই সুযোগটাতে তুমি বিস্ময়কর কিছু করতে পারতে এবং প্রজ্বলিত করতে পারতে আশার প্রদীপগুলো। যদি এই সুযোগগুলোতে উত্তম কিছু না করো, তাহলে তুমি সফলতার রেলগাড়ি হারালে। কবি বলেন :
إذا المرء أعيته المروءة ناشئا فمطلبها كهلا عليه عسير
'জীবনের সূচনাতে যদি মানুষ ব্যক্তিত্ব অর্জনে সক্ষম না হয়, তবে বয়সকালে তা অর্জন কঠিনই বটে।'
যৌবন যেহেতু তোমার প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গনিমত, তাই তোমাকে এ সম্পর্কে দুবার হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। প্রথমত, তোমার জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে এবং দ্বিতীয়ত, তোমার যৌবন সম্পর্কে।
হে যুবক, সময়, সুস্থতা, শক্তি, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ— সবগুলোই আছে তোমার। এই নিয়ামতগুলোর কিছু চাহিদা ও হক রয়েছে তোমার ওপর। বর্তমানে সবাই প্রতিযোগিতা করে চলে। নেককাররাও প্রতিযোগিতা করে, বদকাররাও প্রতিযোগিতা করে। কেউ বিনাশী লক্ষ্যের দিকে ছোটে, আর কেউ ভালো লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়। ফেরেশতারাও প্রতিযোগিতা করে আবার শয়তানও প্রতিযোগিতা করে। জান্নাত নিয়েও প্রতিযোগিতা করা হয় আবার জাহান্নামের দিকেও প্রতিযোগিতা করা হয়। এবার তুমিই নির্বাচন করো, তুমি কোন দিকে প্রতিযোগিতা করবে?
বি.দ্র.
যুবকরা বিয়ের পরের তুলনায় বিয়ের পূর্বে বেশি অবসর থাকে।
কাজের পূর্বে ও পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকেও যুবকরা অবসর থাকে।
যুবকরা যদি দ্রুতই সময়ের মূল্য অনুধাবন করত, তাহলে তাদের জন্য বিষয়টি কল্যাণকর হতো। আর তা অনুধাবনে যতই দেরি হবে, ততই ক্ষতি হবে।
কবি বলেন :
اثنان لو بكت الدماء عليهما عيناي حتي يؤذنا بذهاب لم يبلغا المعشار من حقيهما فقد الشباب وفرقة الأحباب
'দুটি বিষয়ের জন্য যদি চক্ষু কাঁদতে কাঁদতে রক্ত প্রবাহিত করে, এমনকি যদি চক্ষু আলোকহীন হয়ে যায়।
তবুও তার দশ ভাগের এক ভাগ হকও আদায় করতে পারবে না, বিষয় দুটি হলো, যৌবন ও প্রিয়জনের বিচ্ছেদ।'