📄 চতুর্থ বাহু : বিনোদনের জন্য সময় ব্যয় করা
অনেকেই বিনোদনের গুরুত্ব বোঝে না। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, বিনোদন মানে জীবনের মূল্যবান সময়গুলোকে নষ্ট করা। অথচ বিনোদন মানবজীবনে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু তাই নয়, যদি নিয়ত বিশুদ্ধ থাকে এবং শরিয়াহর মাপকাঠি অনুযায়ী হয়, তাহলে এটি ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত হবে। ইসলামি শরিয়ায় বিভিন্ন দলিল-প্রমাণের আলোকে এর বৈধতা পাওয়া যায়। বরং শরিয়াহ এর প্রতি উৎসাহিত করেছে। এখানে আমি যুবকদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরব। তা হলো শারীরিক ব্যায়াম। রাসুল ইরশাদ করেছেন:
لَا سَبَقَ إِلَّا فِي نَصْلٍ، أَوْ خُفٌ، أَوْ حَافِرٍ 'নিক্ষেপণ, দৌড় খেলা এবং ঘোড়দৌড় ছাড়া অন্য কিছুতে প্রতিযোগিতা নেই।' ২৭
এখানে نَصْل দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তির নিক্ষেপের মাধ্যমে বিনোদন করা। এ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, দৌড় খেলা। حَافِر দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ঘোড়দৌড় খেলা। সাহাবায়ে কিরামের সময়ের চারটি বিনোদন বা খেলার নমুনা তোমাদের সামনে তুলে ধরা হলো।
الرمي বা নিক্ষেপ করা
এটিকে আমি কী বলব? ইবাদত বলব, নাকি ব্যায়াম বলব? হ্যাঁ, যতক্ষণ পর্যন্ত নিয়ত ঠিক থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত উভয়ের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। একদা নবি কারিম এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তারা পরস্পর প্রতিযোগিতা করছিল। অর্থাৎ তারা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে তির নিক্ষেপের প্রতিযোগিতা করছিল। রাসুল এই অবস্থা দেখে তাদের উৎসাহ দিয়ে বললেন:
ارْمُوا بَنِي إِسْمَاعِيلَ، فَإِنَّ أَبَاكُمْ كَانَ رَامِيًا ارْمُوا، وَأَنَا مَعَ بَنِي فُلَانٍ
'হে বনি ইসমাইল, তোমরা নিক্ষেপ করো। কেননা, তোমাদের পূর্বপুরুষও (ইসমাইল আ.) নিক্ষেপ করতেন। তোমরা নিক্ষেপ করো। আমিও অমুকের সন্তানদের সাথে আছি।'
এ সময় তাদের এক দল নিজেদের হাত গুটিয়ে রাখল। অর্থাৎ তির নিক্ষেপ থেকে বিরত থাকল এবং তা থেকে বারণ করল। অতঃপর রাসুলুল্লাহ বলেছেন: مَا لَكُمْ »لَا تَرْمُونَ؟ 'কী হলো তোমাদের?! নিক্ষেপ করছ না কেন?' তারা বলল, كَيْفَ نَرْيِي وَأَنْتَ مَعَهُمْ؟ 'কীভাবে আমরা নিক্ষেপ করি! অথচ আপনি তাদের মাঝে আছেন।' এ কথা শুনে রাসুল বললেন: »ارْمُوا فَأَنَا مَعَكُمْ كُلُّكُمْ 'নিক্ষেপ করো। আমি তোমাদের সবার সাথেই আছি।' ২৮
এই হাদিসের মধ্যে প্রশিক্ষণকে উন্নত চরিত্রের অংশ বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়। সাহাবায়ে কিরাম যখন নিক্ষেপ থেকে বিরত থেকেছেন, তখন রাসুল-এর সাথে কতই না উত্তম ও সুন্দর ভদ্রতা বজায় রেখেছেন। কেননা, রাসুল তখন বিপরীত দলে ছিলেন। তাই তাঁরা রাসুল-এর ওপর জয়ী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছিলেন যে, ফলে তিনি পরাজিতদের দলে চলে যাবেন।
• العَدْوُ বা দৌড় প্রতিযোগিতা
নবি কারিম আয়িশা সিদ্দিকা-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন। মাঝে মাঝে তিনি আয়িশা-কে পেছনে রেখে আগে চলে যেতেন। আবার মাঝে মাঝে আয়িশা রাসুল-কে পেছনে রেখে সামনে চলে যেতেন। ফলে রাসুল তাকে বললেন, 'এটা হলো (পূর্বেরটার) বদলা।' এখান থেকেই আনসাররা মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতার জন্য রাসুল -এর কাছে অনুমতি চাইতেন। রাসুল -ও তাঁদের অনুমতি দিতেন। যেমনটি আমরা কোনো এক গাজওয়া থেকে ফেরার সময় সালামা বিন আকওয়া -এর হাদিসে দেখতে পাই।
তিনি বলেন, ...একজন আনসার ছিলেন। কেউ দৌড় প্রতিযোগিতায় তার আগে যেতে পারত না। একদা সেই আনসারি লোকটি বারবার বলছিল যে, 'আমার সাথে প্রতিযোগিতা করে মদিনায় যাওয়ার মতো কেউ নেই? আছে কি কোনো প্রতিযোগিতাকারী?' সে এ কথার পুনরাবৃত্তি করেই যাচ্ছিল। সালামা বিন আকওয়া বলেন, 'যখন আমি তার এই ঘোষণা শুনলাম, তখন তাকে বললাম, “তুমি কি কোনো সম্মানিত ব্যক্তিকে ভয় করো না? কোনো ভদ্র ব্যক্তিকে শ্রদ্ধা করো না?” সে বলল, “না। রাসুল ব্যতীত অন্য কারও সাথে প্রতিযোগিতা করতে আমার কোনো ভয় নেই।” তার এ কথা শুনে আমি রাসুল -এর কাছে আরজ করে বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, আমার মা-বাবা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক, আমাকে অনুমতি দিন আমি ওই ব্যক্তির সাথে প্রতিযোগিতা করব।”
রাসুল বললেন, "যদি তোমার ইচ্ছা হয়, তাহলে করতে পারো।” তিনি বলেন, 'রাসুলের অনুমতি পেয়ে আমি বললাম, "আমি তোমার কাছে যাব।” অতঃপর আমি পা দ্বারা দাগ টানলাম এবং লাফ দিয়ে দৌড়াতে শুরু করলাম। অবশেষে আমি তার আগে মদিনায় গিয়ে পৌঁছলাম।'
• المُصَارَعَةُ (কুষ্টি বা মল্লযুদ্ধ)
রাসুল এক মুশরিকের সাথে তিনবার কুস্তি লড়াই করেছিলেন। প্রতিবার একশ বকরির চুক্তি করা হয়েছিল। অতঃপর রাসুল তাকে পরাজিত করে দিয়েছেন। তৃতীয়বারে সে রাসুল-কে উদ্দেশ্য করে বলল, 'হে মুহাম্মাদ, তোমার পূর্বে কেউ আমার পিঠকে জমিন স্পর্শ করাতে পারেনি।' অতঃপর লোকটি ইসলাম কবুল করেছে এবং রাসুল-ও তার বকরিগুলো ফিরিয়ে দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়। রাসুল তো বদর যুদ্ধের সৈন্য সংগ্রহের সময় সামুরা বিন জুনদুব ও রাফি' বিন খাদিজ নামক দুই বালকের মাঝে কোনোরূপ চুক্তি ছাড়া কুস্তি লাগিয়ে দিয়েছেন। অতঃপর সামুরা রাফি'কে পরাজিত করায় রাসুল তাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন। অথচ প্রথমবার সে যুদ্ধের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলে ছোট হওয়ায় তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
■ ঘোড়া বা উট প্রতিযোগিতা
রাসুল তাঁর সবচেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন উষ্ট্রীর সাথে অন্যান্য উষ্ট্রীর দৌড় প্রতিযোগিতা বাধিয়ে দিতেন। সেই উষ্ট্রীকে অন্য কোনো উষ্ট্রী কখনো পরাজিত করতে পারত না। কিন্তু একদিন অন্য একটি উষ্ট্রী তাকে পরাজিত করে ফেলে। তাই সাহাবিরা বলতে লাগলেন যে, 'দ্রুতগামী উষ্ট্রী পরাজিত হয়েছে।' সহিহ হাদিসে ইবনে উমর থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুল ﷺ পা ঢাকা ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে সানিইয়্যাতুল বিদা'য় গিয়েছেন। যার দূরত্ব হলো ছয় থেকে সাত মাইল। অতঃপর নগ্ন পাবিশিষ্ট ঘোড়ায় আরোহণ করে সানিইয়্যাতুল বিদা' থেকে মসজিদে বনি জুরাইকে গিয়েছেন। যার দূরত্ব হলো প্রায় এক মাইলের সমান। এ ধরনের প্রতিযোগিতায় রাসুল ﷺ বিজয়ীকে পুরস্কৃত করতেন।
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত সহিহ হাদিসে উল্লেখ আছে যে, আব্দুল্লাহ বিন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা নবি কারিম ﷺ ঘোড়ার মাঝে প্রতিযোগিতা করলেন। অতঃপর বিজয়ীকে পুরষ্কৃত করেছেন। এখান থেকেই উমর বিন আব্দুল আজিজ (রহঃ) শরীরচর্চার প্রতি গুরুত্বারোপ করার জন্য মদিনায় ঘোড় দৌড়ের প্রতিযোগিতা চালু রেখেছেন। এক প্রতিযোগিতায় আবু বকর (রাঃ)-এর নাতি মুহাম্মাদ বিন আবু তালহার ঘোড়ার মাঝে ও জনৈক বেদুইনের ঘোড়ার মাঝে কঠিন প্রতিযোগিতা চলছিল। ঘটনাক্রমে বেদুইন ব্যক্তির ঘোড়া মুহাম্মাদ বিন তালহার ঘোড়ার সামনে চলে গেল। এই অবস্থা দেখে বেদুইন ব্যক্তি সুউচ্চ স্বরে বলতে থাকল :
'ওহে, সর্বোচ্চ মর্যাদা আজ কার হয়ে গেল! হ্যাঁ, আমরাই এর জন্য প্রতিযোগিতা করেছি এবং আমরাই এর একমাত্র হকদার। যদি পাখিও আসে আমাদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে, তাহলে আমরা তার সাথেও জয়ী হব।'
সে এ কথা বলতে না বলতেই মুহাম্মাদ বিন তালহার ঘোড়া তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করে সামনে চলে গেল এবং তিনিই বিজয়ী হলেন। অতঃপর উমর বিন আব্দুল আজিজ বেদুইন লোকটিকে বললেন, 'আল্লাহর শপথ, কল্যাণে অগ্রগামী ব্যক্তির নাতি তোমার ওপর জয়ী হয়েছে।'
এ কথাগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সাহাবায়ে কিরাম ও তাবিয়িদের সময় শরীরচর্চার চিত্র কেমন ছিল। হে যুবক, এবার তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি, আজ তুমি কোন ধরনের শরীরচর্চায় ব্যস্ত?! তুমি তো কোনো ব্যায়ামই করো না! যার ফলে শরীরের অতিরিক্ত ওজন থেকে নিষ্কৃতি পাবে।
বড়ই আশ্চর্যের বিষয়! বর্তমানে যুবকরা বিভিন্ন ক্রীড়া চ্যানেল ফলো করে, খেলাধুলা-সম্পর্কিত পত্রিকাসহ অনেক ধরনের ক্রীড়াবিষয়ক খবরাখবর পড়ে। কিন্তু তারা নিজেরা কখনো কোনো ধরনের ব্যায়াম করে না। শুধু ফলো করেই সময় কাটায়।
ইবনে মুজাহিদ ছিলেন বাগদাদের প্রধান কারি। একদা তিনি তার কয়েকজন সঙ্গী-সাথির সাথে বাগদাদের এক বাগানে হাঁটতে বের হয়েছেন। তখন তার সঙ্গীরা বাগানে এদিক সেদিক হাঁটাহাঁটি করছিল আর মজা করছিল। এ সময় একজন তার দিকে আড় চোখে তাকালে তিনি বলেন, বাগানে التعاقل করা মসজিদে খেলার মতো।
'প্রতিটি দিন শেষে স্বল্প সময়ের মধ্যে হলেও পরবর্তী দিনের কার্যতালিকা তৈরি করে রাখো।'
**টিকাঃ**
২৭. সুনানুন নাসায়ি: ৩৫৮৬।
২৮. সহিহুল বুখারি : ২৮৯৯।