📘 সময়ের সঠিক ব্যবহার কীভাবে করবেন > 📄 প্রথম বাহু : ইমান ও আমলসংক্রান্ত

📄 প্রথম বাহু : ইমান ও আমলসংক্রান্ত


তুমি তোমার সময়গুলোকে নেক আমল দ্বারা পূর্ণ করে দাও। যেমন: একটি আয়াত তিলাওয়াত করা, হাদিসের আলোচনা, ইসতিগফার, তাসবিহ-তাহলিল, নামাজ, দাওয়াত, পড়ালেখা, ইলমে দ্বীন শিক্ষা করা ও শেখানো, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ ইত্যাদি। যদি সময়গুলোকে এসব আমল দ্বারা ব্যস্ত রাখতে পারো, তাহলে আমাদের আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তিগুলো ডানা মেলতে পারবে, উন্নত হবে। কারণ, সময়গুলো এভাবে কাজে লাগালে আমরা আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হব। (হাদিসে কুদসিতে এসেছে) আল্লাহ তাআলা বলেন : مَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أَحِبَّهُ، 'নফল আমলের মাধ্যমে আমার বান্দা আমার নিকটবর্তী হতে থাকে। অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসি।' আর আল্লাহ তাআলা যেই বান্দাকে ভালোবাসেন, তার সাথে তিনি কী আচরণ করবেন বলে তোমার মনে হয়?
সময়কে কাজে লাগানোর এই মহাপুরস্কারের কারণেই আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) অনুতপ্ত হয়েছেন। কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি বা দুনিয়ার কোনো কিছু হারিয়ে ফেলে অনুতপ্ত হননি। বরং তিনি নিজেই বলছেন যে, 'আমি সেদিনের মতো আর কোনো দিন কোনো কিছুর জন্য অনুতপ্ত হইনি, যেদিন সূর্য ডুবে গিয়েছিল, অথচ আমার আমলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়নি।' ৭
সময় তো একের পর এক অতিবাহিত হয়েই যাচ্ছে। সুতরাং যেই মুহূর্তটি আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে অতিবাহিত করা হয়নি, সেটি পরিত্যক্ত ও নষ্ট হয়ে গেল। যা আর কখনো ফিরে আসবে না। আর যেই মুহূর্তগুলোতে কোনো না কোনোভাবে আল্লাহ তাআলার হুকুম পালন করা হয়, সেই মুহূর্তগুলোই অত্যন্ত দামি ও লাভজনক। যেমনটি সুলাইমান আত-তামিমির মাঝে ছিল। তাঁর ব্যাপারে বলা হয়, তাঁর এমন কোনো মুহূর্ত অতিবাহিত হতো না যে, তিনি সে সময় কোনো না কোনো সদাকা করেননি। আর যদি সদাকা করার মতো কিছু না থাকত, তাহলে তিনি দুই রাকআত নামাজ পড়তেন এবং এই আয়াত তিলাওয়াত করতেন :
يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا
'হে রাসুলগণ, পবিত্র বস্তু আহার করো এবং সৎকাজ করো।' ৮
তবে প্রথমেই আমাদের জানতে হবে যে, কোনো কিছু অর্জনের চেয়ে রক্ষার গুরুত্ব অধিক বেশি। ব্যবসার মধ্যে মুনাফা অর্জনের চেয়ে ব্যবসার ওপর থেকে সব ধরনের ক্ষতিকর দিকগুলো প্রতিহত করা প্রথম কর্তব্য।
(প্রিয় ভাই) তোমার সময় হচ্ছে তোমার মূলধন। এই লেখাটি পড়ার দ্বারা যদি তোমার অধিক লভ্যাংশ অর্জন করা উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তোমাকে অবশ্যই লভ্যাংশকে ক্ষতি থেকে দূরে রাখতে হবে। তোমার নিজের কোনো দোষ-ত্রুটি বা ক্রোধের কারণে যেন লভ্যাংশের ক্ষতি হয়ে না যায়। আর তুমি সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে তখনই, যখন তোমার সময়গুলো আল্লাহর নাফরমানি ও হারাম কাজ থেকে মুক্ত হবে। যেমন: হারাম গান শ্রবণ করা, ইন্টারনেটে নগ্ন ও অশ্লীল ক্লিপ দেখা, হারাম কাজ সম্পাদন করার জন্য কোথাও যাওয়া এবং খারাপ মানুষের সাথে ওঠাবসা করা।
(আবু সুলাইমান আদ-দারিনি ؒ) সত্যই বলেছেন। তিনি বলেন, 'কোনো ব্যক্তি তার অতীত জীবন আল্লাহর অবাধ্যতায় অতিবাহিত করায় যদি তার ভবিষ্যতের জীবন নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত সে ক্রন্দন করে এবং দুঃখ করে, তাহলে সেই ব্যক্তির কতটুকু দুঃখ করা উচিত যে, অতীতের ন্যায় তার ভবিষ্যতকেও অজ্ঞতার আঁধারে অতিবাহিত করছে?!')
প্রথমেই প্রাত্যহিক কিছু আমলের রুটিন দেওয়া হলো :
১. বারো রাকআত সুন্নাতে মুআক্কাদার সালাত আদায় : দিন ও রাতে মোট ১২ রাকআত সুন্নাত সালাত আদায় করতে হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি এগুলোর প্রতি যত্নবান হবে, আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তার জন্য একটি বাড়ি নির্মাণ করবেন। হাদিসেও এমনটিই বর্ণিত আছে।
২. কুরআন তিলাওয়াত : নিয়মিত কুরআনে কারিম থেকে ৪/৬/১০ পৃষ্ঠা করে নির্দিষ্ট একটি অংশ তিলাওয়াত আবশ্যক করে নেওয়া। যার পক্ষে যতটুকু তিলাওয়াত করা সম্ভব, ততটুকু তিলাওয়াত করা চাই। তোমার যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন, কখনো কুরআন তিলাওয়াত ছেড়ে দিয়ো না। বরং প্রতি মাসে তোমার নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়েও এক পৃষ্ঠা বা সাধ্যমতো বেশি পড়ার চেষ্টা করবে, যাতে এভাবে বৃদ্ধি পেতে পেতে একসময় তুমি দৈনিক এক পারা পরিমাণ তিলাওয়াত করতে পারো। এক পারা কুরআন তিলাওয়াত করা তোমার একটা গেম খেলার সময়ের এক-তৃতীয়াংশও হবে না, আর একটি ফিল্ম দেখার সময়ের সাথে তুলনা করলে তো তার এক-চতুর্থাংশও হবে না।
৩. হিফজুল কুরআন : পবিত্র কুরআনে কারিমের তিলাওয়াতের পাশাপাশি প্রতিদিন একটু একটু করে মুখস্থ করা। যাতে জান্নাতে প্রবেশ করার পর ফেরেশতারা তোমাকে বলতে পারে যে, পড়ো আর ওপরের দিকে উঠতে থাকো। অতঃপর তুমি একেকটি আয়াত তিলাওয়াত করবে আর ওপরের দিকে আরোহণ করতে থাকবে। এভাবে তোমার মুখস্থ থাকা শেষ আয়াতটি তিলাওয়াত করা পর্যন্ত উঠতেই থাকবে। তাহলে বলো তো দেখি! পবিত্র কুরআনের কতটুকু মুখস্থ করেছ তুমি?! তুমি কি চাও না জান্নাতের সর্বোচ্চ ভবনের সর্বোচ্চ স্তরে থাকতে? যারা অতীত থেকেই জীবনের সময়গুলো নষ্ট করে আসছ এবং রাসুলে কারিম কর্তৃক বর্ণিত মহামূল্যবান ধনভান্ডারকে পদদলিত করছ, শোনো তোমরা! রাসুল ইরশাদ করেছেন :
يَجِيءُ الْقُرْآنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَالرَّجُلِ الشَّاحِبِ، يَقُولُ لِصَاحِبِهِ: هَلْ تَعْرِفُنِي؟ أَنَا الَّذِي كُنْتُ أُسْهِرُ لَيْلَكَ، وَأُظْمِيُّ هَوَاجِرَكَ، وَإِنَّ كُلَّ تَاجِرٍ مِنْ وَرَاءِ حِجَارَتِهِ، وَأَنَا لَكَ الْيَوْمَ مِنْ وَرَاءِ كُلِّ تَاجِرٍ، فَيُعْطَى الْمُلْكَ بِيَمِينِهِ، وَالْخُلْدَ بِشِمَالِهِ، وَيُوضَعُ عَلَى رَأْسِهِ تَاجُ الْوَقَارِ
‘কিয়ামতের দিন কুরআনে কারিম ফ্যাকাশে ব্যক্তির মতো এসে তিলাওয়াতকারীকে বলবে, “আমাকে চেনো?! আমি সে, যে তোমাকে রাত্রে জাগ্রত রাখত। মধ্যাহ্নের তাপের সময় পিপাসার্ত করে রাখত। প্রত্যেক ব্যবসায়ী নিজের ব্যবসার পিছে পিছে চলে, আর আমি আজ তুমি-সহ প্রত্যেক ব্যবসায়ীর (তিলাওয়াতকারীর) পেছনে আছি।” অতঃপর তাকে জান্নাতের রাজত্ব দেওয়া হবে ডান হাতে আর স্থায়িত্বের পরওয়ানা দেওয়া হবে বাম হাতে। এবং তার মাথায় সম্মানের মুকুট পরিয়ে দেওয়া হবে।” ৯
এটি পবিত্র কুরআনে কারিমের বরকত। যা রাতের বেলায় কেবল মুখের আওয়াজের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়ে দিনের বেলায় ভিন্ন রকম ফলাফল প্রকাশ করে। অর্থাৎ পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে তোমার মাঝে কঠিন গরমেও রোজা রাখার যোগ্যতা সৃষ্টি হবে। কিন্তু কথা হলো কুরআন ধূসর আকৃতি ধারণ করে আসবে কেন?!
এর ব্যাখ্যা হলো, পবিত্র কুরআন কিয়ামতের দিন তার তিলাওয়াতকারীর রূপ ধরে মলিন চেহারায় উপস্থিত হওয়ার কারণ হলো, সেই ব্যক্তি দুনিয়ায় তার প্রতিটি সময়কে কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যেই ব্যস্ত রাখত। ফলে কুরআনে কারিম রাতের বেলায় তাকে জাগ্রত রাখতে রাখতে সে ক্লান্ত হয়ে গেছে এবং দিনের বেলায় রোজা রাখতে রাখতে তার চেহারা মলিন হয়ে গেছে।
পূর্বের কথাগুলো ছিল উৎসাহমূলক, সামনের কথাগুলো শান্তি-সম্পর্কিত
নবি কারিম ইরশাদ করেছেন: إِنَّ الَّذِي لَيْسَ فِي جَوْفِهِ شَيْءٌ مِنَ القُرْآنِ كَالبَيْتِ الحرب 'যার অন্তরে কুরআনে কারিমের সামান্য অংশও নেই, সেটা বিধ্বস্ত বাড়ির ন্যায়। ' ১০
বরং রাসুল এমন একদল যুবক সাহাবিকে নিয়ে গর্ব করেছেন, যাঁরা তোমাদের প্রতীক্ষায় আছে, কখন তোমরা তাঁদের সাথে মিলিত হবে হে যুবকেরা! রাসুল ইরশাদ করেছেন: خُذُوا القُرْآنَ مِنْ أَرْبَعَةٍ مِنْ ابْنِ مَسْعُودٍ، وَأُبَيَّ بْنِ كَعْبٍ، وَمُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، وَسَالِمٍ مَوْلَى أَبِي حُذَيْفَةَ 'তোমরা চার ব্যক্তির কাছ থেকে কুরআনে কারিম শিক্ষা করো। ১. ইবনে মাসউদ থেকে। ২. উবাই বিন কাব থেকে। ৩. মুআজ বিন জাবাল থেকে। ৪. আবু হুজাইফার মুক্তদাস সালিম থেকে।' ১১
এই চারজনের মধ্যে মুআজ, ইবনে মাসউদ ও সালিম এই তিনজনই ছিলেন যুবক।
হে যুবক-যুবতিরা, দিন-রাত আল্লাহর কালামের সাথে সময় কাটাও। দিন-রাতের বিভিন্ন সময়ে পবিত্র কালামুল্লাহ তিলাওয়াত করতে থাকো। আমলনামাকে উজ্জ্বল করার এই সুবর্ণ সুযোগ হারিয়ো না। সময়গুলোকে সুরভিত করে তোলো। ইবনে ইরাক আদ-দিমাশকি তাঁর সাথিদের কুরআন মাজিদ মুখস্থ করার আদেশ দিতেন। প্রতি রাতে ইশার সালাত শেষে তিনি সবার সামনে সুরা মুলক তিলাওয়াতের পরে এই কবিতাংশটুকু আবৃত্তি করে শোনাতেন। তিনি বলতেন :
কথাগুলো অনেক পুরোনো, কিন্তু তা শুনে কখনো ক্লান্তি আসে না।
তার তিলাওয়াতের কারণে আমার অন্তর ও নিয়তের মধ্যে এবং কাজের মাঝে পবিত্রতা আনয়ন করে।
এর মাধ্যমেই আমি সব রোগ থেকে আরোগ্য পাই।
কিন্তু এটি জানা থাকা সত্ত্বেও উদাসীন থাকলে তা আমার বিরুদ্ধে দলিল হয়ে দাঁড়াবে।
হে প্রভু, তাই এই পবিত্র কালাম হিফজ করার মাধ্যমে আমাকে উপকৃত করুন।
আর আমার অন্তরকে আলোকিত করুন এবং চক্ষুকে শীতল করুন।
৪. এক রাকআত হলেও বিতরের সালাত আদায় করা। ১২
৫. চাশতের সালাত আদায় করা: আমাদের দেহের ৩৬০ জোড়ার দৈনন্দিন আবশ্যকীয় সদাকার পরিবর্তে চাশতের দুই রাকআত সালাতের বৈধতা আরোপ করা হয়েছে। পুরো দেহের অর্থাৎ এই ৩৬০ জোড়ার সদাকা হিসেবে সামান্য এই দুই রাকআত সালাতই যথেষ্ট। এটি কোনো কষ্টসাধ্য বিষয় নয়। অথচ অধিকাংশ মানুষ তা থেকে গাফিল।
৬. শাওয়াল, আশুরা, আরাফা এবং প্রতি সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার নফল সিয়ামগুলো পালন করা।
৭. বেশি বেশি সদাকা করা: তালক বিন হাবিব প্রত্যেকে সালাতের সময় সদাকার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে বের হতেন। যদি কিছু না পেতেন, তাহলে তিনি পেঁয়াজ নিয়ে যেতেন আর বলতেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَاجَيْتُمُ الرَّسُولَ فَقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيْ نَجْوَاكُمْ صَدَقَةً
'হে মুমিনগণ, তোমরা যখন রাসুলের সাথে একান্তে কথা বলতে চাও, তখন তোমাদের এরূপ কথার পূর্বে কিছু সদাকা দাও।' ১৩
সুতরাং আল্লাহ তাআলার কাছে কোনো কিছু চাওয়ার আগে কিছু সদাকা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল।
৮. প্রতিদিন হজ-উমরা পালন করা : কেননা নবি কারিম ইরশাদ করেছেন :
مَنْ صَلَّى الغَدَاةَ فِي جَمَاعَةٍ ثُمَّ قَعَدَ يَذْكُرُ اللهَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ، ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ كَانَتْ لَهُ كَأَجْرٍ حَجَّةٍ وَعُمْرَةٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: تَامَّةٍ تَامَّةٍ تَامَّةٍ
'যে ব্যক্তি ফজরের সালাত জামাআতের সাথে আদায় করার পর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে বসে আল্লাহর জিকির করে, অতঃপর দুই রাকআত সালাত আদায় করে, তার জন্য একটি হজ ও উমরার সাওয়াব লিপিবদ্ধ হয়।' বর্ণনাকারী বলেন, রাসুল বলেছেন, 'পূর্ণ পূর্ণ পূর্ণ (হজ ও উমরার সাওয়াব)।' ১৪
৯. দাওয়াহ ইলাল্লাহর কাজ করা: সমস্ত নবি-রাসুলের রিসালাতের একটি গুরুদায়িত্ব ছিল আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করা। আর আল্লাহ তাআলাও নবি- রাসুলদের তাঁর এই বাণীর ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তা নিয়ে গর্ববোধ করতে বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন :
قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي
'বলে দিন, “এই আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে বুঝে সুঝে দাওয়াত দিই আমি এবং আমার অনুসারীরা।” ১৫
হে মুসলিম ভাই, তাহলে চিন্তা করো তো! তুমি কি তোমার রাসুলের অনুসরণ করতে পেরেছ? যেভাবে তিনি উম্মাহকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছেন, তুমি কি সেভাবে আহ্বান করতে পেরেছ? না তুমি অলসতা ও অবহেলা করে দাওয়াত থেকে বিরত থেকেছ এবং তাঁকে ছেড়ে অন্যদের অনুসরণ করেছ আর তাঁর পদ্ধতিকে অন্ধের মতো এড়িয়ে গিয়েছ? তুমিই তোমার অবস্থান নির্ণয় করো।
নেকি অর্জন, মিজানের পাল্লাকে ভারী করা ও আমলনামা পবিত্র করার জন্য দাওয়াহ ইলাল্লাহ (আল্লাহর দিকে আহ্বান) অত্যন্ত উত্তম ও চমৎকার পন্থা। মৃত্যুর পরেও এর প্রতিদান লিপিবদ্ধ হতে থাকে। নবি কারিম ﷺ এই মহামূল্যবান আমলের পক্ষে প্রতিদান ঘোষণা দিয়ে ইরশাদ করেছেন:
لَأَنْ يُهْدَى بِكَ رَجُلٌ وَاحِدٌ خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ
'তোমার দ্বারা কেবল একজন লোক হিদায়াত পাওয়া তোমার জন্য লাল উট পাওয়ার চেয়েও উত্তম।' ১৬
হে যুবক ভাইয়েরা, তোমরা যৌবনের এই ভরা মৌসুমে দাওয়াতের ময়দানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার প্রতি আগ্রহী হও। তা হতে পারে বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা-ভাষণ অথবা দরসের মাধ্যমে বা ছোট ছোট কিতাবাদি ও রিসালাহ প্রকাশ ও বিতরণের মাধ্যমে। অথবা ইমেইল, ইউটিউব-সহ ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে। অথবা পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব ও কাছের মানুষদের সাথে দ্বীনি আলোচনার মাধ্যমে। মনে রাখবে, যে ব্যক্তি অন্যের কল্যাণে নিজের সময় ব্যয় করে, আল্লাহ তাআলা তার সময়ের মধ্যে বরকত দান করেন। ফলে অন্যরা যেই কাজ করতে কয়েক মাস বা বছর লেগে যায়, তার সে কাজ সম্পাদন করতে মাত্র কয়েকদিন বা সপ্তাহ ব্যয় হয়। সুবহানাল্লাহ।
১০. মসজিদে ইলমি মজলিশে উপস্থিত থাকা : তুমি কি জানো যে, মসজিদের কোনো একটি ইলমি দরসে উপস্থিত হলে একটি পরিপূর্ণ হজের সাওয়াব পাওয়া যায়? রাসুল ইরশাদ করেছেন:
مَنْ غَدًا إِلَى الْمَسْجِدِ لَا يُرِيدُ إِلَّا أَنْ يَتَعَلَّمَ خَيْرًا أَوْ يُعَلِّمَهُ، كَانَ لَهُ كَأَجْرِ حَاجٌ تَامَّا حِجَّتُهُ
'যে ব্যক্তি কোনো কল্যাণকর বিষয় শেখার জন্য অথবা শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রত্যুষে মসজিদে গমন করে, তাহলে তার জন্য এমন একজন হাজির হজের সমপরিমাণ সাওয়াব দান করা হবে, যে তার হজকে পরিপূর্ণ করতে পেরেছে। ১৭

**টিকাঃ**
৭. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির: ৭৮৩৩।
৮. সুরা আল-মুমিনুন: ৫১।
৯. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল আওসাত: ৬/৫১।
১০. সুনানুত তিরমিজি: ২৯১৩।
১১. সহিহুল বুখারি: ৪৯৯৯, সহিহু মুসলিম: ২৪৬৪, সুনানুত তিরমিজি : ৩৮১০।
১২. বিতরের রাকআত সংখ্যা নিয়ে ইমামদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। আহনাফদের মতে বিতরের সালাত তিন রাকআত পড়া ওয়াজিব। (অনুবাদক)
১৩. সুরা আল-মুজাদালা: ১২।
১৪. সুনানুত তিরমিজি: ৫৮৬।
১৫. সুরা ইউসুফ: ১০৮।
১৬. সহিহুল বুখারি : ২৯৪২।
১৭. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির: ৭৪৭৩।

তুমি তোমার সময়গুলোকে নেক আমল দ্বারা পূর্ণ করে দাও। যেমন: একটি আয়াত তিলাওয়াত করা, হাদিসের আলোচনা, ইসতিগফার, তাসবিহ-তাহলিল, নামাজ, দাওয়াত, পড়ালেখা, ইলমে দ্বীন শিক্ষা করা ও শেখানো, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ ইত্যাদি। যদি সময়গুলোকে এসব আমল দ্বারা ব্যস্ত রাখতে পারো, তাহলে আমাদের আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তিগুলো ডানা মেলতে পারবে, উন্নত হবে। কারণ, সময়গুলো এভাবে কাজে লাগালে আমরা আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হব। (হাদিসে কুদসিতে এসেছে) আল্লাহ তাআলা বলেন : مَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أَحِبَّهُ، 'নফল আমলের মাধ্যমে আমার বান্দা আমার নিকটবর্তী হতে থাকে। অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসি।' আর আল্লাহ তাআলা যেই বান্দাকে ভালোবাসেন, তার সাথে তিনি কী আচরণ করবেন বলে তোমার মনে হয়?
সময়কে কাজে লাগানোর এই মহাপুরস্কারের কারণেই আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) অনুতপ্ত হয়েছেন। কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি বা দুনিয়ার কোনো কিছু হারিয়ে ফেলে অনুতপ্ত হননি। বরং তিনি নিজেই বলছেন যে, 'আমি সেদিনের মতো আর কোনো দিন কোনো কিছুর জন্য অনুতপ্ত হইনি, যেদিন সূর্য ডুবে গিয়েছিল, অথচ আমার আমলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়নি।' ৭
সময় তো একের পর এক অতিবাহিত হয়েই যাচ্ছে। সুতরাং যেই মুহূর্তটি আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে অতিবাহিত করা হয়নি, সেটি পরিত্যক্ত ও নষ্ট হয়ে গেল। যা আর কখনো ফিরে আসবে না। আর যেই মুহূর্তগুলোতে কোনো না কোনোভাবে আল্লাহ তাআলার হুকুম পালন করা হয়, সেই মুহূর্তগুলোই অত্যন্ত দামি ও লাভজনক। যেমনটি সুলাইমান আত-তামিমির মাঝে ছিল। তাঁর ব্যাপারে বলা হয়, তাঁর এমন কোনো মুহূর্ত অতিবাহিত হতো না যে, তিনি সে সময় কোনো না কোনো সদাকা করেননি। আর যদি সদাকা করার মতো কিছু না থাকত, তাহলে তিনি দুই রাকআত নামাজ পড়তেন এবং এই আয়াত তিলাওয়াত করতেন :
يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا
'হে রাসুলগণ, পবিত্র বস্তু আহার করো এবং সৎকাজ করো।' ৮
তবে প্রথমেই আমাদের জানতে হবে যে, কোনো কিছু অর্জনের চেয়ে রক্ষার গুরুত্ব অধিক বেশি। ব্যবসার মধ্যে মুনাফা অর্জনের চেয়ে ব্যবসার ওপর থেকে সব ধরনের ক্ষতিকর দিকগুলো প্রতিহত করা প্রথম কর্তব্য।
(প্রিয় ভাই) তোমার সময় হচ্ছে তোমার মূলধন। এই লেখাটি পড়ার দ্বারা যদি তোমার অধিক লভ্যাংশ অর্জন করা উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তোমাকে অবশ্যই লভ্যাংশকে ক্ষতি থেকে দূরে রাখতে হবে। তোমার নিজের কোনো দোষ-ত্রুটি বা ক্রোধের কারণে যেন লভ্যাংশের ক্ষতি হয়ে না যায়। আর তুমি সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে তখনই, যখন তোমার সময়গুলো আল্লাহর নাফরমানি ও হারাম কাজ থেকে মুক্ত হবে। যেমন: হারাম গান শ্রবণ করা, ইন্টারনেটে নগ্ন ও অশ্লীল ক্লিপ দেখা, হারাম কাজ সম্পাদন করার জন্য কোথাও যাওয়া এবং খারাপ মানুষের সাথে ওঠাবসা করা।
(আবু সুলাইমান আদ-দারিনি ؒ) সত্যই বলেছেন। তিনি বলেন, 'কোনো ব্যক্তি তার অতীত জীবন আল্লাহর অবাধ্যতায় অতিবাহিত করায় যদি তার ভবিষ্যতের জীবন নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত সে ক্রন্দন করে এবং দুঃখ করে, তাহলে সেই ব্যক্তির কতটুকু দুঃখ করা উচিত যে, অতীতের ন্যায় তার ভবিষ্যতকেও অজ্ঞতার আঁধারে অতিবাহিত করছে?!')
প্রথমেই প্রাত্যহিক কিছু আমলের রুটিন দেওয়া হলো :
১. বারো রাকআত সুন্নাতে মুআক্কাদার সালাত আদায় : দিন ও রাতে মোট ১২ রাকআত সুন্নাত সালাত আদায় করতে হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি এগুলোর প্রতি যত্নবান হবে, আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তার জন্য একটি বাড়ি নির্মাণ করবেন। হাদিসেও এমনটিই বর্ণিত আছে।
২. কুরআন তিলাওয়াত : নিয়মিত কুরআনে কারিম থেকে ৪/৬/১০ পৃষ্ঠা করে নির্দিষ্ট একটি অংশ তিলাওয়াত আবশ্যক করে নেওয়া। যার পক্ষে যতটুকু তিলাওয়াত করা সম্ভব, ততটুকু তিলাওয়াত করা চাই। তোমার যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন, কখনো কুরআন তিলাওয়াত ছেড়ে দিয়ো না। বরং প্রতি মাসে তোমার নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়েও এক পৃষ্ঠা বা সাধ্যমতো বেশি পড়ার চেষ্টা করবে, যাতে এভাবে বৃদ্ধি পেতে পেতে একসময় তুমি দৈনিক এক পারা পরিমাণ তিলাওয়াত করতে পারো। এক পারা কুরআন তিলাওয়াত করা তোমার একটা গেম খেলার সময়ের এক-তৃতীয়াংশও হবে না, আর একটি ফিল্ম দেখার সময়ের সাথে তুলনা করলে তো তার এক-চতুর্থাংশও হবে না।
৩. হিফজুল কুরআন : পবিত্র কুরআনে কারিমের তিলাওয়াতের পাশাপাশি প্রতিদিন একটু একটু করে মুখস্থ করা। যাতে জান্নাতে প্রবেশ করার পর ফেরেশতারা তোমাকে বলতে পারে যে, পড়ো আর ওপরের দিকে উঠতে থাকো। অতঃপর তুমি একেকটি আয়াত তিলাওয়াত করবে আর ওপরের দিকে আরোহণ করতে থাকবে। এভাবে তোমার মুখস্থ থাকা শেষ আয়াতটি তিলাওয়াত করা পর্যন্ত উঠতেই থাকবে। তাহলে বলো তো দেখি! পবিত্র কুরআনের কতটুকু মুখস্থ করেছ তুমি?! তুমি কি চাও না জান্নাতের সর্বোচ্চ ভবনের সর্বোচ্চ স্তরে থাকতে? যারা অতীত থেকেই জীবনের সময়গুলো নষ্ট করে আসছ এবং রাসুলে কারিম কর্তৃক বর্ণিত মহামূল্যবান ধনভান্ডারকে পদদলিত করছ, শোনো তোমরা! রাসুল ইরশাদ করেছেন :
يَجِيءُ الْقُرْآنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَالرَّجُلِ الشَّاحِبِ، يَقُولُ لِصَاحِبِهِ: هَلْ تَعْرِفُنِي؟ أَنَا الَّذِي كُنْتُ أُسْهِرُ لَيْلَكَ، وَأُظْمِيُّ هَوَاجِرَكَ، وَإِنَّ كُلَّ تَاجِرٍ مِنْ وَرَاءِ حِجَارَتِهِ، وَأَنَا لَكَ الْيَوْمَ مِنْ وَرَاءِ كُلِّ تَاجِرٍ، فَيُعْطَى الْمُلْكَ بِيَمِينِهِ، وَالْخُلْدَ بِشِمَالِهِ، وَيُوضَعُ عَلَى رَأْسِهِ تَاجُ الْوَقَارِ
‘কিয়ামতের দিন কুরআনে কারিম ফ্যাকাশে ব্যক্তির মতো এসে তিলাওয়াতকারীকে বলবে, “আমাকে চেনো?! আমি সে, যে তোমাকে রাত্রে জাগ্রত রাখত। মধ্যাহ্নের তাপের সময় পিপাসার্ত করে রাখত। প্রত্যেক ব্যবসায়ী নিজের ব্যবসার পিছে পিছে চলে, আর আমি আজ তুমি-সহ প্রত্যেক ব্যবসায়ীর (তিলাওয়াতকারীর) পেছনে আছি।” অতঃপর তাকে জান্নাতের রাজত্ব দেওয়া হবে ডান হাতে আর স্থায়িত্বের পরওয়ানা দেওয়া হবে বাম হাতে। এবং তার মাথায় সম্মানের মুকুট পরিয়ে দেওয়া হবে।” ৯
এটি পবিত্র কুরআনে কারিমের বরকত। যা রাতের বেলায় কেবল মুখের আওয়াজের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়ে দিনের বেলায় ভিন্ন রকম ফলাফল প্রকাশ করে। অর্থাৎ পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে তোমার মাঝে কঠিন গরমেও রোজা রাখার যোগ্যতা সৃষ্টি হবে। কিন্তু কথা হলো কুরআন ধূসর আকৃতি ধারণ করে আসবে কেন?!
এর ব্যাখ্যা হলো, পবিত্র কুরআন কিয়ামতের দিন তার তিলাওয়াতকারীর রূপ ধরে মলিন চেহারায় উপস্থিত হওয়ার কারণ হলো, সেই ব্যক্তি দুনিয়ায় তার প্রতিটি সময়কে কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যেই ব্যস্ত রাখত। ফলে কুরআনে কারিম রাতের বেলায় তাকে জাগ্রত রাখতে রাখতে সে ক্লান্ত হয়ে গেছে এবং দিনের বেলায় রোজা রাখতে রাখতে তার চেহারা মলিন হয়ে গেছে।
পূর্বের কথাগুলো ছিল উৎসাহমূলক, সামনের কথাগুলো শান্তি-সম্পর্কিত
নবি কারিম ইরশাদ করেছেন: إِنَّ الَّذِي لَيْسَ فِي جَوْفِهِ شَيْءٌ مِنَ القُرْآنِ كَالبَيْتِ الحرب 'যার অন্তরে কুরআনে কারিমের সামান্য অংশও নেই, সেটা বিধ্বস্ত বাড়ির ন্যায়। ' ১০
বরং রাসুল এমন একদল যুবক সাহাবিকে নিয়ে গর্ব করেছেন, যাঁরা তোমাদের প্রতীক্ষায় আছে, কখন তোমরা তাঁদের সাথে মিলিত হবে হে যুবকেরা! রাসুল ইরশাদ করেছেন: خُذُوا القُرْآنَ مِنْ أَرْبَعَةٍ مِنْ ابْنِ مَسْعُودٍ، وَأُبَيَّ بْنِ كَعْبٍ، وَمُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، وَسَالِمٍ مَوْلَى أَبِي حُذَيْفَةَ 'তোমরা চার ব্যক্তির কাছ থেকে কুরআনে কারিম শিক্ষা করো। ১. ইবনে মাসউদ থেকে। ২. উবাই বিন কাব থেকে। ৩. মুআজ বিন জাবাল থেকে। ৪. আবু হুজাইফার মুক্তদাস সালিম থেকে।' ১১
এই চারজনের মধ্যে মুআজ, ইবনে মাসউদ ও সালিম এই তিনজনই ছিলেন যুবক।
হে যুবক-যুবতিরা, দিন-রাত আল্লাহর কালামের সাথে সময় কাটাও। দিন-রাতের বিভিন্ন সময়ে পবিত্র কালামুল্লাহ তিলাওয়াত করতে থাকো। আমলনামাকে উজ্জ্বল করার এই সুবর্ণ সুযোগ হারিয়ো না। সময়গুলোকে সুরভিত করে তোলো। ইবনে ইরাক আদ-দিমাশকি তাঁর সাথিদের কুরআন মাজিদ মুখস্থ করার আদেশ দিতেন। প্রতি রাতে ইশার সালাত শেষে তিনি সবার সামনে সুরা মুলক তিলাওয়াতের পরে এই কবিতাংশটুকু আবৃত্তি করে শোনাতেন। তিনি বলতেন :
কথাগুলো অনেক পুরোনো, কিন্তু তা শুনে কখনো ক্লান্তি আসে না।
তার তিলাওয়াতের কারণে আমার অন্তর ও নিয়তের মধ্যে এবং কাজের মাঝে পবিত্রতা আনয়ন করে।
এর মাধ্যমেই আমি সব রোগ থেকে আরোগ্য পাই।
কিন্তু এটি জানা থাকা সত্ত্বেও উদাসীন থাকলে তা আমার বিরুদ্ধে দলিল হয়ে দাঁড়াবে।
হে প্রভু, তাই এই পবিত্র কালাম হিফজ করার মাধ্যমে আমাকে উপকৃত করুন।
আর আমার অন্তরকে আলোকিত করুন এবং চক্ষুকে শীতল করুন।
৪. এক রাকআত হলেও বিতরের সালাত আদায় করা। ১২
৫. চাশতের সালাত আদায় করা: আমাদের দেহের ৩৬০ জোড়ার দৈনন্দিন আবশ্যকীয় সদাকার পরিবর্তে চাশতের দুই রাকআত সালাতের বৈধতা আরোপ করা হয়েছে। পুরো দেহের অর্থাৎ এই ৩৬০ জোড়ার সদাকা হিসেবে সামান্য এই দুই রাকআত সালাতই যথেষ্ট। এটি কোনো কষ্টসাধ্য বিষয় নয়। অথচ অধিকাংশ মানুষ তা থেকে গাফিল।
৬. শাওয়াল, আশুরা, আরাফা এবং প্রতি সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার নফল সিয়ামগুলো পালন করা।
৭. বেশি বেশি সদাকা করা: তালক বিন হাবিব প্রত্যেকে সালাতের সময় সদাকার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে বের হতেন। যদি কিছু না পেতেন, তাহলে তিনি পেঁয়াজ নিয়ে যেতেন আর বলতেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَاجَيْتُمُ الرَّسُولَ فَقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيْ نَجْوَاكُمْ صَدَقَةً
'হে মুমিনগণ, তোমরা যখন রাসুলের সাথে একান্তে কথা বলতে চাও, তখন তোমাদের এরূপ কথার পূর্বে কিছু সদাকা দাও।' ১৩
সুতরাং আল্লাহ তাআলার কাছে কোনো কিছু চাওয়ার আগে কিছু সদাকা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল।
৮. প্রতিদিন হজ-উমরা পালন করা : কেননা নবি কারিম ইরশাদ করেছেন :
مَنْ صَلَّى الغَدَاةَ فِي جَمَاعَةٍ ثُمَّ قَعَدَ يَذْكُرُ اللهَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ، ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ كَانَتْ لَهُ كَأَجْرٍ حَجَّةٍ وَعُمْرَةٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: تَامَّةٍ تَامَّةٍ تَامَّةٍ
'যে ব্যক্তি ফজরের সালাত জামাআতের সাথে আদায় করার পর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে বসে আল্লাহর জিকির করে, অতঃপর দুই রাকআত সালাত আদায় করে, তার জন্য একটি হজ ও উমরার সাওয়াব লিপিবদ্ধ হয়।' বর্ণনাকারী বলেন, রাসুল বলেছেন, 'পূর্ণ পূর্ণ পূর্ণ (হজ ও উমরার সাওয়াব)।' ১৪
৯. দাওয়াহ ইলাল্লাহর কাজ করা: সমস্ত নবি-রাসুলের রিসালাতের একটি গুরুদায়িত্ব ছিল আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করা। আর আল্লাহ তাআলাও নবি- রাসুলদের তাঁর এই বাণীর ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তা নিয়ে গর্ববোধ করতে বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন :
قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي
'বলে দিন, “এই আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে বুঝে সুঝে দাওয়াত দিই আমি এবং আমার অনুসারীরা।” ১৫
হে মুসলিম ভাই, তাহলে চিন্তা করো তো! তুমি কি তোমার রাসুলের অনুসরণ করতে পেরেছ? যেভাবে তিনি উম্মাহকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছেন, তুমি কি সেভাবে আহ্বান করতে পেরেছ? না তুমি অলসতা ও অবহেলা করে দাওয়াত থেকে বিরত থেকেছ এবং তাঁকে ছেড়ে অন্যদের অনুসরণ করেছ আর তাঁর পদ্ধতিকে অন্ধের মতো এড়িয়ে গিয়েছ? তুমিই তোমার অবস্থান নির্ণয় করো।
নেকি অর্জন, মিজানের পাল্লাকে ভারী করা ও আমলনামা পবিত্র করার জন্য দাওয়াহ ইলাল্লাহ (আল্লাহর দিকে আহ্বান) অত্যন্ত উত্তম ও চমৎকার পন্থা। মৃত্যুর পরেও এর প্রতিদান লিপিবদ্ধ হতে থাকে। নবি কারিম ﷺ এই মহামূল্যবান আমলের পক্ষে প্রতিদান ঘোষণা দিয়ে ইরশাদ করেছেন:
لَأَنْ يُهْدَى بِكَ رَجُلٌ وَاحِدٌ خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ
'তোমার দ্বারা কেবল একজন লোক হিদায়াত পাওয়া তোমার জন্য লাল উট পাওয়ার চেয়েও উত্তম।' ১৬
হে যুবক ভাইয়েরা, তোমরা যৌবনের এই ভরা মৌসুমে দাওয়াতের ময়দানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার প্রতি আগ্রহী হও। তা হতে পারে বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা-ভাষণ অথবা দরসের মাধ্যমে বা ছোট ছোট কিতাবাদি ও রিসালাহ প্রকাশ ও বিতরণের মাধ্যমে। অথবা ইমেইল, ইউটিউব-সহ ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে। অথবা পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব ও কাছের মানুষদের সাথে দ্বীনি আলোচনার মাধ্যমে। মনে রাখবে, যে ব্যক্তি অন্যের কল্যাণে নিজের সময় ব্যয় করে, আল্লাহ তাআলা তার সময়ের মধ্যে বরকত দান করেন। ফলে অন্যরা যেই কাজ করতে কয়েক মাস বা বছর লেগে যায়, তার সে কাজ সম্পাদন করতে মাত্র কয়েকদিন বা সপ্তাহ ব্যয় হয়। সুবহানাল্লাহ।
১০. মসজিদে ইলমি মজলিশে উপস্থিত থাকা : তুমি কি জানো যে, মসজিদের কোনো একটি ইলমি দরসে উপস্থিত হলে একটি পরিপূর্ণ হজের সাওয়াব পাওয়া যায়? রাসুল ইরশাদ করেছেন:
مَنْ غَدًا إِلَى الْمَسْجِدِ لَا يُرِيدُ إِلَّا أَنْ يَتَعَلَّمَ خَيْرًا أَوْ يُعَلِّمَهُ، كَانَ لَهُ كَأَجْرِ حَاجٌ تَامَّا حِجَّتُهُ
'যে ব্যক্তি কোনো কল্যাণকর বিষয় শেখার জন্য অথবা শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রত্যুষে মসজিদে গমন করে, তাহলে তার জন্য এমন একজন হাজির হজের সমপরিমাণ সাওয়াব দান করা হবে, যে তার হজকে পরিপূর্ণ করতে পেরেছে। ১৭

**টিকাঃ**
৭. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির: ৭৮৩৩।
৮. সুরা আল-মুমিনুন: ৫১।
৯. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল আওসাত: ৬/৫১।
১০. সুনানুত তিরমিজি: ২৯১৩।
১১. সহিহুল বুখারি: ৪৯৯৯, সহিহু মুসলিম: ২৪৬৪, সুনানুত তিরমিজি : ৩৮১০।
১২. বিতরের রাকআত সংখ্যা নিয়ে ইমামদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। আহনাফদের মতে বিতরের সালাত তিন রাকআত পড়া ওয়াজিব। (অনুবাদক)
১৩. সুরা আল-মুজাদালা: ১২।
১৪. সুনানুত তিরমিজি: ৫৮৬।
১৫. সুরা ইউসুফ: ১০৮।
১৬. সহিহুল বুখারি : ২৯৪২।
১৭. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির: ৭৪৭৩।

তুমি তোমার সময়গুলোকে নেক আমল দ্বারা পূর্ণ করে দাও। যেমন: একটি আয়াত তিলাওয়াত করা, হাদিসের আলোচনা, ইসতিগফার, তাসবিহ-তাহলিল, নামাজ, দাওয়াত, পড়ালেখা, ইলমে দ্বীন শিক্ষা করা ও শেখানো, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ ইত্যাদি। যদি সময়গুলোকে এসব আমল দ্বারা ব্যস্ত রাখতে পারো, তাহলে আমাদের আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তিগুলো ডানা মেলতে পারবে, উন্নত হবে। কারণ, সময়গুলো এভাবে কাজে লাগালে আমরা আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হব। (হাদিসে কুদসিতে এসেছে) আল্লাহ তাআলা বলেন : مَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أَحِبَّهُ، 'নফল আমলের মাধ্যমে আমার বান্দা আমার নিকটবর্তী হতে থাকে। অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসি।' আর আল্লাহ তাআলা যেই বান্দাকে ভালোবাসেন, তার সাথে তিনি কী আচরণ করবেন বলে তোমার মনে হয়?
সময়কে কাজে লাগানোর এই মহাপুরস্কারের কারণেই আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) অনুতপ্ত হয়েছেন। কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি বা দুনিয়ার কোনো কিছু হারিয়ে ফেলে অনুতপ্ত হননি। বরং তিনি নিজেই বলছেন যে, 'আমি সেদিনের মতো আর কোনো দিন কোনো কিছুর জন্য অনুতপ্ত হইনি, যেদিন সূর্য ডুবে গিয়েছিল, অথচ আমার আমলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়নি।' ৭
সময় তো একের পর এক অতিবাহিত হয়েই যাচ্ছে। সুতরাং যেই মুহূর্তটি আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে অতিবাহিত করা হয়নি, সেটি পরিত্যক্ত ও নষ্ট হয়ে গেল। যা আর কখনো ফিরে আসবে না। আর যেই মুহূর্তগুলোতে কোনো না কোনোভাবে আল্লাহ তাআলার হুকুম পালন করা হয়, সেই মুহূর্তগুলোই অত্যন্ত দামি ও লাভজনক। যেমনটি সুলাইমান আত-তামিমির মাঝে ছিল। তাঁর ব্যাপারে বলা হয়, তাঁর এমন কোনো মুহূর্ত অতিবাহিত হতো না যে, তিনি সে সময় কোনো না কোনো সদাকা করেননি। আর যদি সদাকা করার মতো কিছু না থাকত, তাহলে তিনি দুই রাকআত নামাজ পড়তেন এবং এই আয়াত তিলাওয়াত করতেন :
يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا
'হে রাসুলগণ, পবিত্র বস্তু আহার করো এবং সৎকাজ করো।' ৮
তবে প্রথমেই আমাদের জানতে হবে যে, কোনো কিছু অর্জনের চেয়ে রক্ষার গুরুত্ব অধিক বেশি। ব্যবসার মধ্যে মুনাফা অর্জনের চেয়ে ব্যবসার ওপর থেকে সব ধরনের ক্ষতিকর দিকগুলো প্রতিহত করা প্রথম কর্তব্য।
(প্রিয় ভাই) তোমার সময় হচ্ছে তোমার মূলধন। এই লেখাটি পড়ার দ্বারা যদি তোমার অধিক লভ্যাংশ অর্জন করা উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তোমাকে অবশ্যই লভ্যাংশকে ক্ষতি থেকে দূরে রাখতে হবে। তোমার নিজের কোনো দোষ-ত্রুটি বা ক্রোধের কারণে যেন লভ্যাংশের ক্ষতি হয়ে না যায়। আর তুমি সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে তখনই, যখন তোমার সময়গুলো আল্লাহর নাফরমানি ও হারাম কাজ থেকে মুক্ত হবে। যেমন: হারাম গান শ্রবণ করা, ইন্টারনেটে নগ্ন ও অশ্লীল ক্লিপ দেখা, হারাম কাজ সম্পাদন করার জন্য কোথাও যাওয়া এবং খারাপ মানুষের সাথে ওঠাবসা করা।
(আবু সুলাইমান আদ-দারিনি ؒ) সত্যই বলেছেন। তিনি বলেন, 'কোনো ব্যক্তি তার অতীত জীবন আল্লাহর অবাধ্যতায় অতিবাহিত করায় যদি তার ভবিষ্যতের জীবন নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত সে ক্রন্দন করে এবং দুঃখ করে, তাহলে সেই ব্যক্তির কতটুকু দুঃখ করা উচিত যে, অতীতের ন্যায় তার ভবিষ্যতকেও অজ্ঞতার আঁধারে অতিবাহিত করছে?!')
প্রথমেই প্রাত্যহিক কিছু আমলের রুটিন দেওয়া হলো :
১. বারো রাকআত সুন্নাতে মুআক্কাদার সালাত আদায় : দিন ও রাতে মোট ১২ রাকআত সুন্নাত সালাত আদায় করতে হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি এগুলোর প্রতি যত্নবান হবে, আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তার জন্য একটি বাড়ি নির্মাণ করবেন। হাদিসেও এমনটিই বর্ণিত আছে।
২. কুরআন তিলাওয়াত : নিয়মিত কুরআনে কারিম থেকে ৪/৬/১০ পৃষ্ঠা করে নির্দিষ্ট একটি অংশ তিলাওয়াত আবশ্যক করে নেওয়া। যার পক্ষে যতটুকু তিলাওয়াত করা সম্ভব, ততটুকু তিলাওয়াত করা চাই। তোমার যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন, কখনো কুরআন তিলাওয়াত ছেড়ে দিয়ো না। বরং প্রতি মাসে তোমার নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়েও এক পৃষ্ঠা বা সাধ্যমতো বেশি পড়ার চেষ্টা করবে, যাতে এভাবে বৃদ্ধি পেতে পেতে একসময় তুমি দৈনিক এক পারা পরিমাণ তিলাওয়াত করতে পারো। এক পারা কুরআন তিলাওয়াত করা তোমার একটা গেম খেলার সময়ের এক-তৃতীয়াংশও হবে না, আর একটি ফিল্ম দেখার সময়ের সাথে তুলনা করলে তো তার এক-চতুর্থাংশও হবে না।
৩. হিফজুল কুরআন : পবিত্র কুরআনে কারিমের তিলাওয়াতের পাশাপাশি প্রতিদিন একটু একটু করে মুখস্থ করা। যাতে জান্নাতে প্রবেশ করার পর ফেরেশতারা তোমাকে বলতে পারে যে, পড়ো আর ওপরের দিকে উঠতে থাকো। অতঃপর তুমি একেকটি আয়াত তিলাওয়াত করবে আর ওপরের দিকে আরোহণ করতে থাকবে। এভাবে তোমার মুখস্থ থাকা শেষ আয়াতটি তিলাওয়াত করা পর্যন্ত উঠতেই থাকবে। তাহলে বলো তো দেখি! পবিত্র কুরআনের কতটুকু মুখস্থ করেছ তুমি?! তুমি কি চাও না জান্নাতের সর্বোচ্চ ভবনের সর্বোচ্চ স্তরে থাকতে? যারা অতীত থেকেই জীবনের সময়গুলো নষ্ট করে আসছ এবং রাসুলে কারিম কর্তৃক বর্ণিত মহামূল্যবান ধনভান্ডারকে পদদলিত করছ, শোনো তোমরা! রাসুল ইরশাদ করেছেন :
يَجِيءُ الْقُرْآنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَالرَّجُلِ الشَّاحِبِ، يَقُولُ لِصَاحِبِهِ: هَلْ تَعْرِفُنِي؟ أَنَا الَّذِي كُنْتُ أُسْهِرُ لَيْلَكَ، وَأُظْمِيُّ هَوَاجِرَكَ، وَإِنَّ كُلَّ تَاجِرٍ مِنْ وَرَاءِ حِجَارَتِهِ، وَأَنَا لَكَ الْيَوْمَ مِنْ وَرَاءِ كُلِّ تَاجِرٍ، فَيُعْطَى الْمُلْكَ بِيَمِينِهِ، وَالْخُلْدَ بِشِمَالِهِ، وَيُوضَعُ عَلَى رَأْسِهِ تَاجُ الْوَقَارِ
‘কিয়ামতের দিন কুরআনে কারিম ফ্যাকাশে ব্যক্তির মতো এসে তিলাওয়াতকারীকে বলবে, “আমাকে চেনো?! আমি সে, যে তোমাকে রাত্রে জাগ্রত রাখত। মধ্যাহ্নের তাপের সময় পিপাসার্ত করে রাখত। প্রত্যেক ব্যবসায়ী নিজের ব্যবসার পিছে পিছে চলে, আর আমি আজ তুমি-সহ প্রত্যেক ব্যবসায়ীর (তিলাওয়াতকারীর) পেছনে আছি।” অতঃপর তাকে জান্নাতের রাজত্ব দেওয়া হবে ডান হাতে আর স্থায়িত্বের পরওয়ানা দেওয়া হবে বাম হাতে। এবং তার মাথায় সম্মানের মুকুট পরিয়ে দেওয়া হবে।” ৯
এটি পবিত্র কুরআনে কারিমের বরকত। যা রাতের বেলায় কেবল মুখের আওয়াজের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়ে দিনের বেলায় ভিন্ন রকম ফলাফল প্রকাশ করে। অর্থাৎ পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে তোমার মাঝে কঠিন গরমেও রোজা রাখার যোগ্যতা সৃষ্টি হবে। কিন্তু কথা হলো কুরআন ধূসর আকৃতি ধারণ করে আসবে কেন?!
এর ব্যাখ্যা হলো, পবিত্র কুরআন কিয়ামতের দিন তার তিলাওয়াতকারীর রূপ ধরে মলিন চেহারায় উপস্থিত হওয়ার কারণ হলো, সেই ব্যক্তি দুনিয়ায় তার প্রতিটি সময়কে কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যেই ব্যস্ত রাখত। ফলে কুরআনে কারিম রাতের বেলায় তাকে জাগ্রত রাখতে রাখতে সে ক্লান্ত হয়ে গেছে এবং দিনের বেলায় রোজা রাখতে রাখতে তার চেহারা মলিন হয়ে গেছে।
পূর্বের কথাগুলো ছিল উৎসাহমূলক, সামনের কথাগুলো শান্তি-সম্পর্কিত
নবি কারিম ইরশাদ করেছেন: إِنَّ الَّذِي لَيْسَ فِي جَوْفِهِ شَيْءٌ مِنَ القُرْآنِ كَالبَيْتِ الحرب 'যার অন্তরে কুরআনে কারিমের সামান্য অংশও নেই, সেটা বিধ্বস্ত বাড়ির ন্যায়। ' ১০
বরং রাসুল এমন একদল যুবক সাহাবিকে নিয়ে গর্ব করেছেন, যাঁরা তোমাদের প্রতীক্ষায় আছে, কখন তোমরা তাঁদের সাথে মিলিত হবে হে যুবকেরা! রাসুল ইরশাদ করেছেন: خُذُوا القُرْآنَ مِنْ أَرْبَعَةٍ مِنْ ابْنِ مَسْعُودٍ، وَأُبَيَّ بْنِ كَعْبٍ، وَمُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، وَسَالِمٍ مَوْلَى أَبِي حُذَيْفَةَ 'তোমরা চার ব্যক্তির কাছ থেকে কুরআনে কারিম শিক্ষা করো। ১. ইবনে মাসউদ থেকে। ২. উবাই বিন কাব থেকে। ৩. মুআজ বিন জাবাল থেকে। ৪. আবু হুজাইফার মুক্তদাস সালিম থেকে।' ১১
এই চারজনের মধ্যে মুআজ, ইবনে মাসউদ ও সালিম এই তিনজনই ছিলেন যুবক।
হে যুবক-যুবতিরা, দিন-রাত আল্লাহর কালামের সাথে সময় কাটাও। দিন-রাতের বিভিন্ন সময়ে পবিত্র কালামুল্লাহ তিলাওয়াত করতে থাকো। আমলনামাকে উজ্জ্বল করার এই সুবর্ণ সুযোগ হারিয়ো না। সময়গুলোকে সুরভিত করে তোলো। ইবনে ইরাক আদ-দিমাশকি তাঁর সাথিদের কুরআন মাজিদ মুখস্থ করার আদেশ দিতেন। প্রতি রাতে ইশার সালাত শেষে তিনি সবার সামনে সুরা মুলক তিলাওয়াতের পরে এই কবিতাংশটুকু আবৃত্তি করে শোনাতেন। তিনি বলতেন :
কথাগুলো অনেক পুরোনো, কিন্তু তা শুনে কখনো ক্লান্তি আসে না।
তার তিলাওয়াতের কারণে আমার অন্তর ও নিয়তের মধ্যে এবং কাজের মাঝে পবিত্রতা আনয়ন করে।
এর মাধ্যমেই আমি সব রোগ থেকে আরোগ্য পাই।
কিন্তু এটি জানা থাকা সত্ত্বেও উদাসীন থাকলে তা আমার বিরুদ্ধে দলিল হয়ে দাঁড়াবে।
হে প্রভু, তাই এই পবিত্র কালাম হিফজ করার মাধ্যমে আমাকে উপকৃত করুন।
আর আমার অন্তরকে আলোকিত করুন এবং চক্ষুকে শীতল করুন।
৪. এক রাকআত হলেও বিতরের সালাত আদায় করা। ১২
৫. চাশতের সালাত আদায় করা: আমাদের দেহের ৩৬০ জোড়ার দৈনন্দিন আবশ্যকীয় সদাকার পরিবর্তে চাশতের দুই রাকআত সালাতের বৈধতা আরোপ করা হয়েছে। পুরো দেহের অর্থাৎ এই ৩৬০ জোড়ার সদাকা হিসেবে সামান্য এই দুই রাকআত সালাতই যথেষ্ট। এটি কোনো কষ্টসাধ্য বিষয় নয়। অথচ অধিকাংশ মানুষ তা থেকে গাফিল।
৬. শাওয়াল, আশুরা, আরাফা এবং প্রতি সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার নফল সিয়ামগুলো পালন করা।
৭. বেশি বেশি সদাকা করা: তালক বিন হাবিব প্রত্যেকে সালাতের সময় সদাকার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে বের হতেন। যদি কিছু না পেতেন, তাহলে তিনি পেঁয়াজ নিয়ে যেতেন আর বলতেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَاجَيْتُمُ الرَّسُولَ فَقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيْ نَجْوَاكُمْ صَدَقَةً
'হে মুমিনগণ, তোমরা যখন রাসুলের সাথে একান্তে কথা বলতে চাও, তখন তোমাদের এরূপ কথার পূর্বে কিছু সদাকা দাও।' ১৩
সুতরাং আল্লাহ তাআলার কাছে কোনো কিছু চাওয়ার আগে কিছু সদাকা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল।
৮. প্রতিদিন হজ-উমরা পালন করা : কেননা নবি কারিম ইরশাদ করেছেন :
مَنْ صَلَّى الغَدَاةَ فِي جَمَاعَةٍ ثُمَّ قَعَدَ يَذْكُرُ اللهَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ، ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ كَانَتْ لَهُ كَأَجْرٍ حَجَّةٍ وَعُمْرَةٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: تَامَّةٍ تَامَّةٍ تَامَّةٍ
'যে ব্যক্তি ফজরের সালাত জামাআতের সাথে আদায় করার পর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে বসে আল্লাহর জিকির করে, অতঃপর দুই রাকআত সালাত আদায় করে, তার জন্য একটি হজ ও উমরার সাওয়াব লিপিবদ্ধ হয়।' বর্ণনাকারী বলেন, রাসুল বলেছেন, 'পূর্ণ পূর্ণ পূর্ণ (হজ ও উমরার সাওয়াব)।' ১৪
৯. দাওয়াহ ইলাল্লাহর কাজ করা: সমস্ত নবি-রাসুলের রিসালাতের একটি গুরুদায়িত্ব ছিল আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করা। আর আল্লাহ তাআলাও নবি- রাসুলদের তাঁর এই বাণীর ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তা নিয়ে গর্ববোধ করতে বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন :
قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي
'বলে দিন, “এই আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে বুঝে সুঝে দাওয়াত দিই আমি এবং আমার অনুসারীরা।” ১৫
হে মুসলিম ভাই, তাহলে চিন্তা করো তো! তুমি কি তোমার রাসুলের অনুসরণ করতে পেরেছ? যেভাবে তিনি উম্মাহকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছেন, তুমি কি সেভাবে আহ্বান করতে পেরেছ? না তুমি অলসতা ও অবহেলা করে দাওয়াত থেকে বিরত থেকেছ এবং তাঁকে ছেড়ে অন্যদের অনুসরণ করেছ আর তাঁর পদ্ধতিকে অন্ধের মতো এড়িয়ে গিয়েছ? তুমিই তোমার অবস্থান নির্ণয় করো।
নেকি অর্জন, মিজানের পাল্লাকে ভারী করা ও আমলনামা পবিত্র করার জন্য দাওয়াহ ইলাল্লাহ (আল্লাহর দিকে আহ্বান) অত্যন্ত উত্তম ও চমৎকার পন্থা। মৃত্যুর পরেও এর প্রতিদান লিপিবদ্ধ হতে থাকে। নবি কারিম ﷺ এই মহামূল্যবান আমলের পক্ষে প্রতিদান ঘোষণা দিয়ে ইরশাদ করেছেন:
لَأَنْ يُهْدَى بِكَ رَجُلٌ وَاحِدٌ خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ
'তোমার দ্বারা কেবল একজন লোক হিদায়াত পাওয়া তোমার জন্য লাল উট পাওয়ার চেয়েও উত্তম।' ১৬
হে যুবক ভাইয়েরা, তোমরা যৌবনের এই ভরা মৌসুমে দাওয়াতের ময়দানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার প্রতি আগ্রহী হও। তা হতে পারে বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা-ভাষণ অথবা দরসের মাধ্যমে বা ছোট ছোট কিতাবাদি ও রিসালাহ প্রকাশ ও বিতরণের মাধ্যমে। অথবা ইমেইল, ইউটিউব-সহ ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে। অথবা পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব ও কাছের মানুষদের সাথে দ্বীনি আলোচনার মাধ্যমে। মনে রাখবে, যে ব্যক্তি অন্যের কল্যাণে নিজের সময় ব্যয় করে, আল্লাহ তাআলা তার সময়ের মধ্যে বরকত দান করেন। ফলে অন্যরা যেই কাজ করতে কয়েক মাস বা বছর লেগে যায়, তার সে কাজ সম্পাদন করতে মাত্র কয়েকদিন বা সপ্তাহ ব্যয় হয়। সুবহানাল্লাহ।
১০. মসজিদে ইলমি মজলিশে উপস্থিত থাকা : তুমি কি জানো যে, মসজিদের কোনো একটি ইলমি দরসে উপস্থিত হলে একটি পরিপূর্ণ হজের সাওয়াব পাওয়া যায়? রাসুল ইরশাদ করেছেন:
مَنْ غَدًا إِلَى الْمَسْجِدِ لَا يُرِيدُ إِلَّا أَنْ يَتَعَلَّمَ خَيْرًا أَوْ يُعَلِّمَهُ، كَانَ لَهُ كَأَجْرِ حَاجٌ تَامَّا حِجَّتُهُ
'যে ব্যক্তি কোনো কল্যাণকর বিষয় শেখার জন্য অথবা শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রত্যুষে মসজিদে গমন করে, তাহলে তার জন্য এমন একজন হাজির হজের সমপরিমাণ সাওয়াব দান করা হবে, যে তার হজকে পরিপূর্ণ করতে পেরেছে। ১৭

**টিকাঃ**
৭. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির: ৭৮৩৩।
৮. সুরা আল-মুমিনুন: ৫১।
৯. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল আওসাত: ৬/৫১।
১০. সুনানুত তিরমিজি: ২৯১৩।
১১. সহিহুল বুখারি: ৪৯৯৯, সহিহু মুসলিম: ২৪৬৪, সুনানুত তিরমিজি : ৩৮১০।
১২. বিতরের রাকআত সংখ্যা নিয়ে ইমামদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। আহনাফদের মতে বিতরের সালাত তিন রাকআত পড়া ওয়াজিব। (অনুবাদক)
১৩. সুরা আল-মুজাদালা: ১২।
১৪. সুনানুত তিরমিজি: ৫৮৬।
১৫. সুরা ইউসুফ: ১০৮।
১৬. সহিহুল বুখারি : ২৯৪২।
১৭. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির: ৭৪৭৩।

তুমি তোমার সময়গুলোকে নেক আমল দ্বারা পূর্ণ করে দাও। যেমন: একটি আয়াত তিলাওয়াত করা, হাদিসের আলোচনা, ইসতিগফার, তাসবিহ-তাহলিল, নামাজ, দাওয়াত, পড়ালেখা, ইলমে দ্বীন শিক্ষা করা ও শেখানো, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ ইত্যাদি। যদি সময়গুলোকে এসব আমল দ্বারা ব্যস্ত রাখতে পারো, তাহলে আমাদের আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তিগুলো ডানা মেলতে পারবে, উন্নত হবে। কারণ, সময়গুলো এভাবে কাজে লাগালে আমরা আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হব। (হাদিসে কুদসিতে এসেছে) আল্লাহ তাআলা বলেন : مَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أَحِبَّهُ، 'নফল আমলের মাধ্যমে আমার বান্দা আমার নিকটবর্তী হতে থাকে। অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসি।' আর আল্লাহ তাআলা যেই বান্দাকে ভালোবাসেন, তার সাথে তিনি কী আচরণ করবেন বলে তোমার মনে হয়?
সময়কে কাজে লাগানোর এই মহাপুরস্কারের কারণেই আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) অনুতপ্ত হয়েছেন। কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি বা দুনিয়ার কোনো কিছু হারিয়ে ফেলে অনুতপ্ত হননি। বরং তিনি নিজেই বলছেন যে, 'আমি সেদিনের মতো আর কোনো দিন কোনো কিছুর জন্য অনুতপ্ত হইনি, যেদিন সূর্য ডুবে গিয়েছিল, অথচ আমার আমলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়নি।' ৭
সময় তো একের পর এক অতিবাহিত হয়েই যাচ্ছে। সুতরাং যেই মুহূর্তটি আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে অতিবাহিত করা হয়নি, সেটি পরিত্যক্ত ও নষ্ট হয়ে গেল। যা আর কখনো ফিরে আসবে না। আর যেই মুহূর্তগুলোতে কোনো না কোনোভাবে আল্লাহ তাআলার হুকুম পালন করা হয়, সেই মুহূর্তগুলোই অত্যন্ত দামি ও লাভজনক। যেমনটি সুলাইমান আত-তামিমির মাঝে ছিল। তাঁর ব্যাপারে বলা হয়, তাঁর এমন কোনো মুহূর্ত অতিবাহিত হতো না যে, তিনি সে সময় কোনো না কোনো সদাকা করেননি। আর যদি সদাকা করার মতো কিছু না থাকত, তাহলে তিনি দুই রাকআত নামাজ পড়তেন এবং এই আয়াত তিলাওয়াত করতেন :
يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا
'হে রাসুলগণ, পবিত্র বস্তু আহার করো এবং সৎকাজ করো।' ৮
তবে প্রথমেই আমাদের জানতে হবে যে, কোনো কিছু অর্জনের চেয়ে রক্ষার গুরুত্ব অধিক বেশি। ব্যবসার মধ্যে মুনাফা অর্জনের চেয়ে ব্যবসার ওপর থেকে সব ধরনের ক্ষতিকর দিকগুলো প্রতিহত করা প্রথম কর্তব্য।
(প্রিয় ভাই) তোমার সময় হচ্ছে তোমার মূলধন। এই লেখাটি পড়ার দ্বারা যদি তোমার অধিক লভ্যাংশ অর্জন করা উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তোমাকে অবশ্যই লভ্যাংশকে ক্ষতি থেকে দূরে রাখতে হবে। তোমার নিজের কোনো দোষ-ত্রুটি বা ক্রোধের কারণে যেন লভ্যাংশের ক্ষতি হয়ে না যায়। আর তুমি সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে তখনই, যখন তোমার সময়গুলো আল্লাহর নাফরমানি ও হারাম কাজ থেকে মুক্ত হবে। যেমন: হারাম গান শ্রবণ করা, ইন্টারনেটে নগ্ন ও অশ্লীল ক্লিপ দেখা, হারাম কাজ সম্পাদন করার জন্য কোথাও যাওয়া এবং খারাপ মানুষের সাথে ওঠাবসা করা।
(আবু সুলাইমান আদ-দারিনি ؒ) সত্যই বলেছেন। তিনি বলেন, 'কোনো ব্যক্তি তার অতীত জীবন আল্লাহর অবাধ্যতায় অতিবাহিত করায় যদি তার ভবিষ্যতের জীবন নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত সে ক্রন্দন করে এবং দুঃখ করে, তাহলে সেই ব্যক্তির কতটুকু দুঃখ করা উচিত যে, অতীতের ন্যায় তার ভবিষ্যতকেও অজ্ঞতার আঁধারে অতিবাহিত করছে?!')
প্রথমেই প্রাত্যহিক কিছু আমলের রুটিন দেওয়া হলো :
১. বারো রাকআত সুন্নাতে মুআক্কাদার সালাত আদায় : দিন ও রাতে মোট ১২ রাকআত সুন্নাত সালাত আদায় করতে হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি এগুলোর প্রতি যত্নবান হবে, আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তার জন্য একটি বাড়ি নির্মাণ করবেন। হাদিসেও এমনটিই বর্ণিত আছে।
২. কুরআন তিলাওয়াত : নিয়মিত কুরআনে কারিম থেকে ৪/৬/১০ পৃষ্ঠা করে নির্দিষ্ট একটি অংশ তিলাওয়াত আবশ্যক করে নেওয়া। যার পক্ষে যতটুকু তিলাওয়াত করা সম্ভব, ততটুকু তিলাওয়াত করা চাই। তোমার যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন, কখনো কুরআন তিলাওয়াত ছেড়ে দিয়ো না। বরং প্রতি মাসে তোমার নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়েও এক পৃষ্ঠা বা সাধ্যমতো বেশি পড়ার চেষ্টা করবে, যাতে এভাবে বৃদ্ধি পেতে পেতে একসময় তুমি দৈনিক এক পারা পরিমাণ তিলাওয়াত করতে পারো। এক পারা কুরআন তিলাওয়াত করা তোমার একটা গেম খেলার সময়ের এক-তৃতীয়াংশও হবে না, আর একটি ফিল্ম দেখার সময়ের সাথে তুলনা করলে তো তার এক-চতুর্থাংশও হবে না।
৩. হিফজুল কুরআন : পবিত্র কুরআনে কারিমের তিলাওয়াতের পাশাপাশি প্রতিদিন একটু একটু করে মুখস্থ করা। যাতে জান্নাতে প্রবেশ করার পর ফেরেশতারা তোমাকে বলতে পারে যে, পড়ো আর ওপরের দিকে উঠতে থাকো। অতঃপর তুমি একেকটি আয়াত তিলাওয়াত করবে আর ওপরের দিকে আরোহণ করতে থাকবে। এভাবে তোমার মুখস্থ থাকা শেষ আয়াতটি তিলাওয়াত করা পর্যন্ত উঠতেই থাকবে। তাহলে বলো তো দেখি! পবিত্র কুরআনের কতটুকু মুখস্থ করেছ তুমি?! তুমি কি চাও না জান্নাতের সর্বোচ্চ ভবনের সর্বোচ্চ স্তরে থাকতে? যারা অতীত থেকেই জীবনের সময়গুলো নষ্ট করে আসছ এবং রাসুলে কারিম কর্তৃক বর্ণিত মহামূল্যবান ধনভান্ডারকে পদদলিত করছ, শোনো তোমরা! রাসুল ইরশাদ করেছেন :
يَجِيءُ الْقُرْآنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَالرَّجُلِ الشَّاحِبِ، يَقُولُ لِصَاحِبِهِ: هَلْ تَعْرِفُنِي؟ أَنَا الَّذِي كُنْتُ أُسْهِرُ لَيْلَكَ، وَأُظْمِيُّ هَوَاجِرَكَ، وَإِنَّ كُلَّ تَاجِرٍ مِنْ وَرَاءِ حِجَارَتِهِ، وَأَنَا لَكَ الْيَوْمَ مِنْ وَرَاءِ كُلِّ تَاجِرٍ، فَيُعْطَى الْمُلْكَ بِيَمِينِهِ، وَالْخُلْدَ بِشِمَالِهِ، وَيُوضَعُ عَلَى رَأْسِهِ تَاجُ الْوَقَارِ
‘কিয়ামতের দিন কুরআনে কারিম ফ্যাকাশে ব্যক্তির মতো এসে তিলাওয়াতকারীকে বলবে, “আমাকে চেনো?! আমি সে, যে তোমাকে রাত্রে জাগ্রত রাখত। মধ্যাহ্নের তাপের সময় পিপাসার্ত করে রাখত। প্রত্যেক ব্যবসায়ী নিজের ব্যবসার পিছে পিছে চলে, আর আমি আজ তুমি-সহ প্রত্যেক ব্যবসায়ীর (তিলাওয়াতকারীর) পেছনে আছি।” অতঃপর তাকে জান্নাতের রাজত্ব দেওয়া হবে ডান হাতে আর স্থায়িত্বের পরওয়ানা দেওয়া হবে বাম হাতে। এবং তার মাথায় সম্মানের মুকুট পরিয়ে দেওয়া হবে।” ৯
এটি পবিত্র কুরআনে কারিমের বরকত। যা রাতের বেলায় কেবল মুখের আওয়াজের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়ে দিনের বেলায় ভিন্ন রকম ফলাফল প্রকাশ করে। অর্থাৎ পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে তোমার মাঝে কঠিন গরমেও রোজা রাখার যোগ্যতা সৃষ্টি হবে। কিন্তু কথা হলো কুরআন ধূসর আকৃতি ধারণ করে আসবে কেন?!
এর ব্যাখ্যা হলো, পবিত্র কুরআন কিয়ামতের দিন তার তিলাওয়াতকারীর রূপ ধরে মলিন চেহারায় উপস্থিত হওয়ার কারণ হলো, সেই ব্যক্তি দুনিয়ায় তার প্রতিটি সময়কে কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যেই ব্যস্ত রাখত। ফলে কুরআনে কারিম রাতের বেলায় তাকে জাগ্রত রাখতে রাখতে সে ক্লান্ত হয়ে গেছে এবং দিনের বেলায় রোজা রাখতে রাখতে তার চেহারা মলিন হয়ে গেছে।
পূর্বের কথাগুলো ছিল উৎসাহমূলক, সামনের কথাগুলো শান্তি-সম্পর্কিত
নবি কারিম ইরশাদ করেছেন: إِنَّ الَّذِي لَيْسَ فِي جَوْفِهِ شَيْءٌ مِنَ القُرْآنِ كَالبَيْتِ الحرب 'যার অন্তরে কুরআনে কারিমের সামান্য অংশও নেই, সেটা বিধ্বস্ত বাড়ির ন্যায়। ' ১০
বরং রাসুল এমন একদল যুবক সাহাবিকে নিয়ে গর্ব করেছেন, যাঁরা তোমাদের প্রতীক্ষায় আছে, কখন তোমরা তাঁদের সাথে মিলিত হবে হে যুবকেরা! রাসুল ইরশাদ করেছেন: خُذُوا القُرْآنَ مِنْ أَرْبَعَةٍ مِنْ ابْنِ مَسْعُودٍ، وَأُبَيَّ بْنِ كَعْبٍ، وَمُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، وَسَالِمٍ مَوْلَى أَبِي حُذَيْفَةَ 'তোমরা চার ব্যক্তির কাছ থেকে কুরআনে কারিম শিক্ষা করো। ১. ইবনে মাসউদ থেকে। ২. উবাই বিন কাব থেকে। ৩. মুআজ বিন জাবাল থেকে। ৪. আবু হুজাইফার মুক্তদাস সালিম থেকে।' ১১
এই চারজনের মধ্যে মুআজ, ইবনে মাসউদ ও সালিম এই তিনজনই ছিলেন যুবক।
হে যুবক-যুবতিরা, দিন-রাত আল্লাহর কালামের সাথে সময় কাটাও। দিন-রাতের বিভিন্ন সময়ে পবিত্র কালামুল্লাহ তিলাওয়াত করতে থাকো। আমলনামাকে উজ্জ্বল করার এই সুবর্ণ সুযোগ হারিয়ো না। সময়গুলোকে সুরভিত করে তোলো। ইবনে ইরাক আদ-দিমাশকি তাঁর সাথিদের কুরআন মাজিদ মুখস্থ করার আদেশ দিতেন। প্রতি রাতে ইশার সালাত শেষে তিনি সবার সামনে সুরা মুলক তিলাওয়াতের পরে এই কবিতাংশটুকু আবৃত্তি করে শোনাতেন। তিনি বলতেন :
কথাগুলো অনেক পুরোনো, কিন্তু তা শুনে কখনো ক্লান্তি আসে না।
তার তিলাওয়াতের কারণে আমার অন্তর ও নিয়তের মধ্যে এবং কাজের মাঝে পবিত্রতা আনয়ন করে।
এর মাধ্যমেই আমি সব রোগ থেকে আরোগ্য পাই।
কিন্তু এটি জানা থাকা সত্ত্বেও উদাসীন থাকলে তা আমার বিরুদ্ধে দলিল হয়ে দাঁড়াবে।
হে প্রভু, তাই এই পবিত্র কালাম হিফজ করার মাধ্যমে আমাকে উপকৃত করুন।
আর আমার অন্তরকে আলোকিত করুন এবং চক্ষুকে শীতল করুন।
৪. এক রাকআত হলেও বিতরের সালাত আদায় করা। ১২
৫. চাশতের সালাত আদায় করা: আমাদের দেহের ৩৬০ জোড়ার দৈনন্দিন আবশ্যকীয় সদাকার পরিবর্তে চাশতের দুই রাকআত সালাতের বৈধতা আরোপ করা হয়েছে। পুরো দেহের অর্থাৎ এই ৩৬০ জোড়ার সদাকা হিসেবে সামান্য এই দুই রাকআত সালাতই যথেষ্ট। এটি কোনো কষ্টসাধ্য বিষয় নয়। অথচ অধিকাংশ মানুষ তা থেকে গাফিল।
৬. শাওয়াল, আশুরা, আরাফা এবং প্রতি সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার নফল সিয়ামগুলো পালন করা।
৭. বেশি বেশি সদাকা করা: তালক বিন হাবিব প্রত্যেকে সালাতের সময় সদাকার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে বের হতেন। যদি কিছু না পেতেন, তাহলে তিনি পেঁয়াজ নিয়ে যেতেন আর বলতেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَاجَيْتُمُ الرَّسُولَ فَقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيْ نَجْوَاكُمْ صَدَقَةً
'হে মুমিনগণ, তোমরা যখন রাসুলের সাথে একান্তে কথা বলতে চাও, তখন তোমাদের এরূপ কথার পূর্বে কিছু সদাকা দাও।' ১৩
সুতরাং আল্লাহ তাআলার কাছে কোনো কিছু চাওয়ার আগে কিছু সদাকা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল।
৮. প্রতিদিন হজ-উমরা পালন করা : কেননা নবি কারিম ইরশাদ করেছেন :
مَنْ صَلَّى الغَدَاةَ فِي جَمَاعَةٍ ثُمَّ قَعَدَ يَذْكُرُ اللهَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ، ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ كَانَتْ لَهُ كَأَجْرٍ حَجَّةٍ وَعُمْرَةٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: تَامَّةٍ تَامَّةٍ تَامَّةٍ
'যে ব্যক্তি ফজরের সালাত জামাআতের সাথে আদায় করার পর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে বসে আল্লাহর জিকির করে, অতঃপর দুই রাকআত সালাত আদায় করে, তার জন্য একটি হজ ও উমরার সাওয়াব লিপিবদ্ধ হয়।' বর্ণনাকারী বলেন, রাসুল বলেছেন, 'পূর্ণ পূর্ণ পূর্ণ (হজ ও উমরার সাওয়াব)।' ১৪
৯. দাওয়াহ ইলাল্লাহর কাজ করা: সমস্ত নবি-রাসুলের রিসালাতের একটি গুরুদায়িত্ব ছিল আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করা। আর আল্লাহ তাআলাও নবি- রাসুলদের তাঁর এই বাণীর ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তা নিয়ে গর্ববোধ করতে বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন :
قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي
'বলে দিন, “এই আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে বুঝে সুঝে দাওয়াত দিই আমি এবং আমার অনুসারীরা।” ১৫
হে মুসলিম ভাই, তাহলে চিন্তা করো তো! তুমি কি তোমার রাসুলের অনুসরণ করতে পেরেছ? যেভাবে তিনি উম্মাহকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছেন, তুমি কি সেভাবে আহ্বান করতে পেরেছ? না তুমি অলসতা ও অবহেলা করে দাওয়াত থেকে বিরত থেকেছ এবং তাঁকে ছেড়ে অন্যদের অনুসরণ করেছ আর তাঁর পদ্ধতিকে অন্ধের মতো এড়িয়ে গিয়েছ? তুমিই তোমার অবস্থান নির্ণয় করো।
নেকি অর্জন, মিজানের পাল্লাকে ভারী করা ও আমলনামা পবিত্র করার জন্য দাওয়াহ ইলাল্লাহ (আল্লাহর দিকে আহ্বান) অত্যন্ত উত্তম ও চমৎকার পন্থা। মৃত্যুর পরেও এর প্রতিদান লিপিবদ্ধ হতে থাকে। নবি কারিম ﷺ এই মহামূল্যবান আমলের পক্ষে প্রতিদান ঘোষণা দিয়ে ইরশাদ করেছেন:
لَأَنْ يُهْدَى بِكَ رَجُلٌ وَاحِدٌ خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ
'তোমার দ্বারা কেবল একজন লোক হিদায়াত পাওয়া তোমার জন্য লাল উট পাওয়ার চেয়েও উত্তম।' ১৬
হে যুবক ভাইয়েরা, তোমরা যৌবনের এই ভরা মৌসুমে দাওয়াতের ময়দানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার প্রতি আগ্রহী হও। তা হতে পারে বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা-ভাষণ অথবা দরসের মাধ্যমে বা ছোট ছোট কিতাবাদি ও রিসালাহ প্রকাশ ও বিতরণের মাধ্যমে। অথবা ইমেইল, ইউটিউব-সহ ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে। অথবা পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব ও কাছের মানুষদের সাথে দ্বীনি আলোচনার মাধ্যমে। মনে রাখবে, যে ব্যক্তি অন্যের কল্যাণে নিজের সময় ব্যয় করে, আল্লাহ তাআলা তার সময়ের মধ্যে বরকত দান করেন। ফলে অন্যরা যেই কাজ করতে কয়েক মাস বা বছর লেগে যায়, তার সে কাজ সম্পাদন করতে মাত্র কয়েকদিন বা সপ্তাহ ব্যয় হয়। সুবহানাল্লাহ।
১০. মসজিদে ইলমি মজলিশে উপস্থিত থাকা : তুমি কি জানো যে, মসজিদের কোনো একটি ইলমি দরসে উপস্থিত হলে একটি পরিপূর্ণ হজের সাওয়াব পাওয়া যায়? রাসুল ইরশাদ করেছেন:
مَنْ غَدًا إِلَى الْمَسْجِدِ لَا يُرِيدُ إِلَّا أَنْ يَتَعَلَّمَ خَيْرًا أَوْ يُعَلِّمَهُ، كَانَ لَهُ كَأَجْرِ حَاجٌ تَامَّا حِجَّتُهُ
'যে ব্যক্তি কোনো কল্যাণকর বিষয় শেখার জন্য অথবা শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রত্যুষে মসজিদে গমন করে, তাহলে তার জন্য এমন একজন হাজির হজের সমপরিমাণ সাওয়াব দান করা হবে, যে তার হজকে পরিপূর্ণ করতে পেরেছে। ১৭

**টিকাঃ**
৭. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির: ৭৮৩৩।
৮. সুরা আল-মুমিনুন: ৫১।
৯. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল আওসাত: ৬/৫১।
১০. সুনানুত তিরমিজি: ২৯১৩।
১১. সহিহুল বুখারি: ৪৯৯৯, সহিহু মুসলিম: ২৪৬৪, সুনানুত তিরমিজি : ৩৮১০।
১২. বিতরের রাকআত সংখ্যা নিয়ে ইমামদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। আহনাফদের মতে বিতরের সালাত তিন রাকআত পড়া ওয়াজিব। (অনুবাদক)
১৩. সুরা আল-মুজাদালা: ১২।
১৪. সুনানুত তিরমিজি: ৫৮৬।
১৫. সুরা ইউসুফ: ১০৮।
১৬. সহিহুল বুখারি : ২৯৪২।
১৭. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির: ৭৪৭৩।

📘 সময়ের সঠিক ব্যবহার কীভাবে করবেন > 📄 দ্বিতীয় বাহু : দক্ষতা বা যোগ্যতা অর্জন

📄 দ্বিতীয় বাহু : দক্ষতা বা যোগ্যতা অর্জন


হে যুবক, তোমাদের বলছি..., তোমাদের অবশ্যই কিছু বিষয়ে পারদর্শী হতে হবে। যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। যেগুলো তোমাদের খুবই প্রয়োজন। যদি যোগ্যতাগুলো অর্জন করতে পারো, তাহলে তোমাদের জন্য কর্ম ও সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হবে। এটি অত্যন্ত লাভজনক একটি বিনিয়োগ। যদি তা অন্বেষণে ধারাবাহিকভাবে লেগে থাকো, তবেই তা অর্জন করতে পারবে। তাই যত দ্রুত এই চেষ্টা শুরু করবে, তত দ্রুত তোমার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার উজ্জ্বল হতে থাকবে। এমন কিছু যোগ্যতা হলো :
• যোগাযোগ বিদ্যা।
• ব্যক্তিগত রীতিনীতি-সম্পর্কিত বিদ্যা।
• সময় পরিচালনার জ্ঞান।
• পারস্পরিক আলোচনা করার যোগ্যতা।
• দ্রুত পড়ার যোগ্যতা।
• প্রতিবেদন ও মৌলিক জীবনী লেখার যোগ্যতা।
• উপস্থাপন দক্ষতা।
• বিভিন্ন বিদেশী ভাষা সমানভাবে লিখতে, পড়তে ও বলতে পারা।
বর্তমানে কর্মের বাজারে এই যোগ্যতাগুলো আবশ্যিক হয়ে পড়েছে। তোমাদের আমি সাহাবায়ে কিরামের একটি যোগ্যতার কথা বলব। দেখো, তাঁরা কতটা দক্ষ ছিলেন। জায়েদ বিন সাবিত বলেন, 'রাসুল আমাকে ইহুদিদের কিতাবের ভাষা শিক্ষা করার আদেশ দিয়েছিলেন। আল্লাহর কসম, তখনো কোনো ইহুদি আমাদের কিতাবের প্রতি ইমান আনেনি। অতঃপর অর্ধমাস অতিবাহিত হতে না হতেই আমি তা শিখে ফেললাম। তারপর রাসুল যখন কোনো ইহুদির কাছে পত্র লেখার ইচ্ছা করতেন, আমি লিখে দিতাম। তারা কোনো পত্র দিলে আমি তা পড়ে দিতাম।'
হে যুবক, তোমাকে বলছি, বর্তমান সময়ে বিধর্মীদের কয়টি ভাষা শিখেছ তুমি?! কতটুকু যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছ তাতে?! কতটুকু সময় ব্যয় করেছ তা শেখার জন্য?!
প্রিয় যুবক ভাইয়েরা, কেন আমরা সময়গুলোকে সেসব মুবারক আমল দ্বারা ব্যস্ত রাখি না, যেগুলো দ্বারা আল্লাহ তাআলার কাছে আমাদের মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের কাছে সম্মান বেড়ে যায়! এতে তো দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতের সম্মান নিহিত রয়েছে।
বর্তমানে আমরা প্রতিটি মুহূর্তে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ফার্মাসিস্টসহ অনেক ধরনের মুসলিম পেশাজীবী লোকদের প্রয়োজন অনুভব করি। প্রত্যেক সেক্টরে এমন কিছু দায়ির প্রয়োজন, যারা উত্তম চরিত্র ও যথার্থ ইলমের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহ তাআলার দিকে আহ্বান করবে। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা এই মহান লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য সময়কে পরিপূর্ণ কাজে না লাগাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা কেউ এই সেক্টরগুলোর শূন্যস্থান পূরণ করতে পারবে না। তাই কেন তুমি অবসর সময় ও সুযোগগুলোতে এসব যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনের প্রতি মনোযোগ দিচ্ছ না?!

হে যুবক, তোমাদের বলছি..., তোমাদের অবশ্যই কিছু বিষয়ে পারদর্শী হতে হবে। যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। যেগুলো তোমাদের খুবই প্রয়োজন। যদি যোগ্যতাগুলো অর্জন করতে পারো, তাহলে তোমাদের জন্য কর্ম ও সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হবে। এটি অত্যন্ত লাভজনক একটি বিনিয়োগ। যদি তা অন্বেষণে ধারাবাহিকভাবে লেগে থাকো, তবেই তা অর্জন করতে পারবে। তাই যত দ্রুত এই চেষ্টা শুরু করবে, তত দ্রুত তোমার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার উজ্জ্বল হতে থাকবে। এমন কিছু যোগ্যতা হলো :
• যোগাযোগ বিদ্যা।
• ব্যক্তিগত রীতিনীতি-সম্পর্কিত বিদ্যা।
• সময় পরিচালনার জ্ঞান।
• পারস্পরিক আলোচনা করার যোগ্যতা।
• দ্রুত পড়ার যোগ্যতা।
• প্রতিবেদন ও মৌলিক জীবনী লেখার যোগ্যতা।
• উপস্থাপন দক্ষতা।
• বিভিন্ন বিদেশী ভাষা সমানভাবে লিখতে, পড়তে ও বলতে পারা।
বর্তমানে কর্মের বাজারে এই যোগ্যতাগুলো আবশ্যিক হয়ে পড়েছে। তোমাদের আমি সাহাবায়ে কিরামের একটি যোগ্যতার কথা বলব। দেখো, তাঁরা কতটা দক্ষ ছিলেন। জায়েদ বিন সাবিত বলেন, 'রাসুল আমাকে ইহুদিদের কিতাবের ভাষা শিক্ষা করার আদেশ দিয়েছিলেন। আল্লাহর কসম, তখনো কোনো ইহুদি আমাদের কিতাবের প্রতি ইমান আনেনি। অতঃপর অর্ধমাস অতিবাহিত হতে না হতেই আমি তা শিখে ফেললাম। তারপর রাসুল যখন কোনো ইহুদির কাছে পত্র লেখার ইচ্ছা করতেন, আমি লিখে দিতাম। তারা কোনো পত্র দিলে আমি তা পড়ে দিতাম।'
হে যুবক, তোমাকে বলছি, বর্তমান সময়ে বিধর্মীদের কয়টি ভাষা শিখেছ তুমি?! কতটুকু যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছ তাতে?! কতটুকু সময় ব্যয় করেছ তা শেখার জন্য?!
প্রিয় যুবক ভাইয়েরা, কেন আমরা সময়গুলোকে সেসব মুবারক আমল দ্বারা ব্যস্ত রাখি না, যেগুলো দ্বারা আল্লাহ তাআলার কাছে আমাদের মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের কাছে সম্মান বেড়ে যায়! এতে তো দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতের সম্মান নিহিত রয়েছে।
বর্তমানে আমরা প্রতিটি মুহূর্তে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ফার্মাসিস্টসহ অনেক ধরনের মুসলিম পেশাজীবী লোকদের প্রয়োজন অনুভব করি। প্রত্যেক সেক্টরে এমন কিছু দায়ির প্রয়োজন, যারা উত্তম চরিত্র ও যথার্থ ইলমের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহ তাআলার দিকে আহ্বান করবে। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা এই মহান লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য সময়কে পরিপূর্ণ কাজে না লাগাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা কেউ এই সেক্টরগুলোর শূন্যস্থান পূরণ করতে পারবে না। তাই কেন তুমি অবসর সময় ও সুযোগগুলোতে এসব যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনের প্রতি মনোযোগ দিচ্ছ না?!

হে যুবক, তোমাদের বলছি..., তোমাদের অবশ্যই কিছু বিষয়ে পারদর্শী হতে হবে। যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। যেগুলো তোমাদের খুবই প্রয়োজন। যদি যোগ্যতাগুলো অর্জন করতে পারো, তাহলে তোমাদের জন্য কর্ম ও সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হবে। এটি অত্যন্ত লাভজনক একটি বিনিয়োগ। যদি তা অন্বেষণে ধারাবাহিকভাবে লেগে থাকো, তবেই তা অর্জন করতে পারবে। তাই যত দ্রুত এই চেষ্টা শুরু করবে, তত দ্রুত তোমার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার উজ্জ্বল হতে থাকবে। এমন কিছু যোগ্যতা হলো :
• যোগাযোগ বিদ্যা।
• ব্যক্তিগত রীতিনীতি-সম্পর্কিত বিদ্যা।
• সময় পরিচালনার জ্ঞান।
• পারস্পরিক আলোচনা করার যোগ্যতা।
• দ্রুত পড়ার যোগ্যতা।
• প্রতিবেদন ও মৌলিক জীবনী লেখার যোগ্যতা।
• উপস্থাপন দক্ষতা।
• বিভিন্ন বিদেশী ভাষা সমানভাবে লিখতে, পড়তে ও বলতে পারা।
বর্তমানে কর্মের বাজারে এই যোগ্যতাগুলো আবশ্যিক হয়ে পড়েছে। তোমাদের আমি সাহাবায়ে কিরামের একটি যোগ্যতার কথা বলব। দেখো, তাঁরা কতটা দক্ষ ছিলেন। জায়েদ বিন সাবিত বলেন, 'রাসুল আমাকে ইহুদিদের কিতাবের ভাষা শিক্ষা করার আদেশ দিয়েছিলেন। আল্লাহর কসম, তখনো কোনো ইহুদি আমাদের কিতাবের প্রতি ইমান আনেনি। অতঃপর অর্ধমাস অতিবাহিত হতে না হতেই আমি তা শিখে ফেললাম। তারপর রাসুল যখন কোনো ইহুদির কাছে পত্র লেখার ইচ্ছা করতেন, আমি লিখে দিতাম। তারা কোনো পত্র দিলে আমি তা পড়ে দিতাম।'
হে যুবক, তোমাকে বলছি, বর্তমান সময়ে বিধর্মীদের কয়টি ভাষা শিখেছ তুমি?! কতটুকু যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছ তাতে?! কতটুকু সময় ব্যয় করেছ তা শেখার জন্য?!
প্রিয় যুবক ভাইয়েরা, কেন আমরা সময়গুলোকে সেসব মুবারক আমল দ্বারা ব্যস্ত রাখি না, যেগুলো দ্বারা আল্লাহ তাআলার কাছে আমাদের মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের কাছে সম্মান বেড়ে যায়! এতে তো দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতের সম্মান নিহিত রয়েছে।
বর্তমানে আমরা প্রতিটি মুহূর্তে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ফার্মাসিস্টসহ অনেক ধরনের মুসলিম পেশাজীবী লোকদের প্রয়োজন অনুভব করি। প্রত্যেক সেক্টরে এমন কিছু দায়ির প্রয়োজন, যারা উত্তম চরিত্র ও যথার্থ ইলমের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহ তাআলার দিকে আহ্বান করবে। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা এই মহান লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য সময়কে পরিপূর্ণ কাজে না লাগাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা কেউ এই সেক্টরগুলোর শূন্যস্থান পূরণ করতে পারবে না। তাই কেন তুমি অবসর সময় ও সুযোগগুলোতে এসব যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনের প্রতি মনোযোগ দিচ্ছ না?!

হে যুবক, তোমাদের বলছি..., তোমাদের অবশ্যই কিছু বিষয়ে পারদর্শী হতে হবে। যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। যেগুলো তোমাদের খুবই প্রয়োজন। যদি যোগ্যতাগুলো অর্জন করতে পারো, তাহলে তোমাদের জন্য কর্ম ও সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হবে। এটি অত্যন্ত লাভজনক একটি বিনিয়োগ। যদি তা অন্বেষণে ধারাবাহিকভাবে লেগে থাকো, তবেই তা অর্জন করতে পারবে। তাই যত দ্রুত এই চেষ্টা শুরু করবে, তত দ্রুত তোমার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার উজ্জ্বল হতে থাকবে। এমন কিছু যোগ্যতা হলো :
• যোগাযোগ বিদ্যা।
• ব্যক্তিগত রীতিনীতি-সম্পর্কিত বিদ্যা।
• সময় পরিচালনার জ্ঞান।
• পারস্পরিক আলোচনা করার যোগ্যতা।
• দ্রুত পড়ার যোগ্যতা।
• প্রতিবেদন ও মৌলিক জীবনী লেখার যোগ্যতা।
• উপস্থাপন দক্ষতা।
• বিভিন্ন বিদেশী ভাষা সমানভাবে লিখতে, পড়তে ও বলতে পারা।
বর্তমানে কর্মের বাজারে এই যোগ্যতাগুলো আবশ্যিক হয়ে পড়েছে। তোমাদের আমি সাহাবায়ে কিরামের একটি যোগ্যতার কথা বলব। দেখো, তাঁরা কতটা দক্ষ ছিলেন। জায়েদ বিন সাবিত বলেন, 'রাসুল আমাকে ইহুদিদের কিতাবের ভাষা শিক্ষা করার আদেশ দিয়েছিলেন। আল্লাহর কসম, তখনো কোনো ইহুদি আমাদের কিতাবের প্রতি ইমান আনেনি। অতঃপর অর্ধমাস অতিবাহিত হতে না হতেই আমি তা শিখে ফেললাম। তারপর রাসুল যখন কোনো ইহুদির কাছে পত্র লেখার ইচ্ছা করতেন, আমি লিখে দিতাম। তারা কোনো পত্র দিলে আমি তা পড়ে দিতাম।'
হে যুবক, তোমাকে বলছি, বর্তমান সময়ে বিধর্মীদের কয়টি ভাষা শিখেছ তুমি?! কতটুকু যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছ তাতে?! কতটুকু সময় ব্যয় করেছ তা শেখার জন্য?!
প্রিয় যুবক ভাইয়েরা, কেন আমরা সময়গুলোকে সেসব মুবারক আমল দ্বারা ব্যস্ত রাখি না, যেগুলো দ্বারা আল্লাহ তাআলার কাছে আমাদের মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের কাছে সম্মান বেড়ে যায়! এতে তো দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতের সম্মান নিহিত রয়েছে।
বর্তমানে আমরা প্রতিটি মুহূর্তে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ফার্মাসিস্টসহ অনেক ধরনের মুসলিম পেশাজীবী লোকদের প্রয়োজন অনুভব করি। প্রত্যেক সেক্টরে এমন কিছু দায়ির প্রয়োজন, যারা উত্তম চরিত্র ও যথার্থ ইলমের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহ তাআলার দিকে আহ্বান করবে। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা এই মহান লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য সময়কে পরিপূর্ণ কাজে না লাগাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা কেউ এই সেক্টরগুলোর শূন্যস্থান পূরণ করতে পারবে না। তাই কেন তুমি অবসর সময় ও সুযোগগুলোতে এসব যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনের প্রতি মনোযোগ দিচ্ছ না?!

📘 সময়ের সঠিক ব্যবহার কীভাবে করবেন > 📄 তৃতীয় বাহু : সামাজিক কাজে সময় ব্যয় করা

📄 তৃতীয় বাহু : সামাজিক কাজে সময় ব্যয় করা


■ এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের কর্তব্য
রাসুল ইরশাদ করেছেন : حَقُّ المُسْلِمِ عَلَى المُسْلِمِ خَمْسٌ : رَدُّ السَّلَامِ، وَعِيَادَةُ المَرِيضِ، وَاتَّبَاعُ الجَنَائِزِ، وَإِجَابَةُ الدَّعْوَةِ، وَتَشْمِيتُ العاطس
‘এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের পাঁচটি কর্তব্য রয়েছে। ১. সালামের উত্তর দেওয়া। ২. অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করা। ৩. জানাজায় অংশগ্রহণ করা। ৪. দাওয়াতে সাড়া দেওয়া। ৫. হাঁচির উত্তর দেওয়া। ১৮ অপর বর্ণনায় এভাবে আছে, خَمْسُ تَجِبُ لِلْمُسْلِمِ عَلَى أَخِيهِ ‘একজন মুসলিমের জন্য তার অপর ভাইয়ের পাঁচটি কর্তব্য রয়েছে।’... ১৯
ইবনুল আরাবি বলেন, এই হকগুলোর প্রতি তোমাকে যত্নবান হতে হবে এবং ইসলামের সাম্যের শিক্ষা সবার মাঝে প্রতিষ্ঠা করতে হবে যে ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা হলো সকল মুসলিম সমান। তাই এমন কথা বলো না যে, এ তো বাদশাহ; সে অনেক সম্মান-প্রতিপত্তি, ঐশ্বর্য ও সম্পদের অধিকারী। আর এ তো ফকির, দরিদ্র। এ ধরনের কথা বলো না। নিম্ন শ্রেণির কাউকে হেয়জ্ঞান করো না। ইসলামকে একজন পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তির মতো মনে করো। আর সকল মুসলমানকে সেই ব্যক্তির অঙ্গ মনে করো। কেননা, মুসলিম ছাড়া ইসলামের অস্তিত্ব থাকবে না, যেমনিভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছাড়া কোনো মানুষের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।
• আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা
রাসুল ইরশাদ করেছেন :
حُسْنُ الْجِوَارِ، وَصِلَةُ الرَّحِمِ، وَحُسْنُ الْخُلُقِ يَعْمُرْنَ الدِّيَارَ وَيَزِدْنَ فِي الْأَعْمَارِ
'প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা এবং সুন্দর আচরণ করার দ্বারা ঘর আবাদ হয় এবং বয়স বৃদ্ধি পায়।' ২০
এই হাদিসের সাথে সময়ের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কেননা, এতে বয়স বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। আর হাদিসের এই কথাটির দুটি ব্যাখ্যা রয়েছে।
প্রথমত, এখানে 'বয়সের বৃদ্ধি' দ্বারা বয়সের মধ্যে বরকত হওয়ার বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। যেমন: জীবনে বরকত হলে আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজ বেশি বেশি করা যায় এবং এমন সব আমল সম্পাদন করা যায়, যা পরকালে কাজে আসবে।
দ্বিতীয়ত, বাস্তবিকভাবে বয়স বেড়ে যাবে। যেমন বলা হলো যে, অমুক ব্যক্তি যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে, তাহলে তার মোট আয়ু হবে ১০০ বছর। আর যদি তা রক্ষা করতে না পারে, তাহলে তার মোট আয়ু হবে ৬০ বছর। আর আল্লাহ তাআলা তো ভালোই জানেন যে, সে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করবে, না ছিন্ন করবে।
রাসুল -এর প্রায় উপদেশে আত্মীয়তার সম্পর্কের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। উম্মুল মুমিনিন মাইমুনা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার একটি দাসী ছিল। তাকে আমি আজাদ করে দিয়েছিলাম। অতঃপর নবি কারিম আমার কাছে আসলেন এবং বললেন:
أَجَرَكِ اللهُ، أَمَا إِنَّكِ لَوْ كُنْتِ أَعْطَيْتِهَا أَخْوَالَكِ كَانَ أَعْظَمَ لِأَجْرِكِ
'আল্লাহ তাআলা তোমাকে পুরস্কার দান করুন। যদি এটি তোমার মামাদের দান করতে, তাহলে তোমার প্রতিদান আরও বেড়ে যেত।' ২১
এই হাদিস থেকে আতা বিন আবি রাবাহ একটি শিক্ষা অর্জন করেছেন। তিনি বলেন, 'দারিদ্র্য দূর করার জন্য এক হাজার দিরহাম খরচ করার চেয়েও আমার কাছে আমার নিকটাত্মীয়ের জন্য এক দিরহাম খরচ করা অধিক প্রিয়।' এরপর এক ব্যক্তি তাকে বললেন, 'হে আবু মুহাম্মাদ, আমার আত্মীয়রা যদি আমার মতোই ধনী হয়ে থাকে, তাহলে কী করব?' তিনি বললেন, 'তারা ধনী হলেও তাদেরকেই দাও।'
অপর দিকে যারা নিজেদের উত্তম জিনিসগুলো আত্মীয়দের মাঝে ব্যয় করে না, তাদের প্রতি হুঁশিয়ারি করে রাসুল ইরশাদ করেছেন: أَيُّمَا رَجُلٍ أَتَاهُ ابْنُ عَمِّهِ، فَسَأَلَهُ مِنْ فَضْلِهِ، فَمَنَعَهُ مَنَعَهُ اللَّهُ فَضْلَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'যে ব্যক্তির কাছে তার চাচাতো ভাই কোনো অনুগ্রহ তালাশে আসার পর সে তাকে নিষেধ করে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করবেন। ২২
রাসুল অন্যত্র ইরশাদ করেছেন:
مَا مِنْ ذِي رَحِمٍ يَأْتِي ذَا رَحِمِهِ، يَسْأَلُهُ فَضْلًا أَعْطَاهُ اللَّهُ إِيَّاهُ، فَيَبْخَلُ عَلَيْهِ إِلَّا أَخْرَجَ اللَّهُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ جَهَنَّمَ حَيَّةً يُقَالُ لَهَا: شُجَاعُ يَتَلَمَّظُ، فَيُطَوَّقُ بِهِ
'কোনো নিকটাত্মীয় যদি তার অপর নিকটাত্মীয়ের কাছে গিয়ে এমন কোনো অনুগ্রহ কামনা করে, যা আল্লাহ তাআলা কেবল তাকেই দান করেছেন, অতঃপর সে তা দিতে কার্পণ্য করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার জন্য জাহান্নাম থেকে একটি সাপ বের করে আনবেন। যাকে شُجَاعٌ বলা হয়। সে তার ঠোঁট চাটতে থাকবে। অতঃপর তাকে প্যাঁচিয়ে ধরবে।' ২৩ (হাদিসটি হাসান সহিহ।)
• এতিমের দায়িত্ব গ্রহণ
তুমি কি কোনো এতিমের দায়িত্ব গ্রহণ করেছ কখনো?! রাসুল ইরশাদ করেছেন, 'তুমি কি চাও যে, তোমার অন্তর নরম হোক এবং প্রয়োজন পূরণ হোক? (যদি চাও) তাহলে এতিমের প্রতি দয়া করো, তার মাথা মুছে দাও, তুমি যা খাও তাকে তা খাওয়াও-তবেই তোমার অন্তর নরম হবে এবং প্রয়োজন পূরণ হবে। ' ২৪
শুধু তাই নয়, রাসুলে কারিম তোমাকে এই সুসংবাদও দিয়েছেন যে, এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী ও তিনি জান্নাতে পাশাপাশি অট্টালিকায় থাকবেন। তা হবে খুব কাছাকাছি। স্বয়ং রাসুল -এর পাশের আসনে থাকবে সে। তিনি ইরশাদ করেছেন :
أَنَا وَكَافِلُ الْيَتِيمِ كَهَاتَيْنِ فِي الْجَنَّةِ، وَأَشَارَ بِالسَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى، وَفَرَّقَ بَيْنَهُمَا قَلِيلًا
‘আমি ও এতিমের রক্ষণাবেক্ষণকারী জান্নাতে এভাবে থাকব। এ সময় তিনি তাঁর শাহাদাত ও মধ্যমা আঙুল দ্বারা ইশারা করেছেন। আর উভয় আঙুলের মাঝে সামান্য ফাঁকা রেখেছেন।’ ২৫
হে মুসলিম ভাই, এখনো কি তুমি এই সুযোগ গ্রহণ করোনি? রাসুল-এর পার্শ্ববর্তী ফ্লাটটি এখনো বুকিং দাওনি?! তিনি তো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন প্রতিবেশী। নাকি এখনো তুমি উদাসীন হয়ে আছ?!
• দুর্বলদের সহায়তা করা
যদি তোমার কাছে সময়কে সংকীর্ণ মনে হয় এবং সবকিছু বোঝা মনে হয়, তাহলে দুজন খলিফার ঘটনা শোনো।
আবু বকর সিদ্দিক খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে পাড়ার লোকদেরকে তাদের বকরির দুধ দোহন করে দিতেন। অতঃপর যখন খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, তখন তাদের মধ্য হতে এক দাসী বলে উঠল, 'এখন আর তিনি দুধ দোহন করবেন না।' আবু বকর শুনে বললেন, 'বরং আমি আশা করি যে, আমি এতদিন যে কাজ করতাম, তা থেকে যেন আমার পরিবর্তন না হয়।'
উমর বিধবা নারীদের দেখাশুনা করতেন। রাতের বেলায় তাদের পানি পান করাতেন। একদা তালহা উমর-কে এই অবস্থায় এক মহিলার বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখে ফেলেন। ফলে তিনি দিনের বেলায় এসে সেই বাড়িতে প্রবেশ করে দেখলেন, সেখানে একজন অন্ধ বৃদ্ধা মহিলা বসে আছেন। তখন তিনি বৃদ্ধাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, 'এই ব্যক্তি এখানে এসে কী করে?' বৃদ্ধা বললেন, 'সে তো অমুক দিন থেকেই আমার দেখাশুনা করে, আমার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আসে, আমার কষ্টগুলো দূর করে।' উমর বিষয়টি জানার পর বললেন, 'হে তালহা, তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক। তুমি উমরের গোপন বিষয়ের অনুসন্ধান করছ?!'
• কোনো ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করা
যাকে তুমি আল্লাহর জন্য ভালোবাসো এবং যার অস্তিত্বে তোমার মাঝে সহানুভূতি জাগে—এমন কারও সাথে সময় কাটালে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। কেননা, নবি কারিম বলেন, 'যে ব্যক্তি শহরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে আল্লাহর জন্য তার ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' ২৬

**টিকাঃ**
১৮. সহিহুল বুখারি: ১২৪০।
১৯. সহিহু মুসলিম: ২১৬২।
২০. ইবনে আবিদ দুনইয়া কৃত মাকারিমুল আখলাক: ৩২৯।
২১. সুনানু আবি দাউদ: ১৬৯০।
২২. তাবারানি কৃত আল-মুজামুস সগির: ৯৩। আলবানি এটিকে হাসান লি-গাইরিহি বলেছেন।
২৩. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল আওসাত: ৫৫৯৩।
২৪. শাব্দিক কিছুটা তারতম্যের সাথে এটি বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। দেখুন, আল-জামিউস সহিহ লিস সুনান ওয়াল মাসানিদ: ১০/২৪৪; হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১/২১৪।
২৫. মুসনাদু আহমাদ: ২২৮২০।
২৬. তাবারানি কৃত আল-মুজামুস সগির: ১১৮, আল-মুজামুল আওসাত : ১৭৪৩, শুআবুল ইমান: ৮৩৫৮।

■ এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের কর্তব্য
রাসুল ইরশাদ করেছেন : حَقُّ المُسْلِمِ عَلَى المُسْلِمِ خَمْسٌ : رَدُّ السَّلَامِ، وَعِيَادَةُ المَرِيضِ، وَاتَّبَاعُ الجَنَائِزِ، وَإِجَابَةُ الدَّعْوَةِ، وَتَشْمِيتُ العاطس
‘এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের পাঁচটি কর্তব্য রয়েছে। ১. সালামের উত্তর দেওয়া। ২. অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করা। ৩. জানাজায় অংশগ্রহণ করা। ৪. দাওয়াতে সাড়া দেওয়া। ৫. হাঁচির উত্তর দেওয়া। ১৮ অপর বর্ণনায় এভাবে আছে, خَمْسُ تَجِبُ لِلْمُسْلِمِ عَلَى أَخِيهِ ‘একজন মুসলিমের জন্য তার অপর ভাইয়ের পাঁচটি কর্তব্য রয়েছে।’... ১৯
ইবনুল আরাবি বলেন, এই হকগুলোর প্রতি তোমাকে যত্নবান হতে হবে এবং ইসলামের সাম্যের শিক্ষা সবার মাঝে প্রতিষ্ঠা করতে হবে যে ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা হলো সকল মুসলিম সমান। তাই এমন কথা বলো না যে, এ তো বাদশাহ; সে অনেক সম্মান-প্রতিপত্তি, ঐশ্বর্য ও সম্পদের অধিকারী। আর এ তো ফকির, দরিদ্র। এ ধরনের কথা বলো না। নিম্ন শ্রেণির কাউকে হেয়জ্ঞান করো না। ইসলামকে একজন পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তির মতো মনে করো। আর সকল মুসলমানকে সেই ব্যক্তির অঙ্গ মনে করো। কেননা, মুসলিম ছাড়া ইসলামের অস্তিত্ব থাকবে না, যেমনিভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছাড়া কোনো মানুষের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।
• আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা
রাসুল ইরশাদ করেছেন :
حُسْنُ الْجِوَارِ، وَصِلَةُ الرَّحِمِ، وَحُسْنُ الْخُلُقِ يَعْمُرْنَ الدِّيَارَ وَيَزِدْنَ فِي الْأَعْمَارِ
'প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা এবং সুন্দর আচরণ করার দ্বারা ঘর আবাদ হয় এবং বয়স বৃদ্ধি পায়।' ২০
এই হাদিসের সাথে সময়ের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কেননা, এতে বয়স বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। আর হাদিসের এই কথাটির দুটি ব্যাখ্যা রয়েছে।
প্রথমত, এখানে 'বয়সের বৃদ্ধি' দ্বারা বয়সের মধ্যে বরকত হওয়ার বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। যেমন: জীবনে বরকত হলে আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজ বেশি বেশি করা যায় এবং এমন সব আমল সম্পাদন করা যায়, যা পরকালে কাজে আসবে।
দ্বিতীয়ত, বাস্তবিকভাবে বয়স বেড়ে যাবে। যেমন বলা হলো যে, অমুক ব্যক্তি যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে, তাহলে তার মোট আয়ু হবে ১০০ বছর। আর যদি তা রক্ষা করতে না পারে, তাহলে তার মোট আয়ু হবে ৬০ বছর। আর আল্লাহ তাআলা তো ভালোই জানেন যে, সে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করবে, না ছিন্ন করবে।
রাসুল -এর প্রায় উপদেশে আত্মীয়তার সম্পর্কের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। উম্মুল মুমিনিন মাইমুনা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার একটি দাসী ছিল। তাকে আমি আজাদ করে দিয়েছিলাম। অতঃপর নবি কারিম আমার কাছে আসলেন এবং বললেন:
أَجَرَكِ اللهُ، أَمَا إِنَّكِ لَوْ كُنْتِ أَعْطَيْتِهَا أَخْوَالَكِ كَانَ أَعْظَمَ لِأَجْرِكِ
'আল্লাহ তাআলা তোমাকে পুরস্কার দান করুন। যদি এটি তোমার মামাদের দান করতে, তাহলে তোমার প্রতিদান আরও বেড়ে যেত।' ২১
এই হাদিস থেকে আতা বিন আবি রাবাহ একটি শিক্ষা অর্জন করেছেন। তিনি বলেন, 'দারিদ্র্য দূর করার জন্য এক হাজার দিরহাম খরচ করার চেয়েও আমার কাছে আমার নিকটাত্মীয়ের জন্য এক দিরহাম খরচ করা অধিক প্রিয়।' এরপর এক ব্যক্তি তাকে বললেন, 'হে আবু মুহাম্মাদ, আমার আত্মীয়রা যদি আমার মতোই ধনী হয়ে থাকে, তাহলে কী করব?' তিনি বললেন, 'তারা ধনী হলেও তাদেরকেই দাও।'
অপর দিকে যারা নিজেদের উত্তম জিনিসগুলো আত্মীয়দের মাঝে ব্যয় করে না, তাদের প্রতি হুঁশিয়ারি করে রাসুল ইরশাদ করেছেন: أَيُّمَا رَجُلٍ أَتَاهُ ابْنُ عَمِّهِ، فَسَأَلَهُ مِنْ فَضْلِهِ، فَمَنَعَهُ مَنَعَهُ اللَّهُ فَضْلَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'যে ব্যক্তির কাছে তার চাচাতো ভাই কোনো অনুগ্রহ তালাশে আসার পর সে তাকে নিষেধ করে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করবেন। ২২
রাসুল অন্যত্র ইরশাদ করেছেন:
مَا مِنْ ذِي رَحِمٍ يَأْتِي ذَا رَحِمِهِ، يَسْأَلُهُ فَضْلًا أَعْطَاهُ اللَّهُ إِيَّاهُ، فَيَبْخَلُ عَلَيْهِ إِلَّا أَخْرَجَ اللَّهُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ جَهَنَّمَ حَيَّةً يُقَالُ لَهَا: شُجَاعُ يَتَلَمَّظُ، فَيُطَوَّقُ بِهِ
'কোনো নিকটাত্মীয় যদি তার অপর নিকটাত্মীয়ের কাছে গিয়ে এমন কোনো অনুগ্রহ কামনা করে, যা আল্লাহ তাআলা কেবল তাকেই দান করেছেন, অতঃপর সে তা দিতে কার্পণ্য করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার জন্য জাহান্নাম থেকে একটি সাপ বের করে আনবেন। যাকে شُجَاعٌ বলা হয়। সে তার ঠোঁট চাটতে থাকবে। অতঃপর তাকে প্যাঁচিয়ে ধরবে।' ২৩ (হাদিসটি হাসান সহিহ।)
• এতিমের দায়িত্ব গ্রহণ
তুমি কি কোনো এতিমের দায়িত্ব গ্রহণ করেছ কখনো?! রাসুল ইরশাদ করেছেন, 'তুমি কি চাও যে, তোমার অন্তর নরম হোক এবং প্রয়োজন পূরণ হোক? (যদি চাও) তাহলে এতিমের প্রতি দয়া করো, তার মাথা মুছে দাও, তুমি যা খাও তাকে তা খাওয়াও-তবেই তোমার অন্তর নরম হবে এবং প্রয়োজন পূরণ হবে। ' ২৪
শুধু তাই নয়, রাসুলে কারিম তোমাকে এই সুসংবাদও দিয়েছেন যে, এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী ও তিনি জান্নাতে পাশাপাশি অট্টালিকায় থাকবেন। তা হবে খুব কাছাকাছি। স্বয়ং রাসুল -এর পাশের আসনে থাকবে সে। তিনি ইরশাদ করেছেন :
أَنَا وَكَافِلُ الْيَتِيمِ كَهَاتَيْنِ فِي الْجَنَّةِ، وَأَشَارَ بِالسَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى، وَفَرَّقَ بَيْنَهُمَا قَلِيلًا
‘আমি ও এতিমের রক্ষণাবেক্ষণকারী জান্নাতে এভাবে থাকব। এ সময় তিনি তাঁর শাহাদাত ও মধ্যমা আঙুল দ্বারা ইশারা করেছেন। আর উভয় আঙুলের মাঝে সামান্য ফাঁকা রেখেছেন।’ ২৫
হে মুসলিম ভাই, এখনো কি তুমি এই সুযোগ গ্রহণ করোনি? রাসুল-এর পার্শ্ববর্তী ফ্লাটটি এখনো বুকিং দাওনি?! তিনি তো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন প্রতিবেশী। নাকি এখনো তুমি উদাসীন হয়ে আছ?!
• দুর্বলদের সহায়তা করা
যদি তোমার কাছে সময়কে সংকীর্ণ মনে হয় এবং সবকিছু বোঝা মনে হয়, তাহলে দুজন খলিফার ঘটনা শোনো।
আবু বকর সিদ্দিক খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে পাড়ার লোকদেরকে তাদের বকরির দুধ দোহন করে দিতেন। অতঃপর যখন খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, তখন তাদের মধ্য হতে এক দাসী বলে উঠল, 'এখন আর তিনি দুধ দোহন করবেন না।' আবু বকর শুনে বললেন, 'বরং আমি আশা করি যে, আমি এতদিন যে কাজ করতাম, তা থেকে যেন আমার পরিবর্তন না হয়।'
উমর বিধবা নারীদের দেখাশুনা করতেন। রাতের বেলায় তাদের পানি পান করাতেন। একদা তালহা উমর-কে এই অবস্থায় এক মহিলার বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখে ফেলেন। ফলে তিনি দিনের বেলায় এসে সেই বাড়িতে প্রবেশ করে দেখলেন, সেখানে একজন অন্ধ বৃদ্ধা মহিলা বসে আছেন। তখন তিনি বৃদ্ধাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, 'এই ব্যক্তি এখানে এসে কী করে?' বৃদ্ধা বললেন, 'সে তো অমুক দিন থেকেই আমার দেখাশুনা করে, আমার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আসে, আমার কষ্টগুলো দূর করে।' উমর বিষয়টি জানার পর বললেন, 'হে তালহা, তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক। তুমি উমরের গোপন বিষয়ের অনুসন্ধান করছ?!'
• কোনো ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করা
যাকে তুমি আল্লাহর জন্য ভালোবাসো এবং যার অস্তিত্বে তোমার মাঝে সহানুভূতি জাগে—এমন কারও সাথে সময় কাটালে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। কেননা, নবি কারিম বলেন, 'যে ব্যক্তি শহরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে আল্লাহর জন্য তার ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' ২৬

**টিকাঃ**
১৮. সহিহুল বুখারি: ১২৪০।
১৯. সহিহু মুসলিম: ২১৬২।
২০. ইবনে আবিদ দুনইয়া কৃত মাকারিমুল আখলাক: ৩২৯।
২১. সুনানু আবি দাউদ: ১৬৯০।
২২. তাবারানি কৃত আল-মুজামুস সগির: ৯৩। আলবানি এটিকে হাসান লি-গাইরিহি বলেছেন।
২৩. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল আওসাত: ৫৫৯৩।
২৪. শাব্দিক কিছুটা তারতম্যের সাথে এটি বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। দেখুন, আল-জামিউস সহিহ লিস সুনান ওয়াল মাসানিদ: ১০/২৪৪; হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১/২১৪।
২৫. মুসনাদু আহমাদ: ২২৮২০।
২৬. তাবারানি কৃত আল-মুজামুস সগির: ১১৮, আল-মুজামুল আওসাত : ১৭৪৩, শুআবুল ইমান: ৮৩৫৮।

■ এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের কর্তব্য
রাসুল ইরশাদ করেছেন : حَقُّ المُسْلِمِ عَلَى المُسْلِمِ خَمْسٌ : رَدُّ السَّلَامِ، وَعِيَادَةُ المَرِيضِ، وَاتَّبَاعُ الجَنَائِزِ، وَإِجَابَةُ الدَّعْوَةِ، وَتَشْمِيتُ العاطس
‘এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের পাঁচটি কর্তব্য রয়েছে। ১. সালামের উত্তর দেওয়া। ২. অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করা। ৩. জানাজায় অংশগ্রহণ করা। ৪. দাওয়াতে সাড়া দেওয়া। ৫. হাঁচির উত্তর দেওয়া। ১৮ অপর বর্ণনায় এভাবে আছে, خَمْسُ تَجِبُ لِلْمُسْلِمِ عَلَى أَخِيهِ ‘একজন মুসলিমের জন্য তার অপর ভাইয়ের পাঁচটি কর্তব্য রয়েছে।’... ১৯
ইবনুল আরাবি বলেন, এই হকগুলোর প্রতি তোমাকে যত্নবান হতে হবে এবং ইসলামের সাম্যের শিক্ষা সবার মাঝে প্রতিষ্ঠা করতে হবে যে ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা হলো সকল মুসলিম সমান। তাই এমন কথা বলো না যে, এ তো বাদশাহ; সে অনেক সম্মান-প্রতিপত্তি, ঐশ্বর্য ও সম্পদের অধিকারী। আর এ তো ফকির, দরিদ্র। এ ধরনের কথা বলো না। নিম্ন শ্রেণির কাউকে হেয়জ্ঞান করো না। ইসলামকে একজন পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তির মতো মনে করো। আর সকল মুসলমানকে সেই ব্যক্তির অঙ্গ মনে করো। কেননা, মুসলিম ছাড়া ইসলামের অস্তিত্ব থাকবে না, যেমনিভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছাড়া কোনো মানুষের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।
• আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা
রাসুল ইরশাদ করেছেন :
حُسْنُ الْجِوَارِ، وَصِلَةُ الرَّحِمِ، وَحُسْنُ الْخُلُقِ يَعْمُرْنَ الدِّيَارَ وَيَزِدْنَ فِي الْأَعْمَارِ
'প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা এবং সুন্দর আচরণ করার দ্বারা ঘর আবাদ হয় এবং বয়স বৃদ্ধি পায়।' ২০
এই হাদিসের সাথে সময়ের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কেননা, এতে বয়স বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। আর হাদিসের এই কথাটির দুটি ব্যাখ্যা রয়েছে।
প্রথমত, এখানে 'বয়সের বৃদ্ধি' দ্বারা বয়সের মধ্যে বরকত হওয়ার বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। যেমন: জীবনে বরকত হলে আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজ বেশি বেশি করা যায় এবং এমন সব আমল সম্পাদন করা যায়, যা পরকালে কাজে আসবে।
দ্বিতীয়ত, বাস্তবিকভাবে বয়স বেড়ে যাবে। যেমন বলা হলো যে, অমুক ব্যক্তি যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে, তাহলে তার মোট আয়ু হবে ১০০ বছর। আর যদি তা রক্ষা করতে না পারে, তাহলে তার মোট আয়ু হবে ৬০ বছর। আর আল্লাহ তাআলা তো ভালোই জানেন যে, সে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করবে, না ছিন্ন করবে।
রাসুল -এর প্রায় উপদেশে আত্মীয়তার সম্পর্কের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। উম্মুল মুমিনিন মাইমুনা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার একটি দাসী ছিল। তাকে আমি আজাদ করে দিয়েছিলাম। অতঃপর নবি কারিম আমার কাছে আসলেন এবং বললেন:
أَجَرَكِ اللهُ، أَمَا إِنَّكِ لَوْ كُنْتِ أَعْطَيْتِهَا أَخْوَالَكِ كَانَ أَعْظَمَ لِأَجْرِكِ
'আল্লাহ তাআলা তোমাকে পুরস্কার দান করুন। যদি এটি তোমার মামাদের দান করতে, তাহলে তোমার প্রতিদান আরও বেড়ে যেত।' ২১
এই হাদিস থেকে আতা বিন আবি রাবাহ একটি শিক্ষা অর্জন করেছেন। তিনি বলেন, 'দারিদ্র্য দূর করার জন্য এক হাজার দিরহাম খরচ করার চেয়েও আমার কাছে আমার নিকটাত্মীয়ের জন্য এক দিরহাম খরচ করা অধিক প্রিয়।' এরপর এক ব্যক্তি তাকে বললেন, 'হে আবু মুহাম্মাদ, আমার আত্মীয়রা যদি আমার মতোই ধনী হয়ে থাকে, তাহলে কী করব?' তিনি বললেন, 'তারা ধনী হলেও তাদেরকেই দাও।'
অপর দিকে যারা নিজেদের উত্তম জিনিসগুলো আত্মীয়দের মাঝে ব্যয় করে না, তাদের প্রতি হুঁশিয়ারি করে রাসুল ইরশাদ করেছেন: أَيُّمَا رَجُلٍ أَتَاهُ ابْنُ عَمِّهِ، فَسَأَلَهُ مِنْ فَضْلِهِ، فَمَنَعَهُ مَنَعَهُ اللَّهُ فَضْلَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'যে ব্যক্তির কাছে তার চাচাতো ভাই কোনো অনুগ্রহ তালাশে আসার পর সে তাকে নিষেধ করে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করবেন। ২২
রাসুল অন্যত্র ইরশাদ করেছেন:
مَا مِنْ ذِي رَحِمٍ يَأْتِي ذَا رَحِمِهِ، يَسْأَلُهُ فَضْلًا أَعْطَاهُ اللَّهُ إِيَّاهُ، فَيَبْخَلُ عَلَيْهِ إِلَّا أَخْرَجَ اللَّهُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ جَهَنَّمَ حَيَّةً يُقَالُ لَهَا: شُجَاعُ يَتَلَمَّظُ، فَيُطَوَّقُ بِهِ
'কোনো নিকটাত্মীয় যদি তার অপর নিকটাত্মীয়ের কাছে গিয়ে এমন কোনো অনুগ্রহ কামনা করে, যা আল্লাহ তাআলা কেবল তাকেই দান করেছেন, অতঃপর সে তা দিতে কার্পণ্য করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার জন্য জাহান্নাম থেকে একটি সাপ বের করে আনবেন। যাকে شُجَاعٌ বলা হয়। সে তার ঠোঁট চাটতে থাকবে। অতঃপর তাকে প্যাঁচিয়ে ধরবে।' ২৩ (হাদিসটি হাসান সহিহ।)
• এতিমের দায়িত্ব গ্রহণ
তুমি কি কোনো এতিমের দায়িত্ব গ্রহণ করেছ কখনো?! রাসুল ইরশাদ করেছেন, 'তুমি কি চাও যে, তোমার অন্তর নরম হোক এবং প্রয়োজন পূরণ হোক? (যদি চাও) তাহলে এতিমের প্রতি দয়া করো, তার মাথা মুছে দাও, তুমি যা খাও তাকে তা খাওয়াও-তবেই তোমার অন্তর নরম হবে এবং প্রয়োজন পূরণ হবে। ' ২৪
শুধু তাই নয়, রাসুলে কারিম তোমাকে এই সুসংবাদও দিয়েছেন যে, এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী ও তিনি জান্নাতে পাশাপাশি অট্টালিকায় থাকবেন। তা হবে খুব কাছাকাছি। স্বয়ং রাসুল -এর পাশের আসনে থাকবে সে। তিনি ইরশাদ করেছেন :
أَنَا وَكَافِلُ الْيَتِيمِ كَهَاتَيْنِ فِي الْجَنَّةِ، وَأَشَارَ بِالسَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى، وَفَرَّقَ بَيْنَهُمَا قَلِيلًا
‘আমি ও এতিমের রক্ষণাবেক্ষণকারী জান্নাতে এভাবে থাকব। এ সময় তিনি তাঁর শাহাদাত ও মধ্যমা আঙুল দ্বারা ইশারা করেছেন। আর উভয় আঙুলের মাঝে সামান্য ফাঁকা রেখেছেন।’ ২৫
হে মুসলিম ভাই, এখনো কি তুমি এই সুযোগ গ্রহণ করোনি? রাসুল-এর পার্শ্ববর্তী ফ্লাটটি এখনো বুকিং দাওনি?! তিনি তো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন প্রতিবেশী। নাকি এখনো তুমি উদাসীন হয়ে আছ?!
• দুর্বলদের সহায়তা করা
যদি তোমার কাছে সময়কে সংকীর্ণ মনে হয় এবং সবকিছু বোঝা মনে হয়, তাহলে দুজন খলিফার ঘটনা শোনো।
আবু বকর সিদ্দিক খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে পাড়ার লোকদেরকে তাদের বকরির দুধ দোহন করে দিতেন। অতঃপর যখন খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, তখন তাদের মধ্য হতে এক দাসী বলে উঠল, 'এখন আর তিনি দুধ দোহন করবেন না।' আবু বকর শুনে বললেন, 'বরং আমি আশা করি যে, আমি এতদিন যে কাজ করতাম, তা থেকে যেন আমার পরিবর্তন না হয়।'
উমর বিধবা নারীদের দেখাশুনা করতেন। রাতের বেলায় তাদের পানি পান করাতেন। একদা তালহা উমর-কে এই অবস্থায় এক মহিলার বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখে ফেলেন। ফলে তিনি দিনের বেলায় এসে সেই বাড়িতে প্রবেশ করে দেখলেন, সেখানে একজন অন্ধ বৃদ্ধা মহিলা বসে আছেন। তখন তিনি বৃদ্ধাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, 'এই ব্যক্তি এখানে এসে কী করে?' বৃদ্ধা বললেন, 'সে তো অমুক দিন থেকেই আমার দেখাশুনা করে, আমার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আসে, আমার কষ্টগুলো দূর করে।' উমর বিষয়টি জানার পর বললেন, 'হে তালহা, তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক। তুমি উমরের গোপন বিষয়ের অনুসন্ধান করছ?!'
• কোনো ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করা
যাকে তুমি আল্লাহর জন্য ভালোবাসো এবং যার অস্তিত্বে তোমার মাঝে সহানুভূতি জাগে—এমন কারও সাথে সময় কাটালে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। কেননা, নবি কারিম বলেন, 'যে ব্যক্তি শহরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে আল্লাহর জন্য তার ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' ২৬

**টিকাঃ**
১৮. সহিহুল বুখারি: ১২৪০।
১৯. সহিহু মুসলিম: ২১৬২।
২০. ইবনে আবিদ দুনইয়া কৃত মাকারিমুল আখলাক: ৩২৯।
২১. সুনানু আবি দাউদ: ১৬৯০।
২২. তাবারানি কৃত আল-মুজামুস সগির: ৯৩। আলবানি এটিকে হাসান লি-গাইরিহি বলেছেন।
২৩. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল আওসাত: ৫৫৯৩।
২৪. শাব্দিক কিছুটা তারতম্যের সাথে এটি বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। দেখুন, আল-জামিউস সহিহ লিস সুনান ওয়াল মাসানিদ: ১০/২৪৪; হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১/২১৪।
২৫. মুসনাদু আহমাদ: ২২৮২০।
২৬. তাবারানি কৃত আল-মুজামুস সগির: ১১৮, আল-মুজামুল আওসাত : ১৭৪৩, শুআবুল ইমান: ৮৩৫৮।

■ এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের কর্তব্য
রাসুল ইরশাদ করেছেন : حَقُّ المُسْلِمِ عَلَى المُسْلِمِ خَمْسٌ : رَدُّ السَّلَامِ، وَعِيَادَةُ المَرِيضِ، وَاتَّبَاعُ الجَنَائِزِ، وَإِجَابَةُ الدَّعْوَةِ، وَتَشْمِيتُ العاطس
‘এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের পাঁচটি কর্তব্য রয়েছে। ১. সালামের উত্তর দেওয়া। ২. অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করা। ৩. জানাজায় অংশগ্রহণ করা। ৪. দাওয়াতে সাড়া দেওয়া। ৫. হাঁচির উত্তর দেওয়া। ১৮ অপর বর্ণনায় এভাবে আছে, خَمْسُ تَجِبُ لِلْمُسْلِمِ عَلَى أَخِيهِ ‘একজন মুসলিমের জন্য তার অপর ভাইয়ের পাঁচটি কর্তব্য রয়েছে।’... ১৯
ইবনুল আরাবি বলেন, এই হকগুলোর প্রতি তোমাকে যত্নবান হতে হবে এবং ইসলামের সাম্যের শিক্ষা সবার মাঝে প্রতিষ্ঠা করতে হবে যে ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা হলো সকল মুসলিম সমান। তাই এমন কথা বলো না যে, এ তো বাদশাহ; সে অনেক সম্মান-প্রতিপত্তি, ঐশ্বর্য ও সম্পদের অধিকারী। আর এ তো ফকির, দরিদ্র। এ ধরনের কথা বলো না। নিম্ন শ্রেণির কাউকে হেয়জ্ঞান করো না। ইসলামকে একজন পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তির মতো মনে করো। আর সকল মুসলমানকে সেই ব্যক্তির অঙ্গ মনে করো। কেননা, মুসলিম ছাড়া ইসলামের অস্তিত্ব থাকবে না, যেমনিভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছাড়া কোনো মানুষের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।
• আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা
রাসুল ইরশাদ করেছেন :
حُسْنُ الْجِوَارِ، وَصِلَةُ الرَّحِمِ، وَحُسْنُ الْخُلُقِ يَعْمُرْنَ الدِّيَارَ وَيَزِدْنَ فِي الْأَعْمَارِ
'প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা এবং সুন্দর আচরণ করার দ্বারা ঘর আবাদ হয় এবং বয়স বৃদ্ধি পায়।' ২০
এই হাদিসের সাথে সময়ের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কেননা, এতে বয়স বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। আর হাদিসের এই কথাটির দুটি ব্যাখ্যা রয়েছে।
প্রথমত, এখানে 'বয়সের বৃদ্ধি' দ্বারা বয়সের মধ্যে বরকত হওয়ার বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। যেমন: জীবনে বরকত হলে আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজ বেশি বেশি করা যায় এবং এমন সব আমল সম্পাদন করা যায়, যা পরকালে কাজে আসবে।
দ্বিতীয়ত, বাস্তবিকভাবে বয়স বেড়ে যাবে। যেমন বলা হলো যে, অমুক ব্যক্তি যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে, তাহলে তার মোট আয়ু হবে ১০০ বছর। আর যদি তা রক্ষা করতে না পারে, তাহলে তার মোট আয়ু হবে ৬০ বছর। আর আল্লাহ তাআলা তো ভালোই জানেন যে, সে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করবে, না ছিন্ন করবে।
রাসুল -এর প্রায় উপদেশে আত্মীয়তার সম্পর্কের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। উম্মুল মুমিনিন মাইমুনা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার একটি দাসী ছিল। তাকে আমি আজাদ করে দিয়েছিলাম। অতঃপর নবি কারিম আমার কাছে আসলেন এবং বললেন:
أَجَرَكِ اللهُ، أَمَا إِنَّكِ لَوْ كُنْتِ أَعْطَيْتِهَا أَخْوَالَكِ كَانَ أَعْظَمَ لِأَجْرِكِ
'আল্লাহ তাআলা তোমাকে পুরস্কার দান করুন। যদি এটি তোমার মামাদের দান করতে, তাহলে তোমার প্রতিদান আরও বেড়ে যেত।' ২১
এই হাদিস থেকে আতা বিন আবি রাবাহ একটি শিক্ষা অর্জন করেছেন। তিনি বলেন, 'দারিদ্র্য দূর করার জন্য এক হাজার দিরহাম খরচ করার চেয়েও আমার কাছে আমার নিকটাত্মীয়ের জন্য এক দিরহাম খরচ করা অধিক প্রিয়।' এরপর এক ব্যক্তি তাকে বললেন, 'হে আবু মুহাম্মাদ, আমার আত্মীয়রা যদি আমার মতোই ধনী হয়ে থাকে, তাহলে কী করব?' তিনি বললেন, 'তারা ধনী হলেও তাদেরকেই দাও।'
অপর দিকে যারা নিজেদের উত্তম জিনিসগুলো আত্মীয়দের মাঝে ব্যয় করে না, তাদের প্রতি হুঁশিয়ারি করে রাসুল ইরশাদ করেছেন: أَيُّمَا رَجُلٍ أَتَاهُ ابْنُ عَمِّهِ، فَسَأَلَهُ مِنْ فَضْلِهِ، فَمَنَعَهُ مَنَعَهُ اللَّهُ فَضْلَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'যে ব্যক্তির কাছে তার চাচাতো ভাই কোনো অনুগ্রহ তালাশে আসার পর সে তাকে নিষেধ করে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করবেন। ২২
রাসুল অন্যত্র ইরশাদ করেছেন:
مَا مِنْ ذِي رَحِمٍ يَأْتِي ذَا رَحِمِهِ، يَسْأَلُهُ فَضْلًا أَعْطَاهُ اللَّهُ إِيَّاهُ، فَيَبْخَلُ عَلَيْهِ إِلَّا أَخْرَجَ اللَّهُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ جَهَنَّمَ حَيَّةً يُقَالُ لَهَا: شُجَاعُ يَتَلَمَّظُ، فَيُطَوَّقُ بِهِ
'কোনো নিকটাত্মীয় যদি তার অপর নিকটাত্মীয়ের কাছে গিয়ে এমন কোনো অনুগ্রহ কামনা করে, যা আল্লাহ তাআলা কেবল তাকেই দান করেছেন, অতঃপর সে তা দিতে কার্পণ্য করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার জন্য জাহান্নাম থেকে একটি সাপ বের করে আনবেন। যাকে شُجَاعٌ বলা হয়। সে তার ঠোঁট চাটতে থাকবে। অতঃপর তাকে প্যাঁচিয়ে ধরবে।' ২৩ (হাদিসটি হাসান সহিহ।)
• এতিমের দায়িত্ব গ্রহণ
তুমি কি কোনো এতিমের দায়িত্ব গ্রহণ করেছ কখনো?! রাসুল ইরশাদ করেছেন, 'তুমি কি চাও যে, তোমার অন্তর নরম হোক এবং প্রয়োজন পূরণ হোক? (যদি চাও) তাহলে এতিমের প্রতি দয়া করো, তার মাথা মুছে দাও, তুমি যা খাও তাকে তা খাওয়াও-তবেই তোমার অন্তর নরম হবে এবং প্রয়োজন পূরণ হবে। ' ২৪
শুধু তাই নয়, রাসুলে কারিম তোমাকে এই সুসংবাদও দিয়েছেন যে, এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী ও তিনি জান্নাতে পাশাপাশি অট্টালিকায় থাকবেন। তা হবে খুব কাছাকাছি। স্বয়ং রাসুল -এর পাশের আসনে থাকবে সে। তিনি ইরশাদ করেছেন :
أَنَا وَكَافِلُ الْيَتِيمِ كَهَاتَيْنِ فِي الْجَنَّةِ، وَأَشَارَ بِالسَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى، وَفَرَّقَ بَيْنَهُمَا قَلِيلًا
‘আমি ও এতিমের রক্ষণাবেক্ষণকারী জান্নাতে এভাবে থাকব। এ সময় তিনি তাঁর শাহাদাত ও মধ্যমা আঙুল দ্বারা ইশারা করেছেন। আর উভয় আঙুলের মাঝে সামান্য ফাঁকা রেখেছেন।’ ২৫
হে মুসলিম ভাই, এখনো কি তুমি এই সুযোগ গ্রহণ করোনি? রাসুল-এর পার্শ্ববর্তী ফ্লাটটি এখনো বুকিং দাওনি?! তিনি তো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন প্রতিবেশী। নাকি এখনো তুমি উদাসীন হয়ে আছ?!
• দুর্বলদের সহায়তা করা
যদি তোমার কাছে সময়কে সংকীর্ণ মনে হয় এবং সবকিছু বোঝা মনে হয়, তাহলে দুজন খলিফার ঘটনা শোনো।
আবু বকর সিদ্দিক খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে পাড়ার লোকদেরকে তাদের বকরির দুধ দোহন করে দিতেন। অতঃপর যখন খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, তখন তাদের মধ্য হতে এক দাসী বলে উঠল, 'এখন আর তিনি দুধ দোহন করবেন না।' আবু বকর শুনে বললেন, 'বরং আমি আশা করি যে, আমি এতদিন যে কাজ করতাম, তা থেকে যেন আমার পরিবর্তন না হয়।'
উমর বিধবা নারীদের দেখাশুনা করতেন। রাতের বেলায় তাদের পানি পান করাতেন। একদা তালহা উমর-কে এই অবস্থায় এক মহিলার বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখে ফেলেন। ফলে তিনি দিনের বেলায় এসে সেই বাড়িতে প্রবেশ করে দেখলেন, সেখানে একজন অন্ধ বৃদ্ধা মহিলা বসে আছেন। তখন তিনি বৃদ্ধাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, 'এই ব্যক্তি এখানে এসে কী করে?' বৃদ্ধা বললেন, 'সে তো অমুক দিন থেকেই আমার দেখাশুনা করে, আমার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আসে, আমার কষ্টগুলো দূর করে।' উমর বিষয়টি জানার পর বললেন, 'হে তালহা, তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক। তুমি উমরের গোপন বিষয়ের অনুসন্ধান করছ?!'
• কোনো ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করা
যাকে তুমি আল্লাহর জন্য ভালোবাসো এবং যার অস্তিত্বে তোমার মাঝে সহানুভূতি জাগে—এমন কারও সাথে সময় কাটালে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। কেননা, নবি কারিম বলেন, 'যে ব্যক্তি শহরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে আল্লাহর জন্য তার ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' ২৬

**টিকাঃ**
১৮. সহিহুল বুখারি: ১২৪০।
১৯. সহিহু মুসলিম: ২১৬২।
২০. ইবনে আবিদ দুনইয়া কৃত মাকারিমুল আখলাক: ৩২৯।
২১. সুনানু আবি দাউদ: ১৬৯০।
২২. তাবারানি কৃত আল-মুজামুস সগির: ৯৩। আলবানি এটিকে হাসান লি-গাইরিহি বলেছেন।
২৩. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল আওসাত: ৫৫৯৩।
২৪. শাব্দিক কিছুটা তারতম্যের সাথে এটি বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। দেখুন, আল-জামিউস সহিহ লিস সুনান ওয়াল মাসানিদ: ১০/২৪৪; হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১/২১৪।
২৫. মুসনাদু আহমাদ: ২২৮২০।
২৬. তাবারানি কৃত আল-মুজামুস সগির: ১১৮, আল-মুজামুল আওসাত : ১৭৪৩, শুআবুল ইমান: ৮৩৫৮।

📘 সময়ের সঠিক ব্যবহার কীভাবে করবেন > 📄 চতুর্থ বাহু : বিনোদনের জন্য সময় ব্যয় করা

📄 চতুর্থ বাহু : বিনোদনের জন্য সময় ব্যয় করা


অনেকেই বিনোদনের গুরুত্ব বোঝে না। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, বিনোদন মানে জীবনের মূল্যবান সময়গুলোকে নষ্ট করা। অথচ বিনোদন মানবজীবনে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু তাই নয়, যদি নিয়ত বিশুদ্ধ থাকে এবং শরিয়াহর মাপকাঠি অনুযায়ী হয়, তাহলে এটি ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত হবে। ইসলামি শরিয়ায় বিভিন্ন দলিল-প্রমাণের আলোকে এর বৈধতা পাওয়া যায়। বরং শরিয়াহ এর প্রতি উৎসাহিত করেছে। এখানে আমি যুবকদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরব। তা হলো শারীরিক ব্যায়াম। রাসুল ইরশাদ করেছেন:
لَا سَبَقَ إِلَّا فِي نَصْلٍ، أَوْ خُفٌ، أَوْ حَافِرٍ 'নিক্ষেপণ, দৌড় খেলা এবং ঘোড়দৌড় ছাড়া অন্য কিছুতে প্রতিযোগিতা নেই।' ২৭
এখানে نَصْل দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তির নিক্ষেপের মাধ্যমে বিনোদন করা। এ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, দৌড় খেলা। حَافِر দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ঘোড়দৌড় খেলা। সাহাবায়ে কিরামের সময়ের চারটি বিনোদন বা খেলার নমুনা তোমাদের সামনে তুলে ধরা হলো।
الرمي বা নিক্ষেপ করা
এটিকে আমি কী বলব? ইবাদত বলব, নাকি ব্যায়াম বলব? হ্যাঁ, যতক্ষণ পর্যন্ত নিয়ত ঠিক থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত উভয়ের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। একদা নবি কারিম এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তারা পরস্পর প্রতিযোগিতা করছিল। অর্থাৎ তারা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে তির নিক্ষেপের প্রতিযোগিতা করছিল। রাসুল এই অবস্থা দেখে তাদের উৎসাহ দিয়ে বললেন:
ارْمُوا بَنِي إِسْمَاعِيلَ، فَإِنَّ أَبَاكُمْ كَانَ رَامِيًا ارْمُوا، وَأَنَا مَعَ بَنِي فُلَانٍ
'হে বনি ইসমাইল, তোমরা নিক্ষেপ করো। কেননা, তোমাদের পূর্বপুরুষও (ইসমাইল আ.) নিক্ষেপ করতেন। তোমরা নিক্ষেপ করো। আমিও অমুকের সন্তানদের সাথে আছি।'
এ সময় তাদের এক দল নিজেদের হাত গুটিয়ে রাখল। অর্থাৎ তির নিক্ষেপ থেকে বিরত থাকল এবং তা থেকে বারণ করল। অতঃপর রাসুলুল্লাহ বলেছেন: مَا لَكُمْ »لَا تَرْمُونَ؟ 'কী হলো তোমাদের?! নিক্ষেপ করছ না কেন?' তারা বলল, كَيْفَ نَرْيِي وَأَنْتَ مَعَهُمْ؟ 'কীভাবে আমরা নিক্ষেপ করি! অথচ আপনি তাদের মাঝে আছেন।' এ কথা শুনে রাসুল বললেন: »ارْمُوا فَأَنَا مَعَكُمْ كُلُّكُمْ 'নিক্ষেপ করো। আমি তোমাদের সবার সাথেই আছি।' ২৮
এই হাদিসের মধ্যে প্রশিক্ষণকে উন্নত চরিত্রের অংশ বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়। সাহাবায়ে কিরাম যখন নিক্ষেপ থেকে বিরত থেকেছেন, তখন রাসুল-এর সাথে কতই না উত্তম ও সুন্দর ভদ্রতা বজায় রেখেছেন। কেননা, রাসুল তখন বিপরীত দলে ছিলেন। তাই তাঁরা রাসুল-এর ওপর জয়ী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছিলেন যে, ফলে তিনি পরাজিতদের দলে চলে যাবেন।
• العَدْوُ বা দৌড় প্রতিযোগিতা
নবি কারিম আয়িশা সিদ্দিকা-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন। মাঝে মাঝে তিনি আয়িশা-কে পেছনে রেখে আগে চলে যেতেন। আবার মাঝে মাঝে আয়িশা রাসুল-কে পেছনে রেখে সামনে চলে যেতেন। ফলে রাসুল তাকে বললেন, 'এটা হলো (পূর্বেরটার) বদলা।' এখান থেকেই আনসাররা মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতার জন্য রাসুল -এর কাছে অনুমতি চাইতেন। রাসুল -ও তাঁদের অনুমতি দিতেন। যেমনটি আমরা কোনো এক গাজওয়া থেকে ফেরার সময় সালামা বিন আকওয়া -এর হাদিসে দেখতে পাই।
তিনি বলেন, ...একজন আনসার ছিলেন। কেউ দৌড় প্রতিযোগিতায় তার আগে যেতে পারত না। একদা সেই আনসারি লোকটি বারবার বলছিল যে, 'আমার সাথে প্রতিযোগিতা করে মদিনায় যাওয়ার মতো কেউ নেই? আছে কি কোনো প্রতিযোগিতাকারী?' সে এ কথার পুনরাবৃত্তি করেই যাচ্ছিল। সালামা বিন আকওয়া বলেন, 'যখন আমি তার এই ঘোষণা শুনলাম, তখন তাকে বললাম, “তুমি কি কোনো সম্মানিত ব্যক্তিকে ভয় করো না? কোনো ভদ্র ব্যক্তিকে শ্রদ্ধা করো না?” সে বলল, “না। রাসুল ব্যতীত অন্য কারও সাথে প্রতিযোগিতা করতে আমার কোনো ভয় নেই।” তার এ কথা শুনে আমি রাসুল -এর কাছে আরজ করে বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, আমার মা-বাবা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক, আমাকে অনুমতি দিন আমি ওই ব্যক্তির সাথে প্রতিযোগিতা করব।”
রাসুল বললেন, "যদি তোমার ইচ্ছা হয়, তাহলে করতে পারো।” তিনি বলেন, 'রাসুলের অনুমতি পেয়ে আমি বললাম, "আমি তোমার কাছে যাব।” অতঃপর আমি পা দ্বারা দাগ টানলাম এবং লাফ দিয়ে দৌড়াতে শুরু করলাম। অবশেষে আমি তার আগে মদিনায় গিয়ে পৌঁছলাম।'
• المُصَارَعَةُ (কুষ্টি বা মল্লযুদ্ধ)
রাসুল এক মুশরিকের সাথে তিনবার কুস্তি লড়াই করেছিলেন। প্রতিবার একশ বকরির চুক্তি করা হয়েছিল। অতঃপর রাসুল তাকে পরাজিত করে দিয়েছেন। তৃতীয়বারে সে রাসুল-কে উদ্দেশ্য করে বলল, 'হে মুহাম্মাদ, তোমার পূর্বে কেউ আমার পিঠকে জমিন স্পর্শ করাতে পারেনি।' অতঃপর লোকটি ইসলাম কবুল করেছে এবং রাসুল-ও তার বকরিগুলো ফিরিয়ে দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়। রাসুল তো বদর যুদ্ধের সৈন্য সংগ্রহের সময় সামুরা বিন জুনদুব ও রাফি' বিন খাদিজ নামক দুই বালকের মাঝে কোনোরূপ চুক্তি ছাড়া কুস্তি লাগিয়ে দিয়েছেন। অতঃপর সামুরা রাফি'কে পরাজিত করায় রাসুল তাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন। অথচ প্রথমবার সে যুদ্ধের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলে ছোট হওয়ায় তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
■ ঘোড়া বা উট প্রতিযোগিতা
রাসুল তাঁর সবচেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন উষ্ট্রীর সাথে অন্যান্য উষ্ট্রীর দৌড় প্রতিযোগিতা বাধিয়ে দিতেন। সেই উষ্ট্রীকে অন্য কোনো উষ্ট্রী কখনো পরাজিত করতে পারত না। কিন্তু একদিন অন্য একটি উষ্ট্রী তাকে পরাজিত করে ফেলে। তাই সাহাবিরা বলতে লাগলেন যে, 'দ্রুতগামী উষ্ট্রী পরাজিত হয়েছে।' সহিহ হাদিসে ইবনে উমর থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুল ﷺ পা ঢাকা ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে সানিইয়্যাতুল বিদা'য় গিয়েছেন। যার দূরত্ব হলো ছয় থেকে সাত মাইল। অতঃপর নগ্ন পাবিশিষ্ট ঘোড়ায় আরোহণ করে সানিইয়্যাতুল বিদা' থেকে মসজিদে বনি জুরাইকে গিয়েছেন। যার দূরত্ব হলো প্রায় এক মাইলের সমান। এ ধরনের প্রতিযোগিতায় রাসুল ﷺ বিজয়ীকে পুরস্কৃত করতেন।
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত সহিহ হাদিসে উল্লেখ আছে যে, আব্দুল্লাহ বিন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা নবি কারিম ﷺ ঘোড়ার মাঝে প্রতিযোগিতা করলেন। অতঃপর বিজয়ীকে পুরষ্কৃত করেছেন। এখান থেকেই উমর বিন আব্দুল আজিজ (রহঃ) শরীরচর্চার প্রতি গুরুত্বারোপ করার জন্য মদিনায় ঘোড় দৌড়ের প্রতিযোগিতা চালু রেখেছেন। এক প্রতিযোগিতায় আবু বকর (রাঃ)-এর নাতি মুহাম্মাদ বিন আবু তালহার ঘোড়ার মাঝে ও জনৈক বেদুইনের ঘোড়ার মাঝে কঠিন প্রতিযোগিতা চলছিল। ঘটনাক্রমে বেদুইন ব্যক্তির ঘোড়া মুহাম্মাদ বিন তালহার ঘোড়ার সামনে চলে গেল। এই অবস্থা দেখে বেদুইন ব্যক্তি সুউচ্চ স্বরে বলতে থাকল :
'ওহে, সর্বোচ্চ মর্যাদা আজ কার হয়ে গেল! হ্যাঁ, আমরাই এর জন্য প্রতিযোগিতা করেছি এবং আমরাই এর একমাত্র হকদার। যদি পাখিও আসে আমাদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে, তাহলে আমরা তার সাথেও জয়ী হব।'
সে এ কথা বলতে না বলতেই মুহাম্মাদ বিন তালহার ঘোড়া তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করে সামনে চলে গেল এবং তিনিই বিজয়ী হলেন। অতঃপর উমর বিন আব্দুল আজিজ বেদুইন লোকটিকে বললেন, 'আল্লাহর শপথ, কল্যাণে অগ্রগামী ব্যক্তির নাতি তোমার ওপর জয়ী হয়েছে।'
এ কথাগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সাহাবায়ে কিরাম ও তাবিয়িদের সময় শরীরচর্চার চিত্র কেমন ছিল। হে যুবক, এবার তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি, আজ তুমি কোন ধরনের শরীরচর্চায় ব্যস্ত?! তুমি তো কোনো ব্যায়ামই করো না! যার ফলে শরীরের অতিরিক্ত ওজন থেকে নিষ্কৃতি পাবে।
বড়ই আশ্চর্যের বিষয়! বর্তমানে যুবকরা বিভিন্ন ক্রীড়া চ্যানেল ফলো করে, খেলাধুলা-সম্পর্কিত পত্রিকাসহ অনেক ধরনের ক্রীড়াবিষয়ক খবরাখবর পড়ে। কিন্তু তারা নিজেরা কখনো কোনো ধরনের ব্যায়াম করে না। শুধু ফলো করেই সময় কাটায়।
ইবনে মুজাহিদ ছিলেন বাগদাদের প্রধান কারি। একদা তিনি তার কয়েকজন সঙ্গী-সাথির সাথে বাগদাদের এক বাগানে হাঁটতে বের হয়েছেন। তখন তার সঙ্গীরা বাগানে এদিক সেদিক হাঁটাহাঁটি করছিল আর মজা করছিল। এ সময় একজন তার দিকে আড় চোখে তাকালে তিনি বলেন, বাগানে التعاقل করা মসজিদে খেলার মতো।
'প্রতিটি দিন শেষে স্বল্প সময়ের মধ্যে হলেও পরবর্তী দিনের কার্যতালিকা তৈরি করে রাখো।'

**টিকাঃ**
২৭. সুনানুন নাসায়ি: ৩৫৮৬।
২৮. সহিহুল বুখারি : ২৮৯৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00