📘 সময়ের সঠিক ব্যবহার কীভাবে করবেন > 📄 অনুপস্থিত লোকদের দেখে চেতনা সৃষ্টি করা

📄 অনুপস্থিত লোকদের দেখে চেতনা সৃষ্টি করা


যারা সময়ের সঠিক ব্যবহার করেছে এবং প্রতিটি মুহূর্তের মূল্য দিয়েছে, এমন বীরেরা যদি তোমার সামনে নাও থাকে অথবা যদি মারাও যায়, তবুও তাদের মাঝে তোমার জন্য অনেক শিক্ষা রয়েছে। হাসান বসরি এই ধরনের ব্যক্তিদের প্রশংসা এভাবে করতেন যে, 'আমি এমন কিছু শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গকে পেয়েছি, যারা তাদের অর্থের চেয়ে জীবনের ব্যাপারে বেশি কার্পণ্য করতেন।'
• উমর ফারুক-এর এমন কোনো সময় ছিল না, যাতে তিনি ঘুমাতেন। অনেক সময় তিনি বসে বসে তন্দ্রাচ্ছন্ন হতেন। একদা তাকে বলা হলো, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি কি ঘুমান না?!' উত্তরে তিনি বলেন, 'আমি কীভাবে ঘুমাব? যদি আমি দিনে ঘুমাই, তাহলে আমার প্রতি অর্পিত মুসলমানদের দায়িত্বগুলোকে নষ্ট করতে হবে। আর যদি রাতে ঘুমাই, তাহলে আল্লাহর জন্য নির্ধারিত অংশটুকু নষ্ট করতে হবে।'
• প্রখ্যাত মুফাসসির জামালুদ্দিন কাসিমি এমন কিছু যুবকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, যারা হেলায় খেলায় সময় নষ্ট করছিল। তখন তিনি বললেন, 'যদি সময়কে ক্রয়-বিক্রয় করা যেত, তাহলে আমি তাদের থেকে তাদের সময়গুলো কিনে নিতাম।' সময়ের প্রতি এত গুরুত্ববান হওয়ার কারণেই তিনি পঞ্চাশ বছরের জীবনে প্রায় পঞ্চাশটিরও অধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন।
• এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন, বিশিষ্ট ফকিহ, ঐতিহাসিক, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ইমাম আবু জাফর মুহাম্মাদ বিন জারির আত-তাবারি । যিনি নিজের ব্যাপারে বলেছেন, 'আমি সাত বছর বয়সে কুরআনে কারিম হিফজ সম্পন্ন করেছি। যখন আমার বয়স আট বছর, তখন আমি নামাজের ইমামতি শুরু করেছি এবং নয় বছর বয়সে হাদিস লিখেছি।' ৩
তাঁর এমন বিশাল অর্জন ও উচ্চ মনোবলের প্রমাণ হিসেবে তাঁর আরও একটি মন্তব্য উপস্থাপন করছি। নিজের ব্যাপারে তিনি বলেন, 'একদিন আমার কাছে এক লোক এসে ছন্দশাস্ত্র সম্পর্কে জানতে চাইল। অতীতে আমি এই বিষয় নিয়ে তেমন একটা উদ্যমী ছিলাম না। তাই তাকে বললাম, তুমি আগামীকাল আমার কাছে এসো।' অতঃপর ইমাম তবারি ছন্দশাস্ত্রের ওপর লিখিত খলিল ইবনে আহমাদের একটি কিতাব খোঁজ করলে তারা তাঁকে কিতাবটি এনে দেয়। ফলে তিনি এক রাতের মধ্যেই সেই কিতাবটির সবগুলো কায়দা ও নিয়মকানুন আয়ত্ত করে ফেললেন। তিনি বলেন, 'আমি সন্ধ্যাবেলায় ছিলাম ছন্দ্রশাস্ত্র সম্পর্কে অজ্ঞ একজন লোক। কিন্তু সকালবেলায় আমি হয়ে গেছি একজন ছন্দশাস্ত্রবিদ।'
• আবুল আব্বাস বিন আতা ইমাম জুনাইদ-এর ইনতিকালের সময় তার পাশে উপস্থিত ছিলেন। তখন তিনি ইমাম জুনাইদ-কে সালাম দিলে তিনি উত্তর দিতে কিছুটা বিলম্ব করেন। কিছুক্ষণ পর সালামের উত্তর নিয়ে তিনি বলেন, 'আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি আমার অজিফায় ব্যস্ত ছিলাম।' অতঃপর কিবলার দিকে চেহারা ফিরিয়ে তিনি তাকবির বলছিলেন। তখনই তিনি ইনতিকাল করেন।
• ফাতহ বিন খাকান খলিফা মুতাওয়াক্কিলের মন্ত্রী ছিলেন। তিনি সব সময় জামার আস্তিনের ভেতরে কিতাব রাখতেন। যখন তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ করার জন্য অথবা নামাজের জন্য খলিফার সামনে থেকে উঠে আসতেন, তখন হাঁটতেন আর কিতাবের ওপর চোখ বুলাতেন। এভাবেই তিনি কিতাব পড়তে পড়তে তার গন্তব্যে যেতেন এবং সেখান থেকে ফিরতেন। এভাবে তিনি খলিফার মজলিশে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কিতাব পড়তেন। আবার খলিফা যখন কোনো প্রয়োজন পূরণ করতে যেতেন, তখনও তিনি কিতাব বের করে খলিফা আসার আগ পর্যন্ত অধ্যয়নে মশগুল থাকতেন।
এরাই হলেন এমন মহাপুরুষ, যারা কার্পণ্যের স্বাদ গ্রহণ করেছেন। তাদের কার্পণ্য ছিল সময়ের সাথে। আর দুনিয়াতে যারা অবসর সময়কে আল্লাহর আনুগত্যের মাঝে ব্যয় করেছে, তাদেরকে মহান রব জান্নাতের নিয়ামত দ্বারা সফল করেছেন। তিনি বলেন:
كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا بِمَا أَسْلَفْتُمْ فِي الْأَيَّامِ الْخَالِيَةِ
'তোমরা দুনিয়ার জীবনে যা অগ্রে পাঠিয়েছ, তার জন্য স্বাচ্ছন্দে খাও এবং পান করো।' ৪

**টিকাঃ**
৩. ইমাম শাফিয়ি -এর মতে নাবালিগ ছেলের ইমামতি জায়িজ।
৪. সূরা আল-হাক্কাহ: ২৪।

📘 সময়ের সঠিক ব্যবহার কীভাবে করবেন > 📄 দায়িত্ব অনেক বেশি

📄 দায়িত্ব অনেক বেশি


এতে সন্দেহ নেই যে, একজন মানুষের ওপর অনেকগুলো দায়িত্ব থাকে—নিজের, বাবা-মার, স্ত্রীর, সন্তানসন্ততির, পাড়া-প্রতিবেশীর, চাকর-চাকরানির। দিনের অধিকাংশ সময় তাকে এসব দায়িত্ব পালনের মাঝে ডুবে থাকতে হয়। আবার যখন এই সময়ের সাথে তার দৈনন্দিনের জীবিকা অন্বেষণের জন্য ব্যয়িত দীর্ঘ সময়কে যুক্ত করা হবে, তখন সময় আরও সংকীর্ণ হয়ে যাবে। জীবিকার জন্যই সময় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়। এ জন্যই সময়ের মূল্য অনেক বেশি।
একদা কিছু লোক উমর বিন আব্দুল আজিজ -এর নিকট এল। খিলাফতের গুরুদায়িত্ব ও উম্মাহর চিন্তা তাকে দুর্বল করে দিয়েছিল। তারা তার নিকট এসে বলল, 'নিজের বোঝাটা কিছুটা হালকা করে নিন।' তিনি তাদের বললেন, 'তাহলে আমার আজকের দিনের কাজগুলো কে করে দেবে?' তারা বলল, 'আগামীকাল সেগুলো আপনি করে নেবেন।' তিনি বললেন, 'একদিনের কাজ আদায় করতে করতেই আমি দুর্বল হয়ে পড়ছি। তাহলে দুদিনের কাজ একত্রিত হলে আমার কী অবস্থা হবে?!'

📘 সময়ের সঠিক ব্যবহার কীভাবে করবেন > 📄 ‘মৃতদের কথা শোনো’

📄 ‘মৃতদের কথা শোনো’


এমন একজন ব্যক্তির কথা বলছি, যিনি মৃত্যুর পরেও আমাদের উপদেশ দিয়েছেন এবং সঠিক পথের দিশা দিয়ে পুণ্যে অংশীদার হয়েছেন, তিনি হলেন আবু মুহাম্মাদ জাফর বিন মুহাম্মাদ আল-আব্বাসি। তিনি ৫৯৮ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ইনতিকালের আগে অসিয়ত করেছেন যে, তার কবরের ওপর যেন এই কথাটি লিখে দেওয়া হয়, 'অনেক প্রয়োজন অপূরণীয় রয়ে গেছে। অনেক আশা বাস্তবায়িত হয়নি। অনেক মানুষ আক্ষেপ করে মারা গেছে।'
(আজ তুমি তোমার লক্ষ্যগুলোর মধ্য হতে কয়টি বাস্তবায়ন করেছ?)

📘 সময়ের সঠিক ব্যবহার কীভাবে করবেন > 📄 সফরের সময় ঘনিয়ে এসেছে

📄 সফরের সময় ঘনিয়ে এসেছে


যখন মানুষ দুনিয়া থেকে পরপারের পথে যাত্রা করবে, দুনিয়া অতীত হয়ে যাবে এবং সে আখিরাতের মুখোমুখি হবে, তখন সে আকাঙ্ক্ষা করবে, যদি তাকে সামান্য সুযোগ দেওয়া হতো! তাহলে দুনিয়ায় যে সময়গুলো সে নষ্ট করেছে, সেগুলোকে সে পরিশুদ্ধ করে নিত এবং যেগুলো ছেড়ে এসেছে, সেগুলো অর্জন করে নিত। কিন্তু না! তা কখনোই সম্ভব নয়। সুযোগ শেষ হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন-উত্তরের পালা। অচেতনতার সময় শেষ, সচেতন হওয়ার সময় শুরু। তাই মানুষ যদি এই বিষয়গুলো চিন্তা করে, তাহলে তার দীর্ঘ আশাগুলো সংকুচিত হয়ে আসবে, সময়ের প্রতি যত্নবান হবে। তাই কবি বলেন :
'অবসর সময়ে নফল সালাতের প্রতি গুরুত্ব দাও, হতে পারে সহসা তোমার মৃত্যু উপস্থিত হবে।
কত সুস্থ লোককে দেখেছি, কোনো রোগব্যাধি ছাড়াই তার প্রিয় আত্মা বের হয়ে গেছে।'
হে ভাই, তোমার একটি দিনের একটি মুহূর্ত চলে যাওয়ার মানে হলো, তোমার জন্য নির্ধারিত আয়ুর একটি অংশ অতিবাহিত হয়ে গেছে। কবি বলেন :
'যেদিন তুমি দোলনায় ছিলে, সেদিন থেকেই আমি তোমাকে অপূর্ণতায় দেখছি, তখন থেকেই তোমার একেকটি মুহূর্ত তোমাকে কবরের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।'
হ্যাঁ! বাস্তবতা এমনই। আমাদের একেকটি নিশ্বাস আমাদের মৃত্যুর খুব কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা জানিও না, সেই মৃত্যু আমাদের কখন সংঘটিত হবে? সুতরাং বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার কাজ কি এই নয় যে, হঠাৎ করে মৃত্যু গ্রাস করার পূর্বেই তার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখা। একদিন উমর বিন আব্দুল আজিজ লোকজনকে নিয়ে এক জায়গায় বসা ছিলেন। যখন দ্বিপ্রহর হলো, তখন তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়লেন এবং বিরক্তিবোধ করলেন। তাই উপস্থিত লোকজনকে বললেন, 'আমি আসা পর্যন্ত আপনারা এখানেই অবস্থান করবেন।' অতঃপর তিনি তার ঘরে প্রবেশ করলেন কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। এমন সময় তার ছেলে আব্দুল মালিক এসে উপস্থিত লোকজনকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে, 'তিনি ঘরের ভেতরে গিয়েছেন।' অতঃপর তিনি অনুমতি চেয়ে বাবার কাছে প্রবেশ করে বললেন, 'হে আমিরুল মুমিনিন, কেন আপনি ঘরে প্রবেশ করেছেন?' তিনি বললেন, 'কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে এসেছি।' ছেলে বলল, 'আপনি এখানে বিশ্রাম নিচ্ছেন আর প্রজারা বাইরে আপনার অপেক্ষায় আছে, আপনি কি নিশ্চিত যে, এই অবস্থায় আপনার মৃত্যু আসবে না?!' সাথে সাথে উমর বিন আব্দুল আজিজ দাঁড়িয়ে গেলেন এবং মানুষের কাছে চলে গেলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00