📘 সময়ের সঠিক ব্যবহার কীভাবে করবেন > 📄 হিসাবের পালা

📄 হিসাবের পালা


সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর যদি কোনো চিহ্ন রেখে না যেত?! কেননা, হাশরের ময়দানে বিচারের কাঠগড়ায় মানুষকে প্রতিটি মুহূর্ত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। যখন মানুষ আপন প্রতিপালকের সামনে দণ্ডায়মান হবে, তখন তিনি বান্দার বয়স ও একেকটি সময়ের তিলে তিলে হিসাব গ্রহণ করবেন। তিনি জিজ্ঞাসা করবেন, কীভাবে তা ব্যয় করেছ? কোথায় ব্যয় করেছ? কোথায় ব্যস্ত রেখেছ এবং কী কাজ দ্বারা তাকে পূর্ণ করেছ?
নবি কারিম ইরশাদ করেছেন, 'কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার কদম নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে চারটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে। তার জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, কোথায় তা ব্যয় করেছে? তার যৌবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, কোথায় তা ক্ষয় করেছে?” (সহিহ) ১
কবি বলেন :
'আজ আমি মনের চাহিদামতো যাচ্ছেতাই করে যাচ্ছি, অথচ আগামী কাল আমি মরে যাব এবং আমলনামা বন্ধ হয়ে যাবে।
হায়! আমার অবস্থানের কারণে নিজের জন্য লজ্জা হচ্ছে, আমাকে আমার পদস্খলনের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
হায় আফসোস! হায় আফসোস! যুগ যুগ ধরে খিয়ানতই করেছি। আমার প্রতি অর্পিত আমানতকে রক্ষা করিনি।'

**টিকাঃ**
১. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির: ১১১, আল-মুজামুল আওসাত : ৪৭১০।

📘 সময়ের সঠিক ব্যবহার কীভাবে করবেন > 📄 সময় একটি গোপনীয় নিয়ামত

📄 সময় একটি গোপনীয় নিয়ামত


যদিও সময় এমন কোনো অর্থ বা বস্তু নয়, যা মানুষ দোকানে বা বাজারে বিনিময় করে থাকে, তবুও সময়কে সবচেয়ে দামি ও গুরুত্বপূর্ণ ধনভান্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যা দেখা যায় না। অত্যন্ত গোপনীয়। যদি মানুষ এই ধনভান্ডার চোখে দেখত এবং এর মূল্য অনুধাবন করত, তাহলে তা অর্জন করার জন্য পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হতো। এছাড়াও স্বয়ং রাসুল -এর হাদিস থেকে স্পষ্ট বুঝে আসে যে, আল্লাহ তাআলা মানুষকে যতগুলো নিয়ামত দিয়ে থাকেন, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শ্রেষ্ঠ নিয়ামত হলো সময়। সময়ের প্রতি এত গুরুত্ব দেওয়া সত্ত্বেও মানুষ এ ব্যাপারে উদাসীন। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল বলেছেন:
نِعْمَتَانِ مَغْبُونُ فِيهِمَا كَثِيرُ مِنَ النَّاسِ: الصَّحَةُ وَالفَرَاعُ
'দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত। তা হচ্ছে, সুস্থতা ও অবসর। ২
হাদিসে রাসুল كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ কথাটি বলেছেন। এর অর্থ হচ্ছে, খুবই অল্প সংখ্যক মানুষই সময়ের গুরুত্ব অনুধাবন করে। সুস্থবস্থায় প্রায় সবাই ভোগবিলাসে লিপ্ত হয়ে পড়ে। জীবনকে উপভোগ করার মাঝে ব্যস্ত থাকে।
আবার অবসরতা পেলেও অনেকে ভোগবিলাসে লিপ্ত হয়ে যায়। অনেকের অবস্থা তো এমন যে, তারা বার্ধক্যে উপনীত হবার পরও অবসরতার দ্বারা ধোঁকাগ্রস্ত হয়। যখন কেউ এই দুটি নিয়ামতকে একত্রে পায় এবং এগুলোর সঠিক ব্যবহার না করে আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে অলসতা করে, তখনই তাকে مَغْبُونُ বা ধোঁকাগ্রস্ত বলে আখ্যায়িত করা হয়। আর غَبَنِ হলো, কোনো পণ্যকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে ক্রয় করা অথবা নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও কম মূল্যে বিক্রি করা।
রাসুল ﷺ একজন পরিপূর্ণ শরয়ি দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষকে এমন ব্যবসার সাথে তুলনা দিয়েছেন, যেই ব্যবসার মধ্যে মূলধন রয়েছে। যেকোনো মানুষ মূলধন খাটিয়ে ব্যবসা শুরু করলে তা থেকে সে লাভের আশা করে এবং মূলধনকেও টিকিয়ে রাখতে চায়। আর এ জন্য যার সাথে সে ব্যবসায়িক লেনদেন করে, তার আমানতের ব্যাপারে সে খুবই সতর্ক থাকে। তার প্রতি খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখে, যাতে তাকে কেউ ধোঁকা দিতে না পারে। কারণ কেউ যদি তাকে ধোঁকা দিয়েই ফেলে, তাহলে তো সে নিশ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই উদাহরণটির বাস্তব নমুনা এই যে, দুনিয়া হলো আখিরাতের শস্যক্ষেত। আর সুস্থতা ও অবসরতা হলো মূলধন। কিন্তু এই দুই মূলধনের লভ্যাংশ বাহ্যিকভাবে দেখা যায় না। কেবল আখিরাতেই এদের লাভক্ষতি দেখা যাবে। তাই যে ব্যক্তি তার অবসরতা ও সুস্থতাকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করেছে, আগামী দিন (আখিরাতে) সে-ই হবে প্রকৃত লাভবান। আর যে এ দুটি নিয়ামতকে আল্লাহর অবাধ্যতায় ব্যয় করেছে, দুনিয়া ও আখিরাতে সে-ই হলো প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ও ধোঁকাগ্রস্ত। আরেকটি কথা না বললেই নয়, এই দুটি নিয়ামত খুব দ্রুতই চলে যায়। কেননা, অবসরতার পরে ব্যস্ততা এবং সুস্থতার পরে অসুস্থতা চলে আসে।
(আমরা সময়ের খুব মুখাপেক্ষী। অথচ সময় পেয়েও তার সঠিক ব্যবহার করি না।)
তাই যে ব্যক্তি সুস্থতা ও অবসর সময় পেল, অথচ এগুলোর সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ অর্জন করল না, সে-ই প্রকৃত হতভাগা। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের তাঁর প্রদত্ত নিয়ামত পেয়ে ধোঁকাগ্রস্ত হওয়া থেকে রক্ষা করেন এবং আমাদের প্রতি তাঁর ইহসানের মূল্য বোঝার তাওফিক দান করেন। আমিন।

**টিকাঃ**
২. সহিহুল বুখারি: ৬৪১২।

📘 সময়ের সঠিক ব্যবহার কীভাবে করবেন > 📄 নিশ্বাসে নিশ্বাসে

📄 নিশ্বাসে নিশ্বাসে


- (احصر نعم الله عليك نفسا نفسا) এই শিরোনামটি 'আল্লাহর নিয়ামত তোমার সাথে প্রতিটি নিশ্বাসে নিশ্বাসে লেগে আছে') এই ইবারতের সংক্ষিপ্ত রূপ।
আবু হামিদ গাজালি বলেন, মানুষের প্রতিটি নিশ্বাসের মধ্যে দুটি নিয়ামত আছে। একটি নিয়ামত নিশ্বাসের সাথে প্রসারিত হয় আরেকটি সংকুচিত হয়। একটি প্রসারিত হওয়ার মাধ্যমে অন্তর থেকে পোড়া ধোঁয়াগুলো (অর্থাৎ কার্বন ডাই-অক্সাইড) বেরিয়ে যায়। যদি অন্তর থেকে এই ধোঁয়াগুলো বের না হতো, তাহলে মানুষ মারা যেত। আরেকটি সংকুচিত হওয়ার মাধ্যমে অন্তরের মধ্যে পরিচ্ছন্ন বাতাসের সমষ্টি (অক্সিজেন) জমা হয়। যদি তা বন্ধ হয়ে যেত, তাহলে অক্সিজেন না পেয়ে মানুষ সাথে সাথে মারা যেত। রাতে ও দিনে মোট চব্বিশ ঘণ্টা। এ প্রত্যেক ঘণ্টায় প্রায় হাজারবার নিশ্বাস গ্রহণ করি আমরা। প্রতিটি নিশ্বাস প্রায় দশটি মুহূর্তের সমান। আর প্রতিটি মুহূর্তে তোমার দেহের সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গে হাজার হাজার নিয়ামত সঞ্চার হয়। পৃথিবীর সকল মানুষের অবস্থা এমনই।

📘 সময়ের সঠিক ব্যবহার কীভাবে করবেন > 📄 নির্মাণ ও ধ্বংসসাধন

📄 নির্মাণ ও ধ্বংসসাধন


উমর বলেন, 'অবসর সময়ের পরিণামের ব্যাপারে আমি তোমাদের সতর্ক করছি। কেননা, অবসরতা উন্মাদনা সৃষ্টিকারী যাবতীয় মন্দ কাজের সমষ্টি।'
সময়কে গনিমত মনে করার মূলভিত্তি হিসেবে উমর একটি মানদণ্ড স্থাপন করেছেন। সবার কাছে তা পছন্দ হতেও পারে, নাও হতে পারে। তিনি বলেন, 'নিশ্চয় আমি সেই ব্যক্তিকে অপছন্দ করি, যাকে দ্বীনি কিংবা দুনিয়াবি কোনো কাজ ছাড়াই অযথা হাঁটতে দেখি।'
তাই তো উমর-এর জীবনটা সময়কে কাজে লাগানোর জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ততুল্য। তিনি পুরো উম্মাহকে নেক আমল, বিজয়াভিযান, উন্নত সভ্যতা নির্মাণ এবং মর্যাদা অর্জনের মাঝে কাজে লাগিয়ে রেখেছিলেন। ফলে যুবকদের সময়গুলো নেক কাজে ভরে গেল এবং বৃদ্ধদের অবস্থা হলো এমন যে, তারা যেন যুবকদের চেয়েও অধিক ব্যস্ত। একদিন উমর রা. খুজাইমা বিন সাবিত রা.-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তখন তাঁকে বললেন, 'আপনার ভূমিতে আপনি নিজে গাছ রোপণ করতে কে আপনাকে বাধা দিচ্ছে?' খুজাইমা বিন সাবিত রা. তাঁকে বললেন, 'আমি তো একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ। একটু পর ইনতিকাল করব।' তখন উমর রা. তাঁকে বললেন, আপনি আপনার ভূমিতে গাছ রোপণ করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করুন।' তাঁর ছেলে আম্মারা রা. বললেন, 'অতঃপর আমি উমর বিন খাত্তাব রা.-কে দেখেছি, তিনি নিজ হাতে আমার বাবার সাথে তা রোপণ করছেন।'
এ জন্যই সালিহিনদের কেউ একজন বলেছিলেন, 'মনে রেখো, অবসর সময় হচ্ছে মৃত্যুর মতো। আর ব্যস্ততা হচ্ছে জীবিতদের মতো। সুতরাং যদি তুমি সিদ্ধান্ত নাও যে, তুমি জীবিত থাকবে, তাহলে কাজ করতে থাকো।'
জনৈক বিজ্ঞ লোক বলেন, 'অন্তরকে কখনো জিকির থেকে গাফিল রেখো না। সন্তানকে ব্যস্ত করে রাখবে। কেননা, অবসর হৃদয় খারাপ কিছু করতে চায় এবং অবসর হাত পাপাচারের দিকে দ্রুত এগিয়ে যায়।'
(তুমি যতটুকু সময় অবসর থাকবে, ততটুকু সময় শয়তান তোমার মাঝে খারাপ ইচ্ছা জাগ্রত করার চেষ্টা করে যাবে। ফলে অবসর থাকার কারণে মনের মাঝে কুপ্রবৃত্তি জাগ্রত হয় আর কুপ্রবৃত্তি থেকেই সূচনা হয় হারাম কাজের।)
অবসর সময়গুলো যেন তোমার মাঝে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার স্পৃহা তৈরি করে। কারণ, অবসর সময়ই বিপদাপদের কারণ।
তাই সেই ব্যক্তির ওপর কোনো (কল্যাণের) আশা করা যায়, যে একের পর এক ব্যস্ততার মাঝে জড়িয়ে থাকে। কবি সত্যই বলেছেন :
'তুমি যতক্ষণ ব্যস্ত থাকবে, ততক্ষণ আমাদের প্রয়োজনগুলো পূরণ করার জন্য একটু সময় রেখো। কেননা, অবসর হয়ে গেলে তুমি আর কারও আশার পাত্র হবে না।'
শত শত বছর পর নেপোলিয়নও আরবদের সাথে সুর মিলিয়ে একই কথা বলেছেন। কেননা, বাস্তবতা একটাই হয় এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞাগুলো অত্যন্ত মজবুত হয়। তিনি বলেছেন, 'যখন তুমি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করতে চাইবে, তখন কোনো ব্যস্ত মানুষকে তার দায়িত্ব দাও। কারণ, একই সময়ে অবসর ও ব্যস্ততা একত্রিত হতে পারে না।'
(হে ভাই, সময় হলো একটি জাহাজের ন্যায়, যাতে আরোহণ করা যায়। দুনিয়া হলো সমুদ্র আর এই জাহাজের গন্তব্য হলো কবর। সুতরাং তুমি কী দিয়ে তোমার জাহাজকে পূর্ণ করছ?)
কবি বলেন :
‘মানুষ তো একজন আরোহীর ন্যায়। যার জীবন কাটে সফরে সফরে।
দিন আর মাস গুনতে গুনতে তার সফর একদিন ফুরিয়ে যায়।
রাত যায় সকাল আসে, সকাল যায় রাত আসে।
এভাবে সে দুনিয়া ছেড়ে কবরের কাছে পৌঁছে যায়।’

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00