📄 অতীত কখনো ফিরে আসে না
একেকটি দিন অতীত হয়ে যায়। অতিবাহিত হয়ে যায় প্রতিটি ঘণ্টা। প্রতিটি মুহূর্ত চলে যায় আপন গতিতে। যেগুলোকে আর কখনো ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় এবং সম্ভব নয় এর ক্ষতিপূরণ দেওয়াও। আচ্ছা বলো তো, কখনো কি পেরেছ ঘড়ির কাঁটাকে পেছনে ফিরিয়ে আনতে, যাতে তোমার অতিবাহিত খারাপ সময়কে ভালো দ্বারা পূর্ণ করে নিতে পারো?
হাসান বসরি -এর অসিয়ত শোনো! আদম-সন্তানের অতিবাহিত প্রতিটি দিন অতীত হতে থাকে আর বলতে থাকে, হে আদম-সন্তান, আমি নতুন একটি দিন, আজ তোমার প্রতিটি কৃতকর্মের সাক্ষী আমি। তোমার কাছ থেকে চলে গেলে আর কখনো ফিরে আসব না। তাই পরকালের জন্য সাধ্যমতো যতটুকু পারো আমল করে নাও। তোমার ইচ্ছে হলে বিলম্বও করতে পারো। তবে মনে রেখো, আমি তোমার কাছে আর কখনো ফিরে আসব না।
সময়ের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যেগুলো অন্য কিছুর মাঝে নেই। এর প্রত্যেকটিই তোমাকে সময়ের মহামূল্য ও যত্নের কথা বুঝিয়ে দেবে। যেমন:
• সময়কে সঞ্চয় বা সংরক্ষণ করে রাখা যায় না। তাই যে মুহূর্তটিকে তুমি ব্যবহার করতে পারছ না, তা কিন্তু চলে যায়। কিয়ামত পর্যন্ত কখনো তা ফিরে আসবে না।
• সময়কে কোনো কিছুর সাথে বিনিময় করা যায় না। কারণ সময় সবকিছুর চাইতে বেশি মূল্যবান।
• সময় হলো জীবনের একমাত্র উপাদান। কেননা, জীবন তো কতগুলো বছর ও মাসের সমষ্টি। যেই মাস ও বছরগুলো একেকটি মুহূর্ত ও একেকটি ঘণ্টা থেকে সৃষ্টি।
• সময়কে পরিমাপ করা যায় না, অনুধাবন করা যায় না এবং স্পর্শও করা যায় না। তাই প্রতিটি কাজের জন্য সময় পাত্রতুল্য হওয়া সত্ত্বেও তুমি সময়কে আটকে রাখতে পারবে না।
• কেউ নিজের ইচ্ছায় সময়কে দ্রুত বা ধীর গতিতে অতিবাহিত করতে পারবে না এবং থামিয়েও রাখতে পারবে না।
📄 হিসাবের পালা
সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর যদি কোনো চিহ্ন রেখে না যেত?! কেননা, হাশরের ময়দানে বিচারের কাঠগড়ায় মানুষকে প্রতিটি মুহূর্ত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। যখন মানুষ আপন প্রতিপালকের সামনে দণ্ডায়মান হবে, তখন তিনি বান্দার বয়স ও একেকটি সময়ের তিলে তিলে হিসাব গ্রহণ করবেন। তিনি জিজ্ঞাসা করবেন, কীভাবে তা ব্যয় করেছ? কোথায় ব্যয় করেছ? কোথায় ব্যস্ত রেখেছ এবং কী কাজ দ্বারা তাকে পূর্ণ করেছ?
নবি কারিম ইরশাদ করেছেন, 'কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার কদম নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে চারটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে। তার জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, কোথায় তা ব্যয় করেছে? তার যৌবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, কোথায় তা ক্ষয় করেছে?” (সহিহ) ১
কবি বলেন :
'আজ আমি মনের চাহিদামতো যাচ্ছেতাই করে যাচ্ছি, অথচ আগামী কাল আমি মরে যাব এবং আমলনামা বন্ধ হয়ে যাবে।
হায়! আমার অবস্থানের কারণে নিজের জন্য লজ্জা হচ্ছে, আমাকে আমার পদস্খলনের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
হায় আফসোস! হায় আফসোস! যুগ যুগ ধরে খিয়ানতই করেছি। আমার প্রতি অর্পিত আমানতকে রক্ষা করিনি।'
**টিকাঃ**
১. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির: ১১১, আল-মুজামুল আওসাত : ৪৭১০।
📄 সময় একটি গোপনীয় নিয়ামত
যদিও সময় এমন কোনো অর্থ বা বস্তু নয়, যা মানুষ দোকানে বা বাজারে বিনিময় করে থাকে, তবুও সময়কে সবচেয়ে দামি ও গুরুত্বপূর্ণ ধনভান্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যা দেখা যায় না। অত্যন্ত গোপনীয়। যদি মানুষ এই ধনভান্ডার চোখে দেখত এবং এর মূল্য অনুধাবন করত, তাহলে তা অর্জন করার জন্য পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হতো। এছাড়াও স্বয়ং রাসুল -এর হাদিস থেকে স্পষ্ট বুঝে আসে যে, আল্লাহ তাআলা মানুষকে যতগুলো নিয়ামত দিয়ে থাকেন, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শ্রেষ্ঠ নিয়ামত হলো সময়। সময়ের প্রতি এত গুরুত্ব দেওয়া সত্ত্বেও মানুষ এ ব্যাপারে উদাসীন। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল বলেছেন:
نِعْمَتَانِ مَغْبُونُ فِيهِمَا كَثِيرُ مِنَ النَّاسِ: الصَّحَةُ وَالفَرَاعُ
'দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত। তা হচ্ছে, সুস্থতা ও অবসর। ২
হাদিসে রাসুল كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ কথাটি বলেছেন। এর অর্থ হচ্ছে, খুবই অল্প সংখ্যক মানুষই সময়ের গুরুত্ব অনুধাবন করে। সুস্থবস্থায় প্রায় সবাই ভোগবিলাসে লিপ্ত হয়ে পড়ে। জীবনকে উপভোগ করার মাঝে ব্যস্ত থাকে।
আবার অবসরতা পেলেও অনেকে ভোগবিলাসে লিপ্ত হয়ে যায়। অনেকের অবস্থা তো এমন যে, তারা বার্ধক্যে উপনীত হবার পরও অবসরতার দ্বারা ধোঁকাগ্রস্ত হয়। যখন কেউ এই দুটি নিয়ামতকে একত্রে পায় এবং এগুলোর সঠিক ব্যবহার না করে আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে অলসতা করে, তখনই তাকে مَغْبُونُ বা ধোঁকাগ্রস্ত বলে আখ্যায়িত করা হয়। আর غَبَنِ হলো, কোনো পণ্যকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে ক্রয় করা অথবা নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও কম মূল্যে বিক্রি করা।
রাসুল ﷺ একজন পরিপূর্ণ শরয়ি দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষকে এমন ব্যবসার সাথে তুলনা দিয়েছেন, যেই ব্যবসার মধ্যে মূলধন রয়েছে। যেকোনো মানুষ মূলধন খাটিয়ে ব্যবসা শুরু করলে তা থেকে সে লাভের আশা করে এবং মূলধনকেও টিকিয়ে রাখতে চায়। আর এ জন্য যার সাথে সে ব্যবসায়িক লেনদেন করে, তার আমানতের ব্যাপারে সে খুবই সতর্ক থাকে। তার প্রতি খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখে, যাতে তাকে কেউ ধোঁকা দিতে না পারে। কারণ কেউ যদি তাকে ধোঁকা দিয়েই ফেলে, তাহলে তো সে নিশ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই উদাহরণটির বাস্তব নমুনা এই যে, দুনিয়া হলো আখিরাতের শস্যক্ষেত। আর সুস্থতা ও অবসরতা হলো মূলধন। কিন্তু এই দুই মূলধনের লভ্যাংশ বাহ্যিকভাবে দেখা যায় না। কেবল আখিরাতেই এদের লাভক্ষতি দেখা যাবে। তাই যে ব্যক্তি তার অবসরতা ও সুস্থতাকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করেছে, আগামী দিন (আখিরাতে) সে-ই হবে প্রকৃত লাভবান। আর যে এ দুটি নিয়ামতকে আল্লাহর অবাধ্যতায় ব্যয় করেছে, দুনিয়া ও আখিরাতে সে-ই হলো প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ও ধোঁকাগ্রস্ত। আরেকটি কথা না বললেই নয়, এই দুটি নিয়ামত খুব দ্রুতই চলে যায়। কেননা, অবসরতার পরে ব্যস্ততা এবং সুস্থতার পরে অসুস্থতা চলে আসে।
(আমরা সময়ের খুব মুখাপেক্ষী। অথচ সময় পেয়েও তার সঠিক ব্যবহার করি না।)
তাই যে ব্যক্তি সুস্থতা ও অবসর সময় পেল, অথচ এগুলোর সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ অর্জন করল না, সে-ই প্রকৃত হতভাগা। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের তাঁর প্রদত্ত নিয়ামত পেয়ে ধোঁকাগ্রস্ত হওয়া থেকে রক্ষা করেন এবং আমাদের প্রতি তাঁর ইহসানের মূল্য বোঝার তাওফিক দান করেন। আমিন।
**টিকাঃ**
২. সহিহুল বুখারি: ৬৪১২।
📄 নিশ্বাসে নিশ্বাসে
- (احصر نعم الله عليك نفسا نفسا) এই শিরোনামটি 'আল্লাহর নিয়ামত তোমার সাথে প্রতিটি নিশ্বাসে নিশ্বাসে লেগে আছে') এই ইবারতের সংক্ষিপ্ত রূপ।
আবু হামিদ গাজালি বলেন, মানুষের প্রতিটি নিশ্বাসের মধ্যে দুটি নিয়ামত আছে। একটি নিয়ামত নিশ্বাসের সাথে প্রসারিত হয় আরেকটি সংকুচিত হয়। একটি প্রসারিত হওয়ার মাধ্যমে অন্তর থেকে পোড়া ধোঁয়াগুলো (অর্থাৎ কার্বন ডাই-অক্সাইড) বেরিয়ে যায়। যদি অন্তর থেকে এই ধোঁয়াগুলো বের না হতো, তাহলে মানুষ মারা যেত। আরেকটি সংকুচিত হওয়ার মাধ্যমে অন্তরের মধ্যে পরিচ্ছন্ন বাতাসের সমষ্টি (অক্সিজেন) জমা হয়। যদি তা বন্ধ হয়ে যেত, তাহলে অক্সিজেন না পেয়ে মানুষ সাথে সাথে মারা যেত। রাতে ও দিনে মোট চব্বিশ ঘণ্টা। এ প্রত্যেক ঘণ্টায় প্রায় হাজারবার নিশ্বাস গ্রহণ করি আমরা। প্রতিটি নিশ্বাস প্রায় দশটি মুহূর্তের সমান। আর প্রতিটি মুহূর্তে তোমার দেহের সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গে হাজার হাজার নিয়ামত সঞ্চার হয়। পৃথিবীর সকল মানুষের অবস্থা এমনই।