📄 রুচি ও অভ্যাসের পরিবর্তন সম্ভব
যারা দীর্ঘ সময় দাবা, পাশা ও অন্যান্য শরীয়ত নিষিদ্ধ ক্রীড়া বিনোদনে লিপ্ত থাকে, এমনিভাবে যারা চা পানের দোকানে, যেখানে সেখানে অহেতুক সময় অতিবাহিত করে থাকে, তাদের এই কাজ তো কখনো বিবেক-সম্মত হতে পারে না। তাদের এসব অবস্থা বিবেক তো কখনো অনুমোদন করতে পারে না। এসবের মাধ্যমে সময়কে বধ ও বরবাদ করা ছাড়া তো আর কোন উদ্দেশ্য হতে পারে না। হায়! মনে হয়, সময় যেন তাদের শত্রু।
এই সমস্যার সমাধান এবং এই রোগের চিকিৎসা এভাবে হতে পারে যে, প্রথমতঃ মনে এই বিশ্বাস সৃষ্টি করতে হবে এবং তাকে দৃঢ়ভাবে লালন করতে হবে যে, মানুষ সচেষ্ট হলে তার পছন্দ ও অপছন্দের পথ ও বিষয় যেভাবে ও যেদিকে ইচ্ছা পরিবর্তন করতে পারে এবং সে তার শওক ও আগ্রহকেও যে পথে ইচ্ছা চালাতে পারে। তাহলে সে নিজেকে এমন সব বিষয়ে এবং কাজে অভ্যস্ত করে তুলতে পারে যার প্রতি ইতোপূর্বে সে আগ্রহী ছিল না। তেমনিভাবে এমন বিষয় ও কাজকে অপছন্দ ও ঘৃণা করতে পারে, যাকে সে আগে পছন্দ করত এবং স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করত।
তাই বলা যেতে পারে, যদি তার মনোবল দৃঢ় হয়, ইচ্ছা শক্তি প্রবল হয়, তবে সে অবসর সময়গুলোকে তার সুস্থতা, বুদ্ধিমত্তা বা ধার্মিকতার উৎকর্ষ সাধনের মত হিতকর কাজে ব্যয়ে অভ্যস্ত হতে পারে। যদিও সে ও তার মন ইতোপূর্বে এতে অভ্যস্ত ছিল না।
📄 একটি ভ্রান্ত ধারণা
প্রসঙ্গতঃ একটি কথা বড় আফসোসের সাথে বলতে হয়, অধিকাংশ মানুষ এখন মনে করে, বরং বলা যায় বিশ্বাস করে যে, অসার গল্প-উপন্যাস এবং মানহীন পত্র-পত্রিকা ইত্যাদির পঠনই জ্ঞান আহরণের জন্য যথেষ্ট। ফলে শিক্ষানবিশরা সেগুলো অবাধে গলাধঃকরণ করছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক তৃপ্তির জন্য সেগুলোকেই উপযোগী ও যথেষ্ট মনে করছে। কিন্তু ফল হচ্ছে হিতে বিপরীত। কিন্তু এ সকল বিষয়বস্তু তো তাদের মন-মস্তিষ্ককে অবশ ও বিবশ করে দেয় এবং তাদের যৌনানুভূতিকে সজাগ করে। ফলে তারা হয়ে পড়ছে আরও অশান্ত ও উশৃঙ্খল।
📄 ছাত্রকে ভাবতে হবে
আমার তো বিশ্বাস, সামান্য ধৈর্য ও সহনশীলতা এবং ইচ্ছাশক্তির একটু দৃঢ়তা একজন ছাত্রকে নিরবচ্ছিন্ন পঠন ও উপকারী অধ্যয়নে আগ্রহী করে তুলতে পারে। আর প্রতিটি শিক্ষার্থীই সক্ষম- নিজের ইচ্ছা শক্তিকে আন্দোলিত করতে, নিজের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করতে এবং জ্ঞানের কোন শাখায় গুরুত্বপূর্ণ কোন ভূমিকা রাখার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে। চাই তা সাহিত্য, প্রকৌশল বা প্রাণীবিদ্যা হোক, কিংবা হোক কোন যুগের ইতিহাস বা অন্য কোন শাস্ত্র। ইচ্ছা শক্তি ও আভ্যন্তরীণ আন্দোলনে সে এসকল বিষয়ে ব্যাপক অধ্যয়নে ব্রতী হবে, তার গভীরে পৌঁছার চেষ্টা করবে এবং দিনের একটা নির্ধারিত অংশে নিয়মিত সে বিষয়ের সাধনায় আত্মনিয়োগ করবে। আর এসব কাজে সব সময় নিজেকে আগ্রহী ও উদ্দীপ্ত রাখার চেষ্টা করবে।
তাকে নিজের মাঝে বিভিন্ন ভাবনা জাগরুক রাখতে হবে, যা হবে তার চালিকা শক্তি। তাকে ভাবতে হবে যে, সে এখন ভিন্ন এক মানুষ, তার রয়েছে বিশেষ এক শক্তি, সম্মানিত এক ব্যক্তিত্ব। সে এখন নিজের জন্য, স্বজাতির জন্য এবং প্রজন্মের জন্য উপকারী ও কল্যাণকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
এ পথে তাকে ভাবতে হবে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখায় এ জাতি তার সন্তানদের দ্বারা সমৃদ্ধ। সুতরাং জীবনের কোন ক্ষেত্রে বা জ্ঞানের কোন পথে কেউ বিশেষ জ্ঞান ও উৎকর্ষ কামনা করলে সে তাঁদের কারো উপর ভরসা করতে পারে। তাঁদের জীবনী ও জ্ঞান-ভাণ্ডার থেকে পথের দিশা ও পাথেয় সংগ্রহ করতে পারে।
তাছাড়া জ্ঞানীদের মজলিসে নানাবিধ ইলমী, আমলী ও আখলাকী আলোচনা হয়। তখন বহু মূল্যবান কথা-বার্তা বেরিয়ে আসে, বহু উন্নত চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ পায় এবং একে অন্য থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে। ফলে জীবন সজীব ও সমুজ্জ্বল হয়। সে তাঁদের মজলিস থেকে মূল্যবান মণি-মাণিক্য লাভ করতে পারে।
এছাড়াও এখন তো শিক্ষা-সংস্কৃতি অনেক উন্নত হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞান অনেক ব্যাপকতা লাভ করছে, জীবন ও জীবন-যাত্রার মানে বহু উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। এখন কেন সে পারবে না তাঁদের মত হতে। পৃথিবীকে জ্ঞান ও কর্মের নতুন নতুন ফুল দিয়ে সাজিয়ে দিতে!!
📄 চেষ্টার অব্যাহততা জরুরি
এসব কথা যখন সে বারবার শুনবে, বারবার ভাববে তখন সে উপলব্ধি করতে পারবে- তার উপরও রয়েছে কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য। তাকেও নিয়মিত মস্তিষ্ককে খোরাক যোগাতে হবে, যেমন সে উদরকে যোগায়। কারণ, খোরাক যেমন দেহ ও জীবনের অনিবার্য প্রয়োজন তেমনি মন-মস্তিষ্কেরও। আর সময়ের যথার্থ মূল্যায়ন ও তার থেকে সর্বোচ্চ উপকার গ্রহণের চেষ্টা ছাড়া মস্তিষ্কের খোরাকের কল্পনাও করা যায় না।
তখন ধীরে ধীরে ব্যক্তি, তারপর সমাজ, তারপর দেশ উন্নত থেকে উন্নততর হতে থাকবে- সকল ক্ষেত্রে, সর্বদিক থেকে।
প্রিয় পাঠক, আত্মজিজ্ঞাসা ও বিবেকের কাছে জবাবদিহিতাকে তুমি নিজের অভ্যাস বানিয়ে নাও। নিজেকে সব সময় প্রশ্ন কর, অবসর সময়ে আমি কী করছি? আমি কি তা নিজের বা অন্যের স্বাস্থ্য, অর্থ বা জ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনে ব্যয় করছি?
আর সবসময় লক্ষ রাখ, তোমার কর্মশূন্য ও অবসর সময়টুকু বিবেক নিয়ন্ত্রিত থাকছে কি না? তাহলে তো নিশ্চয় তা কোন ভাল লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে ব্যয় হবে। যদি এমনটা হয়ে থাকে তবে তো তুমি সফল বা তোমার সফলতা অবশ্যম্ভাবী। অন্যথায় তুমি এসব গুণ ও অভ্যাস চরিত্রে গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাও এবং নিরবচ্ছিন্ন সাধনা অব্যাহত রাখ। আর অব্যাহত চেষ্টার ফল তো সফলতা বৈ কিছু নয়।
আরবী ভাষার কবি কত সুন্দর বলেছেন,
أخلق بذى الصبر أن يحظى بحاجته ومدمن القرع للأبواب أن يلجا
অর্থ: ধৈর্যশীল ব্যক্তি তার প্রয়োজন লাভের উপযুক্ত আর অবিরাম দরজায় করাঘাতকারী গৃহে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে।
তবে এটাও আমাদের জেনে রাখা দরকার, খুব দীর্ঘদিন যাবৎ কোন নির্দিষ্ট কাজে সময়কে বেঁধে রাখা যায় না। কেননা, জীবনের পট সদা পরিবর্তনশীল। কখনো এমনও হতে পারে যে, তা ধারণারও বহু ঊর্ধ্বে তোমাকে নিয়ে যাবে, কল্পনাতীত উৎকর্ষ দান করবে।
আবার কখনো হয় তার বিপরীত। তবে জীবনচক্র যেদিকেই আবর্তিত হোক তোমার চিন্তা-ভাবনা থাকবে সর্বদা উন্নতির। আর চেষ্টা-সাধনা থাকবে সদা ঊর্ধ্বগতির।