📄 অবসর সময়
সময় একদিক থেকে সবচে' মূল্যবান, অন্যদিক থেকে সবচে' মূল্যহীন। যদি প্রশ্ন করা হয়, তোমার যা কিছু রয়েছে তার মধ্যে সবচে' দামী কী? উত্তর হবে: সময়! আবার যদি জিজ্ঞেস করা হয়, তুমি নষ্ট করতে পারো, ধ্বংস করতে পারো এমন জিনিসের মধ্যে সবচে' সস্তা ও সহজলভ্য কী? উত্তর হবে একই, তা হল- সময়।
তাই তো ফকীহ, আদীব আল্লামা ইয়াহইয়া বিন হুবায়রা র. (৪৪৯-৫৬০ হিজরী) যিনি ছিলেন ইমাম ইবনুল জাওযী র. এর শায়খ- তিনি বলেন,
والوقتُ أنفس ما عُنيت بحفظه . وأراه أسهل ما عليك يضيع
যা কিছুর সংরক্ষণে তুমি সচেষ্ট হতে পার তন্মধ্যে সময় হচ্ছে সবচে' মূল্যবান, অথচ আমি দেখতে পাচ্ছি, যা কিছু তোমার দ্বারা বরবাদ হয় তার মধ্যে সময় সবচে' সহজলভ্য।
মিশরীয় লেখক ও সাহিত্যিক উস্তায আহমদ আমীন র. (মৃত্যু- ১৩৭৩ হিজরী) এর أوقات الفراغ (অবসর সময়) শিরোনামে একটি প্রবন্ধ রয়েছে। প্রসঙ্গ ও বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্যের কারণে এখানে তা সংক্ষেপে উল্লেখ করা ভাল মনে করছি- এই আশায় যে, হয়ত কোন পাঠক তা থেকে উপকৃত হবেন- জ্ঞানের প্রাঙ্গণে বা জীবনের অঙ্গনে।
তিনি বলেন, "আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর হাজার হাজার ছাত্র বছরে চার-পাঁচ মাস গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটায়। তখন কি তাদের অভিভাবকগণ জিজ্ঞেস করেন, কীভাবে তারা এই দীর্ঘ সময়টা কাটাচ্ছে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দৈহিক, মানসিক ও চারিত্রিক গুণে সমৃদ্ধি লাভের পর এই দীর্ঘ ছুটিকে তারা কোন্ কাজে ব্যয় করেছে? তাছাড়া এ জাতির প্রায় অর্ধ-সংখ্যক মানুষ, আমাদের মেয়েরা- বাড়ী ঘরে তাদের অবসর সময়গুলো কীভাবে ব্যয় করে, তা কি জানতে চান কোন অভিভাবক?
সম্পদ ব্যবহার ও বিনিয়োগের, জ্ঞান অর্জন এবং দৈহিক ও মানসিক সুস্থতা লাভের মূল উপকরণ হল সময়, অথচ আমরা কীভাবে তা নষ্ট করে চলছি!
কীভাবে আমরা আমাদের জীবনকে অযথা ও অনর্থক কাজে ব্যয় করে চলছি! যাতে না হচ্ছে দুনিয়াবী কোন ফায়দা, আর না হচ্ছে 'উখরুবী' ফায়দা!! কিন্তু এর মাধ্যমে আমরা কি শুধু সময়ই নষ্ট করছি, না অর্থ- সম্পদ, জ্ঞান, সুস্থতা সবকিছুই খোয়াচ্ছি? কখনো কি ভেবে দেখেছি?
সময় নষ্টের একেবারে নিকটতম পরিণতি তো এই যে, এর মাধ্যমে বহু সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যায়, সম্পদের বহু উৎস নষ্ট হয়ে যায়। ভেবে দেখুন, সময় সম্পদকে যদি কেউ নষ্ট না করে এবং এর সঠিক ব্যবহারে অজ্ঞ না হয় তবে তো সে বহু পতিত ও অনাবাদি জমিকে আবাদ করতে পারে, বহু কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করতে পারে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চালু করতে পারে এবং সেগুলো পরিচালনা করতে পারে- সময়ের একটি অংশ ব্যয় করে।
আর যদি বর্তমান যুগে সময় নষ্টের ও তার অপচয়ের ফল দেখা হয় তবে তা হল, গ্রন্থবিমুখতা, জ্ঞানশূন্যতা, অধ্যয়নবিরূপতা ও মূর্খতাপ্রিয়তা। বর্তমানকালে তো এমন অনেকে রয়েছে যারা মূর্খতা ও জ্ঞান শূন্যতায় কোন মর্মপীড়া ও যাতনা অনুভব করে না। তাদের দেহ শুধু সুখ-শান্তি ও আরাম আয়েশ চায়, কষ্টের পথ মাড়াতে চায় না। অথচ তারা উপলব্ধি করতে পারছে না, যে পথে তারা চলছে তা প্রকৃত পক্ষেই কষ্টের পথ, দুনিয়া ও আখেরাতে অশান্তির পথ।
সময়ের ব্যাপারে মানুষের এমন মানসিকতা ও তার প্রতি এই 'অবিচারের' ফলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় দেখা দেয় অল্পে তুষ্টতা এবং শুধু সহজলভ্য অংশটুকুতেই তৃপ্ততা। শুধু গদবাঁধা পড়া লেখা ও একঘেয়ে সামান্য কাজ- যাতে না আছে কোন শ্রম-সাধনা আর না আছে নতুন কোন চিন্তার উন্মেষ ও বিকাশের ভাবনা- এতেই পরিতৃপ্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়া। এরপর ধীরে ধীরে দেখা দেয় দুর্বল ও ক্লান্ত চিন্তা এবং কাজের ভার উদ্যমী কারও উপর ছেড়ে দিয়ে অলস বসে থাকা। ভাবখানা যেন এমন, তুমিই কর ভাই, আমার আর এ ভেজালে গিয়ে কী লাভ!
📄 অবসর যেন বিবেক নিয়ন্ত্রিত হয়
সময়ের হেফাযত ও মূল্যায়ন বলতে আমি একথা বুঝাচ্ছিনা যে, তোমরা সব সময়ই কাজ আর কাজ করে যাবে, গোটা জীবনই শুধু মেহনত আর সাধনা করে যাবে, সেখানে থাকবে না কোন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আর না থাকবে কোন বিশ্রাম ও আনন্দ। তা হবে একেবারে শুষ্ক, কঠোর, যেন কোন গোমড়ামুখ, যাতে না আছে হাসির চিহ্ন, না আছে কোন খুশী-আনন্দ। বরং আমি বলতে চাচ্ছি, তোমাদের জীবনে কাজের সময়ের চেয়ে যেন অবসর সময় বেশী হয়ে না যায়। আর কর্মশূন্য সময় যেন কর্মপূর্ণ সময়ের উপর প্রভাব বিস্তার করে না ফেলে এবং প্রাধান্য প্রাপ্ত হয়ে না যায়। এমন যেন না হয় যে, অবসর সময়টাই জীবনের মূল ও সারাংশে পরিণত হয়ে বসেছে আর কর্মময় সময় হয়ে গেছে প্রাসঙ্গিক বা পার্শ্ব বিষয়।
আমার তো মন চায় আরেকটু বাড়িয়ে এ পর্যন্ত বলি যে, তোমাদের অবসর সময়গুলো যেন কর্মময় সময়ের মত বিবেক নিয়ন্ত্রিত হয়, আকল-বুদ্ধি দিয়ে পরিচালিত হয়। উদাহরণ দিয়েই বিষয়টি সুস্পষ্ট করার চেষ্টা করছি। যেমন ধর, আমরা কাজের ক্ষেত্রে কোন না কোন লক্ষ্য নির্ধারণ করি এবং কোন নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যেই কাজ করি। তেমনি ভাবে অবসর ও কর্মহীন সময়গুলোও যেন কোন না কোন লক্ষ্য অর্জনের জন্য, উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য ব্যয় হয়। যেমন, শারীরিক সুস্থতা অর্জনের জন্য শরীরচর্চামূলক বৈধ খেলাধুলা বা মানসিক তৃপ্তির জন্য কোন ইলমী মুতালা'আ কিংবা রূহানী খোরাকের জন্য কুরআন তেলাওয়াত, হাদীছ অধ্যয়ন বা নফল ইবাদত বন্দেগী ইত্যাদিতে মগ্ন থাকা। অর্থাৎ কোন একটা উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে যেন তোমার অবসর সময়টা কাটে। অবসর মানে একেবারেই হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা, এমনটা যেন না হয়। অবসরেই যেন মনের শান্তি ও দেহের তৃপ্তির মত কোন কাজ করে ফেলা হয়। অবসর যেন একবারে ফায়দাশূন্য না হয়। অন্যথায় তোমার অবসর যাপন হবে সময় নষ্ট করা; বরং বলা যায় সময়কে 'হত্যা' করা। আর সেটা তো কখনো বৈধ হতে পারে না। কেননা, এই সময়ই তো তোমার জীবন। তাহলে সময়কে হত্যা করা তো জীবন হত্যা, বরং আত্মহত্যারই নামান্তর।
📄 রুচি ও অভ্যাসের পরিবর্তন সম্ভব
যারা দীর্ঘ সময় দাবা, পাশা ও অন্যান্য শরীয়ত নিষিদ্ধ ক্রীড়া বিনোদনে লিপ্ত থাকে, এমনিভাবে যারা চা পানের দোকানে, যেখানে সেখানে অহেতুক সময় অতিবাহিত করে থাকে, তাদের এই কাজ তো কখনো বিবেক-সম্মত হতে পারে না। তাদের এসব অবস্থা বিবেক তো কখনো অনুমোদন করতে পারে না। এসবের মাধ্যমে সময়কে বধ ও বরবাদ করা ছাড়া তো আর কোন উদ্দেশ্য হতে পারে না। হায়! মনে হয়, সময় যেন তাদের শত্রু।
এই সমস্যার সমাধান এবং এই রোগের চিকিৎসা এভাবে হতে পারে যে, প্রথমতঃ মনে এই বিশ্বাস সৃষ্টি করতে হবে এবং তাকে দৃঢ়ভাবে লালন করতে হবে যে, মানুষ সচেষ্ট হলে তার পছন্দ ও অপছন্দের পথ ও বিষয় যেভাবে ও যেদিকে ইচ্ছা পরিবর্তন করতে পারে এবং সে তার শওক ও আগ্রহকেও যে পথে ইচ্ছা চালাতে পারে। তাহলে সে নিজেকে এমন সব বিষয়ে এবং কাজে অভ্যস্ত করে তুলতে পারে যার প্রতি ইতোপূর্বে সে আগ্রহী ছিল না। তেমনিভাবে এমন বিষয় ও কাজকে অপছন্দ ও ঘৃণা করতে পারে, যাকে সে আগে পছন্দ করত এবং স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করত।
তাই বলা যেতে পারে, যদি তার মনোবল দৃঢ় হয়, ইচ্ছা শক্তি প্রবল হয়, তবে সে অবসর সময়গুলোকে তার সুস্থতা, বুদ্ধিমত্তা বা ধার্মিকতার উৎকর্ষ সাধনের মত হিতকর কাজে ব্যয়ে অভ্যস্ত হতে পারে। যদিও সে ও তার মন ইতোপূর্বে এতে অভ্যস্ত ছিল না।
📄 একটি ভ্রান্ত ধারণা
প্রসঙ্গতঃ একটি কথা বড় আফসোসের সাথে বলতে হয়, অধিকাংশ মানুষ এখন মনে করে, বরং বলা যায় বিশ্বাস করে যে, অসার গল্প-উপন্যাস এবং মানহীন পত্র-পত্রিকা ইত্যাদির পঠনই জ্ঞান আহরণের জন্য যথেষ্ট। ফলে শিক্ষানবিশরা সেগুলো অবাধে গলাধঃকরণ করছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক তৃপ্তির জন্য সেগুলোকেই উপযোগী ও যথেষ্ট মনে করছে। কিন্তু ফল হচ্ছে হিতে বিপরীত। কিন্তু এ সকল বিষয়বস্তু তো তাদের মন-মস্তিষ্ককে অবশ ও বিবশ করে দেয় এবং তাদের যৌনানুভূতিকে সজাগ করে। ফলে তারা হয়ে পড়ছে আরও অশান্ত ও উশৃঙ্খল।