📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 ছাত্রদের অলস মানসিকতা

📄 ছাত্রদের অলস মানসিকতা


আফসোস ও পরিতাপের বিষয় যে, বর্তমান যুগে ছাত্রদের মাঝে মানসিক দুর্বলতা ও আলস্য মনষ্কতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা আরাম-আয়েশ কে সাধনা ও পরিশ্রমের উপর প্রাধান্য দিতে শুরু করেছে। গল্পগুজব, বিলাসিতা ও অন্যান্য অনর্থক কাজকর্মকে জীবনের লক্ষ্য মনে করছে। ভোগ বিলাসকে প্রকৃত উদ্দেশ্য বানিয়ে নিয়েছে। যার ফল হচ্ছে এই, অধ্যয়ন ও জ্ঞানার্জনে ব্যয় করার মত সময় তাদের হচ্ছে না। এমনকি এর মানসিকতাও তাদের মাঝে বাকী থাকছে না। তাদের অবস্থাই হয়ত ছন্দে ছন্দে প্রকাশ করেছেন ইমাম আহমদ বিন ফারিস র. (৩২৯-৩৯৫ হিজরী)
إِذَا كَانَ يُؤذيك حر المصيف . ويبس الخريف وبرد الشتا ويلهيك حسن زمان الربيع فأخذك للعلم قل لي : متى
অর্থ: গ্রীষ্মের উষ্ণতা, শরতের রুক্ষতা, শীতের তীব্রতা/ এসব যদি-কষ্ট দেয় তোমায় আর বসন্তের সৌন্দর্য ও সুবাস যদি উদাসীন করে তবে বল ভাই, ইলম অর্জন তোমার দ্বারা কখন হবে!
সময়নিষ্ঠ এক ব্যক্তিত্ব
আল্লামা আবুল মাআ'লী মাহমুদ আলুছী র. (মৃত্যু ১৩৪২ হিজরী) ছিলেন অতি কঠোর পরিশ্রমী ও সময়নিষ্ঠ একজন ব্যক্তি। গরমের তীব্রতা ও গ্রীষ্মের দাবদাহও তাঁকে দরস থেকে বিরত রাখতো না। আর শীতের প্রচন্ডতা ও ঠাণ্ডার অসহনীয়তায়ও কখনো দরসে আসতে তাঁর দেরী হত না। এমন তো বহু বার হয়েছে যে, নির্দিষ্ট সময় থেকে দেরী করে আসার কারণে তাঁর অনেক শাগরেদ জিজ্ঞাসাবাদ ও তিরস্কারের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু এমনটি কখনো হয়নি যে, তিনি দেরী করে এসেছেন।
তাঁর শাগরেদ আল্লামা শায়খ বাহজাতুল আসরী একদিনের ঘটনা উল্লেখ করতঃ বলেন, একবার প্রচণ্ড বৃষ্টির দিনে, যে-দিন ঝড়ো হাওয়া ছিল যেমন, তেমনি প্রবল বৃষ্টি ছিল- আমি তাঁর দরসে উপস্থিত হতে পরিনি। কারণ, আমি ভেবেছিলাম, হয়ত এমন দিনে তিনি দরসে আসবেন না। কিন্তু ঘটল তার বিপরীত। পরদিন আমি দরসে উপস্থিত হতেই তিনি ক্রুদ্ধস্বরে একটি পঙ্ক্তি আবৃত্তি করতে লাগলেন-
ولا خير فيمن عاقه الحر والبرد
তার মাঝে কোন কল্যাণ নেই, শীত গ্রীষ্ম যার প্রতিবন্ধক!

📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 ভবিষ্যতের আশায় ধোঁকা খেয়ো না

📄 ভবিষ্যতের আশায় ধোঁকা খেয়ো না


অনেকে ধারণা করে, আগামীতে হয়ত অবসর সময় পাওয়া যাবে, ভবিষ্যতে হয়ত ব্যস্ততা ও ঝামেলা থেকে সে মুক্ত হবে, তখন সে যুবাবয়সের তুলনায় অনেক বেশী অবকাশ পাবে। কিন্তু বাস্তবতা হয় এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
হে প্রিয় ভাই! শোন, আমি তোমাকে এমন ব্যক্তির কথা বলছি যিনি ঐ বয়সে পৌঁছেছেন এবং তখনকার পরিস্থিতি ও বাস্তবতা উপলব্ধি করেছেন। তিনি বলেন- "তোমার বয়স যতই বাড়বে ততই তোমার দায়িত্ব বাড়তে থাকবে। বিষয় ও ব্যক্তি সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এভাবে, তোমার সময় কমে আসবে, শক্তি হ্রাস পেতে থাকবে।
বার্ধক্যে সময় তো আরও সংকীর্ণ হয়ে যায়। দেহ আরও দুর্বল হয়ে যায় এবং সুস্থতার সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে যায়। উদ্যম হ্রাস পায়, কিংবা প্রায় হারিয়েই যায়। অথচ দায়িত্ব ও ব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়, কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
সুতরাং তুমি তোমার এই সময়টাকেই (অর্থাৎ) যুবা বয়সটাকেই কাজে লাগাও। এটাই সুযোগ। অনাগত ও অজ্ঞাত ভবিষ্যতের আশায় বসে থেকো না, তার জন্য সব কাজ ঝুলিয়ে রেখো না। কারণ জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই, সময়ের প্রতিটি পাত্রই কোন না কোন ব্যস্ততা, কাজ বা অপ্রত্যাশিত বিপদ-আপদে পূর্ণ হয়ে যায়।”

টিকাঃ
৩৭ তিনি হলেন মুহাদ্দিছ আবু মুহাম্মাদ জাফর বিন মুহাম্মাদ আব্বাসী র. (মৃত্যু ৫৬৮ হিজরীতে) তিনি তাঁর কবরের উপর এ বাক্যটি লিখে রাখতে অছিয়ত করে যান,
حوائج لم تقض! وآمال لم تنل! وأنفس ماتت بحسراتها
অর্থ: বহু প্রয়োজন অপূর্ণ রয়ে গেল, অনেক আকাঙ্ক্ষা অপ্রাপ্ত রয়ে গেল। আর আক্ষেপ যাতনা নিয়েই বহু প্রাণের জীবনাবসান ঘটল।

📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 যৌবন ও বার্ধক্য

📄 যৌবন ও বার্ধক্য


প্রকৃতপক্ষে শক্তি ও কর্মের এবং মেহনত ও মুজাহাদার কাঙ্ক্ষিত সময়ই হল যৌবন ও তারুণ্য। তখনই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন এবং লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রচেষ্টার সময়। ভোগ ও প্রাপ্তির স্বচ্ছতা ও তৃপ্তি নিশ্চিত করার সময়।
তবে বার্ধক্য! তা তো হল বিভিন্ন রোগ-শোক, বিপদ-আপদ, ও বাধা বিপত্তির সময়। তখন আগ্রহ যদিও বা থাকে কিন্তু উপায় থাকে না, সুযোগ মিলে না, সাহসে কুলায় না। কবির এ কথা, কে বলতে পারে, তা মিথ্যা!
إن الشباب الذي يجد عواقبه * فيه نلذ ولا لذات للشيب
অর্থঃ যৌবন, তার পরিণাম তো হল মর্যাদা ও গৌরব। তাতে আমরা ভোগ করি, তৃপ্তি লাভ করি। আর বার্ধক্যে না আছে কোন তৃপ্তি, না আছে প্রাপ্তি।
প্রসিদ্ধ সাহিত্যিক আবু উছমান জাহিয যখন বার্ধক্য ও তার উপসর্গসমূহে আক্রান্ত হলেন তখন দুর্বলতা, আর রোগ যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আফসোসের সাথে বলতে লাগলেন,
أتَرْجُو أن تكون وأنت شيخ * كما قد كنت أيام الشباب لقد كذبتك نفسك ليس ثوب * دريس كالجديد من الثياب
অর্থ: তুমি কি আশা করছ, বার্ধক্যে যৌবনের শক্তি ও উদ্যম লাভ করবে? মন তোমায় মিথ্যে আশ্বাস দিচ্ছে। জীর্ণ কাপড় তো নতুন কাপড়ের মত নয়?
বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ এবং সফল ও ভাগ্যবান তো সেই, যে তার বিদ্যমান প্রতিটি সেকেন্ডকে, বর্তমান প্রতিটি মুহূর্তকে বিভিন্ন উপকারী ও ফলদায়ক কর্ম ও কীর্তি দিয়ে পূর্ণ করে রাখে।
দ্বিতীয় খলীফা উমর বিন খাত্তাব রা. কর্মহীনতা ও বেকারত্বকে এবং সময়কে অনর্থক নষ্ট করাকে অত্যন্ত অপছন্দ করতেন। তিনি বলতেন-
إني لأكره أن أرى أحدكم سبهللاً - أي فارغا – لا في عمل دنيا ولا في عمل آخرة -
অর্থ: তোমাদের কাউকে বেকার ও কর্মহীন দেখতে আমি খুব অপছন্দ করি, যখন না থাকে সে দুনিয়াবী কাজে, আর না আখেরাতের কাজে।

📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 অবসর সময়

📄 অবসর সময়


সময় একদিক থেকে সবচে' মূল্যবান, অন্যদিক থেকে সবচে' মূল্যহীন। যদি প্রশ্ন করা হয়, তোমার যা কিছু রয়েছে তার মধ্যে সবচে' দামী কী? উত্তর হবে: সময়! আবার যদি জিজ্ঞেস করা হয়, তুমি নষ্ট করতে পারো, ধ্বংস করতে পারো এমন জিনিসের মধ্যে সবচে' সস্তা ও সহজলভ্য কী? উত্তর হবে একই, তা হল- সময়।
তাই তো ফকীহ, আদীব আল্লামা ইয়াহইয়া বিন হুবায়রা র. (৪৪৯-৫৬০ হিজরী) যিনি ছিলেন ইমাম ইবনুল জাওযী র. এর শায়খ- তিনি বলেন,
والوقتُ أنفس ما عُنيت بحفظه . وأراه أسهل ما عليك يضيع
যা কিছুর সংরক্ষণে তুমি সচেষ্ট হতে পার তন্মধ্যে সময় হচ্ছে সবচে' মূল্যবান, অথচ আমি দেখতে পাচ্ছি, যা কিছু তোমার দ্বারা বরবাদ হয় তার মধ্যে সময় সবচে' সহজলভ্য।
মিশরীয় লেখক ও সাহিত্যিক উস্তায আহমদ আমীন র. (মৃত্যু- ১৩৭৩ হিজরী) এর أوقات الفراغ (অবসর সময়) শিরোনামে একটি প্রবন্ধ রয়েছে। প্রসঙ্গ ও বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্যের কারণে এখানে তা সংক্ষেপে উল্লেখ করা ভাল মনে করছি- এই আশায় যে, হয়ত কোন পাঠক তা থেকে উপকৃত হবেন- জ্ঞানের প্রাঙ্গণে বা জীবনের অঙ্গনে।
তিনি বলেন, "আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর হাজার হাজার ছাত্র বছরে চার-পাঁচ মাস গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটায়। তখন কি তাদের অভিভাবকগণ জিজ্ঞেস করেন, কীভাবে তারা এই দীর্ঘ সময়টা কাটাচ্ছে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দৈহিক, মানসিক ও চারিত্রিক গুণে সমৃদ্ধি লাভের পর এই দীর্ঘ ছুটিকে তারা কোন্ কাজে ব্যয় করেছে? তাছাড়া এ জাতির প্রায় অর্ধ-সংখ্যক মানুষ, আমাদের মেয়েরা- বাড়ী ঘরে তাদের অবসর সময়গুলো কীভাবে ব্যয় করে, তা কি জানতে চান কোন অভিভাবক?
সম্পদ ব্যবহার ও বিনিয়োগের, জ্ঞান অর্জন এবং দৈহিক ও মানসিক সুস্থতা লাভের মূল উপকরণ হল সময়, অথচ আমরা কীভাবে তা নষ্ট করে চলছি!
কীভাবে আমরা আমাদের জীবনকে অযথা ও অনর্থক কাজে ব্যয় করে চলছি! যাতে না হচ্ছে দুনিয়াবী কোন ফায়দা, আর না হচ্ছে 'উখরুবী' ফায়দা!! কিন্তু এর মাধ্যমে আমরা কি শুধু সময়ই নষ্ট করছি, না অর্থ- সম্পদ, জ্ঞান, সুস্থতা সবকিছুই খোয়াচ্ছি? কখনো কি ভেবে দেখেছি?
সময় নষ্টের একেবারে নিকটতম পরিণতি তো এই যে, এর মাধ্যমে বহু সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যায়, সম্পদের বহু উৎস নষ্ট হয়ে যায়। ভেবে দেখুন, সময় সম্পদকে যদি কেউ নষ্ট না করে এবং এর সঠিক ব্যবহারে অজ্ঞ না হয় তবে তো সে বহু পতিত ও অনাবাদি জমিকে আবাদ করতে পারে, বহু কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করতে পারে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চালু করতে পারে এবং সেগুলো পরিচালনা করতে পারে- সময়ের একটি অংশ ব্যয় করে।
আর যদি বর্তমান যুগে সময় নষ্টের ও তার অপচয়ের ফল দেখা হয় তবে তা হল, গ্রন্থবিমুখতা, জ্ঞানশূন্যতা, অধ্যয়নবিরূপতা ও মূর্খতাপ্রিয়তা। বর্তমানকালে তো এমন অনেকে রয়েছে যারা মূর্খতা ও জ্ঞান শূন্যতায় কোন মর্মপীড়া ও যাতনা অনুভব করে না। তাদের দেহ শুধু সুখ-শান্তি ও আরাম আয়েশ চায়, কষ্টের পথ মাড়াতে চায় না। অথচ তারা উপলব্ধি করতে পারছে না, যে পথে তারা চলছে তা প্রকৃত পক্ষেই কষ্টের পথ, দুনিয়া ও আখেরাতে অশান্তির পথ।
সময়ের ব্যাপারে মানুষের এমন মানসিকতা ও তার প্রতি এই 'অবিচারের' ফলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় দেখা দেয় অল্পে তুষ্টতা এবং শুধু সহজলভ্য অংশটুকুতেই তৃপ্ততা। শুধু গদবাঁধা পড়া লেখা ও একঘেয়ে সামান্য কাজ- যাতে না আছে কোন শ্রম-সাধনা আর না আছে নতুন কোন চিন্তার উন্মেষ ও বিকাশের ভাবনা- এতেই পরিতৃপ্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়া। এরপর ধীরে ধীরে দেখা দেয় দুর্বল ও ক্লান্ত চিন্তা এবং কাজের ভার উদ্যমী কারও উপর ছেড়ে দিয়ে অলস বসে থাকা। ভাবখানা যেন এমন, তুমিই কর ভাই, আমার আর এ ভেজালে গিয়ে কী লাভ!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00