📄 যৌবন অতি সংক্ষিপ্ত
আমাদের জীবন প্রতিনিয়ত সংক্ষিপ্ত থেকে সংক্ষিপ্ততর হয়ে আসছে। একটি একটি করে দিন আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। আর বয়স কমে আসছে ধীরে ধীরে। কিন্তু অনেক মানুষ তা বুঝতেই পারছে না। উপলব্ধিই করতে পারছে না যে, তার জীবন খুব দ্রুত কেটে যাচ্ছে, তা আর ফিরে আসবে না।
ফলে সে তার মূল্যায়ন এবং তার প্রতি গুরুত্ব দানে অবহেলা করছে। কোন কিছু অর্জনে ও তা থেকে উপকার গ্রহণে উদাসীন রয়ে যাচ্ছে। যেন সে ভাবছে, জীবন তো অনেক দীর্ঘ, অনেক বিস্তৃত। তা তো চিরস্থায়ী এবং অতি ধীরগামী। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল র. (১৬৪-২৪১) বলেছেন,
مَا شَبَّهْتُ الشَّبَابَ إِلا بِشَيْءٍ كَانَ فِي كُمِّي فَسَقَطَ.
অর্থ: আমি তো যৌবনকালকে শুধু উপমা দিতে পারি এমন কোন বস্তুর সাথে, যা আমার আস্তিনে ছিল, তারপর তা খোয়া গেল।
যৌবনকালকে, কাজের সময়কে তার কাছে এত সংক্ষিপ্ত ও এত সামান্য মনে হয়েছে, অথচ তিনি প্রায় সাতাত্তর বছর হায়াত পেয়েছিলেন। সত্যি বন্ধু! জীবন যতই দীর্ঘ হোক তবু তা ক্রমহ্রাসমান। যৌবন কাল যতই বিস্তৃত হোক তবু তা সংক্ষিপ্ত।
আল্লাহ তাঁর প্রতি দয়া করুন, যিনি এই পরম সত্য তুলে ধরেছেন কবিতার ভাষায়,
أَذَانُ الْمَرْءِ حِينَ الطِّفْلُ يَأْتِي وَتَأْخِيرُ الصَّلاةِ إِلى الْمَمَاتِ
دليل أن محياه يسير كما بين الأذان إلى الصلاة
অর্থ: মানবশিশুর জন্মকালে আযান দেয়া, আর জানাযার নামাযকে তার মৃত্যু পর্যন্ত বিলম্বিত করা একথার প্রমাণ যে, জীবনকাল তার অতি সংক্ষিপ্ত যেমন আযান থেকে নামায এর মধ্যবর্তী ব্যবধান।
📄 ছাত্রদের অলস মানসিকতা
আফসোস ও পরিতাপের বিষয় যে, বর্তমান যুগে ছাত্রদের মাঝে মানসিক দুর্বলতা ও আলস্য মনষ্কতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা আরাম-আয়েশ কে সাধনা ও পরিশ্রমের উপর প্রাধান্য দিতে শুরু করেছে। গল্পগুজব, বিলাসিতা ও অন্যান্য অনর্থক কাজকর্মকে জীবনের লক্ষ্য মনে করছে। ভোগ বিলাসকে প্রকৃত উদ্দেশ্য বানিয়ে নিয়েছে। যার ফল হচ্ছে এই, অধ্যয়ন ও জ্ঞানার্জনে ব্যয় করার মত সময় তাদের হচ্ছে না। এমনকি এর মানসিকতাও তাদের মাঝে বাকী থাকছে না। তাদের অবস্থাই হয়ত ছন্দে ছন্দে প্রকাশ করেছেন ইমাম আহমদ বিন ফারিস র. (৩২৯-৩৯৫ হিজরী)
إِذَا كَانَ يُؤذيك حر المصيف . ويبس الخريف وبرد الشتا ويلهيك حسن زمان الربيع فأخذك للعلم قل لي : متى
অর্থ: গ্রীষ্মের উষ্ণতা, শরতের রুক্ষতা, শীতের তীব্রতা/ এসব যদি-কষ্ট দেয় তোমায় আর বসন্তের সৌন্দর্য ও সুবাস যদি উদাসীন করে তবে বল ভাই, ইলম অর্জন তোমার দ্বারা কখন হবে!
সময়নিষ্ঠ এক ব্যক্তিত্ব
আল্লামা আবুল মাআ'লী মাহমুদ আলুছী র. (মৃত্যু ১৩৪২ হিজরী) ছিলেন অতি কঠোর পরিশ্রমী ও সময়নিষ্ঠ একজন ব্যক্তি। গরমের তীব্রতা ও গ্রীষ্মের দাবদাহও তাঁকে দরস থেকে বিরত রাখতো না। আর শীতের প্রচন্ডতা ও ঠাণ্ডার অসহনীয়তায়ও কখনো দরসে আসতে তাঁর দেরী হত না। এমন তো বহু বার হয়েছে যে, নির্দিষ্ট সময় থেকে দেরী করে আসার কারণে তাঁর অনেক শাগরেদ জিজ্ঞাসাবাদ ও তিরস্কারের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু এমনটি কখনো হয়নি যে, তিনি দেরী করে এসেছেন।
তাঁর শাগরেদ আল্লামা শায়খ বাহজাতুল আসরী একদিনের ঘটনা উল্লেখ করতঃ বলেন, একবার প্রচণ্ড বৃষ্টির দিনে, যে-দিন ঝড়ো হাওয়া ছিল যেমন, তেমনি প্রবল বৃষ্টি ছিল- আমি তাঁর দরসে উপস্থিত হতে পরিনি। কারণ, আমি ভেবেছিলাম, হয়ত এমন দিনে তিনি দরসে আসবেন না। কিন্তু ঘটল তার বিপরীত। পরদিন আমি দরসে উপস্থিত হতেই তিনি ক্রুদ্ধস্বরে একটি পঙ্ক্তি আবৃত্তি করতে লাগলেন-
ولا خير فيمن عاقه الحر والبرد
তার মাঝে কোন কল্যাণ নেই, শীত গ্রীষ্ম যার প্রতিবন্ধক!
📄 ভবিষ্যতের আশায় ধোঁকা খেয়ো না
অনেকে ধারণা করে, আগামীতে হয়ত অবসর সময় পাওয়া যাবে, ভবিষ্যতে হয়ত ব্যস্ততা ও ঝামেলা থেকে সে মুক্ত হবে, তখন সে যুবাবয়সের তুলনায় অনেক বেশী অবকাশ পাবে। কিন্তু বাস্তবতা হয় এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
হে প্রিয় ভাই! শোন, আমি তোমাকে এমন ব্যক্তির কথা বলছি যিনি ঐ বয়সে পৌঁছেছেন এবং তখনকার পরিস্থিতি ও বাস্তবতা উপলব্ধি করেছেন। তিনি বলেন- "তোমার বয়স যতই বাড়বে ততই তোমার দায়িত্ব বাড়তে থাকবে। বিষয় ও ব্যক্তি সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এভাবে, তোমার সময় কমে আসবে, শক্তি হ্রাস পেতে থাকবে।
বার্ধক্যে সময় তো আরও সংকীর্ণ হয়ে যায়। দেহ আরও দুর্বল হয়ে যায় এবং সুস্থতার সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে যায়। উদ্যম হ্রাস পায়, কিংবা প্রায় হারিয়েই যায়। অথচ দায়িত্ব ও ব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়, কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
সুতরাং তুমি তোমার এই সময়টাকেই (অর্থাৎ) যুবা বয়সটাকেই কাজে লাগাও। এটাই সুযোগ। অনাগত ও অজ্ঞাত ভবিষ্যতের আশায় বসে থেকো না, তার জন্য সব কাজ ঝুলিয়ে রেখো না। কারণ জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই, সময়ের প্রতিটি পাত্রই কোন না কোন ব্যস্ততা, কাজ বা অপ্রত্যাশিত বিপদ-আপদে পূর্ণ হয়ে যায়।”
টিকাঃ
৩৭ তিনি হলেন মুহাদ্দিছ আবু মুহাম্মাদ জাফর বিন মুহাম্মাদ আব্বাসী র. (মৃত্যু ৫৬৮ হিজরীতে) তিনি তাঁর কবরের উপর এ বাক্যটি লিখে রাখতে অছিয়ত করে যান,
حوائج لم تقض! وآمال لم تنل! وأنفس ماتت بحسراتها
অর্থ: বহু প্রয়োজন অপূর্ণ রয়ে গেল, অনেক আকাঙ্ক্ষা অপ্রাপ্ত রয়ে গেল। আর আক্ষেপ যাতনা নিয়েই বহু প্রাণের জীবনাবসান ঘটল।
📄 যৌবন ও বার্ধক্য
প্রকৃতপক্ষে শক্তি ও কর্মের এবং মেহনত ও মুজাহাদার কাঙ্ক্ষিত সময়ই হল যৌবন ও তারুণ্য। তখনই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন এবং লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রচেষ্টার সময়। ভোগ ও প্রাপ্তির স্বচ্ছতা ও তৃপ্তি নিশ্চিত করার সময়।
তবে বার্ধক্য! তা তো হল বিভিন্ন রোগ-শোক, বিপদ-আপদ, ও বাধা বিপত্তির সময়। তখন আগ্রহ যদিও বা থাকে কিন্তু উপায় থাকে না, সুযোগ মিলে না, সাহসে কুলায় না। কবির এ কথা, কে বলতে পারে, তা মিথ্যা!
إن الشباب الذي يجد عواقبه * فيه نلذ ولا لذات للشيب
অর্থঃ যৌবন, তার পরিণাম তো হল মর্যাদা ও গৌরব। তাতে আমরা ভোগ করি, তৃপ্তি লাভ করি। আর বার্ধক্যে না আছে কোন তৃপ্তি, না আছে প্রাপ্তি।
প্রসিদ্ধ সাহিত্যিক আবু উছমান জাহিয যখন বার্ধক্য ও তার উপসর্গসমূহে আক্রান্ত হলেন তখন দুর্বলতা, আর রোগ যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আফসোসের সাথে বলতে লাগলেন,
أتَرْجُو أن تكون وأنت شيخ * كما قد كنت أيام الشباب لقد كذبتك نفسك ليس ثوب * دريس كالجديد من الثياب
অর্থ: তুমি কি আশা করছ, বার্ধক্যে যৌবনের শক্তি ও উদ্যম লাভ করবে? মন তোমায় মিথ্যে আশ্বাস দিচ্ছে। জীর্ণ কাপড় তো নতুন কাপড়ের মত নয়?
বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ এবং সফল ও ভাগ্যবান তো সেই, যে তার বিদ্যমান প্রতিটি সেকেন্ডকে, বর্তমান প্রতিটি মুহূর্তকে বিভিন্ন উপকারী ও ফলদায়ক কর্ম ও কীর্তি দিয়ে পূর্ণ করে রাখে।
দ্বিতীয় খলীফা উমর বিন খাত্তাব রা. কর্মহীনতা ও বেকারত্বকে এবং সময়কে অনর্থক নষ্ট করাকে অত্যন্ত অপছন্দ করতেন। তিনি বলতেন-
إني لأكره أن أرى أحدكم سبهللاً - أي فارغا – لا في عمل دنيا ولا في عمل آخرة -
অর্থ: তোমাদের কাউকে বেকার ও কর্মহীন দেখতে আমি খুব অপছন্দ করি, যখন না থাকে সে দুনিয়াবী কাজে, আর না আখেরাতের কাজে।