📄 শ্রেষ্ঠ ও উৎকৃষ্টের জন্যই নিয়োজিত হও
আর পূর্বসূরীদের জ্ঞান অর্জন সর্বদা বুদ্ধি ও বিবেকের পরিমাপে নির্ণীত হতো। আর তা এমনই সূক্ষ্ম বিষয় যে, সামান্য একটু উদাসীনতা ও অন্যমনষ্কতায় তা প্রভাবিত ও বিকৃত হয়ে যায়। তখন তো তাদের ইস্তেকামাত ও অবিচলতা এবং একাগ্রতা ও নিষ্ঠা বজায় থাকবে না। তাই তাঁরা সূক্ষ্ম-জটিল বিষয়াদির ক্ষেত্রে সময় ও স্থানের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতেন। যেন তাঁদের চিন্তা ও ভাবনা এবং বুঝ ও বোধ পূর্ণ ও যথার্থ হয় আর সিদ্ধান্ত গ্রহণ সঠিক হয়।
ইমাম, মুহাদ্দিস, ফকীহ ও আদীব আবু সুলায়মান হামদ বিন মুহাম্মাদ আল-খাত্তাবী র. (৩১৯-৩৮৮) ছন্দে ছন্দে বলেন-
إذا ما خلوت صفا ذهنى وعارضني خواطر كطراز البرق في الظلم وإن توالى صياح الناعقين على أذنى عَرتْني منه حُكلة العجم
অর্থ: যখন আমি নির্জনে থাকি/অন্ধকারে বিদ্যুৎ চমকের মত বহু ভাবনা আমার মনন জগতকে আলোকিত করে/পক্ষান্তরে যদি শোরগোল, হৈ চৈ ক্রমাগত কানে আসতেই থাকে/তবে যেন নির্বাকতা ও চিন্তার বন্ধ্যাত্ব আমাকে পেয়ে বসে।
এমন কিছু ইলম ও জ্ঞান রয়েছে যেগুলোর উপকারিতা ও নির্ভরতা এবং গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা খুব অল্প। সেগুলোর অর্জনে হয়তো জ্ঞান-জগতে পূর্ণতা আসে, সমৃদ্ধি ঘটে, তবে অর্জন না করলে লোকসান বা ঘাটতি হয় না কিংবা কমতি রয়ে যায় না। এ জাতীয় বিষয়ে দীর্ঘ সময় ব্যয় না করা এবং মেধা ও মস্তিষ্ককে বেশী ব্যস্ত না করা উচিৎ। কেননা অশ্রেষ্ঠ ও নিকৃষ্টে মগ্নতা তো উৎকৃষ্ট ও অত্যুৎকৃৃষ্টে পৌঁছার পথে বাধা ও প্রতিবন্ধক বৈ কিছু নয়। তা ছাড়া এতে সময়ও নষ্ট হয় এবং শারীরিক উদ্যম ও মানসিক আগ্রহও স্তিমিত হয়ে যায়। ফলে মানুষ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে, শ্রেষ্ঠ ও উৎকৃষ্টে পৌঁছতে অক্ষম হয়ে পড়ে। এদিকে ইঙ্গিত করেই আরব কবি ছালেহ বিন আবদুল কুদ্দুছ র. বলেছেন-
و إذا طلبت العلم فاعلم أنه حمل فأبصر أي شئ تحمل وإذا علمت بأنه متفاضل فاشغل فؤادك بالذي هو أفضل
অর্থ: জ্ঞান যদি অন্বেষণ করতে চাও তবে জেনে রাখ, তা কিন্তু একটি বোঝা/সুতরাং ভেবে দেখ, কিসের বোঝা তুমি বহন করছ।/আর যখন তুমি বুঝতে পারছ তার মাঝে মর্যাদায় তারতম্য রয়েছে/তখন তোমার উচিৎ সর্বোৎकृष्टের জন্যই তোমার কলবকে মশগুল করা।
সুতরাং প্রতিটি মানুষের এবং প্রত্যেক জ্ঞানীর উচিৎ তার মন ও মস্তিষ্ককে, মেধা, মনন ও চিন্তা-ভাবনাকে এবং মূল্যবান সম্পদ সময়কে শ্রেষ্ঠতর কর্ম এবং উৎকৃষ্টতর উপার্জনে ব্যয় করা। তাহলেই সে পেতে পারে শ্রেষ্ঠত্বের সন্ধান।
📄 ইলমের গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোতে মগ্ন হও
প্রয়োজনে আত্মপ্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ
এক কথায় বলা যায়, প্রতিটি মানুষের, বিশেষত যারা বড় হতে চায়, জীবনকে গড়তে ও সাজাতে চায়, শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হতে চায়, তাদের উচিৎ বিচার-বিবেচনার মাধ্যমে, বুদ্ধি ও বিবেককে কাজে লাগিয়ে সময়-সম্পদকে ব্যয় করা- সুস্থতা বা অসুস্থতা, প্রসন্নতা বা অপ্রসন্নতা, সন্তুষ্টি কিংবা অসন্তুষ্টি যে কোন অবস্থায়, যে কোন মুহূর্তে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে বাহ্যিক আত্মপ্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করাও নিন্দনীয় নয়, বরং প্রশংসনীয়।
আবু হেলাল আসকারী র. রচিত الحث على طلب العلم গ্রন্থে বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও নাহব-বিদ ইবন জারউ আল-মাওছিলি র. এর একটি উক্তি উল্লেখ করা হয়, তিনি বলেন-
ينبغى أن يؤخر الإنسان درسه للأخبار والأشعار لوقت ملله .
অর্থ: মানুষে উচিৎ তথ্য ও কাব্যের অধ্যয়নকে তার ক্লান্তি ও বিরক্তির মুহূর্তের জন্য রেখে দেয়া।
আরেকজন সাহিত্যিক ও ভাষাবিদ ইবনুল মারাগী র. বলেন-
ينبغى أن يُخادع الإنسان نفسه في الدرس ـ
অর্থ: মানুষের উচিৎ অধ্যয়নের স্বার্থে (প্রয়োজনে) আত্ম-প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করা।
(শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ র. বলেন) সম্ভবত এ কথার ব্যাখ্যা এই হতে পারে যে, মানুষ যখন ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে পড়ে, দুর্বলতা ও অবসন্নতা তাকে পেয়ে বসে তখন তাকে (অর্থাৎ, ক্লান্তি ও বিরক্তিকে) প্রশ্রয় দিতে নেই, তার আহ্বানে দেহ মনকে সাড়া দেয়ার সুযোগ দিতে নেই; বরং অবসন্নতার প্রতিবিধান করা উচিৎ। ক্লান্তি ও বিরক্তির সাথে দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামা এবং যে কোন উপায়ে বিজয়ী হওয়ার চেষ্টা করা উচিৎ। যেন সেগুলো দূরীভূত হয়ে যায় এবং দেহ-মনে প্রফুল্লতা ও উদ্যম ফিরে আসে।
এই ক্লান্তি ও বিরক্তি দূর করার এবং তন্দ্রা ও অলসতার প্রতিবিধান করার বিভিন্ন উপায় হতে পারে। যেমন, লোবান বা চুইংগাম জাতীয় কিছু চিবানো। ছাদের নীচ ছেড়ে খোলা ময়দানে, উন্মুক্ত পরিবেশে বের হওয়া, বিভিন্ন কামরায় সামান্য পায়চারী করা, ঠাণ্ডা বা গরম পানিতে গোসল করা কিংবা হাত-মুখ ধুয়ে নেয়া, সামান্য কিছু পানাহার করা বা বন্ধু ও সহপাঠীর সাথে অল্পক্ষণ কথাবার্তা বলা, উচ্চস্বরে কোরআন তেলাওয়াত বা কবিতা আবৃত্তি করা ইত্যাদি।
আবার কখনো বসার অবস্থা বা অবস্থান পরিবর্তন করা, একটু ওঠাবসা বা উঁচুতে আরোহণ করা কিংবা পঠিত কিতাব বা বিষয় পরিবর্তন করা ইত্যাদি মাধ্যমেও উপকার পাওয়া যেতে পারে।
প্রতিটি দেহেরই সংশোধন এবং দেহের প্রতিটি অবস্থা ও প্রতিটি শূন্যতারই পরিবর্তক ও পরিপূরক রয়েছে। জ্ঞান অন্বেষণে আগ্রহী, মেধাবী ও বিচক্ষণ ব্যক্তি মাত্রই সেগুলো জানেন। সবগুলোর আলোচনা বোধ হয় এখানে নিষ্প্রয়োজন।
আমাদের জীবন অতি সংক্ষিপ্ত, সময় অতি অল্প, কিন্তু জ্ঞান-সাগরের পরিধি ও গভীরতা এবং ইলমের ভাণ্ডারের ব্যাপ্তি ও বিশালতা তো সীমাহীন, অপরিমিত। তাই আমাদের উচিৎ ইলমের গুরুত্বপূর্ণ দিক ও অত্যাবশ্যকীয় শাখাগুলোর মাঝেই ব্যস্ত ও মগ্ন হওয়া। যেমনটা বলেছেন হাফেয খতীব বাগদাদী র.-
العلم كالبحار المتعذر كيلها، والمعادن التي لا ينقطع نيلها، فاشتغل بالمهم منه، فإنه من شغل نفسه بغير المهم أضر بالمهم -
অর্থ: ইলম ও জ্ঞানের পরিধি তো সু-বিশাল সাগরের মত, যা পরিমাপ করা যায় না এবং সুবৃহৎ খনির মত যার খনিজ দ্রব্য কখনো শেষ হয় না। সুতরাং তার গুরুত্বপূর্ণ অংশে নিয়োজিত হও। কেননা, গুরুত্বহীন বিষয়ে মশগুল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অর্জনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
📄 সালাফের জীবনী অধ্যয়ন কর
বিচক্ষণ আলেম বিজ্ঞ কবি ও সাহিত্যিক আব্বাস ইবন হাসান আলাভী র. এক মূল্যবান নছীহতে একথার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। আমি তাঁর পুরো উপদেশ বাণীটিই এখানে উল্লেখ করা পাঠকের জন্য ভাল ও উপকারী মনে করছি। কেননা, তাতে রয়েছে সূক্ষ্ম-গভীর চিন্তার নির্যাস এবং আগ্রহীদের জন্য জ্ঞানের মূল্যবান খোরাক।
তিনি বলেন, "জেনে রাখ, তোমার মেধা ও মস্তিষ্ক জ্ঞানের সকল শাখা, এমনকি কোন একটি শাখার সকল প্রশাখাকেও পরিবেষ্টন করতে পারবে না। তাই তাকে গুরুত্বপূর্ণ ও অতীব প্রয়োজনীয় বিষয়েই ব্যস্ত রাখ। কেননা, গুরুত্বহীন ও অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে মস্তিষ্ককে তুমি যতটা সক্রিয় করবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ততই অবজ্ঞা ও অবহেলার শিকার হবে।
আর তোমার ধন-সম্পদ সকল মানুষকে অভাবমুক্ত করে দিতে পারবে না। তাই শুধু হক্বপন্থীদের জন্যই তা ব্যয় কর। কেননা, যখন তুমি সম্পদকে অন্যায় পথে ও অসৎ জনে ব্যয় করবে, তখন সৎপথে ও সৎজনের জন্য ব্যয় করতে চাইলেও তুমি তা পাবে না।
আর তোমার সম্মান-মর্যাদা সাধারণ-অসাধারণ নির্বিশেষে সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়বে না। শাব্দিক অর্থেই সবাই তোমার মর্যাদা বুঝবে না এবং তোমাকে সম্মান করবে না। সুতরাং তুমি শুধু গুণবান ও মর্যাদাবানদের থেকেই তা কামনা কর। কেননা যখন তুমি হীন ও নীচ লোকদের থেকে সম্মান ও মর্যাদা কামনা করবে তখন গুণবান ও মর্যাদাবানদের কাছে তোমার অবস্থান হারাবে।
আর দিন-রাত্রিতে তুমি যদি অবিরাম পরিশ্রম করে চল, অধ্যবসায়ী হয়ে কাজে আত্মনিয়োগ কর তবুও তোমার প্রয়োজন পূর্ণ হবে না, কাজ ফুরোবে না। তাই কাজ ও সহনীয়তার মাঝেই দিন-রাতকে ভাগ করে নাও এবং প্রয়োজনীয় কাজেই মশগুল থাক। কেননা, যখন তুমি অপ্রয়োজনীয় কাজে মশগুল থাকবে তখন স্বভাবতই প্রয়োজনীয় কাজ তোমার হাতছাড়া হবে।"
এ হল পূর্ববর্তী ইমাম ও আলিমদের চিন্তা ও চেতনা, তাঁদের ভাব ও ভাবনা এবং সময়ের ব্যাপারে তাঁদের মূল্য ও মূল্যায়নের কতক খণ্ডচিত্র। বরং বলা ভাল, তাদের বহুজন থেকে অল্প ক'জনের জীবনের সামান্য অংশের উপর একটি ত্বরিত দৃষ্টি মাত্র। সবার কৃতিত্ব ও গুণাবলীর উল্লেখ করা হলে তো এটি শত খণ্ডের বিশাল গ্রন্থে পরিণত হবে এবং এর রচনায় একাধিক জীবনকালের প্রয়োজন হবে। প্রকৃতপক্ষে তাঁরা তো ছিলেন ইসলামের গৌরব, বরং সমগ্র মানবজাতি ও মানবতার গৌরব। কবি কত সুন্দর করে বলেছেন,
أولئك قوم شيَّد الله فخرهم فما فوقه فخر وإن عظم الفخر
অর্থ : আল্লাহ তাঁদের গৌরবকে করেছেন সুদৃঢ় ও সমুন্নত/এর ঊর্ধ্বে নেই কোন গৌরব, হোক না তা বিশাল ব্যাপ্ত। .....
যৎসামান্য আলোচনায় যা কিছু উল্লেখ করা হল এরপর তো আর পাঠকের আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, যদি তিনি শোনেন যে, অমুক আলেম শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন বা অমুকের রচনা-সম্ভার জ্ঞানের সকল বিষয়ের আলোচনায় যথেষ্ট সমৃদ্ধ কিংবা এ জাতীয় কিছু। এ ধরনের কর্ম-কীর্তি বা বক্তব্যকে অসম্ভব মনে করারও কিছু নেই। কেননা, এর হেতু বা কারণ, উপায় ও উপকরণ তো জানা হয়ে গেছে- তাঁরা সময়ের সদ্ব্যবহার করেছেন, অহেতুক অনর্থক কাজ থেকে বিরত থেকেছেন, জীবনের সংক্ষিপ্ততা ও সময়ের গতিধারা সম্পর্কেও সজাগ থেকেছেন। প্রতিটি ঘণ্টা-মিনিট, এমনকি প্রতিটি মুহূর্তের ক্ষেত্রে তাঁরা প্রতিযোগিতা করেছেন। ফলে এ সকল মহা কীর্তি ও স্মরণীয় কর্ম তাঁরা আঞ্জাম দিতে পেরেছেন। ........
উস্তায জামীলুল আ'জম দামেস্কী ر. (মৃত্যু-১৩৫২ হিজরী) একটি কিতাব লিখেন, যার নাম عقود الجوهر في تراجم من لهم خمسون تصنيفا فمئة فأكثر এতে তিনি এমন বহু ওলামায়ে কেরামের কথা উল্লেখ করেন যাঁরা বহু গ্রন্থ রচয়িতা হিসেবে পরিচিত ও প্রসিদ্ধ। যেমন ইবন জারীর তাবারী, ইবনুল জাওযী, ইমাম নববী, ইবন সীনা, ইমাম গাযালী, ইবন হাজার আসকালানী, বদরুল আইনী, সুয়ূতী, ইবন তাইমিয়া, ইবনুল কায়্যিম, আলী ক্বারী, শায়খ মুনাভী, আব্দুল গণী নাবলুসী, আব্দুল হাই লাখনুভীসহ আরও অনেকের- যাদের প্রত্যেকেরই গ্রন্থ সংখ্যা পঞ্চাশ বা একশ'র উপরে- তাঁদের জীবনী বা জীবনীর অংশ বিশেষ উল্লেখ করেন। এ ধরনের গ্রন্থ ও এ জাতীয় মনীষীদের জীবনী যখন কেউ পড়বে তখন স্বভাবতই তা তাকে উদ্বুদ্ধ করবে সময়ের মূল্য উপলব্ধি করণে এবং তার যথাযথ মূল্যায়নে। পাঠক যদি দৃঢ় মনোবল ও কঠিন সংকল্পের অধিকারী হন তবে- আল্লাহ চান তো- তিনিও তাঁদের কাতারে গিয়ে দাঁড়াতে পারেন, তাঁদের দলে শামিল হতে পারেন। তিনিও রেখে যেতে পারেন ত্রিশ, চল্লিশ বা পঞ্চাশের অধিক গ্রন্থ।
ويزيد الله في الخلق ما يشاء، ويختص برحمته من يشاء والله واسع عليم -
(তরজমা: আল্লাহ সৃষ্টির মাঝে যা ইচ্ছা বৃদ্ধি ঘটান এবং যাকে ইচ্ছা স্বীয় রহমত দ্বারা বিশেষিত করেন। আর তিনি তো মহা দানশীল ও মহাজ্ঞানী।)