📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 পূর্বসূরীদের জীবনী ও গ্রন্থভাণ্ডার অধ্যয়ন

📄 পূর্বসূরীদের জীবনী ও গ্রন্থভাণ্ডার অধ্যয়ন


কোন কোন মনীষী তাঁর শাগরিদদেরকে উপদেশ দিয়ে বলতেন, তোমরা যখন দরস থেকে বের হবে তখন একাকী বাড়ী অভিমুখে চলবে। কেননা, একাকী হলে হয়ত তোমাদের কেউ তেলাওয়াত করতে করতে বাড়ী যাবে আবার কেউ ভাল কোন ভাবনায় সময়টা পার করবে। কিন্তু একত্রে থাকলে কথাবার্তা বলতে বলতেই সময়টা চলে যাবে।
প্রিয় পাঠক! এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ কর। একটু সজাগ হও, সতর্ক হও। বুঝতে চেষ্টা কর, সময় কিন্তু হেলায় কাটানোর মত বা অপচয় করে নষ্ট করার মত স্বল্পমূল্যের কোন বস্তু নয়। সময় হল অমূল্য রত্ন। পৃথিবীর কোন কিছুই তার বিনিময় হতে পারে না।
একটি সহীহ হাদীছে আছে; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
من قال سبحان الله العظيم وبحمده، غُرِسَتْ لَهُ بها نخلة في الجنة
অর্থ: যে (একবার) বলবে, "সুবহানাল্লাহিল আযীম ওয়া বিহামদিহি” তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছ রোপণ করা হবে।২৭
তাহলে একটু ভেবে দেখ, প্রতিদিন কত সময় আমরা নষ্ট করছি। কত বিশাল ছাওয়াব আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
মূলত জীবনের দিনগুলো তো হল চাষ ক্ষেত্র। সুতরাং কোন জ্ঞানী লোকের জন্য কি এ সময়ে বীজ বপন না করে, তার প্রতি সজাগ ও সযত্ন না হয়ে অলস বসে থাকা উচিৎ?
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এমন কিছু কাজ রয়েছে যেগুলোর মাধ্যমে আমরা সহজেই সময়ের হেফাযত ও মূল্যায়ন করতে পারি। যেমন, যথা সম্ভব একাকী ও নিঃসঙ্গ থাকা। (মানুষের সাথে) সাক্ষাতকালে শুধু সালাম ও গুরুত্বপূর্ণ কথার মধ্যেই সাক্ষাতকে সংক্ষিপ্ত করা, আর কম খাদ্য গ্রহণ করা। কেননা, আহার বেশী হলে ঘুমও বেশী হবে! অলসতাও বাড়বে। ফলে রাত দিন কর্মহীনতায় কেটে যাবে।
আমাদের পূর্বসূরীদের সবর ও হিম্মত এবং ধৈর্য ও সংকল্প ছিল অনেক উচ্চস্তরের। এর সর্বোৎকৃষ্ট প্রমাণ হল- তাঁদের সুবিশাল রচনা সম্ভার। যেগুলো তাঁদের জীবনকালে অর্জিত জ্ঞান ভাণ্ডারের সারনির্যাস। তাঁদের একেকজন এত অধিক পরিমাণে লিখেছেন এবং এমন ব্যাপ্ত গ্রন্থভাণ্ডার গড়ে তুলেছেন, যা পর্বতসম মনোবল ও সমুদ্রসম অধ্যয়ন ব্যতীত কোনভাবেই সম্ভব নয়।
তবে আফসোসের বিষয় হল, তাদের সেই বিপুল গ্রন্থসম্ভার, সমৃদ্ধ জীবন ও সুব্যপ্ত জ্ঞানের নির্যাস আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। বলা যায়, অধিকাংশই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর মূল কারণ হল, বর্তমান ছাত্রদের প্রত্যয় ও মনোবলের অবস্থা।২৮ যা আজ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। আজ তারা সংক্ষিপ্ত থেকে সংক্ষিপ্ততম কিতাবের প্রতি আগ্রহী। কত স্বল্প ও সীমিত অধ্যয়নে মূল বিষয়ে একটু জ্ঞান লাভ করতে পারে সে চিন্তায় ব্যস্ত। এতেই তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সুদীর্ঘ গ্রন্থগুলি অধ্যয়নের সাহস করা তো বহু দূরের কথা।
তাদের অধঃপতন এটুকু হলেও না হয় কোন রকম মেনে নেয়া যেত। কিন্তু এখন তারা সেই মুখতাছার ও সংক্ষিপ্ত গ্রন্থগুলোরও অংশ বিশেষ পড়ে; সম্পূর্ণ নয়। নির্দিষ্ট কয়েকটি অধ্যায় পড়ে মাত্র, কিংবা তারও অংশ বিশেষ। যার ফল এই দাঁড়িয়েছে যে, যুগের পর যুগ ছাত্রদের অবস্থানুপাতে কিতাব সংক্ষিপ্ত থেকে সংক্ষিপ্ততর হয়ে চলেছে। ফলে পূর্বসূরীদের সেই সব গ্রন্থভাণ্ডার আজ বিলুপ্ত প্রায়। যৎসামান্য আছে তা-ও কোন সংরক্ষিত গ্রন্থশালার কাচের বেষ্টনিতে দর্শনীয় বস্তু হয়ে।
এখন যদি কোন তালিবে ইলম নিজের ইলমী উন্নতি ও অগ্রগতি কামনা করে এবং উৎকর্ষ অর্জন করতে চায় তবে তার কাজ হবে, পূর্ববর্তী মনীষীগণের সেই গ্রন্থসম্ভার অন্বেষণ করা, বিরল ও বিলুপ্ত প্রায় কিতাবগুলো খুঁজে বের করা এবং অধিক থেকে অধিকতর অধ্যয়নে মগ্ন ও নিমগ্ন থাকা। তখনই সে মনীষীগণের জ্ঞানের গভীরতা ও মনোবলের উচ্চতা উপলব্ধি করতে পারবে, যা তার চিন্তা-চেতনাকে শাণিত করবে, হৃদয় ও আত্মাকে আন্দোলিত করবে এবং এপথের মেহনত ও মুজাহাদায় এবং চেষ্টা ও সাধনায় তাকে উদ্বুদ্ধ করবে।
বর্তমানে আমরা যাদের দেখি এবং যাদের সাথে চলাফেরা করি তাদের আচরণ ও উচ্চারণ এবং জীবন বৃত্তান্ত থেকে আমি নিজেও আল্লাহর আশ্রয় চাই। তাদের মাঝে না আছে দৃঢ় সংকল্প ও উচ্চ মনোবল, যার অনুসরণে তালেবে ইলমগণ ফায়দা হাসিল করতে পারে। আর না আছে তাকওয়া ও পরহেযগারী, যা থেকে দুনিয়া-বিমুখ আবেদ উপকৃত হতে পারে।
তাই আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, তোমরা পূর্ববর্তী মনীষীগণের জীবনী পাঠ কর, তাঁদের গ্রন্থগুলো অধ্যয়ন কর। কেননা, তাঁদের কিতাবগুলো অধিক হারে অধ্যয়ন করা তাঁদেরকে দেখারই নামান্তর। তাইতো কবি বলেন,
فاتني أن أرى الديار بطرفي فلعلى أرى الديار بسمعى
সেসব গৃহনিবাস আমার চোখে দেখা হয়নি, হয়তোবা শ্রবণ দ্বারাই আমি তার দর্শন পাব।২৯

টিকাঃ
২৭ জামে' তিরমিযী; ৫:১১৫
২৮ যা মূলত তলব বা অন্বেষার দুর্বলতারই নামান্তর।
২৯ অর্থাৎ, তাদের বাড়ী-ঘরের বর্ণনা শোনার দ্বারা কল্পনায় হলেও তা আমার দেখা হয়ে যাবে।

📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 হাদীছের জন্য তাঁর অস্থিরতা

📄 হাদীছের জন্য তাঁর অস্থিরতা


স্মৃতিশক্তির এত প্রখরতা সত্ত্বেও হাদীছের হেফাযত ও সংরক্ষণের জন্য ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা অবিকৃতরূপে পৌঁছে দেয়ার জন্য তিনি অত্যন্ত সজাগ ও সতর্ক ছিলেন। তাই তাঁর শ্রুত হাদীছগুলোর অনুলিপি তাঁর কাছে পৌঁছতে দেরী হওয়ায় তিনি অস্থির হয়ে পড়েছিলেন এবং তা হাতে পাওয়া পর্যন্ত অস্থির-উদ্বিগ্ন ছিলেন। এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা বর্ণনা করে তাঁর পুত্র হাফেজ আবু মুহাম্মাদ আল-কাসেম বলেন, আমার আব্বা এমন বহু হাদীছ, এমন অনেক কিতাব শুনেছেন যেগুলো তিনি নিজে লিখে রাখেননি এবং সেগুলোর কোন অনুলিপি সংগ্রহ করেন নি। সে ক্ষেত্রে তিনি তার সফরসঙ্গী আবু আলী ইবন ওযীরের অনুলিপির উপর নির্ভর করতেন। কারণ তাদের দু'জনের মাঝে এমন একটা সমঝোতা ছিল যে, যা ইবন ওযীর নকল করতেন সেগুলো আমার আব্বা করতেন না। আর যেগুলো আমার আব্বা নকল করতেন সেগুলো ইবন ওযীর করতেন না।
একবার আমি কোন এক চাঁদনী রাতে জামে মসজিদে বসে আব্বার কথা শুনতে পেলাম, তিনি তাঁর এক সাথীকে আফসোসের সাথে বলছেন, আমার অনেক সফর তো এমন, যেগুলো আমি করেও যেন করিনি। অনেক হাদীছ ও হাদীছের গ্রন্থ এমন, যেগুলো আমি শুনেও যেন শুনিনি। কেননা, সেগুলোর কোন অনুলিপি বা কপি আমার সংগ্রহে নেই। আমি ভেবেছিলাম, আমার সফরসঙ্গী ইবন ওযীর বুখারী, মুসলিম, বায়হাকী ইত্যাদি কিতাব ও বিভিন্ন কিতাবের অংশ বিশেষসহ আমার শ্রুত অন্যান্য হাদীছের অনুলিপি আমার কাছে নিয়ে আসবেন। কিন্তু আফসোস, ঘটনাক্রমে তিনি 'মারভে' বসবাস করতে লাগলেন এবং সেখানের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেলেন।
এরপর আমি অনেক আশা করছিলাম একজন নতুন সফরসঙ্গী যার নাম ইউসুফ বিন ফারওয়া আল-জিয়ানী এবং পুরোনো এক সফরসঙ্গী আবুল হাসান আল-মুরাদীর সাক্ষাত লাভের। কেননা, ইলম ও হাদীছ অর্জন ও সংরক্ষণে তার আগ্রহ ছিল প্রবল। একবার তিনি আমাকে বলেছিলেন, "আমি একবার দামেস্কে সফর করলাম। পরে নিজের দেশ আন্দালুসে ফিরে দেখলাম, এ এলাকার কেউ দামেস্কে সফর করে না। অথচ সেখানে যেমনি রয়েছে হাদীছের ব্যাপক চর্চা, তেমনি রয়েছে ইলমের বিশাল বিশাল ভাণ্ডার। তখন আমার মনে হলো, আবার আমাকে দামেস্কে সফর করতে হবে, অর্জন করতে হবে বড় বড় কিতাব এবং দামেস্কের মূল্যবান ও বিরল জ্ঞান।"
আব্বাজীর এমন আফসোস ও ব্যথিত মনের এসব কথা বলার কিছু দিন পরই তাঁর এক সাথী আমাদের এলাকায় এলেন। খবর পাওয়া মাত্র আব্বা ছুটে গেলেন তাঁর কাছে। তাঁকে আমাদের ঘরে নিয়ে এলেন। তিনি আমাদের কাছে তাঁর শ্রুত হাদীছের চার থলে ভর্তি কিতাব নিয়ে এলেন, আব্বা এতে অত্যন্ত প্রীত হলেন। কষ্ট-ক্লেশহীনভাবে আল্লাহ এ সম্পদ তাঁর হাতে এনে দিয়েছেন বলে তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন এবং তাঁর সে সাথীর সফরের পূর্ণ ব্যয়ভার নিজেই বহন করলেন এবং সেগুলো থেকে নিজের শ্রুত হাদীছগুলো অনুলিপি করতে শুরু করলেন। একেকটি খণ্ড যখন হাতে নিতেন, তিনি এতটাই আনন্দিত ও পুলকিত হতেন, এতই তৃপ্ত ও পরিতৃপ্ত হতেন, মনে হত যেন তিনি সারা দুনিয়ার রাজত্ব হাতে পেয়ে গেছেন। (এ পর্যন্তই হল তিনটি কিতাব থেকে উদ্ধৃত হাফেয ইবন আসাকির র. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী।)

📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 উপযুক্ত সময়ের প্রতি গুরুত্ব প্রদান

📄 উপযুক্ত সময়ের প্রতি গুরুত্ব প্রদান


প্রিয় পাঠক! এ জীবনীতে তুমি আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর যা কিছু পেয়েছো, হতবুদ্ধিকর ও প্রায় অসম্ভব যে কর্মযজ্ঞের কথা জেনেছো, তার কিছুই সম্ভবপর হত না এবং কোন কিছুই ঘটত না যদি তিনি সময়ের সদ্ব্যবহার না করতেন, প্রতিটি ক্ষণ ও মুহূর্তের মূল্যায়ন না করতেন। না হতো এতো সব হাদীছের সংরক্ষণ, আর না হতো এমন বিশাল বিশাল গ্রন্থ সংকলন, যার বিশালতাই বলে দেয়- বর্তমান যুগের কোন ইলমী একাডেমীও তা ছাপতে হিমশিম খাবে, সংকলন তো অনেক দূরের কথা।
সুতরাং হে বন্ধু! সময়ের সদ্ব্যবহার কর, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের যথার্থ মূল্যায়ন কর। কেননা, এই সময়ই তো হল কল্যাণ ও প্রাচুর্যের উৎস। তুমি যত পার তা থেকে প্রাচুর্য অর্জন কর, যত পার কল্যাণ সংগ্রহ কর।
সময়ের সদ্ব্যবহার ও তার যথাযথ মূল্যায়নকারী মনীষীগণের খণ্ড জীবনীর আলোচনায় কিতাবটি এখানেই সমাপ্ত হতে পারতো। কিন্তু আমি চাচ্ছি এর পরিসমাপ্তি খানিকটা বিলম্বিত করতে; সময় সংরক্ষণের কিছু কার্যকর পথ ও পন্থার আলোচনার পরে।
সময় ব্যয়ের ক্ষেত্রে যেদিকে দৃষ্টি দেয়া বিশেষ প্রয়োজন তা হল, ইলমী কাজগুলোকে সেগুলোর গুরুত্ব ও মর্যাদা হিসেবে উপযোগী সময়ে আঞ্জাম দেয়ার চেষ্টা করা।
কিছু ইলমী কাজ রয়েছে যে কোন সময়ে, যে কোন পরিস্থিতিতে সেগুলো আদায় করা যায়। সেগুলোর জন্য খুব বেশী মনোযোগ ও সতর্কতার প্রয়োজন হয় না। যেমন, কোন কিছুর অনুলিপিকরণ, কিংবা সাধারণ মুতালা'আ ও অধ্যয়ন। এসব কাজে সজাগ মস্তিষ্ক, পূর্ণ সতর্কতা কিংবা সূক্ষ্ম ও গভীর চিন্তা-ভাবনার দরকার হয় না।
পক্ষান্তরে কিছু কাজ এমন রয়েছে, যেগুলো এমন সময় ছাড়া পূর্ণরূপে আঞ্জাম দেয়া যায় না, যখন মস্তিষ্ক সজাগ ও সক্রিয় থাকে, মেধা ও মেজায প্রফুল্ল থাকে, যখন মৃদুমন্দ সমীরণ প্রবাহিত হয় আর আসমান থেকে বরকত নাযিল হয়। যেমন, খুব ভোরে, রাতের শেষ প্রহরে, কিংবা সকালে ও রাতে যখন সময়ের নীরবতা ও স্থানের নির্জনতা একাকার হয়ে যায়। কোন কিছু মুখস্থ করার জন্য, কঠিন ও জটিল বিষয় বোঝার জন্য, সূক্ষ্ম ও জটিল সমস্যার সমাধানের জন্য কিংবা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভুল ও বিকৃতির সংশোধনের জন্য এসকল সময়ের সদ্ব্যবহার করা প্রয়োজন।

📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 উপযোগী স্থান নির্বাচন

📄 উপযোগী স্থান নির্বাচন


হাফেয খতীব বাগদাদী র. তাঁর الفقيه والمتفقه নামক গ্রন্থে হেফয (মুখস্থ) করার সর্বোত্তম সময় ও তার জন্য উপযোগী স্থানের ব্যাপারে আলোচনা করতঃ উল্লেখ করেন, "জেনে রাখ! কোন কিছু মুখস্থ ও আয়ত্ত করার কতক নির্ধারিত সময় ও নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। যারা কোন কিছু হিফয বা মুখস্থ করতে চায় এবং অল্প সময়ে বেশী কিছু আয়ত্ত করতে চায়, তাদের উচিৎ উল্লিখিত সময়গুলোকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা এবং সে স্থানগুলোতে সর্বদা অবস্থানের চেষ্টা করা।
হেফযের উপযুক্ত সময়গুলো হল, রাতের শেষ প্রহর বা সাহরীর সময়। অতঃপর দিনের প্রথম ভাগ, তারপর দিনের অন্যান্য সময়। তবে দিনের চেয়ে রাত এবং পরিতৃপ্তির মুহূর্ত থেকে ক্ষুধার মুহূর্ত, হিফযের জন্য অধিক উপযোগী। তাই হেফযকারী বা হেফয প্রত্যাশীর জন্য ক্ষুধার সময়গুলোর খোঁজে থাকা এবং সে অবস্থাকে নিজের মাঝে ধরে রাখায় সচেষ্ট থাকা উচিৎ। তবে তা হতে হবে অবশ্যই বিবেক চালিত; আবেগ-তাড়িত নয়। এ কথাটুকু বলার কারণ হল, কোন কোন মানুষ যখন তীব্র ক্ষুধাক্রান্ত হয় এবং তার পাকস্থলী শূন্য হয়ে পড়ে তখন সে পড়ার শক্তি ও মুখস্থ করার সাহস হারিয়ে ফেলে। তখন কোনকিছু না হয় তার মুখস্থ, আর না পড়ায় তার মন বসে। সে সময় সামান্য কিছু খেয়ে শুধু ক্ষুধার যন্ত্রণা দূর করবে। তবে কিছুটা ক্ষুধা যেন বাকী থাকে। কিন্তু যদি ক্ষুধার জ্বালায় পেট পুরে খায় তবে তো তার কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত, প্রত্যাশিত সময় দীর্ঘক্ষণের জন্য হাতছাড়া হয়ে গেলে।
আর সবচে' উপযোগী স্থানগুলো হল, নিরিবিলি ও নির্জন স্থান। যেমন- উপরের তলার একক কোন কামরা বা কুঠুরি, লোকালয় দূরবর্তী কোন নির্জন স্থান, যে স্থানে মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটানোর কিছু নেই। যেখানে কলব সবরকম অন্যমনষ্কতা থেকে মুক্ত হবে। তাই বৃক্ষপূর্ণ সবুজ স্থানে বা নদীর পাড়ে ও পথের ধারে কোন কিছু মুখস্থ করার জন্য বসা অনুচিত। কারণ এসব স্থানগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে নীরব ও নির্ঝঞ্ঝাট হয় না।৩১
তবে এক্ষেত্রে মুসলিম দার্শনিক আবু নছর আল ফারাবী র. এর ছিল ভিন্ন পথ ও ভিন্ন মত, ভিন্ন চিন্তা ও ভিন্ন দর্শন। আওইয়াতে ইবন খাল্লিকান এই মহান দার্শনিকের জীবনী আলোচনা করে বলেন যে, "তিনি ছিলেন আত্মসমাহিত মানুষ। জনতার মাঝেও তিনি নির্জনতা খুঁজে পেতেন। নিজে সাধারণত কারও সাথে তেমন একটা মিশতেন না, বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া আলাপচারিতায় লিপ্ত হতেন না। তাছাড়াও রচনা ও সংকলনের মত গুরুত্বপূর্ণ কাজেও তাঁর নির্জন স্থানের প্রয়োজন হতো না। দীর্ঘকাল দামেস্কে অবস্থানের সময় প্রবহমান পানির ঝরণার পাশে বা কোন বাগানে বসে কিতাব রচনা করতেন, অথচ মানুষ একের পর এক সেখানে যাওয়া-আসা করত।
পূর্ববর্তী মনীষীগণ ইলম অন্বেষণের জন্য নির্জন ও কোলাহলমুক্ত স্থান ও পরিবেশ নির্বাচন করতেন। কেননা নীরবতা ও নির্জনতা চিন্তায় স্বচ্ছতা আনয়ন করে। আর চিন্তা-ভাবনা যখন স্বচ্ছ হয় তখন ইলমের তলবে ও জ্ঞানের অন্বেষণে উপলব্ধি ও বোধশক্তি সঠিক হয় এবং দৃষ্টিশক্তি ও পর্যবেক্ষণ একাগ্র হয়।

টিকাঃ
৩১. তেমনিভাবে বর্তমানে পার্ক বা মনোমুগ্ধকর দর্শনীয় স্থান। এসব স্থানগুলো যদিও সাহিত্যচর্চার জন্য উপযোগী কিন্তু হিফযের জন্য অনুপযোগী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00