📄 সময়ের গুরুত্ব ও মর্যাদার উপলব্ধি অপরিহার্য
ইমাম আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী র. : যার পুরো নাম হল আবদুর রহমান বিন আলী হাম্বলী বাগদাদী। তাঁর জন্ম ৫০৮ হিজরীতে এবং মৃত্যু ৫৯৭ হিজরীতে। জীবনকাল মোট ৮৯ বছর। তিনিও সময়ের সদ্ব্যবহারে ছিলেন পূর্ণসচেতন। যার ফলাফল এই যে, তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় পাঁচ শতাধিক।
আমরা তাঁর জীবনী থেকে অংশ বিশেষ এখানে উল্লেখ করছি। যেন পাঠক উপলব্ধি করতে পারেন, সময়ের গুরুত্ব ও মূল্যবোধ তাঁর মাঝে কী পরিমাণে ছিল আর কীভাবে তিনি সময়ের সদ্ব্যবহার করতেন, যখন কোন দর্শনার্থী বা সাক্ষাতপ্রার্থী তাঁর কাছে আসত কিংবা অলস ও অকর্মণ্য লোকেরা যখন তাঁর দরবারে ভিড় জমাত।
তিনি তাঁর সায়েদুল খাতির গ্রন্থে লিখেন- 'প্রতিটি মানুষের জন্য অপরিহার্য হল সময়ের গুরুত্ব ও মর্যাদা উপলব্ধি করা। প্রতিটি মুহূর্তকে কল্যাণকর এবং আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্তির কথা ও কাজে অতিবাহিত করা। উন্নত থেকে উন্নততর এবং উৎকৃষ্ট থেকে উৎকৃষ্টতর কথা ও কাজের ধারা অব্যাহত রাখা। সব সময় যদি কল্যাণকর কাজ করার সম্ভাবনা ও সুযোগ না-ও হয় সে ক্ষেত্রে অন্তত কল্যাণকর্মের নিয়ত রাখাতো কোন কষ্টসাধ্য বা অসম্ভব কিছু নয়। উম্মতের প্রতি দরদী নবীর দরদমাখা ঘোষণা কি তোমরা শুননি! نية المؤمن خير من عمله অর্থ : মুমিনের নিয়্যত তার কাজ থেকে উত্তম।
আমাদের পূর্বসূরীদের মাঝে এমন অনেকেই গত হয়েছেন যাঁরা সময়ের সদ্ব্যবহারে প্রতিযোগিতা করতেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হতেন। যেমন: আমের ইবন আবদে কায়স র., যিনি ছিলেন দুনিয়াবিমুখ ও পরহেযগার তাবেয়ীদের অন্যতম। তাঁর সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, একবার এক ব্যক্তি তাকে বললো, ভাই একটু দাঁড়ান, আপনার সাথে কথা বলব। তিনি বললেন, সূর্যকে ধরে রাখ, তোমার সাথে কথা বলি।
📄 সময়ের সাথে মানুষের অবহেলার আচরণ
(ইবনুল জাওযী র. আরও বলেন) আমি তো দেখি, প্রায় সকল মানুষই সময়ের সাথে বড় অবহেলার আচরণ করে, ঘোর উন্মাদনার সাথে এর অপচয় করে। যখন রাত বড় থাকে তখন তা কাটায় বেহুদা কথা-বার্তা ও আলাপ-আড্ডায় কিংবা প্রেম-প্রণয় বা গল্প গুজবের বই পড়ে। আর যখন দিন বড় থাকে তখন রাতটা তো ঘুমেই কাটিয়ে দেয়। আর দিনের এক বৃহৎ অংশ তারা দজলার পাড়ে বিনোদনে বা হাট-বাজারে অনর্থক কাটিয়ে দেয়। তাদের অবস্থাতো অকূল দরিয়ায় ভাসমান আরোহীদের মত, যারা বসে আড্ডায় মত্ত, তাদের না আছে গন্তব্যের চিন্তা আর না আছে পাথেয়ের ভাবনা।
জীবনকে মূল্যায়ন করে, অস্তিত্বকে উপলব্ধি করে এবং শেষ সফরের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করে প্রস্তুত থাকে, এমন মানুষের সংখ্যা আজ অতি অল্প, প্রায় দুষ্প্রাপ্য।
আল্লাহর ওয়াস্তে তোমরা সময়ের পরিচয় অর্জন ও উপলব্ধি কর। হাতছাড়া হওয়ার আগে তার যথার্থ মূল্যায়ন কর। এ থেকে সর্বোচ্চ উপকার লাভের চেষ্টা কর। আমি তো বলতে চাই যে, তোমরা এর সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে পড়। আর আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর, ইনশাআল্লাহ সফলতা আসবেই।
📄 খেদমত ও সাক্ষাতের নামে সময়ের অপচয়
তিনি (ইবনুল জাওযী র.) বলেন, প্রায়ই আমি অনেক মানুষকে দেখি, অধিক মানুষের সাক্ষাত লাভের আশায় তারা দিন-রাত আমার সাথে ছোটাছুটি করে। আর একে তারা নাম দিয়েছে 'খেদমত'। কত দীর্ঘ সময় তারা অলস বসে থাকে! কত মানুষের কত রকম কথা তারা বলে! এমনকি কখনো গীবত ও পরচর্চায়ও লিপ্ত হয়ে পড়ে।
কখনো এমনও দেখা যায় যে, লোকজন যার সাক্ষাতপ্রার্থী তিনিও এটা কামনা করেন এবং এতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। আর নীরবতা ও একাকিত্বকে অপছন্দ করেন, এতে অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। বিশেষ করে বিভিন্ন উৎসব বা ঈদের দিনগুলোতে, তখন তো তারা একে অপরের সাক্ষাতে যায়, একত্রে ঘুরতে বের হয়, এটাও যদি সালাম ও মোবারকবাদ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকত তবে কথা ছিল, বরং তারা এতে বহু সময় নষ্ট করে, নির্দয়ের মত সময়ের অপচয় করে। হে আল্লাহ! এই অকর্মণ্য ও বেকার মানুষগুলো থেকে আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ তা'আলা যেহেতু আমাকে এই বুঝ ও উপলব্ধি দান করেছেন যে, পৃথিবীতে সময় হল সবচেয়ে' গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান সম্পদ এবং তাকে কল্যাণ কাজেই ব্যবহার করা আবশ্যক, তাই তাদের এ সমস্ত কার্যকলাপকে আমি অপছন্দ করি।
তবে তাদের সাথে আমার আচরণ হয় মধ্যপন্থী। কেননা, যদি তাদেরকে একেবারে প্রত্যাখ্যান করি তবে সেটা তো আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করা বা পরিচিতদেরকে দূরে ঠেলে দেয়ার নামান্তর হবে। আর তাদের এসব মেনে নিলে অমূল্য সময়-সম্পদ নষ্ট হবে। তাই আমি যথাসম্ভব দেখা-সাক্ষাতকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। যখন একান্তই বাধ্য হই, কথাকে খুবই সংক্ষিপ্ত করি যেন তাড়াতাড়ি এ পর্ব শেষ হয়ে যায়। অথবা এমন কিছু কাজ সবসময় প্রস্তুত রাখি যা করলেও সাক্ষাতকালে কথাবার্তায় কোন ব্যাঘাত ঘটে না। যেমন: কাগজ কাটা, কলম ঠিক করা, খাতা-পত্র বেঁধে রাখা; এগুলো তো আমাকে করতেই হয়, তবে চিন্তা-ভাবনা বা 'হুযুরে কালবে'র দরকার হয় না। ফলে সাক্ষাতেও আমার সময় নষ্ট হয় না, বেকার কাটে না।
সঠিক বুঝ তো শুধু ভাগ্যবানরাই লাভ করেন
দুনিয়াতে এমন মানুষ অনেক রয়েছে যারা প্রকৃতপক্ষে জীবনের অর্থই বোঝে না। এমন বহু লোককে আমি দেখেছি, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা অঢেল ধন-সম্পদের প্রাচুর্য দ্বারা কামাই-রোযগার থেকে বে-নিয়ায করেছেন। তার পরও তারা সারাদিন বাজারে অলস বসে থাকে, লোকদের দিকে তাকিয়ে থাকে, আর তাদের চারপাশে ঘটমান বিভিন্ন আপদ-বিপদ বা গর্হিত ও নিকৃষ্ট কাজ-কর্মের দর্শক হয়ে বসে থাকে।
তাদের কেউ কেউ তো দাবা-পাশা ইত্যাদি খেলায় ডুবে থাকে। কেউ তো গল্পগুজব ও আড্ডাবাজিতে দিন কাটায়; হয়ত রাজা বাদশাহদের অলীক ঘটনা বলবে কিংবা কোন মিথ্যা রটনা রটাবে অথবা জিনিসপত্রের মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধির অনর্থক বর্ণনা দেবে। আমার তখন বুঝে আসে, জীবনের মর্যাদার অনুভূতি এবং সময়ের গুরুত্ব উপলব্ধি অনেক বড় নি'আমাত, এ নি'আমাত সবাই প্রাপ্ত হয় না। শুধু আল্লাহ যাদেরকে তাওফীক দেন, আর বুঝ ও উপলব্ধি দান করেন তারাই পায়।
আমরা শুধু আল্লাহর কাছে চাইতে পারি, আল্লাহ যেন আমাদেরকে الذين أنعمت عليهم এর দলে শামিল করেন এবং তাদের পথে পরিচালিত করেন। আমীন।
(وما يُلقاها إلا ذو حظ عظيم)
টিকাঃ
২৬ আর এটাই স্বাভাবিক যে, অলস সময় যারা কাটায় এবং অযথা আলাপ চারিতায় লিপ্ত থাকে তারা এক সময় প্রতারণা ও পরনিন্দায় লিপ্ত হয়েই পড়ে।
📄 সময়ের হেফাযতে কৃত্রিমতা বর্জন
নিজের কথা গুণে রাখতেন যিনি
সালফে সালেহীন, তথা নেককার পূর্বসূরীগণ তো সময়ের ব্যাপারে সদা-সতর্ক থাকতেন, সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারে সচেষ্ট থাকতেন। আর সজাগ থাকতেন, যেন একটি মুহূর্তও নষ্ট না হয়।
ফুযায়ল ইবন ইয়ায বলেন, আমি তো এমন ব্যক্তি সম্পর্কেও জানি, যিনি সময় বাঁচানোর তাগাদায় এক জুম'আ থেকে পরের জুম'আ পর্যন্ত নিজের কথাগুলো গুণে রাখতেন। (হয়তবা পরবর্তী সপ্তাহে কথার পরিমাণ কমানোর জন্য এবং আমল ও কাজের পরিমাণ বাড়ানোর জন্যই এই হিসাব। বাকী আল্লাহ ভাল জানেন। - অনুবাদক)
সময়ের হেফাযতের জন্য পূর্ববর্তীগণ লৌকিকতা ও কৃত্রিমতা থেকে দূরে থাকতেন। তাদের জীবনীতে এমন বহু ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।
এক বুযুর্গের দরবারে কিছু লোক এল তাঁর সাক্ষাত প্রত্যাশায়। (কৃত্রিমতার আশ্রয় নিয়ে) তারা বলল, আমরা বোধহয় হযরতের কাজে ব্যাঘাত ঘটালাম। তখন তিনি (নিঃসংকোচে) বললেন, সত্য বলতে কি, আমি একটি কিতাব মুতালা'আ করছিলাম, তোমাদের জন্য তা রেখে উঠে আসতে হল।
*****
এক বুযুর্গ 'সারীসাক্তী' এর কাছে এলেন। দেখতে পেলেন একদল লোক তার কাছে বসে আছে। তখন তিনি বললেন, তুমি তো অলস ও অকর্মণ্যদের আড্ডার স্থল হয়ে গেছো। একথা বলে তিনি সেখান থেকে চলে গেলেন।
মানুষ যার সাক্ষাতপ্রার্থী হয় তিনি যদি নরম মনের হন এবং কিছুটা শিথিলতা প্রদর্শন করেন তবে সেই সাক্ষাতপ্রার্থী আরও আগ্রহী হয়ে ওঠে। বলা যায়, জেঁকে বসে। দীর্ঘ সময় ধরে তার কাছে পড়ে থাকে। তখন তো সাক্ষাত প্রার্থিত ব্যক্তি কোন না কোন অসুবিধার শিকার হনই। মারূফ কারখী র.-এর দরবারে একদল লোক এসে দীর্ঘক্ষণ ধরে বসে রইল। অবশেষে তিনি (বিরক্ত হয়ে) বলেই ফেললেন, 'আল্লাহ তো সূর্যের গতিকে থামিয়ে দেননি; তাহলে তোমরা কখন উঠতে চাও?'