📄 সন্তানের মৃত্যুতেও মাদরাসা থেকে বের হননি যিনি
ইমাম তাজউদ্দিন সুবকী طبقات الشافعية الكبرى গ্রন্থে হাফেয মুনযিরী র. এর জীবনীতে লিখেন, "শেষ জীবনে তিনি উচ্চতর বিভাগে হাদীছের দরস দিতেন। শুধু জুম'আর নামায ছাড়া কখনো তিনি মাদরাসা থেকে বের হতেন না। রশিদ উদ্দিন আবু বকর মুহাম্মাদ নামে তাঁর এক ছেলে ছিল। তিনিও ছিলেন উচ্চস্তরের মুহাদ্দিছ এবং অত্যন্ত মেধাবী ও প্রতিভাবান আলিম। পিতার জীবদ্দশাতেই আল্লাহ এই ছেলেকে নিয়ে গেলেন। (হয়ত তাঁর এই বান্দাকে পরীক্ষা করার জন্য এবং বহুগুণ মর্যাদা ও মর্তবা বৃদ্ধির জন্য কিংবা হয়ত অন্য কিছুর জন্য! আল্লাহর হেকমত বোঝার সাধ্য কার আছে, তিনি যাকে বোঝান সে ছাড়া!) ৬৪৩ হিজরীতে তিনি (রশীদ উদ্দীন) ইন্তেকাল করলেন। শায়খ মুনযীরী মাদরাসার ভিতরেই তাঁর জানাযা পড়লেন। এরপর দরজা পর্যন্ত, শুধু মাদরাসার দরজা পর্যন্ত এগিয়েই তাকে বিদায়, চির-বিদায় জানালেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে শুধু বললেন- "আল্লাহর হাতে তোমাকে সঁপে দিলাম।" এটুকু বলেই তিনি চলে এলেন; মাদরাসার সীমানা থেকে বের হননি।
মৃত্যুর দিনও কবিতা পঙ্ক্তি মুখস্থকরণ
বিশিষ্ট ইমামদের মধ্যে যারা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যায়ন করেছেন, এমনকি জীবনের অন্তিম মুহূর্তে ও মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও যারা ইলম অন্বেষণে ব্যস্ত থেকেছেন, তাদের একজন হলেন আরবী ব্যাকরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কিতাব الألفية এর লেখক, ইমাম ইবন মালেক মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ (৬০০-৬৭২ হিজরী)।
نفح الطيب গ্রন্থে তাঁর জীবনী সংকলক উল্লেখ করেন- "তিনি অত্যধিক মুতালা'আ করতেন এবং যে কোন কিছু লেখার আগে বারবার পুনপঠন ও পুননিরীক্ষণ করতেন। অতি নির্ভরযোগ্য হাদীছ বর্ণনাকারীদের মত যেকোন বিষয় মূল থেকে যাচাই না করে সে বিষয়ে কলম ধরতেন না। সারাদিন সময়কে তিনি এতটাই হেফাযত করতেন যে, যখনই তাঁকে দেখা হত, হয়ত তিনি নামায পড়ছেন বা তেলাওয়াত করছেন কিংবা কিছু লিখছেন বা পড়ছেন।
একবার তিনি তাঁর কতক শাগরিদসহ দামেস্ক সফরে গেলেন। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে যখন তারা গন্তব্যে পৌঁছলেন, তখন সাথীরা আপন আপন কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। ফলে কিছুক্ষণের জন্য তারা তাঁর কথা ভুলে গেলেন। পরে যখন তারা তাঁকে খুঁজলেন, পেলেন না। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর তাঁকে পাওয়া গেল এবং দেখা গেল, কয়েকটি পৃষ্ঠার দিকে তিনি ঝুঁকে আছেন। নিবিষ্টচিত্তে মুতালা'আ করছেন।
আমি সবচে' আশ্চর্য হই, ইলমের প্রতি তাঁর গুরুত্বারোপ ও মনোযোগের এই ঘটনা থেকে যে, মৃত্যুর দিনও তিনি কতগুলো পঙ্ক্তি মুখস্থ করছিলেন। অসুস্থতার কারণে উঠতে পারছিলেন না। তাঁর ছেলে সেগুলো তাঁকে বলে দিচ্ছিলেন আর তিনি মুখস্থ করছিলেন। কারো কারো মতে তিনি সেদিন আটটি পঙ্ক্তি মুখস্থ করেছিলেন। এ যেন এই (আরবী) প্রবাদের বাস্তব নমুনা-
بقدر ما تتعنى تنال ما تتمنى -
অর্থ: যতটুকু কষ্ট সইবে, (আকাঙ্ক্ষালাভে) ততটুকুই সফলতা পাবে।
তিনি ৬৭২ হিজরীতে দামেস্কে ইন্তেকাল করেন, কাসিয়ূন পাহাড়ের পাদদেশে তাঁকে দাফন করা হয়। এখনো তাঁর কবর সেখানে চিহ্নিত আছে।” আল্লাহ তাঁকে উত্তম বিনিময় দান করুন (আমীন)।
📄 প্রায় দু’বছর যাঁর পিঠ যমিনের স্পর্শ পায়নি
হাফেয যাহাবী تذكرة الحفاظ গ্রন্থে ইমাম নববী র. এর জীবনীতে লিখেন, "তাঁর নাম ইয়াহইয়া ইবন শারাফ ইবন মুররি। উপনাম মুহয়দ্দিন আবু যাকারিয়া। তিনি শায়খুল ইসলাম ও 'আলামুল আওলিয়া (ওলীগণের ঝাণ্ডা) উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। বহু বিষয়ে বহু গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন। তাঁর জন্ম ৬৩১ হিজরীতে হাওরান এলাকার নাওয়া নামক জনপদে। ১৮ বছর বয়সে ৬৪৯ হিজরীতে তিনি দামেস্কে আগমন করেন এবং 'মাদরাসায়ে রাওয়াহিয়্যা'য় অবস্থান গ্রহণ করেন। সুদীর্ঘকাল যাবৎ মাদরাসা-প্রদত্ত রুটিই ছিল তাঁর একমাত্র আহার।
তিনি (ইমাম নববী র.) বলেন, "প্রায় দু'বছর আমার এভাবে কেটেছে যে, আমার পিঠ যমিনের (বিছানার/শয্যার) স্পর্শ পায়নি।"
এই সময়ে তিনি সাড়ে চার মাসে التنبيه মুখস্থ করেছেন আর বাকী সময়ে المهذب গ্রন্থের এক চতুর্থাংশ তাঁর শায়খ ইসহাক বিন আহমদ র. এর কাছে পড়েছেন এবং মুখস্থ করেছেন।
ইমাম নববীর শাগরেদ, আমাদের শায়খ আবুল হাসান বিন আত্তার র. বলেছেন, "শায়খ মুহয়দ্দিন প্রতিদিন তাঁর উস্তাযগণের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ বারটি দরস গ্রহণ করতেন। উলূমুল ফিকহে الوسيط গ্রন্থ থেকে দু'দরস, ফিকহে المهذب থেকে এক দরস, সহীহায়ন থেকে উলূমুল হাদীছ বিষয়ে এক দরস, এছাড়া সহীহ মুসলিম থেকে, আরবী ব্যাকরণ শাস্ত্রে ইবনে জিন্নি'র للمع গ্রন্থ থেকে, ভাষা শাস্ত্রে إصلاح المنطق থেকে, ছরফ শাস্ত্র থেকে, উসূলে ফিকহ থেকে, কখনো আবু ইসহাক এর اللمع গ্রন্থ থেকে, আবার কখনো ফখরুদ্দীন রাযী এর المنتخب থেকে এবং আসমাউর রিযাল থেকে উসূলে দ্বীন থেকে, এবং নাহবশাস্ত্র থেকে স্বতন্ত্র একটি করে দরস।
তিনি (ইমাম নববী র.) বলেন, "আমার এ সকল দরসের সাথে সম্পৃক্ত যত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও আলোচনা-পর্যালোচনা থাকত সব আমি নোট করে রাখতাম"।
দিনে-রাতে শুধু একবেলা খাবার গ্রহণ
আবুল হাসান ইবনুল আত্তার আরও বলেন, শায়খ (ইমাম নববী) আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট করতেন না। দিনে বল বা রাতে, সব সময় তিনি পড়ালেখায় مগ্ন থাকতেন। এমনকি পথ চলার সময়ও তিনি হয় একাকী অধ্যয়ন করতেন অথবা কারও সাথে ইলমী আলোচনা করতেন। এটাকে তিনি প্রায় অভ্যাস বানিয়ে নিয়েছিলেন। এ অবস্থায় কাটল প্রায় ছ'বছর। এরপর তিনি কিতাব রচনা, অধ্যাপনা ও ওয়াজ-নসিহতের পথে অগ্রসর হলেন। তখনও তিনি এমনভাবে সময়ের সদ্ব্যবহার করতেন যে, দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টায় শুধু ইশার পর এক বেলা খাবার গ্রহণ করতেন এবং সেহরীর সময় তরল কিছু পান করে নিতেন। আড়ম্বরপূর্ণ খাবার কিংবা ফলমূল তিনি খেতেন না। বলতেন, এতে দেহে অলসতা ঠাঁই পাবে এবং ঘুম বেশী হবে। এমনকি সময়ের হেফাযতের জন্য তিনি বিবাহ থেকেও বিরত থেকেছেন।
তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন। পানাহারে, পোশাক-পরিচ্ছদে, এক কথায় জীবনের সকল ক্ষেত্রে তিনি নিজের প্রতি- বলতে হয়- কঠোরতা করতেন। নিয়মিত ইলমী ব্যস্ততা, তাদরীস, তাছনীফ, ইবাদত-বন্দেগী ও ওযীফা আদায় এবং লাগাতার রোযা রাখা সত্ত্বেও তার খাবার-দাবার ছিল অতি সাধারণ। পোশাক ছিল সস্তা ও সাধারণ কাপড়ের, আর পাগড়ী ছিল (সহজলভ্য) ছাগলের পাকা চামড়া।
তিনি ৬৭৬ হিজরীতে মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। এই স্বল্প হায়াত সত্ত্বেও তিনি স্বরচিত বিশাল গ্রন্থভাণ্ডার রেখে যান। পরবর্তীতে তাঁর রচিত কিতাবের পাতা ও জীবনের 'খাতা' হিসাব করে দেখা যায় গড়ে তিনি প্রতিদিন চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ পাতা লিখেছেন।
📄 রক্তের প্রবাহ ও সঞ্চালনের উদ্ভাবক
বিজ্ঞ আলেম এবং দক্ষ চিকিৎসক
যে সকল অনন্য সাধারণ ব্যক্তি সময়ের সদ্ব্যবহার করেছেন এবং নিজেদের জ্ঞান ও চিন্তার সারনির্যাস আশ্চর্যরকম অল্প সময়ে লিপিবদ্ধ করে রেখে গেছেন, তাদের অন্যতম হলেন ইবন নাফীছ দামেস্কী, যিনি একদিকে যেমন ছিলেন বিজ্ঞ আলেম তেমনি ছিলেন দক্ষ চিকিৎসা বিজ্ঞানী। এমনকি তাঁকে তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা বিজ্ঞানী বললেও অত্যুক্তি হবে না।
روضات الجنات গ্রন্থে লেখক তাঁর জীবনী আলোচনা করতঃ উল্লেখ করেন- "তার পূর্ণ নাম হল, আলাউদ্দিন ইবন নাফীছ আলী ইবন আবু হাযম। জন্ম ৬১০ এবং মৃত্যু ৬৮৭ হিজরীতে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। গবেষণা ও উদ্ভাবনে এ শাস্ত্রে তার প্রতিদ্বন্দ্বী, এমন কি ধারে কাছেও কেউ নেই। এ শাস্ত্রে তাঁর রয়েছে বেশকিছু চমৎকার গ্রন্থ এবং অনবদ্য সংকলন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, চিকিৎসা শাস্ত্রে লিখিত الشامل গ্রন্থটি। কিতাবটি সম্পর্কে তাঁর কতক শাগরিদ বলেন, এর সূচী প্রমাণ করে যে, এটি প্রায় তিনশ' খণ্ডের, এর মধ্যে পরিচ্ছন্নভাবে লেখা হয়েছে মাত্র আশিখণ্ড। তাঁর রচনার মধ্যে আরো রয়েছে المهذب في الكحل এবং ইবন সিনা কৃত 'আলকানূনে'র ব্যাখ্যাগ্রন্থ شرح القانون এগুলোও বহু খণ্ডের। এছাড়াও এ শাস্ত্রে তাঁর অনেক গ্রন্থ রয়েছে।
চিকিৎসা শাস্ত্র ছাড়াও বহু বিষয়ে তাঁর দক্ষতা ও পাণ্ডিত্য ছিল। তর্কশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা, উসূলে ফিকহ, হাদীছ, অলংকার শাস্ত্র ও আরবী ভাষাতত্ত্বেও ছিল যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি এবং এসকল শাস্ত্রেই তিনি কলম চালিয়েছেন- অতি দক্ষ হাতে, সফলতার সাথে। এতসব কিছু তিনি করেছেন- কায়রোর মাদরাসায়ে মাসরূরীয়্যায় ফিকহ অধ্যাপনার দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে।
ইমাম বুরহানুদ্দীন ইবরাহীম রশীদ বলেন, আলা ইবন নাফীছ যখন কোন গ্রন্থরচনার সংকল্প করতেন তখন অনেকগুলো কলম চেঁছে প্রস্তুত করে কোন প্রাচীর বা আড়ালের দিকে মুখ করে বসতেন এবং মন থেকে উৎসারিত জ্ঞান-নির্যাস ও চিন্তার ফলগুলো সংরক্ষণ শুরু করতেন। প্রবলবেগে প্রবাহিত ঢলের গতিতে তাঁর কলম চলত। একটি ভোঁতা হয়ে গেলে রেখে দিয়ে অন্যটি নিতেন যেন কলম চাঁছায় সময় ক্ষেপণ না হয়। আর যখনই তিনি লিখতেন অন্তরের জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে লিখতেন। কোন কিতাব দেখতেন না, তথ্য-সূত্র তালাশ করতেন না। এতেই বুঝা যায়, তাঁর মেধা ও ধীশক্তি কত প্রখর ছিল।
তাঁর স্মৃতিশক্তির প্রখরতার প্রমাণ দিতে গিয়ে কায়রোর এক প্রাজ্ঞজন- সাদীদ দিময়াতী র.- যিনি ইবন নাফীছের শাগরিদ ছিলেন, তিনি বলেন- কাযী জামালুদ্দিন বিন ওয়াছেল এবং ইবন নাফীছ একদিন রাতে এশার পরে আলোচনা শুরু করলেন। আমি তাদের খুব কাছেই শায়িত ছিলাম। বিষয় থেকে বিষয়ে, প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে তাঁরা 'বিচরণ' করতে লাগলেন। শায়খ আলাউদ্দিন ইবন নাফীছকে দেখতে পেলাম, কোন রকম বাঁধা-বিপত্তি ছাড়াই দ্বিধাহীনভাবে তিনি আলোচনা করে চলছেন। তবে কাযী জামালুদ্দীনের আলোচনা চালাতে যেন কিছুটা অসুবিধা হচ্ছিল। যা তাঁর চেহারা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রকাশ পাচ্ছিল, তাঁর আওয়াজ কখনো উঁচু হয়ে উঠছিল, চোখ লাল হয়ে যাচ্ছিল এবং ঘাড়ের রগ ফুলে ফুলে উঠছিল। এমনিভাবে তাঁদের আলোচনা অব্যাহত থাকল ফজর পর্যন্ত। আলোচনা- পর্যালোচনার যখন সমাপ্তি ঘটল, কাযী জামালুদ্দীন বললেন, হে শায়খ আলা উদ্দীন! আমাদের অবস্থাতো এই যে, পাত্রে সামান্য পানি আর ইলমের খাযানায় সামান্য ক'টা দিরহাম। আর আপনি! আপনার কাছে তো উলূমের সাগর এবং এর ভরপুর খাযানা।
ইলমের চর্চা, আলোচনা ও সংরক্ষণে তাঁর আগ্রহ ছিল সীমাহীন। নতুন কিছুর আবিষ্কার ও উদ্ভাবনে তিনি ছিলেন উদ্যমী ও সদা প্রস্তুত।
একবার তিনি গোসলখানা থেকে অর্ধেক গোসল হতে না হতেই বের হয়ে আসেন এবং কাগজ, কলম ও দোয়াত আনতে বলেন। এসব হাজির হতেই ‘হৃদস্পন্দন’ সম্পর্কে একটি রচনা লিখতে শুরু করেন। লেখা শেষ হলে আবার তিনি গোসলখানায় ঢুকেন এবং গোসল সম্পন্ন করেন।
তিনি ছিলেন অত্যন্ত উদার। দিনে হোক বা রাতে মানুষের উপকার সাধনে কখনো তিনি কুণ্ঠাবোধ করতেন না। দূর-দূরান্ত থেকে বহু ইলম পিপাসু ‘পানি’ সংগ্রহের আগ্রহে তাঁর কাছে আসতো, এমনকি শাসক গোষ্ঠীর একটি দলও তাঁর মজলিসে হাজির হতো।
তাঁর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে তাঁর কয়েকজন চিকিৎসক বন্ধুর ধারণা হল, তিনি অষুধ হিসাবে সামান্য মদ পান করেছিলেন। কারণ তাঁর এমন রোগ হয়েছিল, যার চিকিৎসা শুধু এর মাধ্যমেই হতে পারে। কিন্তু তিনি (ইবন নাফীছ) এ দাবী প্রত্যাখ্যান করে বলেন, 'আমার পেটে মদের একটি ফোঁটা পড়বে, আর আমি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করব, এ হতে পারে না।'
তিনি বিবাহ করেননি। মৃত্যুর আগে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সবকিছু, যথা-আলিশান বাড়ি, বিশাল গ্রন্থশালা এবং সকল সম্পদ হাসপাতালের নামে ওয়াক্ফ করে যান।
তাঁর সম্পর্কে বলতে গেলে এক কথায় বলা যায়, তিনি ছিলেন চিকিৎসা শাস্ত্রের অন্যতম পথিকৃৎ। বিজ্ঞজনদের অনেকেই তাঁকে ‘দ্বিতীয় ইবন সীনা’ বলে ডাকতেন।
মানবদেহে রক্তের প্রবাহ ও সঞ্চালন সর্বপ্রথম তিনিই উদ্ভাবন করেন। তা-ও আজ থেকে সাত শতাব্দী আগে। আর নির্দ্বিধায়ই বলা যায়, চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটা এক মহাআবিষ্কার।
আবদুল ফাত্তাহ রহ. বলেন, ইবন নাফীছ র. এই অনন্য বৈশিষ্ট্য ও উজ্জ্বল প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও ছিলেন অতি বিনয়ী। তিনি তাঁর শিষ্য ও শাগরিদদের অনুমোদন ও সনদ পত্রে নিজের স্বাক্ষরস্থানে লিখতেন المتطبب (চিকিৎসা-শিক্ষানবিশ)। অথচ তিনি তখন এ শাস্ত্রের অন্যতম পথিকৃৎ।
📄 সহস্রাধিক গ্রন্থের প্রণেতা
এর চেয়েও আশ্চর্য হল শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা আবুল আব্বাস আহমদ ইবন আবদুল হালীম দামেস্কী র. (৬৬১-৭২৮ হিজরী) এর অবস্থা। যাঁর জীবনকাল ছিল মাত্র সাতান্ন বছর। তবে কিতাব রচনা করেছেন পাঁচশ' জিলদ এরও অধিক। এক মুহূর্ত সময়ও তাঁর তা'লীম, তাছনীফ কিংবা ইবাদত-বন্দেগী ছাড়া কাটতো না। যার ফল হয়েছিল, শত শত খণ্ডের কিতাব, যা তাঁর কোন ছাত্র বা অনুসারীদের পক্ষে একত্র করাও সম্ভব হয়নি।
ইবন শাকের তার فوات الوفيات গ্রন্থে লিখেন, ইবন তাইমিয়্যার গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় তিনশ'। তবে হাফেয যাহাবী র. লিখেন এ যাবৎ প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় পাঁচশ'।
তাঁর (ইবন তাইমিয়্যার) শাগরিদ ইবনুল কাইয়্যিম র. তাঁর কিতাবগুলোর নামের একটি সূচী তৈরী করেছেন। যাতে তিনি প্রায় সাড়ে তিনশ' কিতাবের নাম উল্লেখ করেছেন।
ইবনুল কাইয়্যিম র. الوابل الصيب من الكلم الطيب গ্রন্থে যিকিরের বহু ফায়দা ও উপকারিতা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে একষট্টিতম ফায়দা হল, তা 'যাকের' তথা যিকিরকারীকে অলৌকিক এক শক্তি ও ক্ষমতা দান করে। ফলে যিকিরে সময় ব্যয় হওয়া সত্ত্বেও তার দ্বারা এমন এমন কাজ হয় যা অন্য কেউ কল্পনাও করতে পারে না।
এরপর তিনি লিখেন- শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যার মধ্যে আমি সেই শক্তি ও ক্ষমতার আশ্চর্যরকম প্রকাশ দেখেছি। আমি তা দেখেছি তাঁর রীতি ও অভ্যাসে, আচরণে ও উচ্চারণে এবং সাহসিকতা ও পদক্ষেপ গ্রহণে। আর দেখেছি তাঁর লিখনীতে। তিনি একদিনে যে পরিমাণ লিখতেন তা অনুলিপিকারীর লিখতে লাগত এক সপ্তাহ কিংবা তারচে' বেশী সময়।
প্রিয় পাঠক! এ হল মাত্র একজন আলেমের পরিশ্রমের ফসল এবং সময়ের সদ্ব্যবহারের পরিণতি। কেউ কেউ তো একথাও বলেছেন যে, কোন মানুষের পক্ষে তাঁর সকল গ্রন্থ পড়ে শেষ করা সম্ভব নয়। আর আমার মতে এটা মোটেও অত্যুক্তি নয়।